নতুন ভাষার অক্ষরমালা ও অন্যান্য কবিতা: তনবির আনজুম

নীলাঞ্জন হাজরা

 

করাচির বাসিন্দা তনবির আনজুমের জন্ম সেই শহরেই ১৯৫৬ সালে। করাচি বিশ্ববিদ্যালয়, ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস, অস্টিন-এ ইংরেজি সাহিত্য এবং ভাষাতত্ত্ব নিয়ে তাঁর উচ্চশিক্ষা ও ডক্টরেট ডিগ্রি প্রাপ্তি। পেশায় করাচির ইকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। ১৯৮২-র দশক থেকেই পাকিস্তানের যে কবিরা উর্দু সাহিত্যের সাবেকি ধারাকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে একেবারে নয়া কবিতাশৈলী গড়েপিটে নিয়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম তনবির আনজুম। ১৯৮২-তে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আনদেখি লেহেরেঁ’ (না-দেখা ঢেউ)। এই কবিতাগুলি যে সব কাব্যসঙ্কলন থেকে নেওয়া হয়েছে সেগুলি হল— আনদেখি লেহেরেঁ (না-দেখা ঢেউ), নাসফর অওর কয়েদমে নজ়মেঁ (সফর ও কারাগারে কবিতা), তুফানি বারিশোঁমে রকসান সিতারে (তুফানি বর্ষায় নাচতে থাকা তারা) এবং নয়ে নামকি মুহব্বত (নয়া নামের ভালোবাসা)। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি উত্তর-আধুনিক নারীবাদী কবিতার সেরা নিদর্শন তনবিরের কবিতা, যা যে কোনও তাত্ত্বিক সুনির্দিষ্ট গঠনকে পরাস্ত করে। আর তার ছত্রে ছত্রে প্রতিফলিত পাকিস্তানের দৈনন্দিন বাস্তব।

 

কাচের ওপর আতশবাজি

আমরা একটা ভিড়
আমাদের সামনে জানালার কাচ
ভেতরে আবছা কিছু চরিত্র
যারা মিশে যাচ্ছে
বাইরের প্রতিবিম্বিত ছবিগুলিতে

আমাদের পিছনে
আকাশে ফাটতে থাকা আতশবাজি
দেখা যাচ্ছে কাচে

জরুরি সব সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা কসরতে খেলতে থাকা
বাজিকরদের প্রাণের নিরাপত্তা এই কাচ

সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা
আনন্দ বা দুঃখ
জীবন কিংবা মৃত্যু
ইত্যাদি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়
আমরা দেখে চলেছি
কাচের ওপর আতশবাজি

 

যখন আমি ভাবছিলাম একটা কবিতা

মেয়েটি চলে গেল আমার পাশ দিয়ে
বিরক্তিভরে আমায় দেখতে দেখতে
মন দিতে পারিনি আমি
ওদের বিচক্ষণ নানা কথায়
সময়সীমা চলে যাওয়ার পর পড়লাম
দারুণ চাকরিটার নোটিশ
ক্ষুধার্ত থাকল সে সারা রাত
চলে গেল চিরদিনের মতো
যথাসময়ে ওরা পেরে পারল না
সেলাইয়ের মেশিনগুলো
সমস্ত সম্পদ ওরা লুট করে নিল
দু’হাতে
নড়বড়ে দেওয়ালটা পড়ে গেল
স্কুলের বাচ্চাদের ওপর
ওরা ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে
নিজেকে এবং অন্যদের বোমায় উড়িয়ে দিতে
কেন আমি ভাবছিলাম একটা কবিতা

 

আমার কবিতাগুলো ফিরিয়ে নিতে আমি প্রস্তুত

আমার কবিতা
কিছু মানুষের ওপর কোনও প্রভাবই ফেলে না

আমার কবিতা
কিছু মানুষকে ভীষণ যন্ত্রণা দিয়েছে

আমার কবিতা
কিছু মানুষকে মেরে ফেলেছে

আমি আমার সমস্ত কবিতা ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত
আমি সব মানুষের মার্জনা প্রার্থনা করি

যাতে আমি সহ্য করে নিতে পারি
সারা দুনিয়ার এই উদাসীনতা
সহ্য করে নিতে পারি যন্ত্রণা-কাতর হৃদয়
আর আমার মৃত্যু

 

ফুলের বাদশা

ফুল-পাগল তাহিরার চারপাশে
শুধু ফুল আর ফুল

দানিশ তাকে দিয়েছে গোলাপফুল
ফুলের কেয়ারিতে রয়েছে গেঁদাফুল
হাতে বেলফুলের বাজুবন্ধ
আর চুলে চাঁপা
যে পুকুরটায় সে ডুবে মরেছিল সেটা ভর্তি ছিল পদ্মফুলে
আর কবর জুড়ে রঙে রঙে ভরা নয়নতারা

কথার বাদশা দানিশের বিষয়ে তাহিরার অভিযোগ কী ছিল?

প্রেমে তো সবই চলে
মাঝে সাঝে হলে
যে কোনও কিছুই মেনে নেওয়া যেতে পারে
যদি বারংবার না ঘটে থাকে
তবে তাহিরার হলটা কী?
সকলেই জিজ্ঞাসা করতে থাকল
ভালোবাসা-ভরা নীরবতায় ডুবে যাওয়া
তাহিরা কত চেষ্টা করেছিল
বলতে পারেনি

দানিশ কত শাল কিনে দিত
কবিতা লিখত
ফুলদানি সাজিয়ে রাখত
কবে আর তাহিরা কিছু চেয়েছিল?
যা পেয়েছিল প্রয়োজনের থেকে ঢের বেশি
পবিত্র তাহিরা স্বপ্নে যখনই তাকে ছুঁয়েছে
স্বপ্নের বাদশা দানিশের ঠোঁট
তাকে কত না ফুলের নামে ডাকত

ছিপছিপে তাহিরা মরে গিয়ে মোটেই ভাল কাজ করেনি
এই মর্মন্তুদ মৃত্যু
তাহিরার ফুলের বাদশা
প্রাণাধিক স্বামীটিকে
তার একমাত্র দুর্বলতা
রতিক্রিয়ার সময় গালিগালাজ করার জন্য ভারি বদনাম করে দিল

 

কৃতজ্ঞ নারীদের গান

আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত
যে আমরা একটা দীর্ঘ লাইনে জায়গা পেয়ে গেছি
যার সামনের কাউন্টারটা কোনও না কোনও সময়ে খুলবেই
এবং আমাদের কাজ শীঘ্রই হোক বা দেরিতে ঠিক শেষ হবে

আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত
যে আমরা হরেক কাজের ভাল করে তালিম পেয়েছি
এটা সবসময়ে আমাদের খুব কাজে দেবে

আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত
যে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে এবং লজ্জিত হওয়ার পর
কেউ আমাদের হাত ধরলেন
এবারে আমরা আমাদের হাসিভরা কমনীয় ব্যবহার, ভালবাসা আর সেবাযত্নে
নিজেদের তাঁর যোগ্য বলে প্রমাণ করার সুযোগ পাব
এবং আমরা যে কী ভাল সকলের মুখে মুখে তা রটে যেতে পারবে

আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত
যে যদিও আমরা এমন একটা দেশে জন্মেছি
তবুও আমাদের কেনা-বেচার কারবার এখানে সুসংগঠিত
কিন্তু আমাদের ক্রেতা মোটেই তেমন অত্যাচারী নন
যে আমাদের রক্তাক্ত করবেন

আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত
যে আমাদের উন্নতির জন্য কেউই
আমাদের সম্পূর্ণ নির্বস্ত্র করার প্রয়োজন বোধ করেননি
আর একটু আধটু ডিপ্লোমেটিক হওয়া বেশ কাজে দিল

আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত
যে সংবাদপত্রের ভেতরের পাতায় আমাদের নামের উল্লেখ
সেই জনৈক ব্যক্তিটির সঙ্গে করা হয়নি
যার মৃত্যু হল কে জানে কোন দিক থেকে ছুটে আসা অকারণ গুলিতে
আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত
যে কোনও টাইপিস্টের ভুলে আমাদের নাম বদলে যায়নি
এবং সেই ভিত্তিতে আমাদের জেলখাটার সময় আরও বেড়ে যায়নি

আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত
যে কোনও তুচ্ছ বোকা-বোকা অন্যায়ের প্রতি
সক্কলের সামনে লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য
নিজেদের গায়ে আগুন দিতে হয়নি

আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত
যে একটা লাইনে আমরা জায়গা পেয়ে গেছি
যার সামনের কাউন্টারটা কোনও না কোনও এক সময়ে খুলবেই

এবং এ লাইন এখনও কাজে লাগতে পারে এমন কয়েদিদের
কোনও কাজে-না-আসা বৌদের লাইনও নয়
যাদের মেরে ফেলার আগে স্নানে পাঠানোই দরকার বলে মনে করা হয়েছে

 

মোড়

একটা সুন্দর কবিতা

নাকি একদিনের সুখ?

খিদের একটা দিন

নাকি একটা ঘুমন্ত রাত?

একটা দীর্ঘ সফর

নাকি একটা লম্বা গাড়ি?

ঠান্ডা বালি

নাকি একটা উঁচু বাড়ি?

একটা কুৎসিত যুদ্ধ

নাকি একটি রূপসী মেয়ে?

একটা কঠিন বই

নাকি একটি সাধাসিধা ছেলে?

একটা মুখর নীরবতা

নাকি একটা মূক চিৎকার?

একটা পাগল স্বপ্ন

নাকি একটা ছোট্ট জীবন?

 

শেষ সারিতে গাওয়া গান

ক্লান্তি আমার সত্য
ঘুম আমার প্রয়োজন
তোমাকে চাওয়া আমার বাধ্যবাধকতা

সত্য স্বীকার করার আগে
প্রয়োজন মিটানোর আগে
বাধ্যবাধকতাটাকে জয় করার আগে

আমার কাছে রয়েছে
একটা ব্যস্ত দিন এবং একটু ঘুমের মাঝখানে
এক চিলতে অবসর
আর তোমার ভাবনার সঙ্গে একটা দীর্ঘ কথোপকথন
আমার সারাটা জীবনের সময়
সেই কথোপকথন শেষ করার পক্ষে যথেষ্ট নয়
তোমার সারাটা জীবনের সময়
আমার জন্য অপেক্ষার থেকে অনেকটাই বেশি

আমার সমস্ত বিজয়
দিয়েও হৃদয়ের রাজ্য তৈরি করে ফেলা যাবে না
তোমার যা শক্তি রয়েছে
তা দিয়ে পত্তন করা যেতে পারে তোমার নামের একটা শহর

আমি আমার সত্য স্বীকার করে নেব
মিটিয়ে ফেলব আমার প্রয়োজন
জয় করব আমার বাধ্যবাধকতা
আর তোমার নামে পত্তন হতে যাওয়া শহরে যখন
কোনও উৎসব আয়োজিত হবে
আমি ভিড়ের শেষ সারিতে দাঁড়িয়ে
আরও বহু মানুষের সঙ্গে
একটা গান গাইব
যা উৎসবের পরের দিন ভুলে যাওয়া হবে

 

কোন রং আপনার পছন্দ?

অবিরত রোদে দেওয়ালগুলোর রং ফিকে হয়ে গিয়েছিল
আর একবার বৃষ্টিতেই তা আরও খসে গেল

‘কোন রং আপনার পছন্দ?’
জানতে চায়যে রংকরবে
‘মাটির মতো খয়েরি
আকাশের মতো নীল
গাছের মতো সবুজ
নাকি মেঘের মতো কালো’
যে রংকরবে তার কাছে হরেক রকমের রংআছে

দেওয়ালগুলোর কোথাও কোথাও পুরনো রঙের ছোপ লেগে আছে
তাতে ফুটে ওঠে নানা রকমের ছবি
কোনওটা পশুদের মতো ভয়ঙ্কর
কোনওটা পাখিদের মতো স্বাধীন
কোনওটা শিশুদের মতো নিরপরাধ
কোনওটা বৃদ্ধদের মতো নিঃসহায়
দেওয়ালগুলো জুড়ে হরেক রকমের ছবি

‘কোন রংটা আপনার পছন্দ?’
জিজ্ঞেস করে যে রংকরবে
তার কাজ বেখাপ্পা ছবিগুলো নতুন রঙে ঢেকে ফেলা
সে নিজের কাজে দারুণ পটু

 

কোনও শব্দ নেই

ধুলো আমাদের ঘর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে
এই ঋতুতে কোনও বর্ষা নেই
আমরা চলে যেতে দিয়েছি মেঘের শেষ টুকরোটাকেও
আমার অবাধ্য ছেলের মতোই
সে আর কোনও দিন ফিরে আসবে না

শত্রুতা আমাদের হৃদয় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে
কোনও অলৌকিক কাণ্ড ঘটবে না এই রাতে
আমরা নোংরা জলকে মিশে যেতে দিয়েছি নোংরা কাদার সাথে
বৃদ্ধের দৃষ্টির মতোই তা আর কোনও দিন ফিরে আসবে না

মৃত্যু আমাদের শরীর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে
এই গলিতে আর একটাও শব্দ নেই
আমরা রাস্তায় বয়ে যেতে দিয়েছি রক্ত
আমার হারিয়ে ফেলা ঈশ্বরের মতো
তা আর কোনও দিন ফিরে আসবে না

 

কাঁটা চয়ন করতে করতে

নিজের জীবনটা আমি
স্বপ্ন দেখে, লড়াই করে আর কাঁটা চয়ন করে অপচয় করেছি

আমার ভারি আপশোস
স্বপ্ন আমায় আনন্দ দিয়েছে
এবং ভালবাসার মুহূর্তগুলোকে মুলতুবি করতে থেকেছে
অতি তুচ্ছ কারণে
আমায় অপমানিত করা হয়েছে
এবং আমার কল্পনা
আমায় সেই সব লোকের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ে অপচয় করেছে
যাদের কয়েকটা শব্দেই পরাস্ত করা যেত

আমার প্রার্থনাগৃহ কোনও বাড়ি থেকে আগুন পায়নি
আমার ফায়ারপ্লেসটা জ্বালিয়ে রাখতে
আমায় নিজের হৃদয় জ্বালিয়ে দিতে হয়েছে
আর যেতে হয়েছে এত দূর
যে প্রার্থনাগৃহে ফিরে আসা অর্থহীন মনে হয়েছে
কেউ আমায় কোনও উপায় বলে দেয়নি

আমার দুর্ভাগ্যের আগে
এ পথে কেউ আসেনি
যেখানে স্বাধীন বাতাস আমার জন্য বুনতে থেকেছে কাঁটা
আর আমার জেদ সহজ করে দিতে থেকেছে তোমার পথ

আমার ভারি আপশোস
আমার আহত আঙুলগুলো যতক্ষণে তোমার জন্য
ফুলের মালা গেঁথে ফেলতে পারবে
শুকিয়ে যাবে ফুল
এবং তুমি অনেক উপহার নিয়ে
শুরু করে দেবে নিজের সফল ভালবাসার উৎসব

 

সফরে ও কারাগারে এবারে কী হয়েছিল

আমি একটা তট থেকে একটা ঝিনুক কুড়োলাম
আর নিজের অশ্রু তাতে বন্ধ করে
দূর গভীর সমুদ্রে ছুড়ে দিলাম
আমি নিজের হাতদুটোয়
একটা ধারালো চাকু দিয়ে
দীর্ঘ সফরের রাখা কেটে দিলাম
এবং কিনলাম এমন জুতো
যা সফররত পা দুটোকে সতত আহত করে

এবার আমি বাড়ি তৈরি করেছি
এমন কাচ দিয়ে
যার ওপর কেবল ভিতরটা প্রতিবিম্বিত হয়
আর একটা আগুন দিয়ে
যা প্রয়োজনে নিজেই জ্বলে ওঠে
এবং এমন বাতাস দিয়ে
যার জন্য দরজা খোলা রাখার প্রয়োজন নেই
আর এমন সব বস্তু দিয়ে
যা নিজের নিজের জায়গায় ফরাসের সঙ্গে সেঁটে আছে

আমি আমার ঋতুগুলো চুরি করে এনেছি
আর ঘাসের ময়দান
মরুভূমি, আকাশ
আমি একটা প্রজাপতিকে একটা বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে ফেলেছি
আর দুচোখে একটা স্বপ্নকে
এবং ভালোবাসা বোঝার জন্য
আমি
একটা কবিতা পড়েছি
এবং শব্দের জন্য
একটা গান গেয়েছি
ঘুটঘুট্টি অন্ধকারে আমি
চোখ বন্ধ করে
বাড়ির কাচে
নিজেকে দেখেছি
এবং স্মরণ করেছি
একটি পুরুষকে
যে গভীর সমুদ্রে
নেমে পড়েছে সেই ঝিনুকটা খুঁজতে
যাতে আমি আমার অশ্রু বন্দি করে ছুড়ে দিয়েছিলাম

 

করাচি আকাশ-বিদীর্ণ-করা চিৎকারে বিশ্বাস রাখে না

প্রথম কিংবা হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বের
মস্কোর ভেরাকে নিয়ে একটা ছবি তৈরি হল
‘মস্কো অশ্রুপাতে বিশ্বাস রাখে না’
তৃতীয় কিংবা চতুর্থ বিশ্বের
করাচির জ়েহরার ওপরেও একটা ছবি তৈরি হওয়া উচিত
‘করাচি আকাশ-বিদীর্ণ-করা চিৎকারে বিশ্বাস রাখে না’
ভবঘুরে, গরিব, সাধাসিধা ভেরার জীবন
ছিল দুঃখে ভরা
মা, বাপ আর দশ-দশটা ভাইবোনের দায়িত্ব সামলান
ক্ষুধার্ত
সম্মানহীন জ়েহরার জীবন
দুঃখের অনুভূতিবিহীন হওয়া উচিত

মানুষের চালাকিতে ক্লান্ত ভেরা ভুল করেছিল
দু’ দিনের প্রেম-পিরিতের সঙ্গে শুয়ে পড়েছিল
অবৈধ এক কন্যার মা হয়ে গিয়েছিল
ধান্দাবাজ ঠগদের সঙ্গে যথেষ্ট পরিচিত জ়েহরার কোনও ভুল করা উচিত নয়
তার বিয়ে করা উচিত মা-বাপের কথামতো
এবং খানসাতেক বাচ্চার কমবয়সী মা হওয়া উচিত

ভেরা নিজের মেয়ের সঙ্গেও
রাত্রি জেগে লেখাপড়া জারি রেখেছিল
জল দেওয়া বা অন্য যে কোনও প্রয়োজনে
এদিক ওদিক ছুটে বেড়ানো এবং বাচ্চাদের দৌড় করানো
ক্রমাগত গর্ভবতী জ়েহরার মাথায়
বাচ্চাদের স্কুলের একটা আবছা ছবি থাকা উচিত

ভেরার যৌবন কোনও পুরুষ ছাড়াই নিঃসঙ্গ কেটেছে
যদিও সে ভালবাসায় নিজের বাড়ি তৈরি করেছিল
জ়েহরার জীবন স্বামীর পা টিপে
অনুভূতিহীনভাবে কাটা উচিত
এবং বাড়ির সকলের জন্য পরিশ্রম করা সত্ত্বেও
তার নিজের কোনও বাড়ি থাকা উচিত নয়
চল্লিশের বেশি বয়সে ভেরা
পেয়ে গিয়েছিল সব-কিছু-দিয়ে তাকে ভালবাসা একজন
এবং তার ভালমানুষ হওয়াটা বা তার মেহনত ফেলা যায়নি
জ়েহরার উচিত চল্লিশের আগেই বিধবা হয়ে যাওয়া
এবং আরও সহায়সম্বলহীন হয়ে পড়া

যাবতীয় চিন্তা থেকে মুক্ত ভেরার একমাত্র মেয়ে
যখন নিজের ভুলভাল কাণ্ডের জন্য ঠগবাজদের পাল্লায় পড়ল
বহু কাঠখড় পুড়িয়ে তাকে রক্ষা করেছিল তার সৎ বাপ
জ়েহরার অবিরত চিন্তায় ঘেরা তার সাত বাচ্চারই
এমকিউএম[1] না ক’রে
সেনা অপারেশনের সময়
তাদের সৎ মায়ের আকুল চিৎকার সত্ত্বেও
একে একে
সশস্ত্র বাহিনী কিংবা পুলিশ কিংবা অন্যান্য সন্ত্রাসবাদীদের হাতের
বিবিধ ভয়াবহ অস্ত্রের শিকার হিসেবে
খুন হওয়া উচিত
এরপর তাদের মা জ়েহরারও মরে যাওয়া উচিত
‘করাচি আকাশ-বিদীর্ণ-করা চিৎকারে বিশ্বাস রাখে না’-র মতো বাস্তববাদী ছবি
অস্কার অ্যাওয়ার্ডও পেয়ে যেতে পারে।

 

নতুন ভাষার অক্ষরমালা

আমি বলছি যে
আমি একটা দীর্ঘ সফর করেছি
এই তুচ্ছ কথাটা তোমার কাছে পরিষ্কার করার জন্যে
যে আমার দেহের গুণতি সেই সব জিনিসের মধ্যে হতে পারে না
যা বিক্রি, চুরি কিংবা রদবদল করা যায়
আর আমাদের রাস্তা পৃথক হয়ে গেছে

আমি শুনি
আমার দেহে আর বিক্রি, চুরি বা রদবদল হওয়ার সম্ভাবনা বাকি নেই
সফরের মালপত্রও আর নেই

আমি বলছি
আমি একটা কবিতা শুরু করে ফেলেছি
এবং তার শেষটা স্বপ্নে পেয়ে যাব বলে ঘুমিয়ে থেকেছি

আমি শুনি
স্বপ্নে পাওয়া সমাপ্তি আমার হতে পারে না

আমি বলছি
আমার মধ্যে নিশ্চিত সে হিম্মত আছে
যে আমি যখন খুশি
জীবনের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করে দিতে পারি
আমি শুনি
সেই মুহূর্তটা আমার দেহ-মনের জন্ম হওয়ার আগেই ভেঙে গিয়েছে
যা আমার দেহ আর মনকে কোনও শহরের কাছে নিয়ে যেতে পারত
আমার বাবা উত্তরাধিকারে আমায়
ভালমানুষির উপহার
অতিথিপরায়ণতার শিক্ষা
ভালবাসার প্রয়োজনীয়তা
আর একটা শহর দিয়েছিল
যেখানে চালাক আর বুড়ো দোকানদারেরা
কখনও কখনও বাচ্চাদের বিনা পয়সায় একটা চকলেট দেয়

আমি বলছি
এবার আমার বাবার খুনিকে হত্যা করায় আমার
আর দেরি করা উচিত নয়

আমি শুনছি
কবরখানায় পুরুষদের উৎসবে
গাওয়া গান ছাড়া আমি
কোনও নতুন দিন শুরু হওয়ার গান গাইতে পারব না
যে রাতে জীবন শুরু হয়েছিল
সেই রাতেই এখনও জারি আছে

গ্রীষ্মগুলো আমি কাটিয়েছি এমন একটা গুহায়
যেখানে কোনও একটা জানোয়ার শীতকালের জন্য খাদ্য সংগ্রহ ক’রে
আমার জায়গাটা একচিলতে ক’রে দিয়েছে
আর শীতকালটা ঘুমন্ত পশুটাকে ছেড়ে
কাটিয়েছি আহত-করা তুষারে

আমি বলছি
আমার দেহ সেই পাখি নয়
বেঁচে থাকার জন্য যার পরিযায়ী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে

আমি শুনছি
উত্তরে এখন ভীষণ তুষারপাতের দিন
দক্ষিণে পৌঁছনোর আগেই আমায় হত্যা করা হয়েছে

আমি বলছি
একটা সূর্য দেখতে
এবং একটা নতুন কথার খোঁজে
আমি বহু দূর পর্যন্ত যাব

আমি শুনছি
সফরের মালপত্রের মধ্যে থাকে না চোখ
কিংবা চোখের আকাঙ্খা

আমি বলছি
কেটে ফেলা আমার গাছটার শাখাগুলো থেকে
আমি ঠিক লিখে ফেলতে পারব একটা নতুন ভাষার অক্ষরমালা
আর পাতাগুলো দিয়ে জ্বালাব আগুন
আমি শুনছি
আরও একটা উৎসব আয়োজিত হবে
আরও কিছু প্রাণ
এবং কেটে ফেলা গাছের পাতার আগুন
চুরি করে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে
এবং সে আগুনে ঝলসে ফেলা হবে হাঁপাতে থাকা পশুদের জিভ
এই শহরের শহরতলি পাহাড়ি অঞ্চ‌ল নয়
যা পালাতে থাকাদের আশ্রয় দিতে পারে

আমি বলছি
আমার কাছে বেঁচে আছে সেই দিনের স্বপ্ন
যেদিন নীরবতা ছাড়াও
মৃত শব্দদের বিরুদ্ধে তুলে নেওয়া হবে অন্য কোনও হাতিয়ার

আমি শুনছি
দেহ নীরবতা এবং শব্দ দুটোকেই ধ্বংস করে
আর চোখ প্রত্যেক চোখে-না-পড়া জিনিসকেই শেষ পর্যন্ত দেখে ফেলবে
যা-কিছু চোখে পড়ে নাদেহকে তাই ধ্বংস করে দেয়
দেহকে ধ্বংস করে অতীত দেহকে ধ্বংস করে ভবিষ্যৎ

আমি বলছি
আমি ভেঙে ফেলছি সময়ের বিভাজিকা
আমি হাওয়া, মাটি, জল ও আগুনে ছুড়ে ছুড়ে ফেলছি সময়
সময়কে আমি মুক্ত করে দিচ্ছি আমার দেহ থেকে
এবং শৃঙ্খল অস্বীকার করতে
খুঁজে বেড়াচ্ছি আমার সেই হাত দুটো যা কেটে ফেলা হবে

আমি শুনছি
একটা মেলায় আমায় বন্দি করে ফেলা হয়েছে
যেখানে আমি শিশুদের দেখছি
বুড়ো ধূর্ত দোকানদারদের দেওয়া
বিষাক্ত চকলেট খেতে এবং ছুড়ে ছুড়ে ফেলতে
আমি একটা প্রদীপদানে
নিভে যাওয়া প্রদীপের সাথে
থাকতে বাধ্য হয়েছি
একটা দাঁড়িপাল্লা যার পাল্লাগুলো সমান নয়
তৈরি করা হয়েছে জীবনের ওজন নিতে
খালি ঝুড়িগুলো ভরে নেওয়া উচিত
বহুল উচ্চারিত প্রবচনে
আর একফোঁটা সম্মানে
যেগুলি অবশ্য সহজেই পাওয়া যেতে পারে

আমি বলছি
এ কথা সত্যি নয় যে
অত্যাচার-কক্ষে আমার উপস্থিত থাকার কারণ
স্রেফ আমার নিভে যাওয়া প্রদীপ
আর আমার শূন্য ঝুড়ির বোঝা

আমি শুনছি
মাথার মধ্যে সহসা ঝলসে ওঠা আলো
খুব একটা ভরসাযোগ্য হতে পারে না
সহসা ফাঁস হয়ে যাওয়া একটা রহস্য থেকে ছড়াতে থাকা নীরবতা
এবং ছড়াতে থাকা কথা
তৈরি করে ফেলছে আর একটা রহস্যজাল

আমি বলছি
এবার আমি সহ্য-করা-যেতেই-পারে এমন কেউ হয়ে থাকার শেষ সীমায় পৌঁছচ্ছি
এমনটা হতেই পারে
এখন যেন এমনটা না হয় যে
কে বলি হবে লটারি করে তার নাম ঠিক করার সময়
আমার হলদে রং আর ঠকঠকিয়ে কাঁপা দেখে
আমায় অন্য কারও একটা নাম দিয়ে দেওয়া হল
এবার আমি সহ্য-করা-যেতেই-পারে এমন কেউ হয়ে থাকার শেষ সীমায় পৌঁছচ্ছি
যে, আশীর্বাদ পাওয়া অন্তরাত্মাদের মধ্যে
শরিক হতে না পারায় শোকপালন বন্ধ করেছি

আমি শুনি
আমার জন্ম হয়েছে আগুনে পুড়ে যাওয়ার পরে
যে আগুন একটা ব্যর্থ পরীক্ষার পর
পরীক্ষাগারে লেগে গিয়েছিল
আর সেই ঘর আমার কুল-পরম্পরা
যা লুঠ করেছে এক মোটঘাটবিহীন মুসাফির
দ্বিতীয় বার জন্মানোদের কাছে জীবন আর খুব নতুন বা গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকে না
লজ্জাকর এই জন্ম
এবং তা চিহ্নিত করে যে
আমার কাছে অসাধারণ কিছু আশা করার নেই

আমি বলছি
চিরন্তন অপরাধকে নির্ভার করে দেওয়াদের সঙ্গে
নাচ করব

আমি শুনি
অর্ধেক শোনা ঘুমপাড়ানি গান অতীতের জিম্মায়
এবং নগ্ন ছবি দিয়ে উসকানো ভালবাসাই
ভবিষ্যতের কপালে আছে

আমি বলছি
হৃদয়ের আগুনে আমি
নগ্ন সব ছবি পুড়িয়ে ফেলব
অতিরিক্ত নীরবতাকে
অতিরিক্ত কথাকে
এবং আমার সন্তানদের শোনাব ঘুমপাড়ানি গানের পুরোটাই
হৃদয়ের আগুনে আমি
পুড়িয়ে ফেলব একটা উৎসব
আর একটা শোক
আর অর্ধেক সূর্যের আলো

আমি শুনি
হেমন্তে আপেলের গাছ কেটে ফেলে
তার কাঠ বেচে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়ে গেছে
মৃতদের দাবির জবাবে
নীরবতার অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়ে গেছে
এবং তাদের মশালের কারবার করা
যেন প্রথা মেনে নিষিদ্ধই রাখা হয় সে সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়ে গেছে

আমি বলছি
মাটির নীচে যা কিছু আছে
তার মধ্যে কবর আর সম্পদ দুটোই রয়েছে
যেখানে আমার জীবন্ত দেহে
ঠকিয়ে মাটি ফেলা হয়েছে
কাকতালীয় ভাবে সেখান থেকেই উঠে এসেছে সম্পদ
জমিনের অনেক নীচে
নির্ঘাত ঝলমল করছে হিরে
জমিনের অনেক নীচে
নির্ঘাত বেড়ে উঠছে একটা চক্রান্ত
জমিনের অনেক নীচে
নির্ঘাত ধকধক করছে একটা হৃদয়

 

এ নেহাতই কাকতালীয়

তোমার শরীরে একটি শিশু আছে
যে কোনও মা পায়নি
আমার ভাবনায় রয়েছে একটা ঘুমপাড়ানি গান
যা তোমায় শোনানো যেত

তোমার শরীরে একজন পুরুষ আছে
যে কোনও নারী পায়নি
আমার ভাবনায় একটা নাচ রয়েছে
যে তোমায় দেখানো যেত

তোমার শরীরে একটা বুড়ো আছে
যে কোনও সন্তান পায়নি
আমার ভাবনায় একটি মেয়ে আছে
যে তোমার ক্লান্ত পা দুটো টিপে দিতে পারত

আর এ নেহাতই কাকতালীয় যে
তুমি আমার শত্রুদের সঙ্গে
আমায় খুন করতে এসেছ
তোমার শরীরে একটা যুদ্ধ আছে
কিংবা হয়তো আমার ভাবনায়
কিংবা হয়তো আমাদের পরিবেশে

এখন আমার মৃত্যুর পরে
রাজকন্যা টগবগিয়ে যাবেন সেপাইসন্ত্রীদের নিয়ে
আর তা দেখার জন্য ফাঁক হওয়া জানালার দিকে
ধেয়ে আসবে ঝাঁকে ঝাঁকে তির
এবং একদিন না একদিন হঠাৎই
খোলা থেকে যাবে তোমার জানালা

আমরা গাছের সেই সব শাখা
যা ছেঁটে ফেলে দুনিয়ার সব বাগান সুন্দর করে ফেলা হবে

তোমার শরীরে একটা মৃত্যু আছে
যা আমার ভাগ্যে লেখা আছে
আমার ভাবনায় একটা বান রয়েছে
যা ছুটে আসবে আকাঙ্খার খোলা জানালা থেকে

 

সমুদ্র নিয়ে গেছে আমার দু’চোখ

সমুদ্র আমার দু’চোখ নিয়ে চলে গেছে
তোমায় দেখা যাবে না
তোমার সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে
আমি তিরে দাঁড়িয়ে চোখ দুটো ফিরে আসার অপেক্ষায় আছি

সমুদ্র আমার চোখ দুটো কখন নিয়ে গেল
তা আমি জানি না
সেটা বুঝলাম যখন
আমার মাটিতে যুক্ত হল দেখার আকাঙ্খা
এবং মাটি সরে যেতে লাগল

কিছুক্ষণ জ্বালিয়ে রাখো এই আগুন
আমি জেনে নিচ্ছি ঢেউদের কাছে
আগুনকে বাগান করে তুলতে কতটা বিশ্বাস লাগে
মাটি সঙ্গে নিয়ে ফিরে যাওয়া একটা ঢেউ বলে
আগুনকে বাগান করে তুলতে হলে আগুন দেখা জরুরি
আর সমুদ্র প্রত্যেকটা দেহ মেরে ফেলে ফিরিয়ে দিয়ে যায়


*কবিতাগুলি সরাসরি উর্দু থেকে অনূদিত

 

[1]MQM: মুত্তাহিদা কৌমি মুভমেন্ট। করাচির শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2511 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. অনুবাদ এত ভাল হয়েছে, যে মনেই হয়নি কোনও অনুবাদ কবিতা পড়ছি।

আপনার মতামত...