আয়াসোফিয়া রূপান্তর— তুরস্ক সরকারের এই পদক্ষেপ প্রত্যাশিতই ছিল

বর্ণিল ভট্টাচার্য

 


লেখক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিবাসী তথ্যপ্রযুক্তিবিদ

 

 

 

 

 

ইস্তানবুলের গ্র্যান্ড বাজারের কবজ-বিক্রেতারা সেদিন হতবাক। তারা নিজেরাই চেঁচামেচি করতে অভ্যস্ত। পর্যটকদের ঘাড়ের ওপর পড়ে একে অন্যকে টেক্কা দিয়ে নিজের জিনিসটা বিক্রি করা…। আশেপাশের সরু গলিগুলো সে সময় স্কুটার আর গাড়ির প্যাঁ-পোঁতে ভর্তি থাকে। কিন্তু সে সব আওয়াজ ছাপিয়ে আজ এ কীসের শব্দ! থেমু’আদ্দিন! বিকেলবেলার প্রার্থনায় থাকার জন্য চিৎকার করে আহ্বান জানাচ্ছে!! গত ৮৫ বছরে যে-ধরনের আহ্বান কেউ শোনেইনি! হজম করতে সময় তো লাগবেই।

আয়াসোফিয়া এখন থেকে একটি মসজিদ হয়ে গেল!

তুর্কির সাংস্কৃতিক হেরিটেজ আয়াসোফিয়া— সেই ব্যস্ত শহরের মধ্যে গম্বুজের সিল্যুয়েটের চিরপরিচিত ছবি— বহু সময়েই শিরোনামে এসেছে বিভিন্ন কারণে। এর অন্তর্নিহিত ইতিহাস, অপূর্ব শিল্প এবং স্থাপত্য প্রতি বছরই লক্ষ লক্ষ পর্যটককে আকর্ষণ করে এসেছে। কিন্তু এবারে তার যে কারণে শিরোনামে আসা, তা বোধহয় না হলেই ভালো ছিল।

এ মাসের শুরুর দিকে একটি ইসলামি এনজিও দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন করে এই মর্মে যে, ১৯৩৫ সালে এটিকে মিউজিয়ামে পরিণত করার যে সিদ্ধান্ত তা পুনর্বিবেচনা করা হোক।

আয়াসোফিয়া (মূল গ্রিকে অর্থ ‘পবিত্র জ্ঞান’)-র প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট কনস্টানটাইন, যাঁর নামেই কনস্টান্টিনোপল। তিনি এটিকে নির্মাণ করেছিলেন একটি গির্জা হিসেবে। শুরু থেকেই এটি সম্ভ্রম এবং আড়ম্বরের প্রতীক হিসেবে গোটা বিশ্বে স্বীকৃত। মনে রাখতে হবে, সেই সময়ে কিন্তু রোমানরা অর্ধেক পৃথিবী জুড়ে রাজত্ব করত।

সেই শুরু। ৬০০ বছর পর খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের আক্রমণ সামলায় আয়াসোফিয়া। এর দুই শতক পর এক রক্তাক্ত যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে অটোমানদের ক্ষমতা দখল, এবং তখনও এই প্রাসাদ সগৌরবে অটল। ১৪৫৩ সালে গির্জাটি মসজিদে পরিণত হয়। এরও প্রায় ৫০০ বছর পরে, আধুনিক তুরস্কের জনক উদারমনা এবং ধর্মনিরপেক্ষ কামাল আতাতুর্কের সময়ে এটি মিউজিয়ামে পরিণত হয়। আধুনিক বিশ্ব আয়াসোফিয়াকে সেই মিউজিয়াম হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত। একটা নিরপেক্ষ স্থান, যেখানে আপনি বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে মোজাইক এবং ফ্রেস্কোতে শ্বেতপাথরের কারুকাজ দেখবেন, খিলানগুলির স্থাপত্য দেখে আপনার চক্ষু বিস্ফারিত হবে, এবং আপনি ভাবতে থাকবেন এই যে সাফল্যের— এবং ক্ষতেরও— চিহ্নগুলি, এগুলি তো অন্য কিছুর না, স্বয়ং সভ্যতার যাত্রাপথেরই একান্ত চিহ্ন।

আবার ২০২০তে ফিরে আসা যাক। দেশের প্রশাসনিক আদালত ইসলামি এনজিওটির সহমত হলেন এবং তাদের আবাদনের পক্ষে রায় দিলেন। তুরস্কের বর্তমান মহাপরাক্রমশালী প্রেসিডেন্ট রিসেপ এরদোগান বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে আয়াসোফিয়াকে মিউজিয়াম থেকে মসজিদে পরিণত করতে ডিক্রি জারি করলেন। একটা ডটেড লাইনের ওপর মাত্র একটা সই— ব্যস! এক আধুনিক একনায়ক এক সুপ্রাচীন ভূমি থেকে তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ পূর্বজের সহিষ্ণুতা এবং ঔদার্যের অবশেষটুকুও মুছে দিলেন!

নিখুঁত সমন্বয় কাকে বলে তার একটা প্রকৃষ্ট নজির এই পদক্ষেপ। হতে পারে পশ্চিমী মিডিয়া খবরটা বিশ্বাস করতে পারেনি প্রথমে, কিন্তু তুরস্কে একজনকেও পাওয়া যাবে না যে নাকি এতে ন্যূনতম বিস্মিত হয়েছে। তাদের কাছে এ মোটেই নতুন কিছু নয়। বরং কিছু খ্রিস্টান নেতা যখন একে মধ্যযুগে প্রত্যাবর্তন বলে আখ্যা দিয়েছে, তখন বরং তারা অবাক হয়েছে।

সত্যি কথা বলতে, এই পদক্ষেপ প্রত্যাশিতই ছিল। গত ১০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে আয়াসোফিয়ার ৪টি অনুসারী বাইজান্টাইন গির্জাকেই মসজিদে পরিণত করা হয়েছে। অতএব তার পরের ধাপ হিসেবে ইস্তানবুলের এই গরিমায় যে হাত পড়বে, তা অনিবার্যই ছিল।

রূপান্তরিত মসজিদে প্রথম নামাজ পড়া হল ১৫ জুলাই।

সংখ্যাগরিষ্ঠ তুর্কি জনগণ কিন্তু এই পদক্ষেপকে সমর্থনই করছেন। তাঁদের মনোভাব অনেকটা এরকম—

আয়াসোফিয়া চিরকালই আমাদের, অতএব আমরাই ঠিক করব এটি কী হবে না হবে। আর ক্ষতিটাই বা কী? কোনও মূর্তি নষ্ট করা হচ্ছে না। কাউকে দরজা থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। লক্ষ লক্ষ মানুষ যেমন আসতেন এখানে, তেমনই আসতে থাকবেন। এটা আসলে ইতিহাসের পথে আয়াসোফিয়ার দীর্ঘ, বঙ্কিম সফরে আরও একটি বাঁকবদল মাত্র।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট এরদোগান কেন যে হঠাৎ করে এই ঐতিহাসিক সৌধটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, সে নিয়ে কিন্তু তুর্কি জনগণের মধ্যে কোনও বিভ্রম নেই। সে তিনি যতই দাবি করুন না কেন, যে এই পদক্ষেপ নাকি অতীতের আগ্রাসনকারীদের হাত থেকে তুরস্কের ঐতিহ্যকে মুক্ত করার প্রয়াস। তুরস্কের অর্থনীতি বর্তমানে খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটি দ্বিতীয় মন্দায় আক্রান্ত হয়েছে। প্রথমটি এসেছিল ২০১৯-এর শুরুর দিকে, যার ধাক্কা খুব সামান্যই কেটেছে বলা যায়। আর হাতের সব তাস যখন ব্যর্থ হয়, তখন যে জাতীয়তাবাদে উস্কানি দেওয়াটাই মোক্ষম তাস হয়ে ওঠে তা এরদোগানের চেয়ে ভালো কেউ জানে না। মনে রাখতে হবে আজকের আমেরিকার ট্রাম্প, ব্রাজিলের বোলসোনারো বা ভারতের মোদিরা কিন্তু এই এরদোগানেরই পদাঙ্ক অনুসরণকারী।

এরপর পুনর্নির্বাচনের ঢক্কানিনাদ শুরু হবে, যথারীতি। গত ১০ বছরে তুরস্কে সরকার যেভাবে ধর্মনিরপেক্ষ আইনকানুন, রীতিনীতি এবং সামাজিক অনুশীলনগুলিকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করেছে এবং ঔদার্য ও সহিষ্ণুতার সংস্কৃতিকে বিপর্যস্ত করেছে, তাতে সবচেয়ে আশাবাদী পর্যবেক্ষকরাও এখন সন্দিহান হয়ে পড়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে এটাও সত্যি যে, ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে রুশ অর্থোডক্স চার্চের সঙ্গে বিতর্ক বা সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে একটি ইওরোপীয় শক্তির সঙ্গে আবেগপূর্ণ বিতর্ক তুর্কি জনমানসে বেশ ভালো ছাপ ফেলেছে।

কিন্তু এবারের সময়টা আলাদা। বিরোধী সাংসদদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সাংবাদিকদের চুপ করানো হয়েছে, মানবাধিকার কর্মীদের আক্রমণ করা হয়েছে, সংবিধান পালটানো হয়েছে, বিরোধী সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, বিচারকদের কেনা হয়েছে— এরদোগান সরকার অনেকগুলি সীমা ইতিমধ্যেই পার করে বসে আছে। এবারে আর ফেরার রাস্তা নেই সম্ভবত।

এই প্রাচীন ভূখণ্ড একদিকে আলিঙ্গন করে রয়েছে আনাতোলীয় এবং বলকান উপদ্বীপকে; এই ভূখণ্ড আসিরীয়, থ্রাসীয়, গ্রিক এবং আর্মেনীয়দের প্রাচীন ভূমি; এবং এই ভূখণ্ড অবস্থান করছে এশিয়া, ইওরোপ ও আফেইকার সংযোগস্থলে— আমরা আশা রাখি মধ্যপ্রাচ্যের রক্ষণশীলতার সমুদ্রে একদিন এই তুরস্কই আধুনিক উদারতাবাদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2511 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...