ভাইরাস, ভয় ও ভ্যাক্সিন

কৌশিক দত্ত 

 


লেখক চিকিৎসক, প্রাবন্ধিক ও গদ্যকার

 

 

 

 

মাত্র কয়েক গ্রাম ওজনের করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীতে। তারা আকাশে বাতাসে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে না। মানুষের শরীরে ঢুকতে পেলে (তাও শুধুমাত্র নাক, মুখ, চোখের রাস্তায়) একটি বিশেষ গ্রাহকের (receptor) সাহায্যে নির্দিষ্ট কিছু কোষে প্রবেশ করে মানুষেরই ডিএনএ-র সাহায্য নিয়ে, মানুষের কাছ থেকেই উৎসেচকাদি ধার নিয়ে তাড়াতাড়ি যতটা পারে নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধি (বংশবৃদ্ধিও বলা যায়, তবে না বলারও কিছু যুক্তি আছে) করছে। মানুষের হাঁচি, কাশি, কথা বলা বা চিৎকারের ভরসায় এরা কোনওমতে একজনের শরীর থেকে বেরোতে পারে। বেরোতে পারলেই কেল্লা ফতে, এমনও নয়। বেরোনোর পর যদি কাছাকাছি অন্য কোনও মানুষের খোলা নাক, মুখ, চোখ না পায়, তাহলে রাস্তার রুক্ষ অ্যাসফল্ট বা রেলিঙের লোহা ইত্যাদির উপর আছড়ে পড়া ছাড়া বেচারাদের কোনও উপায় থাকে না। বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে খানিকক্ষণ বাতাসে ভেসে থাকতে পারে বটে, কিন্তু ডানা না থাকায় শহরের এমাথা-ওমাথা উড়ে বেড়াতে পারে না। ভেসে বেড়াতে হয় বাতাসের ভরসায়। তাতে অন্য মানুষের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা খানিক বাড়ে বটে, কিন্তু চোখ বা ঘিলু না থাকায় উপযুক্ত মানুষ খুঁজে বের করার কাজটা করোনার দ্বারা হয় না।

যেখানে আছড়ে পড়ল… সে লোহা হোক বা সিমেন্ট বা কাপড়… সেখানে নির্জীবের মতো পড়ে থাকা ছাড়া গতি নেই। নির্জীবের মতো মানে কুমিরের কায়দায় ঘাপটি মেরে নয়, প্রকৃত নির্জীব অবস্থায়। আসলে ভাইরাস এমন এক জীব… না ঠিক জীব নয়, জীব আর জড়ের মাঝামাঝি এমনি এক হাঁসজারু, আশ্রয়দাতা জীবের শরীরের (বস্তুত কোষের) বাইরে যাদের মধ্যে জীবনের কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। কখন কে সেসব জিনিস ছোঁবে, তার অপেক্ষা। শুধু ছুঁলেই হবে না, সেই হাত না ধুয়ে তাই দিয়ে যতক্ষণ না সেই ব্যক্তি নিজের (বা অন্যের) নাক-মুখ-চোখ ছুঁচ্ছেন, ততক্ষণ ফের বেঁচে ওঠার কোনও আশা নেই বেচারা করোনার। তার মধ্যে যদি হাতে বা অন্য জিনিসপত্রের ওপর জল-সাবান বা অ্যালকোহল ঢেলে ও ডলে দেয় লোকজন, তাহলে অমদ্যপায়ী নাবালক করোনার দেহ রক্ষা পায় না, দেহান্ত হয়। এমনিতেই যেসব বস্তুর ওপর ভাইরাস বাবাজি পতিত হয়েছেন, দু-চারদিনের মধ্যে সেসব কেউ না ছুঁলেই করোনার আয়ু শেষ। এমনই দুর্বল ও অসহায় তারা।

ভাইরাস আন্দাজে করোনা একটু বড়সড়, তা বলে টিভিতে যত বড় দেখায় তার ধারেকাছে নয়। ভাইরাস মাত্রেই অতি ক্ষুদ্র। এতদিনে বাজারে বিখ্যাত এন-৯৫ মুখোশের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছিদ্রের চেয়েও অনেক ছোট করোনাভাইরাসের ব্যাস। এন-৯৫ মুখোশ একাকী সঞ্চরমান অভিযাত্রী করোনাভাইরাসকে আটকাতে পারত না। ভাগ্যক্রমে এই ভাইরাস ওভাবে তেড়ে আসে না, তাই মুখোশ আটকে দেয় ভাইরাসবাহক ড্রপলেট (ছোট জলীয় ফোঁটা)-গুলোকে। খালি চোখে তো দূর, সাধারণ মাইক্রোস্কোপেও এদের দেখা যায় না। তাই ইদানীং টেলিভিশনের মনোজ্ঞ আলোচনা  আর ফেসবুকের রোম্যান্টিক পোস্টে অদৃশ্য শত্রুর কথা খুব শোনা যাচ্ছে। যদিও এরা শত্রুমনোভাবাপন্ন নয়। হ্যাঁ, এরা মানুষকে মানুষ মনে করে না, একথা সত্য। মানুষকে এরা ভাবে বাসস্থান এবং খাবার-দাবার (বা নতুন ভাইরাস দেহ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান) ইত্যাদির এক একটা সংগ্রহশালা এবং সেভাবেই প্রাপ্ত সুবিধার সদব্যবহার করে। কিন্তু আশ্রয়দাতা মানুষকে মেরে ফেলার কোনও উদ্দেশ্য বা ষড়যন্ত্র এদের থাকে না। বস্তুত মানুষের শরীরটি বেঁচে থাকতে থাকতেই কোটি কোটি বংশধর সৃষ্টি করে সদলবলে কেটে পড়ে অন্য শরীর খুঁজে নিতে পারলেই এদের লাভ (মানে জেনেটিক লাভ)। মেরে ফেলে লাভ কী? মরা মানুষ কোনও কাজের নয়। সে হাঁচে না, কাশে না, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে বেড়ায় না, অন্য মানুষের সঙ্গে হাত মেলায় না, এমনকি তার কোষগুলো ব্যবহারযোগ্য উৎসেচক ধার দিতে পারে না, তার জিনের সঙ্গে নিজের আরএনএ থেকে তৈরি ডিএনএ-র সুতোগুলোকে বুনে দেওয়া যায় না বা বোনা হয়ে গিয়ে থাকলেও তা থেকে নতুন কিছু তৈরি হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং মানুষ মরে গেলে এই ভাইরাসের লাভের চেয়ে লোকসান বেশি। সেই কারণেই বেশিরভাগ আশ্রয়দাতা মানুষকে এরা মারে না। তবু কিছু মানুষকে চলে যেতে হয়, যার সংখ্যাটা নেহাৎ কম নয়। অনেক ক্ষেত্রে অবশ্য মানুষ নিজেই নিজেকে মেরে ফেলে। মানবদেহের ইম্যুন সিস্টেম কী করবে বুঝতে না পেরে ক্ষেপে ওঠে এবং দিকবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে র‍্যান্ডম গোলাগুলি চালিয়ে ঝড় (cytokine storm) তোলে। সেই ঝড়ে ভেঙে পড়ে আট কুঠুরি নয় দরজা দেহবাড়ি আর বদনাম হয় ভাইরাসের।

এহেন ক্ষুদ্রকায় বৈরীর ভয়ে সন্ত্রস্ত দুনিয়ার সবচেয়ে প্রতাপশালী, হিংস্র ও আক্রমণাত্মক প্রাণী মানুষ। আমেরিকার ভাণ্ডারে আছে পৃথিবীকে একাধিকবার উড়িয়ে দেবার মতো পারমাণবিক বোমা, চিনের আছে অজস্র আগ্রাসী রণতরী ও যুদ্ধবিমান, এমনকি এই মহামারির মধ্যেও লাদাখ সীমান্তে উড়ছে ভারত ও চিনের যুদ্ধবিমান। হাতিতে চড়ে যুদ্ধের দিন শেষ, কারণ বৃহৎকে আর ভয় পায় না মানুষ। নিজেই সর্ববৃহৎ হয়ে ওঠা মানুষ তবু এখনও ভয় পায় ক্ষুদ্রকে। সেই কথাটা আবার মনে করাল করোনা। সন্ত্রস্ত মানুষ লুকিয়ে পড়েছে নিজস্ব কোটরে। বাণিজ্য বা ভ্রমণ শিকেয় তুলে গৃহবন্দি করেছে নিজেদের। এর নাম “লকডাউন”। অপর মানুষের সংস্রব এড়িয়ে দূরে দূরে একা একা থাকলে আক্রমণ করতে পারবে না করোনা। তা বলে কতদিনই বা এমন লকডাউনের ঘেরাটোপে আত্মরক্ষা করা সম্ভব? এভাবে কি দীর্ঘদিন রক্ষা পেতে পারে মানুষ, বিশেষত দরিদ্র বা সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ? খাবে কী? অগত্যা একসময় পথে বেরোতেই হয়। শুরু হয় “আনলক” প্রক্রিয়া। পৃথিবীর অন্য বহু দেশের মতোই আমাদের দেশও দরজায় তালা দিয়েছিল, যার প্রয়োজনও ছিল। এখন অন্য সকলের মতো তালা খুলে বেরোচ্ছে একটু একটু করে। আপাতদৃষ্টিতে ভারতের আপাত-কঠোর লকডাউনকে ব্যর্থ মনে হতে পারে। মার্চে যখন দেশজুড়ে লকডাউন শুরু হয়, তখন দেশে দৈনিক সংক্রমণ ছিল পঞ্চাশ থেকে একশোজনের মধ্যে। এখন এই মধ্য জুলাইয়ের বৃষ্টিদিনে একদিনে প্রায় ঊনচল্লিশ হাজার মানুষ নতুন করে করোনা সংক্রামিত হচ্ছেন সরকারি হিসেবে। আরও ব্যাপক হারে পরীক্ষা করতে পারলে সংখ্যাটা আরও বেশি হত, কারণ তাহলে বাস্তব সংক্রমণ সংখ্যার আরও কাছাকাছি পৌঁছানো যেত। পশ্চিমবঙ্গেও আজ, ১৮ই জুলাই, দুই হাজারের বেশি মানুষ করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়েছেন একদিনে।

লকডাউনের এই আংশিক ব্যর্থতার জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনার গলদ অনেকাংশে দায়ী, পাশাপাশি দায়ী বহুসংখ্যক সাধারণ মানুষের অসচেতনতা, এমনকি অনেক শিক্ষিত মানুষের অসহযোগিতা এবং দেশ-বিদেশের বিদ্বান গবেষক সংখ্যাতত্ত্ববিদদের তৈরি কিছু মডেলের (যার ভিত্তিতে লকডাউনের সময়কাল নির্ধারিত হয়েছিল) গুরুতর ভ্রান্তিও। তবু লকডাউনের ব্যর্থতাকে “আংশিক” বলছি, কারণ ওটুকুও না করলে মহামারি এদেশে অনেক আগেই অনেক বড় আকার নিত এবং আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ত। সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী রেখাটিকে কিছুদিনের জন্য ঈষৎ চিৎ করে রাখতে পারার (flattening the curve) দ্বারা আমরা নিজেদের জন্য কিছুটা সময় কিনতে পেরেছি, যার মধ্যে আমরা প্রস্তুত হবার সুযোগ পেয়েছি। এই সময়টাকে আমরা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি, সেটা চিন্তার কথা। এখনই হাসপাতালগুলোতে শয্যা-সঙ্কট শুরু হয়েছে।  ঊর্ধ্বগামী রেখাটি তীব্র গতিতে আকাশ ছুঁলে অদূর ভবিষ্যতে বহু মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সুযোগটুকুও পাবেন না। এই রোগের মোকাবিলায় ব্যবহারযোগ্য ওষুধপত্র বা চিকিৎসাপদ্ধতি সম্বন্ধে আমরা যেটুকু শিখেছি, তার অনেকটাই প্রয়োগ করা সম্ভব হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরে। হাসপাতালে ঠাঁই না হলে বা অতি সঙ্কটজনক অবস্থায় থাকা রোগীর জন্য ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিটের শয্যা বা ভেন্টিলেটর না জুটলে কোভিড-১৯ রোগের উন্নত চিকিৎসা সম্বন্ধে প্রকাশিত গবেষণাপত্রগুলো লাইব্রেরির জার্নালের তাক বা চিকিৎসকের মগজকে যতই আলোকিত করুক, রোগী ও তাঁদের পরিজনদের মুখের অন্ধকার তারা দূর করতে পারবে না। ফলে মৃত্যুর হার যতটুকু কমিয়ে আনা গেছে, তা আবার বেড়ে যাবে।

কিছু মানুষ এখনও বীরদর্পে নাক-মুখ না ঢেকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বটে, কিন্তু আতঙ্ক ক্রমশ সাধারণ মানুষের গরিষ্ঠ অংশকে গ্রাস করছে। সভ্য শিক্ষিত মানুষেরা বহুকাল যাবৎ মুখোশধারী ছিলেনই, কিন্তু সেই মুখোশের মধ্যে ছিল অনন্ত বৈচিত্র। এখন সকলের মুখোশ প্রায় একরকম হয়ে গেছে। সাদা, নীল বা সবুজ কাপড়ে নাক-মুখ ঢাকা থাকায় বহুদিনের পরিচিত মানুষের চিরপরিচিত মুখোশগুলোকে চেনা যাচ্ছে না। বিয়াল্লিশ শতাংশ অ্যালকোহলে জল মিশিয়ে খেতে অভ্যস্ত মানুষ সত্তর শতাংশ অ্যালকোহল মুহূর্মুহু দুহাতে মাখছেন নির্জলা। তবু করোনাকে রোখা যাচ্ছে না। মনসার ভয়ে বিশ্বকর্মা লখিন্দরের লৌহবাসরে রেখে দিচ্ছেন অদৃশ্য কোনও ছিদ্র আর চাঁদ সদাগরের হেঁতাল লাঠিকে ফাঁকি দিয়ে কোন ফাঁকে বেহুলাকে বিধবা করে যাচ্ছে কালনাগিনী!

এভাবে এঁটে ওঠা যাচ্ছে না, তা পরিষ্কার। এখন ভরসা একটাই, পরিস্থিতি নাগালের বাইরে যাওয়ার আগেই যদি হাতে পাওয়া যায় কোনও প্রতিষেধক। প্রতিষেধক টীকা আবিষ্কারের লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে শতাধিক সংস্থা, দিন-রাত এক করে বিরামহীন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অগণিত বিজ্ঞানী। এমন প্রতিযোগিতার একটি শুভঙ্কর দিক আছে। এর ফলে দুঃসাধ্য কাজে কম সময়ে সাফল্য আসতে পারে, এই অতিমারির মুহূর্তে যা জরুরি। তবে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ বড় সংস্থাগুলোর বেশিরভাগই বাণিজ্যিক। ফলে আবিষ্কারের দৌড়ে প্রথম হওয়ার লক্ষ্য শুধুমাত্র মানবসেবা বা মঞ্চে দাঁড়িয়ে কান ফাটানো হাততালির আবহে সোনার মেডেলটি গলায় ঝোলানোর উদ্দেশ্যে নয়, বাজার দখল অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। যে সংস্থা প্রথম প্রতিষেধক টীকা বাজারজাত করতে পারবে, তার পণ্যটি হাতে পাবার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বেন কোটি কোটি ক্রেতা, দামের তোয়াক্কা না করেই। কোভিড-১৯ সেই অর্থে কয়েক হাজার কোটি ডলার ঘরে তোলার এক সুবর্ণ সুযোগও বটে। দিন তিনেক আগেই এই বিষয়টি একেবারে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রা-জেনেকা কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে তৈরি ভ্যাক্সিনটি ব্রাজিলে মানবদেহে প্রয়োগের পর ভালো ফল দেখা যাচ্ছে এবং এই বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র আগামী সপ্তাহে “দ্য ল্যান্সেট” নামক বিখ্যাত ডাক্তারি জার্নালে প্রকাশিত হবে, এমন একটা খবর ছড়িয়ে পড়ামাত্র অ্যাস্ট্রা-জেনেকার শেয়ারের দাম তরতরিয়ে বাড়তে শুরু করল। অদূর ভবিষ্যতে অধিক মুনাফার আশায় যাঁরা শেয়ার কিনলেন, তাঁদের মধ্যে বহু দেশের অনেক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষ আছেন। এঁদের অনেকেই চায়ের আসরে প্রকৃত বামপন্থী আন্তরিকতার সঙ্গে ওষুধ ও চিকিৎসা পরিষেবার মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করবেন এবং চিকিৎসক নামক অপদেবতার বাপান্ত করবেন। তবে সে এক ভিন্ন প্রসঙ্গ। আপাতত সেসব অবান্তর কথা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।

সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে বেশি করে যে টীকা জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছিল, তা হল গুটিবসন্তের টীকা। গুটিবসন্ত ইতিহাসে এতবার এমন ভয়ঙ্কর অতিমারি ঘটিয়েছে, যার তুলনায় করোনাকে নিরীহ মনে হবে। কৃষি আবিষ্কারেরও আগে থেকে গুটিবসন্ত মানুষ মারতে শুরু করে। এই রোগ প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে গুটিবসন্ত রোগীর মামড়ি বা চামড়ার টুকরো শিশুদের দেহে ঢুকিয়ে দেবার রীতি ছিল। এতে কিছু সুফল পাওয়া যেত, কিন্তু এটা করতে গিয়েই শিশুদের রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। প্রথম ভ্যাক্সিনের প্রবর্তক ব্রিটিশ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনারের জীবৎকালে গুটিবসন্ত (small pox বা variola) প্রায় ১০ শতাংশ মানুষের মৃত্যুর কারণ ছিল। কিছু ঘনবসতিপূর্ণ শহরে মৃত্যুর হার ছিল ২০ শতাংশের কাছাকাছি। জেনার সাহেব এবং অন্য কিছু চিকিৎসক খেয়াল করেন যে cowpox নামক রোগটি (যা গুটিবসন্তের মতো কিন্তু অনেক কম ক্ষতিকর) যাদের হয়, তাদের গুটিবসন্ত কম হয়। এই কারণে গোয়ালাদের মধ্যে গুটিবসন্তের হার ছিল কম। এই তত্ত্বের ভিত্তিতে জেনার ১৭৯৬ সালে কাউপক্সের গুটি থেকে প্রাপ্ত পুঁজ ব্যবহার করে কিছু মানুষকে টীকা দেন এবং তাতে সাফল্য আসে। টীকা বা ভ্যাক্সিনের সেই শুরু। কাউপক্সের ভাইরাসটির নাম “vaccinia”, আর “ভ্যাক্সিন” শব্দটি এসেছে এই ভ্যাক্সিনিয়া থেকে। তখন থেকে খুলে গেছে প্রতিষেধকের এক নতুন দিগন্ত। সেই জেনার সাহেবের নামাঙ্কিত গবেষণাগারেই করোনাভাইরাসের (SARS-CoV-2) প্রতিষেধক নিয়ে গবেষণা করে সাফল্যের মুখ দেখছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। সেখানে মহিলাদের জয়জয়কার। এই বিজ্ঞানীদলের অন্যতম নেত্রী ভ্যাক্সিনোলজির অধ্যাপিকা সারা গিলবার্ট। ব্রিটিশ সরকারের ভ্যাক্সিন টাস্ক ফোর্সের চেয়ারপার্সন হলেন কেট বিংহ্যাম। এই বিজ্ঞানী দলটির মধ্যে কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স ম্যানেজার হিসেবে কর্মরতা কলকাতার মেয়ে চৌত্রিশ বছরের চন্দ্রাবলী দত্ত। সারা পৃথিবী এঁদের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু এঁদের সাফল্যটির বিষয়ে আলোচনা করার আগে ভাইরাসের বিরুদ্ধে ভ্যাক্সিন তৈরি করার ব্যাপারে কয়েকটা কথা মাথায় রাখা দরকার।

হাত বাড়ালেই আকাশ থেকে ভ্যাক্সিন পেড়ে আনা যায় না। মানবসমাজে গুটিবসন্তের আদি নিদর্শন থেকে ধরে জেনারের হাতে এর প্রথম টীকা তৈরি হতে সময় লেগেছিল আনুমানিক বারো হাজার বছর। তাও সেটা আধুনিক অর্থে ভ্যাক্সিন ছিল না, ছিল ভ্যাক্সিনের আদি রূপ। তা বলে যেকোনও সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করতে এখন আর হাজার বারো বছর অপেক্ষা করতে হয় না, কিন্তু তিন থেকে পাঁচ বছর লেগে যায় সাধারণত। সর্বক্ষেত্রে তাতেও হয় না। হিউম্যান ইমিউনো ডেফিশিয়েন্সি ভাইরাসের (HIV) বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিষেধক পাওয়া গেল না এখনও। সুতরাং এই অতিমারির চাপে SARS-CoV-2-র বিরুদ্ধে প্রতিষেধক তৈরি করতে হচ্ছে খুবই তাড়াহুড়ো করে। তার জন্য নানারকম বিধিনিষেধে বেশ খানিকটা ঢিল দিতে হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়কাল ছোট করে ফেলার ফলে এই ভ্যাক্সিনগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকরিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে সব তথ্য না জেনেই চিকিৎসাক্ষেত্রে এদের প্রয়োগ শুরু করতে হবে। এর ঝুঁকি একেবারে কম নয়। অতীতে কিছু ভ্যাক্সিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মারাত্মক স্নায়ুরোগ ইত্যাদি দেখা গেছে। দুনিয়াজুড়ে চারশো কোটি মানুষকে করোনার টীকা দেওয়ার পর যদি হঠাৎ দশ কোটি লোকের খিঁচুনি শুরু হয় বা হাত-পা অসাড় হয়ে যায়, তাহলে বিরাট বিপদ হবে। সুতরাং তাড়াতাড়ি করলেও তাড়াহুড়ো করার একটা সীমা আছে। ন্যূনতম নিরীক্ষণটুকু বাদ দেওয়া চলে না।

আমাদের কৈশোরেও ভাইরাসঘটিত রোগের বিরুদ্ধে টীকা ছিল প্রধানত দুইরকমের।

১) Live attenuated vaccine অর্থাৎ যেখানে ভাইরাসটি জীবিত, শরীরে প্রবেশের পর সংখ্যাবৃদ্ধি করতে সক্ষম কিন্তু তার রোগ সৃষ্টি করার ক্ষমতাটি নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। যেমন ওরাল পোলিও ভ্যক্সিন। সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারার ফলে মানবদেহে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতে এরা পারদর্শী এবং পোলিওর মতো রোগ নির্মূল করার ক্ষেত্রে এরা বিশেষভাবে উপযোগী কারণ পোলিও ড্রপ খাওয়া শিশুর মলের সাহায্যে ছড়িয়ে পড়ে এই ভ্যাক্সিনের ভাইরাসটি ক্ষতিকর প্রাকৃতিক (wild) পোলিও ভাইরাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। পালস পোলিও কর্মসূচির ভিত্তি ছিল এটাই। দৈবাৎ এই জাতীয় ভ্যাক্সিন থেকে কারও কারও দেহে রোগ সৃষ্টি হতে পারে, বিশেষত যদি প্রাপকের প্রতিরোধ ক্ষমতা কোনও রোগের কারণে কম থাকে। সেরকম রোগীকে এই জাতীয় ভ্যাক্সিন দেওয়া বারণ।

২) Inactivated vaccine অর্থাৎ যে ভ্যাক্সিন তৈরির সময় ভাইরাসটিকে মেরে ফেলা হয়। শরীরে প্রবেশ করার পর সে আর সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারবে না। যেটুকু ভাইরাসের মৃতদেহ শরীরে ঢুকল, তাকেই চিনে নিয়ে শরীর যতটা পারে অ্যান্টিবডি ইত্যাদি তৈরি করবে। ইঞ্জেকটেবল পোলিও ভ্যাক্সিন ছিল এই গোত্রের।

ক্রমশ মাইক্রোবায়োলজি এবং জেনেটিক টেকনোলজির উন্নতির ফলে নতুন নতুন জটিলতর পদ্ধতিতে উন্নততর ভ্যাক্সিন তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইতে এজাতীয় বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি জীবাণুর বিরুদ্ধে ভ্যাক্সিনের যে বিপুল রকমফের তৈরি হচ্ছে নানাদেশে, ঐতিহাসিকভাবে তা অতুলনীয়। মেডিকেল কলেজে আমাদের এক অর্থোপেডিক্সের মাস্টারমশাই বলতেন, “When there are hundred different answers to one question, suspect that all are bogus.” কথাটা বহুক্ষেত্রে ঠিক হলেও এক্ষেত্রে তেমন নেতিবাচক মনোভাব নিচ্ছি না, বরং ইতিবাচক মন নিয়েই এই ভ্যাক্সিন বৈচিত্র্যকে দেখছি।

ভ্যাক্সিন তৈরি করতে চাইলে প্রথমে ঠিক করতে হয় ভ্যাক্সিন তৈরির পদ্ধতিটি। ভাইরাসের দেহের কোন অংশ মানবদেহকোষে প্রবেশের ক্ষেত্রে কাজ করে, কোন অংশ নির্দিষ্ট কিছু ক্ষতির জন্য দায়ী, কোন কোন প্রোটিন “অ্যান্টিজেনিক” অর্থাৎ অ্যান্টিবডির জন্ম দিতে সক্ষম, কোন প্রোটিনটির বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে লাভ আছে (অর্থাৎ ভাইরাসের কোন অংশটি এমন যে বাইরে থেকে সহজে তার নাগাল পাওয়া যাবে এবং তাকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারলে ভাইরাসটি মানবদেহে প্রবেশের বা নিদেনপক্ষে রোগ সৃষ্টি করার ক্ষমতা হারাবে)… এরকম কিছু প্রশ্নের উত্তর চট করে জেনে ফেলতে হয়। তারপর নিজের তত্ত্ব অনুযায়ী একটি পছন্দের চাঁদমারি (target) বেছে নিতে হয়। এরপর ভেবে ফেলতে হয় সেই টার্গেটকে বিদ্ধ করার জন্য কী করতে হবে, কী ধরনের ভ্যাক্সিন মানবদেহে দিলে উপযুক্ত প্রতিরোধ তৈরি হতে পারে, তার জন্য কোন অবস্থায় এবং কীভাবে ভাইরাস বা ভাইরাসের কোনও অংশ মানব শরীরে দিতে হবে এবং সেই জিনিসটি তৈরি করার পদ্ধতি কী? এসব করার জন্য আজকাল কম্পিউটার মডেলিং-এর সাহায্য পাওয়া যায়, সুতরাং মনে হতেই পারে ব্যাপারটা ফেসবুকে পোস্ট করার মতোই সহজ, কিন্তু বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি পড়া থাকলে আর রাতের পর রাত জেগে থাকার ক্ষমতা থাকলে একটু বাড়তি সুবিধা হয়। এরপর কয়েকদিন (কয়েক মাসও হতে পারে) টানা ল্যাবরেটরিতে গলদঘর্ম হয়ে পরিকল্পনামাফিক বস্তুটি বানিয়ে ফেলতে হয়। এরপর শুরু হয় পরীক্ষার পালা। এতক্ষণ ছিল কল্পনা, পরিকল্পনা ও নির্মাণ… যা কঠিন হলেও ব্যক্তিবর্গের ইচ্ছাধীন। এবার প্রকৃতির কষ্টিপাথরে ঘর্ষণের পালা, রীতিমতো সংঘর্ষ। হতাশ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। “শূন্য হাতে ফিরি যদি, নাহি লজ্জা নাহি ভয়” (কার কবিতার লাইন বা এরকম কবিতা আদৌ ছিল কিনা জানি না, সম্ভবত এইমাত্র আমারই মাথায় এটার জন্ম হয়ে থাকতে পারে) গোছের মানসিকতা নিয়ে প্রথম থেকে এতটা খাটতে হবে। রবীন্দ্রনাথের কর্ণের মতো অতটা পেসিমিস্টিক হলে বিপদ, কিন্তু লাইক না পেলে আত্মহত্যা করার ইচ্ছা জাগলে আরও বিপদ।

পরীক্ষার প্রথম ধাপে ল্যাবরেটরিতে কিছু পরীক্ষা থাকতে পারে, যাকে “in vitro test” বলে, যা ওষুধের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। টীকার ক্ষেত্রে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হল মনুষ্যেতর প্রাণীর দেহে (animal model) পরীক্ষা। যে প্রাণীকে সেই ভাইরাস আক্রমণ করতে সমর্থ এবং প্রাণীটির সঙ্গে মানুষের ভালোরকম মিল বা কিছু আত্মীয়তা আছে, এমন প্রাণীকে বেছে নেওয়া সঙ্গত। প্রাণীদেহে ভ্যাক্সিনটি দিয়ে দেখতে হয় প্রাণীটির কোনও ক্ষতি হচ্ছে কিনা এবং তার শরীরে ভালো মাত্রায় অ্যন্টিবডি বা অন্যতর প্রতিরোধক্ষমতার জন্ম হচ্ছে কিনা। এরপর ভ্যাক্সিনপ্রাপ্ত প্রাণীদের প্রচুর পরিমাণে ভাইরাসের মুখে ফেলে দেখতে হয় তাদের রোগ হচ্ছে কিনা। প্রাণী-পরীক্ষায় সফল হলে শুরু করা যায় মানব শরীরে পরীক্ষা। প্রতিটি ধাপে অনুমতি নিতে হয়, নির্দিষ্ট সংস্থায় নথিভুক্ত হতে হয় এবং পেরোতে হয় নানা আমলাতান্ত্রিক বেড়া। মানব শরীরে পরীক্ষারও তিনটি ধাপ থাকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি পাওয়ার আগে। প্রথমে অল্প কিছু সুস্থ স্বেচ্ছাসেবী মানুষের দেহে প্রয়োগ করে দেখতে হয় কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে এবং তা কতটা গুরুতর। এর ফলাফলের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা আদৌ করা যাবে কিনা। গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না থাকলে দ্বিতীয় ধাপে কিছু সংখ্যক মানুষের শরীরে প্রয়োগ করে দেখা হয় টীকাটি কেমন প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি ইত্যাদির জন্ম দিচ্ছে। ফল আশাপ্রদ হলে তৃতীয় পর্যায়ে বেশি সংখ্যক (পারতপক্ষে কয়েক হাজার) মানুষের শরীরে ভ্যাক্সিন প্রয়োগ করে দেখা হয় বাস্তবে তা রোগ প্রতিরোধে কতটা সক্ষম এবং কী কী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে। কোন ডোজে ভ্যাক্সিনটি সবচেয়ে কার্যকর, কোন ডোজ শরীরের পক্ষে সহনীয় বা কতটা দিলে সমস্যা হতে পারে, কতদিন অন্তর কতবার ভ্যাক্সিনটি দিলে ভালো কাজ হচ্ছে… সেই সবকিছুই এর মধ্যে দেখে নিতে হয়। এতকিছু ঠিকমতো হলে তবে বাজারে বিক্রি করার অনুমতি মেলে। স্বভাবতই এসব গবেষণায় সময় লাগে, বিশেষত দ্বিতীয় আর তৃতীয় ধাপে। দীর্ঘকালীন উপকারিতা আর দীর্ঘ সময় পরে ফুটে ওঠা প্রতিক্রিয়া বুঝতে গেলে সময় আরও বেশি লাগবে। বাজারে বিক্রি করার অনুমতি পাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছলেও বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রশাসনিক ছাড়পত্র প্রয়োজন। ততদিনের মধ্যে তৈরি রাখতে হবে ব্যাপক সংখ্যায় ভ্যাক্সিন তৈরি করার প্রযুক্তি। নিশ্চিত করতে হবে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জোগানও।

এই মুহূর্তে বিভিন্ন দেশে ১৫৫টির বেশি ভ্যাক্সিন তৈরি হচ্ছে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে। ইতিবাচক মনোভাব সত্ত্বেও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে নির্দিষ্ট দিনক্ষণ দেখে ভ্যাক্সিন তৈরি করার চেষ্টা অবৈজ্ঞানিক। জবরদস্তি করে একমাসের মধ্যে সব পরীক্ষা শেষ করে নির্দিষ্ট উৎসবের দিনে দেশের মানুষের ওপর ভ্যাক্সিন ভরা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ হাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলে প্রজাসাধারণ রাজার এই তুঘলকি সদিচ্ছাকে সন্দেহের চোখে দেখবে, কারণ উদ্দেশ্য মহান হলেও এতে ভ্রান্তি ও বিপর্যয়ের সম্ভাবনা প্রবল। শুধু যে আত্মনির্ভর ভারতের ভ্যাক্সিন শিল্প নিয়ে এহেন মাতামাতি, তাই নয়, বলশেভিক স্মৃতিকাতরতাও আছে। টেলিভিশনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ খবরের চ্যানেলে দেখলাম ভ্যাক্সিনে “রুশ বিপ্লব”-এর ধুয়ো তুলে সব পেয়েছির আসর বসেছে। মাত্র আঠারো জন স্বেচ্ছাসেবীর শরীরে ভ্যাক্সিন পরীক্ষা করে একমাসের মধ্যেই নাকি রাশিয়া অব্যর্থ ভ্যাক্সিন তৈরি করে ফেলেছে। মস্কো অনেক দূর, ভোল্গার জলে স্নান করা হয়নি কখনও, তবু কলকাতায় বসেই যে-কেউ বলে দিতে পারেন যে এমনটা হওয়া অসম্ভব, কারণ এভাবে কাজটা হয় না। আঠারোজনের শরীরে একমাসে যেটা করা  হয়েছে, সেটা প্রথম পর্যায়ের পরীক্ষা মাত্র, ঠিক যতটুকু করা সম্ভব স্বাধীনতা দিবসের আগে ভারতবর্ষে।

এখন পর্যন্ত যতগুলো ভ্যাক্সিন মানবদেহে পরীক্ষার তৃতীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছে, তাদের মধ্যে অক্সফোর্ডের ভ্যাক্সিনটির অবস্থান সবচেয়ে ভালো। একটু অদ্ভুত পদ্ধতিতে ভ্যাক্সিনটি তৈরি। “স্পাইক প্রোটিন” নামে SARS-CoV-2 ভাইরাসের একটি নির্দিষ্ট গঠনগত প্রোটিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী অ্যান্টিবডির জন্ম দেওয়া এর উদ্দেশ্য। বিজ্ঞানীরা সমগ্র করোনাভাইরাসকে ভ্যাক্সিনে রাখেননি, তার দেহ থেকে শুধু স্পাইক প্রোটিনের সঙ্কেতবাহী আরএনএ অংশটুকুকে আলাদা করে নিয়েছেন। সেই জিনের টুকরোটিকে ঢুকিয়ে দিয়ে এক বিশেষ ধরনের তুলনামূলকভাবে নিরীহ মামুলি সর্দিকাশি ঘটানো অ্যাডেনোভাইরাসের শরীরে। সে “ভেক্টর”-এর কাজ করবে। সে প্রাপকের শরীরে ঢুকে সংখ্যাবৃদ্ধি করবে, হয়ত মামুলি সর্দি হবে ভ্যাক্সিন প্রাপকের, কিন্তু সেই সুযোগে তৈরি হবে প্রচুর পরিমাণে করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন আর মানুষের তূণীর ভরে উঠবে সেই প্রোটিনের বিরুদ্ধে নির্মিত তীরে। অ্যাডেনোভাইরাস এক অন্য গোত্রের ভাইরাস এবং সব অ্যাডেনোভাইরাস একইরকম নিরীহ নয়, তাই বিশেষ প্রজাতির নিরীহ অ্যাডেনোভাইরাসকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। এভাবেই তৈরি হয়েছে অক্সফোর্ডের ChAdOx1 nCoV-19 নামক ভ্যাক্সিনটি। না দোকানে গিয়ে এমন ভয়ঙ্কর নাম বলে ইঞ্জেকশন চাইতে হবে না, এটা সাঙ্কেতিক নাম, যেমনটা গবেষণার জন্য নথিভুক্ত করতে হয়। বাচ্চা ঠিকমতো জন্মালে মুখেভাতের সময় একটা ভালো-নাম দেওয়া হবে।

ইংল্যান্ডে সংক্রমণের সংখ্যা কমে আসায় ব্রাজিলে এর তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা চলছে। প্রথম পর্যায়ে এটি নিরাপদ প্রতিপন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় দফার দেখা গেছে দুরকম প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্ম দিচ্ছে ভ্যাক্সিনটি। অ্যান্টিবডি তো ভালোই তৈরি হয়েছে, কিন্তু চিন্তার কথা হল বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে এমনকি যাদের কোভিড-১৯ ইনফেকশন হয়েছে এবং সেরে ওঠার সময় যথেষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, তাদের দেহেও সেই অ্যান্টিবডি তিন-চার মাসের বেশি কার্যকর থাকছে না। সুতরাং অ্যান্টিবডির জন্ম দিতে পারা মানেই দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার নিশ্চয়তা নয়। সুখের কথা হল এই যে দেখা অক্সফোর্ডের ভ্যাক্সিনটি প্রয়োগ করলে অ্যান্টিবডি ছাড়াও একধরনের ভাইরাসহন্তা শ্বেত কণিকার (Killer T lymohocytes) জন্ম হচ্ছে, যা তুলনায় বেশিদিন কার্যকর থাকে।

তৃতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত খবর প্রকাশের সময় এখনও হয়নি। তবে খুব ভালো ফল দেখা গেলে মাঝপথে একপ্রস্থ খবর দেওয়ার চল আছে। ভ্যক্সিনটি কার্যকর ও নিরাপদ বিবেচিত হলে এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের ছাড়পত্র পেলে তার উৎপাদন ও, বিপণনের দায়িত্বে থাকবে ব্রিটেনেরই ফার্মাসিউটিকাল সংস্থা অ্যাস্ট্রা-জেনেকা, আন্তর্জাতিক ওষুধ ব্যবস্যায় যে অন্যতম দৈত্য। সেই সংস্থা জানাচ্ছে যে সম্ভবত সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে তারা ভ্যাক্সিনটি বাজারে আনতে পারবে এবং ২০২০ সাল শেষ হবার আগেই দুশো কোটি ভ্যাক্সিনের শিশি বাজার তাক করে ছুঁড়ে মেরে করোনাকে মোক্ষম গদাঘাত করবে।

মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি ফাইজার এবং জার্মান সংস্থা বায়োফার্মাসিউটিকাল নিউ টেকনোলজিস (বায়োএনটেক) হাত মিলিয়ে তাদের চারটি পরীক্ষামূলক মেসেঞ্জার আরএনএ (যে ধরনের আর-এন-এ কোষের মধ্যে নিউক্লিয়াস থেকে রাইবোজোমের কাছে প্রোটিন সংশ্লেষ সংক্রান্ত খবর নিয়ে যায় পারাবত পিওনের মতো) ভিত্তিক ভ্যাক্সিনের মধ্যে দুটিকে এই নব-করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রস্তুত করছে। নির্দিষ্ট টার্গেট প্রোটিন অ্যান্টিজেনের সঙ্গে মেসেঞ্জার আরএনএ (mRNA) যুক্ত করে ভ্যাক্সিনগুলো তৈরি। BNT162b1 নামক ভ্যাক্সিনটিতে থাকছে নির্দিষ্টভাবে SARS-CoV-2-এর নোঙরের ডগাটুকু, যা গেঁথে যাওয়ার কাজে লাগে (optimised receptor binding domain antigen) আর BNT162b2-তে থাকছে গোটা নোঙরটাই (full-length spike protein antigen)। দুটো ভ্যাক্সিনই অতি সূক্ষ্ম স্নেহপদার্থনির্মিত কুঠুরিতে (lipid nanoparticles) প্রস্তুত এক বিশেষ ধরনের “nucleoside modified” আরএনএ। ভ্যাক্সিনগুলোর প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্রুত শেষ করার জন্য মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন “ফাস্ট ট্র্যাক” পদ্ধতি অনুমোদন করেছেন। সবকিছু কতদিনে শেষ হবে, সেই বিষয়ে ফাইজার বিশেষ কিছু বলছে না, অক্সফোর্ডের মতো বিরাট হৈচৈ তৈরি হচ্ছে না, তবে ভেতরের খবর যেটুকু শোনা যাচ্ছে, তাতে অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বরের মধ্যে ভ্যাক্সিনটি বাজারে আসতে পারে (আবার নাও আসতে পারে)। প্রয়োগযোগ্য হয়ে উঠলেও মাননীয় শ্রী ডোনাল্ড ট্রাম্প মহাশয় ভ্যাক্সিনটিকে গোটা পৃথিবীতে উড়ে বেড়াতে দেবেন, নাকি “সবটাই আমাদের লাগবে” বলে খাঁচাবন্দি করবেন, তা সময়ই বলবে।

চিনে সনাতন পদ্ধতিতে নিহত ভাইরাসের মৃতদেহ ব্যবহার করে ভ্যাক্সিন তৈরি হচ্ছিল। উপরন্ত সম্প্রতি সাংহাই ফসুন ফার্মাসিউটিক্যাল গ্রুপ বায়োএনটেক-এর প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ভ্যাক্সিনের (BNT162b1) প্রথম পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করার পরিকল্পনা করছে। তবে চিন সম্বন্ধে বেশি আলোচনা করব না, ওরা বড় মারামারি করে। ওদের ভ্যাক্সিন আমাদের দেবে না। যাহোক, ভারতীয় উদ্যোগ সম্বন্ধে দু কথা বলি শেষ করার আগে।

ভারতেও বেশ কিছু সংস্থা নব-করোনার ভ্যাক্সিন তৈরি করছে। তার মধ্যে ভারত বায়োটেক এবং জাইডাস-ক্যাডিলার ভ্যাক্সিন দুটি মানব শরীরে পরীক্ষার ছাড়পত্র পেয়েছে। ভারত সরকার ও ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ-এর কল্যাণে ব্যাপক মাতামাতি হয়েছে ভারত বায়োটেকের টীকাটি নিয়ে, যা নাকি দেশবাসীর জন্য স্বাধীনতা দিবসের উপহার হবে। বস্তুত দুটি ভ্যাক্সিনেরই প্রাথমিক পর্যায়ের হিউম্যান ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়েছে ১৫ই জুলাই তারিখে। হাতে মাত্র একমাস। তার মধ্যে সকল দেশের সেরা হতে গেলে ছু মন্তরই ভরসা। অত তাড়াহুড়ো করার ডেডলাইন ধার্য করে দিলে সেই অসম্ভব কাজটি করতে না পারার জন্য যে ব্যর্থতার তকমা আমাদের দেশি বিজ্ঞানীদের কপালে সেঁটে যাবে, তা তাঁদের প্রাপ্য নয়। যথাযথ সুযোগ ও সময় পেলে তাঁরা সেরাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে সক্ষম।

ভারত বায়োটেকের ভ্যাক্সিনটির নাম “কোভ্যাক্সিন”। এটি সনাতন “inactive vaccine”, যা মানুষের শরীরে ঢুকে ভাইরাসের সংখ্যাবৃদ্ধি করতে অক্ষম। তৈরি করার প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে সরল। তবে মৃত ভাইরাসের সব অংশ ভ্যাক্সিনে থাকাটাকে কেউ সুবিধাজনক ভাবতে পারেন এই অর্থে যে আসল করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীর যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলত, মৃত ভাইরাসের বিরুদ্ধেও সেভাবেই গড়বে। হয়ত তৈরি হবে বেশ কিছু প্রোটিনের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অ্যান্টিবডি, যার ফলে জোরদার হবে ইম্যুনিটি। অবশ্য এর মধ্যে কিছু অ্যান্টিবডি অপ্রয়োজনীয় হতে পারে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্মও দিতে পারে। পাটনার AIIMS, রোহতাকের PGIMS সহ বারোটি কেন্দ্রে মোট ৩৭৫ জনের ওপর প্রথম পর্যায়ের পরীক্ষা হবে। প্রথম ধাপে ভ্যাক্সিন পাওয়া ব্যক্তিদের বারবার পরীক্ষা করে তাঁদের তথ্য যাচাই করে আগে নিরাপত্তার দিকটি দেখে তবে পরবর্তী পর্যায়ে এগোনো হবে। চোদ্দ দিনের ব্যবধানে দুবার ইঞ্জেকশন দেওয়া হবে। পনেরোই অগাস্টের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায় শেষ হতেই পারে, তবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালস রেজিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া-র (CTRI) তথ্য অনুযায়ী সমগ্র ট্রায়ালটি শেষ হতে আনুমানিক পনেরো মাস লাগার কথা।

জাইডাস-ক্যাডিলা জিন প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে এক বিশেষ ধরনের “প্লাজমিড ডিএনএ” তৈরি করেছে যা ভাইরাসের টার্গেট অ্যান্টিজেনটির (যার বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবডি তৈরি হবে) সঙ্কেত বহন করে। এটাই এই ভ্যাক্সিনের ভিত্তি। এই ভ্যাক্সিনের পরীক্ষা হবে আহমেদাবাদের জাইডাস রিসার্চ সেন্টারে। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে মোট ১০৪৮ জনকে ভ্যাক্সিন দেওয়া হবে পরীক্ষামূলকভাবে। ২৮ দিনের ব্যবধানে মোট তিনটি ডোজ দেওয়া হবে প্রত্যেককে। CTRI-এর তথ্য অনুযায়ী সমগ্র ট্রায়াল শেষ হতে বছরখানেক লাগবে, যদিও সংস্থার অধিকর্তা দাবি করেছেন তিন মাসে তাঁরা প্রথম দুটি পর্যায় শেষ করতে পারবেন।

এছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হচ্ছে বহু করোনা প্রতিষেধক, ব্যবহৃত হচ্ছে বিচিত্র সব প্রযুক্তি। যেমন কানাডায় করোনার ভ্যাকসিন তৈরি হচ্ছে উদ্ভিদের শরীরে। অতীতে অকল্পনীয় এক অতিমারি আর লকডাউন পরিস্থিতি যেমন আমাদের জীবনের বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে ২০২০ সালে, তেমনি কল্পবিজ্ঞানও বাস্তব হয়ে উঠেছে মানুষের মেধা আর পরিশ্রমের উপর ভর করে। প্রতিটি ভ্যাক্সিন সম্বন্ধে আলাদা করে লিখতে গেলে বই হয়ে যাবে। আপাতত দু-একটা সতর্কবাণী উচ্চারণ করে থেমে যাওয়াই ভালো।

এবছরের মধ্যেই নব-করোনার ভ্যাক্সিন এসে যাবে বলে মনে হচ্ছে। আশা ও আনন্দের কথা। ভ্যাক্সিন বাজারে এলেও আমার আপনার তা পেতে একটু সময় লাগবে, তবু কখনও তো পাওয়া যাবে। এত সংখ্যক প্রতিযোগী থাকার ভালো দিক হল কেউ নিজের ভ্যাক্সিনের দাম আকাশছোঁয়া করবে না, যদিও একেবারে সস্তা হবার সম্ভাবনা কম। তবে কয়েকটা কথা মাথায় রাখতে হবে। ভ্যাক্সিন আসার আগেই যাঁরা নিয়মের তোয়াক্কা করছেন না আর যাঁরা মাসের পর মাস নিয়ম পালন করে ক্লান্ত, তাঁরা অনেকেই হয়ত ভ্যাক্সিন নিয়েই মাস্ক খুলে ফেলে খোলা বাতাসে শ্বাস নিতে চাইবেন। একটু ধৈর্য ধরতে হবে সেক্ষেত্রে। ভ্যাক্সিন নেওয়ামাত্র প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না, কদিন সময় লাগে। উপরন্তু এসব আরএনএ ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি ভ্যাক্সিন সাধারণত একশো ভাগ, এমনকি নব্বই শতাংশ সুরক্ষা দেয় না। সুরক্ষা প্রদানে ৬৫-৭০ শতাংশ সাফল্য পেলেই যথেষ্ট ভালো ফল বলতে হবে। প্রথম দিকে যে ভ্যাক্সিনগুলো আসবে, সেগুলো কি সংক্রমণ ঠেকাতে সক্ষম হবে নাকি শুধুই মারাত্মক অসুস্থতা নিবারণে সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। সেক্ষেত্রে আপনি গুরুতর অসুস্থ না হলেও বাড়িতে জীবাণু বয়ে নিয়ে গিয়ে পরিজনদের হাতে বা মুখে (এবং নাকে-চোখে) তা তুলে দিতে সক্ষম থাকবেন। ভ্যাক্সিন নিয়ে যে প্রতিরোধক্ষমতা আপনি অর্জন করবেন, তা কতদিন বজায় থাকবে, তাও জানা নেই। কালক্রমে অনেক কিছুই জানা যাবে, কিন্তু জলদি নিশ্চিন্দির জো নেই।

সিমোন দ্য বোভোয়া একটা উপন্যাস লিখেছিলেন, “শি কেম টু স্টে” নামে। করোনার কথা বলতে গিয়ে নামটা হঠাৎ মনে পড়ল আরকি!

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2511 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...