বন্যার জলে ডুবে বাঁচতে চায় প্রান্তিক অসম

সুমনা রহমান চৌধুরী

 


লেখক সমাজকর্মী, পেশায় শিক্ষক

 

 

 

 

জলে নিমগ্ন একটি গ্রাম। সেখানকারই কোনও এক বাড়ির ছাগল রাখার ঘরে আগমন এক বিধ্বস্ত বাঘের। না, শিকারের সন্ধানে নয়। আশ্রয়ের খোঁজে। ততক্ষণে অবশ্য ছাগলটির ঘরের অর্ধেকও জলে ডুবে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার সেই ১৫ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে বাঘ এবং ছাগলটি শেষ অবধি নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান পেল কি না, তা আমরা জানি না। তবে অগুনতি মৃত পশুর জলে ভাসা লাশ দেখে, এই দুই পশুর নিয়তি আমরা অনুমান করে নিতে পারি।

বলতে চাইছি অসমের বন্যার কথা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত চব্বিশ বছরে এত ভয়াবহ বন্যা নাকি অসম দেখেনি। অসমের একজন বাসিন্দা হিসেবে জানি বন্যা এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। বিশেষত চর-নিবাসী মানুষদের। তীব্র দাবদাহের পর বর্ষার আগমনে যখন অন্যান্য রাজ্যের মানুষ স্বস্তি পায়, অসমের নদীতীরবর্তী গ্রামগুলো, চরগুলো তখন মানুষের হাহাকার নিয়ে জেগে থাকে। বাড়ি ঘর মানুষ পশু বন্যার জলে তলিয়ে যাওয়ার হাহাকার। মৃত্যুর হাহাকার। তবে এবছরে যেন অতীতের সব ভয়াবহতাকে ছাপিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বন্যার আগমন। জলবন্দি ২৭টি জেলার প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ। এরমধ্যে মারা গেছেন প্রায় ১১০ জন। সর্বস্ব হারিয়ে ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন আরও কয়েক লক্ষ। প্রায় চার হাজার গ্রাম জলের নীচে তলিয়ে গেছে। আশি হাজার হেক্টর কৃষিজমি জলের তলায়। মানুষ শস্য ঘরে তোলার সুযোগটা পর্যন্ত পাননি। লখিমপুর, মরিগাঁও, বরপেটা, ধুপগুড়ি, গোলাঘাট, দারাং, ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া, দক্ষিণ শালমারা, ধেমাজী, বঙ্গাইগাঁও, নলবাড়ির অবস্থা  ভয়াবহ। বরপেটায় জলবন্দি প্রায় সাড়ে ছ লাখ মানুষ। ধুবড়িতে বন্যার জলে আটক প্রায় নয় লক্ষ মানুষ।

একখড়্গ গন্ডারের জন্যে পৃথিবী বিখ্যাত অসমের কাজিরাঙ্গা ন্যাশন্যাল পার্কটির প্রায় পঁচানব্বই শতাংশ পুরোপুরি জলের নীচে। বন্যার জলে তলিয়ে গেছে কয়েকশো বন্যপ্রাণী। ৮২টির মতো বেআইনি শিকারদমন ক্যাম্প জলে ভেসে গেছে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যখন প্রাণীগুলো ছুটছিল তখন কাজিরাঙ্গা সংলগ্ন জাতীয় সড়কে গাড়ি চাপা পড়ে মৃত্যু হয় ১৪টি হরিণের। অনেকগুলো গন্ডারসহ আরও বহু বন্যপ্রাণী এবং গৃহপালিত প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে ইতিমধ্যেই।  বনদফতর থেকে এখনও অব্দি মাত্র ১২০টির মতো বন্যপ্রাণীকে উদ্ধার করা গেছে। বাকি প্রাণীরা হয় বন্যার জলের তোড়ে, নতুবা খাদ্যের অভাবে মরে গেছে বা মরার মুখে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়ঙ্কর যে বাঁচার তাগিদে মানুষ আর বন্যপ্রাণী এক কাতারে দাঁড়িয়ে। অসহায়। বিধ্বস্ত। ভয়ার্ত। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হল এত ভয়াবহতা, মানুষের এত বিপর্যয় দেখেও কেন্দ্র সরকার অসমের বন্যাকে এখনও রাষ্ট্রীয় বিপর্যয় বলে ঘোষণা করেননি। শুধু প্রধানমন্ত্রী ফোনে খবরাখবর নিয়েছেন একবার। ব্যস। সেবকের দায়িত্ব শেষ।

বন্যাক্রান্ত জেলাগুলোতে সরকারি ৩০০টি ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ৫২ হাজার মানুষ। এর মধ্যে শিশুর সংখ্যা সাড়ে পাঁচহাজার। বাকি মানুষেরা এখনও জলবন্দি। ত্রাণের জন্যে হাহাকার করছেন মানুষ। পর্যাপ্ত ত্রাণ মিলছে না। খাবার নেই, পানীয় জল নেই, মাথার উপর ছাদ নেই, পায়ের নীচে একটুকরো শুকনো জমি নেই। এনআরসি, ডিটেনশন ক্যাম্প, করোনা এবং পরবর্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনাবিহীন লকডাউনের ফলে রুজিরোজগার সমস্ত হারিয়ে প্রান্তিক মানুষেরা অসহায় অবস্থায় ছিলেনই, এই ভয়াবহ বন্যা সেই অসহায়ত্বের ষোলোকলা পূর্ণ করল।

অসমে প্রতিবছর বন্যায় লক্ষ লক্ষ চরসংলগ্ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। সর্বস্ব হারান। সরকার সব দেখে। জানে। কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বন্যা এবং নদীভাঙনে এত এত মানুষের বাড়ি ঘর জীবন তলিয়ে যেতে দেখেও, আজ অবধি অসমে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়নি! কেন্দ্রীয় সরকারের “ব্রহ্মপুত্র বোর্ড” নামে একটি বিভাগ আছে যা মূলত ব্রহ্মপুত্রের বন্যা এবং নদীভাঙন নিয়ে গবেষণা করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল। আবার প্রতিবছর বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্যে কয়েকশো কোটি টাকার বাজেটও বরাদ্দ হয়, কিন্তু অবস্থা যে তিমিরে ছিল, সেখানেই আছে। কোনও উত্তরণ নেই।

বন্যার সঙ্গে অসমের প্রান্তিক মানুষদের বঞ্চনার সুত্রটিও বাঁধা। নদীভাঙন এবং বন্যার ফলে যেহেতু প্রতিবছরই বহু চর, চর সংলগ্ন গ্রাম-বাড়ি-ঘরদোর নিয়ে নদীগর্ভে তলিয়ে যায় এবং ডুবে যাওয়া চর ছেড়ে বেঁচে থাকার আশায় অন্য চরে পাড়ি জমাতে হয়, তাই চরে বসবাসকারী বহু মানুষেরই জমির কোনও পাট্টা নেই। নদীভাঙন, বন্যায় বাড়ি ঘরদোর তলিয়ে গেলেও তাই এইসব মানুষেরা কোনও ধরনের সরকারি সাহায্য বা পুনর্বাসন লাভ করেন না। আবার এইসব ডুবে যাওয়া চরই যখন আবার ভেসে উঠে কয়েক বছর পর, তখন আগের চরে ফিরে গেলে এই নিরন্ন সহায় সম্বলহীন মানুষগুলোকেই ‘সন্দেহজনক’, ‘বিদেশি’, ‘বাংলাদেশি’ ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ এসব আখ্যায় আখ্যায়িত করা হয়। ফলত বাড়ি ঘর জমি হারিয়ে ‘বিদেশি’ তকমা মাথায় নিয়ে, পুলিশ, ডিটেনশন ক্যাম্পের ভয়ে এই মানুষেরা দিন গুজরান করেন। অসমে সদ্যসমাপ্ত এনআরসিতে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে অসমবাসীদের উপর রাষ্ট্রকর্তৃক নথিপত্র হাজির করে নিজেকে বৈধ নাগরিক প্রমাণ করার যে হুকুম জারি হয়েছিল, সেটা যে অযৌক্তিক এবং আদ্যন্ত ভুল, এই বন্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ জর্জরিত অসমকে দেখে তা কি অনুমান করা যাচ্ছে না? প্রতিবছরের বন্যায় যখন বাড়ি গ্রাম মানুষ জলে তলিয়ে যাচ্ছে, সেখানে নথিগুলো সুরক্ষিত থাকার যৌক্তিকতা আছে কি? অথচ রাষ্ট্র এবং তার তাবেদাররা এই বিষয়গুলো ভাবতে নারাজ। নথির প্রামাণ্যের উপরই নাগরিকত্ব প্রমাণের একতরফা দায় চাপানো হল এই প্রান্তিক সহায় সম্বলহীন মানুষগুলোর উপর। ফলস্বরূপ কুড়ি লক্ষ খসড়াছুট মানুষ, কয়েক হাজার ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি মানুষ, আর গলায় দড়ি দিয়ে ‘সন্দেহজনক নাগরিক’ জীবন থেকে মুক্তি পেতে চাওয়া সংখ্যাটা একশো-এর উপর।

অসমের অন্যতম প্রধান সমস্যা বন্যা ও নদীভাঙন। সরকারের অনেক আগেই উচিত ছিল এই দুই বিষয়কে জাতীয় সমস্যা হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া। এবং ব্রহ্মপুত্র ও তার উপনদীগুলির বিজ্ঞানসম্মত নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া শুরু করার। চিনের দুঃখ বলে পরিচিত হোয়াংহো নদী শুধুমাত্র সেদেশের সরকারের বিজ্ঞানসম্মত ভাবনা এবং সদিচ্ছার ফলে আজ দেশটির সমৃদ্ধির উৎস হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমাদের সরকার বাহাদুর নাগরিকত্ব আর প্রান্তিক মানুষজনের ‘সহি ভারতীয়ত্ব’-এর পরীক্ষা নেওয়ায় বিষয়ে বেশি উৎসাহী। আরও সহজ করে বললে নাগরিকদের দুঃখের পরীক্ষা নিতে বেশি আগ্রহী। সুতরাং বন্যার জলে ডুবে যতদিন বাঁচা যায় প্রান্তিক অসমবাসী ততদিনই বাঁচবেন। হ্যাঁ, মাঝে মাঝে ‘হাইল মোদি’ অথবা ‘সবার আনন্দ সর্বানন্দ’ জয়ধ্বনি দিয়ে যাবেন বৈকি! দস্তুর অনুযায়ী।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2511 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...