তিনটি অণুগল্প

জয়াশিস ঘোষ

 

হলুদ চিঠি

রাকেশের লটারি লেগে গেল। মাত্র পাঁচশো টাকায় যামিনী রায়ের এরকম একটা কালেকশন পেয়ে যাবে, স্বপ্নেও ভাবেনি। ভাগ্যিস বসের বাবা মারা গেল। অফিসও ছুটি হয়ে গেল দুপুরবেলা। সবাই এদিক ওদিক কেটে পড়ল। রাকেশের সেরকম কোনও নেশা নেই। একমাত্র কলেজ স্ট্রিটে পুরানো বইয়ের গন্ধ। হাতে নিয়ে দেখে। দরদাম করে। কখনও কখনও সস্তায় মণিরত্ন মিলে যায়। আর আজকে তো একেবারে বৈদুর্যমণি!

বাড়ি এসে চা বানিয়ে বইটা খুলতেই চিঠিটা চোখে পড়ল। বইয়ের ভেতর সযত্নে রাখা। কাগজটা হলুদ হয়ে গেছে। কোনও এক সুমিকে লেখা রণর চিঠি— দেরি হয়ে গেছে অনেক। পাপ বাপকেও ছাড়ে না। অন্যায় করেছি। পারলে ক্ষমা করে দিও।

বইয়ের পাতাগুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজেও আর কোনও নাম ঠিকানা পাওয়া গেল না। বোঝাই যাচ্ছে চিঠি সুমির হাতে পৌঁছায়নি। আর রণ? তার কথাগুলো তো না বলাই থেকে গেল! এরকম কত কথা বলা হয়ে ওঠে না মানুষের সারা জীবনে। সেই রাত্তিরে ঘুম এল না রাকেশের। বিছানায় এদিকওদিক করল। দুবার বাথরুমে গেল। জল খেল। তারপর বারান্দায় এসে দাঁড়াল। পাঁচতলার নীচে কত না বলা কথা নিয়ে একটা শহর ঘুমিয়ে আছে।

পরের দিন অফিস যাওয়ার জন্য বেরিয়ে কলেজ স্ট্রিটের বাস ধরল রাকেশ। একটা অস্বস্তি ভেতরে যার সমাধান না করা পর্যন্ত শান্তি নেই। এখনও কলেজ স্ট্রিট জাগেনি। পুরানো বইয়ের দোকানদার সবে বইপত্র গুছিয়ে রাখছে। রাকেশ বইটা দেখাল। লোকটা ভীষণ বিরক্ত। মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলল— পুরানো বই ফেরত হয় না। কাগজওয়ালার কাছে কিলো দরে বেচে দেন।

রাকেশ একটা কুড়ি টাকার নোট লোকটার হাতে দিয়ে বলল, চটো কেন কাকা? এই বইটা যার থেকে কিনেছ সেই কাগজওয়ালার ঠিকানা দাও। কতগুলো টাকা লস হল বলো তো?

ডি এন ভট্টাচার্য লেনে একটা লড়ঝড়ে বাড়ি। তার একতলায় গোলকের দোকান। বইটা দেখে বলল, এত জায়গা থেকে বই আসে, মনে রাখা মুশকিল। তবে এই বইটা মনে আছে। এক লটে বিশ হাজার টাকার বই বিক্রি করেছিল। কী সব কালেকশন। আসলে আমিও তো সাহিত্যের লোক। হেঁ হেঁ…

বাড়ির গেটে দারোয়ান আটকাল। ভেতরে শ্বেতপাথরের ঝরনা, গোলাপের বাগান। পুরানো বড়লোক হবে। বইয়ের ব্যাপারে এসেছি বলাতে দারোয়ান প্রায় কলার ধরে বের করে দেয় আর কী! বলল, বাবু মারা যাওয়ার পর বই কেনার ধুম পড়েছে। আর বই নেই। এবার আপনি আসেন। দুপুরবেলা যত্তসব…

তীরে এসে তরী ডুববে? রাকেশ শেষ চেষ্টা করল। বলল, আমার কিছু টাকা দেওয়ার ছিল। ম্যাজিকের মত কাজ হল। কলকাতার মধ্যে এত জায়গা জুড়ে এরকম বাড়ি আছে, জানা যায় না। তবে ভেতরে এসে এটুকু বোঝা গেল অবস্থা পড়তির দিকে। গোলাপের বাগানে ঘাসের জঙ্গল। ঝরনাতেও বয়সের ছাপ। যে বড় সোফাটায় বসতে দেওয়া হল তারও চামড়া উঠে গেছে অনেক জায়গায়।

এক ভদ্রলোক এলেন লুঙ্গির কষি বাঁধতে বাঁধতে। রাকেশের আপাদমস্তক মেপে বললেন, বাবার মাথাটা শেষদিকে খারাপ হয়ে গেছিল। বই, ছবির শখে জমানো পয়সা শেষ করে দিল। রক্তের সম্পর্কের কথাও ভাবেনি। একে তাকে বিলিয়ে দিয়েছে। আপনাকে তো আগে দেখিনি কোনদিন।

রাকেশ বলল, দেখুন রণবাবু আমাকে চিনতেন। যামিনী রায়ের ছবি নিয়ে…

বলার সঙ্গে সঙ্গে লোকটার মুখ উত্তেজনায় লাল হয়ে গেল। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালেন। তারপর রাকেশের দিকে তাকিয়ে বললেন— তুই সুমিতা বিশ্বাসের ছেলে নাকি? লজ্জা করে না? রণপ্রতাপ ব্যানার্জীকে বাবু বলছে! শালা, বাজারি মেয়েছেলের রক্ত! এখানে কিসের জন্য? টাকা? এক পয়সাও পাবি না।

রাকেশ চুপচাপ লোকটাকে দেখছে। লোকটা বলেই চলেছে— বাবাকে তখনই বলেছিলাম উল্টোপাল্টা মেয়েছেলেকে আয়া রেখো না। উনি তো নিজের মর্জির মালিক। ভিখারির মেয়ে ছল্লিবাজি করে বাবাকে গাপ করল। বাবার তো তখন ধ্যান, জ্ঞান সব ও। তারপর নিজের খেল দেখাল তো! অত দামী যামিনী রায়ের ছবিটা চুরি করল। ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছি। বাবা কিচ্ছু বলতে পারেনি। তোর সাহস তো মন্দ না। ফোট এখান থেকে। নাহলে…

রাকেশ শান্তভাবে বলল— নাহলে কী করবেন? চুরিটা সুমিতা বিশ্বাস করেনি। করেছেন আপনি। আমি ওনার ছেলে নই। কিন্তু এটুকু জানি, উনি আপনার বাবার জন্য যা করেছেন, সেটা আপনার বাবা মৃত্যুর দিন পর্যন্ত মনে রেখেছেন। ছেলে হিসেবে আপনি কিছুই বাবাকে দেননি। ভোগ করেছেন। বাবার ভালোলাগার বইগুলো পর্যন্ত সস্তায় বেচে দিয়েছেন। ওনার এত শখের যামিনী রায়ের ছবি! দোষটা চাপালেন গরীব আয়ার ওপর। এই অপরাধবোধের ভার নিতে পারেননি রণপ্রতাপ ব্যানার্জী।

রাকেশ ভয় পাচ্ছে না। বরং মনটা ফুরফুরে লাগছে। শুধু একজন অসহায় মহিলার জন্য খারাপ লাগছে। লোকটা একটু থতমত খেয়ে গেছে। ঘাড় ঝুলে গেছে। কোনওমতে বলল, আপনি কে?

রাকেশ বলল, আমার সঙ্গে রণবাবুর সম্পর্কটা আপনি বুঝবেন না। শুধু জেনে রাখুন আপনার বাবার এক টুকরো হৃদয় আমার কাছে গচ্ছিত আছে। যা আপনি কখনও ছুঁতে পারেননি।

বাইরে বেরনোর পর মুষলধারে বৃষ্টি নামল।

 

ত্রাণ

সকালবেলা হইহই করেএকটা ম্যাটাডোরে উঠে পড়ল সবাই মালপত্র নিয়ে। আকাশ মেঘে ভরা। রাস্তার দুধারে ভাঙা পোস্ট, জলে থইথই মাঠ, গাছের লাশ। গান, চেঁচামেচি, খিল্লি করতে করতে যখন ধামাখালি পৌঁছে গেল, টিপটিপ বৃষ্টি। সবাই রেনকোট পরে ফেলল ঝটপট। পিপিই-র কাজটাও হয়ে যাবে।

পিডিএফ বিক্রি করে এত টাকা উঠবে, ভাবতে পারেনি ছেলেমেয়েগুলো। এত বড় একটা পত্রিকা, ফেসবুকের সেলিব্রিটি বেছে বেছে লেখা আদায়, প্রচ্ছদ, টিজার— তিন দিন চোখের পাতা এক করেনি কেউ। পুরো ষাট হাজার পাঁচশো। ভাবা যায়! একে করোনা। তার ওপর আমফান। বিধ্বস্ত সুন্দরবনের চেহারা দেখে এগিয়ে এসেছে ওদের বংজেন ফেসবুক গ্রুপ।

জেটিঘাটে অনেক লোক। ত্রাণের বস্তা। অভিষেক আকাশকে নিয়ে গেল নৌকা জোগাড় করতে। ঝড়ের জন্য দর বেড়ে গেছে অনেক। পাঁচ হাজারের কমে কেউ রাজি হচ্ছে না। বড় বড় এনজিও নৌকায় মাল তুলে চলে যাচ্ছে। আকাশ বলল, যা চাইছে দিয়ে বেরিয়ে যাই। ওয়েদার ভালো না। মাধবকাটি যাওয়া চাপ হয়ে যাবে।

একটা লুঙ্গি পরা লোক এগিয়ে এল। মুখটা গামছা দিয়ে প্যাঁচানো। বলল, ‘যাবে বাবুরা? আমি মাধবকাটির দিকেই যাচ্ছি। তোমরা ভালো কাজে এসেছ। যা খুশি মনে হয়, দিয়ে দিও।’ এ তো মেঘ না চাইতেই জল। অভিষেক আকাশকে বলল, ‘কাকার সঙ্গে নৌকায় যা। আমি ওদের নিয়ে আসছি।’

এখন ওরা নৌকায়। টিপটিপ বৃষ্টি পড়েই চলেছে। দুদিকে ধ্বংসের ছবি। ম্যানগ্রোভের ওপর দিয়ে যেন কেউ রোড রোলার চালিয়ে দিয়েছে। সায়ন্তন বলল, প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে। আকাশ বোতলে ভদকা বানিয়ে এনেছে। চুমুক দিল। শ্রীতমার গলাটা খুব সুন্দর। গান শুরু করল— ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে…’

মাঝি চুপ করে নৌকা চালাচ্ছে। ভটভটি লাগানো এই ছোট বোটগুলো মাছ ধরার কাজে লাগে। অভিষেক বলল, ‘কতক্ষণ লাগবে?’ মাঝি বলল, ‘তোমরা কি মাধবকাটিই যাবে?’ দিতি বলল, ‘আবার কী? সেই তো কথা হল তোমার সঙ্গে।’

মাঝি হাসল। লোকটার চোখগুলো শুধু জেগে আছে গামছার মাঝে। বলল, ‘কলকাতার বাবুরা তো আতাপুর, মাধবকাটি, হেমনগরে আসে। ওরা চাল, ডাল, ত্রিপল পায় রোজ এত এত। সুন্দরবন অনেক বড় গো মা। কত লোক না খেয়ে আছে।’

সবাই এর ওর দিকে তাকাল। অভিষেক বলল, ‘তার মানে এরকম জায়গা আছে যেখানে ত্রাণ পৌঁছায়নি?’ মাঝি হেসে বলল, ‘আমার গেরামে সবাই না খেয়ে আছে। সব ভেসে গেছে গো। কেউ আসেনি চাল দিতে। তোমরা যা দাও, সব আবার ধামাখালি বাজারে চলে আসে। সেগুলো বেশি দামে কিনে নিয়ে গিয়ে ভাত দিই বাচ্চাগুলার মুখে…’

শ্রীতমা বলল, ‘দালালে ভর্তি হয়ে গেছে। সব আসে সেলফি তোলার জন্য। অভিষেকদা, কী ভাবছ? অভিষেক কিছু বলার আগেই আকাশ বলল, ‘এসব বালছালের কথা। যাকে জিজ্ঞাসা করবি সবাই এক কথা বলবে। সারা সুন্দরবনকে তো খাওয়াতে পারব না।’ অভিষেক আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বলল, ‘আকাশ, মাতলামো করিস না। মাঝিভাই, তোমার গ্রামের নাম কী?’

‘ভাতের চর’।

জায়গাটা একটু অদ্ভুত। যেন একটা ডলফিন জলের ওপর মুখ তুলে দেখছে। আবার মিলিয়ে যাবে একটু পরেই। বালিতে নৌকা ভিড়ল। এতক্ষণে মাঝির নাম জানা হয়ে গেছে। জবাশঙ্কর। নামটা নিয়ে ওরা নিজেদের মধ্যে হেসেছে। এখন সূর্য মাথার ওপর। কাঠের সরু পাটাতনের ওপর ভর দিয়ে সবাই নামল। আকশের নেশা হয়ে গেছে বেশ। মাঝি বলল, ‘সাবধান বাবুরা। চোরাবালি আছে গো। আমার পেছনে পেছনে আসেন।’

অভিষেক পেছনে দেখছিল। মাঝি বলল, ‘চিন্তা করেন না। গেরামের লোক নিয়ে যাবে। আপনারাই দেবেন হাতে করে।’ চর পার হয়ে কেয়াগাছ আর হোগলার জঙ্গল। মাঝখান দিয়ে সরু পায়ে চলা পথ। কলকাতার ছেলেমেয়ে। গা একটু ছমছম করছে। দিতি বলেই ফেলল, বাঘ নেই তো? অভিষেক সাহস যোগাতে গেল— ‘ধুর। দিতি, তুই না!’ পেছন থেকে টানল কেউ জামা ধরে। টাল সামলাতে না পেরে পড়েই যাচ্ছিল। রাস্তা জুড়ে শুয়ে রয়েছে একটা কালো সাপ। জবাশঙ্করের আওয়াজ পাওয়া গেল, ‘খুব বিষ ব্যাটার। কামড়ালেই শেষ। বাঘও আছে বাবুরা। আমাদের তো ওদের সঙ্গেই বাস।’

বাকি রাস্তা কেউ কারও সঙ্গে কথা বলল না। শ্রীতমা দিতির হাত ধরে আছে। জঙ্গল পেরিয়ে গ্রামের দেখা পাওয়া গেল। কয়েকটা মাত্র হোগলা পাতার ছাউনি দেওয়া অস্থায়ী ঘর। নতুন হয়েছে।

গ্রামে ঢোকা মাত্র পিলপিল করে লোক এসে ছেঁকে ধরল ওদের। রোগাভোগা শরীর। কঙ্কালের মত পাঁজর। ফোলা পেট। সবার মুখে কাপড় প্যাঁচানো। সবাই বিড়বিড় করছে মন্ত্রের মত একটাই কথা— খাবার… খাবার… ক্ষিদে… ক্ষিদে….

জবাশঙ্কর হাত তুলে চিৎকার করে বলল— ‘সবাই চুপ করো। শহর থেকে বাবুরা, মায়েরা এসেছে। সবার জন্য খাবার এসেছে। সবাই খাবার পাবে।’

ভিড়টা থেমে গেল। সবাই চুপ করে তাকিয়ে আছে ওদের ঘিরে। আকাশ কালো করে আছে। বৃষ্টির তেজ বাড়ছে। ভরদুপুরে যেন রাত নেমে এসেছে। আকাশ সামনে এগিয়ে গিয়ে জবাশঙ্করকে বলল, ‘এসব কী নাটক হচ্ছে? এদের মুখ বাঁধা কেন? ভুলভাল জায়গা যত। ফোনের নেটওয়ার্ক নেই। ফেরত চলো।’

জবাশঙ্কর শান্তভাবে বলল, ‘ত্রাণ দিতে এসেছেন বাবু। লোকের অবস্থা দেখে যান। ক্ষিদে মানুষকে জানোয়ার বানিয়ে দেয় গো। আজকে এদের আনন্দ খুব। খাবার পাবে অনেকদিন পর। আপনারাও আমাদের সঙ্গে দুটো মাংসভাত খাবেন।’

‘মানে?’ অভিষেক বলল, ‘এসবের মানে কী? মাংস খাবে মানে?’ গুঞ্জন বাড়ছে ভিড়ের মধ্যে। এবার সবাই এক সুরে বলছে— ‘মাংস খাবো… মাংস খাবো…

আকাশ একটানে জবাশঙ্করের মুখের গামছা টেনে খোলার চেষ্টা করল। মুখের সঙ্গে লেগে আছে ব্যান্ডেজের মত। যত টানছে, পরত খুলেই যাচ্ছে। মুখ থেকে একই সুর বেরোচ্ছে—

মাংস খাব… মাংস খাব… ক্ষিদে… ক্ষিদে…

 

নতুন বৌ

মর…মর..ছেনাল মাগী। গু খেয়ে মর।

সকাল থেকে বুড়ি খেপেছে। লাবুর পেছন পেছন ঘুরছে আর অভিশাপ দিচ্ছে।

–এসব চলবুনি এখানে। হারামজাদি আমার ছেলেটারে খেয়ে মোছলমানের সঙ্গে ভাগবে? ভোদায় পোকা হয়ে মরবি রে।

বুড়ির মুখ দিয়ে ছিটকে ছিটকে থুতু বেরোচ্ছে। লাবু পাত্তা দিচ্ছে না। ট্রাঙ্কটা খুলে বিয়ের বেনারসিটা বের করেছে। ইমিটেশনের গয়না। বুড়ি দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসেছে। গয়না কেড়ে নিতে গেছে। লাবু দিল এক ধাক্কা। বুড়ি ছিটকে পড়েছে। ব্যথায় উঁ উঁ করছে। কাঁদছে। শাপ দিচ্ছে— সব গয়না শাড়ি নিয়ে পালাচ্ছে। মরবি! কুষ্ঠ হয়ে মরবি। পচে মরে থাকবি। আমি দেখবুনি..

লাবু থালায় ভাতের ওপর কলমি শাক নিয়েও বুড়ির দিকে তাকিয়ে শাকটা তুলে দিল। একদলা নুন নিয়ে ঘষে ঘষে মাখছে। বুড়ি কাঁদছে, ও বউ যাস না। বউ, যাস না আমারে ছেড়ে। আমি আর কোনওদিন কিছু বলবুনি। তুই মোছলমানের ওখানে আমারেও নিয়ে চল। আমি একা থাকবুনি।

বাইরে বৃষ্টির মত একঘেয়ে সুরে বাজছে কান্নাটা। লাবু খাওয়া থামিয়ে বুড়ির দিকে রক্তচক্ষু দেখিয়ে বলল, একদম চুপ। না হলে গলায় পা দিয়ে মেরে ফেলব।

বুড়ি একটু ভয়ে ভয়ে দেখে আবার সুর করে কাঁদতে শুরু করে। ছেলে পছন্দ করে বিয়ে করে এনেছিল। তারপর রাজমিস্ত্রির কাজ করতে সেই যে ভিন দেশে গেল, আর ফিরল না। প্রথম প্রথম টাকা আসত। তাও বছর দুয়েক বন্ধ হয়ে গেছে একেবারে। বেঁচে আছে না মরে গেছে, কে জানে!

লাবু প্রথম প্রথম খোঁজ করেছিল। সারাদিন কাঁদত। ধীরে ধীরে খোঁজ ও কান্না দুটোই কমল। কুড়ানো শাকপাতা, নারকেল, কচু, লতি নিয়ে বাজারে বসে। মাঝে মাঝে একটা মোছলমান ছেলে আসে। ফুসুর ফুসুর করে। আবার চলে যায়।

লাবু খেয়ে থালা ধুয়ে রাখে। হাঁড়ির বাকি ভাতে শাকটুকু ঢেলে বুড়ির সামনে রেখে দেয়। এতগুলো ভাত! সব ওর? বুড়ি এবার ভয় পেয়ে যায়। যদি না ফেরে? লাবুর পা জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে— কোথায় যাস বউ? তুই ছাড়া আমার…

লাবু পাউডার মাখা থামিয়ে একবার বুড়ির দিকে তাকায়। ঘরে আয়না নেই। এতদিন পর শাড়িটা পরে একবারও নিজেকে দেখতে পেল না। ছাদের দিকে তাকিয়ে অভ্যাসে একবার কপালে হাত ঠেকায়। পাপ নিও না ঠাকুর…

বুড়িকে বলে, মরতে যাচ্ছি। লাবু যখন বেরল, আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে।

–নাম কী?
–লক্ষণ সর্দার।
–কোন এলাকায় বাড়ি?
–আজ্ঞে, বেলাপুর।
–বেলাপুরের কেস এখানে কেন? আধার কার্ড দাও। দুজনেরই লাগবে। পঞ্চায়েতের চিঠি আছে?
–স্যার, ওসব থাকলে তো কোর্টে গিয়ে বিয়ে করতাম।

একশো টাকা হাতে গুঁজে দেওয়ার পর নাম উঠে গেল। লোকটা বলল, বউয়ের নাম কী? ডাকো। ছাপ দিতে হবে। পেছনে তাকিয়ে দেখা গেল বউ নেই। এই শালা মেয়েছেলেদের নিয়ে মুশকিল!

ভয়ে পাঁজরা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে লাবুর। ইসমাইল হাত ধরে টেনে প্যান্ডেলের এক পাশে নিয়ে আসে। এদিক ওদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে, হলটা কী তোর? কেস খাওয়াবি নাকি? লাবু বলে, ঘোর পাপ হবে ইসমাইলদা। হিঁদু বাড়ির বউ। নরকে যাব। ইসমাইল একটা বিড়ি ধরায়। বলে, কোন জন্নতে আছিস শুনি? ক্ষিদে পেলে কি তোর ঠাকুর এসে ভাত দিয়ে যায়? শোন, তোর নাম ফুলি হাঁসদা। বাপের নাম নগেন হাঁসদা। গ্রাম চ্যাঙড়া। বাপ মা মরে গেছে। কেউ নেই। আর একটাও কথা বলবি না।

স্কুলবাড়ির বড় মাঠটা জুড়ে নীল সাদা প্যান্ডেল। সার বেধে বসে আছে গোটা তিরিশেক যুগল। মাইকে সানাই বাজছে। বড় লোহার কড়াইয়ে ফুটছে মুরগির মাংস। ঝুড়িতে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত। বিডিও সাহেব, থানার ওসি সবাই বসে আছেন। সভাপতি সত্যেন্দ্রনাথ গুঁই নিজে দেখভাল করছেন। যদিদং হৃদয়ং মম… বিয়ের মন্ত্র পড়ার সময় চোখ বুজে ফেলেছে লাবু। তুলে নাও, ঠাকুর! কাঁপা হাত ধরে ফেলল ইসমাইল।

খেতে বসেছে দুজনে পাশাপাশি। এক মাথা সিঁদুর। মাথায় ফুলের মুকুট। লাল বেনারসি। হোক পুরানো। নতুন বউয়ের বেশ যেন ঢেলে দিয়েছে দারিদ্র্যে চাপা পড়ে যাওয়া লালিত্য। ইসমাইল গোগ্রাসে গিলছে। পাতে উপচে পড়েছে মাংস। ইসমাইল চেঁচিয়ে বলল, আর একটু ভাত দিয়ে যাও গো…

লাবু খেতে পারছে না। চোখ উপচে পড়ছে জলে। এ কী করে ফেলল! মোছলমানকে বিয়ে! সোয়ামি বেঁচে থাকতে…! কীভাবে ফিরবে বাড়ি! টপটপ করে জল পড়ছে ভাতের থালায়। এক মহিলা দেখতে পেয়েছে। কাছে এসে চিবুক তুলে দেখছে। আহা রে! কোথায় থাকো তুমি?

দেখতে দেখতে ভিড় জমে গেল। রান্নার ঠাকুর বেলাপুরের। ইসমাইলকে দেখে বলল, বাপের জন্মে একে দেখিনি। ইসমাইল বিপদের গন্ধ পাচ্ছে। জেরা করা শুরু করেছে সবাই। ওসি, বিডিও, সভাপতি সবাই স্কুলবাড়িতে বসে মদ খাচ্ছে। কেউ গেল খবর দিতে। গুঞ্জন উঠেছে— আজকাল গ্রামের মেয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে পাচার করে দিচ্ছে… পালাতে দিস না… আধার, ভোটার কিছু নেই, নাম লিখল কে? সহসভাপতির চোখ লাল। গর্জন করছে, সব ব্যাটাকে চাবকে সিধা করে দেব।

ইসমাইল লাবুকে ফিসিফিস করে বলল, ওঠ তাড়াতাড়ি। পালাতে হবে। লোকজন কিছু বোঝার আগেই ইসমাইল টেনে দৌড়। সবাই ওর পেছনে ধাওয়া করেছে। খাওয়া থামিয়ে দেখছে বাকিরা। হাতের প্লাস্টিকের প্যাকেটে বেনারসি শাড়ি, সোনার দুল। লাবু রাস্তায় এসে ঘোমটা ফেলে দিল।

রাতের প্যাসেঞ্জারে অত ভিড় নেই। বসার জায়গা পাওয়া গেল। ইসমাইল ঘটিগরমের ঠোঙা এগিয়ে দিল লাবুর দিকে। বলল, পুরো তিন হাজার ক্যাশ। দেড় তোর। আর প্রথমবার বলে শাড়ি, দুলের ভাগ নিলাম না। পরের বার থেকে যা হবে, আধাআধি। আমার দোকান চেনা আছে, রাতের মধ্যে ক্যাশ হয়ে যাবে। লাবুর মুখ দিয়ে এতক্ষণে হাসি বেরোল। ইসমাইল বলল, হাসলে তোকে হেব্বি লাগে…

স্টেশনের কলে ঘষে ঘষে সিঁদুর তুলল লাবু। শাড়ির আঁচলটা জড়িয়ে নিল। বৃষ্টি থেমে গেছে। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2616 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. অসাধারণ ।অল্পপরিসরের মধ্যে তিন তিনটেই গোগ্রাসে গেলার মতন গল্প। টানটান লেখা। খুবই ভালো লেগেছে। প্রত্যেকটি অনন্য ।

  2. শেষদুটো গল্প বেশি ভালো লাগল। “ত্রাণ” পড়ে চমকে উঠলাম। “নতুন-বৌ” টান টান গল্প।শেষের ট্যুইস্ট চমৎকার।

আপনার মতামত...