অন্তেবাসী — ১৫তম পর্ব

পীযূষ ভট্টাচার্য

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

ডলিদি সেখান থেকে উঠে গিয়ে পড়তে বসে। পড়বার চড়া আওয়াজে বাড়িটা ভরে গেলে মা নিচু স্বরে বলে ওঠে, ভুল পড়ছে ডলিটা। মেসোমশাই একগাল হেসে বলে ওঠে “ভুলভাল পড়ুক– তাও তো পড়তে বসেছে, এই যথেষ্ট!”

বেলুদি এবার সত্যি সত্যি হেসে উঠলে বাড়িটা যেন সহজ উচ্ছাসে ভেসে যায়। সেই সন্ধেতে মার কাছে গির্জা কি একটা বাড়ি না অন্য কিছু জানতে চাই। কেননা স্মৃতিতে ছিল ‘মিস রায়ের গির্জাঘর’। দোচালা টিনের ঘর— কেবলমাত্র অতিরিক্ত যা তা হল দরজার উপরে কাঠের তৈরি ক্রুশ। এরকম ঘর অবশ্য বহু দেখেছি— এমনকি ত্রিশূলকে টিন ফুটো করে দাঁড় করিয়ে সিঁদুর লেপে দেওয়া ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মা বলত প্রণাম করতে— করতামও। তবে কাকে করছি তা জানতাম না। দেবদেবীশূন্য বেদিকেই প্রণাম করে এসেছি। দেবী অবশ্য এক রাতের জন্য আসেন, পরদিন পুজো শেষ হওয়ার পর বিসর্জনে যাত্রা করেন। সেই পূজিত দেবীকে কোনওদিনই দেখবার সুযোগ হয়নি। তবে মা অবশ্য কোনওদিনই গির্জাঘরের উদ্দেশে প্রণাম করতে বলেনি।

ঘুমোনোর আগে সন্ধের প্রশ্নের উত্তরে মা বলছিল গির্জার উঁচু-উঁচু গম্বুজের কথা। কিন্তু তারই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, অতএব স্থাপত্যের কোনও ধারণা তৈরি হওয়ার অবকাশই ছিল না। সেজন্য সেদিনের ঘুমের মধ্যে কোনও স্বপ্নই ছিল না। যদি কোনও ধারণার সৃষ্টি হত তবে অবশ্যই স্বপ্নে দেখা দিত তা।

স্মৃতিতে কিছুই ছিল না বলে স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্ন-বাস্তব তৈরি হওয়ার পরিসর পায়নি।

ঘুম ভাঙার পর জানলার বাইরে তাকাতেই দেখি অস্পষ্ট কাঞ্চনজঙ্ঘা দাঁড়িয়ে এমনভাবে যেন কখন কুয়াশা এসে তাকে সকলের দৃষ্টির আড়ালে নিয়ে যাবে তারই অপেক্ষায়। তখনই খেয়াল হল মা উঁচু উঁচু গম্বুজের কথা বলেছিল গতরাতে। গম্বুজ শব্দটি নিজের কাছে নতুন। নিজে না দেখলেও মন্দিরের চূড়া সম্পর্কে একটা ধারণা গড়ে উঠেছিল সেই সময়। গম্বুজ সম্পর্কে কোনও ধারণা না থাকায় কেবল মনে হতে থাকে এত উঁচু করে কেন এক একটি গম্বুজ নির্মাণ হয়? তবে কি সব কিছু নির্মাণের মধ্যেই থাকে এক ধরনের প্রতিযোগিতা?

তখন অবশ্য বুঝে উঠবার বয়স ছিল না, কোন উচ্চতায় পৌঁছে গেলে নির্মাণকে নির্মিতি বলা যেতে পারে।

এসব ভাবনার মধ্যে শুনতে পেলাম নানমাসি সকালের ডাউন ট্রেনে আসছেন না। কথাটা ডলিদি এত উঁচু গলায় বলছে তাতে মনে হতেই পারে নানমাসি আর আসবেন না– যার একটাই মাত্র অর্থ, আমাদের দার্জিলিং সফরই বাতিল।

কিন্তু বাবলু ঘরে ঢুকেই তার চেয়ে উঁচু গলায় চিৎকার করে জানিয়ে দিল— তুই একটা ডাহা মিথ্যুক, নান আসবে বিকেলের ডাউনে, এবেলায় দিদির জন্য প্রেয়ার করবে। সন্ধ্যায় আমাদের বাড়িতেও প্রেয়ার হবে।

বাবলুর কথাও শেষ, বোনও জেগে উঠল। নিজের ঘুম ভেঙে গেলেও আমাকে লেপের তলাতেই থাকতে হয় শরীরের উত্তাপ বোনকে দেওয়ার জন্য। এই উষ্ণতার ভিতরে বোন অনেক বেশি সময় ঘুমিয়ে থাকতে পারে, মাও বাড়ির কাজ করবার সময় পায়।

–আমি কিন্তু তোর সঙ্গেই যাব, বাবা বলেছে। মার একটাই শর্ত, ম্যালে ঘোড়ায় চড়তে পারব না। ঠিক আছে…

কিন্তু ঘুম ভাঙার পর বোনের প্রয়োজন মাকে। তাই মাকে গলা তুলে ডাক দিলাম।

মেসোমশাইর ডাউন ট্রেন চলে যাওয়ার পর বাড়িতে এক ধরনের ব্যস্ততার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সেই ক্যাম্পখাট আবার ফিরে আসে। সঙ্গে বাহাদুর। কিন্তু বাহাদুর ওটা পেতে দিয়েই আবার উধাও। কালুদা বাজারে। মেসোমশাই বাহাদুরের উদ্দেশে বলেন “কিছু ফুলও আনিস।” সেই কথাও উঁচু গলায় বলা— বাহাদুরকে টপকে পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি ফিরে আসতেই মনে হয় বাড়িটা ফুলে ফুলে ছয়লাপ হয়ে গেল। মেজমাসি সেই সুযোগে বলে “প্রেয়ার কী গো?”

–খ্রিস্টানদের পুজো। বেলুর জন্য নান মানত করেছে। ওই তো বেলুকে ফিরিয়ে দিল।

মেজমাসি এ কথায় এমন নির্বাক– সেদিকে চোখ পড়তেই মেসোমশাই ধমকে ওঠেন “একদম কান্নাকাটি নয়। নান নিজেই বলেছে, একদম চিন্তা করবেন না। ওর জন্য প্রতিদিন প্রেয়ার করি। এত মানুষ যখন ওকে নিয়ে ভাবছে তবে ও ভালো হয়ে যাবেই একদিন। ভালোবাসা এখনও অনেক দামী।” কথা শেষ করেই অন্যমনস্ক তিনি, কী ভাবছেন তিনিই জানেন!

সেই উদাসীন মুহূর্তে মেসোমশাই কী ভাবছিলেন তা ছিল অনুমানের বাইরের বিষয় অন্তত সেই বয়সে। যদিও মনে নেই তাঁর বসে থাকার ভঙ্গিমা হাত জোড় করে ছিল কি না। যদি থাকে তবে তা ছিল নানমাসির ঈশ্বর যেখানে রয়েছেন তার ভেতরে তাঁকে নিজের ভেতরে থাকা ঈশ্বর স্বীকার করে অভিবাদন জানাচ্ছেন— আহ্বান করছেন।

তবে একথা স্পষ্ট মনে আছে, বাড়িটা কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল. নিস্তব্ধতার মধ্যে কেউ কি শুনতে পেয়েছিল তার কথা– “আমিই তাহলে এই সৃষ্টি!”

তখনই একটি পাখি ডেকে উঠলে বাড়িটা আবার ছন্দে ফেরে। নিজে সে পাখিকে চাক্ষুষ দেখিনি এ কথা যেমন সত্যি, তেমনই সত্যি সেই ডাক কালেভদ্রে শুনি। কোনও দিনই সেই পাখির খোঁজে বাইরে চোখ না রেখে নিজের ভেতরে স্থিত হয়ে অস্তিত্বে পৌঁছে যেতে চাই।

 

কালুদা বাজার থেকে লাল নীল হলুদ কাগজ কিনে এনেছে শিকলি বানানোর জন্য। বাবলুর শিকলি বানাবার অভিজ্ঞতা আছে তাই সে এক দৌড়ে চলে গেল মেসোমশাইয়ের অফিস থেকে আঠা আনতে। কালুদা বাঘের আলমারি খুলে খাপে ঢোকানো ছোরা নিয়ে এল। খাপ থেকে বের করতেই ছোরা এমন হিংস্র হয়ে উঠল যে রোদ্দুরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একের পর এক ঝলসে দিল সবকিছুকে। বেলুদি ঘরের চৌকিতে বসেই বলে উঠল— কালু সাবধান!

কালুদা ছোরাতে হাত না দিয়ে আমাকে বুঝিয়ে দিল এটাই শেষ অস্ত্র শিকারির। মাথার দিকটা অর্ধবৃত্ত। শিকার যখন গুলিতে মরে যাওয়ার আগে মরিয়া আক্রমণ চালায় তখনই এটা ব্যবহৃত হয় কণ্ঠনালী ছিন্ন করতে। না হলে নির্ঘাৎ মৃত্যু শিকারির।

–এই কালু অত বক্তৃতা ঝাড়তে হবে না, কাজটা শেষ কর। এই বাচ্চু সরে বস…

বাবলু আঠা নিয়ে এসে দেখে কাগজ কাটা শেষ। হতাশ কণ্ঠে বলে “ছোরাটা একবার দেখতাম…” কিন্তু কালুদার চোখে চোখ পড়তেই “ছুঁতাম না, শুধু দেখতাম” বলে ওঠে।

–এটা সাহেবের দেওয়া ছোরা। তুই ছুঁবি কোন সাহসে? সাহেব কবরে চলে গেছে, এটা আমার…। আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কালুদা। কিন্তু বেলুদির চোখে চোখ পড়ে যেতেই থেমে যায়…

দুপুরের পর ডাউন ট্রেন আসবার আগেই আমরা স্টেশনে। এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে বাড়ির সদর দরজায় লাল-নীল-হলুদ কাগজের তৈরি শিকলি দিয়ে বানানো তোরণ, যার দু প্রান্তে ঝুলছে লাল গোলাপের স্তবক। আমি মার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে দেখি মেজমাসি দাঁড়িয়ে আছে শঙ্খ হাতে। তার পাশে চেয়ারে বেলুদি, কালুদা কিন্তু তার পেছনেই।

মেজমাসির হাতে শঙ্খ মা এত দূর থেকে দেখতে পেয়ে বিড়বিড় করে ওঠে “মেজদিটা যেন কী! এত করে মানা করলাম। শুনলই না! উনি যে কীভাবে নেবেন কে জানে…”

এই হতাশার স্বগতোক্তির মধ্যে ট্রেনের হুইসেল শুনে সবার আগে রামছাগল স্টেশন চত্বরের মাঝখানে চলে গেল। বাবলুই জানে ফার্স্ট ক্লাসের কামরা কোথায় দাঁড়াবে। ও একটু বাঁদিক ঘেঁষে দাঁড়ালে আমরাও তাই করলাম। অবশ্য যেখানে দাঁড়াতে হল শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে সুসজ্জিত দরজা দৃষ্টির বাইরে।

নানমাসি একটি ব্যাগের ভেতর পবিত্র জল আরেকটি বড়সড় আকারের ব্যাগ বুকে জড়িয়ে নামলেন। সেই বড় ব্যাগটিতে যিশুর ছবি আছে এটা কিন্তু সেই বয়সেই বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু তাঁর মাথা ঢাকা পোশাকে ভীষণ অপরিচিত লাগছিল। তিনি নেমেই আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি দিয়ে মাকে বললেন— চলো। ততক্ষণে অবশ্য রামছাগলের মালকিন তার নিজস্ব পোশাক-আশাকের ব্যাগ নামিয়ে নিয়ে এসেছে দেখে নিশ্চিন্ত।

সিঁড়িতে তিনি পা রাখতেই মেজমাসি শঙ্খধ্বনি দিল। কিছুটা হতচকিত হয়ে মার দিকে তাকাতেই মা বলে ওঠে, “গৃহে যখন অতিথি হিসেবে কেউ প্রবেশ করেন আমরা তাঁকে অতিথি নারায়ণ হিসেবেই বরণ করি।”

–এ তো উপনিষদ!

সিঁড়ির প্রতিটি ধাপেই শঙ্খধ্বনি। তিনি অপেক্ষা করেন শঙ্খধ্বনি শেষ হওয়ার জন্য। শেষ হলেই উপরের আরও একধাপ। মনে হবে তিনি শঙ্খধ্বনিকে অনুসরণ করছেন। আসলে যে তা কিন্তু নয় তা বোঝা যায় যখন তিনি বলে ওঠেন, এই সামুদ্রিক আহ্বান কেবলমাত্র তাঁর প্রভুর জন্য।

সে তো একজন অনুসরণকারী মাত্র! এই অনুসরণই জীবনের সারাৎসার!

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় বাড়িতে উঠবার শেষ ধাপটি যে একটু বেখাপ্পা, সেটাতেও উঠে গেলেন অনায়াসে। এতটাই মসৃণ ছিল সেই ওঠা। মেজমাসির শঙ্খধ্বনি একটু অপেক্ষা করে বেজে ওঠে। তারপর সটান ঘরে ঢুকে দেখে নেন ঠিক কোনখানে তাঁর প্রভুকে রাখা যেতে পারে। দেখতে দেখতে বাঘের আলমারির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েন।

তখনই মেজমাসি আঁতকে উঠে বলেই ফেলে— এটা তো মরা বাঘ!

–তাতে কী হয়েছে? আপনাদের শিব তো বাঘের ছাল পরেই থাকেন। কত মুনিঋষি একে আসন হিসেবে ব্যবহার করে তপস্যা করেন ঈশ্বরের সন্ধানে…

উত্তর শুনে মেজমাসি আর মা এতটাই হতবাক মুখে কোনও রা নেই। তারপর দুজন একই সঙ্গে কালু বলে ডাক দেয়। “আলমারিটা খুলে দে!”

আলমারির চাবি থাকে কালুদার পৈতেতে বাঁধা অবস্থায়। চাবি ঘুরিয়ে পাল্লা খুলে দিয়ে আবার চাবিটা বের করে নিয়ে আসে। সেখানে নানমাসি প্রথমে ব্যাগ থেকে যিশুর বাঁধানো ছবি বাঘের মাথাতে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে দেন, ক্রুশে বিদ্ধ খ্রিস্ট মাথাটা পেছনে হেলানো সামান্য। যেন জীবনের দুঃখদুর্দশার প্রতি মানুষের অন্তরে দরদ অনুভূতি জেগে ওঠে। তার পাশে রাখেন পবিত্র জলপাত্র। তারপর মাকে কানে কানে কিছু একটা বলেন, মা বোধহয় সেই কথাই মেজমাসিকে বলে, তারপর দুজনেই চোখের ইশারায় আমাদের চলে যেতে বলে। আমরা মেজমাসি ও মার সঙ্গে, যেখানে বেলুদি অপেক্ষা করছে ফুলের তোড়া হাতে, সেখানে চলে যাই। দরজাও বন্ধ হয়ে যায়।

একসময় তিনিও দরজা খুলে বাইরে আসেন, প্রথম যেদিন এসেছিলেন সেই পোশাকে। বেলুদি ফুলের তোড়া হাতে দেওয়ার পর বলে ওঠেন— আমেন!

 

আবার আগামী সংখ্যায়

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2616 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...