লেনিনের সঙ্গে কিছুক্ষণ

লেনিনের সঙ্গে কিছুক্ষণ : অশোক মুখোপাধ্যায়

অশোক মুখোপাধ্যায়

 

[৭-১০]

[১১]

তাহলে এই সব দার্শনিক সমস্যার সমাধান লেনিন করলেন কী করে? এবার সেই সব কথা। ভারতীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী বলা যায়: অথাতঃ বস্তু জিজ্ঞাসা।

বস্তু-ধারণায় মাখের আপত্তির জায়গা ঠিক কোথায়? মাখ দর্শন অনুযায়ী, আমরা যখন আপেল খাচ্ছি বলে ভাবছি, আসলে তখন আমরা আপেলের সংবেদন খাচ্ছি। বা খাওয়ার সংবেদন পাচ্ছি। বস্তুত সেই সংবেদন পাওয়ার সংবেদন পাচ্ছি। … এখন এইভাবে বলতে গেলে যেহেতু অনেক (আসলে অনন্ত) শব্দ খরচা হচ্ছে, তাই একে সংক্ষিপ্ত করে আপেল খাচ্ছি বলাতে মাখ আপত্তি না করলেও তা ভাবতে নিষেধ করে দিচ্ছেন। মানে হল, সংবেদন থেকে জানা শুরু হচ্ছে বলা যাবে, কিন্তু যে বস্তু থেকে সংবেদন পেলাম তার কথা বলা যাবে না। আপেল কাকে বলে জানা যায় না। যা জানা যায় তা হচ্ছে আপেলের রং, স্বাদ, গন্ধ, আকার, স্পর্শানুভূতি, ইত্যাদি সংবেদনগুলি।

বস্তুবাদীরা বলে (এমনকি ভাববাদী হেগেলেও বলেছেন), এই রং স্বাদ গন্ধ আকার স্পর্শানুভূতি মিলিয়ে যা পাই তা-ই হচ্ছে আপেল। কিন্তু এরকম কথা শুনলে মাখ-বাদীরা একেবারে হায়-হায় করে ওঠেন। করো কী করো কী নন্দলাল? যা পাচ্ছ শুধু সেইটুকুই বল। আপেল বলে তুমি কিছু পাচ্ছ না। সাধারণভাবেও বস্তু বলে তুমি কিছু পাও না। সব মিলিয়ে মানে? সব মিলিয়ে কোনও কিছুর সংবেদন তুমি পাচ্ছ নাকি? এই সহজ কথাটা মেনে নিতে আপত্তি কেন তোমার? যার সংবেদন পাচ্ছ না, যার ব্যাপারে তোমার কোনওরকম প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হচ্ছে না, তার কথা তুমি বলো কী করে?

কোনও রাখঢাক না করেই মাখ বলতেন: “To us investigators, the concept “soul” is irrelevant and a matter for laughter. But matter is an abstraction of exactly the same kind, just as good and just as bad as it is. We know as much about the soul as we do of matter.” [Mach, 1911, 48] অর্থাৎ, বিজ্ঞানীদের কাছে আত্মার ধারণা যতটা হাস্যকর, বস্তুর ধারণাও নাকি ঠিক ততটাই হাস্যোদ্দীপক। আলাদা আলাদা জিনিসপত্র যেমন দেখছ সে সব ঠিক আছে। তাই বলে তার মধ্যে থেকে বিমূর্তায়ন করে সাধারণভাবে বস্তুর ধারণা পাওয়ার চেষ্টাটিও কোরো না। করলেই মাখসাহেব হেসে ফেলবেন কিন্তু! আর সেই ১৯০৯ সালে মাখ হাসলে পদার্থবিজ্ঞানীদের মহলে সংক্রমিত হাসি থামানো সহজ কাজ ছিল না।

হেগেল এই জাতীয় প্রস্তাবনার একটা ভারি চমৎকার আগাম উত্তর দিয়েছিলেন। বস্তু তার সংবেদন-সমষ্টির থেকে আলাদা নয়। আমরা যখন বস্তুটি থেকে উৎপন্ন সংবেদনগুলি জানতে পারি, তখনই আমরা বস্তুটিকেও জানতে পারি। তিনি বলতেন, ভাষা নিখুঁত করে বলতে গেলে আমরা ফল খাই বলা যাবে না। আমরা খাই আপেল, চেরি, লেবু, ইত্যাদি। তাহলে ফল বলে কিছু আছে না নেই?

এই প্রশ্নটিকে ধরে এঙ্গেল্‌স তাঁর সময়ে আরও খানিকটা এগিয়েছিলেন। তাঁর Dialectics of Nature নামক গ্রন্থে আমরা তার পরিচয় পাই। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলতে চেয়েছিলেন, স্তন্যপায়ী প্রাণী বললে আমরা কুকুর বেড়াল গরু ভেড়া ইত্যাদি থেকে আলাদা করে কিছুই বুঝি না। এগুলোর থেকে আলাদা করে নিছক স্তন্যপায়ী প্রাণী (অর্থাৎ যে কুকুর নয়, গরু নয়, কিংবা বেড়াল ইত্যাদিও নয়, শুধুই স্তন্যপায়ী, এরকম) বলে কিছু পাওয়া যাবে না। স্তন্যপায়ী প্রাণী মানুষের চিন্তায় সৃষ্ট একটা বিমূর্ত সাধারণ (শ্রেণিবাচক) ধারণা; তথাপি এই কথাটার বাস্তব মানে আছে। এই অর্থটা আমাদের জ্ঞানন প্রক্রিয়া দ্বারা বিশেষ বিশেষ প্রাণীর একটা বিশেষ কিন্তু তাদের মধ্যে সাধারণ বৈশিষ্ট্যকে বিমূর্তভাবে বোঝার চেষ্টার ফল। কিন্তু বিমূর্তকরণ মানেই হল, মূর্ত থেকে শুরু করে তার থেকে বেরিয়ে আসা। কোনও বিমূর্তই স্বতঃবিমূর্ত নয়, স্বয়ম্ভু বিমূর্ত নয়। এই যেমন ধাতুর ধারণা। লোহা, সোনা, তামা, সিসা, পারদ, ইত্যাদি নয়, শুধু ধাতু এক ড্যালা কেউ কি দেখাতে পারে? অথচ ধাতুর ধারণা একটা অত্যন্ত বাস্তব ধারণা। এও সেই বিমূর্ত ধারণা।

গতির প্রশ্নেও তাই। গতি বললেই কোনও না কোনও বস্তুর গতিই বোঝায়। বস্তুহীন গতি, নিছক গতি— তার কোনও অস্তিত্ব নেই। গতিশীল বস্তুকে দেখে বা ধরেই গতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। তাহলে গতি কি বাস্তবে আছে, না নেই?

একইভাবে ফল বলতে কী বোঝায় আমরা জানি। কিন্তু আম আপেল কলা ইত্যাদি বাদ দিয়ে শুধু ফল আনতে বললে কেউ তা আনতে পারবে না। কেন না, আম বা কলার যে অর্থে আমাদের অভিজ্ঞতা সাধ্য অস্তিত্ব আছে, ফলের তা নেই। ফল একটা ধারণা। বাস্তব ধারণা, বাস্তব জিনিস থেকে উদ্ভূত ধারণা, কিন্তু তবুও ধারণাই মাত্র। বস্তু-ধারণাও তাই। বিভিন্ন বিশেষ বিশেষ বস্তু থেকে অন্যান্য সমস্ত বৈশিষ্ট্য বাদ দিয়ে শুধু মাত্র বস্তু হবার বৈশিষ্ট্যটিকে ধরেই আমরা ধারণাটি পাই। অন্যত্র তাঁর পরিস্রুত ভাষায়, “Matter is nothing but the totality of material things from which this concept is abstracted, …”

এখানে এঙ্গেল্‌স যুগপৎ ভাববাদ এবং প্রত্যক্ষবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছেন। একদিকে তিনি ভাববাদীকে বলছেন, দেখো, বস্তুর ধারণাটা একটা বাস্তব সত্তা। চতুর্দিকে পরিব্যাপ্ত বস্তুর একটা সাধারণ পরিচিতি হিসাবেই বস্তুর বিমূর্ত দার্শনিক ধারণা। বিমূর্ত হলেও যা বাস্তব। বাস্তবেরই অংশ। আবার, প্রত্যক্ষবাদীদের তিনি লক্ষ করতে বলছেন, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় বিমূর্ত বস্তু-ধারণাকে না পাওয়া গেলেও মূর্ত প্রত্যক্ষ-গোচর অভিজ্ঞতায় প্রাপ্ত বস্তুনিচয় থেকেই মানুষ তার চিন্তার প্রক্রিয়ায় বিমূর্তকরণের মাধ্যমে বস্তুর দার্শনিক ধারণায় পৌঁছাতে পারে।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, লেনিন বা প্লেখানভের হাতে এঙ্গেল্‌সের এই বইটা আসেনি। তাঁদের সামনে ছিলেন আর একজন, জোসেফ ডিয়েৎস্‌গেন (১৮২৮-৮৮), মার্ক্স এঙ্গেল্‌সের প্রায় সমকালে যিনি স্বতন্ত্রভাবে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দর্শনের বেশ কিছু মৌলিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছিলেন। তিনি তাঁর একটি রচনায় বস্তুর যে দার্শনিক সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, তা যেমন একদিকে তাঁর চিন্তার প্রজ্ঞাকে তুলে ধরে, সঙ্গে সঙ্গে এই মার্ক্সীয় প্রতীতির আবশ্যিক উদ্গমকেও স্পষ্ট প্রতীয়মান করে তোলে: “The Socialist materialism understands by matter not only the ponderable and tangible, but the whole real existence. Everything that is contained in the Universe― and in it is contained everything, the All and the Universe being but two names for one thing― everything this Socialist materialism embraces in one conception, one name, one category, whether that category be called the actuality, reality, Nature or matter.” অর্থাৎ, সমাজতান্ত্রিক বস্তুবাদ বস্তু বলতে বোঝে দুনিয়ায় দৃশ্যমান ও অদৃশ্য যা কিছু আছে তার সমগ্রকে। এই “সবকিছু” কথাটার মানে হল বাস্তবতা, প্রকৃতি, বিশ্বজগৎ এবং বস্তু ইত্যাদি— সে আমরা তাকে যে নামেই ডাকি না কেন।

প্লেখানভ বোগদানভের সঙ্গে বিতর্কে নেমে বস্তুর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ১৯০৬ সালে লেখা তাঁর নিজের একটা প্রবন্ধ থেকেই উদ্ধৃতি দিয়ে বললেন, “In contrast to ‘spirit’, we call ‘matter’ that which acts on our sense-organs and arouses in us various sensations. What is it exactly that acts on our sense-organs? To this question I answer with Kant: things-in-themselves. Thus, matter is nothing else than the totality of things-in-themselves, in so far as these things constitute the source of our sensations.”

তারপর আরও ব্যাখ্যা করে তিনি দেখালেন, “We call material objects (bodies) those objects that exist independently of our consciousness and, acting on our senses, arouse in us certain sensations which in turn underlie our notions of the external world, that is, of those same material objects as well as of their relationships.”

এঙ্গেল্‌স (-এর বক্তব্য না জেনে) এবং ডিয়েৎস্‌গেন থেকে তিনি দু-এক পা এগিয়ে গেলেন বটে, তবুও সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করলে বোঝা যায়, দার্শনিক প্রেক্ষিত থেকে তাঁর দেওয়া বস্তুর এই সংজ্ঞায় একটা অস্পষ্টতা বিভ্রান্তির ফাঁক থেকে যাচ্ছিল (বস্তুর সংজ্ঞা দিতে বসে বারবারই চেতনার প্রশ্নকে তিনি জুড়ে দিচ্ছিলেন)।

এবার ডিয়েৎস্‌গেন এবং প্লেখানভের প্রদত্ত বক্তব্য থেকে ঝাড়াই বাছাই করে সেই বিভ্রান্তির জায়গাটা লেনিন অতি সংক্ষেপে অথচ সুচয়িত শব্দশৃঙ্খলে মুছে দিলেন, “Matter is a philosophical category denoting the objective reality which is given to man by his sensations, and which is copied, photographed and reflected by our sensations, while existing independently of them.”

আমাদের চেতনা নিরপেক্ষভাবে বিদ্যমান যা কিছু আমাদের চেতনায় সংবেদন বয়ে আনে দার্শনিক প্রতীতি হিসাবে তাই হল বস্তু। লক্ষণীয়, ধারে কাছে এসেও প্লেখানভ এই অত্যাবশ্যক শব্দবন্ধটি খুঁজে পাননি। আর, এই একটি সংজ্ঞার মধ্যে দার্শনিক প্রতীতি’ কথাটা যুক্ত করে লেনিন জ্ঞানের উৎস এবং উপায়ের প্রশ্নদুটিকেও একসঙ্গে ধরে ফেলেছেন। কান্টের রেখে যাওয়া জ্ঞানতাত্ত্বিক সমস্যারও সমাধান করে ফেলেছেন। একটি সংজ্ঞার মধ্যেই বস্তু-ধারণার দুটি ভাগ— স্ববস্তু এবং পরবস্তু-কে জুড়ে দিতে পেরেছেন। যখন সে আমাদের চেতনা-নিরপেক্ষভাবে বহির্বাস্তব হিসাবে অবস্থান করে তখন সে হচ্ছে স্ববস্তু; আর যেই সে আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ধরা-ছোঁওয়ার আওতায় চলে আসে, জ্ঞাত বিষয় হয়ে ওঠে, সে-ই হয়ে ওঠে পরবস্তু। বস্তুর দার্শনিক ধারণার মধ্যে বস্তুর এই উভয় পর্যায়কেই তিনি অবধারণ করতে সক্ষম হলেন।

সঠিক উপলব্ধির শক্তিই হচ্ছে এইরকম। লেনিন এখানে একেবারে যেন পেশাদারি দার্শনিক নৈপুণ্যে বিষয়টিকে ধরেছেন। এতদিন পর্যন্ত বস্তুবাদীরা, ফয়ারবাখ এবং এঙ্গেল্‌সের অনুসরণে প্রশ্ন করতেন, বস্তু আগে না ভাব আগে? প্লেখানভও সেই জায়গাতেই থেমে গেছেন। লেনিন তার থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়ে, সমকালীন বিজ্ঞানের সঙ্গে মার্ক্সীয় দর্শনকে সংযোজিত করার প্রয়োজনে বৈজ্ঞানিক ধারণার সঙ্গে দার্শনিক প্রতীতির পার্থক্যের প্রশ্নটিকে সামনে তুলে এনেছেন। চেয়ার, টেবিল, খাট- এগুলো এক একটা জিনিস, তার সাধারণ উপাদান হচ্ছে কাঠ। সেই কারণে, কাঠ, লোহা, কয়লা, জল, মেঘ, গ্রহ- এগুলো বৈজ্ঞানিক অর্থে বস্তু। এই অর্থে বিজ্ঞানে তা বস্তু। দর্শনে বস্তুর এই ধারণার আরও বিমূর্তায়ন হয়, নির্বিশেষায়ণ হয়। জিনিস বা উপাদান শুধু নয়, কোনও বিশেষ ভৌত গুণই সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কঠিন না তরল, ঠান্ডা না গরম, হাল্কা না ভারি, লাল কিংবা সবুজ, জড় না জীব, উদ্ভিদ অথবা প্রাণী, ইত্যাদি বিজ্ঞানে যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক দর্শনে এর কোনও কিছুই বিবেচ্য নয়। সেখানে তার একটা বৈশিষ্ট্যই কেবলমাত্র বিচার্য, চেতনা নিরপেক্ষ অস্তিত্ব। বস্তুর ক্ষুদ্রতম উপাদান পরমাণু না আরও কোনও ক্ষুদ্রতর কণা- এটা বিজ্ঞানের বিচার্য বিষয়। কিন্তু দর্শনের বিচার্য প্রশ্ন- পরমাণুই হোক আর ইলেকট্রনই হোক, তা কি শুধুই আমাদের চেতনায় বসবাস করে, নাকি তা মানুষের চেতনা-বহির্ভূত সত্তা হিসাবে আছে?

এ হচ্ছে সেই ধরনের প্রশ্ন যাকে আইনের ভাষায় বলা হয় উত্তর-পৃক্ত প্রশ্ন। যাঁকে করা হয় তাঁর পক্ষের উকিল এতে সাধারণত আপত্তি তোলেন। অবজেকশন মি লর্ড, আমার মক্কেলকে প্রশ্নের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।

রসিক বিচারক হাসেন, অবজেকশন অভাররুলড। বলুন, বলুন। ইলেকট্রন আছে, না, কেবল ভাবলে আছে? তখন খুব বিপদ হয়। নিজেকে হাস্যকর জায়গায় নিয়ে ফেলতে না চাইলে এই প্রশ্নের উত্তরে যে কোনও সাক্ষীকে বস্তুবাদের পক্ষাবলম্বন করতেই হবে।

লেনিন কি ওখানেই ছেড়ে দিলেন বিষয়টা?

না, বৈজ্ঞানিক ধারণা (concept)-র সঙ্গে দার্শনিক প্রতীতি (philosophical category)-র পার্থক্য কোথায় তাও তিনি বুঝিয়ে দিলেন। বিজ্ঞানে যে বস্তুর ধারণা, তার মধ্যে জড় বস্তুর সাধারণ ধর্মের কথাগুলি বিবেচ্য। সেই সব ধর্ম বা তাদের নিয়মাবলি নিয়ে পদার্থবিজ্ঞান বা রসায়নের কারবার। যদি সজীব বস্তুর কথা ধরা হয় তখন তাদের সাধারণ ধর্মগুলি এবং নিয়মসমূহ জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিবেচনাধীন। কিন্তু দর্শনের এলাকায় ঢুকলে, দার্শনিক প্রতীতির মধ্যে এই সব কোনও ধর্ম বা নিয়মকানুন আলাদা করে গুরুত্ব পায় না। সেখানে শুধু বিবেচনার বিষয় হল, আছে না নেই। বস্তু (সে যা এবং যেমনই হোক) আছে না নেই। অনিবার্যতা আছে না নেই। গতি আছে না নেই? আমাদের কালের প্রেক্ষাপটে যোগ করতে হবে, সম্ভাব্যতা আছে না নেই। ইত্যাদি।

তারপরই লেনিন প্রশ্ন তোলেন, দার্শনিক জ্ঞানতত্ত্ব কি এযাবত বস্তু, অনিবার্যতা, ইত্যাদির চাইতে আরও ব্যাপকতর কোনও ধারণা সৃষ্টি করতে পেরেছে? না। “These are the ultimate concepts, the most comprehensive concepts which epistemology has in point of fact so far not surpassed (apart from changes in nomenclature, which are always possible).” সুতরাং লেনিনের বক্তব্য হল, দর্শনে এর চাইতেও ব্যাপকতর ধারণার জন্ম দিতে না পারা পর্যন্ত চেতনা নিরপেক্ষ বহির্বাস্তব সত্তার জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রতীতি হিসাবেই বস্তু-ধারণাকে গ্রহণ করে আমাদের চলতে হবে। এই ধারণার মধ্যে চেতনা নিরপেক্ষ অস্তিত্বের প্রশ্নটি ছাড়া কোনও বিশেষ বস্তুর কোনও বিশেষ বৈশিষ্ট্যই– বিজ্ঞানে তার যত গুরুত্বই থাকুক– দর্শনের বিচার্য বিষয় নয়।

প্রসঙ্গত মার্ক্সবাদীদের লেনিন স্মরণ করিয়ে দেন, দার্শনিক প্রতীতি অর্থে বস্তুর এই সংজ্ঞা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, “মাখ-পন্থীরা যেভাবে বস্তুর গঠনের একটা বিশেষ তত্ত্বের সঙ্গে জ্ঞানতত্ত্বের একটা সাধারণ প্রতীতিকে গুলিয়ে ফেলছেন, বস্তুর নতুন বৈশিষ্ট্যের (যথা, ইলেকট্রন) নতুন ধর্মের সঙ্গে জ্ঞানতত্ত্বের একটি পুরনো সমস্যা, আমাদের জ্ঞানের উৎস কী বা চেতনা নিরপেক্ষ সত্য বলে কিছু আছে কিনা, ইত্যাদি প্রশ্নকে গোলমাল করে দিচ্ছেন, তা একেবারেই ক্ষমার অযোগ্য।” অর্থাৎ, বিজ্ঞান বস্তুর কী কী নতুন বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করল যা আগে আমাদের জানা ছিল না, তার দ্বারা বস্তুর চেতনা-নিরপেক্ষ অস্তিত্বের প্রশ্নটিকে নাকচ করে দেওয়া যায় না। যখন শুধু চাঁদকেই চিনতাম, তখনও সে আমাদের চেতনার বাইরেই অবস্থান করত; এখন যখন জানা গেল, চাঁদের বুকেও পৃথিবীর মতো উঁচুনিচু অনেক পাহাড় গহ্বর আছে, তখনও সে আমাদের চেতনা নিরপেক্ষভাবেই রয়েছে। জানার প্রশ্নের সঙ্গে অস্তিত্বের প্রশ্নকে গুলিয়ে ফেললে দর্শনে একটা বিরাট ভুল হয়ে যাবে।

লেনিনের এই বিশ্লেষণের মধ্যে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ সত্যের ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। আমাদের সময়ের একটা সমস্যার অনুষঙ্গ দিয়ে বললে সেটা বুঝতে সুবিধা হবে। যেমন, আজকাল অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, সমাজতন্ত্র সংক্রান্ত মূল মার্ক্সীয় তত্ত্বটা সত্য কিনা। আর এর উত্তর খুঁজছেন রাশিয়ায় চিনে সমাজতন্ত্র নির্মাণে কী কী ভুলভ্রান্তি ঘটেছিল, বা বিংশ শতাব্দে অনেকগুলো দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও কেন তা এক সময় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল, তার মধ্যে। না এইভাবে মার্ক্সের তত্ত্বের বিচার করা যায় না। এর দুরকম উত্তর হতে পারে। এক, মূল তত্ত্বকে সত্য ধরে নিয়ে কেন এরকম হল তা আলাদাভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। ভুলভ্রান্তি বা ভেঙে পড়ার কারণগুলিকেই ভালো করে বুঝে নিতে হবে। নতুবা, তত্ত্বটিকে তার ক্যাম্পাসে ঢুকেই বিচার করে দেখাতে হবে, সেটা আদিতে আদতে ভুল ছিল।

 

[১২]

নিকোলাই আরনেস্টোভিচ বাউমান (১৮৭৩-১৯০৫)-এর নাম উল্লেখ করে আজকের কমিউনিস্ট আন্দোলনের কমরেডদের তাঁর পরিচয় এবং কাজকর্ম সম্পর্কে জিগ্যেস করলে এমনকি বয়স্করাও কজন দুচার কথা বলতে পারবেন, আমার গভীর সন্দেহ আছে। এবং তা একেবারেই অমূলক সন্দেহ নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমি এই দাবি করছি। এবং শুধু ভারতের সাপেক্ষে নয়, সারা বিশ্বের ক্যানভাস সামনে রেখেই এই দাবি। ২৯ মে তাঁর জন্মদিনে, কিংবা ৩১ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুদিনে কোনও বামপন্থী পত্রিকায় বা সোস্যাল মিডিয়ায় বামপন্থীদের লেখায় তাঁর সম্পর্কে এক লাইনও চোখে পড়েনি বলে। আজ সুযোগ যখন এসেছে, সেই কমরেড বাউমানের সংক্ষিপ্ত সংগ্রামী বিপ্লবী জীবনের কিছু কাহিনি সংক্ষেপেই বলতে চাই।

আরে, আরে, লেনিনের কথা বলতে বসে বাউমানের কথা কেন? শিবের গীত গাইতে বসে ধান ভাঙার প্যাচাল কেন?

কারণ, ধান চাষ করতে গিয়েই শিবের গান এসেছিল। কারণ, এই সব বিপ্লবী কমরেডদের নিয়েই লেনিন। যাঁদের তিনি উদ্বুদ্ধ করেছেন, প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, সক্রিয় কর্মী থেকে দায়িত্বশীল সংগঠক এবং যথোপযুক্ত নেতা হিসাবে তৈরি করেছেন। দায়িত্ব দিয়ে পরখ করেছেন।

আর একটা বিশেষ কথা এই যে অসময়ে, মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে, শহিদের মৃত্যুবরণ না করলে স্তালিন নয়, এই নিকোলাই বাউমানই খুব সম্ভবত লেনিনের পরে সিপিএসইউ দলের দায়িত্বভার গ্রহণ করার মতো জায়গায় আসতেন। এমনই উজ্জ্বল চরিত্র ও চমকপ্রদ কর্মজীবন এই মানুষটির।

বয়সে লেনিনের থেকে মাত্র তিন বছরের ছোট নিকোলাই বাউমানের জন্ম এক ছুতারের পরিবারে, যাদের পূর্বপুরুষের শরীরে রুশ ও জার্মান রক্ত মিশেছিল। নামের মধ্য ও পদবী অংশে তার চিহ্ন রয়ে গেছে। লেনিনের মতোই তিনিও ১৮৯০-এর দশকে কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, যদিও তিনি পশু চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। ছাত্রজীবনেই তিনি বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং মধ্য রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সংগঠন গড়ে তোলার কাজে জড়িয়ে পড়েন।

পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে নির্বাসন দণ্ড ভোগ করার সময় জেল ভেঙে বেরিয়ে ১৯০০ সালে তিনি বিদেশে পালিয়ে যান এবং লেনিনের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইস্‌ক্রা পত্রিকার প্রকাশ ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। লেনিন এঁকে দেখে মুগ্ধ হন। অনুভব করেন, এক অমূল্য রতন এসে গেছে তাঁর হাতে। বিদেশ থেকে একাধিকবার তিনি গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে ইস্‌ক্রা পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যার কপি রাশিয়ায় নিয়ে যান এবং মস্কো ও সন্ত পিতর্সবুর্গ এলাকায় তা বিতরণ ও প্রচারের ব্যবস্থা করেন।

তাঁর এই আইনেতর সীমান্ত পেরনোর ঘটনাগুলো ছিল শিহরণ জাগানো অ্যাডভেঞ্চারের মতো। পকেটে থাকত একাধিক পাসপোর্ট, বিভিন্ন নামে (স্বনাম বাদে)— কখনও সরোকিন, তো কখনও সারাফস্কি, ইত্যাদি। তিনি সাধারণত বেছে নিতেন সীমান্তবর্তী খুব দুর্গম বন জঙ্গল ঝোপঝাড় সমাকীর্ণ রাস্তাঘাট আর প্রচণ্ড ঝড়জলের রাত। বীভৎস তুষার ঝড়। দু হাত দূরের কিছু দেখা যায় না। অনেকরকম গরম পোশাক পরে থাকার পরও ঠান্ডা যেন হাড় অবধি ঢুকে জানান দিয়ে যায়। মোটা রবারের বর্ষাতি পরেও শরীরের নানা জায়গায় বরফ গলা জলের স্নেহস্পর্শ পাওয়া যায়। ভিজে যায় অন্তর্বাস পর্যন্ত। কিন্তু সুবিধা হল, সে সব দিনে, থুরি, রাতে পেছনে চর লাগলে, খানিকটা পেছনে ফেলে দিতে পারলেই আর সে হাতের বাক্সদুটো দেখতে পাবে না।

একবার ইস্‌ক্রার গোছা নিয়ে আসার সময় তবুও চর পেছনে ধাওয়া করে এসে গেল। তিনি চেপে বসেছেন রেলগাড়িতে। দেখতে পেলেন মহামান্য অনুসরণকারীকে। দুই সারি চেয়ারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাউমানের কোটের দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি বুঝতে পারলেন, একটা কোনও বড় স্টেশনে গাড়ি থামলেই সামরিক পুলিশের দেখা মিলবে।

ইলিচ বারবার বলে দিয়েছেন, সাবধানে যাবে নিকোলুচকা। জারের লোক এখান থেকেই তোমাকে অতিথি করে নেবে।

আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করব কমরেড ইলিচ।

কোনও কারণে ধরা পড়ার মতো অবস্থায় ফেঁসে গেলে যেভাবেই হোক ইস্‌ক্রার বান্ডিলগুলো প্রথম ঝেড়ে ফেলবে। ওগুলো সঙ্গে থাকা অবস্থায় ধরে ফেললে, সাংঘাতিক ব্যাপার হবে।

হ্যাঁ, সাইবেরিয়ায় আমৃত্যু থাকার জায়গা পেয়ে যাব।

এখন গাড়ির মধ্যে কীভাবে সেই চরকে এবং বাক্সদুটোকে কাটানো যায় ভাবতে ভাবতে তাঁর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল।

কামরায় স্কুলের কিছু ছাত্রছাত্রী ছিল। নিকোলাই দ্রুত তাদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেললেন। এসব কাজে তাঁর দক্ষতা ছিল ঈর্ষণীয়। কোটের ভেতর থেকে তাসের প্যাকেট বের করে ওদের উপযাচক হয়ে নানা রকম তাসের ম্যাজিক দেখালেন। তারপর বললেন, ওহে কাকু পিসিরা, তোমরা একটা মজার খেলা খেলতে চাও?

ছাত্রছাত্রীরা হইহই করে রাজি হল। তিনি এবার ওদের সেই পুলিশের চরকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন, ওই যে দূরে এক চাচা বসে আছেন, তোমরা সব্বাই ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে পারবে?

পারব, পারব— সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল। কিন্তু তাতে কী হবে?

আঙ্কলের মুখের ভাবে কতরকম ছবি ফুটে উঠবে, দেখে তোমরা মজা পাবে।

শুধু শুনেই ওরা যে পরিমাণ মজা পেল তাতে তাকিয়ে থাকার খেলা শুরু করতে ওদের দেরি হল না। আট দশটি বিভিন্ন সাইজের ছেলে মেয়ে যেভাবে ওর দিকে ড্যাবড্যাব করে বিস্ময় আর কৌতূহল মেশানো চোখে নিষ্পলক দেখছে, সে এক পরম অস্বস্তির ব্যাপার! চর বাবাজীবন বুঝেই উঠতে পারছিল না, এই পরিস্থিতিতে ওর করণীয় কী। স্কুল ফেরত এই পুঁচকে ছেলেমেয়েগুলো ওকে নিয়ে কী করতে চায় কিছু বোঝা যাচ্ছিল না। ট্রেনিং-এর সময় বোধ হয় সিনিয়ররা কেউ বলে দেয়নি। বাউমান বুঝলেন, খুব সামান্য সময় পাবেন তিনি। ‘হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে উঠলেই লোকটা আবার আমার পিছু নেবে। বা সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়বে। ও বুঝে গেছে যে আমি ওকে চিনে ফেলেছি। ফলে আমি এখন সরে যাওয়ার চেষ্টা করব। আর ও আমাকে আটকাতে চাইবেই।’ অত্যন্ত সন্তর্পনে হাতের বাক্সদুটোকে পা দিয়ে ঠেলে ঠেলে তিনি কামরার কাছের একটা দরজার মুখে নিয়ে গেলেন। তারপর দরজা দিয়ে দুই ধাক্কায় দুটোকেই চলমান ট্রেন থেকে বাইরে ফেলে দিলেন। অতঃপর খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে হ্যান্ডল ধরে নিজেও ঝুলতে লাগলেন, কখন ট্রেনটা একটু মন্থর হয়। মাইনাস সতেরো ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মৃদুমন্দ বঙ্কিমি মলয়জ শীতলাম ঝাপটার মধ্যেই। এক সময় তিনি নিজেও রেললাইনের ধারে লাফিয়ে নেমে পড়লেন।

রাশিয়ার ভেতরে তখন মার্ক্সবাদীদের মধ্যে প্লেখানভপন্থী আর লেনিনপন্থীদের মধ্যে তীব্র মতভেদ এবং বিতর্ক। প্রচুর কষ্ট করে মস্কোয় পৌঁছে একজন সহানুভূতিশীল দাঁতের ডাক্তারের চেম্বারে আরএসডিএলপি-র মস্কো কমিটির সভায় বসেই সেটা তিনি টের পেলেন। লেনিনের পক্ষ থেকে এসেছেন শুনেই সভাস্থ বাকি সদস্যদের মধ্যে একটা নীরব চোখাচোখি আর পরে এক ধরনের হালকা এবং বক্র হাসির ছররা বয়ে গেল।

লেনিন? কী বোঝেন উনি রুশি নাগরিকের মনের ভাব?

বিদেশে বসেই উনি বুঝি প্যাম্ফলেট লিখে-টিখে জারকে হঠিয়ে দেবেন?

সত্যি সত্যিই লেনিন কিছুই যে বোঝেন না, সেটা নিকোলাই টের পেলেন রাস্তায় বেরিয়ে। পুলিশের একটা বেশ বড় দল ঘিরে ধরল তাঁকে। ঠিক এমন আশঙ্কাই সেদিন করছিলেন ইলিচ!

এমনই সব ঘটনাবহুল জীবন তাঁর। আরও অনেক বার তিনি জেলে বন্দি হয়েছেন, পালিয়েছেন। রুদ্ধশ্বাসে পড়ার মতো সেই সব কাহিনি।

১৯০২ সালে শেষবারের মতো লেনিনের সঙ্গে দেখা করে কথা বলে যখন তিনি আবার রাশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, লেনিন তাঁকে বলেন, সামনেই এক ঝোড়ো দিন আসছে। তোমাকে তার জন্য সমস্তরকম প্রস্তুতি সেরে ফেলতে হবে। ধরা পড়ে যেও না।

অবশ্যই কমরেড ইলিচ, আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব।

তোমার উপর আমার ভরসা আছে। তবুও বলছি। বিপদ সঙ্গে নিয়ে খুব ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে হবে তোমাকে।

নিশ্চয়ই। কিন্তু কী জানেন কমরেড, মুশকিল হচ্ছে মেনশেভিকদের নিয়ে। ওরা নিজেরা এখন কোনও অভ্যুত্থান চাইছে না। ফলে যারা চাইছে তাদের সঙ্গে শুধু ঝগড়া করছে তাই নয়, গোপন আন্দোলনের রীতিনীতি ভেঙে এমন আচরণ করছে যে—

সেইজন্যই তো আমার তোমাকে নিয়ে এত দুশ্চিন্তা। মিটিং-এর জায়গাগুলো সাবধানে ঠিক কোরো।

ওদিকে, এসআর-দের নিয়ে আবার উলটো। বাউমান বলেন, তারা আবার এত বেশি সাবধানী হতে চায় যে কাজই করা যায় না! ঠিকানা পালটে পালটে আমরা হয়রান!

সে যাই হোক, সবাইকে নিয়ে চলতে চেষ্টা করতে হবে। তবে মনে রেখো, আমাদের উপরেই মূল দায়িত্ব। শ্রমিকরা যদি আমাদের দলের রাজনীতিটা একবার অন্যদের থেকে আলাদা করে বুঝতে পারে, তখন আর অত অসুবিধা হবে না। জাপানের সঙ্গে একটা যুদ্ধ লাগতে যাচ্ছে। সেই সময়ে অভ্যুত্থানের জন্য একদল বাছাই করা লোক চাই। বেছে বেছে লোক নিও। রিপোর্ট দিও। সুযোগ বুঝে আবার চলে এসো। কাটিয়ে যেও কিছু দিন আমাদের সঙ্গে।

আসব, কমরেড উলিয়ানভ। বাই!

না, সেই সুযোগটা আর আসেনি কমরেড বাউমানের জীবনে। রাশিয়ায় ঢুকে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। অবশেষে ১৯০৫ সালে জাপানের সঙ্গে সত্যিই যুদ্ধ বাধল। আর সেই যুদ্ধে মহামহিম জারের সৈন্যদল তূরীয় তাচ্ছিল্য ও প্রবল ঔদ্ধত্যের সঙ্গে দুঃসাহসিকভাবে জাপানি সেনাদের পিঠ দেখাতে শুরু করে দিল। প্রমাদ গুনে জার তখন দেশের ভেতরে কিছু শাসন সংস্কার ঘটানোর হাবভাব করতে লাগল। জেল থেকে রাজবন্দিদের অনেককে মুক্তি দিয়ে দিল। সেই সময় বাউমানও মুক্তি পান। তাতে অবশ্য জনসাধারণের বিক্ষোভ প্রশমিত হল না।

রাশিয়ায় তখন শ্রমিকদের দ্রোহ ফেটে পড়ল, রাস্তায় রাস্তায় বিরাট বিরাট মিছিল, কারখানায় কারখানায় তখন মজদুর ধর্মঘটের উত্তাল তরঙ্গ। সেরকমই একটি ধর্মঘট পরিচালনার সময় এক গুপ্তঘাতক বিদ্রোহের সমর্থনে থাকার ভান করে ভিড়ের মধ্যে মিশে একেবারে সামনে এসে তাঁর মাথায় এক বিশাল লোহার রড দিয়ে আঘাত করে। রক্তের ধারার মধ্যে ভিজে বাউমান মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যান তিনি।

তাঁর মৃতদেহ কাঁধে তুলে নিয়ে শ্রমিকদের বিশাল মিছিল বেরোয়। সারা দিন ধরে তারা অসংখ্য রাস্তা পরিক্রমা করে। কবরস্থানে পৌঁছনোর পর তাঁর স্ত্রী ইরিনা (নামটা ঠিক বললাম তো?) সেখানে ভাষণ দেন। সামনে থাকা এক সহাস্য সাহসী নেতার হৃদ্স্পন্দন থেমে গেলেও লড়াই থামে না। সারা রাশিয়া জুড়ে বিপ্লবী আন্দোলনের ঝড় বইতে থাকে।

খবরটা রাশিয়ার বাইরে পৌঁছালে কমরেড লেনিন ৩ নভেম্বর ১৯০৫ তারিখে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে বলেন, “Today, November 3 (New Style), the news arrived by telegraph that N. E. Bauman, veterinary surgeon and member of the Russian Social-Democratic Labour Party, has been murdered in Moscow by the tsar’s soldiers. A demonstration was held at his graveside, at which the widow of the deceased, also a member of our Party, delivered a speech calling on the people to rise in arms.…”

বিবৃতির শেষ কথাগুলি ছিল এই রকম: “রাশিয়ার সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক সর্বহারাদের মধ্য থেকে উঠে আসা এই কমরেডের স্মৃতি অমর হয়ে থাকবে! বিপ্লবের বিজয়ের কালে আত্মাহুতি দেওয়া এই বিপ্লবীর স্মৃতি চিরকাল বেঁচে থাকবে! তাঁর শেষ যাত্রায় সশস্ত্র জনতার দেওয়া শ্রদ্ধার্ঘ্য থেকে শপথ ঘোষিত হোক, অভ্যুত্থানের বিজয় এবং অভিশপ্ত জারতন্ত্রের পতন হবেই!”

রাশিয়ার ভেতরে “প্রলেতারি” পত্রিকায় ৭ তারিখে এটা প্রকাশিত হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন (যদ্দিন ছিল) কি তাঁকে মনে রেখেছে?

প্রায় না।

প্রায় বললাম, কেন না, তিরিশের দশকে ষাটতম জন্মবর্ষে এবং ১৯৭৩ সালে জন্মশতবর্ষে সোভিয়েত রাষ্ট্র দুবার তাঁর নামে ডাকটিকিট বের করেছে। মস্কোয় তাঁর একটা সুন্দর মর্মর মূর্তিও স্থাপিত হয়েছিল। এছাড়া, সের্গেই দ্‌মিত্রিয়েভিচ এম্‌স্তিস্লাভস্কি নামক একজন লেখক ১৯৩৬ সালে রুশ ভাষায় বাউমানের উপর একখানি চমৎকার জীবনী-উপন্যাস লেখেন। ১৯৫৫ সালে এর ইংরেজি অনুবাদ Rook—Herald of Spring নামে বেরিয়ে ভারতে এলে অশোক গুহ এর একটা চমৎকার বাংলায়ন করেন, “রুক—বসন্তদূত” নামে। ১৯৬৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে একটা সিনেমাও হয় সেই কাহিনি অবলম্বনে। ব্যস, তারপর থেকে নিকোলাই বাউমান সম্পর্কে আর কোথাও কেউ উচ্চবাচ্য করেনি। নিরন্তর চর্চায় বাউমান থাকেননি। সেই বইটার আর পুনর্মুদ্রণ হয়নি। বাংলায় গুহর অনুবাদও নতুন করে আর বেরয়নি। রুশ বিপ্লবের পঞ্চাশ বছরের চর্চায় বাউমানের নাম কেউ স্মরণ করেছেন বলে শোনা যায়নি। শতবর্ষেও নয়। কেন, কে জানে!

অপ্রসঙ্গত বলি, অশোক গুহর বাংলা অনুবাদ বইটা বিগত সত্তরের দশকে পুরনো বইয়ের দোকান থেকে কিনে উপন্যাস হিসাবে পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। তখন আমি এটাকে গল্পই ভেবেছিলাম। অনেক পরে জেনেছি, এটা একটা সত্যকারের সাচ্চা কমিউনিস্টের জীবন-গাথা। আর দুঃখের কথা, তখন আমি ভালো বই পরিচিত সবাইকে পড়ানোয় বিশ্বাস করতাম বলে যে চেয়েছে তাকেই দিতে দিতে এক সময় কাকে দিয়েছি আর মনে রাখতে পারিনি। শেষ যিনি নিয়েছিলেন তিনি বোধহয় আমেরিকার বিশিষ্ট পুস্তক সংগ্রাহক স্যামুয়েল ক্লিমেন্সের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে …

অশোক গুহর অনুবাদ গ্রন্থটি কোনও সূত্রে কারও কাছে খুঁজে পেলে আবার সেটাকে মুদ্রণ যন্ত্রে ঢোকাতে হবে। কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতিই যে বিপ্লবীদের জন্য অনতিক্রম্য নয়, তা শেখার এবং শেখানোর একটা চমৎকার ম্যানুয়্যাল হিসাবে।

তাছাড়া, কমরেড নিকোলাই আরনেস্টোভিচ বাউমানের বিপ্লবী স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

ভারতেরও বামপন্থী মানস জমিনে।

কমরেড লেনিনের সেরকমই নির্দেশ!

____ 

ছবি:

  • নিকোলাই বাউমান
  • ১৯৫৫ সালের ইংরেজি অনুবাদে বাউমানের কাহিনি
  • বাউমানের মৃতদেহ নিয়ে শেষযাত্রার অংশ
  • মর্মর মূর্তি
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...