মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক প্রসঙ্গে একটি একুশ শতকীয় খসড়া

শঙ্খদীপ ভট্টাচার্য

 


লেখক প্রাবন্ধিক, গল্পকার, পেশায় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার

 

 

 

পৃথিবীর সকল প্রান্তে প্রত্যেক মানবিক স্পন্দনে আজ এক অনিশ্চয়তার অনুরণন। এই অনিশ্চয়তা দানা বাঁধছে অস্তিত্বকে ঘিরে। এক গভীর বিরক্তিকর টানাপোড়েনে বিচ্ছিন্নতা ও অবসাদ এই দুইই আমাদের মধ্যে ক্রমশ নিজের জায়গা পাকা করে চলেছে। ভনিতা না করে বলে ফেলা ভালো যে আমরা অর্থাৎ সবচেয়ে বুদ্ধিমান চিন্তাশীল প্রজাতি বেঁচে থাকার ক্ষেত্রটিকে প্রকৃতির হাতেই সঁপে দিয়েছি৷ আশৈশব ধর্মপ্রাণ, অধ্যাত্মবাদে প্রচণ্ড আস্থাশীল মানুষ থেকে শুরু করে বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণে দক্ষ মানুষদের ক্ষেত্রেও এখন একথাই খাটে। নানা মুনির নানা মত থাকলেও একটি জায়গায় আজ সকলেই একমত। প্রকৃতি বিপর্যয় হোক বা অর্থনৈতিক বৈষম্য একুশ শতকের গোড়ায় দাঁড়িয়ে মানুষ জোর গলায় বলছে যে এই অভূতপূর্ব প্রেক্ষাপট গড়ে তোলার একমেবাদ্বিতীয়ম কারিগর হল খোদ মানুষ।

আজকের এই পরিস্থিতি কোনও বায়ুভূত অতিলৌকিক ঘটনা নয়। এর ইতিহাস আছে, আছে বস্তুগত ভিত। স্বল্প পরিসরে এই রচনার বিভাগগুলিকে এক সুতোয় গেঁথে এক সার্বিক মূর্ত উপলব্ধিতে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছি মাত্র। এই রচনার প্রত্যেকটি বিভাগ বিস্তারিত আলোচনার দাবী রাখে সেকথা আগেই স্বীকার করে নেওয়া ভালো। পাঠক বিভ্রান্ত না হয়ে নতুন কোনও চিন্তার খোঁজ পেলেই আমার শ্রম সার্থক।

 

দর্শনের ক্রমবিবর্তন: প্রকৃতিবাদ থেকে খ্রিস্টীয় ঈশ্বরতত্ত্ব

সমগ্র বস্তুজগতের দ্বান্দ্বিক গতি মানবজ্ঞানে প্রতিফলিত হয় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। এই প্রতিফলন, তার বিকাশ এবং তা অতিক্রান্ত হয়ে পরবর্তী বিকাশের প্রক্রিয়াটি কখনই থেমে থাকে না। বাস্তব সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান এই প্রক্রিয়ায় গভীর থেকে গভীরতর হয়। বস্তুজগতের পরিবর্তনের যেমন শেষ বলে কিছু হয় না ঠিক তেমনি অনুশীলনের মাধ্যমে সত্য সম্পর্কে মানুষের বোধও শেষহীন। কোনও দর্শনই শূন্য থেকে সৃষ্টি হয় না। দেশকালের প্রেক্ষিতে যে বিশেষ পরিস্থিতি থেকে দর্শনের জন্ম বস্তুত দর্শনে সেই পরিস্থিতির ছাপ পড়ে। আদিলগ্নে মানুষের চিন্তাভাবনা প্রকৃতিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল। প্রকৃতিকে কেন্দ্রে রেখে যে দর্শন, তাকেই বলা হয় প্রকৃতিবাদী দর্শন। এই প্রকৃতিবাদ সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু ধারণা না থাকলেই নয় এবং তা বুঝতে গ্রিক দর্শনে আমাদের ফিরে যেতে হবে।

গ্রিক দার্শনিকেরা মূলত সৃষ্টির মূলতত্ত্বকে জানার জন্যই উন্মুখ ছিলেন। তাঁদের দার্শনিক চিন্তার মূল উপজীব্য ছিল বিশ্বসৃষ্টির উৎস কোথায় এবং এর একটি যথার্থ উত্তরের অনুসন্ধান এবং আবিষ্কারই ছিল তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। কোনও আদি সৃষ্টিকর্তার খোঁজ তাঁরা কখনওই করেননি। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আকাশ, সমুদ্র, নদী, গাছগাছালি, পাখপাখালি ভরা এই সমগ্র প্রকৃতিই প্রমাণ করে পৃথিবীর স্পন্দন, জীবনের গুরুত্ব। প্রাচীনতম দার্শনিক থালেস (৬২৮-৫৪৭ খ্রিস্টপূর্ব), অ্যানেকসিম্যান্ডার (৬১১-৫৪৬ খ্রিস্টপূর্ব) এশিয়া মাইনরের ইন্ডিয়ান উপকূলবর্তী সবচেয়ে উন্নত নতুন নগর-রাষ্ট্র মিলেটুসের মানুষ ছিলেন। অ্যানেকসিম্যান্ডার বলেছেন যে বস্তুর স্থূল সীমাবদ্ধ রূপ দেখতে পাওয়া যায় মূল উপাদান তার থেকে সূক্ষ্ম। মহাবিশ্ব একক এই প্রাথমিক বস্তুর ওপর ভিত্তি করেই বিবর্তিত। তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘অনন্ত’ (Unlimited) এবং ‘অনিশ্চিত’ (Undifferentiated), দ্বিতীয়ত অনন্ত গতি এবং তৃতীয়ত বিপরীতের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব অন্তহীন। এই মিলেশীয় দর্শনের বিপরীতে আরও একটি দর্শনের উন্মেষ ঘটে পিথাগোরাসের (৫৬২-৪৯৩ খ্রিস্টপূর্ব) হাত ধরে। তিনি বলেছেন যে, বস্তুজগত মূলতত্ত্ব নয় এবং তার সূক্ষ্ম রূপও নেই। মূলতত্ত্ব হল পদার্থের আকৃতি। এই প্রাথমিক বস্তুটি জোড়-বিজোড়, সসীম-অসীম, ভালো-মন্দ, আলো-অন্ধকার ইত্যাদি বিপরীতগুলির একটি ধারাবাহিক শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। এই বিপরীতগুলির দ্বন্দ্বের সমাধান হত পারস্পরিক মিলনে। বিপরীতের মিলন সংক্রান্ত এই হল পিথাগোরাসের তত্ত্ব। দর্শন পরম্পরায় এই ধরনের ঝোঁক ভাববাদকেই সূচিত করেছিল। গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক হেরাক্লিটাস (৫৩৫-৪৭৫ খ্রিস্টপূর্ব) এই মিলন-তত্ত্বের বিরুদ্ধে হাজির করলেন নিজের বিরোধী তত্ত্ব (doctrine of tension) অর্থাৎ চিরন্তন দ্বন্দ্ব ও গতি পরিবর্তনের তত্ত্ব। এর স্বপক্ষে তিনি বলেছেন, ‘একই নদীতে দুবার অবগাহন সম্ভব নয়, কেননা প্রতি মুহূর্তেই নতুন নতুন স্রোতের সৃষ্টি হচ্ছে। সৃষ্টির মধ্যেই থাকে ধ্বংসের বীজ নিহিত, লয় থেকেই হয় পুনঃসৃজন। গৌতম বুদ্ধের মতোই তিনি পরিবর্তনবাদ ও ক্ষণিকবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। হেরাক্লিটাস তাঁর এই পরিবর্তন দর্শন দ্বারা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের জনকে পরিণত হন। হেরাক্লিটাসের ‘চিরজীবন্ত আগুন’ (ever-living-fire) সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেনিন মন্তব্য করেছিলেন, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের সূত্রগুলির এক সুন্দর উন্মোচন।

পিথাগোরাসের এক শিষ্য পারমেনাইডিস (৫৪০[৪]-?) আপত্তি তুললেন হেরাক্লিটাসের দর্শন নিয়ে। তিনি বললেন, হেরাক্লিটাসের নিয়ত পরিবর্তনশীল অথচ চিরজীবন্ত আগুন একটি বিমূর্তন মাত্র। তর্ক তুলে তিনি বললেন, এই যে গতি, পরিবর্তন, দ্বন্দ্ব, দেহধারণ ও চলে যাওয়া— এই সবকিছুই হল ইন্দ্রিয়জ ভ্রান্তি। সৎ কখনও অসৎ হয় না, অসৎ থেকে সৎ সৃষ্টি হতে পারে না। তিনি বললেন, ব্রহ্ম (The one) হল গতিহীন, পরিবর্তনশীল৷ নিরবধি এবং দ্বন্দ্বমুক্ত। তাকে বুঝতে হবে যুক্তি দিয়ে, ইন্দ্রিয়ানুভব দিয়ে নয়। এই তত্ত্বে অধিবিদ্যার (metaphysics) আশ্রয় ছিল যার সাহায্যে পারমেনাইডিস পূর্ববর্তী দার্শনিকদের সরাসরি বিরোধিতা করলেন।

পিথাগোরাস এবং পারমেনাইডিসকে অনুসরণ করে প্লেটো পরবর্তীকালে এক ভাবের (theory of ideas) তত্ত্ব খাড়া করলেন। তিনি বললেন, বস্তু পৃথিবীর অস্তিত্ব অবশ্যই আছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা ভাবেরই অক্ষম অনুকরণ। প্রকৃত জ্ঞান থাকে ধারণার জগতে যা অপরিবর্তনীয় এবং স্বর্গীয়। ফলত এখানে দার্শনিক চিন্তা দুটি আলাদা আলাদা শিবিরে ভাগ হয়ে গেল। প্রকৃতির আগে যাঁরা আত্মাকে স্থান দিলেন তাঁরা হলেন ভাববাদী আর অন্যরা প্রকৃতিকে আগে রাখলেন, তাঁরা জায়গা নিলেন বস্তুবাদী শিবিরে। এখানে বলে রাখা ভালো যে দার্শনিক হিসেবে প্লেটোকেই বলা হয় ভাববাদের জনক।

সমাজ ও প্রকৃতির প্রতিষ্ঠিত এই ব্যবস্থাটি মেনে নিয়েই পরবর্তী দার্শনিকদের চিন্তাধারা গড়ে ওঠে নীতিবোধকে (ethics) ঘিরে। প্রাকৃতিক দর্শনের পরিসমাপ্তি ঘটে। ফলত সমস্ত চিন্তা অধিবিদ্যা-কেন্দ্রিক বুদ্ধিমার্গীয় আলোচনার দিকে ঘুরে যায়।

পারমেনেডীয় তত্ত্বের পর অধিবিদ্যার আবির্ভাব খ্রিস্টিয় তত্ত্বে। নিপীড়িত জনগণের কাছে পরম দয়ালু ও শক্তিমান এক দেবতার আবির্ভাবের খবর ছড়িয়ে পড়ে। তিনিই হবেন তাদের রক্ষাকর্তা। ধনীরা বুঝতে পারে খ্রিস্টধর্ম তাদের জন্য খুবই সুবিধাজনক। ঈশ্বরের চোখে সবাই সমান এবং কোনও দাস খারাপ হলে খ্রিস্টধর্ম তাকে ভালো করে দেয় এমন এক বিমূর্ত চিন্তার জন্ম হল। ঈশ্বর সর্বশক্তিমান৷ ঈশ্বরই বিরাজমান সৃষ্টির মূলতত্ত্বে৷ মানুষ হল ঈশ্বরের হাতে গড়া শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। ঈশ্বর বলেছেন, “And God said, Let us make man in our image, after our likeness; and let them have dominion over the fish of the sea, and over the fowl of the air, and over the earth, and over every creeping thing that creepeth the earth (Genesis, Chapter one)”। খ্রিস্টধর্মের এক আন্তর্জাতিক ভিত্তিভূমি গড়ে ওঠে।

১৮৫৯ সাল। দীর্ঘকাল ধরে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত ঈশ্বর পরিমণ্ডিত খ্রিস্টীয় সৃষ্টিতত্ত্বের বিরুদ্ধে পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডারে জায়গা করে নিল এক ইতিহাস কাঁপানো সম্পদ, অরিজিন অফ স্পিসিস। মানবজাতির ভাবনা ওলটপালট হয়ে গেল। প্রজাতির বিবর্তন, তার ইতিহাস, রূপান্তর এই সবকিছুর মূল উৎস হিসেবে চিহ্নিত হল প্রাকৃতিক নির্বাচন। প্রাকৃতিক নির্বাচনের যুগান্তকারী তত্ত্ব জীবন সৃষ্টির ক্ষমতা ঈশ্বরের হাত থেকে ফের প্রকৃতির হাতে তুলে দিল।

 

চার্লস ডারউইন: প্রাকৃতিক নির্বাচন ও শ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষ

প্রাকৃতিক নির্বাচন ঠিক কী অল্প কথায় বুঝে নেওয়া যাক৷ আমরা এখন জেনেছি পৃথিবীতে মানুষ আসার অনেক আগেই বেশিরভাগ বিচিত্র সব জীবের সৃষ্টি হয়েছে। এই সৃষ্টির মূলে মানুষের কোনও হাতই নেই অথচ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দেখা যাচ্ছে এক বিপুল প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য।

উত্তর খুঁজেছিলেন চার্লস ডারউইন ‘বিগল’ নামের জাহাজে পাঁচ বছরের দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায়। নিয়ত পরিবর্তনশীল পরিবেশে অভিযোজিত হলে তবেই প্রজাতি বেঁচে থাকবে। পরিবেশই ঠিক করে দেয় কোন প্রজাতি বেঁচে থাকবে এবং প্রজাতির কোন কোন বৈশিষ্ট্যগুলি টিকে থাকবে। এইভাবেই জীবের মধ্যে নতুন বৈশিষ্ট্যের আমদানি হয়, নতুন বৈশিষ্ট্যগুলি ক্রমেই নতুন প্রজাতির সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়ারই নাম দেন ডারউইন— প্রাকৃতিক নির্বাচন। মরুভূমির ক্যাকটাস, হিমাচলের আপেল এবং সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ এই প্রক্রিয়ারই ফসল।

প্রকৃতি কীভাবে নির্বাচন করে তার একটা উদাহরণ দেখা যেতে পারে। সাদা এবং কালো রঙের পীপার নামে এক ধরনের মথ ইংল্যান্ডে পাওয়া যেত। শিল্প বিপ্লবের পর শহরের পরিবেশে কালো ধোঁয়ার প্রভাবে গাছের গুঁড়ি কালো হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে গ্রামের কাছাকাছি জায়গাগুলিতে শিল্প দূষণ না থাকায় গাছের রং ছিল স্বাভাবিক। দেখা গেল শহরাঞ্চলে কালো মথ ৯৫ শতাংশ ও সাদা মথ ৫ শতাংশ। গ্রামের দিকে ঠিক বিপরীত। সাদা মথ ৯৫ শতাংশ, কালো ৫ শতাংশ। যে সকল পাখিদের খাদ্য ছিল ওইসব মথ, তারা গ্রাম শহর দু জায়গাতেই ছিল। শহরের কালো মথগুলিকে পাখিদের দেখতে অসুবিধে হয় তাই খাদ্য হিসেবে সাদা মথকেই তারা খুঁজে নিল। ফলত কালো মথ বেঁচে থাকার সুযোগ পায় এবং প্রজনন ক্রিয়া চলতে থাকে। শহরের মথের পপুলেশনে কালো মথের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৫ শতাংশ। বস্তুত শহরের কৃত্রিম কালো ধোঁয়া প্রাকৃতিক নির্বাচনকে সাহায্য করছে। অতএব দেখা গেল, এই দুই মথের মধ্যে রঙের বৈচিত্র্য তাদের বেঁচে থাকা এবং বিলুপ্তির কারণ। এই বৈচিত্র্য বা পরিব্যক্তি থাকার ফলে কিছু জীব অন্যান্য প্রাণীদের থেকে পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারে। বিবর্তনের এই প্রকল্পে মানবিক, অতিমানবিক কোনও শক্তির সরাসরি বা অদৃশ্য হস্তক্ষেপ নেই। বস্তুত প্রকৃতির ধারণায় মানুষ বা তার কার্যকলাপ একেবারেই এখানে অনুপস্থিত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল মানুষই একমাত্র প্রজাতি যে বিভিন্ন রকম প্রাকৃতিক পরিবেশে বিজেকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। মরুভূমি, সুন্দরবন এবং হিমাচলে মানুষের চলাচল আজও অব্যাহত। তার মানে দাঁড়াল এই যে মানুষ সকল পরিবেশের জন্যই প্রাকৃতিকভাবে নির্বাচিত হয়েছে। ডারউইনের নির্বাচন তত্ত্ব তো একথা বলে না, কারণ বিবর্তনের প্রেক্ষিতে মানুষ যেহেতু পশুপ্রজাতি ছাড়া আর কিছুই নয়, সে অন্যান্য প্রাণীদের মতো বিশেষ একটি পরিবেশেই অভিযোজিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু মানুষ অন্যান্য প্রাণীদের থেকে বিশেষ একটি জায়গায় আলাদা। প্রকৃতির নিয়মগুলি বুঝে মানুষ শ্রমের দ্বারা প্রকৃতিকে পরিবর্তন করতে পারে। উৎপাদনের মাধ্যমে সে চারপাশকে নিজের বাসযোগ্য করে তুলতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে কৃষি ও পশুপালনের নানাবিধ উপায়ে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত প্রাকৃতিক শক্তির বন্দোবস্ত করতে পারে। এইভাবে মানবসমাজে গবাদি পশু, মুরগি, কুকুর এই তিনটি প্রজাতিও প্রায় সর্বত্র নির্বাচিত হয়েছে। আজকের পৃথিবীতে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে ৬০ শতাংশ হল গবাদি পশু, ৩৬ শতাংশ মানুষ ও অন্যান্য সকল স্তন্যপায়ী প্রাণী ৪ শতাংশ। পৃথিবীর সমস্ত পাখির ৭০ শতাংশই হল মুরগি। একইভাবে গৃহপালিত কুকুর বা গরুর প্রজনন এমনভাবেই নিয়ন্ত্রিত যে মানুষের সাহায্য ছাড়া তাদের অস্তিত্বই অসম্ভব। তাদের বিবর্তন ও বিলুপ্তি সম্পূর্ণভাবে মানুষের ইচ্ছাধীন। নিজেদের প্রয়োজনে মানুষের এই সচেতন কর্মকাণ্ড পৃথিবীর চেহারা আজ অনেকটাই বদলে দিয়েছে। তথ্য বলছে পৃথিবীর সমস্ত জীবের মাত্র .০১ শতাংশ হল মানুষ অথচ সমস্ত জীবকূলের প্রেক্ষিতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সংখ্যার এই মানবপ্রজাতি সভ্যতার ৮০ শতাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং প্রায় ৫০ শতাংশ উদ্ভিদের বিলুপ্তির জন্য দায়ী।

দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা মানুষের বিচিত্র সব কর্মকাণ্ডের ভয়ঙ্করতম পরিণাম আজকের জলবায়ু পরিবর্তন। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ থেকে প্রতিদিন আরও স্পষ্ট  হয়ে উঠছে যে আগামী দশ বছরের মধ্যে উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন লাগামছাড়া হবে। বিলুপ্ত হবে অসংখ্য প্রজাতি, ভেঙে পড়বে খাদ্যব্যবস্থা। দেখা দেবে আচমকা বন্যা, খরা, সাইক্লোন, করোনার মতো বা তার চেয়ে অনেক গুণ মারাত্মক ভাইরাসের প্রকোপ। এই নতুন পৃথিবীর অন্যতম ভয়ঙ্কর পরিণাম হিসেবে আপাতত দেখা যাচ্ছে যে মায়েরা তাদের সন্তানদের বুকের দুধের সঙ্গে প্লাস্টিক খাইয়ে চলেছেন। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমনটি প্রথম।

ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী ঠিক এই সূত্রেই। ‘প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা’-য় তিনি লিখেছেন:

প্রকৃতির উপর মানবিক বিজয়গুলির জন্য আমদের বেশি আত্মতুষ্ট হওয়া উচিৎ নয়। কারণ এইরকম প্রতিটি বিজয়ের জন্যই প্রকৃতি আমাদের উপর প্রতিশোধ নেয়। এটা সত্যি যে প্রত্যেকটি বিজয়ই প্রথমে আমাদের ঈপ্সিত ফলের প্রাপ্তি ঘটায়, কিন্তু দ্বিতীয়ত ও তৃতীয়ত তার এমন সব সম্পূর্ণ ভিন্ন, অকল্পিতপূর্ব পরিণাম ঘটে প্রায়শই তা শুধু প্রথম পরিণামটিকে নাকচ করে দেয়।

এই সূত্র ধরেই ১৯৯২ সালে ব্যারি কমোনার (Barry Commoner) বলেছিলেন:

যদি পরিবেশ দূষিত এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা রুগ্ন হয়ে পড়ে, এই দুইয়ের কারণ যে ভাইরাস তা পাওয়া যাবে উৎপাদন ব্যবস্থায়।

পুঁজিবাদী এই উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে ক্রমশ প্রকট হয়ে ওঠা দ্বন্দ্বগুলিকে একপ্রকার অগ্রাহ্য কিংবা আড়াল করার জন্যই বলা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যই মানুষ দায়ী, সকল মানুষই দায়ী। কেতাবি নাম অ্যানথ্রোপসিন। বলা হচ্ছে এটা মনুষ্য-উদ্ভূত জলবায়ু পরিবর্তন (anthropogenic climate change)।

 

অ্যানথ্রোপসিন বনাম ক্যাপিটালোসিন: প্রকৃতি বিপর্যয়ের আঁতুড়ঘর

আইপিসিসির রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৭ সালে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ ছিল ইতিহাসের বিচারে সবচেয়ে বেশি। অতএব বিশ্ব গড় উষ্ণতাকে ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে ধরে রাখার জন্য বিশ্বের মোট সংরক্ষিত তেলের এক তৃতীয়াংশ, সংরক্ষিত গ্যাসের অর্ধেক এবং আশি শতাংশ সংরক্ষিত কয়লাকে ব্যবহারের আওতার বাইরে রাখতে হবে। এই উদোম সত্যিগুলোকে দেখে বুঝেই বিশ্বের তাবড় নেতা, শিল্পপতিরা সেমিনারের পর সেমিনার সাজিয়ে ক্রমশ বাস্তববিমুখ কদর্য সেমিনারজীবীতে পরিণত হয়েছেন। এত চটকদার গালভরা পদক্ষেপ এবং ভুরি ভুরি প্রতিশ্রুতির পরে পাঁচ শতাংশও কার্বন নিঃসরণ তারা কমাতে পারেনি। বরং দিনে  দিনে তা বেড়েই চলেছে।

বলা বাহুল্য, বাস্তুতান্ত্রিক ও সামাজিক কাঠামো ধ্বসে পড়লেও পুঁজিপতিরা সেখান থেকেও মুনাফার উৎস খুঁজে বার করার সমস্ত আয়োজন করবেন৷ এখানেই বুঝে নিতে হবে যে জলবায়ু পরিবর্তন সমগ্র মানবজাতির কাছে নয় একটি বিশেষ শ্রেণির বিশেষ কিছু মানুষের কাছে কেবলমাত্র ব্যবসার নতুন সুযোগ।

ক্ষমতাকে ঘিরে যে পরিকাঠামো তারই ছত্রছায়ায় লালিত এবং পালিত একজন ধনকুবের, একটিমাত্র কর্পোরেশন, সরকার বা কোনও একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সমগ্র মানবজাতির হয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আক্রান্ত সামাজিক পরিস্থিতির বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন থেকে তাদের এই সিদ্ধান্ত এবং পথ সমগ্র মানবজাতি এবং বাস্তুতান্ত্রিক কাঠামোটিকে গভীরতর ও সর্বোপরি অপরিবর্তনীয় বিপন্নতার দিকে ঠেলে দেবে৷ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিশিষ্ট জার্মান অধ্যাপক ও পরিবেশ চিন্তক এলমার অ্যাল্টভেটার (Elmar Altvater) সঠিক বলেছেন:

As long as energy overproduction is in the hands of the oligarchs and private accumulation is considered as inevitable as the laws of nature, an alternative social logic has only a slim chance of developing and spreading. Individual choices to behave more ecologically in terms of consumption and daily life, even though necessary, can stimulate only minor changes.

পরিবেশ বিপর্যয়কে হাতিয়ার করে পাহাড় প্রমাণ সম্পদ বাড়িয়ে তোলা সাধারণ মানুষের কাজ নয়। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম মেধার (artificial intelligence) অভাবনীয় উন্নতিতে ক্রমশ নড়বড়ে হয়ে উঠছে কাজের জায়গা। বহু মানুষের চাকরি ছিনিয়ে নিয়েছে অটোমেশন। এই বিপন্ন অস্তিত্বে চাকরি টিকিয়ে রাখতে সময়মতো অফিস পৌঁছতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে কার্বন নিঃসরণ আলবাত তারা করছেন। মানসিক অবসাদ কাটিয়ে তুলতে ঘন ঘন সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে মিশিয়েও দিচ্ছেন৷ সদিচ্ছা থাকলেও সময়ের অভাবে এবং আনুষঙ্গিক নানা প্রতিবন্ধকতায় পড়ে বৃক্ষরোপন করে কিছু খুচরো পুণ্যও হয়তো তারা কামাতে পারছেন না। এসবই সত্যি। কিন্তু এটাও ভাবতে হবে যে ১০ লক্ষ মানুষের সিগারেট ও গাড়ির মিলিত ধোঁয়া আর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এক মিনিটে নির্গত বিভিন্ন গ্রিনহাউস গ্যাস এবং ফ্লাই অ্যাশ কতটা তুলনীয়। গুগলের ডেটা সেন্টারগুলি চালাতে যে পরিমাণ শক্তির দরকার তা দিয়ে তিনটে সর্বাধুনিক নিউক্লিয়ার রিয়াক্টর পুরোদমে চালানো যায়৷ বর্তমানে নেটফ্লিক্স, আমাজন প্রাইম এবং জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার সমস্ত মালমশলা নিয়ে প্রস্তুত ফ্যান্টাস্টিক সিনেমা, অধ্যাত্মবাদ ও অলৌকিক কাণ্ডে ঠাসা হিন্দি বাংলা সিরিয়াল, অনলাইন গেমগুলি চালাতে কী পরিমাণ শক্তি এবং তার জন্য কতটা পরিমাণ ফসিল ফুয়েলের ব্যবহার হয় তা সাধারণ মানুষের এখন জানা দরকার। কয়েক হাজার গাছ লাগিয়ে একটি অরণ্য তৈরি করা মুখের কথা নয়। সেই অরণ্যে কাঙ্ক্ষিত বাস্তুতন্ত্র তৈরি হতে সময় লাগে বিস্তর। জল জঙ্গল জমিতে কব্জা করে রাখা সরকার এবং কর্পোরেটের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে সাধারণ মানুষ প্রকৃতির পুনর্বিন্যাসে এমন একটি গাছগাছালি পাখপাখালিতে ভরা অরণ্য তৈরি করে নেবে কেবলমাত্র সদিচ্ছার উপর ভর করে তা নেহাতই আকাশকুসুম কল্পনা। অন্যদিকে একটিমাত্র মানুষের সিদ্ধান্তে আমাজনে আগুন ধরিয়ে অসংখ্য পশুপাখিকে অবলীলায় মেরে ফেলে, স্থানীয় আদিবাসিন্দাদের ভূমিচ্যুত করে পৃথিবীর সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রটিকে বিপর্যস্ত করে ক্ষমতালোভী ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসনারো যে ঘৃণ্যতম নমুনা রাখলেন তা কিন্তু কঠোর বাস্তব। পৃথিবীর সমস্ত অরণ্য একত্রে যে পরিমাণ কার্বন শোষণ করে আমাজন একাই তার চার ভাগের এক ভাগ করতে সক্ষম। গত পাঁচ বছরে প্রায় এক লক্ষ বিচ্ছিন্ন অগ্নিকাণ্ড আমাজনের ভেতরে এখনও দাউ দাউ করে জ্বলছে। ব্রাজিলীয় কিছু বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ বলছে বলসনারোর এই কাজ ২০২১ থেকে ২০৩০-এর মধ্যে ১৩.১২ গিগাটন কার্বন নিঃসরণ করবে। সমগ্র আমেরিকার বার্ষিক কার্বন নিঃসরণের মোট পরিমাণের প্রায় তিনগুণ এই পরিমাণ। কার্বন নিঃসরণের তালিকায় প্রথম স্থানে থাকা চিনের মোট কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ২০১৭ সালে ছিল ৯.১ গিগাটন। বলসানারোর পলিসি একাই এক ধাক্কায় চিন এবং আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দিয়েছে৷

বিশিষ্ট মার্কিন সাংবাদিক ও লেখক ডেভিড ওয়ালেস ওয়েলস ( David Wallace-Wells) অ্যানথ্রোপসিন প্রসঙ্গে বলছেন:

…  It is a new era, defined on the wall chart of deep history of human intervention.

এলমার অ্যাল্টভেটার (Elmar Altvater) বলছেন:

Geologists have proclaimed a new age conditioned by measurable human made changes of the atmosphere(such as the increase of the average temperature), the hydrosphere (In the oxidation of the ocean), and the lithosphere (with new solid pollutants absorbed into the crust of earth). These scientists have termed the cumulative impact of  such changes ‘the anthropocene’.

ঠিক তার পরেই তিনি এই দাবিকে খণ্ডন করে বলছেন:

However, it might well be referred to as the capitalocene, due to the fact that the moving drivers of these planetary transformations are profitability and productivity in maximizing the valuation of capital.

শিল্পবিপ্লব শুরু হওয়ার পর থেকে ভূমণ্ডলের পরিবেশ একটি মুক্ত পয়ঃপ্রণালীর মতো ব্যবহৃত হয়ে চলেছে। প্রতিদিন বায়ুমণ্ডলে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে ৯০ মিলিয়ন টন বর্জ্য গ্যাস। একুশ শতক শেষ হওয়ার আগেই পৃথিবী থেকে প্রায় অর্ধেক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসবই সত্যি এবং এসবের জন্য মানুষই দায়ী। কিন্তু সমস্যা একটাই এই সাধারণীকরণে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসরানো, শীতাতপের ঠান্ডায় জীবন কাটানো পরিবেশ সম্বন্ধে উদাসীন ফেটিশ মধ্যবিত্ত ও সাইক্লোনে আক্রান্ত বাস্তুহারা প্রায় একই সারিতে পড়ে যায়। এরা সকলেই মানুষ এবং কোনও না কোনওভাবে পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য কমবেশি দায়ী— কিন্তু এই বিমূর্তায়ন বস্তুগত বিশ্লেষণের মূর্ত দিকটি আড়াল করে৷ আড়াল করে ব্যবহারমূল্যের জগৎ এবং বিনিময়মূল্যের জগতের ফারাকটিকে। আড়াল হয় প্রকৃতির সঙ্গে উৎপাদন এবং পুনরুৎপাদনের সম্পর্কটি। আড়াল হয়ে যায় পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থাটি। পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবিলা না করে উদাসীন থাকা ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হয়েও যথেচ্ছ কার্বন নিঃসরণের সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবেশকে গভীরতর সঙ্কটের দিকে ঠেলে দেওয়া মোটেই এক জিনিস নয়। এই সিদ্ধান্ত কারা নেয়, কেন নেয় তা বোঝা অসম্পূর্ণ থেকে যায় আজকের সময়কে অ্যানথ্রোপসিন ধরে নিয়ে সমগ্র মানবজাতিকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করালে।

পরিবেশ বিপর্যয়ের সঙ্কট এতটাই সুদূরপ্রসারী যে প্রায় পাঁচ কোটি বছর পর আবার পৃথিবীতে গণবিলুপ্তি শুরু হয়েছে। অবশিষ্ট ২০ শতাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রায় এক চতুর্থাংশ সম্ভবত আগামী দুশ বছরের মধ্যে বিলুপ্ত হবে। মানুষ নামের প্রজাতিটিও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বিলুপ্তির কারণটি এখানে আলাদা। প্রকৃতি নয়, পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সেই ব্যবস্থায় উৎসাহিত বিশ্বব্যপী এক ফেটিশ (fetish) দৃষ্টিভঙ্গি।

বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও চিন্তক অমিতাভ ঘোষ তাঁর বই “The great derangement”-এ তাই বলছেন:

Every family in the world cannot have two cars, a washing machine and a refrigerator— not because of technical or economic limitations but because humanity would asphyxiate in the process.

এই সঙ্কট থেকে পরিত্রাণের পথ কি আদৌ আছে? কী সেই পথ?

 

স্পিনোজা থেকে কার্ল মার্কস: ‘Happy the man that find a wisdom’

জীবনানন্দ দাশ ‘সূর্য রাত্রি নক্ষত্র’ কবিতাটি শেষ করেছেন ঠিক এইভাবে:

অধিক গভীরভাবে মানবজীবন ভালো হলে
অধিক নিবিড়ভাবে প্রকৃতিকে অনুভব
করা যায়। কিছু নয়— অন্তহীন ময়দান অন্ধকার রাত্রি নক্ষত্র;—
তারপর কেউ তাকে না চাইতে নবীন করুণ রৌদ্রে ভোর;—
অভাবে সমাজ নষ্ট না হলে মানুষ এই সবে
হয়ে যেত এক তিল অধিক বিভোর।

জীবনানন্দের মতোই শেলি, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ ছাড়াও আরও অনেক প্রকৃতিবেত্তা মহৎ শিল্পী নিবিড়ভাবে অনুভব করেছিলেন প্রকৃতিকে। চিন্তায় মননে প্রকৃতি তাঁদের সত্ত্বার সঙ্গে ছিল অবিচ্ছেদ্য। প্রকৃতি প্রাণকে ঘিরে বিস্ময়কর সব শিল্পসৃষ্টির কারিগর মানুষের চিন্তার সঙ্গে প্রকৃতির মধ্যেকার এই মধুর সম্পর্কটি নিয়ে চমৎকার ব্যাখ্যা করেছিলেন হল্যান্ড দেশের দার্শনিক বারুচ স্পিনোজা (১৬৩৩-১৬৭৭ খ্রিস্টাব্দ)। তাঁর এই ব্যাখ্যা আজকের প্রেক্ষিতে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

স্পিনোজার মতে ঈশ্বর হল প্রকৃতি এবং চিন্তার যোগফল৷ বিপরীতের মিলন। এই ঈশ্বর আধিবিদ্যক বা খ্রিস্টীয় ঈশ্বর নয়৷ ঈশ্বর এখানে সামগ্রিক অর্থে প্রকৃতিরই সংযোজন যেখানে চিন্তা তার সত্তারই একটি দিক। সামগ্রিকভাবে প্রকৃতিই একমাত্র তার গুণ হিসাবে চিন্তার অধিকারী (nature as a whole posseses thinking), একটি অত্যাবশ্যক ধর্ম। বিচ্ছিন্ন কোনও অংশের এই গুণটি নেই। যেমন একখণ্ড মাটির তাল চিন্তা করতে পারে না কিন্তু যা চিন্তা করতে পারে এমন কিছুর গঠনে মাটির তালটি যদি অংশ নেয় তাহলে বলা যায় মাটির তালটিও চিন্তা করতে সক্ষম। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও আসলে ব্যাপারটা হল এইরকম। প্রথমে মাটির তালটিকে গুঁড়ো করা হল৷ তারপর সেখানে একটি গাছের চারা লাগানো হল এবং পরে সেটিকে মানুষ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করল। অতএব এইভাবে মাটির তালের মধ্যে বস্তু সংবেদী শরীরের বস্তুতে রূপান্তরিত হল। এই ব্যাখ্যা ছিল দ্বান্দ্বিকতার এক উজ্জ্বল আভাস। পরবর্তীকালে স্পিনোজার এই দ্বান্দ্বিকতার মূল নির্যাসের বস্তুবাদী ভিত্তিতে বিকাশ ঘটিয়েছিলেন কার্ল মার্ক্স উনিশ শতকের গোড়ায়।

মানুষ বেঁচে থাকে প্রকৃতির জন্যই। গাছপালা পাখপাখালিতে ভরা প্রকৃতিই তার দেহ, এবং সে যদি বেঁচে থাকতে চায় তবে প্রকৃতির সঙ্গে অনবরত কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে বাধ্যতামূলক। তত্ত্বগত দিক দিয়ে দেখলে প্রকৃতির অজৈব শরীর হিসেবে গাছ, পাথর, আলো, বাতাস এই সবকিছুই আংশিকভাবে মানুষের জৈব শরীর এবং তার চেতনা গঠনে সাহায্য করে। তার কায়িক (physical) এবং আধ্যাত্মিক (spiritual) জীবন প্রকৃতির সঙ্গেই সংযুক্ত। এই কথার সহজ মানে দাঁড়ায় এই যে প্রকৃতি আসলে নিজের সঙ্গেই সংযুক্ত কারণ মানুষ প্রকৃতিরই অংশ। জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে মানুষ শ্রমের দ্বারা প্রকৃতির পরিবর্তন করে। এই শ্রম এমনই একটি প্রক্রিয়া যেখানে মানুষ এবং প্রকৃতি দুইই অংশ নিয়ে উৎপাদনের শরিক হয়। মানুষের উৎপাদন আবার অন্যান্য প্রাণিদের থেকে আলাদা। অন্যান্য প্রাণিরা কেবলমাত্র তাদের তাৎক্ষণিক চাহিদা বা তাদের সন্তানের চাহিদা পূরণ করতে গিয়েই উৎপাদন করে কিন্তু মানুষের উৎপাদন বিশ্বজনীন (Universal)। অন্যান্য সমস্ত প্রাকৃতিক চাহিদা থেকে স্বাধীন হয়েও মানুষ উৎপাদন করতে সক্ষম। মানুষ ছাড়া সমস্ত প্রাণি শুধু নিজেরই উৎপাদন করে কিন্তু মানুষ পুনরুৎপাদন করতে পারে সমগ্র প্রকৃতির। এইভাবে প্রকৃতিই হয়ে ওঠে তার কাজকর্মের একটা ইন্দ্রিয়, তাকে সে তার দৈহিক ইন্দ্রিয়গুলির সঙ্গে যুক্ত করে। এই পৃথিবী যেমন তার খাদ্য ভাণ্ডার তেমনি তার শ্রমের জন্য দরকারি উপকরণের ভাণ্ডার৷ এই পৃথিবীই তাকে ছোঁড়বার জন্য, পেষণের জন্য, চাপ তৈরির জন্য, কাটবার জন্য পাথর যোগায়। এক কথায় শ্রম এমনই এক প্রক্রিয়া যার দ্বারা মানুষ তার কাজকর্মের মধ্যে দিয়ে প্রকৃতি এবং তার নিজের মধ্যেকার বিপাকীয় সম্পর্কটি নিয়ন্ত্রণ করে৷ মানুষের শ্রমই হল তার জৈব শরীরের (organic body) সঙ্গে প্রকৃতির মানে তার অজৈব শরীরের (inorganic body) এক ধরনের বিপাকীয় আদানপ্রদান। প্রাকৃতিক-মানবিক সত্তা এবং শ্রমের গতিশীল আন্তঃসম্পর্কের বিশেষ ধারণাটি বোঝাতে গিয়ে মার্কস বলছেন:

Industry is the actual historical relationship of nature and therefore, of natural science to man. If, therefore, industry is conceived as the exoteric revelation of man’s essential powers, we also grin an understanding of the human essence of nature or the natural essence of man.

প্রকৃতির থেকে গ্রহণ এবং প্রকৃতির পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে প্রকৃতিতে প্রত্যর্পণের মাঝে যে ফাঁক, তাকে মার্ক্স ব্যাখ্যা করেছিলেন সামাজিক বিপাক ক্রিয়ার পদ্ধতির পারস্পরিক নির্ভরতার মাঝখানে এক অপূরণীয় ফাটল (irreparable rift) হিসেবে। পরে সমাজবিদ্যার অধ্যাপক জন বেলামি ফস্টার (John Bellamy Foster) একেই বলেন, ‘মেটাবলিক রিফট’। পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির চাহিদা অনুযায়ী পূরণ করবার সহজ বিপাকীয় সম্পর্কটি আজ বিপর্যস্ত। মুনাফার জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা চলে কিন্তু বিপর্যস্ত প্রকৃতির পুনরুদ্ধারে পুঁজিপতিরা উদাসীন। কারণ সেখানে মুনাফা নেই। বর্তমানে সবুজ প্রযুক্তি, জিও ইঞ্জিনিয়ারিং-এর নামে যে উদ্যোগ ও বিনিয়োগ দেখা যাচ্ছে তার নেপথ্যে নতুন বাজার ও মুনাফার উদ্দেশ্যই মজুত। এই অপ্রাকৃতিক অনুশীলনের ফলে কেবলমাত্র উৎপাদন প্রক্রিয়া, উৎপাদিত দ্রব্য থেকেই মানুষ বিযুক্ত (alienated) নয়, একে অন্যের থেকে এবং আখেরে প্রকৃতির থেকেই মানুষ দিনদিন  বিযুক্ত হয়ে পড়ছে। বেড়ে চলেছে বিচ্ছিন্নতা, অবসাদ। সকল বয়সের মানুষের মধ্যেই এই মানসিকতা ঢিমেতালে হলেও দানা বাঁধছে।

বর্তমান প্রাকৃতিক সঙ্কটের তীব্রতাকে মাথায় রেখে মানবকেন্দ্রিকতার উপরে প্রকৃতিকেন্দ্রিক চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এখনই। মানুষ এবং প্রকৃতির আন্তঃবিপাকীয় সম্পর্কটির পুনরুদ্ধারের মাধ্যমেই উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন সম্ভব। এই উৎপাদন সম্পর্কের বস্তুগত ভিত হবে মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যেকার স্বাভাবিক বিপাকীয় সম্পর্কটি। এই উৎপাদন সম্পর্কটিকে বাস্তবায়িত করতে প্রকৃতিমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক ছোট বড় সমস্ত আন্তর্জাতিক সামাজিক আন্দোলনগুলিকে একসঙ্গে নিয়ে সক্রিয়ভাবে আমাদের সবাইকে শরিক হতে হবে৷

দ্বন্দ্বতত্ত্ব মেনে প্রকৃতিকে তার আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া কখনওই যায় না কিন্তু মেরামত অবশ্যই সম্ভব। দ্রুত এই মেরামত না হলে মানুষের অস্তিত্ব অবিসংবাদিতভাবে বিপন্ন। এই বিপন্নতায় শুধু সর্বহারা নয়, সাবঅল্টার্ন, বুর্জোয়া, পেটিবুর্জোয়া, পুঁজিপতি, সকল শ্রেণির মানুষই সামিল৷ বুঝে নিতে হবে বিশুদ্ধ আলো, জল, বাতাস, জীবনধারণের জন্য দরকারি অণুজীব (microbiome) থেকে শুরু করে বনস্পতি, ডলফিন, কাঠবিড়ালি, মানুষ এই সবকিছুকে নিয়েই প্রকৃতি, আমাদের বেঁচে থাকা। এই প্রকৃতির স্বাভাবিক বিবর্তনের জন্য দরকারি অনুকূল পরিবেশটি তিলে তিলে গড়ে তুলতে না পারলে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কীসে?

প্রসঙ্গত বলি, ডারউইন মারা যাওয়ার পর একটা মজার ঘটনা ঘটে৷ মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে, তাঁর পরিচিত এক ছুতোর মিস্ত্রিকে তিনি বলেছিলেন, সাধারণ পালিশবিহীন ওক কাঠের একটি কফিন বানাতে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হাউস অফ কমনস-এর প্রতিনিধিদের অনুরোধ করেন ডারউইনকে ‘ওয়েস্ট মিনিস্টার অ্যাবে’-তে সমাধি দেওয়ার জন্য। মজার ব্যাপার, ডারউইন বাইবেলের ঈশ্বরতত্ত্বের বিরোধিতা করলেও বহু ঈশ্বরবিশ্বাসী লোক তাঁর শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিলেন। ক্যাপ্টেন ব্রিজ যে শোকগাথা সঙ্কলন করেন সেটি ‘বুক অফ প্রোভার্ব’-এর তৃতীয় অধ্যায় থেকে নেওয়া। সেখানে বলা আছে, জ্ঞানের ভাণ্ডার যার আয়ত্তে সেই মানুষ-ই সুখী (Happy the man that find a wisdom)।

হোমো স্যাপিয়েন্স কথার মানে বিচক্ষণ মানুষ (wise man)। আজ মানুষ বিচক্ষণতার কঠিনতম পরীক্ষার মুখোমুখি। প্রকৃতির সঙ্গে সুদীর্ঘকাল কথোপকথন করে সুখী ও সফল সকল মানুষের জ্ঞান ভাণ্ডারে প্রকৃতির স্থান কতটুকু তার খুঁটিনাটি হিসেব আপাতত জমা থাকল ভবিষ্যতের দিনগুলিতে।


তথ্যসূত্র:

  1. Barry Commoner, Making Peace with the Planet, (New York: New Press, 1992)
  2. The Capitalocene: Permanent Capitalist Counter-Revolution, Elmar Altvater and Birgit Mahnkopf, Socialist Register, 2019
  3. The Uninhabitable Earth, A Story of the Future, Elements of Chaos, David Wallace-Wells, Penguin Random House, UK, 2019
  4. Economic and Philosophic Manuscript of 1844, Karl Marx
  5. Dialectics of Nature, Friedrich Engels
  6. Capital, Volume-1, Karl Marx
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2681 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. খুবই জরুরী লেখা। এই আলোচনার পরিসর বাড়িয়ে চলা দরকার।

আপনার মতামত...