রেলের চাকায় ভীষণ ধার

অয়নেশ দাস

 


লেখক গদ্যকার, কর্মসূত্রে বিজ্ঞাপনজগতের সঙ্গে যুক্ত

 

 

 

 

রেলের চাকায় ভীষণ ধার। রুটিটা নামার আগেই গলাটা নেমে গেল

রাত ফুরিয়ে আসছিল। প্রথম ভোরের নরম আলো রেললাইনের বাঁক ধরে ক্রমে এগিয়ে চলছিল। ওরা একসার ওই লাইনের ওপরেই শুয়ে ছিল। নরম আলো ঘুমন্ত ওদের চিবুক স্পর্শ করে যাচ্ছিল। ওদের খেয়াল হওয়ার কথা না। ক্লান্ত; ভীষণ ক্লান্ত ওরা নিঃসাড়ে ঘুমাচ্ছিল। ওরা অভিবাসী শ্রমিক। কর্মহীন, সম্বলহীন, নিঃস্ব ওরা ঘরে ফিরছিল।

ওরা মহারাষ্ট্রের জালনা থেকে পায়ে হেঁটে ১৫৭ কিলোমিটার দূরে ভুসাওয়াল যাচ্ছিল। ভেবেছিল ভুসাওয়াল থেকে কোনওভাবে ওরা ৮৫০ কিলোমিটার দূরে ওদের বাড়ি মধ্যপ্রদেশের উমারিয়া ও শাহদলে পৌঁছতে পারবে। জালনা থেকে শুরু করে ৩৬ কিলোমিটার হেঁটে ওরা বদনাপুর স্টেশন ছাড়িয়ে কারনাডের দিকে খানিকটা এগিয়ে রাতে একটু বিশ্রামের জন্য থেমেছিল। সামান্য কিছু রুটি ছিল ওদের কাছে। সামান্য কিছু খেয়েছিল আর কিছু জমিয়ে রেখেছিল পরের দিনের জন্য। প্রচণ্ড পরিশ্রান্ত ছিল ওরা। চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছিল। লকডাউনের ভারতবর্ষ ছিল নিথর-নিস্পন্দ। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ রেলওয়ে নেটওয়ার্ক আজ বেশ কয়েকদিন ধরেই স্তব্ধ হয়ে আছে। শূন্য রেলট্র্যাকগুলো তাই খুব শীতল হয়ে ছিল। ওরা সেই রেলট্র্যাক আঁকড়েই শুয়ে পড়েছিল।

ক্লান্ত বিবর্ণ শরীরগুলো ঘুমের অতলে তলিয়ে গেছিল। সেই ঘুমের দেওয়াল শুধুমাত্র ঘরে ফেরার আকুল স্বপ্ন ছাড়া অন্যকিছুর ভেদ করার ক্ষমতা ছিল না। তাই ঠিক ভোর ৫টা ২২-এ তীব্র হুইসলটা যখন প্রাণপণ বেজেছিল তখনও ওদের ঘুম ভাঙেনি। কী অনায়াসে চিরঘুমে পাঠিয়ে দেওয়া হল ষোলটি প্রাণ।

ছোট্টবেলা থেকেই রেলগাড়ির প্রতি আমার ছিল অমোঘ টান। ঠিক অপু দুর্গার মতো। এখনও ওই ঝমাঝম শব্দটা আমাকে একছুটে টেনে ছোটবেলায় নিয়ে গিয়ে ফেলে। কিন্তু লকডাউনের ভারতবর্ষে মে মাসের ৮ তারিখের ভোরে যে মালগাড়িটা চেরলাপল্লী থেকে পেট্রোলিয়ামের কন্টেনার নিয়ে মনমাডের দিকে ছুটে যাচ্ছিল, তার চাকার তলায় যখন ওদের অর্ধভুক্ত, ক্লান্ত, ঘুমন্ত শরীর ছিন্নভিন্ন হচ্ছিল— ট্র্যাকের মধ্যে তীব্র হাওয়ার ঘুর্ণিতে বাঁচিয়ে রাখা রুটিগুলো যখন ইতস্তত উড়ছিল— সেই অসম্ভব দৃশ্যকল্পটি রেলগাড়ি নিয়ে আমার যাবতীয় রোমান্টিসিসমের গালে একটা ১০০০ কিলো ওজনের চড় কষিয়ে দিল।

হ্যাঁ, ঘটনাটির পর আমার জানতে ইচ্ছে হয়েছিল একটা রেলের চাকার ওজন কত হতে পারে। ভারতীয় রেল এ ব্যাপারে যে স্ট্যান্ডার্ড ওজনটি মেইনটেইন করে তা হল কমবেশি ১০০০ কিলো। ওই ওজনের একটি চাকা ৭০ কিমি/ঘন্টা গতির ভরবেগ নিয়ে প্রতিরক্ষাহীন একটি মানুষের গলা কি অসামান্য সূক্ষ্মতায় কেটে ফেলতে পারে! যে রেলের গতিমান চাকার দুলুনিতে আজও আমার ঘুম এসে যায়; সেদিন রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদী ব্যাবস্থাগুলিকে আমার মনে হল সার সার মানুষের গলার ওপর দিয়ে ছুটে যাওয়া এক একটি প্রকাণ্ড ভারী চাকা। রাতে আমার ঘুমের মধ্যে কারা যেন সার বেঁধে রেললাইন ধরে হেঁটে আসছিল। বারবার ঘুম ভেঙে গেলেও আমি স্পষ্ট শুনতে পারছিলাম তাদের গলা—

রেলের চাকায় কী ভীষণ ধার; রুটিটা নামার আগেই গলাটা নেমে গেল।

 

গলা কাটার কল

গলা কাটার কল তো ঝমাঝম করে শুধু আজকে চলছে না— চিরকালই চলে আসছে। মার্ক্স তো বলেইছিলেন— অসাম্যের শিকড় তো ইতিহাসেই ছড়িয়ে রয়েছে। এ তো আর আজকের ব্যাপার নয়; প্রজন্মের পর প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়ে চলেছে।

Men make their own history, but they do not make it as they please; they do not make it under self-selected circumstances, but under circumstances existing already, given and transmitted from the past. The tradition of all dead generations weighs like a nightmare on the brains of the living.

আর এই সূত্র ধরেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নতুন নতুন চেহারায় বিকশিত হয়েছে ও হবে। এই যেমন— গ্লোবালাইজেশন, নিও লিবারেলিজম ইত্যাদি গালভরা নাম হয় তাদের। আর এইভাবেই সমাজে অসাম্যের মাত্রা বিভিন্ন মাপে ও বিভিন্ন মানে বৃদ্ধি পেতে থাকে। সে সব পরিসংখ্যান দিয়ে অকারণ লেখাটিকে ভারী করতে চাই না। অক্সফ্যামের রিপোর্টেই যে কেউ সেই মাথা ঘুরে যাওয়া তথ্য পেয়ে যাবেন। তা ছাড়াও এই দেশের রাস্তায় যে কেউ একটু চোখ-কান খোলা রেখে হাঁটলেই সেটা বোঝা খুব একটা শক্ত হয় না। পুঁজির মুনাফা ও অকল্পনীয় অসাম্য— দুইই রকেটের গতিতে আকাশ স্পর্শ করে ফেলছে। এই যেমন দুদিন আগেই খবর পেলাম এই অর্থনৈতিক অধোগতির বাজারে মুকেশ আম্বানি অসামান্য ক্ষিপ্রতায় ফোর্বসের হিসাবে পৃথিবীর পঞ্চম ধনীশ্রেষ্ঠ হিসেবে উঠে পড়েছেন। দুর্দান্ত!

তাহলে আর নতুন করে কী বলার থাকতে পারে! গলা কাটার কল তো অসামান্য ক্ষিপ্রতার সঙ্গেই চলছে! তাতে আর নতুন করে চিন্তার কী আছে?

চিন্তার আছে। যখন বঞ্চিত মানুষের মনস্তত্ত্বেই অসাম্যের নির্মাণ বৈধতা পেতে শুরু করে তখন নতুন করে চিন্তার ব্যাপার আছে বৈকি। গলা কাটার কল ক্রমে আরও নির্মমতর হয়ে চলেছে এবং একই সঙ্গে জনমানসে এই নির্মমতার এক বৈধতার সম্মতিও আদায় করে নিচ্ছে।

 

অ্যান্টিলিয়ার ছাদ

যুগ যুগ ধরে যখন বিভিন্ন ভাবে অসাম্যের নির্মাণ হয় তখন মানুষ তাকে মেনে নেয় অথবা তার কাছে আত্মসমর্পণ করে। চিরকাল শুনে এসেছি— Hunger is the impetus of revolution. কিন্তু সর্বত্র তা প্রযোজ্য হতে দেখিনি। তেতাল্লিশের মন্বন্তরে লক্ষ লক্ষ বুভুক্ষু মানুষ একটু ভাতের ফ্যান ভিক্ষা করতে করতে পিঁপড়ের মতো রাস্তায় পড়ে মরছিল। কিন্তু কোথাও বড়সড় আকারে ধনীর কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল বলে শুনিনি। ফলে অসহায় আত্মসমর্পণ ছিল। কিন্তু বৃহত্তর জনমানসে এই নির্লজ্জ অসাম্যের বৈধতা ছিল কি?

অ্যান্টিলিয়ার উঁচু ছাদটা আমাদের মনশ্চক্ষে এমনই এক মোহময় উচ্চতার আবেশ তৈরি করে যে আমরা নীচটা দেখতে ভুলে যাই বা বলা ভালো ভুলতে শিখে যাই এবং শেষে অ্যান্টিলিয়ার উঁচু ছাদটাই নিঃশর্ত বৈধতা আদায় করে নেয়। আমরা মধ্যবিত্তরাই বৈধতার টিকিট নিয়ে এই দৌড়টা শুরু করি। ম্যাথিউ আর্নল্ড একবার বলেছিলেন— Our inequality materializes our upper class, vulgarizes our middle class, brutalizes our lower class. কিন্তু নীচের শ্রেণি; যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেও মধ্যবিত্তর মতো ক্রমশ সংক্রমিত হয়। এবং ধীরে ধীরে সেও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এই ভয়ঙ্কর অসাম্য নির্মাণের খেলায় একজন অংশীদার হয়ে ওঠে। যদিও এর ফলে সে আরও বেশি করেই রক্তাক্ত হয়। কিন্তু কীভাবে ঘটে এই বৈধতার নির্মাণ?

 

কোথায় গেল মৈত্রী ও সাম্য

অস্বীকার করার উপায় নেই যে উল্টোদিকে বিগত দুই শতাব্দী ধরে শুধু নয়, বস্তুত সভ্যতার আদিম লগ্ন থেকেই সাম্য ও মৈত্রীর ধারণা জনমানসে বেশ ভালোমতো জায়গা করে রেখেছিল। এবং সাম্য ও মৈত্রীর এই ধারণা কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকে সমাজের নৈতিক আধারের ওপর ভিত্তি করে। অমর্ত্য সেন যেমন বলেন—

We need to ask the moral questions: Do I have a right to be rich? And do I have a right to be content living in a world with so much poverty and inequality? These questions motivate us to view the issue of inequality as central to human living.

পুঁজিবাদ কোনও নৈতিকতার আধারকে গ্রাহ্য করে না। সে শুধু আবর্তিত হয় নিরন্তর মুনাফা বৃদ্ধির চক্রকে সামনে রেখে। যদিও এটা একসময় হয়তো তারই স্লোগান ছিল তবুও অবশ্যই সাম্যের ধারণা তার উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টির কলে বাধা দান করে। ফলে সে তো সাম্যের ধারণাকে চুরমার করতে চাইবেই। আবার অন্যদিকে মানুষের মধ্যে নিহিত নৈতিকতাও আকাশ থেকে পড়েনি। তাও এক ঐতিহাসিক অর্জন। ফলে অতি সহজেই সেই ধারণাকে সমাজ থেকে চাইলেই দূর করে দেওয়া যায় না। চমৎকার একটি উদাহরণ এখানে দেওয়া যেতে পারে:

প্রখ্যাত নৃতত্ববিদ মার্গারেট মিড-কে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, সভ্যতার প্রথম নিদর্শন হিসেবে তিনি কোন ব্যাপারটিকে চিহ্নিত করেন। মিডের মতে এটি ছিল প্রত্নসন্ধানে খুঁজে পাওয়া ১৫০০০ বছর আগের একটি জুড়ে যাওয়া মানুষের থাই-এর ভাঙা হাড়। তখন তাঁকে আবারও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কোনও শিকারের জন্য প্রস্তুত অস্ত্র বা কোনও ধর্মীয় অথবা শাসনতান্ত্রিক নিদর্শন নয় কেন? তখন মিড উত্তর করেছিলেন, কোনও মানুষের যখন ফিমারের হাড় ভেঙে যায় তখন তার পক্ষে আর চলে ফিরে বেড়ানো বা জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলি করা সম্ভব হয় না। সেই আদিম সময়ে তা তো মৃত্যুরই নামান্তর। অথচ এই হাড়টি জুড়ে গেছিল। তার মানে এই আদিম মানুষটি লম্বা সময় ধরে তার প্রয়োজনীয় যত্ন (Care) অন্যদের থেকেই পেয়েছিল। এই Care-ই হল মানবসভ্যতার আদিমতম সভ্য নিদর্শন।

সুতরাং সাম্য ও মৈত্রীর ধারণাকে একেবারে নস্যাৎ করে দেওয়া পুঁজিবাদের পক্ষেও কষ্টকর ছিল। সেইজন্য তাকে কেইন্সের দ্বারস্থও হতে হয়েছিল। জনকল্যাণরূপী রাষ্ট্রের ভেকও ধরতে হয়েছিল। কিন্তু এখন বোধহয় তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। তীক্ষ্ণতম অসাম্যকেও এখন বৈধ করে নেওয়া যাচ্ছে। এবং সেটা হচ্ছে সভ্যতার এই অসামান্য অর্জনটির ওপর চূড়ান্ত আক্রমণ নামিয়ে এনে।

 

সর্বাত্মক আক্রমণ

এই যে দুনিয়া জুড়ে চূড়ান্ত বিবমিষাময় অসাম্যের নির্মাণ তা পুঁজিবাদ শুধু একাই তৈরি করতে পারত না যদি না রাষ্ট্র তার চরম আগ্রাসী রূপ নিয়ে তার পাশে এসে দাঁড়াত। সমস্ত নৈতিকতার ধারণাকে ধ্বংস করে সম্পদের এই বীভৎস একমুখী কেন্দ্রীভবনের পাহারাদার হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছে সাধারণ মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের নির্মমতম ভূমিকা। রাষ্ট্র যখন তাকে এই গ্যারান্টি দিচ্ছে তখন পুঁজিবাদী সাম্যের ধারণাও আজ পুঁজিবাদ কর্তৃকই পরিত্যক্ত। নোম চমস্কির কথায়—

the rich and powerful, they don’t want a capitalist system. They want to be able to run to the ‘nanny state’ as soon as they’re in trouble, and get bailed out by the taxpayer.

আমেরিকার অসাম্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে চমস্কি দশটি তত্ত্বের কথা বলেছিলেন যেগুলিকে কাজে লাগিয়ে পুঁজিবাদ এই বীভৎস অসাম্যের নির্মাণ করে চলেছে। প্রাথমিকভাবে তিনি আমেরিকার কথা ভাবলেও সেগুলি ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশেও বোধহয় একইভাবে কার্যকরী হয়েছে। এবং তা রাষ্ট্রের সর্বাত্মক সাহায্য নিয়েই ঘটে চলেছে। তিনি বলেন—

Concentration of wealth yields concentration of power, particularly so as the cost of elections skyrockets, which forces the political parties even more deeply into the pockets of major corporations.

দশটি যে তত্ত্বের কথা চমস্কি উল্লেখ করেন তা হল—

  1. Reduce Democracy
  2. Shape Ideology
  3. Redesign the Economy
  4. Shift the Burden
  5. Attack Solidarity
  6. Run the Regulators
  7. Engineer Elections
  8. Keep the Rabble in Line
  9. Manufacture Consent
  10. Marginalize the Population

তাই এই যে বৈধতার নির্মাণ তা শুধু অর্থনৈতিক নিয়মেই ঘটে না। একই সঙ্গে সুপার স্ট্রাকচারে চরম আক্রমণ নামিয়ে এনে তা ঘটানো হয়। প্রতিনিয়ত সভ্যতার অর্জিত আদর্শগুলির মানে বদলে দেওয়া হয়। মুনাফা তৈরিতে বাধা হয়ে উঠতে পারে যে কোনও আদর্শকে প্রতিস্থাপিত করা হয়। নির্মমতাকে বৈধ করে তুলতে গেলে একক মানুষের বিচ্ছিন্নতা বাড়িয়ে তুলতে হয় তারপর সেই বিচ্ছিন্নতাকেই কাজে লাগানো হয়। এই যে গণতন্ত্রের পরিধিকে ক্রমশ সঙ্কুচিত করা, গণতন্ত্রের স্তম্ভগুলিকে ভেঙে দেওয়া, উন্মত্ত জনতাকে কাজে লাগানো, আদর্শকে ক্রমাগত প্রতিস্থাপিত করা, দায় ঝেড়ে ফেলা, জনসাধারণকে ক্রমশ প্রান্তিক করে দেওয়া— এগুলি দিয়ে আজকের ভারতকে কি চিনে নেওয়া যায় না? বোঝা যায় না কি দগদগে ঘায়ের মতো তার গায়ে এই বীভৎস নির্মাণ?

সেইজন্যই সবার আগে এগুলি দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে মানুষের একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতার চেতনাকে। যে সলিডারিটির কথা চমস্কি এখানে উল্লেখ করেছেন তা আসলে ঐ “Care” যা আমরা মার্গারেট মিডের বক্তব্য থেকে আগেই আলোচনা করেছি। এই সলিডারিটি যদি ভেঙে দেওয়া যায় তখন উপায়হীন একক বিচ্ছিন্ন মানুষ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থায় শুধু আত্মসমর্পণ-ই করে না, ধীরে ধীরে সে এই নির্মম ব্যবস্থাটির প্রতি নিজের অজান্তেই বৈধতার কনসেন্ট-ও দিতে শুরু করে। মানুষ নিজেদের মধ্যেই লড়তে শুরু করে ও অসাম্যের এই সুচতুর নির্মাণটিকে নিজের অন্তঃস্থলে গ্রহণ করে ফেলে। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে এই পৃথিবীটা আসলে “সার্ভাইভ্যাল অব দি ফিটেস্ট”।

 

সার্ভাইভ্যাল অব দি ফিটেস্ট

১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইন প্রকাশ করেছিলেন “অন দ্য অরিজিন অব স্পিসিস”। আর সেখান থেকেই পৃথিবী পরিচিত হয়েছিল তাঁর “প্রাকৃতিক নির্বাচন”-এর তত্ত্বের সঙ্গে। পুঁজিবাদ একটি অসাধারণ অস্ত্র পেয়ে গেল যখন হারবার্ট স্পেন্সার এই বিষয়টিকে অভিহিত করলেন “সার্ভাইভ্যাল অব দি ফিটেস্ট” হিসেবে। বস্তুত পুঁজিবাদী প্রতিযোগিতার মর্মবস্তুই এই। যখন সমস্ত সুযোগ কুক্ষিগত একটি বিশেষ শ্রেণির হাতে তখন আসলে সমস্ত রকম মানবতাবিরোধী অসাম্যের মর্মবস্তুও হয়ে দাঁড়ায় এই তত্ত্ব। কিন্তু শুধু এখানেই দাঁড়িয়ে থাকল না বিষয়টি।

আজকের অসাম্য যে রূপ নিয়েছে তাতে আমরা অবাক হয়ে দেখতে পাচ্ছি এক বিপুল জনসমষ্টিকে এমনকি এই চূড়ান্ত অনৈতিক প্রতিযোগিতাতেও অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। বরং তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। তাই কি এই নির্মমতম অসাম্য? সেই বিপন্ন জনসমষ্টি যেন অপ্রয়োজনীয় এক অংশ। অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে এ দেশে যা ঘটল তাতে আর কী-ই বা ধারণা হতে পারে!

ইউজিনিক্স। প্লেটোর আমলে স্পার্টায় এই তত্ত্বের পথ চলা শুরু হলেও উনবিংশ শতকেই এর আধুনিক অবতারনা ঘটে। ডারউইনের এক তুতো ভাই ফ্রান্সিস গাল্টন ডারউইনের তত্ত্বের সূত্র ধরেই তাঁর নতুন তত্ত্ব প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন— মানবপ্রজাতির উৎকর্ষ শিক্ষা বা সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং তার জিনের গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সুতরাং উৎকর্ষের পথ হল নিকৃষ্ট জিনগুলিকে সরিয়ে দিয়ে কেবলমাত্র উৎকৃষ্ট জিনকে জায়গা করে দেওয়া। উৎকৃষ্ট জিন কারা? নিশ্চয়ই সেই বিশেষ শ্রেণি যারা ইতিমধ্যেই সবরকম সুযোগ আত্মসাৎ করে সমাজে উচ্চতর জায়গায় অধিষ্ঠিত। এভাবেই “সায়েন্টিফিক রেসিজম”-এর ধারণা তৈরি হল। যা বিপুলভাবে পরিক্ষিত হয়েছিল হিটলারের নাৎসি জার্মানিতে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে এই তত্ত্ব সাময়িকভাবে পিছু হটলেও এখন তার করাল উপস্থিতি আবার আমরা টের পেতে শুরু করেছি। না হলে অসাম্যের রূপ আজ এত নির্মম হয়ে উঠতে পারে না। দুনিয়াব্যাপী ফ্যাসিবাদী শাসকদের ক্রমাগত উত্থান, পুঁজিবাদের এই নগ্ন নির্মম রূপ তারই চিহ্ন বহন করছে শুধুমাত্র জাতিগত জায়গা থেকে নয়, বেশি করে আজ শ্রেণিগত জায়গা থেকেও। বিগত ৫০ বছর ধরে পুঁজিবাদ অতিদক্ষিণপন্থার সঙ্গে হাত মিলিয়ে সারা পৃথিবীতেই শ্রমিক আন্দোলনকে ধ্বংস করে চলেছে। আর সাম্প্রতিক বর্তমানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তথা রোবোটিক্স প্রযুক্তির উদ্ভাবন মারফত পুঁজিবাদ এখন মানুষের শ্রমকেও প্রতিস্থাপিত করার প্রতিস্পর্ধা দেখাতে পারছে। তাই কি তার এই নগ্ন রূপ? তাই কি সাম্প্রতিক অসাম্যের এই ভয়াবহ চেহারা? আর চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা হারিয়ে আমরা তাকেই বৈধ করে নিচ্ছি? নাকি অবস্থাটা এরকম জায়গায় পৌঁছে যেতে পারে আমরা আন্দাজ করতে পারিনি। শুধু করোনা এসে ঢাকা দেওয়া সেই চাদরটি উড়িয়ে নিয়ে গেল?

 

শেষের কথা

এই ভাবে চলতে থাকলে অসাম্যের কোন স্তরে গিয়ে পৌঁছব! যেভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষকে অবধারিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন উপায়ে তা কোনও গণহত্যার থেকে কোনও অংশেই কম নয়। কোনও কোনও জায়গায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলির ক্ষেত্রে মৃত্যু শব্দটাও কম বলে মনে হয়। এই সব ক্ষেত্রে যেন সামূহিক অবলুপ্তি ঘটে চলেছে। মুনাফা চক্রের স্বাভাবিক নিয়মেই সমাজে ক্রমাগত অসাম্য তৈরি হতে থাকে। কিন্তু আজ অসাম্য যে স্তরে পৌঁছেছে তাতে বিপন্ন শ্রেণিগুলি শুধু বঞ্চনা আর শোষণের স্তরে আটকে নেই, সামূহিক অবলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে। পুঁজিবাদের এই যে ভয়াবহ রূপ তা যেন ইউজিনিক্সের ঐ ভয়ঙ্কর দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মিশে যাচ্ছে। হাড় হিম করা কতগুলো প্রশ্ন মাথার চারপাশে পাক খেয়ে যায়—

জালনা থেকে যে অভিবাসী শ্রমিকরা হেঁটে ফিরছিল তারাও কি এখন অপ্রয়োজনীয় অংশ?

দশ বছরের যে মেয়েটা খিদের জ্বালায় মরে গেল সেও কি এই অপ্রয়োজনীয় অংশ?

প্ল্যাটফর্মে অভুক্ত মৃতা মাকে জাগানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল যে শিশুটি সেও কি এই অপ্রয়োজনীয় অংশ?

এক এক করে আমরাও কি রূপান্তরিত হব ওই অপ্রয়োজনীয় অংশে?

অসাম্যের এই বাস্তব নির্মাণ সম্ভব হয়েছে মানুষের হাজার হাজার বছর ধরে কষ্টার্জিত নৈতিকতার ধারণাকে ধ্বংস করেই। আর তাকে ধ্বংস করতে পারলেই সম্ভব হয়ে ওঠে অসাম্যের বৈধতা নির্মাণ। আর তাই বোধহয় নৈতিকতার পুনর্নির্মাণের মধ্যেই নিহিত আছে সেই অসাম্য মুক্তির পথ। নৈতিক বলে বলীয়ান সেই সম্মিলিত প্রতিরোধের পথেই বেলাইন হবে অসাম্যের ভারী চাকা। উপড়ে ফেলতে পারব আমরা ঐ গলা কাটার নৃশংস ট্র্যাকগুলোকে। অনন্ত অন্ধকারের মধ্যে আপাতত এইটুকুই আশার আলো। সে রেলের চাকায় যতই ধার হোক না কেন!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2616 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

3 Comments

  1. খুব সুন্দর বিশ্লেষণ। চিন্তার খোরাক জোগায়।

আপনার মতামত...