অরমিতার দিনরাত্রি

চিরশ্রী দাশগুপ্ত

 


লেখক গদ্যকার, পেশায় শিক্ষক

 

 

 

 

সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়েছে অনেকক্ষণ, ঘড়ির কাঁটাও বিকেল ছুঁই ছুঁই। সোনালির ফোন আসার কথা… ভাবতে ভাবতেই বালিশের নিচে চেনা রিংটোন। ভালো লাগার বইটা পাশে মুড়ে রেখে অনিচ্ছের হাত গেল বালিশের অতল থেকে ফোনটা খুঁজে আনতে।

–…বল, কী হয়েছে?
–আরে এমনি। কী আর হবে। কী করছিলি রে?
–তেমন কিছু না, শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাসটা শেষ করছিলাম।
–…ও! বিরক্ত করলাম বল… এখন ছাড়ি তাহলে
–না রে, বল না। বিরক্ত হব কেন?
–ভালোই আছিস বল… বিয়ে-সংসার এসব তো আর করলি না। কী সুন্দর নিজের মতো আছিস। আমরা কাজ করতে করতে হিমসিম খেয়ে গেলাম, আর তুই শরদিন্দু পড়ছিস।

এরপর আরও কিছুক্ষণ সোনালির আক্ষেপমেশানো মন্তব্য শোনার পর একসময় নিজে থেকেই নেটওয়ার্ক ডিসকানেক্ট হয়ে বাঁচিয়ে দেয়।

 

মাঝশ্রাবণের গুমোট আকাশ নেমে এল ঘরে। এরপর আর শত চেষ্টাতেও মন বসে না বইয়ের পাতায়। ঘর লাগোয়া বারান্দায় এসে বোঝা গেল, মেঘটা আসলে মনেই জমেছে, বাইরে নয়। লকডাউনের বিকেল গড়িয়ে একসময় সন্ধ্যা নামে।  চায়ের সরঞ্জাম সাজিয়ে টেবিলে এসে বসতেই ছোটমার ফোন। মা-বাবা চলে যাওয়ার পর এই ছোটমাই আগলে রেখেছিল।

–… কী রে, কী করলি আজ সারাদিন? রান্নাবান্না কিছু করলি নাকি ম্যাগি খেয়েই কাটিয়ে দিলি? রান্নার মাসির সঙ্গে কথা হয়েছে? কবে থেকে আসতে পারবে বলে মনে হয় রে?

একটাও উত্তর দিয়ে ওঠার আগেই এত্তগুলো প্রশ্ন। এই হল ছোটমা…।

এখন তো না হয় ওয়ার্ক ফ্রম হোম চলছে কিন্তু কতদিন হয়েছে, অফিস আওয়ারে ফোন করেই জিজ্ঞেস করবে, ‘… আজ মাসি কী রান্না করল?’

–জানি না তো, আমি তো সকালেই ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে এসেছি। কিছু একটা নিশ্চয়ই করে রাখবে।
–সেকি! বলে আসিসনি কেন কিছু? কী যে করিস না তোরা? তোদের এইসব সৃষ্টিছাড়া কাজ আমি কিছুই বুঝি না।

এরপর আরও কিছু প্রাসঙ্গিক-অতি প্রাসঙ্গিক আলোচনা সেরে তবে ফোন রাখবে। প্রথম প্রথম বিব্রত লাগলেও এখন সামলে গেছে সবটাই।

 

হোয়াটসঅ্যাপ নোটিফিকেশন, ‘ফ্রি আছিস? কল করবি একটু? কথা আছে।’

ভিডিও কল করতেই ওপাশ থেকে হাউমাউ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল উসকোখুসকো চুল আর চোখের নিচে কালি পড়া পারমিতা… ‘আমি আর বাঁচব না রে। ও আমাকে ঠিক মেরে ফেলবে। আজও মেরেছে। এই দ্যাখ… বিকেলে এমনভাবে ডানহাতটা মুচড়ে দিয়েছে যে বালাটাই বেঁকে গিয়ে হাতে চেপে বসেছে। পরশু থেকে ফোনে ব্যাল্যান্সও শেষ। কাউকে কল করতেও পারছি না। কিছুতেই রিচার্জ করেও দিচ্ছে না। বাড়ি থেকে মা-ভাইয়ের ফোন এলেই সন্দীপটা কেমন যেন অন্য মানুষ হয়ে যায়, আর পারছি না রে। কোথায় যাব, কী করব, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। যেভাবেই হোক, আমাকে আর আমার বাচ্চাটাকে বাঁচা প্লিজ। সারাদিন শুনছি, বাবা-মা কিছু শেখায়নি। বারান্দায় দাঁড়ালে বলে, অন্য পুরুষকে দেখার জন্য দাঁড়াই। মায়ের ফোন এলেই বলে, এত মেয়ের খোঁজ নেওয়ার কী আছে? আমার তো শ্বাস নেওয়ারও অনুমতির প্রয়োজন হয়।’

একটানে এতগুলো কথা বলে দম নেওয়ার জন্য থামল পারমিতা… পাশে বিছানায় তিনমাসের পুপুর অসহায় কান্না।

–…সন্দীপ এখন কোথায়?
–কোথায় আবার? লকডাউন হোক বা কারফিউ, সন্ধে হলেই তো বেরনো চাই।

আসলেই তাই। বেশিরভাগ পুরুষই দিনের খানিকটা সময় বাড়ির বাইরে বেরিয়ে অন্য পুরুষদের সঙ্গে কাটিয়ে আসাটাকে কর্তব্য বলে মনে করে। অধিকার বলেও যে মনে করে না, তা নয়। সমাজ আমাদের এভাবে ভাবতে শেখায়। সন্দীপও তো তাই। মুশকিল হল, সে এখন ঘরের ভিতর আটকা পড়ে গেছে। এভাবে বাড়িতে বসে থাকা যায় কাঁহাতক? আর যেটুকু সময় থাকে, সেখানেও পৌরুষের আধিপত্য কায়েমের সেই বস্তাপচা পুরনো অভ্যেস।

 

অরুণাভদার সঙ্গে দিদির ঝামেলার জ্বলন্ত দিনগুলো মনে পড়ে গেল… দিদির রিপিটেড অনুরোধ কোনওদিন কানে তুলতেই চায়নি শিক্ষিত-কর্পোরেট অরুণাভদা। উল্টে বারবার নিজের বিয়ে করা বউয়ের শরীর, মন— সবকিছুর উপর সম্পূর্ণ অধিকার জাহির করেছে। উচ্চশিক্ষিত অরুণাভদার মুখে এ কথা শুনে বারবার শিউরে উঠেছে দিদি, পাল্টা যুক্তি দিলেও লাভ হত না। প্রতি রাতে ধর্ষিত হতে হত, এমনকী সেইসব দিনগুলোতেও। একসময় অরুণাভদা ঘুমিয়ে পড়ত, ঘুমিয়ে পড়ত দিদিও ক্লান্ত শরীরে, শ্রান্ত মনে। শরীরই জেগে থাকতে সায় দিত না, অবসন্ন হয়ে আসত, নিজের অজান্তেই চোখ বুজে আসত। দিদি বলেছিল, মনে হত ‘শত্রু’র সঙ্গে ঘুমোই। প্রতিদিন ঘুম ভাঙত একটা গা-ঘিনঘিনে অনুভব নিয়ে। অথচ কিচ্ছু করার থাকত না। এক সময়ে ধর্ষিত হওয়াটাই অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। শরীর-মন সায় দিত না, তাও সেটাই মেনে নিতে হত।

এটাই নির্মম সত্যি… উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত সব শ্রেণির পরিণীতারাই এরকম রোজ ঘুমোয়। তাদের কথা কিন্তু ভাবে না কোর্ট। কারণ স্বামীর সঙ্গে ঘুমোনোটাই তো ভারতীয় নারীর স্বাভাবিক কর্তব্য। সইতে সইতে একদিন দিদি ডিভোর্সের মামলা করে বসে, স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে। সমাজ-আইন কেউ পাশে নেই জেনেও সাহস করে মামলাটা করেছিল দিদি। ঘরে-বাইরে প্রায় প্রতিক্ষেত্রেই দিদিকে শুনতে হয়েছিল অনন্ত ‘মানিয়ে নেওয়ার’ উপদেশ। ‘…আরে বাবা! কী এমন চাকরি করিস যে এত ফড়ফড়ানি! বরকে একটু সময় দিবি না! ছেলেটা তো তেতে-পুড়ে আসে। নিজের কাজটাই বড় হল! সে-ই বা এ সব মেনে নেবে কেন!’ মুখে আগল দেয়নি কোনও পক্ষের সমালোচকই। চলছিল বহির্মুখী মেয়ের ভুল খোঁজা।

এ তো গেল ডিভোর্সি… সেপারেটেড পরিণীতার কথা। আর অবিবাহিত মেয়ে যদি হয়, তা হলে সমাজের লোকেরা অন্য অস্ত্র হাতে পায়।

আমি অরমিতা। অবিবাহিত থেকেই সন্তান দত্তক নিতে চেয়েছিলাম। একরকম ঢি ঢি পড়ে গেল সর্বত্র। গায়ে পড়ে গেল ‘অতি বিপ্লবী’র তকমা। অরুণাভদাই বলেছিল দিদিকে… ‘স্বদেশি আমল হলে তোমার বিপ্লবী বোন তো স্বদেশি আন্দোলনেও নেমে পড়ত।’

বুঝেছিলাম কোথায় যেন অরুণাভদাদের পুরুষতন্ত্রের অহংয়ে ধাক্কা লেগেছিল। আর সেখান থেকেই চেষ্টা একলা মেয়েটাকে হেয় করার।

 

পারমিতাকে শান্ত করে টিভি অন করতেই চ্যানেল যুদ্ধে চোখ আটকে গেল… ১৫ মে, বিশ্ব পরিবার দিবসের আগে সমাজতত্ত্ববিদরা বলছেন, ‘লকডাউনে মানুষ পরিবারকে কাছে পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই পাওয়া যে মধুর হচ্ছে, সেটা সর্বক্ষেত্রে বলা যাচ্ছে না। কারণ সময়টা ভয়ের, প্রতিকূলতার। লকডাউনের ফলে গার্হস্থ্য হিংসার ঘটনা বাড়ার কথা ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে। এখন তো পরিবারের সব সদস্য একে অপরের সঙ্গে অনেকটা বেশি সময় কাটাতে পারছেন। ভাল-মন্দ ভাগ করে নেওয়ার অফুরান সুযোগ রয়েছে। তা হলে সমস্যা কোথায়? লকডাউন কিন্তু পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য হয়নি। এটার জন্য আগাম পরিকল্পনাও ছিল না। অর্থাৎ লোকে বাড়িতে থাকতে বাধ্য হলেন। এটা লকডাউনের উপরি পাওনা। কিন্তু সেই উপরি পাওনা সকলের জন্য লাভজনক হচ্ছে কি না, তা তলিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সমাজতত্ত্ববিদেরা। শহরের নাগরিক জীবনের পরিসরটা খুবই কম। প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিত্ব প্রতি মুহূর্তে খণ্ডিত হয়ে অসহিষ্ণুতা তৈরি করছে। কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার জেরে হতাশ হয়ে পড়েছেন অনেকে। স্ত্রী ছাড়া কারও কাছে হতাশা প্রকাশের জায়গা পাচ্ছেন না তাঁরা। আবার নেশা করতে না-পেরে স্ত্রী-ছেলেমেয়েকে মারধর করার ঘটনাও ঘটছে।’

হতাশা প্রকাশের কী অসাধারণ উপায়… অরুণাভদা-সন্দীপরাও বুঝি এই হতাশারই শিকার!

টিভি বন্ধ করে বারান্দায় সরে এলেও কানে বাজছে মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সনের স্পষ্ট কথাগুলো, যতক্ষণ সকলের সঙ্গে থাকা হচ্ছে, সেই সময়টা পরিবারের সঙ্গে ‘কোয়ালিটি টাইম’ হওয়াই বাঞ্ছনীয়। আর দাম্পত্যে কোয়ালিটি টাইম যদি সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা হয়, তাতে পরিবারের বন্ধন বাড়বে না। উল্টে মানুষ হাঁসফাঁস করবেন মুক্তির জন্য।

 

আজ আর উল্টোদিকের বস্তি থেকে ভেসে আসছে না পরিচিত গালিগালাজ-চিৎকার আর কান্না। অস্বাভাবিকরকম চুপচাপ সবকিছু কালকের পর থেকেই। হয়তো বড়সড় ঝড়ের পূর্বাভাস কিন্তু কালকের পর অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগছে, অন্তত মিতাদির মেয়ের বিয়েটা আটকানো গ্যাছে। সকালে মেয়েটাকে হোমে পাঠিয়ে শান্তি। ওদেরও দোষ দেওয়া যায় না পুরোটা। আজ চারমাস ধরে লাগাতার লকডাউন আর কাজ হারানোর অনিশ্চয়তায় ভুগে ভুগে মিতাদিরা এমন ভাবনাই ভাবছে। ছেলেটা কেরলে টাওয়ারের কাজ করে। আমাদের সমাজে প্রবাসে কাজ করা পাত্রের কদর বেশি। আর লকডাউনের জেরে বেশি লোকজন ডেকে আপ্যায়নের ঝুটঝামেলা নেই। মেয়েটার স্কুলে যাওয়া তো বন্ধ আর এই সুযোগে এইটে পড়া মেয়েটাকে সুপাত্রে বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে চেয়েছিল বাড়ির লোক। ভাগ্যিস মেয়েটা বুদ্ধি করে পাশের বাড়ির কাকিমার মোবাইল থেকে ফোনটা করেছিল… তারপরেও বাকি ছিল। অতগুলো জোরাজুরি আর ইচ্ছের মুখের উপরে দাঁড়িয়ে ‘না’ বলে দেওয়া খুব একটা সহজ ছিল না ওই তেরো বছরের জন্য। কিন্তু মেয়েটা পেরেছে, রুখে দাঁড়িয়েছে ভিনরাজ্যের টাওয়ারে কাজ করা সুপাত্রকে ফিরিয়ে, নিজের বিয়ে ভেঙে দিয়ে।

 

পারমিতার মোবাইল নম্বরে রিচার্জটা পাঠিয়ে অ্যাডভোকেট বসুর সঙ্গে কথা বলেই সন্দীপের নম্বরটা ডায়াল করলাম… অরুণাভদার শত অত্যাচারেও সেদিনের রুখে না দাঁড়ানোর, দিদির পাশে দাঁড়িয়ে না বলা ঝরঝরে কথাগুলো আজ সন্দীপকে হতভম্ব করে দিল, বুঝতে পারলাম। আর বুঝলাম, জিতে যাচ্ছে পারমিতা-অরমিতা-পরিণীতারা। নিজেকে প্রমাণ করে বুঝিয়ে দিচ্ছে, বিয়ে করাটাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। একা থাকতে গেলে যে অন্তর্শক্তি প্রয়োজন, সেটা তাদের আছে। এত বছরের সাজানো-গোছানো মিথ্যে পৌরুষকে ব্যাকসিটে পাঠিয়ে যে কোনও সময় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে তারাও পুরুষতন্ত্রের বাঁধা গৎকে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2616 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

আপনার মতামত...