“শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল”: নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ প্রসঙ্গে

দেবাদিত্য ভট্টাচার্য

 


লেখক কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির অধ্যাপক, গবেষক ও সম্পাদক। বর্তমানে ওনার গবেষণার বিষয় ভারতবর্ষে উচ্চশিক্ষার ইতিহাস, বিবর্তন এবং অর্থনীতি।

 

 

 

সম্প্রতি, ২৯ জুলাই ২০২০, মহাসমারোহে নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি উন্মোচন করা হয়। কিংবা বলা ভালো সেটি মন্ত্রীসভার দ্বারা অনুমোদিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে মানুষের কাছে তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়। প্রবন্ধের শুরুতেই এই তথ্যের বিবৃতিটুকুও সত্য বলে মেনে নেওয়ার কোনও কারণ নেই— সে প্রসঙ্গে শীঘ্রই আসছি।

স্বাভাবিকভাবেই, তথাকথিত এই নীতি-উন্মোচনের পর থেকেই বিরোধী মহলে ক্ষীণস্বরে কিছু প্রশ্ন উঠেছে: হঠাৎ এই অতিমারির তুঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার কেন বিনা-আলোচনায় সংসদকে এড়িয়ে এই শিক্ষানীতি সরাসরি পাশ করে দিল? এতে কি সরকারের কোনও অন্য অভিসন্ধির গন্ধ পাওয়া যেতে পারে? প্রশ্নগুলি যে অবান্তর তা নয়, তবে ইতিহাস থেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন বটেই। এই নীতির খসড়া মন্ত্রীসভাতেও পৌঁছনোর আগেই যে বেশ কিছু নতুন সংস্থা (যেমন ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন ইত্যাদি) স্থাপন হয়ে গিয়েছিল— যার নাম প্রথমবার নীতিকাঠামোর প্রেক্ষিতেই এসেছে— সে বিষয়ে বিরোধীপক্ষ এতদিন উদাসীন ছিলেন। বেআইনিভাবে একটি নীতি-বৃত্তের কিছু আভ্যন্তরীণ অংশকে তার মূলরূপ-উদ্ঘাটনের আগেই যে বাস্তবায়িত করা হয়ে গিয়েছিল, তার থেকেই বোঝা যায় যে সরকার কোনওদিনই এটিকে সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আনার পরিকল্পনা রাখেনি। ফলত, এই শিক্ষানীতির পূর্ব ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেই এর উদ্দেশ্য ও উদ্ভবকে বোঝা সম্ভব।

 

নীতির রাজনীতি

২০১৪ সালে প্রথম মোদি সরকারের নির্বাচনী-প্রচারেই নতুন শিক্ষানীতির প্রতিশ্রুতি ছিল। ক্ষমতায় আসার পরেই ২০১৫ সালে, সেই উদ্দেশ্যে একটি কমিটি তৈরি হয় বর্তমানে প্রয়াত টি এস আর সুব্রহ্মনিয়াম-এর নেতৃত্বে। ২০১৬ সালে এই সুব্রহ্মনিয়াম কমিটি নতুন শিক্ষানীতির একটি আদল সরকারের হাতে তুলে দেওয়ায়, রাজনৈতিক মহলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাতে খুব একটা আমল দেননি। বরং এক বছরের মধ্যেই সরকার থেকে নীতি-নির্মাণের উদ্দেশ্যে আরও একটি কমিটি গঠন করা হয়— এবার বিশিষ্ট মহাকাশ-বৈজ্ঞানিক কে কস্তুরিরঙ্গন-এর সভাপতিত্বে। প্রায় দেড় বছর সময় নিয়ে এই দ্বিতীয় কমিটি একটি সুবৃহৎ রিপোর্ট তৈরি করে— এবং ডিসেম্বর ২০১৮-য় তৎকালীন মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর-এর কাছে পেশ করেন। লোকসভা নির্বাচনের তখন আর মাস তিনেক বাকি, এবং কমিটির সুপারিশের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থার আদ্যোপান্ত পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছিল। ভোটের মুখে এরকম গুরুতর নৈতিক সিদ্ধান্ত নিলে জনরোষের মুখে পড়তে হতে পারে এবং নির্বাচনী সমীকরণগুলি পালটে যেতে পারে ভেবে সরকার রিপোর্টটি জনসমক্ষে আনতে দেয় না; একেই নোটবন্দি ও জিএসটি নিয়ে সরকার তখন জেরবার।

শিক্ষাব্যবস্থা-সংস্কারের প্রশ্ন ক্রমশই ধামাচাপা পড়ে, ভোটের প্রচারের অবয়ব তৈরি করল বালাকোটের যুদ্ধ-হুঙ্কার। ২০১৯-এর মে মাসে মোদির দ্বিতীয় ইনিংস শুরু হওয়ার সাত দিনের মধ্যে কস্তুরিরঙ্গন কমিটির ৪৮৪ পাতার রিপোর্ট জনসাধারণের সামনে আনা হয়। সঙ্গে দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়। প্রায় পাঁচশো পৃষ্ঠার একটি কম্পিউটার-ফাইল যে বেশিরভাগ মানুষই পুঙ্খানুপুঙ্খ পড়ে জবাব দেওয়ার উপায় রাখে না সে কথা সরকার ভালোই বোঝে; তথাপি এই গণপ্রচারের ছলনাটির একটা প্রতীকী গুরুত্ব ছিল। আপাতদৃষ্টিতে এক চূড়ান্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অনুসরণ করে সরকার বুঝিয়ে দিল যে এর পর সংসদীয় গণতন্ত্রের ধার না ধারলেও চলবে। এবং ঠিক তাই হল। তবে খসড়া-নীতির ওপর প্রায় দু লক্ষ প্রতিক্রিয়া জমা পড়বে এটি আগে অনুমান করা যায়নি। ফলত, বিরোধিতার সুর বুঝে সরকার সমালোচনার ভাষাতেই নীতি-কাঠামোর পরবর্তী সংক্ষিপ্ত রূপ রচনা করল।

কাজেই, নয়া শিক্ষানীতির পর্যালোচনার শুরুতেই মনে রাখতে হবে যে এর ভাষার কারিগরিতে ভেসে গেলে চলবে না। এর অন্তর্নিহিত অর্থকে চিহ্নিত করার পথে ওটাই সবচেয়ে বড় অন্তরায় এবং সবচেয়ে পুরু আচ্ছাদন। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে যে কোনও নীতি-ই স্বয়ম্ভু বা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় না— তাকে তৈরি করে অতীতের ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের কল্পনা। কাজেই এই নীতিকেও চিনতে হবে সেই আদানপ্রদানের রূপরেখার মাধ্যমে— অর্থাৎ, বর্তমান নীতি-কাঠামোগুলির সঙ্গে তার কীরকমের সংবাদ চলছে।

এবার যে সহজ তথ্যের আবহে আলোচনা শুরু করেছিলাম, তাতে ফেরা উচিত। আদৌ কি নয়া শিক্ষানীতি প্রকাশিত হয় ২৯শে জুলাই তারিখে? সেদিন সকালে মন্ত্রীসভায় দস্তাবেজটি অনুমোদিত হওয়ার পরেই সংবাদমাধ্যম-সূত্রে জানানো হয় যে বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে তার উদ্বোধন হবে। কিন্তু এত ঢাকঢোল পিটিয়ে সম্মেলন করে সরকারের তরফে প্রকাশ করা হল কেবলমাত্র নীতি-সারাংশের একটি বিজ্ঞপ্তি এবং তেরোটি পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইড। কস্তুরিরঙ্গন কমিটির সেই ৪৮৪ পাতার বিস্তারিত নীতি-খসড়ার এই শীর্ণকায় চেহারা কী করে হল? জানতে চাইলে মানবসম্পদ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে সংবাদ-দপ্তরগুলিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় একটি ৬০ পাতার নীতিপাঠ্য— যেটি আসলে অনুমোদিত নীতিকাঠামো মোটেও নয়। এমন অনেক বিষয় সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত ছিল যা ওই ৬০ পৃষ্ঠার কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তথাপি সরকারের দ্বারা প্রদত্ত সেই ভুল খসড়ার ভিত্তিতেই চলতে থাকে দেশজুড়ে মিডিয়ার প্রচার ও প্রতিবেদন। তিরিশ ঘন্টা ধরে এই মিথ্যে প্রচারের দুন্দুভিনিনাদ বেজে চলার পর, সরকারপক্ষ-বিরোধীপক্ষ মিলে ৩৪ বছরের ব্যবধানে আসা এই জাতীয় শিক্ষা নীতিকে ‘যুগান্তকারী’ ঘোষণা করার কাজ প্রায় শেষ করে। তখনও দূরে কোথাও আমাদের মতো অতি-বিরোধী কিছু নিন্দুক বলে চলেছে যে আসল নীতি গায়েব। একটা-দুটো সর্বভারতীয় খবরের কাগজেও (যেমন ‘দ্য হিন্দু’) যখন সে কথা বলা শুরু হল, তখন ৩০ জুলাই রাত সাড়ে-দশটায় সন্তর্পণে MHRD ওয়েবসাইট-এ তুলে দেওয়া হল ৬৬-পাতার আসল নয়া ‘জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০’।

মূল নীতি-আলেখ্যর আলোচনায় আসা যাক। যদিও উপরোক্ত প্রসঙ্গ-সূত্রে একটি প্রশ্ন অবশ্যই আমাদের মনে জাগা উচিত: যে নীতি ‘যুগান্তকারী’ আখ্যা পেয়েছে, জনপ্রান্তে তার জন্মমুহূর্ত একটি পূর্ব-পরিকল্পিত দুষ্প্রচারের ধোঁয়াশায় কেন ঢাকা? অতএব, এর বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যায় বারবার দেখানোর চেষ্টা করব যে নীতি কী বলছে এবং আদতে কী করছে। কারণ এই স্ববিরোধটাই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

 

নয়া শিক্ষা-নীতি কী বলছে?

স্কুলশিক্ষা

৬৬ পাতার ঠিক অর্ধেকটা জুড়ে এরই ভবিষ্যৎ-কল্পনা রয়েছে। কস্তুরিরঙ্গন কমিটির উপদেশ মেনেই নয়া শিক্ষানীতি প্রচুর শব্দ ব্যয় করেছে শিশুশিক্ষার গুরুত্বের ওপর— যাকে পোশাকি ভাষায় বলা হয়েছে ‘আর্লি চাইল্ডহুড কেয়ার অ্যান্ড এডুকেশন’ (ECCE)। ভারতের সংবিধান ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রত্যেক শিশুর জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার মৌলিক অধিকার রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের উপর দেয়, এবং সেই অধিকারকে আইনি রূপ দিয়েছে ২০০৯-এর শিক্ষার অধিকার আইন বা Right to Education (RTE) Act। তৎসত্ত্বেও দেশের নানা জায়গায় স্কুলশিক্ষা থেকে ‘ড্রপ আউট’-এর সংখ্যা নেহাত কম নয়, এবং বয়সের সঙ্গে তার অনুপাতও বেড়ে চলে। আইনি ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এই ব্যর্থতার কথা মাথায় রেখেই বর্তমান নীতি দৃষ্টিপাত করেছে ৬ বছরের আগে (অর্থাৎ ECCE) এবং ১৪ বছরের পরের (অর্থাৎ সেকেন্ডারি) শিক্ষাকে সুনিশ্চিত করার ওপর। কিন্তু, যদিও কস্তুরিরঙ্গন কমিটি এবং তার ভিত্তিতে রেখাঙ্কিত সবকটি খসড়া স্কুলশিক্ষার বিস্তারের বিষয়টিকে লিপিবদ্ধ করেছিল RTE Act-এর সংশোধনের সুপারিশ করে, অনুমোদিত নীতি-কাঠামো Act-এর সমস্ত উল্লেখকে ছেঁটে বাদ দিয়ে দিয়েছে। ফলত, ৩ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ‘অধিকারের’ সম্প্রসারণের যে আশ্বাস এর আগে পাওয়া গিয়েছিল, তার সবটাই অবশেষে মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

শিক্ষানীতি স্কুলে পঠনপাঠনের এক নতুন স্তর বিভাজনের ইঙ্গিত দিয়েছে। বর্তমানের ১০+২ কাঠামোয় ছাত্রছাত্রীদের গোটা স্কুলজীবনের মূল্যায়ন টিকে থাকে দুটি পরীক্ষার ফলের ওপর। এই পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষাতন্ত্রের বিপরীতে গিয়ে এই নীতি স্কুলের পাঠক্রমকে ৫+৩+৩+৪ ফর্মুলায় ভাগ করার কথা বলেছে— যার প্রথম পাঁচ বছরের স্তরে পড়বে প্রি-প্রাইমারি এবং প্রাইমারি (৩ থেকে ৮ বছর) এবং মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক মিলিয়ে (ক্লাস ৯ থেকে ১২ পর্যন্ত) একটি মাত্র স্তর তৈরি হবে। কিন্তু, অলক্ষ্যে থেকে যাওয়া সত্যটি হল যে আসল নীতিকাঠামোয় না প্রথম স্তরের প্রি-প্রাইমারি (৩ থেকে ৫ বছর) শিক্ষা আর না শেষের চার বছরের সেকেন্ডারি শিক্ষাকে RTE-র আওতায় আনা হয়েছে। এর ফলশ্রুতি এই হবে যে, যেহেতু এই দুই স্তরের কোনওটাই ‘অধিকার’ হিসেবে গণ্য নয়, ফলে এই নতুন স্তরবিভেদেরও কোনও সদর্থক প্রভাব পড়বে না। একটি নতুন কাঠামো তখনই কার্যকরী হয় যখন তার এক ধাপ থেকে পরের ধাপে যাওয়ার রাস্তাটা সংরক্ষিত থাকে— যে বিষয়টি মূল সুপারিশে থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীসভার পর্যবেক্ষণ-পর্বে লোপ পেয়েছে। এ ছাড়াও এখানে উল্লেখযোগ্য যে মূল RTE Act-এর অনুচ্ছেদ ১৬ পরীক্ষায় পাশফেল-এর ভিত্তিতে কোনও পড়ুয়াকে বসিয়ে দেওয়ার প্রথা তুলে দিয়েছিল। ইতিহাস সাক্ষী যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দলিত-আদিবাসী-সংখ্যালঘু সমাজের শিক্ষার্থীদের তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাব কিংবা ব্যর্থতার নাম করে একই ক্লাসে বারবার ফেল করিয়ে ‘স্কুলছুট’ হতে বাধ্য করা হয়। সে কথা মাথায় রেখেই RTE অধিনিয়ম যদিও এহেন ব্যবস্থার প্রস্তাব আনে, তথাপি ২০১৯-এর গোড়ার দিকে সরকারের একটি সংশোধনীর মাধ্যমে ক্লাস ৫ এবং ক্লাস ৮ স্তরে পরীক্ষা চালু করা হয়— এবং প্রয়োজনে পরীক্ষায় ভালো ফল না-করতে-পারা শিক্ষার্থীদের একই ক্লাসে পুনরায় ভর্তি করানোর উপায় তৈরি হয়। নতুন শিক্ষানীতির প্রস্তাবিত (৫+৩+৩+৪) স্তরবিন্যাসের ফলে এখন স্কুলপড়ুয়াদের জন্য ক্লাস ২-তেই পরীক্ষা এবং পাশফেল-এর প্রথা শুরু হতে চলেছে। অতএব, সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির শিশুরা এতদিন প্রাথমিক শিক্ষার যে অধিকার নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্লাস ৫ অবধি পেয়ে থাকত, সেটিও শীঘ্রই তাদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। প্রাইমারি শিক্ষার স্তর থেকেই ‘ড্রপ আউট’-এর সংখ্যা আরও বাড়বে বলেই মনে হয় এর ফলে। একই সঙ্গে RTE আইন মেনে প্রত্যেক রাজ্যে বেসরকারি স্কুলগুলি যে ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী-আসন আর্থসামাজিকভাবে ‘পিছিয়ে পড়া’ শ্রেণির বাচ্চাদের জন্য বিনামূল্যে সংরক্ষিত করতে বাধ্য হয়েছিল, সেই আসনগুলি এখন দু-বছরের শেষেই (অর্থাৎ ক্লাস ২ পরীক্ষার ভিত্তিতে) জোর করে ফেল করিয়ে খালি করার চেষ্টা চলবে।

স্কুলশিক্ষার ক্ষেত্রে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০’ মাতৃভাষায় শিক্ষাপ্রদানের গুরুত্বের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। এই শিক্ষাপ্রণালীর প্রসার ঘটাতে ক্লাস ৫ পর্যন্ত যে কোনও শিশুকে তার নিজের মাতৃভাষায় পঠন-পাঠন করানো বাধ্যতামূলক বলে মনে করেছে নীতি। অথচ যেই যুক্তির সাহায্যে বহুকাল যাবৎ শিক্ষাবিদরা এমত ব্যবস্থার পক্ষে থেকেছেন— যথা: দৈনন্দিন জীবনচর্যার সঙ্গে পড়াশোনার বিষয়বস্তুর সাদৃশ্য ঘটলে পড়ুয়াদের বোধশক্তি এবং আগ্রহ বৃদ্ধি পায়— সেই ধারণাটিকেই নীতির সূক্ষ্ম প্রতিরূপ ধ্বংস করে দিয়েছে। কারণ একথা স্পষ্ট বলা হয়েছে যে মাতৃভাষায় শিক্ষার পরিসরটি সীমিত থাকবে কেবল মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান অবধি। এবং প্রি-প্রাইমারি স্তরে এই কাজটিও করবেন অঙ্গনওয়ারির কর্মীরা, যারা বর্তমানে মাসিক ২২৫০ থেকে ৪৫০০ টাকা মাইনে পান। তাদের অনলাইন প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে বলে নীতি দাবি করেছে বটে, তবে তাদের ন্যূনতম পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা হবে কিনা সে বিষয়ে রয়েছে দিগন্তভেদী মৌনতা।

নয়া নীতির বয়ানে স্পষ্ট যে গ্রাম অথবা ব্লকভিত্তিক যেসব স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা কম অথবা পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে, সেগুলিকে ক্রমশই জেলাস্তরে স্কুল-কমপ্লেক্স কিংবা স্কুল-ক্লাস্টারে আত্মসাৎ করা হবে। এতে নাকি সামাজিক রূপে বঞ্চিত অথবা অন্ত্যজ শ্রেণির বাচ্চারা সুশিক্ষার অধিকার পাবে। বলা বাহুল্য, গুণগত মান বাড়ানোর স্বার্থে যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তার সঙ্কুচিত করা হয় তাতে বাস্তবে অশিক্ষার প্রকোপই বাড়বে। স্কুল কমপ্লেক্সের দৃষ্টান্তস্বরূপ যদিও কোঠারি কমিশনের রিপোর্টের দোহাই দেওয়া হয়েছে, তথাপি এই উদাহৃত পূর্বসূরির সঙ্গে বর্তমান সঙ্কেতের অনেকখানি পার্থক্য রয়েছে। কোঠারির সুপারিশ টিকে ছিল প্রত্যন্ত জায়গায় অবস্থিত প্রাইমারি তথা হাইস্কুলের প্রশাসনিক এক্তিয়ারের একটা মানচিত্র তৈরির সুবিধার্থে, যেখানে আজ সেটিকে অনুকরণের যুক্তি হিসেবে রাখা হচ্ছে সরকারের আর্থিক সঞ্চয়ের সম্ভাবনা। একই সুরে নীতি একথাও বলছে যে স্কুল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বেসরকারি ‘জনকল্যাণমূলক’ উদ্যোগকে আরও উৎসাহ দেওয়া হবে— এবং সেই স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ-কাঠামো যথাযথ শিথিল করা হবে। এর মানে বিদ্যালয় স্থাপন এবং পরিচালনার কাজে একাধারে যেমন বেসরকারি পুঁজির বিনিয়োগ বাড়বে তেমনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) মতো উগ্র হিন্দুত্ববাদী ধর্মীয় সেবা-প্রতিষ্ঠানের ঢোকার রাস্তা চিরস্থায়ী হয়ে যাবে।

 

উচ্চশিক্ষা

এখন দেখা যাক উচ্চশিক্ষার সংস্কার সাধনের উপায়স্বরূপ বর্তমান শিক্ষানীতি কী পন্থা অবলম্বন করেছে। আমার আন্দাজমতে এক্ষেত্রে নয়া কাঠামো ৮টি বিশেষ বিন্দুতে আলোকপাত করছে। প্রথমেই, কস্তুরিরঙ্গনের পরামর্শ মেনে উচ্চশিক্ষার এক নতুন চারিত্রিক সংজ্ঞা পেশ করা হয়েছে এখানে। একবিংশ শতাব্দীর দাবী মাথায় রেখে নাকি গোটা ব্যবস্থাকে এক লিবারেল মোড়কে পুনর্নির্মিত করা হবে। ভাবতে আশ্চর্য লাগে যে এমন সরকার যার গত ছ বছরের ইতিহাস জুড়ে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে দমন এবং পড়ুয়া-শিক্ষকদের নিগ্রহের উদাহরণ— রোহিত ভেমুলা থেকে জি এন সাইবাবা কিংবা হেনি বাবু-র গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পর্যন্ত— তারা হঠাৎ লিবারেলিজমের পাঠ কেনই বা পড়াবে? আবার অর্থনীতির আঙ্গিকে দেখলে, যে দেশে গত দু দশক ধরে সরাসরি শিক্ষার গতিপথ ঠিক করে দিয়েছে বাজারের চাহিদা— যাকে আমরা নব্য-উদারবাদ (কিংবা ‘নিও-লিবারেলিজম’) বলে থাকি!— সেখানে হঠাৎ জ্ঞানের পুনর্বিবেচনা নাগরিকত্বের মাপদণ্ডে হওয়ার কারণ? সে কারণ আবিষ্কার করতে খুব দূরে যেতে হবে না যদিও; যেই অনুচ্ছেদে এই নতুন শিক্ষাপ্রণালীর গল্প ফাঁদা হয়েছে পড়ুয়াদের সার্বিক ক্রমবিকাশের নাম করে, সেখানেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে এই লিবারেল পঠনপদ্ধতি ঠিক কীরকম হবে। এতে একাধারে যেমন ভারতের আর্য সভ্যতার জ্ঞান-দর্শনের পুনরুত্থান ঘটবে বলে দাবী করা হয়েছে (৬৪ কলার মিশ্রণের ফলে), অন্যদিকে এই স্বর্ণযুগীয় অতীতচারণের কারণ হিসেবে ধার্য হয়েছে ভবিষ্যতের চতুর্থ শিল্পবিপ্লব (‘ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভোলুশন’)। বলে রাখা প্রয়োজন যে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF)-এর স্রষ্টা Klaus Schwab সর্বপ্রথম এই ‘চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের’ অবধারণাটির রচনা করেন!

দ্বিতীয়, নীতি একথাও বলছে যে উদারবাদী উচ্চশিক্ষা-ব্যবস্থাকে অবশ্যই বহুমাত্রিক (অর্থাৎ multidisciplinary) হতে হবে। কিন্তু, এই multidisciplinarity-র মানে কী? মানে, যে কোনও পড়ুয়া কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নশাস্ত্র এবং সাহিত্য, জীববিজ্ঞান এবং সংস্কৃত, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট এবং দর্শনশাস্ত্র একসঙ্গে পড়তে পারে। এক বাক্যে শুনে মনে হবে দারুণ ব্যাপার— তবে সত্যিই কি তাই? এই বহুমাত্রিক শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রত্যেক উচ্চশিক্ষিত নাগরিককে একাধিক বিষয়ে কিছু নিম্নমানের শুরুয়াতি দক্ষতা প্রদান করা— যাতে পরবর্তীকালে তাকে দিয়ে কর্মক্ষেত্রে মাল্টিটাস্কিং করানো যেতে পারে। অতএব উদাহরণস্বরূপ, যে গুদামরক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হচ্ছে তাকে দিয়ে যেন প্রয়োজনে হিসাবনিকাশ করিয়ে নেওয়া যায়, যে মোবাইল মেরামতির কাজ করবে সে খানিক sales-এর দিকটাও সামলে দেয়, অথবা যে পদার্থবিদ্যার শিক্ষকতা করতে বিদ্যালয়ে চাকরি পেল তাকে দিয়ে জোর করে দুটি ক্লাসে সংস্কৃতটাও পড়িয়ে নেওয়া যায়। মোটকথায়, সে কোনও বিষয়েই যেহেতু গভীরে গিয়ে সম্পূর্ণ পারদর্শী হয়ে উঠতে পারবে না, বাজারে সে সস্তায় আধা-দক্ষ অস্থায়ী শ্রম হিসেবেই গণ্য হতে বাধ্য। এটি আসলে আন্তঃবিষয়ক (interdisciplinary) শিক্ষার ঠিক বিপরীত মেরু।

তৃতীয়, স্নাতকস্তরে পড়াশোনার মেয়াদ বাড়িয়ে বর্তমান ৩ বছর থেকে ৪ বছর করার প্রস্তাব রেখেছে নয়া শিক্ষানীতি। একই সঙ্গে বলা হয়েছে যে এই নতুন কাঠামোতে প্রত্যেক বছরের শেষেই পড়ুয়ারা চাইলে প্ৰস্থান করতে পারে— এবং প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তারা কোনও না কোনও একটি শংসাপত্র পাওয়ার অধিকারী। কোনও ছাত্র যদি এক বছর কলেজে পড়ার আর্থিক সামর্থ্য রাখে, তবে সে কেবল একটি সার্টিফিকেট পাবে; দু বছর পরে একটি ডিপ্লোমা পেতে পারে; তিন বছরের শেষে একটি পাস ডিগ্রি মাত্র এবং যদি টানা চার বছর পড়াশোনার খরচ চালাতে পারে তবেই তার কাঙ্খিত অনার্স ডিগ্রি অর্জন হবে। যদিও আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে এই ব্যবস্থায় পড়ুয়াদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও বাড়ল, তথাপি বাস্তবে প্রথাগত শিক্ষার এই শ্রেণিবিভাজনের ফল ঠিক উলটো হবে। উচ্চশিক্ষার অধিকার, ডিগ্রি-র মূল্য এবং পড়াশোনার গুণগত মান সবটাই নির্ধারিত হবে কার কতদিন পর্যন্ত কলেজের মাইনে দেওয়ার ক্ষমতা আছে তার দ্বারা। ২০১৩ সালে ঠিক এই আদলেই চার-বর্ষীয় স্নাতক কোর্স যখন জোর করে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮২টি কলেজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় তখন বিজেপি যে শুধু তার প্রতিবাদ করে তাই নয়, পরের বছরেই ক্ষমতায় এসে তারা সেই কোর্সকে বাতিল করে দেয়। কিন্তু খালি এই অতীতের ইতিহাসটুকু মনে করাটাই যথেষ্ট নয়; ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে এই প্রশ্ন করাটাও একান্ত জরুরি: যে ছেলেটি কিংবা মেয়েটি দু বছর কলেজে পড়ার সাহস করে রসায়নে ডিপ্লোমা নিয়ে বেরোবে, তার হাতে ঠিক কী চাকরি আসতে পারে? হয়তো মাসিক ৩৫০০ টাকায় সে কোনও বেসরকারি স্কুলে ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের চাকরি পাবে— কিন্তু সেটাই কি তার একমাত্র কাজ হবে? নাকি, যেহেতু সে দু বছরে বহুমাত্রিক শিক্ষার উপহারস্বরূপ খানিক বৃত্তিমূলক পড়াশোনার স্বাদও পেয়েছিল (যেমন ধরুন বাগান করা কিংবা গাছে সার দেওয়া), তাকে দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে স্কুলকর্তৃপক্ষ অনায়াসেই খানিক উদ্যান-সংরক্ষণের কাজও করিয়ে নেবে না কি? খবরের কাগজের পাতা থেকে একটি সামান্য বাস্তব উপাখ্যান সতর্কবার্তা হিসেবে রেখে দেওয়া ভালো। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনদপ্তর থেকে ২০০০ বন-সহায়ক পদের বিজ্ঞাপন বেরোলে তার জন্য ২০ লক্ষ আবেদন জমা পড়ে বলে জানা গেছে। বিজ্ঞাপনে কাজের বর্ণনা ছিল বনের পাহারাদারি করা কিংবা হাতি তাড়ানো; প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল ক্লাস ৮ পাশ; এবং মাসিক মাইনে ১০ হাজার টাকা। অথচ আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন প্রচুর এমএ/এমএসসি পাশ এবং পিএইচডি ডিগ্রিধারী প্রার্থী। দেশে বেকারত্বের আর্তনাদ যেখানে এই পর্যায় গিয়ে পৌঁছেছে, সেখানে দু বছরের কলেজ-খরচার পরে ওই রসায়নের ডিপ্লোমার ঠিক কী মূল্য?

চতুর্থ, উচ্চশিক্ষার প্রসারে নিয়ামক সংস্থার বিধিনিষেধের বড়ই আধিক্য— এই আক্ষেপ শিক্ষানীতির অনেকখানি অংশ জুড়ে প্রকাশ পেয়েছে। ফলত এও অভিযোগ, যে সমাজকল্যাণের স্বার্থে উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি উদ্যোগ ক্রমশই রুদ্ধ হচ্ছে। উলটোদিকে এমন প্রচুর কলেজ/ইনস্টিটিউট খোলা হয়ে পড়ে আছে যেখানে ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হচ্ছে না কিংবা পরিকাঠামোর সদ্ব্যবহার অসম্ভব। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার এই খণ্ডিত প্রসারকে নতুন নীতি অতিরিক্ত বলে মনে করেছে; এবং আবারও, স্কুলশিক্ষার উদাহরণমাফিক এখানেও স্বল্প-সম্পন্ন অথবা একমাত্রিক (single-stream) কলেজগুলিকে একত্রিত করে কলেজ কমপ্লেক্সের দাবি বেশ চড়া-সুরে রাখা হয়েছে। এই কলেজ merger-এর মূল অঙ্কটা কস্তুরিরঙ্গন-এর নেতৃত্বাধীন কমিটি কষে দেখালেও সেটিকে নীতির আড়ালেই রাখা হয়েছে। খসড়ার অনুচ্ছেদ ১০.৩ জুড়ে এ ইঙ্গিত স্পষ্ট ছিল যে বর্তমানে যে ৫২০০০ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেশে রয়েছে, তাকে আগামী দু দশকে কমিয়ে ১২৩০০-তে নিয়ে আসতে হবে। অথচ প্রথাগত শিক্ষার প্রসারকে তার এক-চতুর্থাংশে সঙ্কুচিত করে আনলেও নাকি পড়ুয়াদের সংখ্যা দ্বিগুণ করা সম্ভব! গণিতটা আশ্চর্য ঠেকলেও অবিশ্বাস্য নয়; অতিমারির সময় অনলাইন শিক্ষার রমরমা প্রমাণ করে দিয়েছে যে পড়াশোনার জন্য আর প্রতিষ্ঠানরক্ষার খরচ চালানোর দরকার নেই। খানিকটা এহেন রেশ টেনেই ‘light but tight’ (হালকা কিন্তু আঁটসাট) নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার রূপরেখা টেনে দিয়েছে অনুমোদিত নীতি— যা মেনে বর্তমানে সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC), টিচার-ট্রেনিং এর ক্ষেত্রে NCTE এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষার ক্ষেত্রে AICTE ইত্যাদি সবকটি নিয়ামক সংস্থাকে একছত্রে সমাবিষ্ট করে হায়ার এডুকেশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া (HECI) তৈরি হবে। কেবল ডাক্তারি এবং আইনি শিক্ষা এর অধিক্ষেত্রে পড়বে না।

পঞ্চম প্রস্তাব হিসেবে নীতি তুলে ধরেছে মাত্রাবিভক্ত স্বাধিকারের (graded autonomy) এক নতুন শ্রেণি-আকৃতি। যে কোনও সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য যেমন দরকার ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে নিষ্কৃতি, তেমনি তার পঠনপাঠন এবং মুক্তচিন্তার আদানপ্রদানের জন্য প্রয়োজন বাকস্বাধীনতা। একেই বলে শিক্ষার স্বাধিকার কিংবা শিক্ষাক্ষেত্রে স্বায়ত্ততা— যার অভাব আমাদের দেশে চিরস্থায়ী হলেও মোদি সরকারের শাসনকালে প্রাত্যহিক অনুভূত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে রাষ্ট্রদ্রোহী ঘোষণা করা থেকে আরম্ভ করে জুলুমবাজির খাতিরে পাঠক্রম বদলে দেওয়া কিংবা সরকার থেকে গবেষণার বিষয় নির্ধারণ করে দেওয়া— এসব-ই আমরা সম্প্রতিকালে দেখেছি, শুনেছি, সয়েছি। এরকম এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে নয়া শিক্ষানীতি যদিও স্বাধিকারের বুলি বারবার আওড়েছে, তবু তার বদলে এনেছে এক প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ছুৎমার্গ। এতে বলা হয়েছে যে দেশের সমস্ত উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলি এখন তিনটি ভিন্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত হবে। প্রথম শ্রেণি বা ‘টাইপ’-এ থাকবে গবেষণাপ্রধান বিশ্ববিদ্যালয়, দ্বিতীয় ‘টাইপ’-এ পঠনপাঠনের বিশ্ববিদ্যালয় এবং সর্বনিম্ন ‘টাইপ’-এ অন্তর্ভুক্ত হবে সমস্ত কলেজগুলি। অতএব প্রত্যেক-এর আলাদা কাজ, আলাদা শ্রেণি-মর্যাদা এবং সেই অনুপাতে স্বাধিকার— এ যেন স্বাধীন ভারতের এক নব্য বর্ণব্যবস্থা। বলা বাহুল্য, তলায় থাকা ‘শূদ্র’ কলেজগুলির আর্থিক বরাদ্দও হবে সবচেয়ে কম— যেই বিষয়টি কস্তুরিরঙ্গন রিপোর্টের সংযোজন-১ (Addendum I)-এ মোটাদাগে প্রস্ফূটিত থাকলেও এখানে বেমালুম আড়াল করে দেওয়া হয়েছে। উপরন্তু, বিদেশের শ্রেষ্ঠ যে ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয় পরবর্তীকালে ভারতে দোকান খুলতে পারে তারা দেশের সর্বোচ্চ স্বাধিকার-প্রাপ্ত (অর্থাৎ ‘টাইপ ১’) বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মতোই বিধিহীনভাবে পড়ুয়াদের কাছ থেকে বেতন দাবি করতে পারে। এতেই বোঝা যায় যে গবেষণার অধিকার ঠিক কোন শ্রেণির কুক্ষিগত সম্পত্তি হিসেবে নীতিকাঠামোয় সংরক্ষিত হয়েছে।

ষষ্ঠ, নয়া নীতি আগাগোড়া শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপি-র ৬ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। তবে, বলা মানেই কি তার সত্যতা অথবা সরকারের সদিচ্ছা প্রমাণিত হওয়া? এটি উল্লেখযোগ্য যে ১৯৬৬ সালে কোঠারি কমিশনের রিপোর্ট প্রথম জিডিপি-র ৬ শতাংশ হারে শিক্ষায় অর্থ বরাদ্দ করার দাবি তোলে; সেই দাবি ১৯৬৮ সালের পয়লা রাষ্ট্রীয় শিক্ষা-নীতিতেও প্রতিফলিত হয় এবং তার পরবর্তী সমস্ত সরকারি কমিটি-কমিশনের সুপারিশে স্থান পায়। তথাপি এ প্রতিশ্রুতি গত ৫৪ বছরে পূরণ হওয়া দূরে থাক, ভারত সরকার সর্বসাকুল্যে ৩ থেকে ৪ শতাংশের গণ্ডি কোনওদিন-ই পেরোতে সক্ষম হয়নি। ফলত আজ— যখন চলতি আর্থিক বছরের আনুমানিক জিডিপির হিসেব নেগেটিভে যাচ্ছে— তখন এই ওপর থেকে প্রেরিত ফরমানকে দৈববচন বলে মেনে নেওয়ার বিন্দুমাত্র কারণ দেখছি না। বরং এখন যদি এই নেগেটিভ বৃদ্ধির আবহাওয়ায় সরকারের কথামতো আর্থিক বণ্টন সম্ভবও হয়, তবু সেটি সহজ হিসেবেই গত বছরের তুলনায় কমই হতে বাধ্য। এ ছাড়াও কস্তুরিরঙ্গন রিপোর্টে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির যৌথ-বাজেট অনুপাতে যে ১০ শতাংশ ব্যয়কে দ্বিগুণ করার কথা বলা হয়েছিল, সেটি বর্তমান নীতি-বৃত্ত থেকে আমূল বাদ পড়েছে।

সপ্তম বিন্দু হিসেবে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০’ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থায়ী শিক্ষক পদ (মার্কিনি-সংজ্ঞায় ‘tenure track position’) সৃষ্টির কথা বলেছে। যেখানে সরকারি সমীক্ষা (যথা ‘অল ইন্ডিয়া সার্ভে অন হায়ার এডুকেশন ২০১৮-১৯’) বলছে যে গত পাঁচ বছরে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ৫৭০০০ শিক্ষক-পদ অবলুপ্ত হয়েছে কিংবা গড়পড়তা ৪০ শতাংশ পদ নিয়োগপ্রক্রিয়ার অভাবে খালি পড়ে রয়েছে, সেখানে নীতি কিছু ফাঁপা শব্দে কর্মক্ষেত্রে শিক্ষকদের একাত্মতার মাহাত্ম্য গেয়েছে। এবং তারই সঙ্গে রাস্তা করে দিয়েছে ভবিষ্যতে আইন মেনে অস্থায়ী শিক্ষক-নিযুক্তির। যদিও এই মুহূর্তেও শিক্ষকদের শূন্যপদে পার্ট-টাইম/কন্ট্রাকচুয়াল/অ্যাড-হক/অতিথি-লেকচারারের নিয়মিত নিযুক্তি হয়ে থাকে, তবু ওই পদগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাকা চাকরি হিসেবে অনুমোদিত হয়ে আসে। বর্তমান নীতি এই নিয়মকে শিকেয় তুলে প্রভূত উৎসাহ দিয়েছে শিক্ষাপ্রদানে অস্থায়ী কর্মসংস্থানকে।

অষ্টম এবং শেষ নজর-কাড়া বিষয়: এই নীতির জবানবন্দি মেনে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে গবেষণার জন্য এমফিল কোর্স তুলে দেওয়া হবে। যদিও নীতির মূল নথি এর কোনও কারণ দর্শানোর প্রয়োজন বোধ করেনি এবং একবাক্যে এই ডিগ্রিকে নস্যাৎ করে দিয়েছে, তথাপি আমাদের পক্ষে যথেষ্ট কারণ আছে এমফিল-এর পেছনের শিক্ষাবিজ্ঞান ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তাকে বোঝার। একদিকে যেমন স্নাতকোত্তরের পর একটি মাস্টার অফ ফিলোসফির (এমফিল) সাহায্যে গবেষণার পদ্ধতিগত প্রশ্নে পড়ুয়াদের হাতেখড়ি হয়, অন্যদিকে একথা তথ্য-সঙ্গত যে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যারা ডক্টরেট (পিএইচডি) করতে আসেন তারা স্বাভাবিকভাবেই বেশি পারদর্শী হন এবং থিসিসের কাজ যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি শেষ করতে সক্ষম হন। কিন্তু এ ছাড়াও এমফিল ডিগ্রির অস্তিত্বের আরও একটি কারণ আছে: সামাজিক ন্যায়ের লক্ষ্য নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রটিকে প্রসারিত করা। দেশজুড়ে যে কোনও প্রতিষ্ঠানেই এমফিল প্রোগ্রামের মেয়াদ এক থেকে দু বছর, যেখানে পিএইচডি কোর্সের দৈর্ঘ্য অন্তত চার থেকে ছ বছর (এবং অনেক ক্ষেত্রেই ভালোভাবে কাজ সম্পূর্ণ করতে তারও বেশি সময় লেগে যায়)। বহু অংশে সামাজিক পুঁজি এবং আর্থিক প্রতুলতার অভাবে মেয়েরা এবং দলিত-আদিবাসী-সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পড়ুয়ারা শুরুতেই এক ধাপে ডক্টরেটে চার থেকে ছয় বছরের জন্য নাম লেখাতে পারে না। নানাবিধ চাপের মুখে তাদের পড়তে হয়: মেয়েদের জন্য পরিবারের তরফ থেকে বিয়ে করে নেওয়ার চাপ অথবা আর্থসামাজিক পরিস্থিতির পাঁকে পড়ে চাকরি খোঁজার চাপ। গবেষণা করার স্বপ্ন দেখা সত্ত্বেও সে সাহস তারা করে উঠতে পারে না; এবং প্রচুর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরা একটা এমফিল ডিগ্রি নিয়ে কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সুযোগ খোঁজে। এখনও পর্যন্ত এই ডিগ্রির যোগ্যতায় তারা নিয়োগ-প্রক্রিয়াতেও খানিকটা অগ্রাধিকার পায়, এবং গবেষণা-প্রকাশনার ক্ষেত্রেও তাই। অতঃপর, চাকরিরত অবস্থায় কিছুটা আর্থিক নিরাপত্তা ও আত্মসম্বল পেয়ে পিএইচডি-তে নাম লেখায়। যেখানে সরকারি পরিসংখ্যান মেনে আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার ২৬.৩ শতাংশ আর গবেষণায় প্রবেশাধিকার পায় এর ০.৫ শতাংশেরও কম, সেখানে গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক প্রবেশপথটাকেই সঙ্কুচিত করে দেওয়ার কী অর্থ হতে পারে ভেবে দেখা দরকার।

জাতীয় শিক্ষানীতির অনুচ্ছেদ ১২.২ (যার শীর্ষক “শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ এবং পড়ুয়াদের সহায়তা”) উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলিকে ক্রমশ প্রান্তীয় পরীক্ষা-ভারের (“high-stakes examinations”) বোঝা থেকে পড়ুয়াদের মুক্ত করে এক ক্রমশীল এবং সার্বিক মূল্যায়ন-পদ্ধতির (“continuous and comprehensive evaluation”) দিকে অগ্রসর হতে আহ্বান জানিয়েছে। অথচ এই একই মুহূর্তের বাস্তব প্রেক্ষাপটে, সেই একই সরকার— এবং তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক, মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন— সর্বোচ্চ আদালতে যুক্তি পেশ করে চলেছে যে অতিমারির মধ্যেও পড়ুয়াদের পরীক্ষা দিতেই হবে। প্রাণের ঝুঁকি, জনজীবনে লকডাউনের প্রভাব এবং প্রবল আর্থিক অনিশ্চয়তার আশঙ্কা— সবটাকেই উপেক্ষা করে ঘাড় ধরে ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত করানোতেই নাকি তাদের আত্মবিশ্বাসের চাবিকাঠি রয়েছে। সেই মর্মেই সংবাদমাধ্যমে সরকারপক্ষ থেকে বিবৃতি জারি করে সাফাই গাওয়া হচ্ছে যে বিনা পরীক্ষায় কেবল ক্রমান্বিত মূল্যায়ন সঠিকভাবে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার পরিমাপ বিচার করতে পারে না।

যে নীতির জন্মলগ্নে এবং পরতে পরতে রয়েছে রাজনৈতিক দ্বিচারিতা, সে নীতি কি আদৌ মানুষের স্বার্থে?


(এই প্রবন্ধের একটি সামান্য-পরিবর্তিত পূর্ব সংস্করণ আরেক রকম পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...