এক আজব করোনা আর দেশপ্রেম বটিকা

অরিন্দম

 

 

এই পথনাটকের কাঠামোটিতে কবি শ্রীজাতর কবিতার চারটি লাইন আর সুকান্ত ভট্টাচার্যের একটি কবিতা ব্যবহৃত হয়েছে। বাকি সব স্বরচিত ছড়া। আমি এই নাটকটির উপর আমার কোনও স্বত্ব বা অধিকার রাখছি না। যে কেউ এই নাটক করতে পারেন। তার জন্য আমাকে জানানো বা ঋণ স্বীকার কিছুই করতে হবে না।

আবহ হিসেবে “এ কোন সকাল/যা রাতের চেয়েও অন্ধকার…” গানটি বাজবে। মোটামুটি ৪ জন অভিনয় করবে।

১ম জন

কী হল মানুষের আর তার সাধের তথাকথিত সভ্যতার। চিন থেকে আমেরিকা যারা প্রতি দু মাসে মহাকাশে যান পাঠায়, পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ করে বুক চাপড়ায়, কী হল জেমস বন্ডের দেশ ইংল্যান্ডের! গতকাল যাকে মনে হচ্ছিল সিংহপুরুষ, আজ যেন সে মায়ের আঁচলে মুখ লুকোনো শিশু বা পাড়ার ঝগড়ুটে নেড়ি। আণুবীক্ষণিক এক প্রাণ, সে একদম নাকানিচোবানি খাইয়ে দিল! কী আছে তার? খালি একটা প্রোটিনের বর্ম। বাইরে সাবানজলে তার মৃত্যু লুকিয়ে আছে, কিন্তু মানবদেহে তার তেজ সাংঘাতিক। কিন্তু কেন সে এল? তার উদ্ভব কি মানবসভ্যতার দাপটের ফল? একমাত্র উড়ন্ত স্তন্যপায়ী প্রাণী বাদুড়ের দেহে যে ১৪০টা ভাইরাস আছে তার ভিতর সে একটা। এতদিন পরে কেন সে বাইরে এল? কেন বাদুড়ের দেহের থেকে বারবার মারণ ভাইরাস তৈরি হচ্ছে? কী উত্তর তার? বাদুড়ের বাস এই নীল পৃথিবীতে ৬ কোটি বছর আর মানুষের ২ লক্ষ। প্রথম থেকেই পাহাড়-কন্দরের গুহা থেকে বাদুড়কে তাড়িয়ে, খেয়ে মানুষ নিজেকে পুষ্ট করেছে, থেকেছে। তাই কি বাদুড় নিজের অজান্তেই মানুষকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। এর পরেরবার জন্য কি… মানবসভ্যতা যদি বাঁচতে চায় তাকে অন্যের বাঁচার অধিকার স্বীকার করতে হবে…

আজ হয়ত বেঁচে আছি, কাল হয়তো লাশ…
আমি তবু লিখে যাব আমার বিশ্বাস।

রাতে যাকে হত্যা করো, সকালে সে বেঁচে
ডুবলে উঠতেই হয়, সূর্য শিখিয়েছে।

 

২য় জন

কিন্তু জামলো, ১২ বছরের জামলো মাকদম, ও তো কোনওদিন বাদুড়ের মাংস খায়নি। গুহা থেকে বাদুড় তাড়ায়নি। ও খালি লকডাউনের বাড়িতে মায়ের কাছে ফিরতে চেয়েছিল। সুদূর তেলেঙ্গানার লঙ্কাক্ষেতের কাজ থেকে ছত্তিশগড়। ১৫০ কিলোমিটার। জঙ্গল কেটে, না খেয়ে, হেঁটেছিল খালি মায়ের কাছে যাবে বলে। পারেনি। নকশি কাঁথার মাঠ আর পেরোতে পারেনি। ভূমধ্যসাগরের তীরে সিরিয়ার অ্যালান কুর্দির সাথে বিপন্ন বিস্ময় নিয়ে রাতের তারা হয়ে ফুটে আছে এখন। আমরা মরিনি জামলো। আমরা চিৎকার করে বলছি—

জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব— তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
অবশেষে সব কাজ সেরে
আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে
করে যাব আশীর্বাদ,
তারপর হব ইতিহাস

 

৩য় জন

আসলে কেউই বাদুড়ের মাংস খায়নি। সবাই শিশুদের মাংস খাচ্ছে। নরম তুলতুলে পিচ্চি মাংস। তবে সবার মুখে ওই মাংস খেলে রক্ত দেখতে পাবে না। এই ধরো না মজঃফরপুরের স্টেশনে মায়ের চাদর নিয়ে খেলা করা সেই শিশুটা। ওকেও খেয়ে নিয়েছে।

(পিছনে সবাই বলবে: কে খেল কে খেল)

তোমরা জানো না? সব জানো। শিশুদের মাংস কারা খায়, কারা শকুনের মতন ভাগাড়ের দিকে চেয়ে বসে আছে কখন শিশু আসবে… খপ করে ধরবে… তারপর কাগজে ছবি উঠবে… ধন্য ধন্য রব উঠবে। তখন শিশুটাকে নরম তুলতুলে গদিতে রেখে দেওয়া হবে। দু বেলা গরম দুধ খাওয়ানো হবে। যাতে করে মাংসগুলো নরম হয়। যাতে ওর হাড়জিরজিরে শরীরে মাংস লাগে। তারপর সবাই যখন ওর উপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে, তখন ওর মাংস খাওয়া হবে। প্রতিটা মাংসের টুকরোর সাথে থাকবে কর ছাড়ের সুমিষ্ট স্বাদ। আমার ছবির প্রচার। আমার প্রতিটা কাজে ও জোগাবে আচ্ছাদন। ক্রিকেট মাঠে আমার দল চিলিজের খেলায় বোর্ডের পর্দায় মৃত মায়ের চাদর টানা শিশু আর তার পাশে দরিদ্র অসহায় অনাথ শিশুর ভার নেওয়া আমার কাতর চোখের অভিনয়। উফফ…

প্রতিটা পরিযায়ী শিশুর শব
আমাদের বাহারি টবে কেয়ারি ফুল সব
প্রতিটি পরিযায়ীর খিদে
আমার ত্রাণে ধরা থাকে কর ছাড়ের ফিতে
লকডাউনে অসহায় বেকার শ্রমিকের রক্ত কান্না ঘাম
চিন্তা নাই ধরা আছে দিনপ্রতি ১২ ঘণ্টা কাজে ২০২ টাকা দাম…
মিত্রোঁ, শক্তিশালী দেশের ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফে দিব্যকান্তি আমি
করোনা নিয়ে ভেবো না, সব জানে রাম, ট্রাম্প আর অন্তর্যামী…

 

৪র্থ জন

হাঃ হাঃ হাঃ অন্তর্যামী অন্তর্যামী অন্তর্যামী… ছোটবেলায় যাত্রা দেখেছিলাম শার্দূল জারাক খান… সে কি হাসি… সেই হাসির শেষে… সেই হাসির জন্য কুণ্ডু জুয়েলারির মালিক নরেন্দ্র কুণ্ডু সেই সময়ের ১০ পয়সার সোনার মেডেল পড়িয়ে দিয়েছিল। মাইকে নরেন্দ্র কুণ্ডুর নাম ঘোষণা হচ্ছে… তুমুল হাততালি! বিশালবপু শার্দূলের বুকে ১০ পয়সার সোনার মেডেল। কুণ্ডু জুয়েলারি ধন্য ধন্য। এবার ধনাঢ্য নরেন্দ্রবাবু মুচকি হেসে শার্দূলকে বললেন “আবার হাসো”। এবার কী করবে শার্দূল? কিছুক্ষণ আগে সব দম নিংড়ে সে হেসেছে… বুকের খাঁচায় হাঁপর চলছে… শার্দূল হাসছে… ট্রেন চলছে… রাস্তায় মানুষ চলছে… ৫ কিলো চালের মেডেল… ১২ ঘন্টা… ২ দিন ধরে হাঁটছে… শার্দূল হাসছে… খেয়াল করলে দেখা যাবে মুখে লাল রক্তের ছিটে… পালার অধিকারী শার্দূলের দিকে লাল চোখে তাকিয়ে আছে… শার্দূল জানে… থামা যাবে না… শার্দূলের ক্লান্ত লাগছে… শার্দূল শুয়ে পড়তে চায়… চোখ জুড়ে ঘুম… দূরে ট্রেনের হুইসেল… ট্রেন আসছে… ঘুম… অধিকারীর গরম চোখ… নরেন্দ্রর স্মিত হাসি… সোনার মেডেল… ট্রেনলাইনে ঘুম… লক্ষ বছরের ঘুম…

খোকা ঘুমোল/ পাড়া জুড়োল/ বর্গি এল দেশে/ বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/ ঋণ শুধব কিসে……

 

১ম জন

কেন সরকার ৩ মাসের সুদ পরে দিলেও চলবে বলেছে। ধার নিয়েছ সুদ দেবে না? নরেন্দ্রবাবুর দয়ার শরীল। মমতামাখা মন। না না অন্য কিছু মানে করবেন না। দেওয়ালেরও চোখ আছে। তোমরা গান্ডুগণের খালি চাই চাই চাই। লকডাউনে বাড়ি যেতে চাই। কেন শালা এখানে খেতে পাচ্ছিস না? বাড়িতে গেলে যেন রাজার হালে থাকবি? কাজ চললে তো বাড়ি যাবার নাম গন্ধ করতিস না। পয়সার গন্ধ পেলে সব ভুলে যাস, না!

 

২য় জন

জানেন এই বঞ্চিত বাঞ্চতদের দল চেনে খালি পয়সা। আরে শালা লকডাউন হয়েছে। করোনা ছড়াবে। গান্ডুদের খালি বাড়ি যাবার তারা। আমাদের সরকারের দিল আছে। দেশজুড়ে ৫০০০ কোটি টাকা দিয়েছে এই লঙ্গরখানা চালানোর জন্য। কিন্তু বকাচ্চোদের কথা শুনবেন! বলে কি না প্রতিদিন লপসি খাবে না? বলুন তো। যা শালারা যা। রাস্তায় গাড়ি উল্টে, চাপা পড়ে মরে থাক। শালাদের প্রধান বিচারপতির মতন ৫১ লাখ টাকার বাইক চড়াতে হবে? এদের জন্যই সরকারগুলোর কষ্ট বাড়ছে। রাজ্যে এসেই তো শালা রোগ ছড়াবে। এরা দেশের কথা ভাবেই না। দেশদ্রোহীর দল সব। সরকারের কত চিন্তা। এর মধ্যে আবার চিনাদের ডানা গজিয়েছে।

পিপীলিকার পাখা ওঠে মরিবার তরে
যদিও করোনা এখন ঘরে ঘরে
ভাবিও না,
চিনা অ্যাপ মারিয়াছি
দীপ জ্বালাইয়া, ডঙ্কা বাজাইয়া
করোনাও মারিব।
যুদ্ধে মারিতে মানুষ মরিবে
সবই নিয়তি
সরকার কী করিবে?
মানুষকে বুঝিতে হইবে
মৃত্যু যদি হয় ঘরে ঘরে
দেশপ্রেমের তরে
সবই সহ্যিবে।

 

৩য় জন

ঠিক ঠিক ঠিক
টিক টিক টিক
যুদ্ধ যুদ্ধ যুদ্ধ
হাল্লা চলেছে যুদ্ধে

চিন আমাদের দুশমন, পাকিস্তান আমাদের দুশমন, নেপাল আমাদের দুশমন, বাংলাদেশ আমাদের দুশমন, রোহিঙ্গা আমাদের দুশমন, মুসলমান আমাদের দুশমন। ঘরে বাইরে খালি দুশমন। ঘরের দুশমনদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে কনসেন্ট্রেশন থুড়ি ডিটেনশন সেন্টারে পাঠাতে হবে। আর বাইরের দুশমনদের জন্য যুদ্ধ।

যুদ্ধ যুদ্ধ যুদ্ধ (সবাই বলবে)

এখন না খেয়ে মরলে, মড়াকান্না কাঁদলে চলবে না। করোনা হলে হবে। কিন্তু আমাদের রাফায়েল জেট চাই। সিনুক হেলিকপ্টার চাই। অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গান চাই। দেশের সুরক্ষার জন্য যদি কয়েক কোটি মানুষ মারা যায় যাবে। মনে রাখতে হবে দেশমাতৃকা রক্ত চায়। দেশ মানে সীমান্ত। দেশ মানে তেলের ট্যাক্স। জার্মানিতে দেখোনি লক্ষ লক্ষ মানুষ মরেছে তবেই না হিটলার হিটলার হয়েছে। জার্মান জাতির গর্বের মতন আমাদের হিন্দু ভারতীয়দের গর্ব করতে হবে। এটাই দেশপ্রেম। এই সময় তোমাদের ঠিক করতে হবে রাফায়েল জেট চাই না ৪০ টাকায় তেল চাই। ভাত চাই না সৈন্যদের হাতে বন্দুক চাই। দেশের সুরক্ষা চাই না ৮ ঘণ্টা কাজে বেশি পয়সার মজুরি চাই। সুন্দর জীবন চাও না হিন্দু গর্বের সুরক্ষিত ভারত চাও। ওই দেখো আম্বানি-আদানি-বিড়লা-টাটা সবাই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ। ‘জিও’ আজ দেশের সম্মান বাড়িয়েছে। আম্বানি আজ পৃথিবীর প্রথম ১০ জন বড়লোকদের মধ্যে একজন। এই সময় দেশের মানুষের উচিত নিজের ভাতের, কাজের চিন্তা না করে বড়লোকদের মতন দেশপ্রেম মানে যুদ্ধের কথা ভাবা।

মনে রাখতে হবে
দেশপ্রেম মানে সরকারপ্রেম। আর সরকারপ্রেম মানে নরেনপ্রেম।
হেইল নরেন, হেইল শ্রীরাম
ওই দেখো লাদাখ সীমান্তে
দলে দলে সেনা চলেছে সমরে
যুদ্ধ চাই, যুদ্ধ চাই
চারিদিকে নো ভাই
দেশপ্রেমের প্রমাণ চাই
সবাই বলো ‘যুদ্ধ চাই’

 

৪র্থ জন

চুপ থাক, চুপ থাক
যত মানুষ মারার দল
চুলোয় যাক
দেশপ্রেমের ছল।
এই দেশেতে বিদ্যাপতি ভনে
শুনে পুণ্যবান
‘সবাকার উপরে মানুষ সত্য’
মানুষই মহান।
যারা কাজ করে ভাত চায়
তারা দেশ গড়ে বিদ্বেষ নহে
আমাদের দেশ ভারতবর্ষ
এই দেশের মানুষ মেরে
পেটের ভাত কেড়ে
যুদ্ধ চায় যারা,
শুনে রাখো
লালন, কবির, ভগত, আসফাকউল্লার দেশে
আমরা মেহনতকশ
আমরাই দধীচি,
আমাদের হাড়ের অস্ত্রে মরুক
টাকার কুমির যুদ্ধবাজ যত
বেজন্মার দল…
আমরাই বাঁচব
আমরাই দেশ গড়ব…

ভারতের মানুষ (সবাই বলবে) মানুষের মতন বাঁচতে চায়। ভারতের মানুষ (সবাই বলবে) ৫০০ টাকার অসম্মান চায় না। (সবাই বলবে) তারা মানুষের অধিকার চায়। যারা করোনার দোহাই দিয়ে মানুষকে পশুর মতন খাটাতে চায়, ভারতের মানুষ (সবাই বলবে) তাদের চায় না।

দেশ মানে (সবাই বলবে) সরকার নয়। দেশ মানে (সবাই বলবে) মানুষ। দেশের অস্ত্র (সবাই বলবে) রাফায়েল নয়। দেশের অস্ত্র (সবাই বলবে) শিক্ষিত ভরাপেট হাতেকাজ মানুষ।

দেশ মানে (সবাই বলবে) শান্তি। দেশ মানে (সবাই বলবে) সাম্য। দেশ মানে (সবাই বলবে) অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।

দেশ মানে

“ঘৃণার বেসাতি যারা করে তারা হুঁশিয়ার”

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...