জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০

শুভোদয় দাশগুপ্ত

 


লেখক ইংরেজি ভাষা সাহিত‍্যের অধ‍্যাপক। পশ্চিমবঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (ওয়েবকুটা)-র রাজ‍্য সভাপতি

 

 

 

প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষানীতি অবশেষে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার অনুমোদন পেল। আর এই শিক্ষানীতিতে সিলমোহর পড়ল বিশ্বব্যাপী অতিমারির আবহে যখন কোভিড-১৯ ভাইরাসের প্রকোপে সারা পৃথিবীতে শিক্ষা কার্যত স্তব্ধ হয়ে আছে। এই জাতীয় শিক্ষানীতি খসড়া আকারে দৃষ্টিগোচর হয় বেশ কয়েকবছর ধরেই। কস্তুরিরঙ্গন কমিটি যখন এই জাতীয় শিক্ষানীতির খসড়া রিপোর্টের আকারে তুলে দেয় কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রকের হাতে তখন থেকেই বিতর্ক ও নানা আলাপ আলোচনা চলে আসছিল এই শিক্ষানীতিকে ঘিরে। প্রাথমিক মাধ্যমিক সহ স্নাতক স্নাতকোত্তর স্তরে এবং গবেষণায় সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের সুপারিশ নিয়ে বিপুল আয়তনের শিক্ষানীতি দফায় দফায় public domain-এও আনা হয় জনসাধারণ ও stake holder-দের মতামত চেয়ে। আবার দফায় দফায় এই খসড়া শিক্ষানীতি তুলেও নেওয়া হয় public domain থেকে অজ্ঞাত কারণে। তদানীন্তন মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রক দাবী করে জাতীয় শিক্ষানীতি রূপায়ণ পর্বে কন্তুরিঙ্গনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি বহু সংস্থা ও প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করে খসড়া শিক্ষানীতি প্রস্তুত করেছে। কিন্তু সেই তালিকায় মুষ্টিমেয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া যারা ছিল তাদের সিংহভাগই শিক্ষার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত নয়। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল তাদের অধিকাংশই কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা, ধর্মীয় সংগঠন এবং কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন শাসক দলের ছাত্র সংগঠন। এই তথ্য থেকেই প্রশ্ন ওঠে সেই খসড়া শিক্ষানীতি রূপায়ণে মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রকের স্বচ্ছতা নিয়ে। ২০১৯ সালে যখন এই খসড়া জাতীয় শিক্ষানীতি পাবলিক ডোমেইনে আসে সে বিষয়ে মতামত আহ্বান করা হয়। AIFUCTO, FEDCUTA, DUTA, WBCUTA সহ বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন এই প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি নিয়ে তাদের মতামতও জানায় বিস্তারিতভাবে। দফায় দফায় সেই সব মতামতের কিছু কিছু অংশের ভিত্তিতে পরিবর্তনও আনা হয়। কিন্তু আগেই বললাম, মাঝেমাঝেই এই খসড়া শিক্ষানীতি পাবলিক ডোমেইন থেকে তুলে নেওয়া হয় অজানা কারণে।

প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষা সহ স্নাতক, স্নাতকোত্তর শিক্ষা ও গবেষণায় এই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষানীতি আপাতদৃষ্টিতে বহু ইতিবাচক সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যা অনেককেই মানসিক প্রসন্নতা দেবে। কিন্তু এই সংস্কার ও পরিবর্তনের অন্তরালে ছত্রে ছত্রে পাবলিক ফান্ডেড এডুকেশনকে বিপন্ন করে শিক্ষাকে এক মুনাফা অর্জনের পথ হিসেবে বেসরকারি উদ্যোগপতিদের হাতে অর্পণ করার যে অভিসন্ধি চরিতার্থ করা হয়েছে, তাকে চিহ্নিত করাই ভারতবর্ষের সচেতন নাগরিকদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। সেই লক্ষে এগোতে হলে শুধু জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে কিছু গালভরা সমালোচনা করে জাতীয় কর্তব্য সম্পাদন করা যাবে না। এই শিক্ষানীতিতে সুকৌশলে কীভাবে শিক্ষাকে একটি অন্যতম লাভজনক পণ্যে পরিণত করতে এই দরিদ্র দেশে একটি মার্কিন মডেল আরোপ করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে যথাযথ বিশ্লেষণ তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থায় শাসক দলের ধর্মীয় মৌলবাদ প্রসূত রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডাকেও কীভাবে চরিতার্থ করার রূপরেখা এই শিক্ষানীতিতে প্রণয়ন করা হয়েছে তাকে চিহ্নিত করাও আর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেশের সচেতন নাগরিকদের।

শিক্ষামন্ত্রকের নাম বদল করে ১৯৮৫ সালে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধি মন্ত্রকের নতুন নামকরণ করেন মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রক। এই নব-নামাঙ্কিত দপ্তরের মন্ত্রী হন নরসিংহ রাও। সদ্য প্রবর্তিত জাতীয় শিক্ষানীতিতে এই মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রককে তুলে দেওয়া হল। পুরনো নাম শিক্ষামন্ত্রক আবার ফিরিয়ে আনা হল।

উচ্চশিক্ষায় একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা National Higher Education Regulatory Authority (NHERA) গঠিত হবে এই নতুন জাতীয় শিক্ষানীতিতে। যার অর্থ হল UGC, AICTE এবং NCTE এই সংস্থাগুলি রূপান্তরিত হবে Professional Standard Setting Body বা PSSB হিসেবে। এই সমস্ত পদক্ষেপেরই একটা প্রেক্ষাপট আছে, আছে সুনিদিষ্ট পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য যা নিয়ে সম্যক আলোচনা হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। সাংবিধানিক স্বীকৃতিতে শিক্ষা যুগ্ম তালিকায় থাকলেও শিক্ষার সার্বিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে রাজ্যের প্রাধিকার-কে খর্ব করে ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণের প্রচেষ্টা কোনও নতুন পদক্ষেপ নয়। নিকট অতীতেই আমরা যদি UPA-2 সরকারের শাসনকালে শিক্ষাবিষয়ক সংস্কারের সুপারিশগুলো দেখি তো দেখা যাবে উচ্চশিক্ষার নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীকরণ করাটা একটা অভিসন্ধি মাত্র। সমস্ত নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করার অন্যতম উদ্দেশ্য হল শিক্ষায় বেসরকারি বিনিয়োগ তথা বিজাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির এদেশে অবাধ বাণিজ্যের রাস্তা খুলে দেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণের সব ক্ষমতা যেন কেন্দ্রীভূত হয় কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রকের হাতে। এর উৎস সন্ধানে গেলে আমরা দেখতে পারব যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ভারতবর্ষে যে উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা প্রচলন করেছিল তার মধ্যেই নিহিত ছিল এই গরীব দেশে শিক্ষাকে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও গরীব মানুষের নাগালের বাইরে রেখে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত প্রয়াস। এই ইতিহাসকে মাথায় রেখেই স্বাধীন ভারতে গঠিত শিক্ষা কমিশনগুলি, বিশেষত কোঠারি কমিশন তার সুপারিশে equality of opportunity to the less advanced class-এর প্রতি সুবিচারের প্রয়োজনীয়তার প্রশ্নটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল। একের পর এক শিক্ষা কমিশন— রাধাকৃষ্ণণ, মুদালিয়র, কোঠারি— এত সুপারিশ এত দিশা— কিন্তু স্বাধীন ভারতে সরকারি পদক্ষেপে এই সুপারিশগুলিকে কতটা মান্যতা দেওয়া হয়েছে? শিক্ষাখাতে কেন্দ্রীয় বাজেটের ন্যূনতম ব্যয়বরাদ্দ স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে কত হওয়া উচিত ছিল— অদ্যাবধি সেই অঙ্কটাই বা কত? Gross Enrolment Ratio প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পর থেকে লক্ষ্যমাত্রা কী ছিল— আজ প্রকৃত পরিসংখ্যানই বা কী? এই দ্বিচারিতার আবহেই গৌণ হয়ে গেছে স্বাধীন ভারতবর্ষের শিক্ষা কমিশনগুলির সব ইতিবাচক সুপারিশ।

এই অবজ্ঞার অন্তরালে আছে শিক্ষাকে কিছু সুবিধাভোগী, বিত্তবান পরিবারের ছেলেমেয়েদের আওতায় রেখে দেওয়া যাতে গণশিক্ষার প্রসার কোনও জনচেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধাচারণের সম্ভাবনার সৃষ্টি না করে। বর্তমান শিক্ষানীতিও এই ইতিহাস, এই পরিকাঠামোর উপর দাড়িয়েই রূপায়িত। গালভরা প্রতিশ্রুতি, নতুন দিনের স্বপ্নের মায়াজাল যতই থাক শাসকশ্রেণির মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে যেন বিস্মৃত না হয় দেশবাসী। ধারাবাহিক ব্যর্থতা বিশ্বের দরবারে উন্মোচিত হওয়া এবং শাসনব্যবস্থার মূল অভিসন্ধি আড়াল করতে Right of the Children to free and compulsory Education Act গৃহীত হয়েছিল ২০০৯ সালে যে আইনে ৬-১৪ বছরের সকল শিশু ও কিশোরের অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার পর থেকেই আমরা দেখে আসছি শিক্ষা কমিশনগুলির সুপারিশ এবং জাতীয় শিক্ষানীতির স্থিরীকৃত লক্ষ্য সম্পাদনের সার্বিক পরিকাঠামো তৈরি করার যথার্থ উদ্যোগ গ্রহণ না করে আবার কোনও শিক্ষা কমিশন বা কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৯৮৬ সালের শিক্ষানীতিতেও রাধাকৃষ্ণণ ও কোঠারি কমিশনের সুপারিশকে মান্যতা দিয়ে উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রে i) Greater access, ii) Equal access, iii) Quality and excellence iv) Relevance এবং v) Promotion of Social Values-এর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

অথচ, এই সুপারিশগুলি কার্যকর করার সদর্থক প্রয়োগ এবং তার মূল্যায়নের আগেই ২০০৫ সালে স্যাম পিত্রোদার পৌরোহিত্যে গঠিত হল National Knowledge Commission। আসলে শিক্ষা আমাদের দেশে এমনই এক খেলার সামগ্রী। এক একটা কমিশন গঠন হয়, সুপারিশ আসে— কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা ব্যতিরেকে শাসকদল শিক্ষার্থীদের ও শিক্ষাব্যবস্থার উত্তরণে সক্রিয় হয় না কোনও কালেই। আজকের জাতীয় শিক্ষানীতির মূল প্রতিপাদ্যগুলি চর্চা করতে গিয়ে পূর্ববর্তী শিক্ষানীতিগুলি তথা বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনের উপজীব্য বিষয়গুলি স্মরণ করা খুব অমূলক হবে বলে মনে হয় না।

২০০৯ সালে যশপাল কমিটির সুপারিশগুলোর দিকে যদি আমরা ফিরে তাকাই তো দেখব যশপাল কমিটিও শিক্ষার সংস্কারের প্রশ্নে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে সম্পূর্ণ স্বশাসন প্রদানের কথা বলেছিল। সেই সঙ্গে সুপারিশ ছিল বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলধারার শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ডেমোক্রেটিক গভার্নেন্স, এর বিষয়েও যথারীতি ঢালাও উল্লেখ আছে যশপাল কমিটির এই সুপারিশে। বলা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের ও বিভিন্ন অংশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করতে হবে। যশপাল কমিটির এই সুপারিশগুলি প্রণিধানযোগ্য কেননা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে সম্পূর্ণ স্বশাসন প্রদানের এই মিথ রচনা করা পুরনো থেকে নবতম শিক্ষানীতি সব ক্ষেত্রেই একটা রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডাপ্রসূত কৌশল— একথা বললে ভুল হবে না। এই স্বশাসন কথাটাই একটা চাতুরি হয়ে উঠেছে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে। এই স্বশাসনের নিগূঢ় অর্থ কী? স্বশাসনের সমস্ত নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি ধরা থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। এই নিয়ন্ত্রণ কি সত্যিই এই গরীব দেশের প্রান্তিক অংশের কায়ক্লেশে শিক্ষিত হওয়ায় ব্রতী ছাত্রছাত্রীদের জন্য পাবলিক ফান্ডেড এডুকেশনকে সুনিশ্চিত করবে? না কি এই নিয়ন্ত্রণ গ্যাটচুক্তির প্রতিভূ হিসেবে শিক্ষার পণ্যায়ন ও বাণিজ্যিকীরণের রাস্তা সুগম করার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করার এক কৌশলী পন্থা? আপাতদৃষ্টিতে এই স্বায়ত্তশাসন, এই অটোনমি শিক্ষার বেসরকারিকরণের প্রতিরোধ-সহায়ক বলে প্রতিভাত হলেও এই কেন্দ্রীকরণ National Council for Higher Education and Resarch (NCHER) বা NHERA-এর মাধ্যমে Public Funded Education সঙ্কোচনের অভিসন্ধি।

সাম্প্রতিক কালে একই আঙ্গিকে উচ্চশিক্ষায় প্রস্তাবিত হয়েছিল গ্রেডেড অটোনমির কথা। যে অটোনমির বলে একটি বড় অংশেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার অজুহাতে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক মঞ্জুরিতে কেন্দ্রীয় সরকারের দায়দায়িত্বের অনেকটাই। এই গ্রেডেড অটোনমির অন্তরালেও ছিল সেলফ-ফিনান্সিং কোর্স চালু করার যাবতীয় পরিকল্পনা। প্রস্তাবিত এই গ্রেডেড অটোনমিতে বিশ্ববিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভেদ রচনার প্রস্তাব ছিল। কোন বিশ্ববিদ্যালয় গবেষকদের ঠাই দিতে পারবে আর কোন বিশ্ববিদ্যালয় পারবে না তারও নিয়মাবলি তৈরি হয়েছিল। এইসব প্রসঙ্গ উ্থাপনের উদ্দেশ্য একটাই যে, যখন যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে শিক্ষানীতির প্রণয়ণে তাদের মূল দায়বদ্ধতার জায়গা যেটা— ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যত— সেটা কীভাবে উপেক্ষিত থেকেছে তা দেখা।

নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি ২৯শে জুলাই, ২০২০ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার অনুমোদন পায়। কিন্ত এই শিক্ষানীতির আদর্শগত ভিত্তি কী হতে চলেছে তা মে মাস থেকে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক ঘোষিত কিছু শিক্ষাবিষয়ক সিদ্ধান্তের মধ্যেই নিহিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী মোদি ১লা মে ২০২০ জাতীয় শিক্ষানীতি পুনরায় বিবেচনা সাপেক্ষে ঘোষণা করেন যে অনলাইন শিক্ষাই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম অবলম্বন হবে, এবং তা শিক্ষাব্যবস্থার গুণমানকে উন্নীত করবে বিশ্বমানে। অনলাইন শিক্ষাকে মান্যতা দিয়ে কর্পোরেট পুঁজিকে এই বিশাল দেশে মুনাফার রাস্তা প্রশস্ত করে দেওয়ার জন্য উপযুক্ত সময় বেছে নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কোভিড মহামারিতে এখন স্তব্ধ শিক্ষাব্যবস্থা সারা বিশ্বে। ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক নিরাপত্তা একটি স্পর্শকাতর বিষয় এবং তা সুরক্ষিত করতে সারা পৃথিবীতে এখন পঠনপাঠন স্তব্ধ হয়ে আছে। কনট্যাক্টবিহীন লেখাপড়ার একমাত্র উপায় এখন অনলাইন শিক্ষা। কিন্তু আমাদের এই দেশে শিক্ষার্থীদের সিংহভাগ যখন গরীব মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসে, অ্যানড্রয়েড ফোন, ল্যাপটপ, নেট কানেকশন শতকরা কতজন ছাত্রছাত্রীর থাকতে পারে সেই কথা বুঝেও বুঝলেন না মোদি শিক্ষায় বেসরকারিকরণের পথ সুগম করতে। এখন প্রশ্ন হল অনলাইন শিক্ষা যে শিক্ষার মানকে উন্নীত করবে সেই ভাবনার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নরেন্দ্র মোদি কোথা থেকে আহরণ করলেন? দ্বিতীয়ত, ভারতবর্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি অনলাইন শিক্ষাকে অবলম্বন করে শিক্ষার গুণমানে বিশ্বে প্রথম সারিতে পৌছে যাবে প্রধানমন্ত্রীর এই ধ্যানধারণার উৎস কী? Frontline পত্রিকার সাম্প্রতিকতম সংখ্যায় বিষয়ের অবতারণা করে বলা হয়েছে যে এই র‍্যাঙ্কিং Marketing Agencyদের মূল্যায়ন, যার মানদণ্ড হল Market Fundamentalism; আর এই মানদণ্ড শিক্ষার সামাজিক উদ্দেশ্যকে মান্যতা দেয় না। অনলাইন শিক্ষাবিষয়ক প্রধানমন্ত্রী মোদির ১লা মে ২০২০ তারিখের ঘোষণার অব্যবহিত পরে Googleএর Chief Executive Officer এদেশে মুকেশ আম্বানির Reliance Industryতে ব্যাপক বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত জানায়। এরপর একটি বাজার সমীক্ষার রিপোর্টে বলা হয় যে অনলাইন শিক্ষা পরবর্তী চার বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার অঙ্কের একটি বাজার তৈরি করবে (অনিল সাদগোপালের নিবন্ধ Decoding the agenda; Frontline, ২৮ আগস্ট)।

জুন মাসের ১১ তারিখে আবার প্রধানমন্ত্রী “আত্মনির্ভর ভারত” গঠনের আহ্বান জানান। এর অব্যবহিত পরেই মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রক (অধুনা শিক্ষামন্ত্রক) বিশ্বব্যাঙ্কের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদন করে ভারতবর্ষের ছটি রাজ্যে স্কুলশিক্ষায় বিশ্বব্যাঙ্কের হস্তক্ষেপে সিলমোহর দেয়। Frontline পত্রিকার ২৮ আগস্ট সংখ্যার ইতিমধ্যে উল্লেখিত নিবন্ধে প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে স্বঘোষিত “বিশ্বগুরু” নরেন্দ্র মোদির দেশ যদি নিজের দেশের স্কুলশিক্ষা পরিচালনায় বিশ্বব্যাঙ্কের দ্বারস্থ হয়, তো সেই দেশ কীভাবে ‘আত্মনির্ভর’ ভারতবর্ষ তৈরি করবে?

অতিমারিকে ব্যবহার করে শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা চরিতার্থ করার আর এক দৃষ্টান্ত সিবিএসই পাঠক্রমে ভার লাঘবের অজুহাতে নরেন্দ্র মোদি সরকারের পদক্ষেপ। করোনা পরিস্থিতির নিরিখে সিলেবাস সঙ্কোচন আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত বলেই অনেকে মনে করবেন। কিন্তু যদি একটু খুঁটিয়ে দেখা যায় যে অতিমারির আবহে ছাত্রছাত্রীদের পাঠক্রমের ভার লাঘব করার নামে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত কোন কোন অধ্যায়গুলিকে নিশানা করা হচ্ছে তা হলে বুঝতে অসুবিধা হবে না যে পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে মোদি সরকার কীভাবে ছাত্রছাত্রীদের এক ভ্রান্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চাইছে। সিলেবাস কমানোর অজুহাতে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সিবিএসই পাঠক্রমে Federalism, Democracy and Diversity, Nationalism, Secularism— ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্যের নিরিখে এইসব অপরিহার্য অধ্যায়গুলিকে নিশানা করা হয়েছে। নবম শ্রেণির সিলেবাসে সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের Democratic Rights-বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিকে তুলে নেওয়া হয়েছে। দশম শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত Democratic Politics II শীর্ষক অংশের তৃতীয় অধ্যায়ে Democracy and Diversity; চতুর্থ অধ্যায়ে Gender, Religion and Caste, পঞ্চম অধ্যায়ে Popular Struggle and Movements, অষ্টম অধ্যায়ে Challenges to Democracy বাদ পড়েছে। অনুরূপে একাদশ শ্রেণিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠক্রম থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে Citizenship, Nationalism এবং Secularism-এর মত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলি। দ্বাদশ শ্রেণিতে Contemporary World Politics অংশে বাদ পড়েছে Security in the Contemporary World এবং Environment And Natural Resources— এই দুটি অধ্যায়। আবার দ্বাদশ শ্রেণিতেই Politics in India since Independence শীর্ষক অধ্যায়ে Changing Nature of India’s Economic Development এবং Planning Commission And Five Years Plans— এই দুটি জরুরি অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ভারতের বৈদেশিক নীতির অংশে India’s Relations with Bangladesh, Nepal, Srilanka And Mayanmar-বিষয়ক আলোচনাগুলিও তুলে নেওয়া হয়েছে।

দশম শ্রেণির সোশাল সায়েন্সের পাঠ্যসূচিতে ‘Gender, Religion and Caste’ অধ্যায়ে আলোচিত হয় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কীভাবে এক সম্প্রদায়ের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে অন্য সম্প্রদায়কে বেশি সুযোগসুবিধা প্রদান করা হতে পারে। একই অধ্যায়ে অন্য একটি অংশে বলা হচ্ছে যে সমাজে উচ্চবর্ণের মানুষরা আজও দলিত এবং আদিবাসীদের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নত। এই অংশগুলি থেকে আগামী পরীক্ষায় কোনও প্রশ্ন আসবে না বলে সিবিএসই ঘোষণা করেছে। ইউজিসির প্রাক্তন চেয়ারম্যান এবং জেএনইউ-র Centre for Study of Regional Development-এর এমেরিটাস প্রফেসর সুকদেও থোরাট এ প্রসঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন ছাত্রছাত্রীরা এই বয়সে এগুলি না জানতে পেরে কি পঁচিশ বছর বয়সে পৌঁছে জানবে? এ প্রসঙ্গে তাঁর উক্তি: We have a problem of Gender, Caste and religious discrimination. If we want to sensitise the youth, they must be told about the persisting problems. Why are you hiding away these problems?

দ্বাদশ শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তকের একটি অংশে ব্যাখ্যা করা আছে নাগরিকত্বের অধিকার কিভাবে বিবিধ জাতি, বর্ণ, ধর্মের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। এই অধ্যায়ে আরও বিবৃত হয়েছে দিল্লিতে প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ কীভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, তাদের সংস্কৃতি ও ধর্মকে প্রতিফলিত করে। কিন্তু এই অংশটিকেও বাদ দেওয়া হচ্ছে পরিবর্তিত পাঠ্যসূচি থেকে৷ এই প্রসঙ্গে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের অধ্যাপিকা নন্দিনী সুন্দার বলেছেন “The title of all the chapters that are being dropped are values intrinsic to the constitution that the government has been attacking.”

দ্বাদশ শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞান পুস্তকের যে অংশে নমর্দা বাঁচাও আন্দোলন তথা সমসাময়িক Social Movements-এর গুরুত্ব আলোচিত হয়েছে সেই অংশও পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই প্রসঙ্গে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের পুরোধা-ব্যক্তিত্ব মেধা পাটেকার বলেছেন: “I see this as a conspiracy to keep the students unaware of the people’s struggles, which really challenged the establishment at any particular point in history. They want to wipe off these movements, as the people’s battles from the history of India.”

এছাড়াও সিলেবাসের যে অধ্যায়ে ১৯৮৪ সালের শিখনিধন কিংবা ২০০২ সালের দাঙ্গায় বিপুল সংখ্যায় মুসলিমদের হত্যার বিষয়গুলি আলোচিত হয়েছে বাদ পড়েছে সেই সব অংশগুলিও। কেননা এই ঘটনাগুলির প্রত্যেকটাই ভারতীয় সংবিধানের বহুত্ববাদের আদর্শকে কীভাবে কলঙ্কিত করে সেই কথাই তুলে ধরে। এই অংশটির মূল প্রতিপাদ্য হল Secularism, যা কিনা ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম সনাতন ঐতিহ্য।

ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার ভার এই প্যান্ডেমিক পরিস্থিতিতে লাঘব করার নামে আর যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পাঠক্রম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তা হল Federalism আর Local area government, যা কিনা গণতন্ত্রে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পুরনো কাঠামোর বিদ্যালয়শিক্ষাতে পাঠ্যক্রমের ভার লাঘব করার নামে ভারতবর্ষের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি তথা ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্যকে খর্ব করার এই চেষ্টা যে অপ্রত্যাশিত ছিল না তা বুঝতে আরওই অসুবিধা রইল না জাতীয় শিক্ষানীতি ঘোষণার পর। এখানে অবশ্য বিদ্যালয়শিক্ষার মূল কাঠামোটারই পুনর্বিন্যাস করা হল। বর্তমান ১০+২ পদ্ধতির পরিবর্তে নিয়ে আসা হচ্ছে ৫+৩+৩+৪ এই ১৫ বছরের বিদ্যালয়শিক্ষার নতুন ব্যবস্থা। বিদ্যালয়শিক্ষার এই নতুন ব্যবস্থা নানা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় রচিত যার অন্যতম লক্ষ্য বেসরকারিকরণের বহুবিধ রাস্তা খুলে দেওয়া। তিন বছরের প্রাক-প্রাথমিকের সঙ্গে প্রাইমারি শিক্ষার প্রথম দুই বছরকে জুড়ে শিশুদের “ভিত্তিপ্রস্তর স্তরে” পঠনপাঠনের বাধ্যবাধকতায় বেঁধে ফেলা তাদের মানসিক বিকাশকে ব্যাহত করবে। এই পদ্ধতি বিজ্ঞানসম্মত হতে পারে না। একেবারে শিশু অবস্থাতেই তাদের মধ্যে কিছু গোঁড়ামি ও সংস্কারকে প্রোথিত করে তাদের এক ভ্রান্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করার বা এক ভ্রান্ত মূল্যবোধে দীক্ষিত করার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যাবে এই ব্যবস্থায়। তদুপরি চতুর্থ শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম এবং নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার নতুন এই জটিল বিন্যাসে গরীব ঘর থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের স্কুলছুট হওয়ার প্রবণতা আরওই বাড়বে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের বিভাজন তুলে দেওয়া, বোর্ড পরীক্ষার পরিবর্তে সেমেস্টার প্রথার প্রবর্তন এবং National Testing Agency-র মাধ্যমে মূল্যায়ন— এই সমস্ত কিছুই বিদ্যালয়শিক্ষাতেও ব্যাপক বেসরকারি কোচিং সেন্টারের রমরমাকে সুনিশ্চিত করবে। আর একটি বিষয় এই প্রসঙ্গে গভীর চিন্তার উদ্রেক করে। এই যে পরিবর্তিত মাধ্যমিক স্তরে কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্যের বিভাজন তুলে দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের নিজের পছন্দমত বিষয় নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তা তাদের পরবর্তী উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে, বিশেষত ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি specialized শিক্ষার পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে।

শিক্ষার নতুন ব্যবস্থায় ত্রিভাষা শিক্ষার সুপারিশ করা হয়েছে প্রাথমিক স্তরেই। শিক্ষানীতির ৪.৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “As research clearly shows that children pick-up languages extremely quickly between the ages of 2 and 8 and that multilingualism has great cognitive benefits to young students, children will be exposed to different languages early on (but with a particular emphasis on the mother tongue), starting from the Foundational Stage onwards.”

একথা সত্যি যে ভাষাবিদরাও প্রমাণ করেছেন যে Language acquisition বা ভাষা আয়ত্ত করার ক্ষমতা

সবচেয়ে বেশি থাকে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত। কিন্তু ভারতবর্ষের মত গরীব দেশে অপুষ্টিতে ভোগা অগণিত শিশু ও কিশোরকে প্রথমত ৩ বছর বয়স থেকে প্রাথমিক শিক্ষার পঠনপাঠনে অন্তর্ভুক্ত করা এবং ৮ বছর বয়সের মধ্যে তাকে দুয়ের অধিক ভাষা শেখানোর নীতি তৈরি করা ন্যায়সঙ্গত নয়।

সংবিধানের অষ্টম শিডিউলে উল্লেখিত ভাষাগুলির কথা বলা হলেও প্রাচীন ভারতের বিপুল জ্ঞানভাণ্ডারের হদিশ পেতে সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার গুরুত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে প্রকারান্তরে। আবার বলা হয়েছে ”The three languages learned by children will be the choices of states, regions and of course the students themselves, so long as at least two of the three languages are native to India.” এই অংশের মধ্যেই নিহিত আছে ত্রিভাষা ফর্মুলাতে ইংরেজিকে একটি অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

উচ্চশিক্ষাতেও বড়সড় কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে আগেই বলা হয়েছে। প্রচলিত ব্যবস্থার বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অবলুপ্তি ঘটিয়ে একটা মার্কিন মডেল আনতে চলেছে এই শিক্ষানীতি যা আমাদের দেশে কোনওভাবেই প্রযোজ্য নয়। Teaching University এবং Reaserch University পৃথকীকরণের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া বলা হয়েছে Autonomous Degree প্রদানকারী কলেজের কথা।

পাশাপাশি আবার এই শিক্ষানীতিতে প্রাচীন ভারতে নালন্দা, তক্ষশীলার মত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উৎকর্ষের প্রসঙ্গ আনা হয়েছে। প্রাচীন ভারতের এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে Multidisciplinary পঠনপাঠনের রেওয়াজকে স্মরণ করে আবার বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় এই Multidisciplinary পদ্ধতির প্রসার ঘটানোর কথা বলা হয়েছে।

স্নাতক স্তরে চার বছরের পাঠক্রম রচনা করে সার্টিফিকেট, ডিপ্লোমা ও ডিগ্রি প্রদানের রাস্তা খোলা রাখা হয়েছে নতুন শিক্ষানীতিতে। এমফিল তুলে দেওয়া হচ্ছে অথচ চার বছরের স্নাতক ডিগ্রিকে গবেষণায় প্রবেশিকা হিসেবে বিশেষ ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে গুরুত্ব কমছে ম্নাতকোত্তর শিক্ষার। এদেশের শিক্ষায় পাশ্চাত্য মডেল লাগু করার পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়েছে Choice Based Credit System প্রয়োগ করে যা পঠনপাঠন ও মুল্যায়নকে এক প্রহসনে পরিণত করেছে। ইউনাটারি ইউনিভার্সিটিতে যদি বা CBCS চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, এদেশে কিন্তু বৃহত্তর শিক্ষাব্যবস্থায় এই সিস্টেম আদ্যন্ত অস্বচ্ছতা ও অনিয়মে ভরে উঠেছে ইতিমধ্যেই।

বলা বাহুল্য Choice Based Credit System-এর নামে নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়নের বহু আগেই দেশজুড়ে কার্যত Semester System চালু করা হয়েছে। এই মার্কিনী মডেল ইতিমধ্যেই ভারতবর্ষের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে পরিকাঠামোর অভাবে। জেএনইউ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত ইউনিটারি ইউনিভার্সিটিতে যেখানে intake capacity নিয়ন্ত্রিত সেখানে এই মডেল তাও বা সম্ভব, কিন্তু ১৩০ কোটির এই গরীব দেশে যেখানে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিকাঠামোর অভাবে মুমুর্ষু যেখানে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ন্যূনতম প্রয়োজনের ধারেকাছেও না, সে সমস্ত প্রতিষ্ঠানে Choice Based System এক বিলাসিতা মাত্র। কারণ, ছাত্রছাত্রীদের Choice নির্ভরশীল সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামোর উপর— সেখানে যে কোনও পাশ্চাত্য তথা মার্কিনী মডেল এক প্রহসন মাত্র। যেটা লক্ষণীয় বিষয় সেটা হল এই যে, আজ বেশ কয়েকবছর ধরেই কেন্দ্রীয় সরকার শিক্ষাব্যবস্থায় ধীরে ধীরে যে পরিবর্তনগুলো নিয়ে আসছে তা সে CBCS System প্রণয়ন হোক, সংবিধানে যুগ্ম তালিকায় থাকা শিক্ষার নীতি প্রণয়নে রাজ্যগুলিকে ক্রমশ তাৎপর্যহীন করে তোলাই হোক আর অতি সম্প্রতি সিবিএসই পাঠক্রমের ভার লাঘবের নামে সেই সব পাঠ্যসূচিকে মুছে দেওয়া যা ভারতীয় সংস্কৃতির বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে মহিমান্বিত করে, তা-ই হোক না কেন— সব কিছুরই চূড়ান্ত রূপ সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার অনুমোদন পাওয়া জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০। রাজনৈতিক অভিসন্ধিতে ভরা এই শিক্ষানীতিতে একদিকে যেমন গোঁড়ামি, কুসংস্কার, অসহিষ্ণুতার শিক্ষার প্রসার সুনিশ্চিত করতে যাবতীয় অবিজ্ঞানকে শিশু বয়স থেকে শিক্ষার্থীর মনে প্রোথিত করার ষড়যন্ত্র; অন্যদিকে তেমন মার্কিন মডেলকে সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ বহির্ভুতভাবে টেনে এনে এই গরীব দেশের প্রান্তিক ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষালাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে শিক্ষাব্যবস্থায় বেসরকারিকরণের রাস্তাকে মসৃণ করার চতুর নীতিকেই তুলে ধরা হয়েছে।

উচ্চশিক্ষার প্রসঙ্গে ফিরে এসে বলি নয়া শিক্ষানীতিতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির তিন রকমের শ্রেণিবিভাজন করা হয়েছে। যার একটি হল টিচিং ইউনিভার্সিটি এবং বাকি দুটি যথাক্রমে রিসার্চ ইউনিভার্সিটি ও অটোনমাস ইনস্টিটিউশান। যে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গবেষণার কাজে ক্ষেত্র প্রস্তুত করায় ব্রতী হবে সে স্নাতক স্তরে শিক্ষণে নিবেদিত-প্রাণ হবে না।

আপাত দৃষ্টিতে অত্যাধুনিক, কিন্তু ভারতবর্ষের মত আর্থসামাজিক দেশে কতটা প্রযোজ্য? আর জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০তে এই প্রসঙ্গে বলা হয়েছে এই তিন ধরনের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রথম দুই শ্রেণিরও লক্ষ্য হবে ক্রমান্বয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে উন্নীত হওয়া— অর্থাৎ একটি অটোনমাস উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া। এই আলোচনায় পূর্বেই বলা হয়েছে যে অটোনমি, গ্রেডেড অটোনমি ইত্যাদি নানা বাক্যবন্ধে স্বাধিকারের সংজ্ঞাটাই গুলিয়ে দিতে চায় নরেন্দ্র মোদি সরকার। স্বাধিকার অ্যাকাডেমিক— যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই তার পাঠক্রম, পরীক্ষাব্যবস্থা, পরীক্ষার মূল্যায়ন নিয়ন্ত্রণ করবার অধিকার পাবে— নাকি financial autonomy, যার অর্থ— বলা বাহুল্য, এই financial autonomy প্রদানের অর্থ পাবলিক ফান্ডেড এডুকেশন থেকে সরকারের হাত তুলে নেওয়া।

যার ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির fund generation-এর একমাত্র রাস্তা হবে ছাত্রছাত্রীদের টিউশন ফি বৃদ্ধি করা যা ক্রমশ শিক্ষাকে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও গরীব ছাত্রদের নাগালের বাইরে ফেলে দেবে। তাই এই অটোনমির অর্থ এই ১৩০ কোটির দেশে অগণিত গরীব ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষার আঙিনা থেকে নির্বাসিত করা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় কর্পোরেট পুঁজির অবাধ বিচরণকে সুনিশ্চিত করা। এখানেই বুঝে নিতে হবে নতুন শিক্ষানীতিতে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে বেসরকারি জনহিতকর প্রতিষ্ঠান বা Corporate Philanthropy-কে আহ্বান করে শিক্ষার পণ্যায়ণে আর একটি রাস্তা খুলে দেওয়া হল। এমন Corporate Philanthropy কটা খুঁজে পাওয়া যাবে যারা শুধুই দাতব্য করবে, বিনিময়ে নিজেদের কায়েমি স্বার্থ চরিতার্থ করবে না বা শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা করবে না?

জাতীয় শিক্ষানীতির অভিমুখ তাই খুবই স্পষ্ট। ছত্রে ছত্রে বিদেশি কায়দায় আধুনীকিকরণ, multiple entry, multiple exit। যখন খুশি পড়তে আসো, যখন খুশি পড়াশোনা ছাড়ো। প্রথমত যতটুকু পড়লে তার জন্য একটা কাগজ পাবে। আর পড়াশোনা ছেড়ে আবার যদি পড়তে আসবে, কেঁচেগন্ডুষ করতে হবে না। যেখানে শেষ করে গিয়েছিলে, সেইখান থেকেই আবার শুরু করতে থাকবে। তোমার পুরনো পড়ার Academic Credit গচ্ছিত থাকবে ব্যাঙ্কে, তার সঙ্গে যোগ হবে তোমার নতুন পড়ার স্কোর। কিন্তু বাস্তব হল এই যে, আমাদের দেশে এই ব্যবস্থা রূপায়িত হওয়া এক কষ্টকল্পনা। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে সেমেস্টার সিস্টেম, CBCS একইভাবে একেবারেই অবাস্তব পরিকল্পনা। কিছু প্রিভিলেজড উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বহুকাল আগেই এই পদ্ধতি রূপায়ণ করেছে। তারা পরিকাঠামোগতভাবে খুবই উন্নত। কিন্তু এই সেমেস্টার সিস্টেম, CBCS নিয়ে তাদের ঘিরেও বহুকাল ধরে উঠে আসছে অনেক সমালোচনা। আজ থেকে তিরিশ বছর আগেও ভারতবর্ষের একটি সেমেস্টার সিস্টেমে চলা কুলীন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পঠনপাঠন নিয়ে বলা হত সেই প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞান more horizontal than vertical।

পরিশেষে বলা দরকার যে, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০তে Value Education-এর প্রশ্নটি কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচিত হয়েছে, বা আদৌ গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হয়েছে কি? সার্বিকভাবে এই শিক্ষানীতি ভারতবর্ষের সংবিধানে সহিষ্ণুতার ঐতিহ্যতে যে আঘাত হেনেছে তা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। শিক্ষানীতির প্রারম্ভে ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্যের গৌরবগাথাকে মহিমান্বিত করা হলেও তার ব্যাখ্যায় স্বীকৃতি পায়নি বহুত্ববাদের ঐতিহ্য রচনায় বৈচিত্র্যের সঙ্গে ঐক্যের দিশারী অনেক গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন এবং অবদানের কথা। চূড়ান্ত জাতীয় শিক্ষানীতির প্রারম্ভে বলা হয়েছে “The curriculum must include basic arts, crafts, humanities, games, sports and fitness, languages, literature, culture and values, in addition to science and mathematics to develop all aspects and capabilities of learners’ and make education more well-rounded, useful and fulfilling to the learner. Education must build character, enable learners to be ethical, rational, compassionate, and caring, while at the same time prepare them for gainful, fulfilling employment.” ভারতীয় সংস্কৃতির এই সুমহান ঐতিহ্যের প্রতি এই পরম আস্থাভাজন দায়বদ্ধতার প্রতিশ্রুতি জাগিয়ে এই জাতীয় শিক্ষানীতি কার্যত বহুত্ববাদকে হনন করেছে সুকৌশলে। Frontline পত্রিকার ২৮শে আগস্ট সংখ্যায় এই প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: “The NEP’s incomplete and mispercieved framework of the “rich heritage of ancient and eternal Indian knowledge and thought” reveals its historical prejudices. While it accords adequate attention to the Brahminical traditions and sources of knowledge, the non-brahminical contribution to knowledge and pedagogy of debate and questioning by the Buddha and Mahavira and their challenge to social stratification and hierarchical social order stand ignored. The materialist philosophical treatises of Charvaka or Lokayata rooted in observation, empericism and conditional inference as sources of knowledge are not just undervalued but entirely erased from the NEP’s historical memory. অনিল সদগোপালের Decoding the Agenda নিবন্ধে বলা হয়েছে কিভাবে, জাতীয় শিক্ষানীতি Value Education-এর প্রশ্নে এড়িয়ে গিয়েছে সমগ্র মধ্যযুগকে, যে সময়ে ইসলামিক ধারা হিন্দু ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে Synretic Sufism-এর বিকাশ ঘটে, এবং ভারতবর্ষে জ্ঞানের উন্মেষ এক নতুন দিশার উৎপত্তি ঘটায় বিজ্ঞান, রাষ্ট্র পরিচালনা, বাণিজ্য, সাহিত্য, সঙ্গীত ও কলাসহ বিবিধ ক্ষেত্রে।

জাতীয় শিক্ষানীতির মুখবন্ধের একটি অংশে লেখা হয়েছে: “The rich heritage of ancient and eternal Indian knowledge (Jnan), wisdom (Pragyaa), and Truth (Satya) was always considered in Indian thought and Philosophy as the highest human goal. The aim of education in ancient India was not just the acquisition of knowledge as preparation for life in this world, or life beyond schooling, but for the complete realization and liberation of the self.” এই কথাগুলো থেকে একথা স্পষ্ট যে নতুন শিক্ষানীতির মূল ভিত্তি হবে প্রাচীন ভারতের দর্শন ও সংস্কৃতি। শিক্ষার্থীকে অনেকটাই বৈদিক যুগের শিক্ষার আদলে আত্মনির্ভরতার পথে এগোতে হবে। সব মিলিয়ে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠবে সঙ্ঘ পরিবারের নীতি ও চিন্তাধারার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে। তাই নতুন শিক্ষানীতিতে ভারতবর্ষের শিক্ষা ও সংস্কৃতির সুমহান ঐতিহ্যের গৌরবগাথা বর্ণনায় জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন ধারায় যেসব মনীষীদের অবদান স্বীকৃতি পেয়েছে আর যেসব যুগ ও যুগের মনীষীরা ব্রাত্য হয়েছেন তার রাজনীতি বুঝতেও অসুবিধা হয় না খুব একটা। প্রকাশিত নতুন শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে: “The Indian education system produced great scholars such as Charaka, Susruta, Aryabhatta, Varahamihira, Bhashkaracharya, Brahmagupta, Chanakya, Chakrapani Datta, Madhava, Panini, Patanjali, Nagarjuna, Goutama, Pingala, Sankardev, Maitreyi, Gargi and Thiruvalluvar, among numerous others, who made seminal contributions to world knowledge in diverse fields such as mathematics, astronomy, metallurgy, medical science and surgery, civil engineering, architecture, shipbuilding and navigation, yoga, fine arts, chess, and more.”

বিদ্বজ্জনেরা প্রশ্ন তুলেছেন ভারতবর্ষের সামাজিক পরিকাঠামোয় যে জাতপাতের বৈষম্যের ধারা যা নিয়ে জাতপাতবিরোধী আন্দোলনে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছেন সাবিত্রীভাই-জ্যোতিরাও ফুলে, আম্বেদকর (মহারাষ্ট্র), ই ভি রামস্বামী (তামিলনাড়ু) বা নারায়নাগুরু ও আয়ানকালী (কেরল), সেই সব ব্যক্তিত্বের উল্লেখ নেই কেন? প্রশ্ন উঠেছে সামাজিক পরিকাঠামোতে আজও কেন পিতৃতন্ত্র ও জাতপাতের বৈষম্য শিক্ষালাভের মৌলিক অধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে অন্তরায় থেকে গেছে? নতুন কিছু শব্দবন্ধের সৃষ্টি হয়েছে এই শিক্ষানীতিতে। তার অন্যতম Socio Economically Disadvantaged Groups (SEDG) এবং Under Represented Groups। এই শব্দবন্ধগুলি এনে নিশ্চুপে ঊহ্য রাখা হয়েছে SC/ST/OBC এই অংশের মানুষের অধিকারকে। দলিত ও বহুজনদের প্রতি শত শতাব্দীর বঞ্চনা ও নিপীড়নের ইতিহাসও স্বীকার করে না এই শিক্ষানীতি। সব মিলিয়ে ভারতীয় সংবিধানে স্বীকৃত এই অংশের মানুষের অধিকারকেও মুছে দেওয়ার দিকে বলিষ্ঠ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ নিয়েছে নতুন শিক্ষানীতি। এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এই সব বঞ্চিত অংশের মানুষদের সংরক্ষণের প্রশ্নটিও।

এহেন এক নতুন শিক্ষানীতির প্রণয়নে নরেন্দ্র মোদির সরকার অনেককাল ধরেই প্রস্ততি নিচ্ছে। কোভিড মহামারিতে দিশেহারা পৃথিবী, দিশেহারা আমাদের ভারতবর্ষ। রেল, বিএসএনএল, কয়লা শিল্প বেসরকারিকরণের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও বাণিজ্য করার রাস্তা সুগম করে দেওয়ার এই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগাতে বিন্দুমাত্র কসুর করলেন না প্রধানমন্ত্রী। এই নতুন শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংঘটিত করা আশু কর্তব্য এই দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকদের। প্রতিবাদ শুরুও হয়েছে দেশজুড়ে। পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকার সরব হয়েছে প্রতিবাদে এটা নিঃসন্দেহে ভরসার কথা। একটি বিশেষজ্ঞ কমিটিও গঠন করেছে রাজ্য সরকার নতুন শিক্ষানীতি খতিয়ে দেখতে। কিন্তু এ প্রসঙ্গে একটি বিষয় উত্থাপিত হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। ২০১৭ সালে রাজ্য বিধানসভায় উত্থাপিত হওয়া The West Bengal Universities and Colleges (Administration and Regulation) Bill-2017 যা সেই বছরই বিরোধীশূন্য বিধানসভায় পাশ হয়, তার ছত্রে ছত্রে রয়েছে এই শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীকরণের প্রচেষ্টা। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাধিকার হরণের এই আইনকে প্রত্যাহার না করে আজ কোন অধিকার বলে নতুন জাতীয় শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে রাজ্য সরকার? অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে পশ্চিমবঙ্গের মত সচেতন নাগরিকদের রাজ্যে এই শিক্ষা আইন নিয়ে যথাযথ প্রতিবাদ দানা বাঁধেনি। অথচ দেশেবিদেশে এই কালাকানুন নিয়ে চর্চা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ওয়েবকুটা এই কালাকানুনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিবাদ আন্দোলনই শুধু করেনি, আদালতে মামলা পর্যন্ত করেছে। দু বছরের কাছাকাছি বাদী-বিবাদী লড়াইয়ের পর আদালতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই আইনের একটি ধারায় অন্তবর্তীকালীন স্থগিতাদেশ পেয়েছে মামলাকারীরা।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলি পরিচালনায় সমস্ত প্রশাসনিক এবং স্বায়ত্তশাসনের অধিকারই কার্যত কেড়ে নেওয়া হয়েছে The West Bengal Universities and Colleges (Administration and Regulation) Act-2017 এই আইনে। Administration of Colleges অংশে কলেজ পরিচালন সমিতির সভাপতি নির্বাচনের পরিবর্তে রাজ্য সরকার কর্তৃক মনোনীত করবার নিয়ম তৈরি হয়েছে। পরিচালন সমিতির সভাপতির বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ হওয়াকে বাধ্যতামূলক না রেখে ‘শিক্ষা নিয়ে আগ্রহী’ ব্যক্তিকেও রাজ্য সরকার মনোনীত করতে পারবে।

কলেজ পরিচালন সমিতিতে নির্বাচিত শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী প্রতিনিধিত্বের সংখ্যা হ্রাস করা হয়েছে। কলেজ পরিচালন সমিতির মেয়াদ, যা নির্ধারণ করত বিশ্ববিদ্যালয় তা রাজ্য সরকার নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে। আইনের Employees of Colleges শীর্ষক Chapter III-তে বলা হয়েছে College Service Commission-এর recommendation কলেজশিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বলে গৃহীত হবে না। CSC কর্তৃক নির্বাচনের পরও কলেজে জয়েন করার আগে সমস্ত testimonial verification মেডিকেল ও পুলিশ ভেরিফিকেশনের মুখোমুখি হতে হবে (10 এর 2 উপধারা)। এই অংশের 11(2) উপধারায় বলা হয়েছে যে জনস্বার্থে রাজ্য সরকার যে কোনও শিক্ষক, লাইব্রেরিয়ান এবং অশিক্ষক কর্মীকে রাজ্যের যে কোনও জায়গায় বদলি করতে পারবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই আইন বলবত হওয়ার আগে সরকার-পোষিত কলেজে শিক্ষকদের নিয়োগে কোনও বদলির শর্তাবলি ছিল না। এই আইন কার্যকর হওয়ার পরে বদলিকে ঘিরে শুরু হয়েছে অর্থের লেনদেন সহ ব্যাপক অনিয়ম। আর জনস্বার্থে বদলির নিয়মের শিকার হচ্ছেন শিক্ষকরা কলেজ কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের রোষের কারণে। ইতিমধ্যে ব্যারাকপুর রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ও নদীয়ার পান্নাদেবী কলেজে বেশ কয়েকজন শিক্ষককে অন্যায়ভাবে বদলির অর্ডার ধরানো হয়েছে। আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন ওই শিক্ষকরা। মামলা চলেছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষা আইনে Chapter V-এ Administration of Universities বিষয়ক নির্দেশিকা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী পদ তৈরি করার অধিকার রাজ্য সরকার নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। অবসরের পর কোনও শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনে Extension প্রদানের বিষয়টিও রাজ্য সরকারই নিয়ন্ত্রণ করবে।

এছাড়াও বলা হয়েছে রাজ্য সরকারের নির্ধারিত ফরম্যাটে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়-কর্মীর Annual Confidential Report এবং Performance Appraisal Report, Asset Declaration Report জমা দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রকার স্বাধিকারে যথেচ্ছ সরকারি হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণকে সুনিশ্চিত করা হয়েছে 15(1) নং উপধারায়। বলা হয়েছে: The State Government shall have the power to enquire into the affairs of the University, as and when it considers necessary.”

জাতীয় শিক্ষানীতি বিষয়ে এই আলোচনাতে The West Bengal Universities and Colleges (Administration and Regulation) Act-2017-র প্রসঙ্গ টেনে আনা অনিবার্য ছিল এই কারণে যে শিক্ষার স্বাধিকার হরণ এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের প্রশ্নে কিছু কিছু জায়গায় অসম্ভব দৃষ্টিভঙ্গিগত মিল এই আইন ও জাতীয় শিক্ষানীতিতে। রাজ্য সরকার কর্তৃক রচিত এই আইনের ১৮ নং ধারায় আছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির অটোনমিতে হস্তক্ষেপ করে ক্ষমতার সব নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে নিয়ে নেওয়ার সমূহ আস্ফালন: The State Government shall have the power to give directions to any college or in any University in any matter not inconsistent with the provisions of this Act and the college or the University shall be duty bound to comply.

সদ্য প্রকাশিত জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন এ রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী এবং মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী। জাতীয় শিক্ষানীতি খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে রাজ্য সরকার। এই পদক্ষেপ খুবই আশাব্যঞ্জক। সেই সঙ্গে এই দাবীও উঠে আসে যে চরম কেন্দ্রীকরণ ও শিক্ষার স্বাধিকার হরণের অভিসন্ধিদুষ্ট জাতীয় শিক্ষানীতি প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক “The West Bengal Universities and Colleges (Administration and Regulation) Act-2017 শিক্ষা-আইনটিও।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. প্রাবুদ্ধ বাবু যে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন সে প্রসঙ্গে বলতে হয়, সরকার বেতন দেন বলেই নতুন আইন করে কর্মীর কার্য সম্পাদন যোগ্যতার মূল্যায়ন, বার্ষিক সম্পদের হিসাব সরকার চাইতেই পারেন। কিন্তু কর্মীর স্বাধীন মতপ্রকাশের উপর কি হস্তক্ষেপ করতে পারেন? শিক্ষা প্রশাসনে গণতান্ত্রিক পরিচালন ব্যবস্থাকে বির্সজন দিয়ে মনোনীত পরিচালন ব্যবস্থা প্রণয়ন কি সমর্থন যোগ্য? দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া একজন কর্মীকে জনস্বার্থে কোন প্রত্যন্তর অঞ্চলে বদলি কি গণতন্ত্রের অপব্যবহার নয়?

আপনার মতামত...