পণ্ডিতজির প্রতি অনুযোগ

দেবজ্যোতি মিশ্র

 


লেখক সুরকার, সমাজকর্মী

 

 

 

আমি পণ্ডিত যশরাজের গান বেশ মন দিয়ে শুনতে শুরু করেছি আশির দশকের মাঝের দিকে। কাজের সূত্রে মুম্বাই যাওয়া-আসার সুবাদে ওই সময় অনেক অনুষ্ঠানে ওঁর গান শুনতে পেয়েছি। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে মনে পড়ে পৃথ্বী থিয়েটারে একটি অনুষ্ঠানের কথা। মনে হয় জয়জয়ন্তী গেয়েছিলেন। অসাধারণ সে অভিজ্ঞতা! এছাড়া কলকাতার ডোভার লেনে আর সম্ভবত রামকৃষ্ণ মিশনে। ডোভার লেনে ওঁর গাওয়া আহির ভৈরব, আর একটি টোড়ি— সম্ভবত বিলাসখানি— এগুলো আমার কাছে অবিস্মরণীয় স্মৃতি।

এ তো গেল অনুষ্ঠানে গান শোনার কথা। আমাদের দৈনন্দিন চর্চায়ও তিনি অনুপস্থিত ছিলেন না। মনে আছে সলিলদার, সলিল চৌধুরীর, বাড়ির আড্ডার কথা। সে একটা বৌদ্ধিক চর্চার আখড়া ছিল আমাদের। সেখানে ভীমসেনজি, আমির খানসাহেব শোনার সঙ্গে সঙ্গে যশরাজজির গানও শোনা হয়েছে। সেখানে কে শ্রেষ্ঠ সে নিয়ে তর্কাতর্কিও হয়েছে অনেক। আমি ভীমসেনজির পক্ষে, বলাই বাহুল্য। ভীমসেনজির ভক্ত বলে তো বটেই, একদা তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণের সুযোগ হয়েছিল সে-ও একটা কারণ। সেসব অবশ্য অল্প বয়সের বালখিল্যতা।

যশরাজজির গান ছিল অসম্ভব মিষ্টি। এবং অবশ্যই অসম্ভব সুরেলা। সঙ্গীতের ব্যবহারে, সুরক্ষেপণের কৌশলে তিনি শ্রোতার মনে ঘোর লাগাতে জানতেন। আর অনায়াসে চার-পাঁচ ঘণ্টা পারফর্ম করতে পারতেন। যাঁরা জানেন, তাঁরা জানেন যে এতক্ষণ পারফর্ম করা মুখের কথা নয়। সকলে পারেন না। শুধু তাই নয়, এই দীর্ঘ সময় ধরে শ্রোতাকে নিবিষ্ট ও আবিষ্ট করে রাখার কৌশল তাঁর করায়ত্ত ছিল। এছাড়া ছিল তিনটি সপ্তকে সমান পারঙ্গমতা। কী করে যে ওইরকম প্রস্তুতি কারও থাকতে পারে, ভাবলে অবাক হতে হয়।

তবু যশরাজজির গান, গায়ন আমার প্রথম পছন্দ নয়। কেন?

আসলে ব্যক্তিগতভাবে বীররস আমার খুব প্রিয়। যে কারণে ভীমসেন যোশিজির গান আমাকে ভীষণ আকৃষ্ট করে। বা, ধরা যাক উস্তাদ আমির খানের সেই মারোয়া। উস্তাদজি একেবারে তদ্গত হয়ে, নিচুতে গেয়ে চলেছেন। আর কোথাও যেন যেতেই চাইছেন না, এমনভাবে বহুক্ষণ ধরে গেয়ে চলেছেন। এমন কী মিডল রেঞ্জেও আসছেন না। কাউকে কোথাও যেন সচকিত করতে চাইছেন না, কেবল নিজের মনের মধ্যে গেয়ে চলেছেন ওই গান। মহাভারতের কোনও বীর যোদ্ধা যেন একটি রক্তস্নাত দিনের শেষে প্রেয়সীর সঙ্গে বিশ্রম্ভালাপে রত। আমি সম্প্রতি এই গানের সূত্রে কাউকে বলছিলাম, ধরা যাক আইনস্টাইন সাহেবের বক্তৃতা চলছে। এই গান এমন যে তার ব্যাকগ্রাউন্ডেও চালিয়ে দেওয়া যায়। কোথাও একটুও ব্যাহত হতে হয় না, এমনই এই গানের সৌন্দর্য।

বীররস আমাকে প্রাণিত করে। আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে শিথিল হতে না দিয়ে নিজেকে আরও বেশি করে ছড়িয়ে দেবার প্রেরণা দেয়। আমাদের শ্রমজীবী ক্যান্টিন চলছে, তাতে নিত্যনতুন মানুষজনের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে, আর আমি দেখে চলেছি এই বিপুল বিশ্বের ভাঙচুর। আঘাত দেখছি, প্রত্যাঘাতও দেখছি না তা নয়। হয়তো করছিও, নিজেদের সাধ্যমত। এই যে বিপুলসংখ্যক মানুষ আসছেন, তাঁদের অনেকেই আমার কাজের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল নন। কিন্তু তাঁরা যে আমার আগামীর কাজকে স্পর্শ করে থাকবেন সেটা বেশ বুঝতে পারছি। আমি বামপন্থী। হতাশাগ্রস্ত আমি হতে পারব না। বীররস আমাকে সেই হতাশার উল্টোদিকে দৌড় করায়।

যাই হোক, ভীমসেনজির যদি বীররস, যশরাজজির তবে ভক্তি, বাৎসল্য ও শৃঙ্গার।

কিন্তু শুদ্ধ ভক্তিরসের কথা বলতে গেলে আমায় ডিভি পালুসকার আরও অনেক বেশি টানেন। ধরা যাক ললিতে ওঁর গাওয়া ‘আরে মন রাম’। শুনে মনে হয়, যেন দৃঢ় মুষ্টির থেকে একটি একটি করে পোষ মানানো স্বরপক্ষী বাতাসে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। অথবা শ্রী রাগে ‘হরিকে চরণ কমল নিসদিন সুমরে’। গানের শুরুর দিকের তানকারির কথাটা মনে করুন। ওঁর গানে আমি সমর্পণের অধিক আরাধ্যের সঙ্গে একটা ডিসকোর্স, প্রশ্নোত্তর খুঁজে পাই যা পণ্ডিত যশরাজের গানে তেমন করে পাই না। ভীমসেনজির গাওয়া ভজনগুলি তো লেজেন্ড হয়ে গিয়েছে। কিন্তু পালুসকর (অতি স্বল্প জীবনকাল পেলেন এই মহান শিল্পী) হোন বা ভীমসেন, স্ব-স্ব সাঙ্গীতিক পরিচিতিকে ভক্তিগানে সীমাবদ্ধ রাখেননি মোটেই। আর শ্রোতারাও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিবিধ অঙ্গনে এঁদের স্বচ্ছন্দ গতায়াত সসম্মানে মেনে নিয়েছেন।

অপরদিকে যশরাজজির ভক্তিরস একান্তভাবে উত্তর ভারতীয়, বা বলা যেতে পারে গো-বলয়ের ভক্তিরস। উত্তর ভারত থেকে পাঞ্জাবকে বাদ দেব ভেবেই গো-বলয়ের উল্লেখ করতে হল। এই ভক্তি হল অহৈতুকী ভক্তি। সম্রাটই দেবতা, বা দেবতাই সম্রাট— অর্থাৎ সব ক্ষমতার অধিকারী— এইরকমের একটা ধারণার বশবর্তী সেই ভক্তি। ওখানে ঈশ্বর বিপদে রক্ষা করেন, আর এখানে ‘এ নহে মোর প্রার্থনা’। ওই ভক্তিপ্রবাহে ঈশ্বরের সঙ্গে আমাদের মত ডায়ালগ বা ডিসকোর্স কোথায়? ‘দেবতারে প্রিয়’ করে তোলার স্পর্ধা নেই। ওদিকে তুলসীদাসজি থাকলে এদিকে আছেন লালন, রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, রবীন্দ্রনাথ। ওই ভক্তিরস তর্কসাপেক্ষ নয়। এই ভক্তিতে পদে-পদে প্রশ্ন। গুরু রামকৃষ্ণকে বিবেকানন্দ প্রশ্নে-প্রশ্নে জর্জরিত করতে পারেন। তাঁকে সেই অধিকার দেওয়া হয়। উত্তরে ধর্ম যদি ভক্তির উৎস এবং নিয়ামক হয়, এখানে সেই জায়গাটা দর্শনের। এই ঘাত-প্রতিঘাতের অভিজ্ঞান, আমার কাছে, বীররস ছাড়া তেমন করে তৈরি হয় না। ওঁর গান যখন শুনতে বসি ভাল লাগে। কিন্তু সেই গানের শেষে কোনও একটা গভীর দর্শনে জেগে ওঠা— যশরাজজির গান শুনে এমন আমার কখনও হয়নি, কখনও হয় না। এত সঙ্গতি নিয়েও সাম্রাজ্যবিস্তারে মনোযোগী হলেন না, পণ্ডিতজির প্রতি আমার এই এক অনুযোগ।

এত কিছু সত্ত্বেও চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের আহ্বানে সাড়া দিয়ে লিখতে যে বসলাম, তার কারণ আমার মনেই উঠতে থাকা এই প্রশ্ন— এত সৌন্দর্য, এই বিপুল ঐশ্বর্য থেকেও এমন কী নেই পণ্ডিত যশরাজের গানে? এই লেখাটা মূলত সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেয়েই। পাঠক, আপনি সে উত্তর পেলেন কি না জানা নেই, তবু প্রশ্নটি পেলেও পরিশ্রম সফল হয়েছে বলে মনে করব।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2616 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...