বাবা

মিত্রা ঘোষ চট্টোপাধ্যায়

 


লেখক স্বেচ্ছাবসরপ্রাপ্ত ভূবিজ্ঞানী, প্রকাশক, সম্পাদক, গদ্যকার। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কনিষ্ঠা কন্যা

 

 

 

বাবার জন্ম ১৯২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর বেঁজগাও গ্রামে, তখনকার ভারতবর্ষের ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে। তিনি হরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও সুরবালা দেবীর পুত্র। হরেন্দ্রনাথের প্রথম স্ত্রী বিনোদিনী প্রয়াত হন নাবালক সন্তান (তিন পুত্র— শচীন্দ্রনাথ, জীতেন্দ্রনাথ, ধীরেন্দ্রনাথ) এবং দুই কন্যা (মনতোষিনী, বিমলা)-দের রেখে। তখন বাড়ির নতুন বউ হয়ে এলেন সুরোবালা গাঙ্গুলি— বাবার মা, আমাদের ঠাকুমা। তাঁর তত্ত্বাবধানে বড় হন বিনোদিনী ঠাকুমার আর তাঁর নিজের পুত্রকন্যারা। বাবা তাঁদের পঞ্চম সন্তান, দ্বিতীয় পুত্র। বাবারা ছিলেন নয় ভাই আর আট বোন। শচীন্দ্র, ধীরেন্দ্র, জীতেন্দ্র, দ্বিজেন্দ্র, বীরেন্দ্র (ডাকনাম তুরতুরি), সত্যেন্দ্র, রমেন্দ্র, রবীন্দ্র এবং রথীন্দ্র। বোনেরা হলেন মনতোষিনী, বিমলা, লাবণ্য, সুজলা, কমলা, সুফলা, রমলা এবং মৃদুলা। আজ তাঁদের ভাইবোনেদের মধ্যে জীবিত আছেন ছোট দুই বোন রমলা গাঙ্গুলি ও মৃদুলা মুখার্জি আর এক ভাই আছেন কানাডাতে, রবীন চ্যাটার্জি।

আমাদের পরিবার: মা, বাবা, দিদি অর্চনা, ছোড়দা বুদ্ধদেব, কেয়া আর আমি। দাদা রুদ্র বোধ হয় তুলেছিল ছবিটা

আমরা পাঁচ ভাই বোন, অর্চনা, রুদ্র, বুদ্ধদেব, কেয়া আর আমি— মিত্রা। আমাদের অতি দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের ঠাকুর্দা হরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে আমরা দেখিনি। বাবার জিতুদা, জীতেন্দ্র জ্যাঠামশাইকেও দেখা হয়নি, তিনি স্কুলে সপ্তম-অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার বয়সে বাড়ির একটি বড় গাছ থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান। বাবার কাছে শুনেছি তাঁর কথা, বাবা একটি গ্রন্থাগার করেছিলেন ‘জীতেন্দ্র মেমোরিয়াল লাইব্রেরি’ নামে।

বাবা আর মার বিয়ে হয় ১৯৪৪ সালে, কোলকাতায়। বাবার তখন চব্বিশ আর মার ষোলো। বাবার বাড়ি ঢাকুরিয়ায় আর মায়ের বাড়ি ভবানীপুরের স্কুল রো-এ। মার নাম রানি ভবানী বাড়রি (ব্যানার্জি), ডাকনাম রানু। দাদু মধুসূদন বাড়রি ছিলেন আলিপুর কোর্টের মুহুরি। তাঁদের সাতটি কন্যা সন্তান— এর মধ্যে মা দ্বিতীয়। ১৯৪৪ সালে আমাদের ঠাকুরদাদা হরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর ইচ্ছেয় খুব তাড়াতাড়ি, পাত্রি রানি ভাবানীকে দেখে আসার দশ দিনের মধ্যেই বিয়ে ঠিক হয়। পরের ভাই সত্যেন্দ্ররও বিয়ে হয় ওই সময়ে। ঠাকুর্দা তার বছরখানেক পরে মারা যান।

মাকে খুব ভালোবাসতেন বাবা। অনেকেই বলতেন, তার রানু ডাকের মধ্যেই ভালোবাসার উত্তাপ আর গভীরতা ছিল; কবিতা ও সংসার-যাপনে, জীবনযুদ্ধে, স্ত্রীকে বন্ধু আর সহযোদ্ধা করে নিয়েছিলেন। তাঁর কবিতা সিক্ত হয়েছে, অন্য মাত্রা পেয়েছে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার শক্তি আর রসায়নে। কবির এই আদর আর স্বীকৃতি তার স্ত্রী রানি চট্টোপাধ্যায়ের বেশ খানিকটা প্রাপ্য।

বাবা পড়াশোনা করেছিলেন জগদ্বন্ধু ইন্সটিটিউশন এবং রিপন কলেজিয়েট স্কুলে। কলেজ করেছেন রিপন কলেজে। কর্মজীবন শুরু হয়েছিল জ্যাঠামশাই দ্বিজেন্দ্রনাথে রঢাকুরিয়া ব্যাঙ্কিং কর্পোরেশনে। যদিও বেকারত্ব, কখনও প্রুফরিডিং-এ কেটেছে অনেকটা সময়, আবার জগদ্বন্ধু এবং বাঘাযতীন স্কুলে শিক্ষকতাও করেছিলেন। পরবর্তী কাজ ১৯৫৬ থেকে তঁর মামার টিপারা (ত্রিপুরা) টি কর্পোরেশনে, যে চা বাগানের মালিক ছিলেন আমাদের ঠাকুর্দা হরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু বেশ কয়েক বছর কাজ করে, চাকরির টানাপোড়েন থেকে নিজেকে মুক্ত করেন, কবিতাই ছিল তাঁর প্যাশন, পেশা এবং সম্পূর্ণ জগত। কেন কবিতা লেখেন, এ প্রশ্নের সহজ উত্তর আসত এক বাক্যেই— ‘কবিতা লেখা ছাড়া আর কিছু পারি না বলে।’ তাঁর সারা জীবন ছিল সংগ্রামের— অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম। ভালোবাসার পৃথিবী তাঁর স্বপ্ন, তাই অ-ভালোবাসা, অন্যায়, বিভেদ-হিংসার বিরুদ্ধে সজাগ, মুখর থাকত কবির কলম; প্রতিবাদী কবি এই আখ্যাটির যথার্থতা আমি এখানেই দেখতে পাই। আসলে তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন। তাঁর কবিতার একটি পংক্তি উচ্চারণ করি: ‘এমন একটা পৃথিবী চাই, মায়ের আঁচলের মত। আর যেন সেই আঁচল জুড়ে গান থাকে যখন শিশুদের ঘুম পায়’।

বাবার ভুলোমনের অজস্র মজার মজার ঘটনা আমাদের সকলের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা, এবং যাঁরা বাড়িতে আসতেন তাঁদেরও। লিখতে বসলেই, কলম কোথায় গেল, চশমাটা পাচ্ছি না, লেখার খাতা, সিগারেটের প্যাকেট খুঁজে আন’— এই চলত প্রতিদিন।

খেতে আর খাওয়াতে, দুটোতেই বাবার আনন্দ। সিঙারা জিলাপি আর অমৃতি খুব প্রিয়। আমাদের প্রত্যেকের জন্মদিনে ঘুম থেকে উঠেই সিঙারা আর জিলাপি নিয়ে আসতেন। আম পুড়িয়ে শরবৎ, আচার বানাতেন— লেবু, বড়বড় লঙ্কা, আম, পাকা কুল এইসব দিয়ে। প্রয়োজনমতো হাত লাগিয়ে লুচি, নিমকি ভাজাতে বেজায় উত্সাহ ছিল। বাবার ঝোঁক ছিল হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা, এ ব্যাপারে অনেক পড়াশোনা আর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর।

আলিপুরে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে যখন লাইব্রেরিয়ানের পাঠক্রম শেষ করেন, অবসর পেলে প্রায়ই ঘুরে আসতেন চিড়িয়াখানায়। প্রাণীজগৎ নিয়ে গভীর আগ্রহ, পড়াশোনা, জ্ঞান ছিল তাঁর। চিড়িয়াখানায় ঘুরতে ঘুরতে আমরাও তাঁর কাছে শিখতাম, চাক্ষুষ জেনে যেতাম কত কিছু। পরিযায়ী পাখি কোনগুলো, কোথা থেকে কখন আসে চিড়িয়াখানায়, কোথায় যায় ওরা, শুনতাম বাবার কাছে। দু-তিনটে গন্ডার ছিল তখন; তার মধ্যে একটা নাকি বাবার বন্ধু। আমরা সত্যি বলেই ভাবতাম, দৌড়ে যেতাম সেই গন্ডারটার কাছাকাছি। বাড়িতেও অনেক সচিত্র বইপত্র পড়িয়ে আমাদের খুব ছোটবেলা থেকেই শিখিয়েছিলেন পৃথিবী আর গাছপালা, পশু-পাখির কথা। মুখে মুখে অঙ্ক কষা, অঙ্কের সহজ নিয়ম, বাংলা ইংরেজি ভূগোল ছাড়িয়ে বিজ্ঞানও সহজভাবে শিখিয়ে দিতেন, অনেক বই কিনে দিতেন প্রাত্যহিক জীবনে বিজ্ঞানকে বোঝা, পরীক্ষানিরীক্ষা করার জন্য। নিজের সন্তান, বিশাল একান্নবর্তী পরিবারের আর পাড়ার যত খুদে কিশোর তরুণদল, সকলের সঙ্গেই বেশ ভাব তাঁর। গল্পের বই, নাটক, খেলাধুলো, নাচ-গান, ব্যায়াম— যা কিছু শিশুদের শারীরিক আর মানসিক বিকাশের জন্য দরকার; আমাদের মননে, শারীরিক চর্চায় বাবাই সেই বীজ পুঁতে দিয়েছিলেন; নিত্য জলহাওয়া দিয়ে সস্নেহে বড় করতেন একএকটি চারাগাছ। বাবা আমাদের ইংরেজি, বাংলা ছড়া পাঠ করে শোনাতেন। গল্প বলতেন। তার মধ্যে একটা গল্পের চরিত্র ছিলেন বীরেন চাটুজ্জে বলে এক ভবঘুরে লোক। আমার পড়তে শেখারও আগে শুরু হয়েছিল বাবার পড়ে শোনানো ঠাকুরমার ঝুলি, দাদামশায়ের থলে, সুকুমার রায়ের আবোলতাবোল, হযবরল। নিজের পড়াও শুরু বাবার এনে দেওয়া বই থেকে। উপেন্দ্রকিশোর সমগ্র, বিদেশি রূপকথার অনুবাদ মোটা মোটা বই, হ্যান্স অ্যান্ডারসন, লীলা মজুমদারের হলদে পাখির পালক, টং লিং, খেরোর খাতা, ধনগোপাল মুখোপাধ্যায়ের যূথপতি আর চিত্রগ্রীব, সন্দেশ পত্রিকা থেকে গৌরী ধর্মপাল, আরও যত বই ছিল, বাবা এনে দিলে আমরা এক একজন করে পড়ে ফেলতাম। তাঁর এনে দেওয়া বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী আর চাঁদের পাহাড়, শরদিন্দুর সদাশিব, শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত আমার খুব প্রিয় তখন। বিদেশি ক্লাসিক্যাল বইয়ের অনুবাদ পড়াটা নেশার মত ছিল, শেষ না করে থামতে পারতাম না। বাবা এনে দিলেন ব্যোমকেশ বক্সি, প্রেমেন্দ্র মিত্রের মামাবাবু, জাপানি গোয়েন্দা হুকাকাশি-র বই, নলিনী রায়ের গোয়েন্দা গন্ডালু, হেমেন্দ্র কুমার রায়ের বিমল-কুমার আর বিদেশি গোয়েন্দা গল্পের অনুবাদ— শার্লক হোমস, ফাদার ব্রাউন, আগাথা ক্রিস্টির হারকুল পয়রো, মিস মার্পেল, পার্কার পাইন— কিছু বই সরাসরি ইংরেজিতেই পড়েছি। টিনটিনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি— বড় বড় হার্ডবাইন্ড বইগুলো একের পর এক কিনে আনতেন। গ্র্যাফিক্স বইয়ের মধ্যে ম্যানড্রেক, অরণ্যদেব, পুরনো হাঁদাভোদা, লরেল-হার্ডি প্রচুর পড়তাম— বাবাও আমার থেকে নিয়ে পড়তেন অরণ্যদেব। তাঁর কাছে গল্প শোনার সময় একসঙ্গে নাটকও করতাম গল্পের চরিত্র ভাগ করে নিয়ে— বিশেষ করে পাগলা দাশু। এক প্রজন্ম পরে, আমার মেয়ে ঝুমরি (পৌলোমী) আর দিদির মেয়ে তিতিন (মধুমিতা)-র সঙ্গেও নাটকের এই খেলা ছিল বাবার, তখনকার গল্পগুলো অন্য— গোপাল ভাঁড়, ডুবডুব-চমটক-কালিয়া এরকম কত কী। বাবা আমাদের খুবই উৎসাহ দিতেন লেখার। শুধু লেখা নয়, আমাদের প্রত্যেকের খেলাধুলা, এক্সারসাইজ, গান, আবৃত্তি, নাটক এমনকি নাচের জন্যও। সন্ধ্যাবেলা মাঠ থেকে ধুলোমাখা পায়ে বাড়ি ফিরলে, বাবা আমাদের পা ধুইয়েমুছিয়ে দিতেন। মুখে মুখে ছড়া আর অঙ্ক। ‘কিশোর সঞ্চয়ন’-এ বাবার লেখা থেকে একটু উদ্ধৃত করি— ‘এরপর বাবা আরেকটা ছড়া বানালেন: এক যে ছাতি/ মাথায় হাতি।/ এক যে রাগ/ ভীষণ বাঘ। কেয়া বলল, এ ছড়া তোমার আপ্সে দেখলে খুব বকবে। মিঠুন বলল, বকবে কেন? এ-তো খেলা। কেয়ে বলল, আপ্সে কি কেউ খেলা করে? মিঠুন বল্ল, কবিতাটা তুমি আপিসে লুকিয়ে রেখ। তাহলেই কেউ দেখতে পারবে না। …ছড়া বানানো এখানেই শেষ হতো। কিন্ত রাত্রে খেতে বসে বাবা পড়লেন ময়া মুশকিলে। ভাতো আর কেউ মুখ দেয় না। চিৎকার করে দু’বোন ছড়া কাটছে তো কাটছেই: এক যে ফানুষ/ ওড়ায় মানুষ’।

যখন স্কুলের ছাত্রী-সম্পাদক ছিলাম, স্কুলের সমস্ত অনুষ্ঠান, নাটক, কবিতা পড়া, সিরিয়াস প্রবন্ধ লেখা, দেয়াল সংবাদ, স্কুল ম্যাগাজিনের সম্পাদনা— সব কিছুতেই বাবার প্রত্যক্ষ পরামর্শ পেতাম।

যৌবনকালে তিনি অনুশীলন সমিতির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত ছিলেন। চারের দশকে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে কিছুদিন প্রাথমিক সদস্য ছিলেন। তাঁর কবিতায় প্রতিবাদী রূপটি তীব্র হয় ভারতে ১৯৬৯ সালে খাদ্য আন্দলন, ১৯৬১-র নাট্য নিয়ন্ত্রণ বিল বিরোধী আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ১৯৬৬-র খাদ্য আন্দোলন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ৭০-এ ইন্দিরা সরকারের এমারজেন্সি, প্রতিটি সঙ্কটকালে। ১৯৬২ সালে চিন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের  সময় প্রথমে চিনবিরোধী ভূমিকা নিলেও পরে নিজেই তাঁর সেই রাজনৈতিক অবস্থানকে ভুল বলে স্বীকার করেছিলেন তিনি। ১৯৬৭ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে আইন অমান্য করার অপরাধে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং অন্যান্যদের সঙ্গে কারাবরণ করেন। এমারজেন্সি এবং বন্দিমুক্তি আন্দলনের সময় তিনি ছিলেন সম্মুখ ফ্রন্টে। স্বাক্ষর সংগ্রহ, ইস্তেহার, অজস্র পোস্টারধর্মী কবিতা লিখে সমস্ত পত্রিকায় পাঠিয়ে দিতেন। দেশ ও মানুষের দুর্দিনে কবিতাই ছিল তাঁর যুদ্ধাস্ত্র। সাতের দশকে নকশাল তরুণতরুণীদের ওপরে পুলিশি নির্যাতন চরমে পৌঁছলে তিনি শুধু প্রতিবাদ জানাবার জন্য শতাধিক কবিতা লিখেছিলেন। ডাক্তারদের ওপর বামফ্রন্টের পুলিশ ও পার্টিকর্মীদের হামলার প্রতিবাদসভাতে তিনি অসুস্থ শরীরে উপস্থিত ছিলেন এবং সম্ভবত সেইটিই তাঁর জীবনের শেষ প্রতিবাদসভা।

ফুসফুসের ক্যান্সারের সঙ্গে দশ মাস যুদ্ধ করে আমাদের ১৪ স্টেশন রোড ঢাকুরিয়ার বাড়িতে, ১৯৮৫ সালের ১১ জুলাই সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাবা, যখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র পঁয়ষট্টি, মা রানি ভবানীর বয়স সাতান্ন। কবি ও মেডিকাল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওথোরাসিক সার্জন ভূমেন্দ্র গুহরায় তাঁর অপারেশন, কেমোথেরাপি এবং পরবর্তী চিকিৎসা করেন। এর পরে ভর্তি হন ঠাকুরপুকুরে ডাক্তার সরোজ গুপ্তের ক্যান্সার হাসপাতালে, রেডিয়েশন কোর্স ও সেরে ওঠার জন্য। সেখান থেকে বাড়িতে ফিরে এলেও জীবনের দীপ একটু একটু করে নিভে আসছিল তাঁর। হোমিওপ্যাথ ডাক্তার ভোলানাথ চক্রবর্তী এসে যেদিন দেখলেন, ১০ জুলাই, সে দিনই জানিয়ে গেলেন অন্তিম সময় উপস্থিত। লিখছিলেন কবিতা। অসাধারণ এক মানুষ ছিলেন তিনি, শুধু তাঁর কবিতার জন্য নয়— ভালোবাসা ও মানবিকতার জন্য, পিতৃত্বের অমৃত দানের জন্য। আমার সম্পূর্ণ জীবনে এমন দৃঢ় অথচ উদার, এমন মমতাময় অথচ অনমনীয় নির্ভীক মানুষ আমি আর একজনকেও পাইনি। তাঁর ভালোবাসার পাত্রদের অনেকেই আজ নেই। যাঁরা আছেন, তাঁরা সমাজের মেরুদণ্ডের মত, তাঁদের চারিপাশের মানুষের কাছে বটবৃক্ষর মত। তাঁরাই প্রকৃতপক্ষে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উত্তরসূরি, উত্তরাধিকারী এবং সহযোদ্ধা। তিনি বাবা ছিলেন বলেই হেলায় হারিয়েছি কত সম্পদ— আজ পর্যন্ত আত্মসাৎ করতে পারিনি, নিজেরও অর্জন করা হয়নি তেমন মনুষ্যত্ব, কিন্তু শিখেছি অনেক।

তাঁর কবিতা দিয়েই লেখা শেষ করি—

কন্যার জন্য একটি কবিতা

সারা বছর ফুল থাকে না,
গানের পাখি সারা বছর গান গায় না।
তবু স্বপ্ন থাকে।
চেনা মানুষ সারা বছর
কাছেই থাকে।
ফুল না থাকুক,
মানুষ থাকে।

(২৮ জানুয়ারি, ১৯৮৩; সংশোধিত ২৬ জুন, ১৯৮৫)


ছবিগুলি লেখিকার সৌজন্যে প্রাপ্ত

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2616 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...