ছোট নৌকা বড় গাঙ

শৈলেন সরকার 

 

এপারে বুড়োবুড়ির তট। ওপারে ছোট রাক্ষসখালি। মাঝখানে হার্ডিঞ্জ ক্রিক। হার্ডিঞ্জ ক্রিক ধরে আমরা এখন দক্ষিণে নেমে বঙ্গোপসাগরে পড়ব। সাগর ধরেই ফিরব আমরা। রসুলের কথায় এখন ভাটা, ঠাকুরানের মুখে পড়তে পড়তে জোয়ার ধরে নেব। অন্তত সাড়ে চার ঘন্টার পথ। বলল, শীতকাল তো, চিন্তার কিছু নেই।

বুড়োবুড়ির তট আসলে জি প্লট দ্বীপের দক্ষিণ। সুন্দরবনেরও। লাগোয়া নদীকে ওরা বলে গাং। সরকারের খাতায় নাম হার্ডিঞ্জ ক্রিক। অর্থাৎ সাগর থেকে ঢুকে পড়া নালা। সাগর বলতে অবশ্যই বঙ্গোপসাগর। হার্ডিঞ্জ ক্রিক চওড়া যথেষ্টই। কুমিরের উপদ্রব খুব। দ্বীপের এখানে ওখানে ঢুকে পড়া খাড়িতে ঝোপ-জঙ্গলে ডিম পারবে। হয়তো কুমিরের উপদ্রবের জন্যই নদীতে নেমে চিংড়ির মীন ধরতে নামা কোনও বউ বা মেয়ে চোখে পড়েনি এখনও। আমরা নেমেছিলাম দুপুর বারোটা নাগাদ, দ্বীপের একেবারে উত্তরে চাঁদমারি ঘাটে। সেই ঘন্টা চারের দূরের কে-প্লট নামের এক দ্বীপ থেকে গতকাল বিয়ে হওয়া বর-বউ নিয়ে। মেয়ের শ্বশুরবাড়ি ছোট রাক্ষসখালি। বর-বউকে ওখানে নামিয়ে রসুলের এই বুড়োবুড়ির তটে আসার কথা। এসেছেও। মিতাদের বাড়ি খাওয়া-দাওয়া চুকিয়ে ঘাটে এসে দেখি রসুল নৌকা নিয়ে মাঝনদীতে।

এই ফাঁকে একেবারে ছোট্ট করে ইতিহাসের একটু কথা। এই বুড়োবুড়ি বলতে স্থানীয় মানুষ শিব-পার্বতীর কথা বললেও, যে মন্দির নিয়ে কথা, সেটি আসলে ছিল বৌদ্ধ মঠই। পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর কথা অনুসারে এখান থেকে নদীর পর নদী আর দ্বীপের পর দ্বীপ পার করে পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ কিলোমিটার উত্তর-পুবে কঙ্কণ দীঘির জটার দেউল আর এই তটের বাজারের ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির ছিল একই ধাঁচের নির্মাণ। দুটোই বাংলার প্রাচীন পুরাকীর্তি। সময়কাল ওই পাল আমলের শেষ বা সেনেদের শুরু। কঙ্কণদীঘির বৌদ্ধ মঠ যেমন এখন জটার দেউল বা শিবের মন্দিরের পরিচিতি পেয়েছে তটের বাজারের মঠেরও পরিণতি একই। স্থানীয় স্কুলে এই ধ্বংসস্তুপ থেকে পাওয়া পোড়ামাটির পাত্র, মূর্তি, হাড়ি-কলসি বা অন্য অনেক কিছুই যত্ন করে রাখা। আছে পাথরে খোদাই করা নানা কথা, অচেনা হরফ। ধাতব মুদ্রা। ছিল নানা ডিজাইনের স্বর্ণালঙ্কার, আছেও। কিছু এর-ওর তার হাতে হাতে, কিছু বিক্রিও হয়ে গেছে। বাঘের পরিচিতি ছাড়া সুন্দরবনের অনেক দ্বীপই কিন্তু পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন চোরাচালানের আখড়া হিসেবেও বিখ্যাত।

আলাউদ্দিন নৌকার মোটরের হ্যান্ডেল ঘোরাতেই ভট্‌ভট্‌-ভট্‌ভট্‌ আর কালো ধোঁয়া। রসুলের হাঁক, ‘উঠে পড়, উঠে পড়, বেলা নেমে গেছে, অনেকটা পথ।’

নৌকায় পা দিয়ে প্রথম কয়েক মিনিট পেছনের ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা মিতা বা ওর পাড়া-প্রতিবেশীদের ক্রমে অস্পষ্ট হতে থাকা শরীর, ওদের দাঁড়িয়ে থাকা— আচ্ছন্ন করে রাখে সবাইকেই। বলতে গেলে কোন দূরের একেবারে অচেনা একদল মানুষের সঙ্গে ঘন্টা তিনেকের আত্মীয়তা। এইবার একসময় তটের ঘাটও বাইরে চলে যায় চোখের। তখন শুধুই ভট্‌ভট্‌-ভট্‌ভট্‌। এই এতক্ষণে যে যার মতো জায়গায় বসছে। জায়গা বলতে নৌকার ডালি আর পাটাতন। ডালি বলতে একেবারে ধারের নৌকার কাঠামোর জেগে থাকা কাঠের গায়ে। ডালির পিঠ বরাবর ঠিক নীচেই ছুটতে থাকা নদী। সবাই জায়গামতো বসার পর খেয়াল হল আরে নদী কোথায়, এ তো ক্রিক। ঢুকে পড়া সাগরের নালা, বড় গাঙের টুকরো। ডানদিক-বাঁদিকে এইটুকু সময়ের মধ্যেই অস্পষ্ট একেবারে। আর দুদিকের এই অস্পষ্টতাই যেন চুপ করিয়ে দিল সবাইকে। আলাউদ্দিন বলল, আসল সাগর পড়তে দেরি আছে, ডানদিকে ওই যে কালো কালো কিছু দেখা যাচ্ছে ওটা লোথিয়ান দ্বীপ। ওটা জঙ্গল, না বাঘ নেই ওখানে। পাখি প্রচুর আর সাপ। ডানদিকে আমরা ছিলাম যেখানে, সেই জি-প্লট চলছে এখনও। শীতের বেলা বলতে গেলে ভাটার টানের মতোই রাতের পেটে ঢোকার জন্য হুড়মুড় করে নামছে। নৌকায় আলো জ্বালানো হয়নি। চুপ করা মুখগুলি এখন কেউই আর কারও দিকে তাকিয়ে নেই সম্ভবত।

হঠাৎ করেই দূরের দিকে আওয়াজ জেগে উঠল কোনও। হঠাৎ করেই আমাদের নৌকার শব্দকে ছাপিয়ে একেবারে বুক-কাঁপানো শব্দ জেগে উঠল একটা। যেন বড় গাঙের জল ফুঁড়ে লাফিয়েই উঠল কিছু। দেখি অনেকটা অন্ধকার গায়ে জড়িয়ে আমাদের নৌকাটাকে পেছনে ফেলে ঊর্ধশ্বাসে ছুটছে। ট্রলার। আলাউদ্দিন বলল, ফিরছে সাগর থেকে। গিয়েছিল মাছ ধরতে। পনেরো-বিশদিন বা মাসখানেক মাছের কাজ করে তারপর। ট্রলারের মাথায় পতাকা উড়ছে হু-হু করে। সামনের দিকে দাঁড়িয়ে থাকা ফেট্টি মাথায় জনা তিনেক লোক। একেবারে সিনেমায় দেখা জলদস্যুদের মতোই। পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ওদের কেউ তাকিয়েও দেখল না আমাদের। দমকা বাতাসের মতোই আছড়ি-পিছড়ি ঢেউ তুলে আমাদের নৌকায় উপর-নীচ দুলুনি দিয়ে অদৃশ্য হল নিমেষেই। নিমেষেই, কেননা কুয়াশা তখন খুব দূর পর্যন্ত তাকাতে দিচ্ছে না তোমাকে। দুপাশ জুড়েই ঘষা কাচের অস্পষ্টতা ঘিরে ফেলেছে কখন। আকাশে মেঘ, কোনও তারা বা চারপাশ জুড়েই ছিটেফোটা আলোর চিহ্নমাত্র নেই কোথাও। বলতে না বলতে আর একটি ট্রলার। জেগে ওঠা শব্দ, হঠাৎ করেই মাথায় ফেট্টি বাঁধা লোক, উড়তে থাকা পতাকা। দমকা ঢেউ আর নৌকার উপর-নীচ দুলুনি। রসুল আলাউদ্দিনকে উপরে উঠে হাল ধরতে বলল। বলল, তুই ধর কিছুক্ষণ, আমি নীচে গিয়ে লম্ফটা জ্বালিয়ে আসি। হ্যাঁ, আর কে জানত আমাদের আয়ু ফুরিয়ে এসেছিল। আমাদের সবারই। অথচ কারও তা জানাই ছিল না।  ঠিক, এক ধরনের ভয় আমাদের গিলে ফেলেছিল। আমাদের পুরো অস্তিত্ব জুড়েই তখন ভট্‌ভট্‌-ভট্‌ভট্‌ ধ্বনি আর কিছু নেই।

আলাউদ্দিন উপরে উঠে হাল ধরেছে কি ধরেনি, বা রসুল নীচে নেমে লম্ফ জ্বালাবে মনে করে গ্যাস-লাইটারে টিপেছে কি টেপেনি। আমি তখন ছাউনির পেছনে। ইঞ্জিন লাগোয়া, একাই। আমি তখন এই কূল-পাড়হীন অন্ধকারে স্তব্ধ হয়ে পেছনে বসে মোটরের ঘুরন্ত ব্লেডের সঙ্গে ঘর্ষণে নোনা জলের ফসফরাসের জ্বলে ওঠা দেখছি। হঠাৎ করেই আলাউদ্দিনের চিৎকার, ‘রসুলদা, নৌকা।’ রসুল কী ভাবল বা কী শুনল কে জানে, নিমেষেই লাইটার বা লম্ফ ফেলে দুদ্দার করে ছাউনি থেকে বেরিয়ে পেছনে, আলাউদ্দিনকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে হাল ধরল নিজেই। আর কিছু বুঝতে না বুঝতেই নৌকা আচমকা একদিকে কাত হয়ে একেবারে ডোবে-ডোবে। সামনের দিক থেকে তুমুল আর্তনাদ। সবার। এমনকী রসুল-আলাউদ্দিনের ঠিক পেছনে বসে থাকা আমারও। আর একটু হলে আমি—। কী হয়েছিল কে জানে, আমাদের হাঁফ ফিরে আসতে না আসতেই নৌকা ফের আগের মতোই সোজা, সেই আগের মতোই ভট্‌ভট-ভট্‌ভট্‌। শুধু সামনে বসে থাকা মৌ বা ছোটনদের গলায় বেঁচে ফেরার হাঁফছাড়া ধ্বনি। আর একটু হলেই কী হত বা না হত। কিন্তু কী এমন হয়েছিল? ‘ও কিছু না, সাগরে হয় এমন।’ বুঝি, এড়িয়ে যাচ্ছে, রসুল বা আলাউদ্দিন দুজনই। রসুল এবার আর সামনে গেল না। আলাউদ্দিনকেই বলল, ছাউনির নীচে গিয়ে লম্ফটা জ্বালাতে। ‘কী হয়েছিল রসুল? তোমরা ওইরকম করলে, দেখলাম না তো কিছু।’ রসুল শুধু বলল, ‘ঠাকুরানে ঢুকি, বলছি।’ বললাম, ‘ঠাকুরানে ঢুকবে বলছ, কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না তো কিছুই। এক ফোঁটা আলোও তো নেই কোথাও। একটা তারা দেখা গেলেও না হয় হত।’ রসুল উত্তর করল না কোনও। আমার মাথায় এবার সেই সিঙ্গল সিলিন্ডারের ভূত ঢুকল। যদি ইঞ্জিনের কিছু হয়? বিকল হয় ইঞ্জিন। বিকল হলে নৌকা চলবে আর কোথায়? জলের টানে, যেদিকে স্রোত—। ভাটার টানে পাড় থেকে আরও দূরে আরও আরও দূরে সাগরের বুকে—। রসুলকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘পাড় এখান থেকে কতদূরে বলতে পারবে?’

—পাঁচ-ছয় কিলোমিটার।

আমি তখন গুলিয়ে ফেলেছি সবকিছু। কোন দিকে পাড় বা কোন দিকে শুধুই সাগর— বুঝে উঠতে পারছি না। বললাম, ‘পাড় ঠিক কোনদিকে বলো তো?’

—কেন বাঁ দিকে, আমরা এখন সীতারামপুর পার হচ্ছি।
—পার হচ্ছি মানে?
—মানে, বাঁ দিকে ছ কিলোমিটারের মতো গেলে সীতারামপুর পড়বে। জি-প্লটের মধ্যেই।

ছ কিলোমিটার শুনেই বুক শুকিয়ে আসে। তার মানে এখানে কিছু হলে চিৎকার করে গলা ফাটালেও শুনতে পাবে না কেউ। কিন্তু কিছু হলে চিৎকার বের হবে? চারপাশ জুড়ে শুধুই অন্ধকার। কিছু হলে জলে ভেসে যাওয়া ছাড়া কী করার থাকবে? কিছু হওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্তই। ভাবার মতো মন আর থাকবে তখন? সাঁতার দিয়ে কী হবে এখানে? সাঁতার জানলেও দিক জানো তুমি? আর ভাটার টান? সাঁতার কাটতে দেবে তোমাকে? জলের তলায় তোমার পা কে টানবে কে জানে? তোমার পা টেনে কোন অতল গভীরে—। আর কতক্ষণ ভাসবে, কত দূর ভাসবে, টান তোমাকে কোথায় নিয়ে যাবে? বুক ধরফর করতে থাকে আমার। ছোটন, রবীন, ছাড়াও মৌ, প্রসূন, দেবশ্রী। ওরা হয়তো ভয়ে কুঁকড়েই আছে ছাউনির নীচে। গলার সাড়া পাচ্ছি না কোনও।

নৌকার সেই ডুবে যাচ্ছি-ডুবে যাচ্ছি বাঁক খাওয়ার পর কতক্ষণ চলেছি কে জানে? সম্ভবত ছোটনই, বলল, চল গানের লড়াই খেলি। ওরা ছাউনির নীচে থাকলেও আলাউদ্দিন দেখি ছাউনির বাইরে সেই নৌকার সামনের দিকে গলুইয়ে বসে। গান কেউ পারবে না পারবে না করে শেষ পর্যন্ত ছোটনই শুরু করল। ও শেষ করার পর কে ধরবে কে? ধরতে চাইছে না কেউই। আসলে সবার মধ্যেই ভয় একেবারে গোটা শরীর পেঁচিয়েই আটকে আছে। গলার স্বর বের করার ক্ষমতাই আর নেই কারও। তবু, আমি জানি, ছোটন ওদের ভয় কাটানোর চেষ্টা করছে। আমি সেই পেছনেই, মোটরের ব্লেডে নোনা জলের ফসফরাসের জ্বলে ওঠা দেখছি। হঠাৎ করেই রসুল বলল, ‘গান থামাও, একেবারে শব্দ চলবে না। চুপ।’ রসুলের এক কথায়, জগৎটাই থেমে গেল একেবারে। আবার সেই ভুটভুটির কানে আটকে থাকা ধ্বনি। এই ধ্বনিই যেন আমাদের টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও। রসুলকে বললাম, ‘কী হবে গান গাইলে?’ বলল, ‘বাঁ দিকে ধনচির জঙ্গল, ডাকাতের ঠেক, দু-দুটো মেয়ে—।’

অন্ধকার তখন আমাদের সবারই মন জুড়ে। একেবারে চুপচাপ। ঠিক জানি, বাড়ির কথাই মনে পড়ছে সবার। ঘর, আলো, চেনা মানুষজন। হাসি। সব ছাড়িয়ে আমরা এখন কত দূরে? ফিরতে পারব কোনও দিন? সময় একেবারে স্থির। নৌকাও। আমরা সবাই, সবকিছু নিয়েই যেন পৌরাণিক কোনও প্রাণীর হাঁ-করা গহ্বরে। আমাদের কোনও অতীত নেই, ভবিষ্যৎ নেই। আমরা সবাই শুধু এক স্তব্ধ হয়ে থাকা মুহূর্তের অন্তর্গত।

কার যেন হাত পড়ল পিঠে।

আলাউদ্দিন। বলল, ভয় করছিল?

বললাম, আমরা এখন কোথায়, বলো তো? বলল, ঠাকুরানের মুখে ঢুকে গেছি। আর ঘন্টা দেড়েক। জোয়ার শুরু হয়ে গেছে।

মুহূর্তের মধ্যেই মনে হল, যেন এক উল্লাসধ্বনি জেগে উঠল কোথাও। যেন, আহ্‌, বেঁচে আছি, বেঁচে আছি। সামনে বসে থাকা ওরা কেউ কিছু জানে না এখনও। আমরা এখন সাগর ছাড়িয়ে ঠাকুরানের মোহনা হয়ে নদীতে ঢুকছি, আমরা যে এখন সব ভয়ের বাইরে—। আলাউদ্দিনকে বললাম, আমরা তো এখনও সেই অন্ধকারেই। চারপাশ জুড়ে তো আলোর চিহ্নই নেই কোথাও, বুঝলি কী করে? আলাউদ্দিনের কথায়, তাকান বাঁ দিকে। দেখতে পাচ্ছেন কিছু?

—কী দেখব, সেই অন্ধকারই তো।
—ভালো করে দেখুন, দেখুন খুবই অস্পষ্ট কালো কালো একটা রেখা না?

ঠিক দেখলাম কিনা কে জানে, যেন ওর কথাতেই মনে হল সত্যিই কালো রেখার মতো কিছু। বলল, মোহনার মুখে ঠাকুরান এখানে অন্তত তেরো-চৌদ্দ কিলোমিটার চওড়া। জোয়ার শুরু হয়ে গেছে। বাঁ দিকে এল-প্লট, পাড় থেকে আমরা অন্তত চার-পাঁচ কিলোমিটার দূরে। ডান দিকে ফরেস্ট, তা অবশ্য অনেকটাই দূর, দেখা যাবে না এই অন্ধকারে। বলল, খুব ভয় পেয়েছিলেন না?

বললাম, ওই যে তুই রসুলকে ডেকে ‘ওটা কী’ বলে চিৎকার জুড়লি, কী হয়েছিল তখন?

সেই কুয়াশায় মাত্র হাল ধরেই ও নাকি একেবারে মুখোমুখি কোনও নৌকা বলে ভুল করেছিল। ভেবেছিল আলো না জ্বালিয়ে নৌকা রেখে কেউ—। মনে হয়েছিল যেন ধাক্কা লাগবে তক্ষুনি। বলল, ওটা আসলে ছিল কস্তুরী। কস্তুরী আবার কী? বলল, রসুলদারও ভুল ছিল, এই ভাটায় সাগর দিয়ে আসাটা ঠিক হয়নি। বলতে পারেন, আমাদের এতগুলি মানুষের আজ নতুন করে জন্ম হল। দম আটকে আসে আমার। ওর কথামতো নৌকা এখন ঠাকুরান নদীতে ঢুকে গেছে। জোয়ারের টানে আমরা একেবারে আমাদের সেই কে-প্লট বরাবরই ছুটছি। আর ঘন্টা খানেকের মধ্যেই—।

—কিন্তু কী ছিল ওটা, কস্তুরী কী?

এক জাতীয় ঝিনুক ধরনের পোকা নাকি একজনের গায়ে আরেকজন করে জড়িয়ে, একেবারে উইপোকার ঢিবির মতো উঁচু হতে হতে, সেই জলের তলা থেকে, একেবারে কংক্রিটের পিলারের মতো—। ক বছর আগে এক পুলিশের লঞ্চ নাকি বুঝতে না পেরে, একজনেরও নাকি প্রাণ বাঁচেনি। সবার লাশও নাকি খুঁজে পায়নি শেষ পর্যন্ত। বললাম, থাক নৌকা পাড়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত বলার দরকার নেই কাউকে।

সেদিন যারা এক নৌকায় ছিলাম, যারা একই সঙ্গে মৃত্যুভয় জড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অন্ধকারে শুধু এক ভট্‌ভট্‌-ভট্‌ভট্‌ ধ্বনিতে ডুবে গিয়ে একেবারে নিশ্চিত এক অন্ধকার সুড়ঙ্গপথের মুখে দাঁড়িয়েছিলাম— আজ তাদের কে কোথায় আছে জানা নেই আর। ভাটার টান নাকি জোয়ারের চেয়েও সাংঘাতিক। একেবারে কিছুই না বুঝতে দিয়ে হুড়মুড়-হুড়মুড় করে, নিমেষেই তুমি দেখলে গভীর অন্ধকারে কোথাও আর পাড়ের আর চিহ্ন নেই কোনও। সেদিনের কথা মনে পড়লে তুমুল টানের কথাই শুধু মনে পড়ে। কে কোথায় ভেসে যাচ্ছি কে জানে?

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...