অশৌচ

শঙ্খমণি গোস্বামী

 

বছর দেড়েক আগেকার ঘটনা। প্রতিদিনের মত বাবা সন্ধেবেলা হাঁটতে বেরিয়েছেন। সাধারণত ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফিরে আসেন। কিন্তু সেদিন আড়াই ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পরও আসছেন না। এবং এই সময়টায় মোবাইল ব্যবহারে বাবার ভীষণ অনীহা। এটা বাবার একা থাকার সময়। এদিকে বাড়িতে উৎকণ্ঠায় আমাদের আধমরা অবস্থা। তৃতীয়বার হারা উদ্দেশ্যে খুঁজতে বেরোবার ঠিক আগে বাবা ফিরে এলেন। গেট দিয়ে ঢুকতে না ঢুকতে মায়ের অনিবার্য প্রশ্নবাণ ধেয়ে এল— “কোথায় গিয়েছিলে? এত দেরি হল কেন?” বাবা শান্তভাবে বাইরের দরজাটার ছিটকিনি তুলে মায়ের মুখোমুখি হয়ে, স্মিত হেসে উত্তর দিলেন— “শ্মশানে গিয়েছিলাম। এখানকার ব্যবস্থাপনা কেমন, দেখে এলাম। কয়েকদিন পরেই তো যেতে হবে। তখন তো আর দেখতে পাব না কীভাবে কী হয়!” উত্তর শুনে মা-ভাই কাঁদো কাঁদো। কিন্তু আমি হেসে ফেলেছিলাম মৃত্যু সম্পর্কে বাবার এই অদ্ভুত উদাসীনতা দেখে। মুখে যে যাই বলুক, মৃত্যু সম্পর্কে সবার মনেই অল্পবিস্তর ভয় থাকে। মরতে কে চায় হঠকারী ছাড়া? আমি তো চাই না এখনও পর্যন্ত। “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। … … … তা যদি না পারি তবে, বাঁচি যত কাল/তোমাদেরই মাঝখানে লভি যেন ঠাঁই।/তোমরা তুলিবে বলে সকাল বিকাল/নব নব সঙ্গীতের কুসুম ফুটাই।/হাসিমুখে নিও ফুল, তারপরে হায়/ফেলে দিও ফুল, যদি সে ফুল শুকায়।” (‘প্রাণ’, ‘কড়ি ও কোমল’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। বাবা নিজে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন বলেই বারবার বলতেন— “ভালোমন্দ যাহাই আসুক, সত্যেরে লও সহজে।” ছোট থেকে বাবার মুখে কথাটা শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। সেই কারণেই বোধহয় সেদিন হেসে ফেলেছিলাম। বাবা বৈদ্যুতিক চুল্লি সেদিনের আগে দেখেননি।

কিন্তু একান্ত পারিবারিক গল্প হঠাৎ বলছি কেন? সেটা এবার বলব। ২৪ অক্টোবর বাবা চিরদিনের মত আগুনের গুহায় ঢুকে গেলেন। কদিন আমরা কৃচ্ছ্রসাধন করলাম। কয়েকদিন যানবাহনে ঘোরাফেরার সময় অভিনব অভিজ্ঞতা হল। প্রথম দিন আমি একা অটোর পিছনের সিটে বসেছি, আরও দুজনের জায়গা খালি। লক্ষ করছিলাম থামাবার জন্য হাত দেখিয়েও যেই আমার দিকে চোখ যাচ্ছে, সবাই কবীর সুমনের ভাষায়— “তাক করে উদাসীন, আকাশকুসুম টিক টিক…” করে ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলেন। অটোওয়ালার ডাকে সাড়া দিচ্ছিলেন না। এরকম কয়েকবার হওয়ার পর, কিছুটা অপরাধবোধ থেকেই ওনাকে বললাম— “আমি কি সামনে গিয়ে বসব? আমার মনে হচ্ছে আপনি অনেকগুলো ভাড়া মিস করছেন।” ভদ্রলোক মুখে হাসি টেনে বললেন— “আপনি পিছনেই বসুন।” এরপর পাঁচ মিনিটও হয়নি, একজন অভিজাত চেহারা ও পোশাকের মধ্যবয়স্ক মহিলা অটো থামালেন, তারপর উঠতে গিয়ে আমাকে দেখে পরিষ্কার করে বললেন— “তোমার অটোতে অশৌচ আছে। যাব না।” স্বাভাবিকভাবে আমার খুব কান্না পাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু পেল না। বরং বেদম হাসি পেল। শেষ পর্যন্ত সিটও খালি থাকল না অবশ্য।

অশৌচ মানে অপরিষ্কার, অপরিচ্ছন্ন, অপবিত্র। নিজের পবিত্রতা সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা নেই। তবে চুল-দাড়ি-নখ ছাড়া তো মোটামুটি পরিচ্ছন্নই ছিলাম! এই কয়েকদিনের জন্য সমাজ যে পোশাক ঠিক করে দেয়, সেটাই পরেছিলাম। তা সত্ত্বেও আমি পরিত্যাজ্য হলাম কেন? যে হিন্দু সমাজ এই সময়ে কিছু নিয়ম পালনের কথা বলে, সেই সমাজই আবার আংশিকভাবে ব্যক্তিবিশেষকে বর্জনও করবে— এটা স্বাভাবিক? এ তো সমাজকর্তাদের চূড়ান্ত স্ববিরোধিতা। যখন মানুষের মন খুব দুর্বল থাকে, তখন নিয়মের নিগড়ে তাঁকে মানসিকভাবে বারবার আঘাত করার বিভিন্ন রীতি বর্জনীয় বলে মনে হয়েছে প্রতি পদে। অবশ্য এই কয়েকদিনে বিভিন্ন জায়গায় আশাতীত ভালো ব্যবহারও যে পেয়েছি, সেই কথাটা না বললে অন্যায় হবে।

কয়েকদিনের জন্য হলেও ‘দ্য আনটাচেবল’ হয়ে বাঁচতে কেমন লাগে, সেটা কিছুটা বুঝলাম। আজ বাদে কাল ন্যাড়া মাথায় চুল গজিয়ে যাবে, আমি মিশে যাব জনারণ্যে। কিন্তু অস্পৃশ্য হওয়ার অভিজ্ঞতা আমৃত্যু মনে থাকবে।

সমস্ত পারলৌকিক কাজে ‘প্রেত’ শব্দটা বারবার ঘুরেফিরে আসে কেন? আমাদের বাবাকে ‘প্রেত’ ভাবতে যাব কেন? এ তো চরম মানসিক অত্যাচার। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। ক্লাস ফাইভে এক বছর হিন্দি ছিল, আর সেভেন-এইট দু বছর সংস্কৃত। যে সব মন্ত্রগুলো বললাম, তার বেশিরভাগেরই মানে পুরোপুরি বুঝলাম না, সঠিক উচ্চারণও করলাম না। শুধু অনুকরণ করে ঠোঁট নাড়িয়ে গেলাম। কেন? কেউ কেউ বিছানায় বসার উপক্রম করতেই চেয়ার এগিয়ে দিলেন! কেন? সবচেয়ে বড় কথা, অশৌচান্তে সমাজস্বীকৃত আয়োজনের ব্যবস্থা করতে বেশ পরিশ্রম করতে হয়। প্রায় অনাহারে থেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত পরিবারের পক্ষে সে কাজ সম্পূর্ণ সুস্থভাবে করা কি আদৌ সম্ভব? এখন এত কথা বলছি, কারণ অপ্রিয় সত্যি কথাটা হল— “প্রতিবাদী কণ্ঠগুলো টাকার ব্যাপার/প্রতিবাদ করতে গেলেও খাবারদাবার।”

আজকাল বিয়ের বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণপত্রের নীচে অনেকে পরিষ্কার লিখে দেন— “দয়া করে সঙ্গে কোনও উপহার আনবেন না।” ব্যক্তিগতভাবে আমার এটা ভীষণ অপমানজনক মনে হয় নিমন্ত্রিতের পক্ষে। নেমন্তন্ন যখন করলেনই, তখন তিনি আসবেন কি না, খাবেন কি না, উপহার আনবেন কি না— সেটা তাঁর উপরেই ছেড়ে দেওয়া ভালো। নইলে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়। আমার তো যে কোনও উপহার পেতে দারুণ লাগে, দিতেও। কিন্তু তাই বলে শ্রাদ্ধবাসরে উপহার! আগে অন্যদের ক্ষেত্রে দেখেছি , এবার আমাদের বেলায় ঘটল। অনেকেরই শ্রাদ্ধের খাবারে অরুচি থাকে। বেশিরভাগ নিমন্ত্রিত রজনীগন্ধার মালা, স্টিক, বড়জোর সঙ্গে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে যান। জলপাইগুড়িতে বড় হয়েছি, বরাবর এমনটাই দেখেছি, করেছি। দক্ষিণবঙ্গে আজকাল দেখছি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানেও অনেকে উপহার নিয়ে আসেন। এসেছেন। এই আবহে কি উপহার মানায়? সর্বোপরি ব্যাপারটা কী লেনদেনের পর্যায়ে চলে যায় না? ফোন করে নেমন্তন্ন ও নগদ উপহার— দুটোই সমানভাবে বর্জনীয় বলে মনে করি। না হলে এই দুইয়ের চাপে পড়ে সামাজিকতার পরিসরটা মাঝখান থেকে ভ্যানিশ হয়ে যায়। হবিষ্যান্ন কিনে আনার সময় না-ই থাকতে পারে, তাতে অসুবিধে নেই। কিন্তু এ বাবদ মূল্য ধরে দেওয়াটা বড্ড গায়ে লাগে। আর এমন একটা উদ্দেশ্যে এটা করা হয়, যে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রিফিউজও করা যায় না কড়াভাবে। ওই মুহূর্তে সেটা করলে অন্যকে অপমান করা হয়, স্বর্গতকেও। রাজদ্বারে শ্মশানে চ য তিষ্ঠত স বান্ধব। কেউ কাউকে ধন্য করছে না, দয়া করছে না, করুণা করছে না, কৃতার্থ করছে না বা উদ্ধারও করছে না— এই কথাটা মনে রাখা দরকার।

অনেকে হয়ত বলবেন, তা এতই যখন হাসি পায়, তখন এত সব সামাজিক রীতি মানলেন কেন? সবকিছু হেসে উড়িয়ে দিলেই তো পারতেন। তাঁরা ঠিকই বলবেন। আসলে এমন একটা ঘটনার অভিঘাতে কয়েকদিন তর্ক করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলাম। কয়েকটা দিন কেটেছে যন্ত্রচালিতের মতন। উঠতে বললে উঠেছি, বসতে বললে বসেছি। এখন ক্রমেই পিতৃবিয়োগের শোকও সহনীয় হয়ে উঠছে। একটা সম্বোধন জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছে শুধু— বাবা।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...