অসঙ্গতির সঙ্গত — ১৬তম পর্ব

হিন্দোল ভট্টাচার্য

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

আমাদের সবচেয়ে বড় অসঙ্গতির জায়গা সম্ভবত আমরাই। এর অন্যতম কারণ হল, আমরা এ কথা স্বীকার করতে ভয় পাই যে আমরা জগতের প্রায় কিছুই বুঝতে পারি না। যেটুকু বুঝি, তা এতটাই আমাদের প্রেক্ষিত থেকে এক ক্ষুদ্র অংশ, যে তা নিয়ে নিশ্চিত থাকেন তাঁরাই, যাঁরা, অনিশ্চয়তায় যাপনকে এক অসুস্থতা বলে মনে করেন। তাঁদের মানসিক শান্তির জন্য সেই সব নিশ্চয়তা কতটা এবং কতদিন কাজে লাগে, তা অবশ্য জানি না, কিন্তু এ কথা ঠিক, এই নিশ্চয়তাকে ধ্রুব জ্ঞান করতে করতে এমন ভাবনাও তাঁদের মধ্যে এসে যায়, যে, যা বা যেটুকু তাঁরা ভাবছেন, তা-ই সত্য। আমরা কী করে ধারণা করতে পারি কী সত্য এবং কীভাবে সত্য তা নিয়ে? ধরা যাক, এই যে সৃষ্টির কাজে কবি বা শিল্পীরা মগ্ন, তাঁরা কি সত্যসন্ধান করার জন্যই শিল্পচর্চা করছেন না কি আত্মানুসন্ধান  করার জন্য শিল্পচর্চা করছেন? একজন বিজ্ঞানী যদি সত্যসন্ধান করার জন্য বিজ্ঞানের সাধনা করেন, তবে তা সাধনা করা হবে কি? সত্য বলতে কী বোঝায়? এই মহাজগতে কোনও কিছু নির্দিষ্ট সত্য বলে আছে কিনা, সে বিষয়েই সন্দেহ জাগে। সত্য যদি কিছু থেকে থাকে, তবে, তা ব্যক্তিনিরপেক্ষ। আর অসঙ্গতির জায়গাটি হল, যদি তা এমন ধ্রুব সত্য হয়, তবে জগৎ বহুকাল আগেই থেমে যেত। আমার প্রেক্ষিতে এবং আমার মতো কোটি কোটি মানুষের প্রেক্ষিতে সত্য অসংখ্য। এমনকী সত্য স্বয়ং পরিবর্তনশীল। কারণ আমরা যেগুলিকে সত্য বলে ভাবি, সেগুলি সম্ভবত সত্যের ব্যাখ্যা, সত্যের উদাহরণ, সত্যের বিকাশ ( ম্যানিফেস্টেশন) এবং সত্যের রূপ। কিন্তু এ সবকিছুই ক্ষণিকের। পরবর্তী কোনও ক্ষণেই এগুলি পরিবর্তিত হয়ে যায়। তাহলে, আছে কি তেমন নির্দিষ্ট সত্য, যাকে অনুসন্ধান করছি বলেই শিল্পচর্চা করছি? বা, আদৌ কি তাকে অনুসন্ধান করছি? না কি এক পরম শূন্যতার বিপন্ন বিস্ময়ের বিপন্নতায় রচনা করছি আমাদের ক্ষণকালের নশ্বরতাগুলিকে?

এই সব সম্পর্কে সত্যিই কিছুই জানি না। এই যে বারবার সঙ্গতিবিহীনতার কথা বলছি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অসঙ্গতিই বস্তুর প্রকৃত স্বভাব। অসত্য-এর নানারূপের লীলা এবং সত্যের নানা সম্ভাবনা সম্পর্কে আমাদের অসঙ্গতিই জীবনচর্চা, দর্শনচর্চা, শিল্পচর্চা এমনকী বিজ্ঞানচর্চাও। কারণ আমরা এতটাই ক্ষুদ্র, যে আমাদের  পক্ষে সত্য সম্পর্কে ধারণা করতে পারার অজ্ঞ ঘোষণা করাটি একধরনের অসম্পূর্ণতাকে পূর্ণতা হিসেবে ভাবার মতো। কিন্তু কেন করি আমরা এমন? কেন আমরা এ কথা যদি বুঝিও যে সত্য বলে এক ও ধ্রুব বলে কিছু হয় না, বা, তাকে অনুসন্ধান করাটি অনেকটা দিগন্তের দিকে দৌড়ে যাওয়ার মতো, তাহলেও, আমরা যেটুকু জানি, তা নিয়ে সঙ্ঘ গড়ে তুলি, মানুষকে শাসন করতে থাকি, সেই সত্যের চিরসত্য হয়ে ওঠার ধারণা দিয়ে, গড়ে তুলি ধর্মগ্রন্থ? গড়ে তুলি সত্যের অনুশাসন, যে সত্য আদতেই নেই? আমরা তো বিভিন্ন অসম্পূর্ণ রূপের কিয়দংশের ম্যানিফেস্টেশন দেখতে পাই, বা বুঝতে পারি বা অনুভব করতে পারি মাত্র। তা দিয়ে কীভাবে অনুধাবন করে, তাকে একটা মহাজাগতিক শাসনের আওতায় নিয়ে আসি ? এ হল একেবারেই মানুষের ক্ষুদ্র অস্তিত্বের সমস্যা। যে যত ক্ষুদ্র, তার ঘোষণা ততই বিরাট, যদিও ফাঁপা। তবে এটুকু দিয়েই হয়তো আমরা ক্ষান্ত হতে পারি না। কারণ এই প্রবণতা তৈরি করে মানুষের এক চরম সামাজিক রাজনৈতিক সমস্যা। ধর্ম যার অন্যতম, ফ্যাসিবাদ যার অন্যতম। পৃথিবীতে মানুষের ইতিহাস হল ধর্ম ও ফ্যাসিবাদের শাসন ও অত্যাচারের ইতিহাস। তার বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধের ইতিহাস। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ম, রাজনীতি ও ফ্যাসিবাদের বিভিন্ন রূপ মানবসভ্যতার আদিকাল থেকেই এক তীব্র অত্যাচারী ভূমিকায় মানুষের উপর হত্যাকারীর খাঁড়া নামিয়ে এনেছে। মানবসমাজে তৈরি করেছে ঈশ্বর সংক্রান্ত এক সাম্রাজ্যবাদী ধারণা, যা গণতন্ত্রেও মানুষের অস্তিত্বকে শাসন করেছে। তথাকথিত ধর্মবিরোধী নাস্তিক সমাজতান্ত্রিক ধারণার ভিত্তি যে মার্কসবাদ, তাকেও বিপ্লবী লেনিন ঘোষণা করেছিলেন ‘সর্বশক্তিমান, কারণ ইহা সত্য’ বলে। ফলে, ধর্মের অনুপ্রবেশ সেখানেও ঘটেছে। মার্কসবাদের থেকে অতি দূরে কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠনগুলি হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্মের সমাজতান্ত্রিক সংগঠন। ধর্ম কিন্তু যায়নি।

আমরা সমস্ত কিছুর মধ্যে যে একটা শৃঙ্খলা খুঁজে চলেছি, যে সঙ্গতি খুঁজে চলেছি, যা না থাকলে আমরা পাগলই হয়ে যাব বলে মনে হয়, তাও একপ্রকার আমাদের অসহায়তা। কারণ জগতের স্বভাব যে আসলে অসঙ্গতি, তা মেনে নিতে আমাদের প্রবল সমস্যা। এই যে আমিও লিখলাম, জগতের স্বভাব যে আসলে অসঙ্গতি, এটিও এত নিশ্চিত ভাবে আমি বলতে পারছি কেমন করে? এই জায়গাতে এসেই থমকে যেতে হয়। নিজেদের সীমাবদ্ধতাগুলিকে মেনে নিতে হবে আমাদের। আর সেই সীমাবদ্ধতাকে কখনওই শেষ কথা জেনে যাওয়ার রাস্তা হিসেবে মনে করার অভ্যেসকেই ছাড়তে হবে। কিন্তু এমন যদি করতে পারতাম আমরা, তাহলে সম্ভবত, আরও একটি সম্ভাবনার কথা মনে আসবেই। তা হল পৃথিবীটা মানুষের বসবাসের যোগ্য হয়ে উঠত। কিন্তু ধর্ম, রাজনীতি এবং ফ্যাসিবাদ তা করতে দেবে বলে মনে হয় না। কারণ শিল্প, কাব্য, দর্শন, বিজ্ঞান সমস্ত সংসারেই বাসা বেঁধেছে এই বলপূর্বক ধারণার ফ্যাসিবাদ। সঙ্গতি খোঁজার, কারণ প্রতিষ্ঠার, ‘এক’ ও ‘ধ্রুব’-কে অনুসরণের এমন এক আত্মঘাতী মিছিল, যা মানুষকে বৃহত্তর দর্শনের অনেক দূরে নিয়ে চলেছে।

বাক্য ও মনের অতীত এই অনুভূতিমালাকে আমাদের সঙ্গতিপূর্ণ করে তোলার কারণ নেই। এর স্বভাব হল অসঙ্গতি। গোটা মহাজগতেরই মধ্যে কাজ করছে এক তীব্র র‍্যান্ডম ইচ্ছে। এই ইচ্ছে কেউ যে ভাবছে তা মনে হয় না। বস্তুর ইচ্ছে, বস্তুহীনতার ইচ্ছে। শূন্যতার ইচ্ছে। শূন্যতাবিহীন শূন্যতার ইচ্ছে। যেমন ধরুন, আপনার মনের মধ্যে কেউ বসে আছে, যে মনকেও দেখছে। যে আপনার জন্মের আগের অবস্থার সাক্ষী, আবার মৃত্যুর পরের অবস্থারও সাক্ষী। কিন্তু যেহেতু সে আপনার বুদ্ধি এবং মনের অধীন নয়, তাই আপনি তাকে দেখতে পাবেন না। তিনি কি ঈশ্বর? তিনি কি শয়তান? তিনি কি আত্মা? আপনি যদি তার জন্য আপনার মতো করে কোনও একটি শব্দ দেন, তাহলেও হবে সম্ভবত। এই যে অদ্ভুত এক বাক্য ও মনের অতীত সত্ত্বার কথা আমি ভাবি, এই ভাবাটা কি কোনও সত্যের ইঙ্গিত করছে? না কি সেটিও সত্য নয়। সত্যের একটি সম্ভাবনা মাত্র?

জিজ্ঞাসাচিহ্নের কাছেই আসলে সব ভাবনাকে নিয়ে চলে যেতে হয়। আর এই জিজ্ঞাসাচিহ্ন কোনও সমাপ্তির কথা ঘোষণা করে না। একটা লেখার যেমন কোনও শুরু বা শেষ হয় না। পৃথিবীর কোন ঔপন্যাসিক বা কবি বা গল্পকার বা প্রাবন্ধিক বলতে পারবেন যে তাঁর লেখাটি শেষ হয়েছে? তিনি কি আসলে কোনও লেখা শেষ করেন না কি সাময়িক বিরতি নেন? কোনও অন্য লেখা কি আগের কোনও লেখার থেকেই শুরু হয় না? পৃথিবীর কোনও কবিতাও কি আসলে শেষ হয়? আমাদের ভাবনা কি শেষ হয়? এই মহাজগতের কি শেষ আছে কোনও? শুরুও কি আছে? দিক রয়েছে শুধু। উপর নীচে এপাশে ওপাশে সর্বত্র অসংখ্য দিক। যত বিন্দু তত দিক। যত দিক, তত বিন্দু। অসীমের মধ্যে বসে আমরা অসীমের দিকে এগোই। অথবা নামি। বা উঠি। বা কোথাও যাই না।

অথচ আমাদের সকলের জীবন, এ মহাজগতের সমস্ত কিছুর জীবনই মাঝপথে শুরু হয়ে মাঝপথে শেষ। অসমাপিকা ক্রিয়াই আমাদের ভবিতব্য। আমাদের সব লেখা অসমাপ্ত একটার পর একটা দরজা খুলে যায় কোথাও। একটার পর একটা জানলাও। একটা ঘর হয় খুব বড় হতে হতে দিগন্ত হয়ে যায় নয়তো বা খুব ছোট হতে হতে বিন্দুর চেয়েও ক্ষুদ্র হয়ে যায়। এ হেন অবস্থায় বলতে পারি আমাদের সমগ্র অস্তিত্বই অর্থহীন। কারণ আমরা অর্থ খোঁজার চেষ্টা করি মাত্র। কেন চেষ্টা করি, তা আমাদের মানবসভ্যতার ডিএনএ-তেই রয়েছে।

অসঙ্গতির এই লেখার সঙ্গে সঙ্গত করার মতো কেউ নেই। শুরু নেই। শেষও নেই। অন্য কোথাও এই লেখা আবার শুরু হবে। অন্য কোনও নামে। অন্য কোনও রূপে হয়তো বা।

 

(ক্রমশ অন্য কোনও লেখায় ফের দেখা হবে)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. চিন্তার খোরাক। দারুণ লেখা। হিন্দোলের গদ্য আমার প্রিয়। এই পর্বগুলি অসামান্য হচ্ছে।

  2. সত্যের স্বরূপ যেভাবে উন্মোচন করা হয়েছে লেখাটিতে, তা এককথায় অনবদ্য। সত্যিই তো এই পরিবর্তনশীল জগতে একটি সত্য বলে কিছু নেই। প্রতিটি সত্যই প্রসঙ্গনির্ভর। মেটাফিজ়িক্যালি সত্য হচ্ছে কোনও সত্তার প্রকাশ।

আপনার মতামত...