ফাঁসির দিনক্ষণ

সাত্যকি হালদার

 

অতঃপর দূরবর্তী এক শহরে এক সঙ্গে তিন আসামির ফাঁসির দিন ঘোষণা হয়ে গেল।

দূরবর্তী বলতে আরব সাগরের দিকে সেই শহর। সেখানে স্থানীয় চার্চ, সামুদ্রিক খাঁড়ি, পর্যটকদের আনাগোনা। সেখানে বছর চার আগে বেড়াতে আসা বিদেশি ট্যুরিস্ট দম্পতিকে আটকে রেখে খুন করে ফেলেছিল তিনজন।

তখন দেশ জুড়ে খবর হয়েছিল। প্রচলিত রাজনীতির তরজা। যদিও শেষ পর্যন্ত ধরা পড়া তিনজনের কোনওরকম রাজনৈতিক যোগ বেরোয়নি। তারা নিতান্ত আসামি-ই। খুনি। আড়ালে থাকা সমুদ্র তীরের ওই সব জনপদে এক সময় তিনজনেই ছিল ছিঁচকে চোর। পরে হাই-রোড লাগোয়া এলাকায় ছিনতাইয়ে হাত পাকায়। সে-সব করতে করতেই বেড়াতে আসা দম্পতিকে অপরহরণ করে ও সামলাতে না পেরে তাদের খুন করে ফেলে।

আসামি গ্রেপ্তারে পুলিশের সময় লেগেছিল সপ্তাহ খানেক। তার মধ্যেই অবশ্য তরজা, মিছিল, ফাঁসি চাই-য়ের পোস্টার। দেশের রাজধানীর যেখানে সংসদ, রাষ্ট্রপতি ভবন, তার আশেপাশেও গ্রেপ্তার, বিচার আর ফাঁসির দাবিতে ক দিন বিক্ষোভ চলেছে। সেই সময় কাগজে প্রায় প্রতিদিনই বিদেশি সেই স্বামী-স্ত্রীর ছবি। সন্ধেবেলা টেলিভিশনের বাগবিতণ্ডাতেও ধিক্কার, অপরাধ-পরিসংখ্যান আর মৃত্যুদণ্ডের সওয়াল। দেশের লোক সকালবেলা উপুড় হয়ে যেত খবরের কাগজের পাতায়। প্রথমে আশা করা হয়েছিল রাজনীতির ধারাবাহিক স্ক্যান্ডালে আর একটি ছত্রছায়া প্রকাশ হতে চলেছে। দু-একটি সংবাদমাধ্যম খানিকটা এগিয়ে ছিল সেদিকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই, বহু ঘনঘটার শেষে জালে পড়ল তিন ছিঁচকে চোর। একজন পার্টটাইম লরির খালাসি, একজন বেসরকারি অফিসের ঝাড়ুদার, শেষজন একটা গ্যারেজে কাজ করে ও সেখানেই খায়-ঘুমায়। আইনি পদ্ধতিতে ক বছর সময় লাগলেও এরা কেউই প্রথমে আইনজীবী পায়নি। কেউ দাঁড়াতে রাজি হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত এক আইনজীবী এদের হয়ে খানিক দৌড়দৌড়ি করলেও রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন খারিজের পর ফাঁসির দিন নির্ধারিত হয়ে গেল।

না। ওই সমুদ্র লাগোয়া শহরের সঙ্গে আমাদের ছোট শহর দিনহাটার কোনও মিল ছিল না। তখন নয়, এখনও নেই। ওখানে যখন মৌসুমী বাতাস দিনহাটায় তখন গরমের শেষ দিক। দিনহাটায় শীতের ভাব আসে পুজোর পরপর, ওখানে সেভাবে পুজো নেই, শীত আসে দেরিতে। তবু যেদিন সকালের কাগজে ফাঁসির দিন ঘোষণা হওয়া তিন ছিঁচকে চোরের ছবি বার হল, দিনহাটা স্কুলের সদ্য রিটায়ার হওয়া ভগীরথ স্যারের বুকে সেদিন চিনচিনে একটু ব্যথা হল। কাগজে লিখে দিয়েছে আর ঠিক চোদ্দ দিন। ফাঁসি মকুবের সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষ। এ বার চটপট একজন জল্লাদ খুঁজে ফেলার পালা। ভগীরথ স্যার কাগজ ভাঁজ করে খানিকক্ষণ বসে থেকে তারপর উঠে বাজারে চলে গেলেন।

না, তিনি ফাঁসির পক্ষ বা বিপক্ষ, কোনও দিকে নন। এমন বিষয়ে ভাবেননি কখনও। তার এক মাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে মুর্শিদাবাদের খাগড়ায়। দিনহাটা মাস্টার-পাড়ায় চাকরির শেষ দিকে বানানো একতলা বাড়ি, সেখানে তিনি ও তাঁর স্ত্রী থাকেন। স্ত্রীর হাঁটুর ব্যথার চিকিৎসার জন্য তিনি শিলিগুড়িতে এক অস্থি-বিশেষজ্ঞের চেম্বারে গত বছর বার তিনেক গেছেন। সেখানে তেমন ফল-লাভ হয়নি। নি-রিপ্লেসমেন্টের নিদান শোনার পর তিনি ফালাকাটায় এক জড়িবুটি কবিরাজের কাছে হাঁটছেন। জড়িবুটি নিয়েও তাঁর বিশ্বাস বা অবিশ্বাস নেই। তৃণমূল, বিজেপি, বামফ্রন্ট, এ-সব নিয়েও তিনি ভাবেন না। দিনহাটার কমল গুহর ছেলে ফরোয়ার্ড ব্লক ছেড়ে তৃণমূল হলে সারা জেলা যখন বিপক্ষে বা পক্ষে, তিনি খলে হাতে তখন বাজারে গেছেন। জড়িবুটির সান্ত্বনা এইটুকু যে সেখানে যাওয়ার পর গত তিন মাসে স্ত্রীর হাঁটুর ব্যথা নতুন করে বাড়েনি বা কমেনি।

এ-মতো ভগীরথ স্যার মাছ-সবজি-কাপড় কাচা সাবান কিনতে কিনতে ভাবলেন ওই তিন ছিঁচকে চোর নিশ্চয়ই জেনে গেছে তাদের আয়ু আর মাত্র তেরোটি রাত।

প্রতিবেশী সন্তোষ গুহ হাইপাওয়ারের চশমার ভেতর দিয়ে তাকিয়ে সন্ধের বেঞ্চে বললেন, ছিঁচকে আর কেন বলছেন মশাই! বলুন খুনে, মার্ডারার। জেলের ভেতর কেন, ওদের টেনে বাইরে এনে সবার সামনে ঝোলানো দরকার।

ভগীরথ স্যার পাঞ্জাবি আর পাজামায় বিকেলে বের হন। মাস্টার পাড়ায় ঢোকার আগে একটুখানি ছোট পার্ক। সেখানে বাচ্চারা খেলে, মায়েরা সতর্ক দোল দেয়। বয়স্করা দুটো বেঞ্চে পিঠ হেলিয়ে বসে থাকেন।

হাইপাওয়ারের কাঁচা-পাকা চুলের সন্তোষ গুহর পর অতিবৃদ্ধ দাসবাবু তোবড়ানো গালে বললেন, পরপর কটাকে ফাঁসি দিলে তবে দেশটা বাঁচে। চারপাশে এত খুন ধর্ষণ, কোথাও কোনও প্রতিকার আছে! এসবের জন্যই তো ব্যাঙ্কে বয়স্কদের ইন্টারেস্ট রেট কমছে।

কনডেমড্ সেলেরও একটা বর্ণনা বেরিয়েছে কাগজে। বছর বারো আগে পরিমল নামের একটা লোকের যখন ফাঁসি হয়েছিল তখনও দেশ ও মিডিয়া জুড়ে এমনই ধামাকার কথা ভগীরথ স্যার খানিকটা মনে করতে পারেন। সন্ধেবেলায় বুড়োটে এক জল্লাদ আসত টিভিতে। সে সর্বসমক্ষে দড়িতে গিঁট লাগিয়ে দেখাত। সকালের কাগজে থাকত মৃত্যু কুঠুরিতে ধীরে পায়চারি করা মানুষকে নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত। মন-চিকিৎসক চেম্বারে বসে জানাতেন এই সময় ঠিক কী হয়, কেন খাবারে অরুচি, কেন ওজন কমে যায়। শতকরা কত জন আত্মহত্যার কথা ভাবে। টেলিভিশনের আড্ডায় মনো-চিকিৎসকের পাশে বসেই বুড়ো জল্লাদ হাত তুলে দড়ির গিঁট বোঝাত।

ভগীরথ স্যারের রাতে শুয়ে সেই তিনজনের কথা মনে হয়। ছিঁচকে চোর থেকে আচমকা খুনি হয়ে যাওয়া তিনজন। সকালের কাগজে দ্যাখা এক ফ্রেমে তিন মুখ। গত কাল দুপুরে শেষ আবেদন খারিজ হয়ে যেতেই তারিখ ঠিক হয়ে গেছে। সেই মতো তিনজনকে শুনিয়েও দেওয়া হয়েছে বয়ান। এখন ফাঁকা সেলে গভীর রাতে কেউ ডোরা-কাটা পাজামায় হাঁটছে, কেউ আলোর নীচে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসা। সিপাইদের বুটের আওয়াজ অন্ধকার করিডোরে আসে আর যায়।

জল্লাদ পাওয়া নিয়ে প্রথমে একটু সংশয় ছিল। চার দিন পর তেমন একজনকে খুঁজে পাওয়া গেল। এরও নাকি কাজের উত্তরাধিকার ছিল। এখন মাঝ-বয়স পেরিয়েছে। কাগজে তার ছবি বেরিয়ে গেল। আগে ফাঁসি দেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই, তবু সাগ্রহে রাজি হয়ে গেছে সে। কয়েক দিনের মধ্যে রওনা হয়ে যাবে দূরবর্তী সাগর সংলগ্ন শহরে। কাজের সহযোগী হিসাবে নিজের সতেরো বছরের ছেলেকেও সে নিয়ে যেতে চায়।

ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝিতে দিনহাটায় বর্ষা হল দু দিন। ইদানিং আবহাওয়া দপ্তরের ভাষ্য বড্ড বেশি মিলতে শুরু করেছে। প্রকৃতিতে আর তেমন চমক থাকছে না। যেমন আড়ালে থাকছে না মৃত্যু ঘোষণা হওয়া মানুষের শেষের কোন দিন কী কী হয়। জেলখানা এখন বিবৃতি দিয়ে জানায় বাড়ির লোক দেখা করে গেল কবে, সমান ওজনের বালির বস্তায় মহড়া, এমনকী শেষ ক-দিনের মেডিকেল চেক-আপের ফলাফলও।

কাগজে উত্তরবঙ্গ জুড়ে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির কথা লেখা ছিল। তার পাশের কলামে ছিল সকালে টোস্ট, ডিম-সেদ্ধ বা অমলেট। দুপুরে ভাত বা রুটি, সঙ্গে ডাল, মাছ বা চিকেন। খুনিদের ভেতর নিরামিশাষী একজন। তার জন্য বাড়তি সবজি। রাতে সবার জন্য রুটি, স্যুপ, টক দই।

মাঝ-বয়সি জল্লাদ লোকটি এসে দেখা করবে তিনজনের সঙ্গে। সৌজন্য ও নিয়মের সাক্ষাৎ। আগামী কয়েক দিন টানা থাকবে এই সব খবর। ফাঁসুড়ে লোকটির ইন্টারভিউও ছাপা হচ্ছে মাঝে মাঝে। সামান্য কাঁচা-পাকা দাড়ি, কখনও তাৱ উত্তরপ্রদেশের ঘিঞ্জি শহরের ঘর, পাঁচ ছেলে মেয়ে, একেক দিন সন্ধেয় খবরের মাঝখানে লাইভ উঠে আসছে এই সব। লোকটি জানিয়েছে বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। এবার ফাঁসি-প্রতি তিরিশ হাজার টাকা করে পাবে। সব মিলে এক লাখের কাছে। ছোট মেয়ের বিয়েটা দিয়ে ফেলবে এর পর।

দিনহাটার ভগীরথ স্যার এই সমস্ত খবর থেকে বেরিয়ে যেতে চান। ভাবলেন খবরের কাগজ দেখবেন না আগামী ক-টা দিন। টিভি এমনিতেই খুব দেখেন না। সন্ধ্যেবেলা টিভি থাকে স্ত্রী-র আওতায়। সেখানে পর পর সিরিয়াল হয়ে যায়।

কয়েক দিন পরে তিনটে লোকের ফাঁসি হবে। তেমন তিনজন যারা সত্যিকারের খুনি, অপরাধী। ভগীরথ স্যার এও ভাবেন এদের কথা কেন আনতে হবে মাথায়!

দু দিন এসব থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি। নিজের মতো থাকা। বাজার, ইলেকট্রিক-অফিস, খাওয়া-ঘুম। সন্ধেবেলা একা হাঁটাহাঁটি। পার্কের কোণের বেঞ্চটিতে গেলেন না। বেঞ্চের সব আলোচনা এখন এক বিষয়ে। সবাই যেন কাউন্টডাউনের ভেতর ঢুকে গেছে।

কাউন্টডাউন। শব্দ দুটি হঠাৎ ছিটকে এসেছিল টিভি থেকে। এক চ্যানেল থেকে আরেক চ্যানেলে সরে যাচ্ছিলেন স্যারের স্ত্রী। কটার সময় কোন চ্যানেলে পৌঁছে যেতে হবে এটা প্রায় মুখস্থের মতো। সেই সব চ্যানেল বদলের মাঝেই রিমোট কোনও সান্ধ্য খাপ পঞ্চায়েত ছুঁয়ে গেল। সেখানে গলা তুলে ঘোষিকা বলছেন, দেশ জুড়ে কাউন্টডাউন শুরু। আর ঠিক তিন দিন পর শুক্রবার ভোর সাড়ে পাঁচটায় এক সঙ্গে ফাঁসিতে ঝুলবে তিনজন। রিমোট সরে গেল। যে চ্যানেলে স্থির হল সেখানে সদ্য শুরু হয়েছে সিরিয়াল, বকুলকথা।

রান্নাঘরে বাসন পড়ার শব্দের মতো সমস্ত এড়িয়ে থাকার চেষ্টা যেন ফিরে এল ভগীরথ স্যারের মাথায়। পাশের ঘরে কী একটা বই পড়ছিলেন। খবরের কাগজ ক দিন এড়িয়ে থেকে বইয়ে সময় দিতে চাইছিলেন। তেমন মনোসংযোগ যে হয়েছে তা নয়। তবু মুখ ঢেকে থাকা যাচ্ছিল। টিভির ঘোষিকার কাটাকাটা কথায় সেই আড়ালটা সরে গেল। কতগুলো শব্দ ছুটে গেল মাথার এদিক থেকে ওদিকে।

খবরের কাগজে মাঝেমাঝেই ছাপা হওয়া এক ফ্রেমে তিন আসামির মুখ মনে পড়ল আবার। খুনি তিনজনের মধ্যে একজনের বয়স কম। বাইশ বা তেইশ। ওই ছেলেটিই গ্রাম থেকে কাজ খুঁজতে শহরে এসেছিল। গ্যারেজে কাজ করত, ঘুমাতও গ্যারেজে। শহরে একা থাকতে থাকতে অপরাধচক্রে জড়িয়ে যায়। তিন রাতের আয়ুর ব্যাপারটা ওর কাছেও নিশ্চয়ই জানা। তা ছাড়া আদালতের রায়, জেলের প্রস্তুতি, মানবাধিকার আইনে সব এখন আসামিকে জানিয়ে দিতে হয়। মাঝে এক দিন কাগজে লিখেছিল, জেলখানার দর্জি কয়েদে এসে তিনজনের ফাঁসির পোশাকের মাপ নিয়ে গেছে। দড়িতে বালির বস্তা ঝুলিয়ে ফাঁসির যে মহড়া তাও এখন জানানোটা নিয়ম।

ভগীরথ স্যার ঘুমোতে পারেন না রাতে। শোয়ার ভেতর এ পাশ ও পাশ করেন। গিন্নিরও বয়সের সঙ্গে ঘুম কমেছে। তবে ঘুম না এলে তিনি ছটফট করেন না। স্যার দু বার বাথরুমে গেলেন, কয়েক ঢোক জল খেলেন। মনে করতে চাইলেন প্রেশার ও কোলেস্টেরলের রাতের ডোজ খেয়েছেন কি না। তারপরও চোখ বুজতে চাইলে মাথার ভেতর ছোট মাপের তিনটে কুঠুরি-ই। ঝোলানো আলোর নীচে ডোরা-কাটা জামা ও পাজামা। হাঁটুতে মুখ গুঁজে বা দলা হয়ে শুয়ে মিনিট-মিনিট সময় গুণছে তিনজন। এক পা করে এগোচ্ছে ফাঁসি মঞ্চের দিকে। ভগীরথ স্যার ঘুম আসার আগে ভাবেন তিনিও কি উৎকণ্ঠায় সময়ের কাঁটা পার করে যাচ্ছেন! তাঁর ঘুম না আসা চোখ কি ঝোলানো দড়ি, গিঁটের কৌশল, ফাঁসুড়ে লোকটির নির্বিকার হাবভাব দেখছে। তিনিও কি শুনছেন অন্ধকার করিডোরে বুটের কাছে আসা, দূরে চলে যাওয়া।

ভোর-রাতের দিকে অদ্ভুত স্বপ্ন এল তাঁর। বয়সের নিয়মে ঘুম অনেক বছরই স্বপ্নহীন। বারবার ভেঙে যাওয়া, কয়েকবার বাথরুম, এই-ঠান্ডা এই-গরম, এ সব এখন রাতের সঙ্গী। চৌত্রিশ বছর যাঁর সঙ্গে শয্যা ভাগ করা সেই গিন্নির এখন আলাদা জগৎ, বিছানাতেও ভিন্ন এলাকা। রাতে শোয়ার পর কথাবার্তা হয় টুকটাক, পরপর দুবার জল খেলে গিন্নি তন্দ্রার ভেতর এক-দুটি প্রশ্ন করেন। ঘুমের ভেতর করা অভ্যাসের প্রশ্নে উত্তরের অপেক্ষা থাকে না। কিন্তু অনেক দিন পর মাস্টারমশাই ভোররাতের ঘুমে চলে গেলেন তাঁর প্রথম জীবনের বাড়িতে। দেখলেন বাবা জ্যাঠামশাইর সামনে বকুলপিসি চুপ হয়ে বসা বারান্দার কোণায়। জ্যাঠামশাইর ঘনঘন মাথা নাড়া আর ধমকের সামনে মুখ নামিয়ে নখ খুঁটছে বকুলপিসি।

ভোররাতের স্বপ্নে কত কাল আগের এক মফস্বল। তখনকার সেই আধা শহরে লোকজন কম, দোকানপাট তত হয়নি। সকালবেলা কীর্তন শোনাতে আসত সুবল বোষ্টম। সেদিন সে আসেনি। পরিবর্তে পরের দিন বাড়ির উঠোন আর বারান্দা জুড়ে চেনাজানা অনেকে। অত লোক কিন্তু কারও মুখে কথা নেই। খানিক আগে পেছনের বারান্দার টিনের চালের আড়কাঠ থেকে বকুলপিসির ঝুলন্ত দেহ দড়ি কেটে নামানো হয়েছে। মাঝ রাতে পিসি একা কখনও চলে গিয়েছিল ওদিকে।

সকালে যখন নামিয়ে আনা হয়েছে তখন সে ঠান্ডা, শক্ত। সামনের বারান্দার মেঝেতে মাদুরের ওপর শোয়ানো। বকুলপিসির ঢাকা শরীর থেকে পায়ের পাতা দুটি টান হয়ে বেরনো। বাবা মাঝেমাঝে বিড়বিড় করছেন। …দু-তিনটে ভালো সম্বন্ধ, তা রেখে তুই ওই ক্ষ্যাপাটে বোষ্টমকে মন দিলি!

অন্তত পঞ্চাশ বছর পর ভগীরথ স্যারের স্বপ্নে নিঝুম সেই বাড়ি, বকুলপিসি আর হঠাৎ সকাল। কলতলায় যাওয়ার মুখে আড়কাঠ থেকে ঝুলে থাকা দেহ। গোড়ালি থেকে টান হওয়া পায়ের পাতা। ভগীরথ স্যার কত দিন পর আবার সেই পায়ের পাতা দেখলেন। দেখলেন পুলিশের ডোম এসে বকুলপিসিকে ভ্যানের ওপর ফেলে দড়ি পেঁচিয়ে বাঁধছে। তখনও বাইরে বেরনো সেই দুই পা।

সকালে উঠে স্যার হাঁটতে থাকলেন। আরও হাঁটলেন। আর মাত্র দু দিন। তারপরই ওই তিন কয়েদির পায়ের পাতা সকালের আলোতে শক্ত টানটান হয়ে থাকবে। নির্বিকার মুখের সেই ফাঁসুড়ে লোকটি দড়ি খুলে নামিয়ে আনবে দেহ। ঘন্টাখানেক আগে সে যাদের হাঁটিয়ে নিয়ে গেছে তাদের দেখবে ঘাড় কাৎ, নিথর। প্রেস বিবৃতি দিয়ে জেলখানা শেষ সময়ের অনুপুঙ্খ জানাবে। জানাবে ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে কে চঞ্চল হয়ে পড়েছিল, কে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে।

আর দু দিন। সারা দেশ ফাঁসির দাবিতে উত্তাল। সবাই মাথা ঝাঁকিয়ে বলছে, ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই। অসুস্থ শরীরেও মিছিল করছে। মাথার ওপর আঙুল নাড়িয়ে বলছে তিন জনকে ঢোকাতেই হবে গিঁট বাঁধা দড়ির ভেতরে। শরীর খারাপ নিয়ে রাজধানীর রাস্তায় ফাঁসি চাইয়ের মিছিলে গিয়ে কে যেন পথেই রক্ত-বমি হয়ে মারা গেল!

বকুলপিসির শরীর ফেরত এসেছিল সন্ধেবেলায়। এবারের আসা অবশ্য স্বপ্নের ভেতর নয়। ভগীরথ স্যার একা একা হাঁটছেন। শহর যেদিকে শেষ সেদিকে চলে যাচ্ছেন হেঁটেই। বিকেলে সেই হাঁটার ভেতর ভোরের স্বপ্নের পিসি ফেরত আসে। সন্ধেয় মর্গ থেকে এসেছিল সাদা কাপড় ঢাকা দেহ। সামান্য বেরিয়ে থাকা মুখ। টান হয়ে থাকা পায়ের পাতা সাদা কাপড়ে মোড়া। ভগীরথ স্যার স্পষ্ট সব মনে করতে পারেন।

এই বিকেল শেষ হলে রাত। তারপর আর একটি রাত। সে রাতের আর কোনও সকাল নেই। দাবি আদায়ের লোকেরা ওই রাতেও রাস্তায় হাঁটবে। তাদের সম্মিলিত শব্দ জেলখানার উঁচু পাঁচিল টপকে যাক বা না যাক, ফাঁসুড়ে লোকটি কারা-অফিসারদের তত্ত্বাবধানে দড়ির গায়ে মোম ঘঁষবে। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি দেখে যাবে লাল-বাতি লাগানো গাড়ি। সরকারি মনোবিদ ও পুরোহিত জেলখানায় গিয়ে তিন জনকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করে দেবে।

ভগীরথ স্যার হাঁটতে থাকেন। একা। তিনি নিজেও কি শিউরে উঠছেন আর এগোচ্ছেন কোনও অন্ধকারের দিকে? বকুলপিসির সাদা কাপড়ে ঢাকা শরীর থেকে বেরিয়ে আসা পা-দুটির কথা মনে পড়ে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...