পাঁচটি কবিতা

নীলাঞ্জন হাজরা

 

সেই স্বরগুলো আমাদের
আমি রেখে এসেছি তোমার

শহরে

জানবাজারের হুল্লোড়ে
চোখাচুখির
আমাদের সম্মিলিত স্মৃতির

সেই সব স্বর

তারপর

তারপর দু’ জনেই সর্বশক্তি দিয়ে
কাঁটাতার খামচে ধরার

স্বর

যখন সকলেই কণ্টকিত হয়ে
অপেক্ষায় ছিল
আকাশ বিদীর্ণ করা ভীষণ আর্তনাদের
আমাদের কবজি গড়িয়ে
টপটপ করে পড়া ভালোবাসার

স্বর

রেখে এসেছি তোমার

শহরে

নিশ্ছিদ্র কারফিউয়ের চোখে ধুলো দিয়ে
যে স্বরেরা গিয়ে
চকিত নিশ্চিত পায়ে

তোমার কবরে

আমাদের সম্মিলিত স্মৃতির
পড়ে থাকা আমার অংশটুকু জ্বালিয়ে
গেঁথে দেয়, এক কোণে

দিনের যে কোনও প্রহরে
কখন কে জানে

রেখে এসেছি
তোমার

শহরে

 

কলকাতা-করাচি

 

আমার কবিতা তুমি পড়বে না

প্রত্নক্ষেত্র খুঁড়ে
যে দগ্ধ শহর পাওয়া গেল
উত্তেজিত খননকারীরা
তার দেওয়ালে দেওয়ালে লক্ষ করলেন
সম্পূর্ণ অপরিচিত ভাষায়
বিপুল অক্ষরে একটাই পঙ্‌ক্তি খোদাই করা আছে
এ ছাড়া আর পাওয়া গেল না একটা বর্ণও
যদিও পাওয়া গেল মানুষের স্বাভাবিক জীবন ধারণের
যাবতীয় উপকরণের দগ্ধাবশেষ
বিভিন্ন পোড়া হাড় থেকে
একটা চিড়িয়াখানা শনাক্ত করা গেল
যাতে ঢোকার পথের মুখেই বাঁ দিকের দেওয়ালে
লেখা আছে পঙ্‌ক্তিটা
যাকে ঘিরে গোলাপের পাপড়ির বিন্যাসে
গড়ে উঠেছে শহরটা
রান্নাঘরে উনুনের ঠিক পিছনের
কালো হয়ে যাওয়া দেওয়ালে
লেখা আছে পঙ্‌ক্তিটা
লিঙ্গ-বিভাজিত যে কবরখানা পাওয়া গেল
তার মাঝখানের দেওয়ালের দুপিঠেই
লেখা আছে পঙ্‌ক্তিটা
ভেঙে পড়া ফোয়ারা আর ভাঙাচোরা টবের টুকরো থেকে
যেটা বাগান বলে চিহ্নিত হলো
কিংবা স্পষ্টতই যেটা জলাশয়
তার আশেপাশে কোথাও পঙ্‌ক্তিটা লেখা না থাকলেও
খননকারীরা প্রত্যেকে সেই রাত্রে
ভয়ঙ্কর এক দুঃসপ্বপ্নে দেখলেন
পাপড়ির বিন্যাসের একেবারে বাইরের সীমান্তে
যে দেওয়ালে দুটো আঙটায় বাঁধা
কঙ্কালটার বুকে ফুঁড়ে চলে গিয়ে এখনও
বিঁধে আছে গুলির খোলগুলো
সেই দেওয়ালেই সব থেকে গভীর খোদাই করা আছে
পঙ্‌ক্তিটা
যার উপরে যতবার ফিনকি দিয়ে এসে পড়ছে
রক্তের ছিটে
বার বার বদলে বদলে গিয়ে
প্রত্যেক আধুনিক ভাষায় ফুটে ফুটে উঠছে —

আমার কবিতা তুমি পড়বে না

সেই ভীষণ দুঃস্বপ্নেও
ঠাওর করতে পারলেন না খননকারীরা
এ দেওয়াললিখন

হুমকি না হাহাকার

 

নারীদের স্বরে ভরা
এ হৃদয় ছেড়ে কোত্থাও যেতে চাই না আমি

গণপিটুনি আর গণহত্যায় মুসলমান নিধনের উৎসব থেকে গড়িয়ে
এখানে এসে জমা হওয়া চাপ চাপ ছোপগুলো
কোনও না কোনও নারীস্বর
করুণ হাতে মুছে ফেলার সময়
তার পোশাকে লুকনো
ছোরাটা
অকস্মাৎ দেখে ফেলতে পারি আমি

কলকলে ভিড়ে মিশে গিয়ে
সেই স্বর
সংক্রমিত স্বপ্নের প্রত্যয়ে
এ হৃদয় ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরে
অনেক অনেক রাত্রি
আমি তার সন্তর্পণে ফিরে আসার অপেক্ষা করতে পারি
আমি কান পেতে শুনতে পারি
তার হাত ধুয়ে ফেলার জলের শব্দ
পোশাক ছেড়ে ফেলার শব্দ

যদিও আগামীকাল হোলির হুল্লোড়ে
সহসা দৃষ্টি বিনিময়ে
আমি তাকে চিনে ফেলেছি ভেবে
ঠিক রং মাখিয়ে বসব অন্য কোনও নারীস্বরে

তাই আমাকে গুম করে অকথ্য অত্যাচারের পরেও
ধূর্ত রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দারা
আমার হৃদয়ের অজস্র নারীস্বরের মধ্যে
কোনও দিন খুঁজে পাবে না
স্বপ্ন-সংক্রমিত সেই স্বর

এবং দেশব্যাপী হাততালির কলরবে
ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবে অন্য কোনও স্বর
আগুন-রঙা ফুলের অরণ্য-সঙ্কুল
উষর আমার দেশের কোনও স্বর থেকে তখন
পাষাণ বিদীর্ণ করে বয়ে যাবে কাঁদনা গীতের ধারা
যাতে এসে মিলবে একদিন
আরও অজস্র অফুরন্ত স্বর
তৈরি হয়ে যাবে এক বিপুলা

নদী

নারীদের স্বরে ভরা নদী
যে নদীতে সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে
আমি সন্তর্পণে ফেলে আসতে পারব
একটা পোশাক

আর একটা ছোরা

যে নদীর দুই তিরে গড়ে উঠবে
সে নদীর স্বরে সিঞ্চিত আমার

হৃদয়

যা ছেড়ে কোত্থাও যেতে চাই না আমি

 

সেতুতে উঠলেই ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে করে
নদী দেখলেই চুমু খেতে
নদীও এই জীবনের মতো বোহেমিয়ান হয়ে গেলে
অসহ্য শোক বয়ে আনে

চুমুগুলোকেই

তাই আমি করে দিয়েছি বোহেমিয়ান
তারা কেউ একটা ই-মেল পর্যন্ত লেখে না আমায়
আসলে বোধহয় তারা আমায় জানাতে চায় না
একদিন সব সেতু পুড়িয়ে ফেলবে

ঘৃণা

লোভ শুকিয়ে ফেলবে সমস্ত

নদী

একদিন শেষ চুমুটার মৃত্যুসংবাদের
অপেক্ষাই হয়ে উঠবে

জীবন

আর একদিন চুমুদের কবরখানা আবিষ্কৃত হবে
তৈরি হবে প্রত্যেকটা চুমুর তীব্র কাহিনীর লেবেল দেওয়া

জাদুঘর
যার পাশ দিয়ে বয়ে যাবে একটা দারুণ খরস্রোতা

নদী

জাদুঘরে পৌঁছতে যার ওপর দিয়ে পার করতে হবে একটা

সেতু

সেতুতে উঠলেই ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে করে
নদী দেখলেই আবার চুমু খেতে

 

আমি পলাশ-লাল ধুলো ওড়ানো পথের ধারে
ছেড়ে দিয়েছি সবুজ ফুলকারি আঁকা আর
সা-রে-গা-মা হর্ন বাজানো তিপান্নটা বাস
অনিমিখ অপেক্ষায়

তোমার, নারী

হিরের ফলায় শিকার করা যায় না তোমার

হৃদয়

পারফিউমের বিজ্ঞাপন, বৃষ্টি বা উল্কাপাত
এ সব কিছুর গন্ধ-শব্দ-বর্ণের কোত্থাও নেই তোমার

চুমু

শুধু তোমারই চুমুর স্পর্শ ছাড়া

আমাকে আশ্রয় দেবে বলে সৃষ্টি হওনি তুমি
তোমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কিংবা গোটা অস্তিত্বটাই
উপমার খোঁজে চুরি করা যায় নি
শিশুপাঠ্য ভুগোল, বোটানি, অর্নিথোলজি, জলবায়ুবিদ্যা
বা কীটবিজ্ঞানের বই থেকে

আমার সবুজ কল্পনার
বিস্তীর্ণ বুগিয়াল উপত্যকা-ঢাকা প্রথম ভোরের কুয়াশা
সরিয়ে ফেলা ছাড়াও তোমার

পোশাক

খুলে ফেলার অজস্র কারণ থাকতে পারে
আমার পশ্চিম-রাঢ় দেশের হাহা প্রান্তরের একটা গোটা
জীবন আমি ছেড়ে দিয়েছি
অনিমিখ অপেক্ষায়

তোমার, নারী

আমার কবিতার ধ্বংসস্তূপ ছেড়ে
কোথায় চলে যাওয়ার আগে

কথা

দিয়ে যাওনি

 

[কবির ইচ্ছা-অনুসারে প্রথম কবিতাটির নাম লেখাটির শেষে মুদ্রিত হল। বাকি চারটি কবিতার কোনও নাম নেই।]

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2616 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...