ভ্যান গঘ ও পিকাসোর হেঁটে যাওয়া

রূপায়ণ ঘোষ 

 

১.

একটি পাহাড়ি উপত্যকার নিচে এসে দাঁড়ালেন পিকাসো। হাতে রং, অবিন্যস্ত তুলিদের মায়াবী কোলাহল। কিছু দূর দিয়ে বয়ে চলেছে মেঘছায়া নদীর জল। আকাশে আকাশে পাখিদের অবিরত উড়ে যাওয়া; দু-একটি কুঁড়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা হিত্তীয় অশ্বের সারি— আশঙ্কিত তাদের চোখ ধূসরকৃষ্ণ আকাশের দিকে ধাবিত! সেখানেই দোদুল্যমান এক সেতুর উপর নিমগ্ন বসে রয়েছেন ভ্যান গঘ। পিকাসো হাঁটতে শুরু করলে, তার প্রতিটি পদধ্বনিতে সাইপ্রেস বৃক্ষগুলি ক্রমশ মাথা নোয়াতে থাকে; স্পন্দিত উর্বর হয় ফসলের ভূমি…

২.

পরস্পরের দিকে তাকিয়ে অবোধ্য রহস্যে হেসে উঠলেন দুই চিত্রকর। তাদের রঙের কৌটোয় গোলা আছে পৃথিবীর তামাম বৃক্ষপ্রাণরস! তুলির প্রতিটি রোমে জীবনের নিসর্গ-বেদনা, অব্যক্ত সমাহিত দৃষ্টির বিভঙ্গ-মুদ্রা। মুহূর্তের স্তব্ধতা থেকে উঠে দাঁড়ালেন পিকাসো; এই সমস্ত নৈসর্গিক প্রান্তরে বিকীর্ণ করলেন জীবনের অর্ধাভিলাষ— দেখতে দেখতে পাহাড়ি মানুষ, তুষার-ধবল অশ্ব, করুণ গাভী, ছুটে যাওয়া অজস্র পতঙ্গগুচ্ছ, এই মন্থর চলমান দিন— যেন তুলির টানে ক্ষুধা আর তৃষ্ণার দিকে বিভক্ত হয়। হা হা শব্দ হেসে ওঠেন উল্লসিত পিকাসো; কৌটোর রস ছুড়ে দেন দানিয়ুব নদীর ভিতর! জীবনের এই আদিম মহাচিত্র আঁকা শেষে সমাধিময় পিকাসোর চোখ ক্রমশ ক্লান্ত, অরণ্যমুখী হয়।

৩.

সে অরণ্যদৃষ্টি থেকে কেঁপে ওঠে ভ্যান গঘের তুলি, পালকের রহস্য-সঞ্চালন। ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া সময়ের রং, একটি বিষণ্ণ বিকেল এসে দ্রবীভূত করে চরাচর। দিগন্তরেখা ধরে ফিরে আসা রক্তিম কাকেদের দল— পালকে পালকে তারা সন্ধান বয়ে আনে। দূরে সুউচ্চ গির্জা, ভেসে আসে নির্লিপ্ত ঘন্টাধ্বনি। শিল্পিত বুরুশের নায়ক— জলাশয়সেতু পেরোতে পেরোতে ফেলে আসা ভূমিখণ্ড দ্যাখে; বাতাসের ব্যগ্রতা শোনে। দ্যাখে অ্যালবিনো হরিণের ত্রস্ত পদচিহ্ন পৃথিবী পেরিয়ে চলে যাচ্ছে ঈশ্বরের দিকে…

গির্জার পাশে পাশে ফুটে ওঠা ক্রুশবিদ্ধ ছায়া- আঁধারিত সন্ধ্যা আনে। আনে ধু ধু নিঃশব্দ প্রান্তরগামী জ্যোৎস্নালোক। সে আলোয় ভিজতে ভিজতে ভ্যান গঘ হেঁটে যান মায়ামৃগগামী ইচ্ছের দিকে…

৪.

এত অশ্রু; এত অশ্রুপাত শিশুদের দল! কিছু আশ্চর্য রমণী, খেজুরের রসের মতো গড়িয়ে যায় প্রান্তরময়। গম আর ভুট্টার খেত জুড়ে ছড়ানো মায়াবী আখ। নারী বা পুরুষের বেশে যারা আসে, প্রত্যেকের হাতে ধরা অভুক্ত ক্রুশ, তৃষিত পেরেক! খাদ্য নিয়ে যাবে তাঁরা মৃত্যুর বিনিময়ে…

যে মাথাগুলি ছাড়িয়ে লোহিত নিশান ওড়ে, তাদেরই ওষ্ঠ আরও রক্তময়। আরও বিবর্ণ ভ্রমরাধিক হৃদয়। বিস্মিত পিকাসোর হাতে উঠে আসে বিষাদমথিত আলো, ধূসর গোধূলি থেকে চুঁইয়ে পড়া রং যে মুখ আঁকে— তার সবগুলি চোখ কী ভীষণ কৃষ্ণকায়! দূর আঙুর বাগিচায় সন্ধে আনে, বেজে ওঠে দেবতাতীত সুর-মূর্ছনা…

৫.

রহস্য আলোয় মোড়া দ্রাক্ষাকুঞ্জ থেকে ম্যান্ডোলিন বাজিয়ে চলেছে যে নারী— তার ধূসর পোশাক, আরও পিঙ্গলবর্ণ চোখ— প্রহরের ভেঙে পড়া কথাদের ভাষা দেয়, সুর দেয় পাহাড়ের অনিবার স্রোতের পায়ে…

বন্ধ চোখের কাছে সান্ধ্যমেঘ এসে জমে, বিমুক্ত স্তনের কাছে প্রজাপতি ব্যথা— এত মধু আর সুরা আঁকতে আঁকতে জাগরলগ্ন চাঁদ এসে নামে। বাঙ্ময় পিকাসোর তুলি খসে গেলে, অনবগুণ্ঠিত ছবিটির দিকে চেয়ে রাত্রিরা রক্তের দীর্ঘ শব্দ শোনে। কোনও এক মিশরের দেবদাসী অথবা শস্যদাত্রী ইস্তার এখানে এসে দাঁড়াবেন; সমস্ত বন্দনা শেষে গড়ে ওঠা চিত্রের ভিতর কিংবা আরও গভীর পাতালে চলে যেতে যেতে, মানুষের হাতে মাংসের অধিকার দিয়ে যাবে তাঁরা, রেখে যাবে অতৃপ্ত হরিণের পদাঙ্ক-রাত…

৬.

এই পথ ধরে হেঁটে যাবে তারা- আগে আগে দলছুট বুনো অশ্ব এক। জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাত্রির ছায়া মেখে নীরবতা আরও সমীপবর্তী হয়। অদূর অরণ্য গায়ে বিক্ষত অ্যালবিনো হরিণ— গুলিবিদ্ধ, চেয়ে আছে মৃত্যুর বিচূর্ণ স্পর্শের দিকে…

ক্লান্ত পিকাসো এসে দাঁড়ান নশ্বর মাটির কাছে; ক্ষতময় কানের পাশে শ্রান্ত ভ্যান গঘ। তখনই ত্রস্ত আহত মৃগ, বিপন্ন তবু স্মৃতিপথে চলে যায় আরও গভীর বৃক্ষের দেশে! জীবনের বেদনার দিকে এই ক্ষিপ্র ছুটে যাওয়া, মরু-ঈগলের মতো তারা স্থির, দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ভেসে যাওয়া নদীচিহ্ন দ্যাখে। সহস্র অবসাদ শেষেও তার বয়ে যাওয়া আছে। এই নদী-গ্রাম, অরণ্য প্রান্তর; এই পাহাড়ের সানুদেশ, শ্বেতমৃগ- সকলেই বেঁচে আছে বিদীর্ণ লড়াইয়ে।

আরও কত বাকি আছে সত্তার বিশীর্ণ সময়

তবু তো সংগ্রাম আছে, জীবনের বেদনা জেনো তার চেয়ে বড় নয়…

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...