উইসলায়া সিমবোর্সকা — কবিতা অষ্টক

কৌশিক মিত্র

 

যখন আপনি পলাতক হন,
আপনার পদক্ষেপগুলি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক
রাজনৈতিক কারণে।
অরাজনৈতিক কবিতাবলিও রাজনৈতিক
এবং আমাদের উপরে আভা দানকারী চন্দ্র
এখন আর প্রকৃতপক্ষে চান্দ্র নয়।”

‘আমাদের সময়ের শিশুরা’ — উইসলায়া সিমবোর্সকা

১৯১৯-এর ভার্সাই চুক্তির পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পোল্যান্ডের নবরূপে আত্মপ্রকাশ, অবসান ঘটল ডানজিগের উপর জার্মান একাধিপত্যের, পোল্যান্ড ফিরে পেল বন্দর হিসেবে ডানজিগকে ব্যবহারের অধিকার। লেগেই থাকল পূর্বের লিথুয়ানিয়া, ইউক্রেন এবং রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত। ১৯২০-২১-এ রাশিয়ার সঙ্গে বেধে গেল যুদ্ধ, রেড আর্মি ঢুকে এল ওয়ারশ অবধি। আশ্চর্যজনক হলেও, ওয়ারশর এ যুদ্ধে জিতে গেল পোলান্ড। ১৯২১-এর মার্চে রিগার সন্ধিতে স্থির হয়ে গেল পোল্যান্ডের পশ্চিম সীমানা, ভার্সাই ত পূর্বদিক নির্ধারণ করেই দিয়েছে। এই মার্চেই সে দেশে গৃহীত হল নূতন সংবিধান। নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এলেন গ্যাব্রিয়েল নারুতোউইজ। তিন চতুর্থাংশের বেশি কৃষিজীবী এবং শিল্পশ্রমিকের দেশ পোল্যান্ড, যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত তার সর্বাঙ্গ, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া খুব সহজ ছিল না সে সময়। লেগে থাকল একের পর এক অসন্তোষ, ধর্মঘট এবং বিক্ষোভ। খুব শীঘ্রই সমর্থন হারালেন নারুতোউইজ এবং ১৯২২-এর ডিসেম্বরে আততায়ীর হাতে খুন হয়ে গেলেন তিনি। ক্ষমতায় এলেন ভোয়াদিস্লাভ গ্যাব্রিস্কি। ছোট ছোট সংস্কার কার্যসূচি নিয়ে তিনি এগিয়ে দিতে থাকলেন পোল্যান্ডকে। এই ক্রান্তিকালেই পশ্চিম পোল্যান্ডের কর্নিক শহরে উইসলায়া সিমবোর্সকার জন্ম (২রা জুলাই, ১৯২৩), বাবা ভিনসেন্ট ছিলেন এক পোলিশ অভিজাতর কাছে কর্মরত। ১৯৩১-এ সিমবোর্সকা পরিবার পাড়ি দেয় ক্রাকাও শহরে। এ সময়ে পোল্যান্ড চলে গিয়েছে সামরিক শাসক জোসেফ পিলসুদস্কির স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে। স্টেশনের কাছেই নতুন বাড়ি। বাড়ির জানালা থেকে ট্রেনের আসা-যাওয়া দেখেন ছোট্ট উইসলায়া। খুব অল্প বয়সেই আ্সক্ত হন ছবি দেখায়, বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে মহড়া দেন নাটকের। ক্রাকাও শহরটিকে বড় ভালবাসতেন। এই শহরেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাটিয়ে যাবেন সিমবোর্সকা।

বিস্তীর্ণ জীবনে সিমবোর্সকা দেখেছেন পিলসুদস্কির স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, তার বেড়ে ওঠা সেই সময়ে যখন বিরোধী রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরকে রুদ্ধ করে দেওয়া হয় বেরেজা-কারতুস্কার কারাগারে, তিনটি দফায় কৃষক বিদ্রোহে উত্তাল হয়ে ওঠে পোল্যান্ড (১৯৩২, ১৯৩৩, ১৯৩৭), শ্রমিকের রক্তে ভিজে যায় দেশের মাটি (১৯৩৬, রক্তাত্ত বসন্ত), অনাক্রমণ চুক্তি সাক্ষরিত হয় রাশিয়া (১৯৩২) এবং জার্মানির (১৯৩৪) সঙ্গে। তিনি দেখলেন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসেফ বেকের একের পর এক ভ্রান্ত কূটনৈতিক কর্মসূচি, চেকোশ্লোভাকিয়া, লিথুয়ানিয়া একের পর এক জার্মান গ্রাসে চলে গেল, তাঁর স্বদেশ তখনও নীরব। এগিয়ে এল হায়নার হিংস্র দাঁত, ১৯৩৯-এর এপ্রিলে হিটলার ছিঁড়ে ফেললেন অনাক্রমণ চুক্তি, ১লা সেপ্টেম্বর শুরু হল পোল্যান্ড আক্রমণ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরুয়াত। অন্য দিক থেকে শুরু হল রাশিয়ান আক্রমণ। ২৭শে সেপ্টেম্বর ওয়ারশর পতন, পোল্যান্ড অলিখিতভাবে ভাগ হয়ে গেল জার্মানি এবং রাশিয়ার মধ্যে। ১৯৪১-এ রাশিয়া জার্মানির হাতে আক্রান্ত হওয়ার পর পরিস্থিতির মোড় ঘুরবে, শুরু হবে জার্মান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পার্টিজান আন্দোলন, আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে বেঁচে থাকার মরিয়া লড়াই। ততদিনে পোল্যান্ডে শুরু হয়ে গিয়েছে হিটলারের ঘৃণ্য ইহুদিনিধন কর্মসূচি, তৈরি হয়ে গিয়েছে একের পর এক কনসেনট্রেশন ক্যাম্প— মাইদানেক (লুবলিন শহরের নিকটবর্তী), ক্রাকাও-পোয়াসুফ, আউসভিৎজ, স্তুতফ (ডানজিগ সন্নিকটস্থ)। রেললাইন ধরে একের পর এক ট্রেন যায় বন্দিদের নিয়ে ক্যাম্পের দিকে, রেল-সড়ক কর্মচারী সিমবোর্সকা সেই বুকফাটা আর্তনাদ শুনতে পান। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন আন্ডারগ্রাউন্ডে তাঁর প্রথাগত পড়াশুনা শুরু হয়েছিল, তারপরেই রেল-সড়ক কর্মচারী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু। অল্পের জন্য বেঁচে যান হিমলারের এসএস বাহিনীর হাত থেকে, নইলে দাসশ্রমিক হিসেবে তাঁর জীবন শেষ হত হয়ত জার্মানিতেই। এভাবেই কেটে যায় দিন, মহাযুদ্ধের শেষে শুরু করেন পোলিশ সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা। এরপর ক্রাকাও-র জ্যাগিয়েলোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ব নিয়ে তিন বছর অধ্যয়ন, অর্থাভাবে ডিগ্রি অর্জন অধরাই থেকে যায়। পরবর্তী সময়ে পোল্যান্ডের সরকার গঠনে দেখা দিল নিরঙ্কুশ রাশিয়ান প্রভাব, কখনও দেখা যাবে সেই প্রভাব কাটিয়ে দেশজ সমাজবাদের দিকে যাত্রা (ভোয়াদিস্লাভ গোমুলকা ছিলেন এই মতবাদের সমর্থক, এমত কারণেই তিনি স্ট্যালিনের রোষে পড়েন এবং কারারুদ্ধ হন, ১৯৫৬-য় বিংশতি সোভিয়েত কংগ্রেসের পর তিনি ছাড়া পান এবং পোলিশ ইউনাইটেড ওয়ার্কারস পার্টি সংক্ষেপে পিজেডপিআর-এর সম্পাদক হিসেবে দেশের পুনর্গঠনে মন দেন), দমন, আন্দোলন এবং পায়ে পায়ে এগিয়ে চলা। এই সময়ে সিমবোর্সকাকেও দেখা যায়, পিজেডপিআর-এর সদস্যা হিসেবে, মনেপ্রাণে তিনি বিশ্বাস করতেন রাশিয়ান প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে সমাজবাদের দেশজ প্রয়োগেই পোল্যান্ডের উন্নয়ন সম্তব। তাঁর এই দর্শন, স্ট্যালিনিজমের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ব্যক্ত হয়েছিল “কলিং আউট টু ইয়েতি” (১৯৫৭) কাব্যগ্রন্থের একাধিক কবিতায়। পরবর্তীতে সেভাবে আর রাজনীতিতে জড়াতে চাননি, কিন্তু ভ্রষ্টাচারের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ঝলসে উঠেছে, ছদ্মনামে লিখেছেন একাধিক প্রবন্ধ।

১৯৪৫-এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন,”জিয়েনিক পোলস্কি” সংবাদপত্রে তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতা “শব্দের খোঁজে”। পাঁচের দশক থেকে তাঁর একের পর এক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেতে থাকে। ১৯৫২-য় “দ্যাটজ হোয়াট উই লিভ ফর”, ১৯৫৪-য় “কোয়েশ্চেন পুট টু মাইসেলফ”, “কলিং আউট টু ইয়েতি” (১৯৫৭), “সল্ট” (১৯৬২), ”আ মিলিয়ন লাফস, আ ব্রাইট হোপ” (১৯৬৭), “কুডন্ট হ্যাভ” (১৯৬৯), “আ লার্জ নাম্বার” (১৯৭৬), “পিপল অন দ্য ব্রিজ” (১৯৮৬), “দ্য এন্ড অ্যান্ড দ্যা বিগিনিং” (১৯৯৩), “ভিউ উইথ অ্যা গ্রেন অব স্যান্ড” (১৯৯৫), “মোমেন্ট” (২০০২), “হিয়ার” (২০০৯), “এনাফ” (২০১২)। এছাড়াও প্রকাশ পায় তাঁর কবিতার বেশ কয়েকটি সঙ্কলন। ১৯৫৩-১৯৮১ এই দীর্ঘ সময়পর্বে পোল্যান্ডের সাহিত্য পত্রিকা ’লিটারারি লাইফ’-এর কবিতা বিভাগ সম্পাদনা এবং নিয়মিত কলাম লেখার কাজ চালিয়ে গেছেন সিমবোর্সকা। ফরাসি সাহিত্য থেকে মাতৃভাষায় অনুবাদের কাজও চালিয়েছেন স্বচ্ছন্দে। ১৯৪৮-এ পরিণয় সূত্রে বাঁধা পড়েন স্বদেশীয় কবি অ্যাডাম উডেকের সঙ্গে, ১৯৫৪-য় বিচ্ছেদ হলেও, আমৃত্যু তাঁরা পাশাপাশি থেকেছেন (১৯৮৬-তে অ্যাডামের মৃত্যু হয়)। সাহিত্যচর্চার পুরস্কারস্বরূপ বহুবার ভূষিত হয়েছেন সম্মানে, উল্লেখ্য—গ্যায়টে পুরস্কার (১৯৯১), পোলিশ পেন ক্লাব পুরস্কার (১৯৯৬), সাহিত্যে নোবেল (১৯৯৬) ইত্যাদি। নিসঃন্তান এই মানুষটি ছিলেন বড় নির্জনতাপ্রিয়, নিরহঙ্কার এই কবি ভাবিত ছিলেন, নোবেল পুরস্কার যদি তাঁকে জনবিচ্ছিন্ন করে দেয়, যা তিনি কোনওদিন চাননি, পাশের বাড়ির মানুষ তাঁকে দেখবেন বিশেষ কেউ হিসেবে এ ছিল তাঁর অত্যন্ত অপছন্দের। যৌবনের প্রথম দিনগুলিতে প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তিনি তাঁর সৃষ্টিকে, কবিতাকে অরাজনৈতিক হিসেবেই দেখতে চেয়েছেন, যদিও তাঁর কবিতায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ”অরাজনৈতিক কবিতাও রাজনৈতিক”। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তার কলম ঝলসে উঠেছে বার বার, আর সমস্ত রাজনৈতিক চেতনার ঊর্ধ্বে উঠে একথাই স্বীকার করে নিতে হয়, সিমবোর্সকা জীবনের কবি, তিনি লোকায়ত সুখদুঃখের কবি, তাঁর কবিতায় মৃত্যুচেতনা প্রতিভাত হয়ে যায় অমলিন সরলতায়, এক অনাবিল স্বতঃস্ফূর্ততায়। কবিতা তাঁর কাছে কত প্রিয়, কবিদের গ্লানিময় জীবন তাঁর কাছে কত বেদনাময়, তা ধরা পড়ে তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বক্তৃতায় (১৯৯৬):

সমসাময়িক কবিরা, বিশেষত নিজেদের সম্বন্ধে সংশয়াপন্ন এবং সন্দেহপ্রবণ। জনসমক্ষে তাঁরা নিজেদের কবি হিসেবে পরিচয় দেন অনিচ্ছা সহকারে, যেন তাঁরা কিঞ্চিৎ লজ্জিত। কিন্তু আমাদের এই মুখর সময়ে নিজস্ব গুণাবলিকে চিহ্নিত করার পূর্বে, স্বীয় ত্রুটিবিচ্যুতিগুলি স্বীকার করে নেওয়া সহজ, অন্তত যদি সেগুলি সুন্দর উপায়ে গাঁটবন্দি হয়ে থাকে, যেহেতু এগুলির অবস্থান অত্যন্ত গভীরে এবং এগুলি যে নিজেরই তা যেন বিশ্বাস করে ওঠা যায় না…. প্রশ্নাবলির উত্তর দেওয়ার পূর্বে কিম্বা কোনও অপরিচিতের সঙ্গে কথোপকথনে, যখন তাঁরা নিজেদের পেশা পরিচিতি এড়িয়ে যেতে পারেন না, সেক্ষেত্রে কবিরা ব্যবহার করেন “লেখক” শব্দটি অথবা “কবি” শব্দটিকে প্রতিস্থাপন করেন সেই পেশাটি দিয়ে লেখালিখির পাশাপাশি তিনি যাতে নিযুক্ত থাকেন। একজন কবির সঙ্গে কোনও আমলা অথবা বাসযাত্রীর আচরণে ফুটে ওঠে অবিশ্বাস এবং শঙ্কা। আমার বিশ্বাস একজন দার্শনিকের ক্ষেত্রেও এমত আচরণেরই প্রাপ্তি ঘটবে।ভতবুও তাঁরা অপেক্ষাকৃত উত্তম অবস্থানে, কেননা এ নয় যে তাঁদের এ প্রকার সম্বোধন কিছু জ্ঞানদীপ্ত উপাধির সাহায্যে অলঙ্কৃত। দর্শনের অধ্যাপক— এ বস্তু বড়ই শ্রদ্ধা উদ্রেককর।

কিন্তু কবিতার কোনও অধ্যাপক নেই। সবকিছুর পর, এর অর্থ এই যে কবিতা একটি পেশা যার প্রয়োজন বিশেষ পাঠ, নিয়মিত পরীক্ষা, গ্রন্থপঞ্জি ও পাদটিকা সমেত তাত্ত্বিক লেখালিখি, এবং অন্তিম পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিপ্লোমা প্রদান। অন্য অর্থে এর মানে এই দাঁড়ায় অনিন্দ্যসুন্দর কবিতাবলির মাধ্যমে পাতাগুলি পূর্ণ করলেই কবি হয়ে ওঠা যায় না। মূল উপাদান হল চিরকুটখানা কোনও বিশেষ স্বীকৃতি বহন করছে কিনা। রাশিয়ান কবিতার অহংদীপ্ত ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করি, জোসেফ ব্রডস্কি যিনি ভবিষ্যতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হবেন, শুধুমাত্র এই কারণেই তাঁকে অন্তর্বর্তী কারাবাসে যেতে হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ তাঁকে সম্বোধিত করছিল “একটি পরগাছা” হিসেবে, কেননা তাঁর কোন সরকারি স্বীকৃতি ছিল না যা তাঁকে কবি হিসেবে পরিচিত হওয়ার অধিকার দেয়।

বেশ কিছু বছর আগে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ব্যক্তিগতভাবে ব্রডস্কির সঙ্গে সাক্ষাতের। আমি লক্ষ করেছিলুম, যত কবিকে আমি জানি, তাঁদের মধ্যে তিনিই একমাত্র যিনি নিজেকে কবি বলতে ভালবাসেন। তার সেই উচ্চারণ ছিল জড়তাহীন এবং স্বতঃস্ফূর্ত।”

তাঁর মর্মবেদনা প্রকট হয়ে ওঠে এই বক্তৃতায় যখন তিনি উচ্চারণ করছিলেন— “সৌভাগ্যময় দেশগুলিতে, মানুষের মর্যাদা যেখানে এত দ্রুত ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয় না, সেখানে কবিরা চান তাঁদের লেখা প্রকাশ করতে, তাঁরা চান তাঁদের লেখাগুলি পঠিত এবং উপলব্ধ হোক, এবং আরও যদি কিছু থাকে তা হল তাঁরা সাধারণ প্রতিকূলতা এবং দৈনিক নিস্পেষণের ঊর্ধ্বে নিজেদের স্থাপন করতে চান। এবং বেশি দিনের কথা নয়, এই শতাব্দীর প্রথম দশকেই কবিদের আড়ম্বরপূর্ণ পোশাক এবং খেয়ালি আচরণের মধ্যে দিয়ে নিজেদের প্রকাশ করার সংগ্রাম আমাদের বাকরুদ্ধ করেছে। কিন্তু এ সব শুধুমাত্র গণপ্রদর্শনের জন্য। সেই মুহূর্তের তখনই জন্ম হয়েছে, যখন কবিরা তাদের পশ্চাতে থাকা দুয়ার বন্ধ করেছেন, পরিত্যাগ করেছেন তাদের বহিরাবরণ, বাহ্যিক আড়ম্বর, কবিত্ব প্রকাশের অনুষঙ্গগুলি, এবং অসমসাহসিকতায় নীরবে সম্মুখীন হয়েছেন— ধৈর্য্যের সঙ্গে তাঁদের সত্তা অপেক্ষমান হয়েছে— নিশ্চল সাদা পৃষ্ঠাগুলির জন্য। এ হল সেই যা অন্তে বিবচনায় আনার যোগ্য।

২০১২-র পয়লা ফেব্রুয়ারি, কর্কট রোগে আক্রান্ত সিমবোর্সকা ঘুমের মধ্যেই পাড়ি দিলেন না ফেরার দেশে। সারা বিশ্বের অগণিত পাঠকের কাছে রেখে গেলেন এক অনবদ্য সৃষ্টিসম্ভার। আপাতদৃষ্টিতে হয়ত তাঁর কবিতাবলিকে সহজ মনে হতে পারে কিন্তু তন্নিষ্ঠ পাঠে অনুভব করে নিতে হয় এই অনবদ্য সৃজনসম্ভারের গভীরতা। তাঁর লেখালিখির আক্ষরিক অনুবাদ বাংলায় করা যেতে পারে কিনা জানা নেই, তবুও ইংরেজি থেকেই নির্বাচিত কিছু কবিতার ভাবানুবাদ করার প্রয়াস করা হল।

 

ইউটোপিয়া

দ্বীপ যেখানে সবকিছুই স্বচ্ছ।
পদতলে শয়ান কঠিন প্রান্তর।

শুধুমাত্র পথগুলি দেয় প্রবেশের অধিকার।

প্রমাণের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়া গুল্ম রাশি।

অকাট্য অনুমান এর বনস্পতি,
সঙ্গে স্মরণাতীত কাল থেকে জট ছাড়াতে চাওয়া শাখাগুলি
বেড়ে ওঠা তার এখানেই।

দীপ্তিমান সরল এবং ঋজু বোধিবৃক্ষ,
এখন বসন্তের প্রভাবে মঞ্জরীর আসা-সে প্রাপ্তি এখানেই।
কাণ্ডের কাষ্ঠল হয়ে ওঠা, দৃশ্যপটের বিস্তার;
সে যেন সুস্পটতার মায়াভূমি।

যখন ঘনিয়ে ওঠে সংশয়ের মেঘ, হাওয়া তো আছেই তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্য।

প্রতিধ্বনির জেগে ওঠা হয়ত অবাঞ্ছিত
চরাচরের সব রহস্যের সুললিত ব্যখ্যা তার কাছেই।

ডান পাশে একটি গুহা সব মর্মার্থেরা সেখানে শায়িত।

বা্মদিকে পড়ে থাকা প্রত্যয়ের অতলান্তিক সরোবর।
তলদেশে খানখান হয়ে যাওয়া সত্য স্পর্শ করতে চায় পৃষ্ঠদেশ।

উপত্যকায় দণ্ডায়মান সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাসের মিনার।
অত্যুচ্চ শৃঙ্গেরা দেখায় বস্তুসমূহের নির্যাসের নান্দনিক দৃশ্যাবলি।

সমগ্র মুগ্ধতার নিরিখে বসতিহীন এ দ্বীপ,
সমুদ্রের অদূরেই সৈকতে ছড়িয়ে থাকে ব্যতিক্রমী
বিলীয়মান পদচিহ্নের সারি।

যা এখানে করা যায় তা হল ত্যাগ আর গভীরতার মধ্যে ডুব দেওয়া,
অতলস্পর্শী জীবনে আর ফিরে না আসা।

 

তিনটি বিসদৃশ শব্দ

যখন আমি ভবিষ্যৎ শব্দটা উচ্চারণ করি,
প্রথম অক্ষরগুলি ইতিমধ্যেই অতীতের অধিকারে।

যখন আমি উচ্চারণ করি নীরবতা শব্দটিকে,
আমি তাকে ধ্বংস করে দিই।

যখন আমি শূন্যতা শব্দটি উচ্চারণ করি,
আমার নির্মাণ অস্তিত্বহীনের ধরাছোঁওয়ার বাইরে থাকে।

 

হিটলারের প্রথম আলোকচিত্র

ছোট্ট গাউনে সজ্জিত এই ছেলেটি কে?
ঐ শিশুটিই অ্যাডলফ, হিটলারের শৈশব
সে কি একজন আইনজ্ঞ হবে?
কিম্বা ভিয়েনার কোন অপেরা হাউসের গায়ক?
কার ছোট্ট হাত এগুলি,কার ছোট্ট কান, চোখ এবং নাক?
কার উদর পূর্ণ হয়েছে দুধে, শুধু আমরা জানি না:
মুদ্রাকর ডাক্তার, ব্যবসায়ী অথবা বণিক! কার?
কোথায় শেষপর্যন্ত ঘুরে বেড়াবে সেই আদরের বাছারা?
বাগানে, স্কুলে, অফিসে, নববধূর কাছে?
হতেও পারে বার্গমিস্টারের কন্যার সন্নিকটে?

অমূল্য ছোট্ট স্বর্গদূত, মায়ের সূর্যকিরণ, প্রিয় সোনা
এক বছর আগে যখন তার ভূমিষ্ঠ হওয়া
আকাশ এবং পৃথিবীর বুকে চিহ্নগুলির কোন অভাব দেখা যায়নি
বসন্তের সূর্য,বাতায়নে জেরানিয়াম এর দৃশ্য
প্রাঙ্গনে ছড়িয়ে যাওয় যাওয়া শিঙাবাদকের বাজনা।
গোলাপি কাগজে মুড়ে রাখা সৌভাগ্য
প্রসব বেদনার পুর্বে তার মায়ের চোখে নেমে আসা অবশ্যম্ভাবী স্বপ্ন
স্বপ্নে ঘুঘু পাখির আসা- আনন্দ দায়ক সংবাদের সূচক
যদি সত্য হয়, দীর্ঘ-প্রতীক্ষিত এক অতিথির পদার্পন অবশ্যম্ভাবী
আঘাত আঘাত, কে ওখানে, এ তো অ্যাডলফের আঘাতকারী মর্মবেদনা।

একটা ছোট্ট ছেলেভুলানো ডায়াপার,ঝুমঝুমি,চুষিকাঠি
আমাদের প্রাণচঞ্চল ছেলেটা, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিই এবং আঘাত করি কাঠে, ভাল,
লোকগাথার মতই দেখায়, ঠিক যেন ঝুড়িতে শায়িত বিড়ালছানা,
অন্য পারিবারিক অ্যালবামের ছোট্ট শিশুর মতই
চুপ,কান্না শুরুর প্রয়োজন নেই, মিঠাই,
কৃষ্ণ অবগুণ্ঠনের আড়াল থেকে ক্যামেরা ছবি তুলবে।

ক্লিঙ্গার অ্যাটেলিয়ার, গ্র্যাবেনস্ট্র্যাসি, ব্রনাউ,
এবং ব্রনাউ ছোট্ট কিন্তু দামী শহর
স্বচ্ছ ব্যবসা,পরোপকারী প্রতিবেশী
গন্ধ ইস্ট-মন্ডের,ধূসর সাবানের
এখানে শোনা যায়না কুত্তার চিৎকার, যায়না নিয়তির পদধ্বনি
একজন ইতিহাস শিক্ষক গাম্ভীর্য্য হারান
বাড়ির পড়া দেখতে গিয়ে হাই তোলেন।

 

বিজ্ঞাপন

আমি ট্রাঙ্কুলাইজার।
আমি বাড়িতে সক্রিয়।
আমি অফিসে কাজ করে চলি
আমি বসতে পারি পরীক্ষায়।
অথবা দাঁড়াতে পারি সাক্ষী হিসেবে।
ভেঙে যাওয়া কাপ আমি জোড়া লাগাতে পারি সন্তর্পণে।
আপনাকে যা করতে হবে তা হল আমাকে নেওয়া,
আপনার জ্বিহার তলায় মিশিয়ে নেওয়া,
এক গ্লাস জলের সহায়তায় আমাকে গলাধঃপকরণ করা।
কী করে দুর্ভাগ্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয় তা আমি জানি,

কী করে সইতে হয় দুঃসংবাদ।
অবিচারের তীব্রতা লঘু করে দেওয়াই আমার কাজ,
ঈশ্বরের অনস্তিত্ত্বের প্রজ্জ্বলন।
বিধবার মুখের শোকাবরণী তুলে এনে দিতে পারি যা আপনার মুখের পক্ষে মানানসই হবে।
কিসের তরে আপনার এহেন প্রতীক্ষা,
বিশ্বাস রাখুন আমার রাসায়নিক গঠনে
আপনি এখনও যুবক/যুবতী
আহত হবার পর কিভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয় তা শেখার পক্ষে এখনও খুব বেশি দেরী হয়ে যায়নি।
সাহসের সঙ্গে আপনাকে মোকাবিলা করতে হবে দুর্ভাগ্যের?
আপনার নরকে আমাকে প্রবেশ করতে দিন।
নিদ্রার আচ্ছাদনে আমি একে মুড়ে দেব।

 

আত্মহত্যার ঘর

আপনি নিশ্চয় ভাবেন শূন্য এ ঘর।
যদিও পোক্ত পৃষ্ঠসহ তিনখানা চেয়ার ছিল এ ঘরে।
আঁধারের বিপ্রতীপে কার্যকর একটি বাতি
একটি ডেস্ক, তার উপরে একখানা ওয়ালেট, কিছু সংবাদপত্র
এক দুঃখহীন বুদ্ধদেব, একজন দুঃখী যিশু
সাতটি সৌভাগ্যসূচক হাতি, ড্রয়ারে একটি খাতা
আপনি ভাবছেন ওতে আমাদের ঠিকানা নেই?

আপনি ভাবেন ওখানে ছিল না কোনও বই, ছবি অথবা নথি?
ওখানে ছিল কালো হাতে ধরা স্বান্তনা দানকারী ট্রাম্পেট
সাসকিয়ার সঙ্গে থাকা তীব্র প্রেমের ফুলগুলি
ভগবৎ কৃপায় বিচ্ছ্যুরিত আনন্দ
তাকে- জীবনদায়ী ঘুমে আচ্ছন্ন ওডিসাস
বুক ফাইভের শ্রমিকদের পরেই তার অবস্থান।
নীতিবাদীরা,
স্বর্ণাক্ষরে ছাপান তাদের নামগুলি।

সুন্দরভাবে ট্যান করা কাঁটার উপর।
পরবর্তী ডানদিকে, রাজনীতিবিদেরা, ঋজুভাবে দন্ডায়মান।

এবং সমাধানের কোনও রাস্তা ছাড়াই, একমাত্র দরজা দিয়ে
আশাহীনতা ছাড়াই, শুধুমাত্র জানালা দিয়ে
কেমন দেখায় ঘরটিকে।
কাঁচগুলি স্পর্শ করে বাতায়নের নিম্নভাগ।
একটি মাছির গুঞ্জন, সেটিই তখনও জীবিত।

আপনি ভাবেন বিবরণীটি হয়ত স্বচ্ছ করে তুলেছে বিষয়টিকে।
এখন কি হবে যদি আমি বলি কোন বিবরণীই নেই-
আমাদের মত অনেকেই, তাঁর বন্ধুরা, হয়ত সেই কাঁচের গায়ে ভার দিয়ে থাকা
খামটির মধ্যে ধরে যেতে পারেন।

 

সাম

ওহ, মানুষের তৈরি রাষ্ট্রের ছিদ্রযুক্ত সীমান্তেরা!
কতগুলি মেঘ শাস্তি এড়িয়ে ভেসে ভেসে অতিক্রম করে সেই বেড়া;
কী পরিমাণ বালু পৃথক ভূমিখণ্ডে বিচরণে সক্ষম হয়;
কতগুলি পাহাড়ি নুড়ি স্খলিতপদে প্রতিস্পর্ধী উল্লম্ফনে আশ্রয় নেয় বিদেশি মাটিতে!

সীমান্তের মুখবিবরের সামনে উড়ে বেড়ানো প্রতিটি পাখিরই নাম কি উল্লেখ করা প্রয়োজনীয়
অথবা সীমান্তে রাস্তা যেখানে বন্ধ সেখানে অবতরণ যাদের?
একটি বিনম্র রবিন— এখনও তার লেজ রয়ে গেছে বিদেশে
যার চঞ্চু এসেছে ঘরে, এই যদি যথেষ্ট না হয়, তার উড়ান বন্ধ হবে না
অসংখ্য কীটপতঙ্গের মধ্যে,আমি আলাদা করে নেব পিঁপড়েকে
সীমান্তরক্ষীদের বাম এবং ডান জুতোর মধ্য দিয়ে
সেই প্রশ্নগুলির প্রতি থাকবে সীমাহীন উপেক্ষা,”কোথা থেকে?” “কোথায়?”
সবিস্তার নথিভুক্তিকরণ, এক ঝলকে,
বিশৃঙ্খলা টিকে থাকে প্রতি মহাদেশে!
নদী তীরবর্তী কোন গুল্ম তার অগুণতি পত্ররাজি
পাচার করে দেয় না নদীতে?
অক্টোপাস ছাড়া কার উদ্ধত প্রলম্বিত বাহু
চূর্ণবিচুর্ণ করতে পারে স্থানিক জলধারার পবিত্র উল্লম্ফনকে?
কোন মুখে আমরা শৃঙ্খলার কথা বলি?
নক্ষত্রসমূহের অবস্থানসমূহ যখন আমাদের
দ্বিধাগ্রস্থ করে তোলে শুধুমাত্র এ বিষয়ে যে কে কার জন্যে কিরণ দিচ্ছে?
বলবার নয় ব্যাঙেদের নিষিদ্ধ ভেসে থাকার কথা!
এবং সমগ্র স্তেপের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস
যেন তারা খণ্ডিত হয়নি!
এবং অনুকূল বাতাসে ভেসে যাওয়া ধ্বনির সারি
সেই ষড়যন্ত্রকারী চিঁ চিঁ শব্দ, সেই দুর্বোধ্য উচ্চারণ
শুধুমাত্র মানুষই হতে পারে বিদেশি
অবশিষ্টেরা মিশ্রিত বৃক্ষরাজি, বিধ্বংসী গুপ্তচর এবং হাওয়া।

 

সমাপ্তি এবং প্রারম্ভ

প্রতিটি যুদ্ধের শেষে
কাউকে নামতেই হয় সুবিন্যস্ত করার কাজে।
বস্তুত জিনিসগুলি তো নিজে থেকেই
সুসংহত হতে পারে না।

রাস্তার উপরে থাকা পাথরগুলিকে
ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে হয় কাউকে
যাতে করে শবদেহ পূর্ণ শকটগুলির
রাস্তা করে নিতে সুবিধা হয়।

কাউকে টেনে নিয়ে যেতে হয় শরীর
কাদা এবং ছাইয়ের মধ্যে দিয়ে,
সোফা স্প্রিং,কাঁচের টুকরো,
রক্তাত্ত বস্ত্রখন্ডের মধ্যে দিয়ে,

কাউকে টেনে নিয়ে যেতে হয় খুঁটি
দেওয়ালগুলিকে খাড়া রাখার তাগিদে,
কাউকে বাড়াতে হয় জানালার উজ্জ্বলতা,
অথবা দরজাগুলির ফ্রেমে আবদ্ধকরণ।

শব্দের দংশন নেই, নেই আলোকচিত্র গ্রহণের সুবিধা
অনেক বছর ধরে,
ক্যামেরারা গিয়েছে,
অন্য যুদ্ধক্ষেত্রে।

সেতুগুলির পুননির্মাণ আবশ্যক,
রেল চলাচলের রাস্তা এবং স্টেশনগুলিরও,
জামার হাতাগুলি গুটিয়ে নিতে হবে খণ্ডে খণ্ডে।

কারুর হাতে ঝাড়ু,
এখনও স্মরণে আসে কেমন ছিল সে সব।
হয়তবা শোনে কেউ,আন্দোলিত হতে থাকে
তার অকম্পিত মস্তিষ্ক।
কিন্তু কাছেই অন্যেরা সক্রিয় হয়ে উঠতে দায়বদ্ধ
কে খুঁজে নেবে সেই সব ক্ষুদ্র ক্লান্তিকর কোন একটা কিছু।

সময় সময় এখনও কেউ অবশ্যই
ঝোপের তলা থেকে খুঁড়ে নিয়ে এসে
অবতারণা করবে ক্লিশে যুক্তির
আর রেখে যাবে একমুঠো বিষাদ।

যারা জানত
কিসের তরে এই সব কিছু
অবশ্য নির্মাণ করবে তাদের অবগতির পথ
যারা জানে বড় কম
এবং তার চেয়েও কম
এবং শেষে কিছুই না জানা বুঝিবা তার চেয়েও কম।

কাউকে শায়িত হতে হবে
সেই ঘাসের মধ্যে, যা আচ্ছাদন দেবে
কারণ এবং প্রভাব গুলিকে
মুখে একটি ভুট্টা মঞ্জরী
মেঘেদের দিকে নির্বাক নির্বোধ চেয়ে থাকা।

 

স্বশাসন

বিপদ পড়লে, সমুদ্রশশক নিজেকে দ্বিধাবিভক্ত করে নেয়
একটি অংশকে ছেড়ে আসে ক্ষুধার্ত পৃথিবীতে
এবং অন্য অংশের সাথে সে পলায়ন করে

প্রচণ্ড তীব্রতায় এ নিয়তি এবং মুক্তির বিভাজন ঘটায়
শাস্তি এবং পুরষ্কার, যা অতীত এবং যা ভবিতব্য

শরীরের মধ্যভাগে সৃষ্ট এক অতলান্তিক গভীরতা
দুটি বিদেশি সমুদ্রতীরের মধ্যবর্তী হয়ে ওঠা

একটি তীরে জীবন, অন্য তীরে মৃত্যু
এখানে আশা অন্যদিকে নিরাশা।

তুলাদণ্ড থাকলেও, পাল্লাগুলি থাকে অবিচল।
বিচার যদি কিছু থেকে থাকে, তা এই।

মৃত্যু যেমন চাওয়া হয়েছে তেমনই, আধিক্য ব্যতিরেকেই
ফিরতে চাওয়া সেই অবস্থানেই যেখানে ছেড়ে আসা হয়েছে

এত সত্যিই, আমরাও আমদের দ্বিধাবিভক্ত করতে পারি
কিন্তু কেবল মাংস এবং ভাঙা ফিসফিসানিতেই।
এবং মাংস ও কবিতায়

একদিকে কণ্ঠ, অন্যদিকে অট্টহাসি

শান্ত, দ্রুত মরে যেতে থাকা

এখানে গুরুভার হৃদয়, সেখানে আমার অসম্পূর্ণ মৃত্যু
তিনটি ছোট্ট শব্দ, উড়ে যাওয়া খেচরের খসে যাওয়া তিনটি পালকের মতই।

গভীর শূন্যতা আমাদের বিভাজিত করে না
সেই অতলান্তিকতা আমাদের ঘিরে থাকে।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...