আচ্ছন্ন ডিস্টোপিয়ার দেশ

অয়নেশ দাস

 


লেখক গদ্যকার, কর্মসূত্রে বিজ্ঞাপনজগতের সঙ্গে যুক্ত

 

 

 

 

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনও প্রেম নেই— প্রীতি নেই— করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।

(জীবনানন্দ দাশ)

জীবনানন্দ শুধু সেদিনের পৃথিবীর কথা ভেবে লাইনগুলো লিখেছিলেন? ভবিষ্যতেরও কি কোনও ইঙ্গিত তিনি রেখে যাননি? এই খেদ কি তাঁর শুধুই ব্যাক্তিগত বোধ থেকে ছিল, নাকি তার একটা সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতও ছিল? তা কি শুধু বিশেষ একটি সময়কে ঘিরে, নাকি তা আবহমানকাল ধরেই সত্য? এ কি তাঁর দুঃস্বপ্ন ছিল না কি বাস্তব অভিজ্ঞতাই? ঠিক কোন মুহূর্তে মানবসমাজ এবং বিশ্বপ্রকৃতি এই দুঃস্বপ্নের চূড়ান্ত বাস্তব পরিণতিতে উপনীত হয়?

কী সেই দুঃস্বপ্নের চরম বাস্তব পরিণতি? জর্জ অরওয়েলের ‘নাইনটিন এইট্টি ফোর’ শুরু হয়েছিল এইভাবে— “It was a bright cold day in April, and the clocks were striking thirteen.” আজকের ভারতবর্ষে, এমনকি এই পৃথিবীর-প্রকৃতির যে কোনও অংশে  দাঁড়িয়ে, ক্ষমতাবান দশ শতাংশের কথা জানি না; কিন্তু বাকি নব্বই শতাংশের অন্তর্গত আমাদের প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি অভিজ্ঞতায় এই শব্দগুচ্ছ মেরুদণ্ডে শীতল তরঙ্গের মতো ক্রমান্বয়ে অভিজ্ঞাত হয়ে চলে।

আমরা রবীন্দ্রনাথের আলোকময় উত্তরাধিকার বুকে নিয়ে বড় হয়েছি, আশাবাদের গর্ভেই লালিত হয়েছি। ধীরে ধীরে আশার পরতগুলো খুলে খুলে গিয়েছে; তবুও সেই চাষাটির মতোই আশায় বেঁচেছি। কিন্তু আচমকা এক ঝটকায় দেখি নিজেরই অজ্ঞাতসারে কখন এক ডিস্টোপিক অন্ধকারের বাসিন্দা হয়ে গিয়েছি।

 

ইউটোপিয়া-ডিস্টোপিয়া

অস্বীকার করার উপায় নেই বাঙালি জীবনে বামপন্থার একটা বড় ভূমিকা ছিল; অন্তত একটা সময় পর্যন্ত। অনেকেই শ্রেণিহীন, শোষনহীন সমাজের স্বপ্নে মশগুল থেকেছি। আবার অনেকেই সেই সমাজকে ইউটোপিয়ান সমাজ বলে উড়িয়ে দিয়েছি। যদিও মার্ক্সীয় বীক্ষায় সেই শ্রেণিহীন, শোষনহীন সমাজ বৈজ্ঞানিকভাবেই অর্জন করা সম্ভব। সেই আলোচনায় এখন যাচ্ছি না।

অক্সফোর্ড ডিকশনারি ইউটোপিয়ার অর্থ বলছে— এমন একটি কাল্পনিক স্থান বা দেশ যেখানে সবকিছু আদর্শ অর্থাৎ ঠিকঠাক। অর্থাৎ যেখানে মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত এবং সবাই সুখে বসবাস করে। ইউটোপিয়ায় আমরা কখনওই ছিলাম না। শোষণ, বঞ্চনা, অসুখ ও কমবেশি অধিকারহীনতার মধ্যেই ছিলাম। উন্নয়নশীল সামাজিক কল্যাণকামী একটি দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা কিন্তু সামগ্রিক ডিস্টোপিয়াতেও বোধহয় ছিলাম না। অন্তত সাহিত্য, চলচ্চিত্র ইত্যাদিতে ডিস্টোপিয়ার যে রূপকল্পনা আমরা দেখেছি সামূহিকভাবে তার মুখোমুখি আমরা হইনি।

এখন এই ডিস্টোপিয়া হল ইউটোপিয়ার প্রতিশব্দ। মানে সব অর্থেই উল্টো। এক ভয়ঙ্কর অবাঞ্ছিত সমাজ অথবা দেশ যার চরিত্রে ছড়িয়ে আছে অমানবিকতা, অত্যাচারী রাষ্ট্র, পরিবেশ বিপর্যয়, নিশ্ছিদ্র নজরদারি ইত্যাদি, ইত্যাদি। সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে ডিস্টোপিয়ার যে রূপকল্পনাগুলি প্রায় এক-দেড় শতক ধরে উঠে এসেছে তা কিছুদিন আগেও— অন্ততপক্ষে ভারতের মাটিতে কষ্টকল্পনা ঠেকলেও আজ যেন অনেক কিছুই মিলে যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও ঐ সব রূপকল্পনাগুলি পড়ে বা দেখে আমরা শিহরিত হতাম। মাথায় প্রশ্ন ঘুরপাক খেত— ভবিষ্যতে সত্যিই কি এমন হতে পারে? বুঝতে পারতাম আশপাশটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং বদলানোটা খুব ভালো দিকে যাচ্ছে না। তবুও ওই অন্ধকার যে আমাদেরও আশেপাশে ছেয়ে আসছে সেটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করত না। এরপর হঠাৎই কোভিডের ঝড়ে টালমাটাল হতে হতে আবিষ্কার করতে শুরু করলাম একসময় পড়া ওই রূপকল্পনাগুলো আমাদের চারপাশ ঘিরে বাস্তব হয়ে উঠতে শুরু করেছে। আমাদের চেতনায়, মননে, প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায়, সামাজিক সম্পর্কে, ব্যক্তিমানুষের সম্পর্কে ও স্বাধীনতায়, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কে, এমনকি মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্কে— প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই ভয়ঙ্কর ডিস্টোপিয়া আমাদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে।

একটি পুঁজিবাদী সমাজ আসলে একটি ডিস্টোপিয়ান সমাজ

অতিমারির এই প্রলম্বিত অন্ধকার রাত্রিই কি আমাদের এই ডিস্টোপিয়ার দরজায় পৌঁছে দিল? এর আগে ইউরোপে হিটলারের উত্থানে, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলিতে মানুষ তো বিভিন্ন সময়ে তা বিভিন্নভাবে প্রত্যক্ষ করেছে! কিন্তু বড়সড় বিধ্বংসী যুদ্ধ ছাড়াও, গণতন্ত্রের ঘেরাটোপে থাকা দেশগুলিও আজ যে এই ডিস্টোপিয়ার মুখোমুখি তা কি কোনও একটি আকস্মিক ব্যাপার?

যতই গণতন্ত্রের ধ্বজা আমরা ওড়াই না কেন আমরা আসলে এক বিস্তৃত পুঁজিবাদী সমাজের বাসিন্দা। আপাত গণতন্ত্রের সুখানুভূতিতে ডুবে থাকতে থাকতে আমরা ভুলে যাই একটি পুঁজিবাদী সমাজ আসলে একটি ডিস্টোপিয়ান সমাজ। সেই অর্থে তো আমরা ডিস্টোপিয়াতেই বসবাস করেছি। কিন্তু তার আঁচ হয়তো আমাদের গায়ে অসহনীয় লাগেনি। তার অনেকগুলি কারণ ছিল। যেমন মানুষের চেতনায় এবং বাস্তব লড়াইতে পুঁজিবাদের প্রতিস্পর্ধী এক আদর্শের পরিপূর্ণ না হলেও এক জোরালো অস্তিত্ব ছিল। সেই প্রতিস্পর্ধী সমাজতান্ত্রিক আদর্শ তথা ব্যবস্থা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে রীতিমতো দরকষাকষির জায়গায় পৌঁছতে পেরেছিল। সামান্য হলেও সেই সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর কিছু সুফল পৃথিবীর একটা অংশের সাধারণ জনসমাজ তো অতি অবশ্যই পেয়েছে। সাধারণ জীবন কিছু সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক রক্ষাকবচ দিয়ে ঘেরা ছিল। আজ সেই কাঠামোর বিপর্যয়ের সঙ্গে সঙ্গে, রক্ষাকবচগুলি অন্তর্হিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাদী সমাজের ডিস্টোপিয়ান লক্ষণগুলো ভীষণভাবে ফুটে উঠছে মাত্র। হয়তো যার আগেই সাক্ষী হতে হয়েছে ইরাক, সিরিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশগুলিকে। তাই আমাদের বুঝতে হবে যে করোনা-অতিমারির বিভীষিকা আমাদের ডিস্টোপিয়ায় এনে ফেলেনি, বরং এই অতিমারিও পুঁজিবাদী ডিস্টোপিয়ান সমাজেরই একটি অতি অবশ্যম্ভাবী লক্ষণ, যা আমাদের এখন গিলে খাচ্ছে।

 

যা ছিল ফিকশন তা আজ ফ্যাক্ট

ডিস্টোপিয়ান সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রগুলিতে যে রূপকল্পগুলি প্রকাশিত হয়েছে তা আমাদের চারপাশে হঠাৎ যেন সত্যি হয়ে উঠছে। কিছুদিন আগেও যা ফিকশন ছিল তা আজ ফ্যাক্ট-এ এসে দাঁড়াচ্ছে। অথচ তার কার্যকারণ তো প্রথম থেকেই সক্রিয় ছিল।

দুশো বছরেরও বেশি সময় ধরে পুঁজির এই আগ্রাসী ক্ষুধায় সম্পূর্ণ বিশ্ব পরিবেশ আজ ভয়ঙ্কর রকম বিপন্ন। জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণায়ন যার সরাসরি অভিঘাত। মুনাফার স্বার্থে অপরিমিত জীবাশ্ম-জ্বালানির ব্যবহার, প্রকৃতিকে যথেচ্ছ নির্দয়ভাবে ব্যবহার করে পুঁজিবাদ শুধু মানুষ ও প্রকৃতির অনন্যোজীবী সম্পর্ককে ধ্বংস করেনি, ধ্বংস করে চলেছে প্রকৃতির নিজের তৈরি করা তাবৎ বিন্যাসের ভারসাম্যকে। সেই অবিন্যাসের ডিস্টোপিয়া আমরা ইতিমধ্যেই ভোগ করতে শুরু করে দিয়েছি। যার কথা অমিতাভ ঘোষ তার ‘দ্য গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট’ বইতে আলোচনা করেছেন। তাঁর বইটির আক্ষরিক বাংলা হল ‘মহা অবিন্যাস’।

ল্যাবেই তৈরি হোক বা প্রকৃতি থেকেই আসুক, এই কোভিড ১৯ ভাইরাসটি যে এই প্রাকৃতিক ভারসাম্যের বিরুদ্ধেই পুঁজিবাদের অবিচ্ছিন্ন মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার ফলাফল— এক তৈরি করা মহা অবিন্যাসের ফলাফল— তা তো আজ প্রমাণিত। কোভিডোত্তর যে সমাজে আমরা বাস করছি তার সঙ্গে একশো বছরেরও আগে লেখা এম ফস্টারের ‘দ্য মেশিন স্টপ্‌স্‌’-এর চমকপ্রদ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এই ডিস্টোপিয়ান গল্পে দেখা যায় মানুষ তার স্বাভাবিক পরিবেশে থাকার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ এখন মাটির নীচে এক একটি বিশেষ মানের কুঠুরিতে এককভাবে অর্থাৎ আইসোলেশনে থাকে। তার সমস্ত জাগতিক-শারীরিক-মানসিক চাহিদা পূরণ করে একটি সর্বশক্তিমান গ্লোবাল মেশিন। তার যাবতীয় যোগাযোগ সাধিত হয় ইন্সট্যান্ট মেসেজিং ও ভিডিও কনফারেন্সিং মারফত। বাহ্‌! ১৯০৯ সালে যা লেখা হয়েছিল ২০২০তে এসে আমরা তো ঠিক সেইভাবেই বেঁচে থাকা শুরু করেছি, তাই না?

 

এ দেশেও কোনও ব্যতিক্রম ঘটেনি

ডিস্টোপিয়ান ফিকশনগুলিতে আমরা বারবার এমন সব রাষ্ট্রের কথা উঠে আসতে দেখি যা ভীষণরকম অথরিটেরিয়ান অর্থাৎ সোজা বাংলায় স্বৈরাচারী এবং অত্যাচারী। এবং প্রায় সবকটিরই একটি বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হল ভয়ঙ্করভাবে ডিহিউম্যানিজম বা অমানবিকীকরণের ঝোঁক। অল্ডাস হাক্সলির ‘ব্রেভ নিউ ওয়র্ল্ড’ বা জর্জ অরওয়েলের ‘নাইনটিন এইট্টি ফোর’ অথবা রে ব্র্যাডবেরির ‘ফারেনহাইট ৪৫১’-তে রাষ্ট্রের এই প্রত্যেকটি চরিত্রই রূপকল্প হয়ে উঠে এসেছিল।

রাষ্ট্রের এইসব চরিত্রের রূপকল্প থেকে প্রথমেই আমাদের অবধারিতভাবে মনে এসে যায় হিটলারের জার্মানির কথা। শুধু সেই জার্মানি নয়, আরও অনেক উদাহরণই দেওয়া যায়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে বহু দেশেই তৈরি হয়েছিল সামাজিক কল্যাণকামী রাষ্ট্রের পরিকাঠামো। আমাদের ভারতবর্ষের রাষ্ট্রিক পরিকাঠামোও ছিল তাই। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষ ধাপেই বস্তুত প্রতিরোধহীন কর্পোরেট পুঁজি তার দাঁত-নখ বার করে ফেলে। ঐ সব কল্যাণকামী রাষ্ট্রের পরিকাঠামো দ্রুত ধ্বংস হতে থাকে ও কর্পোরেট পুঁজির তল্পিবাহক স্বৈরতান্ত্রিক পরিকাঠামো একে একে দেশগুলিকে গ্রাস করতে থাকে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে ব্যাপারটা ঘটলেও মূলগতভাবে তা পুঁজির উদগ্র লালসাকে চরিতার্থ করার নামেই ঘটে। দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশেও তার কোনও ব্যতিক্রম ঘটেনি।

২০০৩ সালে ম্যাক্স ব্যারির ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস ‘জেনিফার গভর্নমেন্ট’-এ আমেরিকা ও ওশেনিয়ার সমস্ত দেশগুলির সর্বৈব নিয়ন্ত্রণ থাকে সর্বশক্তিমান কর্পোরেটগুলি ও তাদের কায়েমি আঁতাতের হাতে। দেশগুলির প্রকৃতপক্ষে কোনও ক্ষমতাই থাকে না। আবার ২০১২য় সাইমন ব্যারির তৈরি ‘কনটিনাম’ নামের কানাডিয়ান সায়েন্স ফিকশন সিরিজটিতে আমরা একটি নতুন ধরনের কর্পোরেট রিপাবলিক ব্যবস্থা দেখতে পাই যা একটি ডিস্টোপিয়ান ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে বলীয়ান এক পুলিশি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে জনতার ওপর চলে নিশ্ছিদ্র নজরদারি আর মানুষের সবরকম সামাজিক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়।

না, আমাদের দেশে এই সমস্ত কিছু আর ফিকশন বলে মনে হয় না। দেশে দেশেই কর্পোরেট ও রাষ্ট্রের এই ডিস্টোপিয়ান চরিত্রগুলি ক্রমশ নগ্ন প্রকট হয়ে ঊঠছে। আমাদের দেশ যেন তার সামনের সারিতেই আছে। আমরা যখন লকডাউনে বন্দি তখন দেশের একের পর এক পাবলিক সেক্টরগুলি কোনওরকম পরোয়া ছাড়াই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। একে একে বিক্রি হচ্ছে এভিয়েশন, কয়লা খনি সমেত সমস্ত খনিজ উত্তোলন কেন্দ্র, কৃষিক্ষেত্র, এমনকি সার্বভৌমত্বের প্রতীক ভারতীয় রেল পর্যন্ত। প্রায় সমস্ত সংরক্ষিত ও অসংরক্ষিত বনাঞ্চল কর্পোরেট মাইনিং-এর আওতায় আনা হচ্ছে। হ্যাঁ, দেশের জনতাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখেই দেশের সমস্ত সম্পত্তি কর্পোরেটের লালসার হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ম্যাক্স ব্যারি তাঁর ‘জেনিফার গভর্নমেন্ট’-এ ঠিক এইটাই লেখেননি? আর ‘কনটিনাম’-এর পুলিশ রাষ্ট্রের স্বরূপ? সে তো আমরা ভারভারা রাওদের মতো মানুষদের পরিণতি থেকেই টের পেয়ে যাই।

 

শুধুই একটি নাম্বার

ফিকশনের প্রায় প্রতিটি ডিস্টোপিয়ান সমাজে নিশ্ছিদ্র নজরদারি বা সার্ভেল্যান্স এক অতি জরুরি অনুষঙ্গ। আজকের পৃথিবীর পরিপ্রেক্ষিতটা কীরকম? প্রযুক্তির বিস্ফোরণে সম্মোহিত করে, প্রযুক্তির ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়ে পুঁজিবাদ আমাদের ব্যক্তিক স্বাধীনতার পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্র ও কর্পোরেটের যৌথ ব্যবস্থাপনায় চলছে নিশ্ছিদ্র নজরদারির এক নিখুঁত অন্তর্জাল।

মাত্র কয়েক বছর আগেই সর্বপ্রথম এই ভারত রাষ্ট্রেই প্রায় জোর করে চালু করা হল আধার। সমস্ত নাগরিকের বায়োমেট্রিক তথ্য ছিনতাই করে নেওয়া হল। সঙ্গে সঙ্গেই নজরদারির কোডিং-এ আমরা পরিণত হলাম শুধুমাত্র এক একটি নাম্বারে। রাশিয়ান লেখক ইয়েভগেনি জামিয়াটিন ১৯২১ সালে ‘উই’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। সেখানে তিনি এমন একটি রাষ্ট্রের কথা লিখেছিলেন যেখানে মানুষ আর নাম দিয়ে পরিচিত ছিল না, তারা শুধু এক একটি নাম্বার হিসেবে পরিচিত হত। আমরাও তো আজ এক একটা নাম্বার! এক একটি আধার নাম্বার! আর সেই আধার নাম্বার মারফত আমরা রাষ্ট্র ও কর্পোরেটের কাছে আমাদের টিকি বাঁধা দিয়ে বসে আছি। আবার ডিমনিটাইজেশন জোর করে চাপিয়ে দিয়ে আমাদের ঠেলে দেওয়া হল ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং-এর দিকে। ব্যাঙ্কের সঙ্গে আধার লিঙ্ক করতে বাধ্য করা হল আমাদের। জুড়ে গেল অ্যাকাউন্ট নাম্বার। এছাড়াও জুড়ে আছে আছে মোবাইল নাম্বার, ফোন নাম্বার, ভোটার কার্ড নাম্বার, প্যান নাম্বার… রাষ্ট্র ও কর্পোরেটের কাছে আমরা শুধুই অন্তহীন নাম্বারের সমষ্টি। নাম্বার দিয়েই মুহূর্তে তল্লাশি করে দেখে নেওয়া যায় আমাদের ব্যক্তিজীবনের যাবতীয় খাস অন্দরমহল।

আসলে ব্যক্তিজীবনের কোনও ধাপেই আর আমরা নজরদারির আওতার বাইরে নেই। অথচ মানতে বাধা নেই যে প্রযুক্তির এই সুকৌশলী বিস্ফোরণে আমরা সত্যিই মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। একের পর এক অ্যাপ-এর প্রাত্যহিক ব্যবহার আমরা আমাদের জীবনচর্যার গভীরে টেনে এনেছি ও একই সঙ্গে নিজেদের একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য নিজেদের অজান্তেই তুলে দিয়েছি তাদের হাতে। গুগলে আমরা সার্চ করছি ভেবেছিলাম, তার বদলে গুগলই আমাদের আগাপাশতলা সার্চ করে ফেলছে তা ভাবতে পারিনি। না চাইলেও আমাদের জীবনের প্রত্যেকটি ইঞ্চি এখন পুঁজিবাদী নজরদারির অধীন। না চাইলেও নজরদারির ডিস্টোপিয়া এখন প্রতিটি বোতলবন্দি ব্যক্তিজীবনের একান্ত অনুষঙ্গ।

 

মেশিন ও মানুষ

আমরা নেহাতই পুঁজির হাতে বোতলবন্দি। পুঁজিবাদ আমাদের প্রকৃতি, সমাজজীবন, সম্পর্ক, জ্ঞান, আমাদের শ্রম এমনকি আমাদের নিজের সত্তা থেকেই বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। সে মেশিন, রোবট ও গ্যাজেটে ভরা এক দুঃস্বপ্নের সমাজ তৈরি করেছে। মানুষ ক্রমে আত্মবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। পৃথিবীব্যাপী অতুলনীয় অবসাদের সমুদ্র মানবজীবন গ্রাস করে চলেছে। বিভিন্ন স্তরের সমাজেই আত্মহননের সংখ্যা লাফ দিয়ে দিয়ে বাড়ছে। যন্ত্রে ঘেরা এক ভয়াবহ যান্ত্রিক জীবনে বসবাস করতে করতে ক্রমশ আমরা অতলান্ত নাগরিক ডিস্টোপিয়ার অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি। আমাদের পরের প্রজন্মকে ইতিমধ্যেই যে কোনওরকম সুস্থ শৈশব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে, সুস্থ ভবিষ্যৎ থেকেও তাই তারা অবধারিতভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

মার্ক্স আমাদের দেখিয়েছিলেন পুঁজিবাদী উৎপাদন কিভাবে শ্রমজীবী মানুষকে তার নিজের উৎপাদন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। বিচ্ছিন্ন শ্রম এমন একটি জগৎ সৃষ্টি করে যে উৎপাদক নিজেকেই আর চিনতে পারে না। একধাপ এগিয়ে মুনাফার নেশায় মত্ত পুঁজিবাদ এখন শ্রমদানের যাবতীয় প্রক্রিয়া থেকে মানুষকেই বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। ব্যাপকহারে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশন চালু করার মাধ্যমে, অত্যাধুনিক রোবোটিক্স প্রযুক্তির বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিদিন বিশাল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ কাজের বাজারে উদ্বৃত্ত হয়ে পড়ছেন। যারা এখনও টিকে আছেন কর্মক্ষেত্রে তাদের শ্রমের মর্যাদাও আজ ভূলুন্ঠিত।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশনের এই ডিস্টোপিয়া নিয়ে ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল কার্ট ভোনেগুট-এর উপন্যাস ‘প্লেয়ার পিয়ানো’। এই উপন্যাসে এমন একটি ডিস্টোপিয়ান উৎপাদন প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছিল যেখানে অটোমেশনই শেষ কথা। মানুষের শ্রম সেখানে সিদ্ধান্তবিহীন দাসত্বমূলক। মোটকথায় মানুষ সেখানে মেশিনের মর্যাদাহীণ আজ্ঞাবহ দাস মাত্র। আজকের পৃথিবীতে বিপুল সংখ্যক মানুষকে বাতিল করে দেওয়ার পুঁজিবাদী অমানবিকরণের চক্রান্ত দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশন, রোবোটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইত্যাদি মানবতাবিরোধী প্রযুক্তির ব্যাবহার শ্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত পৃথিবীর বড় অংশের মানুষকে এক অমানবিক ডিস্টোপিয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

 

বাতিল মানুষের মিছিল

পুঁজি যখনই সঙ্কটে পড়ে তখন সে ফ্যাসিবাদকে মানুষের ঘাড়ের ওপর বসিয়ে দেয়। পুঁজির মূলমন্ত্র হল মুনাফা আর মুনাফার মূল চালিকাশক্তি হল শোষণ। এই শোষণের অবধারিত ফলাফল হল দুঃসহ নিষ্ঠুর অসাম্য। ফলে পুঁজিবাদের প্রকরণগুলির মধ্যেই নিহিত থাকে চূড়ান্ত অমানবিকীকরণের পুরোদস্তুর ঝোঁক। ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে এই অমানবিকীকরণের ঝোঁকটি হঠাৎ করে উদোম হয়ে যায়। ১৯৩০-এ গ্রেট ক্রাইসিসের পরেও তা হয়েছিল। এখনও আবার সেই ডিস্টোপিয়া ফিরে এসেছে।

গ্রেট ক্রাইসিসের পরে এই ডিহিউম্যানিজম বা অমানবিকীকরণের শিকার হিসেবে প্রথমেই উঠে আসবে হিটলারি রেজিমের হতভাগ্য ইহুদিদের প্রসঙ্গ। এখন সেই অমানবিকীকরণের ঝোঁক আবারও দেশে দেশে বিষাক্ত সংক্রমণের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। কোনও দেশে ইহুদিদের জায়গা নিচ্ছে মুসলমানেরা, কোথাও ব্ল্যাক ও হিস্পানিক, কোথাও কুর্দ জনজাতি আবার কোথাও বা সাব-সাহারান কোনও গোষ্ঠী। এই দেশে দেশে অমানবিকীকরণের দৃষ্টান্তগুলি ওপরের স্তরে ধর্ম অথবা রেসিজম যে নাম নিয়েই আসুক না কেন আসলে তা পুঁজিবাদী চক্রান্তেরই অংশ মাত্র। এ দেশেও এনআরসি-র মতো অমানবিক আইন ফ্যাসিবাদ ও পুঁজিবাদের যৌথ চক্রান্তের ফসল। দেশে দেশে গড়ে উঠেছে ক্যাম্প। আউশভিৎসের বিভীষিকা আবার নেমে এসেছে পৃথিবীর মাটিতে।

জাতিগত বা গোষ্ঠীগত এই অমানবিকীকরণের দৃষ্টান্তগুলি তবু আমাদের চোখে পড়ছে। কিন্তু আরও অসংখ্য ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে এই অমানবিকীকরণের ডিস্টোপিয়া নিঃশব্দে ঘটে যাচ্ছে। ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা। শ্রমজীবী মানুষদের কথা আমরা আগেই বলেছি। প্রত্যেকটি ঘটনা আমাদের নাকের ডগায় আমাদের দেশেই বিপুলভাবে ঘটে চলেছে। উন্নয়ন নামক একটি ধোকার টাটি গিলিয়ে আমাদের কনসেন্টও নিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বন্য প্রকৃতির সঙ্গে জনজাতিগুলির হাজার হাজার বছরের নিবিড় সহাবস্থানের ইতিহাসকে ধ্বংস করে, অরণ্যজীবী মানুষকে উন্নয়নের নাম করে তার বাসভূমি থেকে উৎপাটিত করে তাদের সর্বহারা ভিখিরিতে পরিণত করা হচ্ছে। যার একটি দুর্ভাগ্যজনক রূপকল্প সাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরী তাঁর ‘ভারতবর্ষ’ গল্পটিতে অনেকদিন আগেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গিয়েছিলেন। এই লকডাউনের সময়েই আমাদের দেশের পরিবেশ আইনের কয়েক দফা সংশোধনী এনে তার যা অবস্থা করা হল তাতে নিয়মগিরির কুমটি মাঝিদের অসামান্য প্রতিরোধও যে সেই একই ডিস্টোপিয়ান দুর্ভাগ্যের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছে, তাতে সন্দেহ নেই।

এই যে বিশাল সংখ্যক মানুষকে অপাংক্তেয় করে দেওয়া হচ্ছে, বিশেষ বিশেষ শ্রেণিগুলিকে বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে; এই বিপুল জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যত কী? ক্যাম্পে, উদ্বাস্তু শিবিরে ধুঁকতে ধুঁকতে মরা? নাকি জঙ্গল, জমি থেকে উৎখাত হয়ে শহরের রাস্তায় ভিখিরির জীবন বাঁচা? না কি আরও ভয়াবহ ডিস্টোপিয়া অপেক্ষা করে আছে তাদের জন্যে?

 

আমাদের ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড

পুঁজিবাদ কোনও মতাদর্শগত ব্যবস্থা নয়। মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে সম্পদ সৃষ্টির উপকরণগুলির কুক্ষিকরণ ও সাধারণ মানুষের শ্রম ও জ্ঞানের শোষণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিশেষ উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা। তাই পুঁজিবাদ অনৈতিক হতে বাধ্য। পুঁজিবাদের নৈতিক ভিত্তি হল যা হারবার্ট স্পেন্সার বলে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ ‘সার্ভাইভ্যাল অফ দি ফিটেস্ট’। ডারউইন সাহেবের প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্ব বাজারে আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর নাম করেই উঠে আসে ‘সোশাল ডারউইনিজম’ বা ‘সামাজিক ডারউইনবাদ’। স্পেন্সারকে সামনে রেখে তারা এই মতবাদ প্রচার করতে থাকে— সমাজে তারাই টিকে থাকবে যারা টিকে থাকার যোগ্য। প্রকৃতিতে যেমন প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে সেই প্রজাতিটিই টিকে থাকে যে প্রজাতিটি টিকে থাকার যোগ্যতা দেখায়। সমাজে তেমনি সেই মানুষটিই টিকে থাকবে যে টিকে থাকার যোগ্য। ডারউইনের টিকে থাকার ক্ষেত্রে আন্তঃপ্রজাতি প্রতিযোগিতার তত্ত্বটিকে অন্তর্প্রজাতি প্রতিযোগিতায় অবনমিত করেছে সামাজিক ডারউইনবাদীরা। পুঁজিবাদী নৈতিকতার মর্মবস্তু হিসেবে পুঁজিবাদ তত্ত্বটিকে গ্রহণ করেছে, সর্বতোভাবে সমাজে ন্যায়সঙ্গত করার চেষ্টা করেছে এবং তারা যে এ ব্যাপারে অসফল হয়েছে তা আমরা বলতে পারি না। আমরা কীভাবে অস্বীকার করি যে আমাদের সাধারণ নাগরিক জীবনের মননেও বিষয়টি একরকম মান্যতা পেয়ে গিয়েছে?

১৯৩১ সালে লেখা অল্ডাস হাক্সলির ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’ উপন্যাসটিতে হাক্সলি একটা মারাত্মক ইঙ্গিত দিয়ে যান। হাক্সলি যে ডিস্টোপিয়ান সমাজের কথা বলেন সেখানে প্রাকৃতিক ব্যবস্থার প্রকৌশলগত পরিবর্ত্তন ঘটিয়ে মানুষের এক কৃত্রিম সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ঘটানো হয়। সমস্ত নাগরিককে আলফা, বিটা, গামা, ডেল্টা, এপ্সাইলন নামক শ্রেণিগুলিতে জন্মগতভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়। এবং আরও ভয়ঙ্কর হল এই অন্যায় শ্রেণিবিন্যাসের নীচের শ্রেণিগুলির মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা অত্যাধুনিক প্রকৌশলে কমিয়ে দেওয়া হয় যাতে তারা তাদের নিজেদের দুর্ভাগ্যজনক অবস্থাতেই সন্তুষ্ট হয়ে পড়ে। পরের শতাব্দীতে পৌঁছে আমরাও কি আমাদের অবস্থাতে একরকম সন্তুষ্ট হয়ে পড়ছি না? এই মিথ্যা সন্তুষ্টিই কি আমাদের মননে এই সর্বৈব অনৈতিক ব্যবস্থার সপক্ষে মান্যতার নির্মাণ করছে না?

অথচ গত শতাব্দীর প্রথম ও মধ্যভাগ জুড়ে অধিকাংশ দেশে অত্যাচারিত মানুষের মধ্যে প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের যথেষ্ট প্রবণতা লক্ষ করা গিয়েছে। পুঁজিবাদকে তার জন্য যথেষ্ট হিমসিম খেতে হয়েছে। ফ্যাসিবাদের ডিস্টোপিয়া কাটিয়ে উঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর দেশে দেশে সামাজিক কল্যাণকামী মডেল জনপ্রিয়তা পেয়েছে, এ তো সত্য! কিন্তু আরও সত্য এই যে সেই সময় থেকেই পুঁজিবাদ পাখির চোখ করে আমাদের চেতনা ও মননকে নিশানা করে ফেলেছে। অসম্ভব দ্রুততায় রাক্ষুসে প্রযুক্তির এক মহাবিস্ফোরণ ঘটিয়ে, ক্রমাগত মগজে বিচারবোধবর্জিত তথ্য, ভুল তথ্য, বানানো তথ্যের হ্যামারিং করে করে আমাদের চেতনার সমস্ত বৌদ্ধিক কার্যক্ষমতাকে সে বিন্দুবৎ কমিয়ে দিয়েছে। মেশিন, গ্যাজেট আর প্রযুক্তির অন্তর্জালে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে গিয়ে আজ আমরা ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’-এর নিম্নবর্গের নাগরিকদের মতোই চেতনার জড়ভরত্ব লাভ করেছি। হ্যাপিনেস সিডেটিভ গেলার মতোই কার্যকারণহীন, অর্থহীন বিচ্ছিন্ন আনন্দের স্রোতে আমাদের চেতনাকে মাতিয়ে রেখে আমাদের এমন জড়ত্বের দিকে পুঁজির তৈরি এই সমাজ ঠেলে দিয়েছে যে অন্ধকারকেও আলো বলে আমরা হিল্লোলিত হয়ে চলেছি। আসলে আমাদের মেনে নিতে হবে আমাদের চেতনা লুট হয়ে গেছে। সেখানে পুঁজিবাদ তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে ফেলেছে। আমাদের মানতেই হবে যে পুঁজিবাদ অসামান্য সাফল্যের সঙ্গেই আমাদের চূড়ান্ত বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পেরেছে। আর বিচ্ছিন্ন মানুষ ডিস্টোপিয়ার অন্ধকারে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে!

আজকের এই সার্বিক অসহায়তার কথা অল্ডাস হাক্সলি প্রায় ভবিষ্যদ্বক্তার মতো ব্যক্ত করে গিয়েছিলেন। সোশ্যাল ক্রিটিক নীল পোস্টম্যান ১৯৮৫ সালে লেখা তার বইতে জর্জ অরওয়েলের ‘নাইনটিন এইট্টি ফোর’ ও হাক্সলির ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’-এর প্রতিতুলনা টেনে এই বিষয়টিতে আলোকপাত করেছিলেন। আমরা মিলিয়ে নিতে পারি— What Orwell feared were those who would ban books. What Huxley feared was that there would be no reason to ban a book, for there would be no one who wanted to read one. Orwell feared those who would deprive us of information. Huxley feared those who would give us so much that we would be reduced to passivity and egoism. Orwell feared that the truth would be concealed from us. Huxley feared the truth would be drowned in a sea of irrelevance. Orwell feared we would become a captive culture. Huxley feared we would become a trivial culture, preoccupied with some equivalent of the feelies, the orgy porgy, and the centrifugal bumblepuppy.

অরওয়েল কল্পিত ডিস্টোপিয়ার সঙ্গে মানুষ ইতিমধ্যেই বহুবার পরিচিত হয়েছে, তার মধ্যে বসবাস করেছে। এমনকি অরওয়েলের নিজের সময়েও তার কিছু কিছু দেখা গিয়েছে। কিন্তু হাক্সলির কল্পিত ডিস্টোপিয়া্র প্রকরণগুলি সেই অর্থে ব্যাপকতর এবং সূক্ষ্মতর এবং প্রকৃত অর্থেই সার্বিকভাবে অনেক বেশি ভয়াবহ। দুনিয়াব্যাপী হিল্লোলে ভেসে এক সর্বগ্রাসী ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে আমরা হাক্সলি কল্পিত সেই নতুনতর, ব্যাপকতর এবং সূক্ষ্মতর ডিস্টোপিয়ার দুনিয়ায় এসে পড়েছি।

ফ্রান্সিস গাল্টনের জিন

প্রযুক্তি দিয়ে মানুষের শ্রমকে যখন পুঁজিবাদ অদূর ভবিষ্যতেই প্রতিস্থাপিত করে দিতে পারবে তখন এই বিশাল সংখ্যক প্রতিরোধহীন বাতিল, অপাংক্তেয় মানুষকে পুঁজিবাদ কী চোখে দেখবে? পুঁজিবাদী সমাজে তারা তো তখন বোঝা হয়েই দাঁড়াবে। পুঁজিবাদ কেন তাদের পার্থিব সম্পদের সামান্যতম হকদার বলেও মানবে?

সামাজিক ডারউইনবাদের উত্থানের পরে পরেই চার্লস ডারউইনের সম্পর্কিত এক ভাই ফ্রান্সিস গাল্টন-এর হাত ধরে উঠে আসে ইউজেনিক্স-এর তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুসারে উচ্চতর জেনেটিক কোয়ালিটির প্রতিনিধি সম্পদশালী ও শক্তিমান মানুষেরাই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার যোগ্য। আর সেই উচ্চতর উৎকর্ষের জিনের প্রতিনিধি সংখ্যা বাড়ানোর জন্যই নিম্নতর জিনের প্রতিনিধি সংখ্যা অর্থাৎ দরিদ্র, দুঃস্থ, দুর্বল, সংখ্যালঘু জনজাতি, শারীরিকভাবে অপটু মানুষদের সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে। তারপর থেকেই বিভিন্নভাবে চালু হয় এই তথাকথিত দুর্বল শ্রেণির মানুষের সংখ্যা উদ্দেশ্যমূলক ব্যাপক জন্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কমিয়ে আনার বিভিন্ন প্রকল্প। পুঁজিপতিদের বিভিন্ন সংগঠন এই প্রকল্পগুলিকে সাকার করতে এগিয়ে আসে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি বৃহৎ সংগঠনের একটি হল রকফেলার ফাউন্ডেশন এবং অপরটি কার্নেগি ফাউন্ডেশন। পরবর্তীকালে হিটলার খোলাখুলিভাবে ইউজেনিক্স-এর তত্ত্বটিকে সমর্থন করে এবং জার্মানিতে ব্যাপকভাবে তার প্রয়োগও শুরু করে। যেমন টি৪ ইউজেনিক স্টেরিলাইজেশন প্রোগ্রামটি ছিল নাৎসি জার্মানির একটি কুখ্যাত প্রকল্প। এ ব্যাপারে এত কথা এইজন্যই বলা যাতে আমাদের বুঝে নিতে সুবিধে হয় যে ইউজেনিক্স-এর মতো একটি ভয়াবহ ডিস্টোপিয়ান মতবাদ পুঁজিবাদ ও ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কীভাবে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল এবং আজও আছে। বারেবারেই দেখা গিয়েছে পুঁজিবাদের ডিএনএ-তে ফ্রান্সিস গাল্টনের জিন প্রত্যক্ষভাবে ক্রিয়াশীল। কিন্তু তা আর আগের মতো গ্যাসচেম্বারের বদ্ধ অন্ধকারের সদম্ভ উচ্চারণের মতো করে নেই; সংখ্যাহীন অর্ধসত্য-অসত্যের অনিঃশেষ অপলাপের মধ্য দিয়ে তা আজকের দুনিয়ায় চারিয়ে যাচ্ছে মগজ থেকে মগজে, সামাজিক মানুষের অন্তঃস্থ মননে।

যেমন নিও-কলোনিয়াল থাবায় ছিন্নভিন্ন আফ্রিকা আজ এই ইউজেনিক্সিয় পরীক্ষানিরীক্ষার আঁতুরঘর। বৃহৎ পুঁজিবাদী সংগঠনগুলির বিভিন্ন শাখা সেখানে অসহায় কালো মানুষদের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যে ডেপো প্রোভেরার মতো অত্যন্ত ক্ষতিকর কন্ট্রাসেপ্টিভের ব্যাবহার, সেকেন্ড সেমিস্টার অ্যাবর্শন ও বিভিন্ন ভ্যাক্সিনের সম্পূর্ণ অনৈতিক ট্রায়াল সেখানে চালিয়ে যাচ্ছে। উৎসাহী পাঠক ওবিয়ানুজু একোচার লেখা ‘টার্গেট আফ্রিকা’ বইটি পড়ে দেখতে পারেন। তা ছাড়াও এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলিতেও গরীব ও পিছিয়ে পড়া মানুষদের ওপর যথেচ্ছ অনৈতিক ট্রায়াল চালিয়ে যাচ্ছে বৃহৎ পুঁজিবাদী সংগঠন ও বিগ ফার্মা কোম্পানিগুলি। এই সমস্ত ভয়াবহ অনৈতিক এবং অমানবিক কারবারের পেছনে যাদের নাম বারবার উঠে আসছে তারা হল বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। এর পেছনে একটি মুনাফাচক্র তো কাজ করছে বটেই; এছাড়াও এক চরম মানবতাবিরোধী ইউজেনিক্সিয় মানসিকতাও সমানভাবে কাজ করে চলেছে। অথচ সবই চলছে পরিবার পরিকল্পনা, নারীর ক্ষমতায়ন প্রভৃতি অর্ধ্যসত্যের পাহাড় সামনে রেখেই। ব্যাপক মানুষের সম্মতি আদায় করেই।

 

ফিলানথ্রপির ভাইরাস

পুঁজিপতিদের একটা মজা আছে। একটু বয়স হলেই তারা প্রত্যেকেই এক একজন ফিলানথ্রপিস্ট হয়ে পড়েন। বিল গেটসও এইরকম একজন স্বঘোষিত ফিলানথ্রপিস্ট। তাঁর ফিলানথ্রপির নমুনা শুধু আফ্রিকা নয়, প্রায় সব অনুন্নত অথবা উন্নয়নশীল দেশেই ছড়িয়ে আছে। তিনি পৃথিবীর ভ্যাক্সিন অধিপতি। ভ্যাক্সিনের মাধ্যমে পৃথিবীর জনসংখ্যা কমিয়ে আনা— বিল গেটসের ঘোষিত উদ্যোগ। ভারতে আধার নাম্বারের প্রবর্তনের পেছনেও গেটসের ভূমিকা ছিল। গেটসের মতো পুঁজিপতিদের ভয়ঙ্কর ফিলানথ্রপির ঠেলায় আমাদের তৃতীয় বিশ্বের অবস্থা ক্রমশ জামিয়াটিন বা হাক্সলির কল্পিত ডিস্টোপিয়ার জগতের মতো হয়ে উঠছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এই প্রকল্প চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে গেটস ফাউন্ডেশন তৈরি করেছে গাভি— দ্য ভ্যাক্সিন অ্যালায়েন্স এবং ইউনাইটেড নেশন্স ও রকফেলার ফাউন্ডেশনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আইডি ২০২০। এদের মাধ্যমে চালু হতে চলেছে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ‘ডিজিটাল সার্টিফিকেট’। এই সার্টিফিকেটে প্রতিটি নাগরিকের চিকিৎসা সম্বন্ধীয় যাবতীয় তথ্য (ভ্যাক্সিন প্রাপ্তির তালিকা সহ) মজুত থাকবে এবং এর ওপরেই নির্ভর করবে নাগরিকটির বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা ও পরিষেবা পাওয়ার অধিকার। এই আইডি অতি অবশ্যই বায়োমেট্রিক হবে। সোজা কথায় আইডি ২০২০ ক্রমে এমন একটি ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা তৈরি করতে যাচ্ছে যা একটি নাগরিকের যাবতীয় তথ্য মজুত করায় সক্ষম হবে এবং অবশ্যই তা যে কোনও সরকারের বা রাষ্ট্রের আওতার বাইরে থেকে উপলব্ধ করা সম্ভব হবে। আইডি ২০২০-র সরকারি ওয়েবসাইট জানাচ্ছে যে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে উদ্বাস্তুদের এবং ডিজিটাল পরিচয়হীন মানুষদের ট্র্যাক করার জন্যই এই বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল পরিচয়ের শংসাপত্রের আশু প্রয়োজন। বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয় কী ভয়ঙ্কর বিশ্বব্যাপী নজরদারি ও বেছে বেছে অমানবিকীকরণের ডিস্টোপিয়া আমাদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে কারণ ইতিমধ্যেই আমাদের পাশের ঘর বাংলাদেশে ডিজিটাল আইডি-র পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু হয়ে গিয়েছে।

হঠাৎ করে কোভিড ১৯ ভাইরাসটির আবির্ভাব, পৃথিবীব্যাপী সংক্রমণ ও তার জেরে পৃথিবীব্যাপী ত্রাসের রাজত্ব আমাদের কাছে এতটাই অতর্কিত যে আমরা যেন এক রহস্যের চাদরে ঢাকা পড়ে গিয়েছিলাম। এখন ধীরে ধীরে সেই চক্রান্তের চাদর উন্মুক্ত হতে শুরু করেছে। পুঁজিবাদ এই সঙ্কট থেকে কীভাবে লাভবান হচ্ছে তা এই সময়েই একচেটিয়া পুঁজিপতিদের ব্যাপক সম্পদ বৃদ্ধির হার লক্ষ করলেই একটা আন্দাজ পাওয়া যাবে। এই লকডাউনের সময়েই যখন পৃথিবীব্যাপী অর্থনীতি চূড়ান্তভাবে ধরাশায়ী ঠিক সেই সময়েই মুকেশ আম্বানির রেকর্ড পুঁজির সঞ্চয়ন ঘটেছে। আবার এই কোভিড ১৯ ভাইরাসটির আবির্ভাবের ফলেই বিশ্বব্যাপী এক ব্যাপক বাধ্যতামূলক ভ্যাক্সিনেশন এবং আইডি ২০২০-র মতো প্রকল্প লাগু হওয়ার মতো সুবর্ণ সুযোগও পুঁজিবাদের হাতে এসে গিয়েছে। তাই এই ভাইরাসটির আবির্ভাব কোনওভাবেই যে নেহাতই একটি নিরামিষ প্রাকৃতিক ব্যাপার নয়, এ নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ আছে কি? এই সামাজিক দূরত্বের সময়ে কীভাবে কাজকর্ম সম্ভব; এই প্রশ্নের উত্তরে বিল গেটসের বক্তব্য হল— একমাত্র ভ্যাক্সিনের প্রমাণ সম্বলিত ডিজিটাল সার্টিফিকেট নিয়েই তা সম্ভব। অর্থাৎ সেই শংসাপত্র দিয়ে দাগানো মানুষজনেরই চলাফেরা করার স্বাধীনতা থাকবে। দাগানো কথাটা দায়িত্ব নিয়েই বললাম। কারণ এমআইটি-র একটি গবেষণাপত্রে কোয়ান্টাম ডট ট্যাটু নামে একটি অদৃশ্য ডিভাইসের প্রস্তাবনা করা হয়েছে যা ভ্যাক্সিনের সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের শরীরে ইমপ্ল্যান্ট করা যাবে এবং তার মধ্যে ঐ ভ্যাক্সিনগ্রহীতার সমস্ত তথ্য মজুত থাকবে ও তা পৃথিবীর যে কোনও অংশ থেকে উপলব্ধ করা যাবে। ভাবতেই শরীরে একটা হিমস্রোত বয়ে যায় যে আমাদের প্রজন্ম থেকেই হয়তো সেই দাগানো প্রজন্মের বেঁচে থাকা শুরু হবে। জেনেটিক্যালি মডিফায়েড শস্যে আমাদের কৃষিক্ষেত্রগুলি ভরে গিয়েছে। অদূর ভবিষ্যতেই কোভিডোত্তর সমাজ কি জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মানুষে ভরে যাবে?

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে কোভিডোত্তর নিউ নর্ম্যালের কথা। হু প্রধান এও বলেছেন যে এই নিউ নর্ম্যাল কিছুতেই আর পুরোনো নর্ম্যাল হবে না। তিনি কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছেন? কী হতে চলেছে সেই নিউ নর্ম্যাল? কোভিডোত্তর নিউ নর্ম্যাল যে একটি ডিস্টোপিয়ান নর্ম্যাল হতে চলেছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

 

শেষের কথার সেই ব্যাংটি

সাহিত্যিকেরা যে ডিস্টোপিয়ার কল্পনা করে গিয়েছিলেন আমরা কি তাতে কোনওরকম গুরুত্ব দিয়েছিলাম? না দিতে পেরেছিলাম? অল্ডাস হাক্সলি নিজের লেখা বইটির (ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড) বার্তা হিসেবে বলেছিলেন— “This is possible: for heaven’s sake be careful about it.” তাবৎ প্রজাতির মধ্যে না কি মানুষের মস্তিষ্কেই কেবল ভবিষ্যতের ধারণার জন্ম হয় এবং বর্তমানের কর্ম দিয়ে মানুষ সেই ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করতে পারে! কী ছিল গত দুই এক শতক ধরে সেই বর্তমানের কর্ম? অধ্যাপক ক্রিস্টোফার স্মিড একটি প্রবন্ধে লিখেছেন— While the world goes to waste for future generations (persons we can only apprehend in the imagined world of the post-apocalyptic film), we distract ourselves from disaster by watching it as entertainment on a lit screen in a darkened amphitheater.

হাক্সলি যথার্থই ভয় পেয়েছিলেন যে সত্যকে অপ্রাসঙ্গিকতার মহাসমুদ্রে ডুবিয়ে দেওয়া হবে। তাই ভয় হয় এই ভয়াবহ ডিস্টোপিয়ার অন্ধকার আমরা কতটা সত্য সত্যই আনুধাবন করতে পারছি অথবা চাইছি। না কি আমদের অবস্থাটা সেই ফুটন্ত জলে ব্যাংটার মতো!

এই গল্পটা জানেন তো? একটি জলভরা পাত্রে একটি জীবন্ত ব্যাং ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর পাত্রের নীচে আগুন লাগানো হয়। পাত্রের জল যত গরম হতে থাকে লাফিয়ে পালানোর বদলে ব্যাংটিও সেই বাড়তে থাকা উষ্ণতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে থাকে। তার পর একসময় ব্যাংটি ফুটন্ত জলে সিদ্ধ হয়ে মারা যায়। একে বলে বয়েলিং ফ্রগ সিন্ড্রোম।

রবীন্দ্রনাথের আলোকময়তার উত্তরাধিকার বুকে নিয়ে বড় হয়েছি আমরা; তাই আশাবাদী হয়ে যদি শেষ করতেই হয় তাহলে প্রার্থনা করব যেন ব্যাঙটি জল ফোটার আগেই লাফ দেওয়ার শক্তি অর্জন করতে পারে। প্রার্থনা করব যেন তার চেতনার জড়ভরত্ব সে কাটিয়ে উঠতে পারে।


তথ্যসূত্র:

  1. The Machine Stops; ISBN140990329X
  2. The Great Derangement: Climate Change and the Unthinkable by Amitav Ghosh ISBN022632303X
  3. Brave New Worldby Aldous HuxleyISBN0060929871
  4. https://web.archive.org/web/20090131040207/http://playboy.com/magazine/interview_archive/kurt-vonnegut/kurt-vonnegut.html
  5. Jennifer Governmentby Max BarryISBN 0-385-50759-3
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Continuum_(TV_series)
  7. Amusing Ourselves to Death: Public Discourse in the Age of Show Businessby Neil PostmanISBN 0670804541
  8. Enge, Erik (2015). Dehumanization as the Central Prerequisite for Slavery. GRIN Verlag.
  9. https://daily.jstor.org/why-are-dystopian-films-on-the-rise-again/
  10. https://vimeo.com/ondemand/stringsattached
  11. https://old.reddit.com/r/Coronavirus/comments/fksnbf/im_bill_gates_cochair_of_the_bill_melinda_gates/
  12. https://id2020.org/digital-identity
  13. https://medium.com/@id2020/request-for-information-a3bb28daf54f
  14. https://stm.sciencemag.org/content/11/523/eaay7162
  15. https://www.sciencealert.com/an-invisible-quantum-dot-tattoo-is-being-suggested-to-id-vaccinated-kids
  16. https://www.youtube.com/watch?v=3wQx-BjmfJk
  17. Target Africa: Ideological Neocolonialism in the Twenty-First Century: Ideological Neo-Colonialism Of The Twenty-First Century Kindle Editionby Obianuju Ekeocha
  18. https://vigilantcitizen.com/latestnews/bill-gates-calls-for-a-digital-certificate-to-identify-who-is-vaccinated/
  19. https://www.corbettreport.com/exposebillgates/

 

*লেখার ভেতরের প্রথম ছবিটি প্রতাপ রবিশঙ্কর কৃত এবং হেডার ও লেখার ভেতরের দ্বিতীয় ছবিটি জ্দিশ্ল বেক্সিনস্কি-র ডিস্টোপিয়ান সু্ররিয়ালিজম সিরিজের ছবি 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. তথ্যসূত্রে অনিচ্ছাকৃত বাদ পড়ে গিয়েছে – ঋণস্বীকারঃ ডোডো পাখিদের গান ; লেখক পরিমল ভট্টাচার্য

আপনার মতামত...