মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়: ‘তবুও মানব থেকে যায়’

কিন্নর রায়

 


লেখক গল্পকার, কথাসাহিত্যিক

 

 

 

 

অধ্যাপক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুবাদক, গোয়েন্দা কাহিনি লেখক, ছোটদের লেখক, একজন বড় মাপের সাহিত্যিক, এবং একজন উল্লেখযোগ্য কবি— এই সবটা মিলিয়ে যে মানবদার সঙ্গে আমার পরিচয়, তা গড়ে উঠতে বেশ খানিকটা সময় লেগেছিল। এর আরম্ভ আজ থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে। তখন মানবদার দোর্দণ্ডপ্রতাপ, কিন্তু সেই প্রতাপ তিনি কোনওদিন দেখাননি, আমাদের সামনে অন্তত কোনওদিনই দেখাননি। তিনি ছিলেন এমন একজন অধ্যাপক যিনি ভৈকম মুহম্মদ বশীর জানেন, যিনি ডক্টর জিভাগো-র অনুবাদক হিসেবে নিজেকে একজন কৃতবিদ্যজন বলে দাবি করতে পারেন, যিনি নিকানোর পাররার না-কবিতাকে অনুবাদ করে প্রথমবার আমাদের সামনে নিয়ে আসেন, যিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সায়েন্স ফিকশন অর্থাৎ বিজ্ঞানভিত্তিক কাহিনি অনায়াসে অনুবাদ করেন আমাদের জন্য এবং একইসঙ্গে লেখেন বিচিত্র সব খেলার লেখা। যখন আমি প্রতিক্ষণ-এ চাকরি করি, তখন মানবদা খেলা ও খেলার রাজনীতি নিয়ে নিয়মিত একটি কলাম লিখতেন। আবার টিনটিনের কমিকসে যে আসলে বর্ণবাদের কথা আছে, বর্ণবিদ্বেষের কথা আছে— সে উচ্চারণ আমি প্রথম শুনি শ্রদ্ধেয় মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে।

প্রকৃত অর্থে, মানবদা ছিলেন একজন বহুদর্শী মানুষ, সেই অর্থে খুব দীর্ঘকায় নন, খর্বকায়ই বলা যায় তাঁকে। ফুল প্যান্টলুনের ওপর পাঞ্জাবি— অধিকাংশ সময়েই এই ছিল তাঁর পোশাক। হাতে লম্বা ছাতা। চোখে চশমা নেই, চশমাটা পকেটে রাখা আছে। পড়ার সময় চশমা পরেন। এবং দেজ পাবলিশিং-এ, যারা তাঁর মূল প্রকাশক, তাদের ওখানে এলে তাঁর সঙ্গে একটা অদ্ভুত সৌহার্দ্য বিনিময় হয়। আজ আমি বলতে গর্ব অনুভব করি, ‘ধর্মসঙ্কট’ নামে আমার একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, আজ আমাদের দেশে সার্বিক মৌলবাদের যে উত্থান তার বহু বছর আগে, আমার যতদূর মনে পড়ছে, ৮৮, ৮৯ অথবা ৯০ সাল হবে। মানবদা এই গ্রন্থের একটি অতি মূল্যবান ও দীর্ঘ ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন। এই গ্রন্থটির গল্পগুলি কৃতবিদ্য কিনা আমি জানি না, উচ্চমানের কিনা তা সেকথা সমালোচকেরা বলবেন, কিন্তু মানবদার ভূমিকাটি আমার বইটির মূল্য অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছিল সে কথা নিঃসন্দেহ।

এ ছাড়াও আমি ‘প্রকৃতিপাঠ’ নামে একটি আখ্যান রচনা করি, আজ থেকে তিরিশ বছরেরও বেশি আগে। তখন বাংলা ভাষায় খুব বেশি প্রকৃতিচর্চা হচ্ছে না। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘আরণ্যক’ লিখে গেছেন অনেকদিন আগে। কিন্তু সেই সূত্র ধরে যে চর্চা হওয়া দরকার, তা তেমনভাবে হচ্ছে না। ‘প্রকৃতিপাঠ’ বইটিতে আমাদের দেশে ও সারা পৃথিবীতে প্রকৃতির যে দূষণ এবং ধ্বংস, তার একটা আংশিক রূপরেখা তুলে ধরার চেষ্টা করি, কলকাতার পাখির বাজার, কলকাতার পরিবেশ, শিল্পী-বেহালা অঞ্চলে দূষণের প্রভাব, এইসব নানা কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে উঠে আসে সে আখ্যানের মধ্যে। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় খুব যত্ন করে সেই বইটির রিভিউ করেছিলেন যুগান্তর পত্রিকায় এবং তাকে চিহ্নিত করেছিলেন একটি স্বতন্ত্র ধারার উপন্যাস হিসেবে। এছাড়াও শ্রদ্ধেয় সরোজ বন্দ্যোপাধায় ‘প্রকৃতিপাঠ’ পড়ে আনন্দবাজার প্রত্রিকায় একটি দীর্ঘ রিভিউ করেন এবং তাতেও তিনিই বিভূতিভূষণের একটা তুলনা টেনেছিলেন। এই দুটো রিভিউ অর্থাৎ মানবদা ও সরোজদার রিভিউ বেরোনোর পর ‘প্রকৃতিপাঠ’ নিয়ে কিছুটা আলোড়ন তৈরি হয়।

মানবদার প্রসঙ্গে ফিরে আসি। তিনি কেমন মানুষ ছিলেন? হরিপদ দত্ত লেনে তিনি থাকতেন, নবীনা সিনেমার কাছে, একতলায়। হাঁটতে হাঁটতে তাঁর বাড়ি বহুবার গেছি। কাছাকাছি থাকতেন বরেন গঙ্গোপাধ্যায়। মানবদার ভাড়াবাড়ি। আমি গিয়ে দেখেছি, মানবদার ঘরের এক কোণে ডাঁই করে রাখা শশধর দত্তের লেখা মোহন সিরিজ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “মানবদা, আপনি দস্যু মোহন পড়েন?” মানবদা বললেন, “হ্যাঁ, পড়ি তো।” আমি নিজেও দস্যু মোহন, স্বপনকুমার সবই পড়েছি। কিন্তু মানবদার মতো একজন মানুষ যিনি অনায়াসে নিকানোর পাররার অনুবাদ করেন, বোর্হেস, ফুয়েন্তেস অনায়াসে বলতে পারেন, শিক্ষকের মতো অথচ শিক্ষকের ভার না নিয়ে আমাদের ভৈকম মুহম্মদ বশীর ও মার্কেজ বলে যেতে পারেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা, তিনি শশধর দত্ত রচনাবলিও পড়ছেন, এটা আমার কাছে বেশ খানিকটা বিস্ময়-জাগানিয়া দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এভাবেই সমস্ত জানাশোনা মেলামেশার মধ্যে দিয়ে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অনায়াসে আমাদের মানবদা হয়ে ওঠেন। কী বিপুল তাঁর পড়াশুনো! কী পরিমাণ তাঁর স্মৃতিশক্তি! আমার মনে আছে, তিনি নব্বই দশকে একবার খুব অসুস্থ হলেন, পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা। নার্সিংহোমে দেখতে গেছি। মাঝে একদিন দেখতে গেছি, আর তারপর ছাড়া পাচ্ছেন যেদিন, সেদিনও গেছি। মানবদা একটা হুইলচেয়ারে বসা৷ বললেন, “সিগারেটটা ছাড়তে বলছে। তা আমি সিগারেট আমি ছাড়ব কেন বলো? মাঝে মাঝে এরকম নার্সিংহোমে ভর্তি হব, রিপেয়ার করাব, আবার চলে যাব।” এই যে এত অনায়াসে একটা জীবনকে দেখা, যেন একটা ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব৷ আমাদের মতো যারা অনেকটাই নবীন, তাঁর কাছে যাচ্ছি, যেমন ধরুন আমি, কী বিপুল স্নেহ পেয়েছি। ওঁর বাড়িতে যে কর্মসহায়িকা থাকতেন, তাঁকে দিয়ে অনবদ্য সব খাবার রান্না করিয়ে আমাদের খাইয়েছেন। কখনও কখনও ফ্রিজ থেকে মিষ্টি ইত্যাদি বার করে নিজের হাতে আমাদের আপ্যায়িত করেছেন। মিষ্টি খাইয়ে সুমিতাদিকে, অর্থাৎ মানবদার সহায়িকা, যদি আমি ওঁর নামটা ঠিকঠাক মনে করতে পারি, আমাদের জল দিতে বলছেন। মানবদার স্ত্রী, হিমানীদি দূরে থাকতেন। জীবন আলাদা হয়ে গেছে তাঁদের। আমি সে বিষয়ে কিছু বলছি না। মনে হত না, সেরকম কোনও যোগাযোগ আছে। হয়তো বা আছে। আমি দেখতে পাই যে মানবদা একাই থাকেন। কর্মসহায়িকা ভদ্রমহিলাটি ওঁর সংসারটিকে ধরে রেখেছিলেন। যদিও আমরা দেখেছি মানবদার দেওয়ালে হিমানীদির একটি অসামান্য ছবি। পরবর্তী সময়ে হিমানীদি কলকাতায় এসেছেন। আলাপ হয়েছে। দেজ-এ এসেছিলেন। বাংলা অ্যাকাডেমিতে একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। সেখানে মানবদা-হিমানীদি দুজনেই খুব স্বচ্ছন্দ ও স্বাভাবিক। আমার চৈতন্যে কোথাও কোথাও একটু আঘাত লাগত হয়তো, কিন্তু উনি অকুতোভয়, যেন কিছুই হয়নি, কোনও ব্যাপারই ঘটেনি।

মানবদার লেখা কবিতার প্রসঙ্গে আসি। মানবদা যেসব অসামান্য কবিতা লিখেছেন, তাঁর কবিতা নিয়ে তেমনভাবে কোনও কথাই হল না। চলচ্চিত্রনির্মাতা বুদ্ধদেব দাশগুপ্তও কবিতা লেখেন, যেমন তাঁর একটি কবিতার নাম ‘কফিন অথবা সুটকেস’, আমি তাঁর কবিতা অত্যন্ত পছন্দ করি। তেমনিভাবে মানবদার কবিতার মধ্যেও একটা সম্পূর্ণ আলাদা জগতের কথা আছে। সম্পূর্ণ আলাদা একটা আরবান ডিকশন। সেটা নিয়ে কেউ তেমনভাবে কিছু বললই না। এটা আমার কাছে অত্যন্ত বেদনার। আশ্চর্য লাগে, তাঁর সমসাময়িক বন্ধুরাও এই নিয়ে কিছু বললেন না। স্বপন মজুমদার অনেকদিন ধরেই অসুস্থ। সুবীরদা অনেক আগেই চলে গেছেন। সৌরীনবাবু আছেন। শঙ্খবাবু খানিকটা সিনিয়র। এঁদের কারও সমালোচনা করছি না, কিন্তু এঁদের কাউকেই মানবদার কবিতা নিয়ে তেমন কিছু বলতে শুনিনি৷

মানবদার কবিতা ছাড়াও তাঁর লেখা রহস্য উপন্যাস, বাচ্চাদের জন্য তাঁর লেখা, এগুলোও যথাযথ মনোযোগ পেল না। তাঁর অনুবাদ নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলছেন স্বাভাবিকভাবেই। তিনি নিকানোর পাররার যেমন করেছেন, তেমনি ডক্টর জিভাগোর মতো অত বড় আখ্যানকে নিজের মতো অনুবাদ করেছেন, অথবা মার্কেজের আখ্যান ‘নির্দয়া ঠাকুমার কাহিনি’ অথবা ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’ তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছেন। ভৈকম মুহম্মদ বশীরের কবিতার সঙ্গে বাঙালি পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি, খেলা নিয়েও লিখেছেন। অনেকেই হয়তো জানেন বা জানেন না, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও ক্রিকেটার সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সহোদর। সম্বরণদার সঙ্গে আমার অল্পই আলাপ। মানবদার সঙ্গে তীব্র আলাপ। একেবারে সংরাগ বলা যেতে পারে। তাঁদের আরেকজন ভাই সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে খানিকটা আলাপ ছিল। ওঁর স্ত্রী হিমানীর সঙ্গেও আলাপ ছিল খানিকটা। কিন্তু মানবদার সঙ্গে যেভাবে হাড়েমাংসে মিশেছি, যেভাবে রাজনীতি নিয়ে কথা হয়েছে, যেভাবে সেই সময়ের সামাজিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তা কোনওদিন ভুলবার নয়। বামফ্রন্টের আমলে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ ছিল। এতদসত্ত্বেও সরকারের কোনও কোনও কাজকে তিনি খুব একটা সমর্থন করতেন না, এবং সেটা আকারে প্রকারে ইঙ্গিতে এমনকি প্রকাশ্যে বা আমাদের সঙ্গে ঘরোয়া আলোচনায় বলেওছেন৷ অবশ্য তিনি ছিলেন আদ্যন্ত মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী একজন মানুষ। কিউবাকে খুব গুরুত্ব দিতেন। শুধু কিউবা কেন, গোটা দক্ষিণ আমেরিকা বা সাম্রাজ্যবাদীরা যাকে লাতিন আমেরিকা বলে, সেই ভূখণ্ডের সাহিত্যের সঙ্গে তিনি একা হাতে আমাদের প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। কিউবা তিনি গেছেন, এবং তাঁর কাছেই প্রথম জানতে পারি, উচ্চারণটা কিউবা নয়, কুবা। চিলি নয়, চিলে। এই উচ্চারণগুলো মানবদার কাছ থেকে শেখা। আমরা অবশ্য তাঁর ছাত্র ছিলাম না, আবার এক অর্থে ছাত্রও। তিনি যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কলন সম্পাদনা করলেন, আমার দুটো গল্প নিলেন। একটি দাঙ্গাবিরোধী, সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী সঙ্কলন, দেজ থেকে বেরোল। সে সময় অনেকেই ঈর্ষান্বিত হলেন, আমার সময়ের বা আমার সময়ের একটু আগের কেউ কেউ। কিন্তু মানবদার কোনও পরোয়া নেই। তাঁর মনে হয়েছে, তাই তিনি আমার দুটি গল্প নিয়েছেন। আমি আমার একটি সামান্য অকিঞ্চিৎকর গ্রন্থ তাঁকে উৎসর্গ করেছিলাম, যদিও মানবদা অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তা গ্রহণ করেছিলেন।

পরে যখন তিনি ট্যাংরার কাছে সরকারি আবাসনে চলে গেলেন, দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল। যাওয়া হত না। এই যে হরিপদ দত্ত লেনে হেঁটে চলে যেতাম, বরেনদার বাড়িতে যেতাম, বরেনদা প্রয়াত হওয়ার পরেও মানবদা ওখানে ছিলেন, কিন্তু উনি নতুন ঠিকানায় চলে যাওয়ার পর আর সেভাবে যাওয়া হত না। তবে মনে আছে, বাংলাদেশের কবি, সম্পাদক এবং ভাবুক অধ্যাপক শামিম রেজাকে নিয়ে মানবদার বাসায় অর্থাৎ সরকারি ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম। শামিম মানবদার খুব স্নেহের পাত্র ছিলেন৷ শামিম আমারও খুব বন্ধু, যদিও আমার চেয়ে অনেকটাই ছোট, আমার ছোটভাইয়ের মতো। জায়গাটায় ট্যাক্সি ছাড়া যাওয়াই যায় না। বন্ডেল গেট হয়ে যেতে হয়। খানিকটা দুর্গমই বলা চলে। ফলে দূরত্ব খানিকটা বাড়ল, মানবদার সঙ্গে দেখা হওয়াটাও কমে গেল।

কিন্তু তাঁর লেখার বিরাম ছিল না। আজকাল থেকে ছোটদের জন্য সকাল বলে যে পত্রিকা বেরোত, সেখানে বা গণশক্তি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন। এছাড়াও প্রকাশ পেত তাঁর অনুবাদ করা উপন্যাস, মূলত সেগুলো দক্ষিণ আমেরিকার উপন্যাস। আমরা সেইসব উপন্যাস পড়ে যাকে বলে আহ্লাদে আটখানা হয়ে যেতাম। মালিনী ভট্টাচার্য (কমুনিস্ট নেত্রী ও একসময়ের সাংসদ) এবং মিহির ভট্টাচার্য, ওঁরা ‘লালকমল নীলকমল’ বলে একটা পত্রিকা করেছিলেন। চমৎকার ছোটদের কাগজ৷ তার কয়েকটা সংখ্যা বেরোয়। তাতে আমিও লিখেছি। মানবদা ছিলেন সেই কাগজের অন্যতম উপদেষ্টা, প্ল্যানমেকার৷ মানবদা যুগান্তর পত্রিকার জন্য ইসমত চুঘতাই-এর গল্প অনুবাদ করেছেন। সাদাত হোসেন মান্টোর ‘ঠান্ডা গোস্ত’ অনুবাদ করছেন। যুগান্তর পত্রিকার শারদসংখ্যাগুলি দেখলে বোঝা যাবে যে মানবদার অনূদিত গল্পের একটি দীর্ঘ ধারা একসময় ওখানে প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলাভাষাটা তিনি অসম্ভব ভালো জানতেন, এবং তার সঙ্গে রাজনীতি, সমাজনীতি, দেশনীতি, সাহিত্য, বিশ্বসাহিত্য, বিশ্ব সিনেমা, থিয়েটার সর্বত্র ছিল তাঁর অবাধ চলাচল। একইসঙ্গে তিনি ছিলেন ছাত্রবৎসল একজন মানুষ। আমি তাঁর ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে শুনেছি যে শ্রদ্ধেয় মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অসম্ভব স্নেহ করতেন তাঁর ছাত্রমণ্ডলীকে। তিনি ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অত্যন্ত সফল অধ্যাপক— এটাও তার একটা বড় পরিচয়। তাঁর পড়ানোর যে পদ্ধতি বা তরিকা, তাও অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, এতখানি প্রজ্ঞা ও মেধা সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে কোনও দেখানেপনা ছিল না। আমাদের সময়ে অর্থাৎ সাতের দশকে ফাট বলে একটা শব্দ চালু ছিল। সেই সময় ভারতীয় ক্রিকেট দলে কয়েকজন ক্রিকেটার ছিলেন, যেমন পতৌদি, এম এল জয়সীমা, অথবা সেলিম দুরানি… এঁরা সবসময় কলার তুলে ঘুরতেন। আমি এঁদের কাউকেই ছোট করছি না, কিন্তু এই ফাট দেখানো, আমি কত জানি রে এমন হাবভাব… আমি মানবদার মধ্যে কখনও দেখিনি। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি পঞ্চাশের লেখকদের লেখা পড়ছেন, একইসঙ্গে তিনি সস্তা থ্রিলার পড়ছেন, বটতলার সাহিত্যও মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন, সেই তিনিই আবার মহাশ্বেতা দেবীর লেখা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে পড়ছেন, এমনকি আমাদের মতো যারা সত্তরের শেষে বা আটের দশকের গোড়ায় লিখতে এলাম, মানবদা আমাদের লেখাও একইরকম আগ্রহ নিয়ে পড়তেন। তাঁকে কখনও ক্লান্ত হতে দেখিনি। সদ্যোপ্রকাশিত বইটি তিনি সংগ্রহ করার পর বা তাঁকে দিয়ে আসার পর, তিনি তা যেভাবে মন দিয়ে পড়তেন, এবং পড়ার পর বইটি নিয়ে যা বলতেন বা অধিকাংশ ক্ষেত্রে লিখে জানাতেন, তাতে মহান বাংলাভাষার একজন নগণ্য ও দীন অক্ষরকর্মী হিসেবে আমি কৃতার্থ হয়েছি, সম্মানিত হয়েছি।

তিনি আজ চলে গেছেন। মানুষের মৃত্যু তো স্বাভাবিক। প্রত্যেকেই মারা যাবেন। কেউই তো অমর নয়। কিন্তু তবুও ‘মানব’ থেকে যায়। জীবনানন্দ দাশের সেই যে অমোঘ পঙক্তি, তা মানবদার ক্ষেত্রে আক্ষরিকভাবেই বর্তায়। আমরা দেখেছি কী অনায়াসে ও অক্লেশে মানবদা অত্যন্ত জটিল ও দুরূহ পাঠক্রমকে ক্রমাগত আপন করে নেন। যেমন ধরুন কমিকস নিয়ে তিনি বলেন, অর্থাৎ ওই বেতাল বা অরণ্যদেব, রিপ কার্বি, ডেসমন্ড, বা জাদুকর ম্যানড্রেক, লোথার, এবং অবশ্যই টিনটিন যার স্রষ্টা একজন বেলজিয়ান… এসবের মধ্যে দিয়েও সাম্রাজ্যবাদী কলাকুশলতা কীভাবে কাজ করছে ছবি ও লেখায়, মানবদা তা ধরে ধরে আমাদের দেখিয়ে দিতেন। আমরা যারা টিনটিন পড়তে অসম্ভব ভালোবাসতাম বা এখনও ভালোবাসি, মানবদার এইসব বিশ্লেষণ আমাদের চোখ খুলে দিয়েছিল। বুঝতে পারি, কীভাবে একজন মানুষ তাঁর দৃষ্টিদর্পণ দিয়ে যারা অবুঝ তাদের শিক্ষিত করে তোলেন। কীভাবে চিহ্নিত করেন ধর্মান্ধতাকে, মৌলবাদের উত্থানকে এবং বজ্জাতিকে।

লিখতেন অক্সফোর্ড-এর ছোট খাতায়। গোটা গোটা বড় বড় হাতের লেখা। একটু টান ছিল, কিন্তু প্রেসের বুঝতে কোনও অসুবিধে হত না। লেখার ফাঁকে ফাঁকে সিগারেট খেতেন। পায়ে ব্যাথার সময় সিগারেট খাওয়া কমালেন কিন্তু বন্ধ করেননি। খুব ফ্যাশনেবল মানুষ ছিলেন। তাই কখনও এলোমেলো, অপরিচ্ছন্ন, দরকচামারা পোশাকে মানবদাকে দেখিনি। খুব দামি কিছু নয় তবে সুচারু। হয়তো একটা জিনস পরেছেন আর তার ওপরে একটা চমৎকার পাঞ্জাবি পরেছেন। বা একটা প্যারালাল ধরনের ফুলপ্যান্ট পরেছেন, ফুলপ্যান্টই পরতেন, তার ওপর একটা সুদৃশ্য পাঞ্জাবি পরেছেন৷ আমি মানবদাকে বললাম, “খুব সেজেছেন আজকে।” উনি বললেন, “তুমি যে কী বলো না! একটা ট্যাক্সি ডাকো তো!” কলেজ স্ট্রিটে গেলে ট্যাক্সিতে যাওয়ার কথা ভাবতেন। হরিপদ দত্ত লেনেও সেভাবেই ফিরতেন। তখনও মেট্রো রেল সেভাবে চালু হয়নি। প্রচুর বই কিনতেন। বই উপহারও পেতেন অনেক৷ আমি নিজে দেখেছি, দে বুক স্টোরে এসে গাদা গাদা বইয়ের অর্ডার দিচ্ছেন, ইংরেজি বই, বাংলা বই। ওরা দু তিনদিনে বইগুলো সংগ্রহ করে রাখলেন। উনি আবার একদিন গিয়ে নিয়ে এলেন৷ হয়তো সৌরীনবাবু, সৌরীন ভট্টাচার্য আছেন সঙ্গে৷ অমিয় দেবকে কখনও কখনও দেখেছি মানবদার সঙ্গে, তবে খুবই কম। কখনও থাকতেন ওঁদের পুরনো বন্ধু সুবীর রায়চৌধুরী। সুবীরদার কথা কেউ বলেই না আজকাল। বিদেশি ছায়াপাতে ‘মেলা থেকে ঝামেলা’ অথবা ‘গোলন্দাজ থেকে গোয়েন্দা’-র মতো এমন চমৎকার বই তিনি বাংলাভাষায় লিখে গেছেন। সুবীরদা কী চমৎকার সম্পাদনা করেছিলেন জগদীশ গুপ্তের গল্পসঙ্কলন, যেটা দেজ থেকে বেরিয়েছিল। সুবীরদা ফুলশার্ট প্যান্টের ভেতর গুঁজে পরতেন, একটু ন্যালবেলে প্যান্ট, মাথায় টাক, সুবীরদার পোশাক অত স্মার্ট ছিল না। মানবদার হাতে বারোমাস থাকত সুন্দর বড় হ্যান্ডেলওয়ালা ছাতা, এতটাই বড় যে তার নিচে দুতিনজন মানুষকে নিয়ে যাওয়া যায়। মানবদা ছাতা হাতে গটগট করে দেজ-এ ঢুকলেন। হাতে সিগারেট। ঢুকে সিগারেটটা ফেলে দিলেন। বললেন, “বাবু, বইগুলো হয়েছে?” বাবু অর্থাৎ দেজের সুভাষবাবু। সুভাষদা হয়তো বললেন, “হ্যাঁ মানবদা, আপনি বসুন। বই এসেছে।” “চা আনাও।” “কফি খাবেন?” “হ্যাঁ, তা কফি আনাও।” আমরাও বসলাম৷ বসেই মানবদা হাঁক পাড়লেন “হ্যাঁ, বলো কী খবর তোমাদের?” মাঝে মাঝে খুব গরম পড়লে দেখেছি, মানবদা আদ্দির কাপড়ের হাফ পাঞ্জাবি বা ফতুয়া পরে এসেছেন। হাতে সেই ছাতা। কাঁধে একটা ঝোলা আছে। আর মুখে সর্বদা একটা হাসি। অথচ তাঁর এত বিষাদ, পারিবারিক ছিন্নভিন্নতা, কখনও সেসব স্পষ্ট করে বলেননি। আমরা কিছুটা কল্পনা করতে পারতাম। মানুষটা একাই থাকেন। নিঃসঙ্গ। সব মানুষই অবশ্য নিঃসঙ্গ। তবুও মানবদাকে দেখে বিস্মিত হতাম।

আজও তাঁর বিপুল কাজ আমাকে একইরকম বিস্মিত করে। মানবদার বহু কাজ আজও অনাবিষ্কৃত থেকে গেছে। মূলত অনুবাদক হিসেবেই লোকে তাঁকে চিনেছে। তিনি মার্কেজ অনুবাদ করেছেন। তিনি ভৈকম মুহম্মদ বশীর বা নিকানোর পাররার অনুবাদ করেছেন। বরিস পাস্তারনাকের ‘ডক্টর জিভাগো’-র অনুবাদক হিসেবে তাঁর খানিকটা নাম আছে। কিন্তু এমন একজন মানুষ তা বাদ দিয়েও সারাজীবন যে এত কাজ করেছেন, এত পড়াশুনো করেছেন, তা নিয়ে কলকাত্তাইয়া বুদ্ধিজীবীরা তেমন আলোচনা করেছেন বলে আমার মনে হয়নি। এই মানুষটিকে শুধু অনুবাদকের খাঁচায় আটকে রাখলে বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতিকে অপমান করা হবে। আমি তাঁর সঙ্গে হাড়েমাসে মিশেছি। শেষ ক বছর দূরত্বের কারণে দেখাসাক্ষাৎ কিছু কম হয়ে গিয়েছিল বটে। কিন্তু শামিম যখনই কলকাতায় এসেছে আমি আর শামিম একটা ট্যাক্সি করে সারাদিন ঘুরছি, তারপর মানবদার ওখানে চলে গেছি। সেখানে গিয়ে আড্ডা, কথাবার্তা, অনুবাদের কথা, বিশ্ব সাহিত্য নিয়ে বা ভারতীয় সাহিত্য নিয়েও নানারকম জিজ্ঞাসা, সব কিছু নিয়ে আলোচনা হয়েছে৷ এই যেমন প্যাপিরাস থেকে ভারতীয় সাহিত্যের যে খণ্ডগুলো বেরোয় সেটাও মানবদারই কাজ। মানবদা আসলে জানালাগুলো খুলে দিতে জানতেন। শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্যের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে তিনি ভারতীয় সাহিত্যের জানালাগুলো খুলে দিয়েছেন। তিনি বিশ্বসাহিত্যের জানালাগুলোও আমাদের জন্য খুলে দিয়েছেন। আমার গর্ব হয় যে এরকম একজন প্রতিভাধর ও হৃদয়বান (প্রতিভাধররা যে সবাই হৃদয়বান হন সেটা অবশ্য আমার মনে হয় না) মানুষের উষ্ণ সান্নিধ্য পেয়েছি। কিন্তু পাণ্ডিত্যের গুমোর বলতে যা বোঝায়,অহং বলতে যা বোঝায়, মানবদার মধ্যে আমি কোনওদিন তা দেখিনি। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে পণ্ডিত। প্রতিক্ষণের আড্ডায় আমাদের মজাদার একটা চালু কথা ছিল, মানবদা যেসব বইয়ের নাম বলছেন, সেসব কি সত্যিই লেখকরা লিখছেন, নাকি মানবদা বানিয়ে বলছেন? এরকম একটা কথা ঘুরে বেড়াত এবং মানবদাও সেটা খুব উপভোগ করতেন। বাংলায় অনুবাদ অনেকেই করেছেন। যেমন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আমি নাম করেই বলছি, তাঁর লোরকা বা মেঘদূতের অনুবাদ পড়ে লোরকা বা কালিদাস কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু মানবদার ক্ষেত্রে তা নয়। আমি মার্কেজ মিলিয়ে দেখেছি। অবশ্যই ইংরেজি থেকে, আমি তো আর মূল ভাষাটা জানি না। ইংরেজি ও মানবদার করা বাংলা অনুবাদ, দুটোই আমার কাছে একইরকম মনে হয়েছে। পাশাপাশি সারা পৃথিবীর সিনেমা সম্বন্ধে তাঁর যে অভিজ্ঞতা বা বক্তব্য, তাঁর রাজনৈতিক বোধ, সে সম্বন্ধে তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণ, কুবা-কে শ্রদ্ধা করা অথবা চে গেভারা, ফিদেল কাস্ত্রো— এঁদের প্রতি তাঁর যে শ্রদ্ধামিশ্রিত ভালোবাসা— সেটা আমি বারবার দেখতে পেয়েছি৷ এই মাপের মানুষ এই মুহূর্তে আর কটা আছেন? সরোজদা চলে গেছেন। পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় চলে গেছেন। মানবদাও চলে গেলেন। কার সঙ্গে কথা বলব আর? মানবদার মতো একজন ভার্সেটাইল জিনিয়াস, তাঁর চলে যাওয়ার আমার কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি। এরকম একজন মানুষের সঙ্গে অনেকটা মিশতে পেরে, অনেকভাবে মিশতে পেরে, অনেক স্মৃতিময়তার মধ্যে মিশতে পেরে আমি নিজেকে সম্মানিত মনে করি।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...