আওয়াধ নবাবদের বিজ্ঞানচর্চার আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য

শঙ্কর রায়

 


লেখক প্রবীণ সাংবাদিক

 

 

 

 

কেন্দ্রে এক সংখ্যালঘু সরকার ২০১৯ সালে নির্বাচন কমিশনের বেশরম যোগসাজসে ইভিএম ও ভিভিপ্যাট-এর কারচুপিতে  জিতে (তাও ৪০ শতাংশের চেয়েও কম ভোট পেয়ে) অযোধ্যায় শিলাপূজন করে জোর করে হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের পথে এক ধাপ এগিয়ে গেল। রবীন্দ্রনাথের ভারততীর্থ ধারণা আজ প্রতিনিয়ত আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দলের ঝটিকা বাহিনী দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে। বাবরি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল বাবরের জন্মের ১৫/১৬ বছর আগে। এর অকাট্য প্রমাণ সুখবীর কাউর ও শের সিং-এর লেখা Archaeology of Babri Masjid, Ayodhya বইতে।

বাবর জন্মেছিলেন ৮৮৮ হিজরি সনে। আর বাবরি মসজিদ নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছিল ৮৭২ হিজরি সনে। এর প্রমাণ আছে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির গ্রন্থাগারে (আরবি হরফে লেখা একটি কিতাবে), যার অনুলিপি আছে প্রাক্তন আইএএস শের সিং বেইন্সের আরকেওলজি অফ বাবরি মসজিদ, অযোধ্যা গ্রন্থে। তিনি তার অনুবাদও (ডিসাইফার) করে দিয়েছেন। আরবিতে লেখা আছে— মাইমুন আলাইহে বাখাতে। এটা হিজরি সন অক্ষরে লেখা। শের সিং আরবি জানা বিশেষজ্ঞ দিয়ে এর সংখ্যাগত ব্যাখ্যা দিয়েছেন: মা = ৪০, আই = ১০, ম = ৪০, ভাউ = ৬, ন = ৫০ অর্থাৎ মোট (আংশিক) = ১৪৬; আইন = ৭০, ল = ৩০, আর = ১০, হ = ৫ অর্থাৎ মোট (আংশিক) = ১১৫; বা = ২, খ = ৬০০, ত = ৯ অর্থাৎ মোট (আংশিক) = ৬১১। তাহলে সর্বমোট দাঁড়াল (১৪৬+১১৫+৬১১) = ৮৭২।

মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কুৎসার শিকার, যে চক্রান্ত রচনা আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের। সাম্রাজ্য বিস্তার তাঁর মূল পরিচয় না। ‘বাবরনামা’ (আসল উচ্চারণ ‘বাবরনামে’) এক অসামান্য রচনা, যদিও ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা দিয়ে গেছে তার এক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিকৃত ইংরেজি ভাষ্য। ব্রিটিশ প্রাচ্যতত্ত্ববিদ অ্যানেট সুসান বিভারিজ বাবরনামে-র অনুবাদে মুল টেক্সট বিকৃত করেছিলেন। আসলে তিনি মূল টেক্সট ‘তুঝুক-ই-বাবুরি’ আদৌ পড়েনইনি, পড়েছিলেন তার আরবি অনুবাদ। বাবরের মূল রচনাটি ‘তুর্কি’ ভাষায়। তিনি একটি ভাষা লিপিরও প্রবর্তক। তিনি আসলে শুধু কবি ছিলেন না, এক বিরল মাপের সংস্কৃতিমনা ছিলেন।

এই যে বলা হচ্ছে: By the command of Emperor Babar, whose justice is an edifice reaching up to the very height of the heaven; the good-hearted Mir Baqi built this alighting-place of angles Buvad Khair Baqi (may this goodness last forever) the year of building made clear likewise, when I said Buwad Khair Baqi (935 A.H) (i.e. 1528).— এটা ডাহা মিথ্যা কথা। মসজিদে লেখা ছিল— বুভদ খবর বাকি, যার মানে আরও খবর বাকি আছে।

আমার আক্ষেপ, প্রস্তাবিত রামমন্দিরের তলায় ধ্বংসস্তুপে চাপা পড়ে আছে জৌনপুরের সুলতানদের অন্যতম স্থাপত্য— যার নাম Sharqi School of Architecture , যার অবশেষ ক্রমবিলীয়মান। এ নিয়ে আমার একটা ছোট্ট লেখা আছে। উৎসাহী পাঠক-পাঠিকারা এই লিঙ্ক থেকে পড়ে নিতে পারেন।

তাছাড়াও সেখানে চাপা পড়ে আছে আরও মহত্তম ঐতিহ্য। তা হল অযোধ্যার নবাবদের আন্তর্জাতিক স্তরে বিজ্ঞানচর্চার প্রসার। অস্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক অব্দি  অযোধ্যার নবাবেরা ফ্রান্সের সঙ্গে বিজ্ঞানচর্চার অসামান্য প্রয়াস নিয়েছিলেন। আমি নিজে কখনও ফৈজাবাদ বা অযোধ্যা যাইনি, কিন্তু যাঁরা বলেন যে অনেকবার গিয়েছি, বাবরি মসজিদ প্রদক্ষিণ করেছি (আমার অতিপ্রিয় সাংবাদিক শুভাশিস মৈত্র, দেবাশিস ভট্টাচার্য, অমল সরকার ইত্যাদিদের কথাই ধরা যাক), তাঁদের কোনও লেখাতে এ নিয়ে একটি বাক্যও চোখে পড়েনি। এদের কারও জানতেও ইচ্ছে করেনি অযোধ্যায় নবাবদের ইতিহাস? অমল ২ আগস্ট ২০২০ ‘এই সময়’-এর রবিবারোয়ারি-তে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সেবক ত্রিলওকিনাথ পান্ডেকে ‘রামলালা’র বন্ধু হিসেবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে লিখেছেন, অথচ অধ্যাপক ইকবাল গনি খান-এর কথা জানতে চেষ্টাও করেননি। ২০০৩ সালে ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ হিস্ট্রি অফ সায়েন্স-এ এঁর (তখন  আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন অ্যাডভান্সড হিস্ট্রির অধ্যাপক) একটি উচ্চ মানের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়— THE AWADH SCIENTIFIC RENAISSANCE AND THE ROLE OF THE FRENCH: C. 1750-1820। উনি লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ম সহ ইওরোপের একাধিক লেখ্যাগারে কাজ করে ঐ গবেষণাপত্রটি লেখেন। তারপরেই তিনি রহস্যজনকভাবে খুন হন। কেন্দ্রে তখন ক্ষমতাসীন এনডিএ সরকার, প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ি, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী। এর পরেও সাংবাদিককুলের জানতে ইচ্ছে করল না, কেন অধ্যাপক ইকবাল গনি খান খুন হলেন। এর পেছনে সঙ্ঘ পরিবারের ভূমিকা থাকতে পারে, এ ধারণা প্রবল ছিল।

ইকবাল গনি খান তাঁর গবেষণাপত্রে জানান,

…by the mid-18th century, French astronomers such as Pons and Calmette did not have to face this prejudice, and they were easily given a part of the Vedas. Gentil too had a completely welcoming experience at Benares, when he found no problems for getting copies of Sanskrit texts, and Polier (c.1760) explicitly states that contrary to popular prejudice about Hindu scholars, they were even willing to give him their texts – which is why he got the first complete copy of the four Vedas….

This was also an important juncture in the history of India’s intellectual exchanges with France because Bernier was bringing with him, ideas that were new and had not become current even in Europe! The more intellectually inclined among the Mughal elite were aware of atomistic philosophy, in the form it had existed in, especially in the ideas of Leucippos and Democritos. They had read the Persian and Arabic translations of these Greek and Hellenistic scholars by the early Arab translators such as al Kindī and Hunain ibn Ishaq. This idea of atomism now suddenly acquired importance in 17th century India as a result of the translation provided by François Bernier of the works of Pierre Gassendi (1592-1655). The attempts by Gassendi to reconcile mechanistic atomism with Christian belief in immortality, Free Will and the existence of an Infinite God and therefore infinite Creation were taken up by the man who was to assume immense importance in the 19th century, namely Qāzi Muhibullāh Bihāri. Bihāri’s treatise on the Diuz la yatadjuzzā meaning the particle which cannot be divided any further’- was completed just a few years after the works of Gassendi had been popularised in India by Bernier and Danishmand Khān. Incidentally it was the same Muhibullāh Bihāri who went on to write his Risālā (treatise) on Time, and on Motion-both of which became standard textbooks for the students of the early 18th century curriculum popular in Lucknow and Awadh as the Dars-i Nizāmia. The Atomist Muhibullāh Bihāri was a student of Shaikh Qutbuddīn Sāhalvi, whose son Nizāmuddīn designed the Dars-i Nizāmia; lit. “The Curriculum of Nizamuddin.  This syllabus that became the backbone for higher education in 19th century Awadh, laid so much emphasis on Greek logic and reasoning that the mullāhs of Awadh and Delhi denounced it as it was considered anti-Islamic.

দীর্ঘ ইংরেজি উদ্ধৃতির জন্য মাফ চাইছি। আসলে এই কথাগুলি মূল সন্দর্ভ থেকে উৎকলিত করলাম, যাতে কেউ না আমাকে দুষতে পারেন যে আমি বাংলা তর্জমা করতে গিয়ে মূল টেক্সট থেকে সরে যাচ্ছি। লেখক জোর দিয়েই বলেছিলেন সেই সময় “আওয়াধ (এটাই ঠিক উচ্চারণ, অযোধ্যা না) ছিল ‘বৌদ্ধিক নবজাগরণে’র ভিত্তিভূমি। আমাদের গবেষণা সমীক্ষার  আগেও মুঘল অভিজাতদের সঙ্গে ফরাসি পরিব্রাজকদের মতবিনিময় হয়েছিল। যেমন, ট্যভার্নিয়ার নিখুঁত হীরার অনুসন্ধানের কালে ভারত জুড়ে গহনা সংগ্রহের সমস্ত বড় হীরা এবং তাদের জ্যামিতির একটি সচিত্র ক্যাটালগ আঁকেন, যা ১৯৬০-এর দশকে বিশদভাবে জানা যায়। পঁস, বোদিয়ে, দ্যনভিল, দানে, বার্বিয়ে ও জর্মন যোসেফ তিয়েফেনথেলার (যিনি  আল বেরুনি, নাসিরুদ্দিন তুসি, উলুঘ বেগ ও আবুল ফজলের লেখাপত্র ও পাণ্ডুলিপি থেকে দ্রাঘিমাংশ পাঠ নেন) প্রভৃতি খ্রিস্টীয় ধর্মযাজকেরা, ভারতের নানা অঞ্চলের স্থানাঙ্কগুলি (অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ) সংশোধন করে নেন: বিশেষত আওয়াধ-এর অন্তর্ভুক্ত শহরগুলির যথা লক্ষ্ণৌ, ফৈজাবাদ, বাহরেইচ, খৈরাবাদ, বলরামপুর, মোহাম্মদি, বেনারস প্রভৃতি। ক্লদ বোদিয়ে (১৬৮৬-১৭৫৭) ও ফ্রান্সিস পঁস (১৬৯৮-১৭৫২)-এর la Hire’s Tabulae-এর প্রতিলিপি ভারতে নিয়ে যাওয়ার কথা  অবশ্যই উল্লেখিত আছে। পূর্বোক্ত খ্রিস্টীয় ধর্মযাজকেরা প্রধানত সাওয়াই রাজা জয় সিং (প্র্য়াণ ১৭৪৩)-এর আগ্রহে জ্যোতির্বিদ্যা গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ভারতে বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসের ঐ পর্যায়  নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেছেন ভি এন শর্মা, রাজাউল্লা প্রভৃতি ইতিহাসবিদেরা।

ইকবাল গনি খান আরও জানিয়ে গেছেন:

A major indicator of a civilisation’s intellectual stature is the manner in which it preserves its literary heritage. There are Persian manuscript collections in London, Paris, Oxford, Cambridge, Dublin, Glasgow, Berlin and even in Aberystywith, that were once busy libraries in India. They were carted away from the palaces of the Mughals and later from the libraries of 18th century rulers such as the Nawab of Awadh, the Afghan chief Hafiz Rahmät Khān, the Mysore ruler Tipu Sultan, etc. initially as a part of the looting that followed in the wake of early British conquests and then with the onset of Orientialism, out of a desire to preserve them for the superior western scholars; to save them from the destructiave hands of the natives.29 The books in Khuda Bakhsh Library, Patna, 30 in the Raza Library, Rampur, 31 as well as those in Hyderabad, Aligarh, and in the library of the Asiatic Society in Calcutta are the few that managed to survive this drain of intellectual wealth.

However, prior to this colonial looting, provincial courts such as Awadh had become the repositories for the books once owned by the Mughals and the nobles serving the Empire. Thus in the 1780’s the library in Lucknow had 300,000 volumes with hundred of attendants. “All the jewels in Asaf ud-Daulāh’s vaults would not have paid for a fraction of this treasure in books’, says a later chronicler.32 He makes it a point to add that only 700 were `inherited’ from the libraries of the Salatin-i Taimūrīya i.e. the Mughal kings – the rest were later acquisitions.

ফরাসি বিজ্ঞান সাধকদের সাবেক সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে বিপুল আগ্রহ ছিল, অনেক সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি কিনে নিয়ে গেছেন। ইকবাল গনি খানের ভাষায়:

The French were avid buyers of Sanskrit manuscripts – some of the Jesuits like Pons had them copied both for their centres in India as well as for the Bibliothèque du Roi in Paris which besides its official commission from the King, was also building up a good collection of Farsi and Arabic mss through the efforts of Law de Lauriston, Anquetil du Perron, Gentil, Polier, Claude Martin was collecting them for himself and it was his collection that was most callously sold offin lots and thus dispersed between 1801 and 1805.A similar fate was reserved for his collection of natural history drawings that he had ordered his commissioned and trained Indian artists to execute।

আওয়াধ-এর বিজ্ঞানপ্রেমী নবাবেরা প্রেরণা পেয়েছিলেন মোগল বাদশাহদের কাছে। এ নিয়ে পরে লেখার ইচ্ছে আছে। আওরঙ্গজেবও বিজ্ঞানপ্রেমী  ছিলেন। তাঁর আমলে ফ্রাঁসোয়াজ বার্নিয়ে-কে বাদশাহের দরবারে চিকিৎসক নিযুক্ত করা হয়েছিল এবং তাঁর ভারতীয় আতিথ্য দানকারী আয়োজক মুল্লা শফি ইয়াজদী ওরফে ডেনিশম্যান্ড খানকে আওরঙ্গজেবের আদালতে ব্যক্তিগত উপস্থিতি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য বার্নিয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা ইউরোপীয় নিরবচ্ছিন্ন অনুবাদ করা এবং দুই দেশের মধ্যে ধারণাবলির আদানপ্রদান। যিনি আজকে ধর্মীয় গোঁড়ামির জন্য নিন্দিত, তাঁর কাছ থেকে এটি বড় পাওনা। বার্নিয়ে ১৭শ শতাব্দীর ইউরোপীয় দার্শনিকদের চিন্তার কার্টেসীয় বিশ্বদৃষ্টির সারমর্ম ডেনিশম্যান্ড খানকে অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করেছিলেন।

আজ প্রজ্ঞাবান ইকবাল গনি খানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার দিন। ইসলাম আমলে বিজ্ঞান চর্চার ঐতিহ্যকে তুলে ধরার এই তো সময়। প্রণতি জানাই শহীদ ইকবাল গনি খানকে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...