মধুসূদন দাদা

প্রতিভা সরকার

 


লেখক গদ্যকার, প্রবন্ধকার, অধ্যাপক, সমাজকর্মী

 

 

 

যদিও লোকে তাঁকে চাণক্য বলত, নির্দ্বিধায় বিপত্তারণ মধুসূদন দাদা বলেও ডাকা যায় প্রণব মুখোপাধ্যায়কে। প্রায় সারাজীবন মূল ক্ষমতার কুর্সিতে অবলীলায় টিঁকে থেকেছেন, লোকদেখানো আড়ম্বরের রাষ্ট্রপতির পদ এই তো শেষের কদিনের। যদিও পরমারাধ্য প্রধানমন্ত্রীর সিংহাসন দু একবার হাতের নাগালে এসেও পুরোপুরি আসেনি, কিন্তু ক্ষমতার গভীর ও গোপন উৎস চিনতে তাঁর কখনওই ভুল হত না। দিল্লিতে কাঁটা বিছানো রাজনীতির অলিন্দে দশকের পর দশক তাঁর সাবলীল পদচারণার পেছনের গুপ্ত রহস্য এটাই।

ইন্দিরা গান্ধির হাত ধরে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে রাজ্যসভার মনোনয়ন। সালটা ১৯৬৯। তারপরেও আরও চারবার রাজ্যসভায়। প্রণব ক্ষমতার সেরা বিশ্বাসভাজনদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু রাজীব গান্ধি ছেঁটে ফেলেছিলেন তার অন্তরঙ্গ বৃত্ত থেকে। কিন্তু অত্যন্ত দক্ষ, বুদ্ধিমান, অসামান্য স্মৃতিশক্তির অধিকারী, বিপদমুক্ত করবার প্রায় অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন, সবার ওপরে অসীম ক্ষমতালিপ্সু এই মানুষটিকে বেশিদিন এড়িয়ে থাকা অসম্ভব ছিল। ফলে সন্ধিস্থাপন হয়ত হয়েছিল, কিন্তু তার মায়ের জমানার মতো প্রণব অমিতশক্তিধারী হয়ে উঠুন এটা রাজীব পছন্দ করতেন না। নরসিমা রাওয়ের আমলে যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান হন। ১৯৯৫ সালে বিদেশমন্ত্রী। মনমোহন সিংয়ের আমলে অর্থ, প্রতিরক্ষা, বিদেশ তিন মন্ত্রকেই কোনও না কোনও সময়ে মন্ত্রিত্ব করেছেন। রাজা এসেছে, রাজা গেছে, কিন্তু প্রণব মুখোপাধ্যায়ের প্রয়োজন ফুরায়নি। রাজীবের ওপর রাগ করে নিজের রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস নামে একটি দল বানিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তা জনমানসে বা রাজনীতিতে কোনও ছাপ ফেলতে ব্যর্থ হয়। প্রণব কংগ্রেসে ফিরে আসেন। তার দলও কংগ্রেসে মিশে যায়।

 

সাপ ও ব্যাং

আসলে সাপ ও ব্যাং উভয়ের মুখে চুম্মা দেওয়ার অভ্যাসটি আখেরে খুবই শক্তিশালী এবং চুমাকারী যদি প্রবলতর বুদ্ধিমান হন, তাহলে তো কথাই নেই। ফলে ইন্দিরা গান্ধি এবং মনমোহন সিং, দুজনের সঙ্গেই আমাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির প্রবল অন্তরঙ্গতা ছিল। রাজীব গান্ধির সঙ্গে মনোমালিন্যের কোনও স্মৃতিও তিনি পুষে রাখেননি। বরং রাজীবের মৃত্যুর পর ১৯৯৮ সালে সীতারাম কেশরীর বিরুদ্ধে গিয়ে সনিয়া গান্ধিকে কংগ্রেস সভানেত্রী করায় প্রণবই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার দাবী ও যোগ্যতা অগ্রাহ্য করে মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী করায় তিনি দারুণ ভেঙে পড়েছিলেন বলে শোনা যায়। তবে সত্যি কথা বলতে কী, রাষ্ট্রপতি হবার আগে অব্দি ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতার বৃত্তে দ্বিতীয় স্থানটি ধরে রেখেছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়।

ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও তার গাঢ় সখ্যের কথা সর্বজনবিদিত। শোনা যায় মধুসূদন দাদা হিসেবে তিনি একাধিকবার মোদির জীবনেও অবতীর্ণ হয়েছেন। মোদি গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন প্রণববাবুর বুদ্ধি পরামর্শ নিয়ে বিপদমুক্ত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রিত্বের অভিষেকের সময় কংগ্রেস নেতারা তেমন খাতিরদারি না পেলেও “প্রণবদা”র যত্নআত্তির কোনও ত্রুটি হয়নি। দুজনেই দুজনের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ গল্পগুজব পছন্দ করতেন। মোদিলিখিত খোলা চিঠি থেকে অল্প অনুবাদ করে দেওয়া বাহুল্য হবে না। “তিন বছর আগে”, মোদি লিখেছেন, “আমি নতুন দিল্লিতে এসেছিলাম এক বহিরাগত হয়ে। সামনে ছিল বিপুল এবং কঠিন কর্মভার। সেসময় আপনিই ছিলেন পিতৃতুল্য এবং আমার রক্ষাকারী। আপনার জ্ঞান, পথের দিশা এবং আপনার ব্যক্তিগত উষ্ণতা আমাকে দিয়েছে মনোবল এবং শক্তি।”

উত্তরে প্রণব মুখোপাধ্যায় লেখেন এ চিঠি তার হৃদয়কে ছুঁয়ে গেছে।

শোনা যায়, মমতা ব্যানার্জি প্রণববাবুকে পছন্দ করতেন না, কারণ প্রণববাবু পশ্চিমবঙ্গের বাম নেতাদের নিয়ে পথ চলার পক্ষপাতী ছিলেন। এই কারণ এবং আরও অন্যান্য ঘটনাবলিই নাকি রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়নের মমতা-বিরোধিতার পেছনে বিদ্যমান। যাই হোক সবাইকে নিয়ে চলার একটা মন্ত্র প্রণবের জানা ছিল, অনেকেই এটা বিশ্বাস করেন।

যে বিজেপি সরকার কংগ্রেসের শেষ দেখতে এসেছে বলে ঢক্কানিনাদ হয়, ২০১৯ সালে তারাই প্রণব মুখোপাধ্যায়কে রাষ্ট্রের সেরা শিরোপা ভারতরত্নে ভূষিত করে। তার ঠিক এক বছর আগেই নাগপুরে আরএসএস ডেরায় সেই বিতর্কিত বক্তৃতা তিনি দিয়ে ফেলেছেন। প্রথম সারির কংগ্রেসি নেতা বা প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ অনেককে অবাক করেছিল। কিন্তু এই অনুষ্ঠানকে তার আর একটি মাস্টারস্ট্রোক বলেও দেখা হয়। কারণ ধুতি পাঞ্জাবি জহরকোট সজ্জিত প্রণব তার ভাষণে পরিষ্কার বলেন সহিষ্ণুতাই হচ্ছে এদেশে সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং অন্তর্ভুক্তিতেই আমরা বিশ্বাস গচ্ছিত রেখেছি। ভারতের আত্মা বহুত্ববাদী। তাই আমাদের জাতীয়তাবাদকে ধর্ম, বিশ্বাস, প্রাদেশিকতা, ঘৃণা এবং অসহিষ্ণুতার নিগড় দিয়ে বাঁধতে গেলে আমাদের জাতীয় পরিচয়ই হারিয়ে যাবে।

আবার একই সঙ্গে আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেগড়েওয়ারের জন্মভিটে পরিদর্শন করতে গিয়ে প্রণব বলেন, আজ ভারতমাতার এক মহৎ সন্তানকে শ্রদ্ধা জানাবার সুযোগ পেয়ে আমি বড় খুশি।

 

মেলাবেন তিনি মেলাবেন

ভারতীয় রাজনীতিতে এই ‘তিনি’টি যদি প্রণব মুখোপাধ্যায় হন, তাহলে সারা জীবন ধরে লেখা তার ডায়েরিগুলি বড় মূল্যবান। রাজনীতির শত ব্যস্ততা, রাইসিনা হিলসের রাজবিলাস, শেষজীবনের কর্মহীনতা, সবকিছুর মধ্যে একটি কাজ তিনি নিষ্ঠাভরে করে গেছেন বলে শোনা যায়। সেটি হল ডায়েরি লেখা। এই উপমহাদেশের রাজনীতি কতটা মিলের আর কতটা অমিলের, মানুষের চেহারায় যারা আমাদের শাসন করে, তারা সত্যিই কতটা মানুষ, কতটা মেশিন, তাদের নিজস্বতা কৃত্রিমতা, সবটুকুর হিসেব নিতে চাইলে এই ডায়েরিগুলো আনকাট বই হয়ে বেরনো দরকার। কে বলতে পারে, সেদিন যে প্রণব মুখোপাধ্যায়কে আমরা দেখতে পাব তিনি সত্যিই চেনা প্রণব, নাকি একেবারেই নতুন কেউ!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2616 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...