শিরোনামহীন সময়ের মোনোক্রোম মন্তাজ

শুভেন্দু সরকার

 


শুরু হল মেল ট্রেনের নতুন কামরা উইন্ডো সিট। এই কামরায় স্রষ্টারা কথা বলবেন তাঁদের নিজেদেরই সৃষ্টি নিয়ে। এই সংখ্যায় উইন্ডো সিট-এ শিল্পী শুভেন্দু সরকার।

 

 

 

 

 

 

একেবারে আচমকাই, ছবিগুলোর কথা মনে পড়ল দীর্ঘ সতেরো বছর পর— সরাসরি স্মৃতির ভেতর থেকে উঠে এল যেন! একটি বিশেষ সময় ও পারিপার্শ্বিকের চাপে ছবিগুলো আঁকা হয়েছিল তখন, আর তার পর, স্মৃতির তলায় চাপাও পড়ে গিয়েছিল। সত্যি বলতে কী, ভুলেই গিয়েছিলাম ছবিগুলোর কথা। আজ, এতদিন পরে, কোভিড অতিমারি ও দেশজোড়া এক অন্ধকারের রাক্ষসীনৃত্যের আবহ যেন ঝাঁকুনি দিয়ে সেগুলোর কথা মনে পড়িয়ে দিল। আর, ছবিগুলোকে ফিরে দেখতে গিয়ে মনে হল, আরে, এগুলো তো আসলে আজকেরই ছবি— এই সময়টাকেই তো আমি ধরে রাখতে চাইছিলাম সতেরো বছর আগে!

দৈবে আমি বিশ্বাস করি না। বিশ্বাস করি না, ছবি আকাশ থেকে পড়ে। শুধু ছবি কেন— কোনও শিল্পই আকাশ থেকে পড়ে না। বরং ঘোরতরভাবে বিশ্বাস করি, একজন ছবি-আঁকিয়ে (বা, যে কোনও শিল্পীই) আসলে তার সময় আর চারপাশটাকেই নিজের কাজের মধ্যে ধরে রাখতে চায়— কখনও বুঝে, কখনও বা পুরোটা না-বুঝেই। অনেকসময় খালি চোখে হয়তো বোঝা যায় না সেটা, বা হয়তো টের পাওয়া যায় না কোথা থেকে এল সেই আপাত-অসংলগ্ন ভাবনার সূত্র। হয়তো, অনেক পরে ফিরে দেখতে গিয়ে বোঝা যায়, কীভাবে একজন ব্যক্তি নিজের অগোচরেই নিজেকে প্রস্তুত করে তুলছিলেন আসন্ন কোনও অন্ধকারের জন্য।

এই ছবিগুলোর ক্ষেত্রেও কি ঘটেছিল তেমনই কিছু? তা না-হলে আঁকার পর কেন তুলে রেখেছিলাম সেগুলোকে? কেন তখন কাউকেই দেখাতে ইচ্ছে করেনি, কথা বলতে ইচ্ছে করেনি ছবিগুলো নিয়ে? এতদিন পর, আজই হঠাৎ কেন ইচ্ছে করল? এই অন্ধকার সময়ে? তাও আবার কোনও গ্যালারির ঠান্ডা ঘরের বৃত্তের মধ্যে নয়— একটি ওয়েব-পত্রিকার পাতায়? আমি কি সময়ের আগেই এঁকে ফেলেছিলাম ওদের? কিংবা, অসংবদ্ধ কয়েকটি ভাবনা— আমি যেভাবে দেখেছিলাম— টুকে রাখতে ইচ্ছে করেছিল ক্যানভাসে— আজ এতদিন পরে সেগুলোর মানে বুঝতে পারলাম?

এই প্রশ্নমালার কোনওটিরই উত্তর আমার কাছে নেই। খুঁজে পেতেই হবে উত্তর, তেমন বাধ্যতাও নেই কোনও। আমি কেবল আমার সামনে একটি আধখোলা জানলার কথা ভাবতে পারি, যার মধ্যে দিয়ে আমার চারপাশ, সকালের আলোয়, রাত্রির আবছায়ায়, আমার ঘরের মধ্যে গুঁড়ি মেরে ঢুকে পড়ে। দুটো-একটা রং হয়তো দেখতে পাই। কখনও তারা ইয়েলো ওকার, কখনও ইন্ডিয়ান রেড বা বার্ন্ট অ্যাম্বার, কখনও বা নিকষ কালো। অন্ধকার কিছু ছেঁড়া-ছেঁড়া অবয়ব তৈরি হয়ে উঠতে থাকে। তার সঙ্গে জুড়ে যেতে থাকে অনেক ভাঙাচোরা লাইন। এইভাবে আস্তে আস্তে একটা কিছু চেহারা ফুটে ওঠে। জানলার খোলা চৌকো অংশটা সেই ছবিটার ফ্রেম হয়ে যায়।

ছবিগুলো তৈরি হয়েছিল ২০০৩ সালে। তখন তো আজকের মতো ইন্টারনেটের এত রবরবা ছিল না। সকালের কাগজে আর সন্ধের টেলিভিশন-খবরে দেখতাম, গুজরাত জ্বলছে। চারদিকে আগুন আর শ্বাসরোধী ধোঁওয়ার মধ্যে দৌড়ে যাচ্ছে কিছু মানুষ… অস্ত্র হাতে তাদের পিছনে ধাওয়া করেছে আরও কিছু মানুষ… অন্ধকার দেওয়ালের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে চোখেমুখে ভয়ের রেখা আঁকা কিছু মানুষ… উলটোদিকের দেওয়ালের আড়ালে তাদের ওপর নজর রেখে চলেছে কিছু মানুষ… এইরকমই একটা হিংসা আর অবিশ্বাস আর আর্তনাদের মধ্যে দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছিল আমাদের দিনরাত।

আর আজ, ২০২০। একটা অতিমারি এসে আমাদের সভ্যতা আর বিজ্ঞানচর্চার অগ্রগতির যাবতীয় অহমিকার আড়াল একটানে খসিয়ে দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে আমাদের আসল মুখ। সে মুখে রাগ আর অসহিষ্ণুতা— হিংস্রতা আর প্রতিশোধস্পৃহা মিশে রয়েছে। আমরা দেখছি দোপেয়ে একটা জন্তু, তার চোয়ালের কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে লোভ। অন্যকে আরও বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে নিজে আরও নিরাপদে থাকার লোভ। আর, এই লোভের উলটোদিকে দাঁড়িয়ে একলা হয়ে যেতে থাকা অসংখ্য অসহায় মানুষ। তারা সার দিয়ে বাড়ি ফিরছে, পায়ে হেঁটে। তাদের দিকে খুব মন দিয়ে তাকিয়ে আছি আমি। দেখতে পাচ্ছি, ভীড়ের মধ্যে রয়েছে নিজের ক্রুশকাঠ পিঠে বহন করে ফেরা একলা মানুষ, শ্বদন্ত বের করা কালো বেড়াল, ডানা-ভাঙা রাজা, জোকার, বেহালাবাদক আর উদ্যত বেয়নেট। স্বপ্নের মধ্যে ভ্রমরার সঙ্গে কথা বলছে একটি মেয়ে, যার চোখে কুটিল হাসি আর মাথায় বিষণ্ণ মুকুট।

এইসব দেখতে দেখতে আমি আসলে সতেরো বছর আগে আঁকা ওই ছবিগুলোর কাছে ফিরে যাচ্ছি। নাকি, ওই ছবিগুলোই সতেরো বছর ধরে হেঁটে এসে আজ আচমকাই আমায় চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছে আজ? নাকি, আসলে যে ছবিগুলো আমি আঁকতে শুরু করেছিলাম সতেরো বছর আগে, এতদিনে সেগুলো আঁকা শেষ হল?

ছবিগুলোর আলাদা করে কোনও নাম দিইনি। সিরিজটির নাম, ধরে নিন, ‘আনটাইটল্‌ড’। শিরোনামহীন সময়ের মোনোক্রোম মন্তাজ।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...