নিয়মভঙ্গ

বিজয় বোস

 

মিত্তিরদার খবরটা পাওয়ার পর থেকেই কাজে আর মন বসাতে পারলাম না। মিত্তিরদা নেই, খবরটা বিশ্বাস করাটা যে আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এই তো কিছুদিন আগেও অফিসপাড়ায় দেখা হয়েছিল। দিব্যি আগের মত ফিট। আমি টিফিন খেতে নিচে নেমেছিলাম, মিত্তিরদা পাসপোর্টের অফিসে এসেছিলেন। টি বোর্ডের কাছে দেখা। মিত্তিরদা জিজ্ঞেস করলেন— কি হে সজল, কেমন চলছে? চাপ কেমন?

–সামলে নিচ্ছি দাদা। আপনি নেই, একটু অসুবিধে তো হবেই প্রথম প্রথম।
–হ্যাঁ সামলে চলিস ভাই, রাস্তায় কলার খোসা ফেলার লোকের তো অভাব নেই। স্লিপ খাস না। পা বাঁচিয়ে।
–এদিকে এসেছেন একটা ফোনও করলেন না। রাস্তায় হঠাৎ দেখা না হলে তো জানতেই পারতাম না আপনি এদিকে এসেছেন। আসুন না অফিসে।
–না রে ভাই, অফিসে আর না। এদিকে কাজেই এসেছিলাম, আর তাছাড়া তোরা সব ব্যস্ত বলেই আর ফোন করিনি। আর কি জানিস, পুরনো ঘোড়াদের রেসের মাঠে আবার ফিরে যেতে নেই। অনেক বছর ওই চেয়ার, টেবিল, ফাইল, কম্পিউটার সহ্য করেছি, আর না। আশপাশটা তো দেখার সুযোগই হয়নি, এবার ভাবছি একটু ঘুরে নিই। ভাবছি একবার মিলেনিয়াম পার্কটার দিকে গেলে কেমন হয়? তারপর লঞ্চে করে হাওড়ায় গিয়ে ট্রেন?

মিত্তিরদার পুরো নাম মহাদেব মিত্র। সাড়ে পাঁচ ফুটের মতো লম্বা, শ্যামলা গায়ের রং, মাথায় আধা কাঁচাপাকা চুল, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, আর সবসময় ক্লিন শেভড। সঙ্গে সারাজীবন একই টেবিলে বসে কাজ করার পুরস্কারস্বরূপ একটা ভুঁড়ি। মিত্তিরদা বলতেন, ‘সারাজীবন দশটা পাঁচটা করে পিএফ আর গ্র্যাচুইটি মিলে তো কিছুই জমাতে পারলাম না ভাই, ভুড়িটাই যা সম্বল।’ উত্তরপাড়ায় বাড়ি ভদ্রলোকের। সকালের ঠাসাঠাসি লোকালে এসে কাজ করে আবার বিকেলে সেই ভিড়ে ঠাসা ট্রেনে চড়ে বাড়ি ফিরতেন। জীবনে কেউ কখনও ওনাকে বুট পড়তে দেখেননি, সবসময় স্নিকার্স। তাও কালেভদ্রে পাল্টাতেন। টিফিন বলতে বরাবর তিনটে রুটি আর মরসুমি সবজি। একাউন্টসের অডিটর, হিসেবনিকেশে জেট গতির মাথা। আর শখ বলতে আবৃত্তি করা। অফিসের সোশ্যালে, বা কারও অনুরোধে কবিতা বলতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত বোধ করতেন না। জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ থেকে শ্রীজাত, জয় গোস্বামী পর্যন্ত অকপটে উগরে দিতে পারতেন। রিটায়ারমেন্টের কিছুদিন আগে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমার দায়িত্ব শেষ, এবার গঙ্গার ধারে বসে হাওয়া খাব আর কবিতা লিখব।’ আমি যখন অফিসে জুনিয়ার হয়ে জয়েন করেছিলাম, এই মিত্তিরদাই আমাকে হাতে ধরে কাজ শিখিয়েছিলেন। প্রথম প্রথম স্যার বলায় এক ধমক দিয়ে বলেছিলেন— ‘ওসব মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এটিকেট এখানে দেখালে বড়বাবুর কাছে নালিশ করে দেব। অডিট তো একরকম গোয়েন্দাগিরিই, তুমি বরং আমাকে মিস্টার মিত্তিরই ডেকো। শুনলেও গর্ব হবে।’ তারপর খানিক ভেবে বলেছিলেন, ‘নাহ থাক, তারচেয়ে তুমি বরং বাকি সবার মতো আমাকে মিত্তিরদাই ডেকো।’

তারপরে টানা বারো বছর কতবার যে মিত্তিরদা মিত্তিরদা করেছি তার অন্ত নেই। সেই মিত্তিরদা নেই, কথাটা যেন আমার কাছে বজ্রপাতের মতো। আজ সকালে বৌদি ফোন করে জানালেন গতকাল সন্ধ্যেবেলা নাকি স্ট্রোক হয়েছিল।

 

ভালোই হয়েছে মিত্তিরদার কাজটা রবিবার পড়ে, অন্যদিন হলে আগে থাকতে বলেকয়ে, একটা কিডনি আর একটা চোখ বড়বাবুর টেবিলে জামিন রেখে একদিনের একটা ছুটি নিতে হত। মিত্তিরদার বাড়ি আমি আগেও অনেকবার গিয়েছি, তাই বাড়ি চিনতে কোনও অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। বাড়ির লোকের সঙ্গেও আমার গভীর আলাপ। রিটায়ারমেন্টের পর মিত্তিরদা অনেকবার বলেছিলেন আসার কথা, বলেছিলেন— ‘অফিসের বাইরেও তো একটা সম্পর্ক আছে নাকি?’ আমার যাচ্ছি যাব করে আর যাওয়া হয়নি। আর আজ এমন একটা পরিস্থিতিতে যেতে হবে কে জানত।

একতলা বাড়িটার সামনে সাদা কাপড়ের গেট। তাতে সাদা রজনীগন্ধার মালা। ভেতরে আবছা কোলাহল। ঘরে প্রবেশ করতে বৌদি এগিয়ে এলেন— আরে সজল যে। এসো এসো।

–কেমন আছেন বৌদি?
–আর কেমন। জানোই তো সব।
–কী করে হঠাৎ করে এরকম…
–আর থাক ওসব কথা। তুমি অনেক দূর থেকে এসেছো, একটু বোসো। চা খাবে তো?

আমি ফুল আর মিষ্টির প্যাকেট বৌদির হাতে দিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসলাম। অফিসের শ্যামল, গৌরাঙ্গ আর রঙ্গনের আসার কথা, যদিও কেউই এখনও এসে পৌঁছয়নি। আমি যদিও আসার আগে হোয়াটস্যাপে লিখে দিয়েছিলাম আমি যাচ্ছি বলে। আমার চেয়ারের ঠিক মুখোমুখি মিত্তিরদার ছবিটা রাখা। মিত্তিরদার রজনীগন্ধায় এলার্জি ছিল। আজ অবশ্য তার না বলার উপায় নেই, পুরো ছবিটাই রজনীগন্ধাময়। ধূপের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঘরখানা। ছবিতে মিত্তিরদা এমনভাবে হাসছেন যেন এক্ষুনি বলে উঠবেন— সজল এসেছিস? বোস একটু, আমি ওদিকটা দেখে নিই। বরযাত্রীর আসার সময় হয়ে গেছে।

আমার চোখের কোণটা হালকা কিটকিট করে উঠল।

আমার পাশে পাঁচজন মাঝবয়সীদের একটা গ্রুপ। তারা আইপিএল নিয়ে আলোচনা করছে। অবশ্যই গলা নামিয়ে। এটা কি ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা করার জায়গা? আমি খানিক বিরক্তি নিয়েই বারান্দায় উঠে গেলাম। মিত্তিরদা এখানে টবে গাছ করতেন, নানারকম মরসুমি ফুলের শখ ছিল। শেষ যখন এসেছিলাম আমাকে দেখিয়েছিলেন খুব যত্ন করে। এখনও সেই গাছগুলো আছে। বারান্দায় দুজন ভদ্রলোক নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন। তাদের মধ্যে একজনকে আমি চিনি, মিত্তিরদের ছেলে সহদেব। কাজ করে উঠেছে, মাথা মোড়ানো। আমাকে লক্ষ করেনি। চাপা গলায় অন্য ভদ্রলোকটিকে বলছে— আমার টেন্ডারটা একটু দ্যাখো দাদা।

অপর ভদ্রলোকটি বললেন— আরে ওভাবে হয় নাকি, একটা সিস্টেম আছে তো নাকি?

–এটা পাস না হলে প্রচুর টাকা লোকসান হয়ে যাবে দাদা। তোমার হাতেই সব।

আমি বারান্দার অন্যদিকে এলাম। বাঁদিকে ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম শোওয়ার ঘরে তিনজন মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা খাটের ওপর বসে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন।

প্রথমজন বললেন— আমি তো বলেই দিয়েছি, এবার জয়েন্টে চান্স না পেলে এক্কেবারে সোজা আর্টস পড়তে পাঠিয়ে দেব।
দ্বিতীয়জন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সামান্য বিরক্তি নিয়ে বলে উঠলেন— আমারটা তো কমার্স নিয়েছে, কী করবে কে জানে?
তৃতীয় ভদ্রমহিলা বললেন— আমার ছোট ছেলে এই তো ব্যাঙ্গালোরে চাকরি নিল। কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়েছে। আর ওখানে তো অপরচুনিটি প্রচুর।

কী আশ্চর্য! এরা যে কেউ একটা শ্রাদ্ধবাড়িতে এসেছে সেকথা বিন্দুমাত্র বোঝার উপায় নেই। মিত্তিরদা বাদে দুনিয়ার সব আলোচনা যেন এখানেই করতে হবে এদের। সর্বত্র নিজের স্বার্থসিদ্ধি আর ঢাক পেটানোর প্রচেষ্টা। আমি বিরক্ত হয়ে শ্যামলকে ফোন করলাম— কিরে কতদূর?

ফোনের ওপ্রান্ত থেকে শ্যামল বলল— খুব ফেঁসে গেছি রে সজল। মেয়েটার কাল থেকে পরীক্ষা। আমি বৌদিকে জানিয়ে দিয়েছি। আর কি যাব বল? এরকম একটা অকেশন!

অকেশন! কথাটা কানে ঠেকল। যাই হোক, আমি গৌরাঙ্গকে একবার চেষ্টা করলাম— কিরে কতদূর?

–ভাই শরীরটা একদম দিচ্ছে না রে আজকে। তুই একটু বৌদিকে বুঝিয়েসুঝিয়ে ম্যানেজ করে নে না।

আমি মাথা হেলিয়ে বললাম— ঠিক আছে।

ইচ্ছে করেই আর রঙ্গনকে ফোন করলাম না। কী হবে ফোন করে? উত্তর তো আমার জানা। অথচ আমি তো জানি মিত্তিরদা এদেরকে জুনিয়র হিসেবে কতটা স্নেহ করতেন! আমি আবার ঘরে ঢুকে এলাম। ঢুকতেই বৌদি বললেন— আরে তোমাকেই তো খুঁজছিলাম, কোথায় ছিলে? যাও যাও ওপরে যাও, একটা ব্যাচ বসছে। এই ব্যাচে বসে পড়ো।

–বৌদি, আমি কিন্তু কিছু খাব না।
–খাব না আবার কী? যাও। বৌদি আদেশের সুরে বললেন।
–কিন্তু…
–কোনও কিন্তু না। তোমার মিত্তিরদা অর্ডার করলে পারতে না করতে?

আমি প্রাণহীন একটা মুচকি হাসি দিলাম। মিত্তিরদার দোহাই দিয়ে অফিসেও অনেকে অনেক সময় কত কাজ করিয়ে নিয়েছে আমাকে দিয়ে!

সাদা প্লেটে প্রথমে ভাত এল, সঙ্গে সুক্তো। তারপর ডাল, আলুভাজা, ফুলকপির তরকারি। মিত্তিরদার মেয়ে কাজল খাওয়াদাওয়ার দ্বায়িত্বে। পরনে ঘিয়ে রঙের ঢাকাই, সঙ্গে কালো থ্রি কোয়ার্টার ব্লাউজ, তাতে ওরলি আর্ট। গলায় অক্সিডাইজড হার। আমার সামনে এসে বলল— সজলদা না! কেমন আছ?

–এই আর কি।
–এমা তোমার প্লেট তো ফাঁকা। পনির নাওনি?
–হ্যাঁ নিয়েছি তো। এই তো দ্যাখো এখনও শেষ হয়নি।
–এটুকু মাত্র? দাঁড়াও। তারপর ক্যাটারারের ছেলেটাকে ডেকে রীতিমতো আদেশের সুরে বলল— এই এনাকে আরেকটু পনির দাও।

আমি প্রায় দাঁড়িয়ে উঠে প্রতিবাদ করে উঠলাম— এই কি করছ কী? আর না।

–না বললে শুনব না সজলদা। নাও।

অত্যাচার এতেই থামল না। পনিরের পর কোফতা, চাটনি, সবশেষে রসোগোল্লায় গিয়ে অত্যাচারটা থামল। আমি নিচে নামতে বৌদি আমাকে ধরলেন— সজল একটু শোনো, কিছু কথা আছে।

বৌদি একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন— তোমার দাদার অফিসের সেটেলমেন্টের কিছু টাকা পাওনা ছিল, আমি পেপারগুলো তোমাকে দিয়ে দিলে তুমি একটু অফিসে যোগাযোগ করে ওই সেটেলমেন্টের টাকাটা কীভাবে তোলা যায় একটু বলে দিতে পারবে?

–হ্যাঁ নিশ্চয়ই।
–আরেকটা কথা ছিল ভাই।
–হ্যাঁ বলুন না।
–আমার দাদার ছেলেটা এই বছর সবে গ্র্যাজুয়েশন পাস করেছে। তোমার তো এদিক ওদিক অনেক চেনাশোনা, একটু যদি কিছু দেখে দিতে পারো তো ভালো হয় ভাই।
–নিশ্চয়ই। আমার নম্বর দিয়ে দেবেন ওকে, বলবেন একবার যাতে একটু যোগাযোগ করে।

আসার সময় বৌদি বললেন— নিয়মভঙ্গে প্রায় কাউকেই বলা হয়নি। তুমি দাদার খুব কাছের, তুমি এসো কিন্তু।

–চেষ্টা করব বৌদি। আমি বেরিয়ে এলাম।

বেরোবার সময় শুনলাম মিত্তিরদার মেয়ে হাতের একটা বালা দেখিয়ে কাকে একটা বলছে— এই তো নতুন গড়ালাম এটা। সেনকো থেকে।

 

আমি রাস্তায় নেমে এলাম। ফিরতে হবে, তবে এবার রিকশা না ধরে হাঁটা লাগলাম। স্টেশন খানিকটা দূর, কিন্তু আমার একটু মুক্ত বাতাস চাই। একটা শ্রাদ্ধবাড়িতে আইপিএল, জয়েন্ট, কবজি ডুবিয়ে খাওয়ার জন্য জোরাজুরি, সেটেলমেন্টের টাকা, টেন্ডার, সোনার গয়না, চাকরির আবেদন— কী ছিল না? আরও কিছুক্ষণ থাকলে আরও কি কি যে শুনতে হত কে জানে। যে মানুষটা এদের সবার জন্য প্রায় সারাজীবন এক স্নিকার্সে, এক টিফিনে লড়ে গেলেন, আজ তার কাজে সে নিজেই ব্রাত্য। সত্যিই যে মানুষটা নেই, কারও তাকে নিয়ে ভাবারও বোধহয় কোনও প্রয়োজন নেই। তার জীবন নিয়ে জানার কারও কোনও আগ্রহ নেই, তার কাজ নিয়ে কারও আলোচনা করার মতো ইচ্ছে বা সময় কোনওটাই নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র জিনিসে মিত্তিরদার নেশা ছিল, ওনার সম্মানে দু একটা কবিতাও কি পাঠ করা যেত না? বা একটু স্মৃতিচারণ? মিত্তিরদাকে নিয়ে আমার কত অভিজ্ঞতা, কত বিকেল, কত ক্যান্টিন, কত লালদিঘির পাড়, কত ডেকার্স লেন, কত ইস্টবেঙ্গল মাঠ আছে। কিন্তু আমি সেগুলো কাদের বলব? কেউ জানতে চাইলে তো?

মনে মনে কিঞ্চিৎ রাগ হল। আবার হাসিও পেল। নিয়মভঙ্গ! নিয়মভঙ্গ তো কেবলমাত্র একটা সামাজিক অনুষ্ঠান মাত্র। কিন্তু সমাজের যে নিয়মগুলো উইপোকার মতো সমাজকে ভেতর ভেতর খেয়ে নিয়েছে, সেই নিয়ম ভাঙবে কে? কারও ইচ্ছে আছে, না কারও সে সাহস আছে? যুগযুগ ধরে সেই নিয়মের কাদায় পা দিলেই পা পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

অথচ এই সেদিনও মিত্তিরদাই বলছিলেন— সজল স্লিপ খাস না।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...