নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি: সোনার পাথরবাটি অথবা জ্ঞানাঞ্জনের শলাকা

স্টেশন মাস্টার

 

এক দশক পূর্বে শিক্ষা যেদিন এ দেশে একটি সার্বজনিক সাংবিধানিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃত হয়, দেশবাসীর পক্ষে তাহা বাস্তবিকই এক পরম আহ্লাদের বিষয় বলিয়া বিবেচিত হইয়াছিল। শিক্ষার অধিকার আইনে ফাঁক ছিল না, এমন কথা কেহ বলিবেন না– ফাঁক বিস্তর ছিল, এবং সে আইন রূপায়ণ করিতে গিয়া গত দশ বৎসরে ফাঁকগুলি বারংবার ধরাও পড়িয়াছে– তথাচ, শিক্ষাকে ছয় হইতে চৌদ্দবর্ষীয় সকল শিশু-কিশোরের নাগালে পঁহুছিয়া দিবার লক্ষ্যে সে আইন ছিল বাস্তবিকই এক ক্রান্তদর্শী উদ্যোগ। তাহার দশ বৎসর পর, যখন জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণীত হইতেছে, বড় আশা ছিল, সেই আইনের ভাবনাভিত্তি ও তাহার রূপায়ণের অভিজ্ঞতার নিরিখে চৌত্রিশ বৎসরের পুরাতন শিক্ষানীতিটির খোলনলিচা পালটাইয়া তাহাকে আরও সময়োপযোগী, অধিকতর ভবিষ্যৎমুখী করিয়া তোলা হইবে। কস্তুরিরঙ্গন কমিটি-প্রণীত ও বিজেপি সরকার-কর্তৃক ঢক্কানিনাদিত নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি, বলা বাহুল্য, সেই আশায় জল ঢালিয়া দিয়াছে।

নয়া শিক্ষানীতি লইয়া অভিযোগ একাধিক, কিন্তু সে প্রসঙ্গে ঢুকিবার আগে স্বীকার করিতেই হয়, বাক্‌বিন্যাসে (নাকি বাগাড়ম্বরে বলিব) তাহা বাস্তবিকই চমকপ্রদ– এমন একটি সুচারু ও সুলিখিত সন্দর্ভের নিকটে দাঁড়াইয়া বিস্মিত হইতেই হয়! কিন্তু, বিষয়টি যখন একটি দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকনির্দেশ ও তাহার সার্থক রূপায়ণের একাধিক গুরুতর প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত, তখন রচনাসৌকর্য ব্যতিরেকে তাহার প্রতি দেশবাসীর অধিকতর প্রত্যাশা থাকে বই কী! সে প্রত্যাশাপূরণ কতদূর ঘটিবে, দেশের শিক্ষার প্রকৃত অভিমুখটি আগামী কয়েক দশকে কোন পথে অগ্রসর হইবে, ইত্যাদি প্রশ্নের সদুত্তর মিলিবার আগেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শ্রী পোখরিয়াল নিশঙ্ক ঘোষণা করিয়া দিলেন, অতি সত্বর নয়া শিক্ষানীতি কার্যকর হইতে চলিয়াছে।

মন্ত্রীর কথার সূত্র ধরিয়াই যখন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং নীতির উদ্বাহু প্রশংসা শুরু করিলেন, বুঝা গেল, ইহাও সরকারের একটি সুপরিকল্পিত অ্যাজেন্ডা। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা হইতে ভারতবাসী জানিয়াছেন, যে কোনও গোলমেলে বিষয়ে তড়িঘড়ি শিলমোহর লাগাইয়া তাহাকে কার্যে রূপান্তরিত করা এই সরকারের একটি প্রিয় পদ্ধতি– ফলে এই বিষয়েও অনুরূপ তাড়াহুড়া দেখিয়া সন্দেহ ঘনীভূত হইল। একাধিকবার খসড়া প্রণয়ন ও সংশোধন-পরিমার্জনের গয়ংগচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে বিপুলায়তন নথিটি প্রস্তুত হইতে প্রায় তিন বৎসর লাগিয়াছিল, তাহাতে হঠাৎ কী কারণে এ হেন গতিসঞ্চার হইল যে, দেশ যখন অতিমারির প্রকোপে পর্যুদস্ত তখনই তড়িঘড়ি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদন সম্বল করিয়া ও সংসদকে পাশ কাটাইয়া তাহাকে কার্যকর করার পথ প্রস্তুত হইল, সে প্রশ্ন স্বাভাবিক কারণেই উঠিল। যেখানে পশ্চিমবঙ্গ-সহ একাধিক রাজ্য আপত্তি তুলিয়া বলিয়াছে, শিক্ষানীতির চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়নে তাহাদিগের মতামত হয় গ্রহণ করা হয় নাই কিংবা লিখিত মতামত অগ্রাহ্য করা হইয়াছে, সে ক্ষেত্রে অন্তত সংসদে বিষয়টি লইয়া সবিস্তার আলোচনা হইবে, এমনই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু, সংখ্যাগৌরবে বলীয়ান সরকার বাস্তবে সে পথ মাড়ায় নাই।

পূর্বেই বলিয়াছি, সন্দর্ভটি বাক্‌বৈদগ্ধ্যে গরীয়ান। কিন্তু সে গৌরবের আড়ালে খুব স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান, বহিরঙ্গে শিক্ষার সার্বজনিকতা লইয়া অতিশয় দার্শনিক যুক্তিবিন্যাস করিলেও বস্তুত এই নীতি ঠিক উলটা কথা কহিতেছে– শিক্ষাকে একটি ক্রয়যোগ্য পণ্যরূপে বাজারজাতকরণ ও বিপণনের রাস্তা প্রস্তুত হইতেছে। সে কারণেই শিক্ষার অধিকারের বয়ঃসীমা বাড়াইয়া তিন হইতে আঠারো বৎসর বয়সী সকলের শিক্ষার কথা বলা হইলেও তাহা অবৈতনিক থাকিবে কি না, সেই মর্মে কোনওরূপ উচ্চবাচ্য করা হয় নাই। ওয়াকিবহাল পাঠকের স্মরণে থাকিবে, ‘আরটিই অ্যাক্ট’-এ সুস্পষ্ট বলা হইয়াছিল, ছয় হইতে চৌদ্দবর্ষীয় সকল শিশুর জন্য শিক্ষা হইবে আবশ্যিক ও অবৈতনিক। ভারতের মতো দেশে, যেখানে শিক্ষালয়ে উপস্থিতি সুনিশ্চিত করিতে বিপুলসংখ্যক পড়ুয়ার ক্ষুধানিবৃত্তির দায়িত্ব সরকারকে লইতে হয়, সে দেশে শিক্ষাকে ক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত করার সিদ্ধান্তের কুফল কতদূর ভয়াবহ ও মর্মান্তিক হইতে পারে, সরকারের তাহা অবশ্যই বিবেচনার মধ্যে রাখা উচিত ছিল।

‘আর্লি চাইল্ডহুড কেয়ার অ্যান্ড এডুকেশন’-কে (সংক্ষেপে ‘ইসিসিই’) সরকারের দায় বলিয়া মানিয়া লওয়া হইয়াছে, ইহা প্রস্তাব হিসেবে অবশ্যই শ্রুতিমধুর। কিন্তু তাহার রূপায়ণে অঙ্গনওয়াড়ি পরিষেবাকেন্দ্রগুলির ভূমিকা ঠিক কী হইবে, শিক্ষকনিয়োগ ও শিক্ষকদিগের শিক্ষণপ্রক্রিয়াই বা কীরূপে সঞ্চালিত হইবে, তজ্জনিত ব্যয়বরাদ্দ কীরূপে হইবে, বাজেটে ইহার সংস্থান নারী ও শিশুকল্যাণ নাকি শিক্ষা– কোন মন্ত্রক হইতে আসিবে, ইত্যাদি অসংখ্য বিষয়ে প্রগাঢ় ধোঁয়াশা রহিয়া গিয়েছে। বস্তুত, ছয় হইতে চৌদ্দ-র মডেলের পরিবর্তে তিন হইতে আঠারো-র প্রস্তাবিত মডেলে বিপুল পরিমাণ বাড়তি পরিকাঠামোর প্রয়োজন হইবে– অধিকসংখ্যক শিক্ষকনিয়োগ, তাঁহাদিগের যথোপযুক্ত শিক্ষণ, অধিকসংখ্যক বিদ্যালয়ভবন নির্মাণ, শিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটায়ন-সংক্রান্ত পরিকাঠামো নির্মাণ– সব মিলাইয়া বিপুল অর্থের সংস্থান করিতে হইবে।

এ প্রসঙ্গে নয়া জাতীয় শিক্ষানীতিতে একটি হাস্যকর রকমের উচ্চাশাব্যঞ্জক ঘোষণা শুনানো হইয়াছে। বলা হইয়াছে, শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয়বরাদ্দ অনতিদূর ভবিষ্যতে ক্রমে-ক্রমে জিডিপি-র ছয় শতাংশে লইয়া যাওয়া হইবে। কিন্তু যে দেশের কেন্দ্রীয় বাজেটে শিশুদের জন্য সামগ্রিক সংস্থান মোট বাজেটের মাত্র তিন দশমিক দুই শতাংশ, সে দেশে এ হেন প্রস্তাব স্তোকবাক্য বলিলেও কম বলা হয় – ইহা কার্যত ভিত্তিহীন ও অবাস্তব প্রতিশ্রুতি। যে দেশের কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যগুলিকে জিএসটি-র বকেয়া টাকা মিটাইতে না-পারিয়া হাত তুলিয়া দেয় ও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক হইতে ধার করিতে বলে, যে সরকার কোভিড অতিমারির বিপদে আর্থিক সহায়তার নামে দরিদ্র জনসমষ্টিকে কার্যত ঋণগ্রহণে উৎসাহ দেয়, সেই সরকারের মুখে শিক্ষায়, বিশেষত দরিদ্র শিশুকিশোরদিগের শিক্ষায় এ হেন উপুড়হস্ত প্রতিশ্রুতি নির্জলা মিথ্যাবাক্যের নামান্তর। এই প্রসঙ্গে মনে রাখিতে হইবে, গত কয়েক বৎসর ধরিয়া বাজেটে যে ব্যয়বণ্টনের প্রথা (‘ডিভলিউশন’) চালু হইয়াছে, সেই মোতাবেক শিক্ষাখাতে (যাহা কেন্দ্র-রাজ্য যৌথতালিকার অন্তর্গত) খরচের কমবেশি ষাট শতাংশ দায় রাজ্যগুলির স্কন্ধে। একদিকে রাজ্যগুলির অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হ্রাস করিয়া অন্যদিকে তাহাদের ঘাড়ে অধিক ব্যয়ের বোঝা চাপাইলে রাজ্যগুলি তাহা মানিবেই বা কেন, মানিলেও সংস্থান করিবে কোথা হইতে – সে প্রশ্নও অপ্রাসঙ্গিক নহে।

প্রশ্ন রহিয়াছে আরও অনেক, বস্তুত অসংখ্য। স্কুলশিক্ষায় ‘ত্রিভাষা-নীতি’ হইতে শুরু করিয়া ‘পাঁচ-তিন-তিন-চার সূত্র’, সমাজের পশ্চাদ্‌বর্তী ও অনগ্রসর অংশের জন্য ‘এসইডিজেড’ (‘সোশিও-ইকনমিক্যালি ডিজ্‌অ্যাডভান্টেজ্‌ড জোন’) চিহ্নিতকরণ ও ‘এসইজেড’ (স্পেশ্যাল এডুকেশন জোন’) গঠন, বিভিন্ন এলাকার একাধিক স্কুলকে জুড়িয়া দিয়া ‘স্কুল ক্লাস্টার বা কমপ্লেক্স’-এর পরিকল্পনা, ‘পরখ’ কর্মসূচির মাধ্যমে পরীক্ষাগ্রহণ ও মূল্যায়ন, স্কুলশিক্ষায় স্বেচ্ছাসেবী কর্মীনিয়োগে উৎসাহদান, ‘জেন্ডার ইনক্লুশন ফান্ড’ নির্মাণ ইত্যাদি নানাপ্রকার আপাতরোমাঞ্চক পরিকল্পনার কথা শিক্ষানীতির ছত্রে-ছত্রে, কিন্তু সেগুলি অধিকাংশই নিছক বাগাড়ম্বরের আড়ালে কার্যক্ষেত্রে একটি বানিয়া শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তনের প্রকৌশল।

আমাদিগের মনে হইয়াছে যে, নতুন এই শিক্ষানীতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি লইয়া সম্যক আলোচনা করার, এবং উক্ত প্রশ্নগুলির নিরিখে শিক্ষানীতিটিকে সরেজমিন কাটাছেঁড়া করিয়া দেখিবার ইহাই উপযুক্ত সময়। কিন্তু সম্পাদকীয় নিবন্ধের স্বল্প পরিসরে তাহা কদাচ সম্ভব নয়, পরন্তু তাহাতে একদেশদর্শিতার দোষ ঘটিতে পারে – সেই বিধায় আমরা চারনম্বর প্ল্যাটফর্মের সেপ্টেম্বর সংখ্যার মূল ভাবনা হিসাবে বিষয়টিকে বাছিয়া লইলাম। গুরুপ্রণামের স্তোত্র বলিতেছেন, অজ্ঞানের তিমিরান্ধকার হইতে চক্ষুরুন্মিলন ঘটাইয়া আলোকে উত্তরণের পথ দেখাইতে পারে একমাত্র জ্ঞানাঞ্জনের শলাকা – এই সংখ্যায় বহুমাত্রিক প্রবন্ধনিচয়ের মাধ্যমে আমরা সেই জ্ঞানাঞ্জনশলাকার (যাহার অর্থ প্রজ্বলিত মশালও হইতে পারে আবার খুঁচাইয়া ঘা করিবার কাঠিও হইতে পারে) আলোকে ধড়-মুড়া-টিকি-ল্যাজা-সমেত গোটা শিক্ষানীতিটিকে পুনরাবলোকনের ইচ্ছা করিলাম। সন্নিবেশিত নিবন্ধগুলিতে বিষয়টির বহুস্তর আলোচনা করিলেন মানবী মজুমদার, শুভোদয় দাশগুপ্ত, শ্রুতিনাথ প্রহরাজ, দেবাদিত্য ভট্টাচার্য, স্বাতী মৈত্র, আকাশ ভট্টাচার্য এবং দীপসিতা ধর

অন্যান্য বিভাগবর্গের কথা বলিতে গেলে প্রথমেই বলিতে হয় স্মরণের কথা। এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে বেশ কিছু কৃতী মানুষ আমাদিগকে ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে রহিয়াছেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, বিশিষ্ট চলচ্চিত্রবেত্তা গাস্তঁ রোবের্জ, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী পণ্ডিত যশরাজ, পুরাতাত্ত্বিক এবং লোকগবেষক চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত, সাহিত্যিক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কবি বিজয়া মুখোপাধ্যায়। স্মরণ করা হইল তাঁহাদের। সঙ্গে জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে স্মরণ করা হইল কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে।

দুটি ধারাবাহিক রচনা— মৃণাল চক্রবর্তীর উপন্যাস ‘সন্তোষ পাল’ এবং হিন্দোল ভট্টাচার্যের আত্মকথা ‘অসঙ্গতির সঙ্গত’-এর অন্তিম পর্ব প্রকাশিত হইল এই মেল ট্রেনে। এবং যাত্রা শুরু করিল অশোককুমার মুখোপাধ্যায়ের নতুন ধারাবাহিক স্মৃতিকথা ‘কলকাতা, নয়…’।

এই যাত্রা থেকে মেল ট্রেনে সংযোজিত হইল একটি নতুন বগি—উইন্ডো সিট। স্রষ্টা এই কামরায় বসিয়া আপন সৃষ্টি লইয়া কথা বলিবেন, আলোচনা করিবেন— এই উপলক্ষেই কামরাটির অবতারণা। আমাদের উইন্ডো সিটে প্রথম অধিষ্ঠান শিল্পী শুভেন্দু সরকারের।

তৎব্যতীত কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদ, অণুগল্প, অন্যগদ্য, ফটোফিচার সহ সব নিয়মিত বিভাগগুলি এবং স্টিম ইঞ্জিন, বিশেষ নিবন্ধ, হুইলার্স স্টল, ডিসট্যান্ট সিগনাল, ভালো খবর-এর মতো সমস্ত বিশেষ বিভাগগুলি রহিল যথারীতি।

পড়ুন, মতামত দিন, ভালো থাকুন…

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. শিক্ষা নীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। সেই দিক অত্যন্ত সময়োপযোগী প্রচেষ্টা।

আপনার মতামত...