মন্দির ওহি তোড়েঙ্গে: অযোধ্যায় ভাঙছে ইতিহাস এবং হিন্দুত্ব

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 


 লেখক গদ্যকার, প্রাবন্ধিক

 

 

 

 

শুরুতেই হোঁচট খাবেন না। একটু ইতিহাসটা ঝালিয়ে নিই। খুব পুরনো। যে দাপট নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আপনি, বা আপনি না হলেও আপনার পড়শি বা অফিসকর্মী সেই দাপট বজায় রাখতে গেলে, তল্লাটে ডেঁপো সেকুদের সঙ্গে তর্ক করতে গেলে একটু তো পড়াশুনো করতেই হবে দাদা। আসুন, ক্লাস করি।

১৮৭০ সালে অবধ সরকারের প্রেস থেকে তৎকালীন কমিশনার ও সেটলমেন্ট অফিসার পি কার্নেগির পক্ষ থেকে ‘The Historical Sketch of Tehsil Fyzabad, Zillah Fyzabad’ শীর্ষক একটি সমীক্ষা বেরোয় যেখানে অযোধ্যার ধর্মীয় গুরুত্ব বোঝাতে সমস্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির একটি তালিকা প্রকাশিত হয়।

কার্নেগি সেটলমেন্ট রিপোর্ট, ১৮৭০

এই রিপোর্টে অন্যান্য অসংখ্য মন্দিরের মতো প্রাসঙ্গিকভাবেই এসে যায় ‘জন্মস্থান’, ‘জন্মভূমি’ (বা রাম চবুত্রা) এবং সীতা রসুইয়ের মতো স্থাপত্যের নাম। তৎকালীন বাবরি মসজিদ সংলগ্ন এলাকা জুড়েই এইসব স্থাপত্যগুলির অবস্থান। হনুমানগড়ি থেকে দোরাহি কুয়া অবধি একটি রাস্তা মসজিদের অংশ থেকে মন্দিরগুলিকে আলাদা করে রেখেছে। এর একটি চিত্ররূপ নীচে দেওয়া হল:

কোট রামচন্দ্রে বাবরি মসজিদ, জন্মস্থান, জন্মভূমি ও সীতা রসুইয়ের ঐতিহাসিক এলাকা

জন্মস্থান। ১৭০১ সালে মোহান্ত রামদাস প্রতিষ্ঠিত ‘জন্মস্থান’ নামের সুবিখ্যাত মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলিম জমিদার মীর মাসুম আলির জায়গির দেওয়া একটি জমিতে। চমকে গেলেন? আই রিপিট। মুসলিম জমিদার মীর মাসুম আলির জায়গির দেওয়া একটি জমিতে। কোট রামচন্দ্র এলাকার এই মন্দিরটি অযোধ্যার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ এবং ঐতিহাসিক হিন্দু স্থাপত্য ছিল বলে কার্নেগি সাহেবের সেই রিপোর্টে দাবি করা হয়।

‘জন্মস্থান’: ৩১৯ বছরের পুরনো মন্দির

এছাড়াও ছিল ‘জন্মভূমি’ বা রাম চবুত্রা। ১৮৯৮ সালে পরবর্তীকালের সপ্তম এডওয়ার্ড বা সেদিনের প্রিন্স অ্যালবার্ট এডওয়ার্ডের জন্মবার্ষিকীতে তৈরি এডওয়ার্ড তীর্থ রক্ষিনী বিবেচিনী সভার পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ১০০০ টাকার অনুদান নিয়ে নিকটবর্তী মন্দির ও ধর্মীয় স্থানগুলির চিহ্নিতকরণের জন্য বেশ কিছু দিকনির্দেশক রাখার পরিকল্পনা করা হয়। জন্মভূমি এবং জন্মস্থান— এই দুটি শব্দ নিয়ে যাতে তীর্থযাত্রীদের মধ্যে কোনও দ্বিধা না তৈরি হয় তার প্রচেষ্টা করা হয়। মোট ১০৩টি জায়গা চিহ্নিত করা হয়। তারপর থেকে ঠিক এল আকৃতির একটি ব্যবধানে চিহ্নিত ছিল রাম চবুত্রা বা জন্মভূমি এবং সীতা রসুই। এছাড়াও ছিল বেশ কিছু ছোট বড় ঐতিহাসিক এবং বহু পুরনো মন্দির যেমন হনুমানগড়ি, আচারি, রানোপালি নানাকশাহি, রামগুলেলা, খাকি আখড়া ইত্যাদি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কার্নেগি রিপোর্ট অনুযায়ী এই হনুমানগড়ি প্রতিষ্ঠার অর্থ দিয়েছিলেন নবাব মনসুর আলি খান ১৭৬৭ সালে, তাঁর রাজকোষ থেকে। অর্থাৎ অযোধ্যার মন্দির স্থাপত্যগুলির প্রতিষ্ঠার পেছনে মুসলিম জমিদারদের প্রভূত সহযোগিতা ও অর্থানুকূল্যের দিকটি সুস্পষ্ট।

হনুমানগড়ি মন্দির

এবার ভাঙনের ক্রনোলজি। টার্গেট ‘জন্মস্থান’। ১৯৮৪ সালে মন্দিরের নিচের তলার রেসিডেন্সিয়াল অংশটি পোস্ট অফিস দখল করল। ১৯৯১ সাল থেকে মন্দিরের উপরের অংশটি থেকে বাবরি মসজিদের উপর নজরদারি করবার জন্য বসল পুলিশ কন্ট্রোল রুম। ১৯৯২ সালের সেই কুখ্যাত ৬ ডিসেম্বর করসেবকদের লম্ফঝম্প দেখবার জন্য নীরব থিয়েটার হলে পরিণত হয়েছিল সেই তথাকথিত পুলিশ কন্ট্রোল রুম। তাও আবার হিন্দু স্থাপত্যেরই একটি অংশের উপর বসে। আয়রনিটা ভাবুন। ১৯৯৩ সাল। নরসিংহ রাওয়ের সরকার থেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরি মসজিদ ও তার আশেপাশের এলাকা মিলে মোট ৬৭.৭০৩ একর জমি কিনে নেওয়া হল। আবার কোপ পড়ল জন্মস্থানের উপর। কারণ, মন্দিরের আরতি এবং ভোগের জন্য রান্নাবান্না এবং পূজারী ও কর্মীদের কাজকর্ম চলত মূলত এই এলাকাটিতেই। ক্রমশ ছোট হতে থাকল ঐতিহ্য। এবং অবশ্যই, এলাকাটি সরকার অধিগ্রহণ করলে ভেঙে দেওয়া হল ওই এলাকায় পড়া ছোটবড় বেশ কিছু মন্দির। দু বছর পিছিয়ে যাই। ১৯৯১ সাল। তৎকালীন কল্যাণ সিংয়ের নেতৃত্বে উত্তর প্রদেশের বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে ২.৭৭ একর জমি কেনা হয়, যার মূল লক্ষ্য হিসেবে বলা হয় তীর্থযাত্রীদের জন্য টয়লেট ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। এবং তখন ধ্বংস করা হয় সুমিত্রা ভবন, সঙ্কটমোচন, রাম জানকী মন্দিরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যকে। এবং শেষমেশ সেই কুখ্যাত ৬ ডিসেম্বর। জানা যায় বাবরি মসজিদ ধূলিসাৎ। যেকথা জানা যায় না তা হল, সেদিনই করসেবকদের তাণ্ডবে ধ্বংস হয় নির্মোহী আখড়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ঐতিহাসিক রাম চবুত্রা (‘জন্মভূমি’) এবং সীতা রসুই। এবং, ২০২০। ২৭ আগস্ট। রামমন্দির নির্মাণের ‘ঐতিহাসিক’ রায়ের প্রেক্ষিতে শ্রীরামজন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের দায়িত্বে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল ‘জন্মস্থান’। ৩১৯ বছরের ইতিহাস। হিন্দু সংস্কৃতির লেগ্যাসি।

কী পড়ে থাকল? বাবরি মসজিদ এলাকায় টিমটিম লন্ঠনের মতো অন্ধকার দেওয়া একটি জোড়াতালি রামলালা মন্দির। ঐতিহাসিক রায়। ৩৬০ ফুট দীর্ঘ, ২৩৫ ফুট চওড়া এবং ১৬০ ফুট উঁচু মেরা হিন্দু ভারত। কী চলে গেল? বছরের পর বছর জুড়ে অযোধ্যা আলো করে আসা তীর্থযাত্রীদের গন্তব্য সেইসব ছোটবড় মন্দির। ঐতিহ্য। স্থাপত্যরীতি। এবং অবশ্যই শাশ্বত গঙ্গা যমুনা সংস্কৃতি, যা জায়গির দেওয়া মুসলিম শাসকদের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিল পরিবার নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পুণ্যি করতে আসা হিন্দু তীর্থযাত্রীদের।

উঠে পড়ুন। ক্লাস শেষ…


ঋণস্বীকার : thewire.in

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...