পাবজি বা ফৌজি আসলে আমাদের মনস্তত্ত্বের নিয়ন্ত্রক

সুমন সেনগুপ্ত

 


লেখক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তুকার, সমাজকর্মী

 

 

 

 

চিনের সঙ্গে সীমান্তে ভারতের দ্বৈরথ চলছে বেশ কিছু দিন ধরে। তাহলে ভারত কি যুদ্ধে যাচ্ছে? এরকম অনেক প্রশ্ন অনেকের মাথায় ঘুরছে? ভারত কি পারবে এত বড় শক্তিধর একটা দেশের সঙ্গে যুদ্ধ করতে? করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ভুলে অনেকেই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার উন্মাদনায় ভুগছেন। কিন্তু সত্যিই কি যুদ্ধ হবে? নাকি ভারত সরকার যেভাবে পাবজি-র মতো কিছু অনলাইন গেম সহ বেশ কিছু চাইনিজ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন নিষিদ্ধ করছেন তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে নিজেদেরকে?

প্রথমে জেনে নেওয়া জরুরি এই পাবজি আসলে কিরকম ধরনের খেলা? সরকার কেন এই খেলাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল? এর মধ্যেও কি কোনও রাজনীতি আছে? এর পিছনেও কি কোনও উদ্দেশ্য আছে? নাকি সরকার চিনকে শিক্ষা দিতেই এই কাজটি করল?

এই পাবজি খেলা কিন্তু অনেকদিন ধরেই চলছিল। একদল আরেকদলকে মারছে। একজন আরেকজনকে নির্দেশ দিচ্ছে হেডফোনে ‘একটু বাঁদিক চেপে যা, সামনে নিচু জায়গায় বসে আছে আসল শত্রু।’ অন্যজন তাঁর নির্দেশ পালন করছে রাস্তায় চলতে চলতে। প্রয়োজনমত আরও কাউকে কাউকে ডেকে নিচ্ছে তাঁকে সাহায্য করার জন্য। খেলা চলছে। শত্রু চিহ্নিত করা চলছে। বেশিরভাগ সময়েই এই শত্রুরা সেই অর্থে ‘দেশের শত্রু’ আর যারা খেলছে তারা সবাই দেশপ্রেমিক। অনেকেই হয়তো খেলাটা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়, কিন্তু খেলা চলছে স্মার্টফোনে। দেশের একটা বড় অংশ এই খেলাতে মগ্ন। যাদের বয়স মূলত ১৫ থেকে ২৫। যাদের কথা ছিল দুঃসহ স্পর্ধা দেখানোর তাদেরকে নেশাগ্রস্ত করে রাখা হয়েছিল এই খেলা দিয়ে, যার নাম ‘পাবজি’ বা ‘প্লেয়ারস আনআইডেনটিফায়েড ব্যাটেল গ্রাউন্ড’। যেখানে কেউ কাউকে চেনে না কিন্তু সবাই শত্রুকে চেনে। কখনও কখনও একটা অলীক চরিত্র এসে বলে যাচ্ছে কেন এই শত্রুদের মারা উচিত।

শুধু এটা নয় আরও বেশ কিছু এরকম খেলা মোবাইলের জন্য তৈরি হয়েছে যা আরও সরাসরি দেশপ্রেমের কথা বলছে। যেমন ‘কাউন্টার স্ট্রাইক’, ‘ফোর্টনাইট’ ইত্যাদি যা আরও সরাসরি জাতীয়তাবাদ প্রচার করছে। যদিও বেশ কিছু রাজ্যে এই খেলাগুলো নিষিদ্ধ তবুও যেকোনও নিষিদ্ধ বস্তুরই তো আকর্ষণ বেশি হয়। তাই খেলা চলছে আর খেলার মধ্যে দিয়ে কখন আমাদের অজান্তেই আমরা হয়ে উঠছি জাতীয়তাবাদী। কী করে জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠছে তা নিয়ে হয়ত অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, কিন্তু একটু এই খেলাগুলোর মধ্যে প্রবেশ করলেই বোঝা যাবে এর সঙ্গে কীভাবে জাতীয়তাবাদ জড়িত। কীভাবে এর মধ্যে দিয়েও ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। কখনও কখনও শত্রুকে দেখানো হয় এই খেলার মধ্যেই, দৃশ্যগতভাবে সেই শত্রুকে মুসলমান, সন্ত্রাসবাদী হিসেবে দেখানোটা এই খেলারই অঙ্গ। সারাক্ষণ যদি একজন মানুষকে এইরকম কাল্পনিক সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় তাহলে সেই মস্তিস্কটিও অবচেতনে মেনে নেয় যে মুসলমান মানেই সন্ত্রাসবাদী। এর সঙ্গে ফেসবুক এবং হোয়াটস্যাপে যদি অনবরত বার্তা আসতে থাকে যে মুসলমানেরা অচিরেই সংখ্যাগুরু হয়ে যাবে, অচিরেই হিন্দুরা সংখ্যালঘু হতে পারে, তখন অবচেতনে যে জাতীয়তাবাদ তৈরি হয় পাবজি খেলার মধ্যে দিয়ে চেতনে তার বিকাশ ঘটে। এভাবেই একজন কিশোর অজান্তেই হয়ে ওঠে মুসলমান-বিদ্বেষী।

তা সত্ত্বেও কেন সরকার থেকে এই পাবজি নিষিদ্ধ করা হল? কিছুদিন আগে তাঁর ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে দেশকে আত্মনির্ভর হবার পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এই অবস্থায় বিদেশি মোবাইল অ্যাপলিকেশন দিয়ে এইসব অনলাইন মোবাইল গেম চালিয়ে নিয়ে গেলে মানুষ প্রশ্ন করতে পারেন। তাই আপাতত পাবজি মোবাইলে খেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এখনও কমপিউটারে খেলা যাবে। কাকতালীয়ভাবে হলেও সত্যি যে যেদিন পাবজি নিষিদ্ধ করা হয়েছে তার একদিনের মধ্যেই আরও একটি প্রায় একই ধরনের মোবাইল গেম আনা হয়েছে তার নাম ‘ফৌজি’। নাম শুনেই নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে যে কেন এটি এখনই আনা হল। আরও সরাসরি দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদ কিশোর এবং যুব মনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করাতে হবে। আমেরিকাতে একটি প্রায় একইরকমের একটি মোবাইল গেম চালু আছে, নাম ‘ফ্যানাটিকাল ফিউচারিস্ট’, ঘটনাচক্রে এই ভারতের ‘ফৌজি’র সঙ্গে এই আমেরিকার খেলাটির পোস্টারের হুবহু মিল আছে। নিন্দুকেরা বলছেন যে আত্মনির্ভরতার নামে চাইনিজ মোবাইল গেম নিষিদ্ধ করে একটি আমেরিকার গেমের নকল করে যদি আরও একটি গেম একটি ভারতীয় সংস্থা বানায়, তাহলে কি তাতে সত্যিই ভারতীয়ত্ব প্রকাশ হয়?

এখন দেশাত্মবোধ না দেখালেই সে দেশদ্রোহী। এখন প্রতিবাদ করার নাম “দেশদ্রোহিতা”।

কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন এতে অসুবিধা কোথায়? জাতীয়তাবোধ বা দেশপ্রেম কি খারাপ কিছু? তাঁদের জন্য রবীন্দ্রনাথের কিছু কথা বলা জরুরি। যে রবীন্দ্রনাথের জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে আমাদের এত গর্ব অহঙ্কার, সেই রবীন্দ্রনাথ কী বলেছিলেন এই জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে? উনি বলেছিলেন যে এই জাতীয়তাবাদ একটা ভয়ঙ্কর বিপদ যা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশের মূল অশান্তির জন্য দায়ী। ১৯০৮ সালে বলেছিলেন “দেশাত্মবোধ কক্ষনো আমাদের শেষ সম্বল হতে পারে না, আমার কাছে মনুষ্যত্ববোধ অনেক বড়। আমি কখনই হীরের দাম দিয়ে কাঁচ কিনতে পারবো না। আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন দেশাত্মবোধ কখনই মনুষ্যত্ববোধকে হারাতে পারবে না।” মহাত্মা গান্ধি চিরকাল বলেছিলেন সশস্ত্র দেশাত্মবোধ এক “অভিশাপ”। বিদেশে একটা প্রচলিত কথা আছে যে “মূর্খদের সর্বশেষ সম্বল হচ্ছে দেশাত্মবোধ”। রবীন্দ্রনাথ বা গান্ধিরা গত হয়েছেন দীর্ঘদিন। এখন দেশাত্মবোধ না দেখালেই সে দেশদ্রোহী। এখন প্রতিবাদ করার নাম “দেশদ্রোহিতা”। কখন যে মোদিবন্দনা আর দেশপ্রেম সমার্থক শব্দ হয়ে গেছে। আমরা প্রশ্ন করতে ভুলে গেছি যে এত কৃষকের মৃত্যুর জন্য কে দায়ী? আমরা প্রশ্ন করতে ভুলে গেছি বছরে ২ কোটি বেকারের চাকরি কোথায় গেল? আমরা প্রশ্ন করি না কেন আধারের কারণে আজও আমাদের দেশে মানুষ মারা যাচ্ছে? ব্যাঙ্গালোর দক্ষিণে বিজেপির প্রার্থী ২৮ বছরের তরুণ তেজস্বী সূর্য যখন বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন যে ‘আপনি মোদির পক্ষে না থাকলে আপনি দেশদ্রোহী’, তখন বোঝা যায় যে জাতীয়তাবাদ কত গভীরে প্রবেশ করানোর প্রক্রিয়া চলছে এবং তা কীভাবে কাজ করছে। যেকোনও কমবয়সি যুবকযুবতীদের কাছে চাকরির দাবি, শিক্ষার দাবি তখন গৌণ হয়ে গেছে। তার কাছে যখন দেশই আসল আরাধ্য তখন অন্য কোনওদিকে নজর যাতে না যায় তাই এই নেশা সূচ দিয়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করানো হচ্ছে অত্যন্ত কম বয়স থেকে। স্মার্টফোন সেই সূচ। চলছে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ ধরে প্রচার। মুসলমানেরা সন্ত্রাসবাদী, মুসলমানেরা ক্রমশ সংখ্যায় বেড়ে চলেছে। মুসলমানদের জন্যই অন্যান্য মানুষদের সবচেয়ে বেশি অসুবিধা হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। একজন ১৮ বছরের কিশোর/কিশোরীকে যদি রোজ এইরকমের বিভিন্ন মেসেজ পাঠানো হয়, সে বিশ্বাস করতে শুরু করে ঐ কথাগুলো। এবং এর বিপরীত যেকোনওরকমের কথাকেই তাঁর মনে হয় দেশদ্রোহী বা অ-দেশপ্রেমিক। খবর পাওয়া গেছে যে আমাদের রাজ্যের কোচবিহারেই দেশের শাসক দলের হয়ে কাজ করেন এমন মানুষ আছেন যিনি একাই ১৪০০টি হোয়াটসআপ গ্রুপ চালান এবং এর বিনিময়ে তিনি যথেষ্ট পারিশ্রমিকও পান।

করোনা পরবর্তী লকডাউনে বেশিরভাগ মানুষ গৃহবন্দি। তাঁদের অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আছেন, তাঁরা অনেকেই বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী অনলাইনে কিনছেন, এতে হয়তো অনেকে ভাবছেন যে তাঁরা করোনামুক্ত থাকতে পারবেন, কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে ছোট ব্যবসা যে বন্ধ হওয়ার মুখে, সে বিষয়ে কিন্তু অনেকেরই নজর নেই। বিভিন্ন জনবিরোধী আইন কিন্তু এই লকডাউনের মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকার পাশ করিয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন সমাজকর্মীদের গ্রেপ্তার করে রাখা হয়েছে। মানুষ কিন্তু কোনও প্রতিবাদ করতে পারছে না। মানুষকে একলা করে দেওয়া হয়েছে। শারীরিক দূরত্বের বদলে সামাজিক দূরত্ব শব্দবন্ধটি খুব সচেতনভাবেই আনা হয়েছে। যাতে প্রতিটি মানুষ একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন এবং একে অপরের পাশে না দাঁড়াতে পারেন। এটাও কিন্তু শাসকশ্রেণির খেলা। বিভাজনের খেলা, একলা সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে সেই জায়গায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে প্রতিটি মানুষকে। খেয়াল করে দেখুন, রাতারাতি নোটবন্দি করার মধ্যে দিয়ে এর শুরু, সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক একটি সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিটি মানুষকে আলাদা আলাদাভাবে তারা ব্যাঙ্কের সারিতে দাঁড় করিয়েছিল। কেউই তখন সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেননি, তারপর করোনার জন্য মাত্র ৪ ঘণ্টার নোটিসে লকডাউন ঘোষণা, সেই একই সূত্র কাজ করেছে শাসকশ্রেণির মাথায়। একদিকে একলা করে দেওয়া অন্যদিকে সেই একলা মানুষকে সামাজিক মাধ্যমে আরও বেশি করে ঢুকিয়ে ফেলা, যাতে সে প্রতিবাদও ওই মাধ্যমেই করে। ইদানীং ফেসবুক সহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমগুলিও বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। তারা কী বলছে সেটাও খেয়াল করা জরুরি। ‘মন খোলো পৃথিবী খুলে যাবে’। কিন্তু সত্যিটা আসলে কী? একজন মানুষ যত বেশি বেশি করে এই সামাজিক মাধ্যমগুলোতে থাকবেন তত তাঁর জগৎ খোলার বদলে আরও ছোট হবে, তাঁর পরিসর বাড়ার বদলে আরও সঙ্কীর্ণ হবে। যত সঙ্কীর্ণ হবে, সে তত আত্মকেন্দ্রিক হবে দিনে দিনে, তত বেশি বেশি করে সমাজচ্যুত হবে। সেখানেই শাসকশ্রেণি আবারও জিতে যাবে। সে তার জাতীয়তাবাদ এবং দেশপ্রেমের বড়ি আরও সহজে এই একলা মানুষকে খাওয়াতে পারবে। তাই কখনও পাবজি বন্ধ করে ফৌজি বা আরও অন্য অনেক স্মার্টফোনের অনলাইন খেলা প্রচলনের মধ্যে দিয়ে আসলে মানুষকে একলা করে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করাই শাসকশ্রেণির লক্ষ্য। সেই আসল খেলাতে প্রতিটি মানুষ কিন্তু এক একটি দাবার বোড়ে, যার নড়াচড়ার ক্ষমতাও সীমাবদ্ধ, যার ভাবনাচিন্তা করার জায়গাও সীমিত।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2616 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...