তিনটি অণুগল্প

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 

নো লকডাউন

বডি এসে পৌঁছেছে এই করোনাকালে, কলকাতার এক হটস্পটে। অনেকদিন বাদে বেশ সাজোসাজো রব যেন আবাসনে। বাইরের গেটগুলো ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করে খুলছে, বন্ধ হচ্ছে। নীচের সিকিউরিটিদের ইন্টারকম খারাপ এই দুর্দিনে। মেকানিক আসতে পারছে না। কী হয়েছে জানতেও পারবে না কেউ। বাইরে রাস্তার মোড়ে পরপর গার্ডরেল লাগিয়ে বন্ধ করা হয়েছে বস্তিবাসীদের বাইরে এসে দেদার আড্ডা দেওয়া। তার মধ্যেই ছমছমে এক আবহাওয়ায় মৃতদেহ এসে পৌঁছল। এক আবাসিকের স্ত্রী মারা গেছেন। হোয়াটস্যাপ গ্রুপে খবর পেল সবাই। আবাসিকরা নিজেদের মধ্যে কানাঘুষো করল। কোভিডে মারা গেলে তো বডি আসত না বাড়িতে। কেউ বলল, সে তো বটেই অতএব ধরে নাও কো-মরবিডিটি। তার মধ্যেই ঠাট্টা করে একজন মিম শেয়ার করল, কোমর-বিড়ি-টি গেল কোথায়?

একজন বলল, সিরিয়াসলি ভদ্রমহিলা ক্যানসারে ভুগছিলেন অনেকদিন। করোনার বাজারে কেমোর ওষুধ পাওয়া খুব মুশকিল হচ্ছে। একে একে ইরফান খান থেকে ঋষি কাপুর… কত কত ক্যান্সার পেশেন্ট মারা গেল দেখছ না?

আচ্ছা তুমি এই ভদ্রলোকের কথাই বলছিলে সেদিন? আত্রেয়ী লিখল।

অলকা লিখল, হ্যাঁ রে বাবা। তিনি আমাদের টাওয়ারের। রোজ ভোরে হাঁটতে নেমে দেখছি দুধওয়ালা সাইকেল রেখে গটমট করে কাঁচা দুধের ক্যান নিয়ে ঢুকছে। কিছু পরেই পেপারওয়ালা। তারপরেই কাজের মেয়েটিও। সিকিউরিটি বারণ করা সত্ত্বেও ঢুকে পড়ছে এরা।

স্বপ্না লিখল, ভদ্রলোক হোমরাচোমরা একজন। উচ্চপদস্থ আমলা। কারও সঙ্গে এমনিতে মেশে না কিন্তু নিজের হাতেই আইন তুলে নিয়েছেন। কথায় বলে না, কিং ক্যান ডু নো রং! আচ্ছা বল দেখি, কোভিড ভার্সেস ক্যানসার নিয়ে কত আলোচনা হচ্ছে টিভিতে, তা সত্ত্বেও এরা মানলেন না? কত রিস্ক ছিল এনাদের!

আত্রেয়ী লিখল, সেদিন আমি সিঁড়ি দিয়ে নামছি দুধের প্যাকেট আনতে, দেখি লিফট থেকে ঝাঁকায় করে ফল সবজি এল।

বলিস কী? অলকা লেখে। আর আমরা মরছি মেইনটেনেন্স দিয়ে। লিফট ইউজ করতে পারছি না। কোথায় কার ড্রপলেট ঘুরে বেড়াবে লিফটের মধ্যে, সেই ভয়ে।

স্বপ্না লিখল, আমি লিফটে উঠলে নিঃশ্বাস বন্ধ রাখছি।

অলকা লেখে এবার, তোমার তিনতলা বলে পারছ। আমার এগারোতলায় সেটা সম্ভব? দম আটকে মরেই যাব যে। কোভিডের ভয়ে শেষে হার্টফেল করে মরব।

আত্রেয়ী হাসির ইমোজি দিয়ে লেখে, আবার কো-মরবিডিটি হয়ে সংবাদের শিরোনামে যাবে। কোভিড কাউন্ট বাড়বে না।

জানিস তো আসলে এরাও সবাই আর ট্যাকল করতে পারছে না এই সিচ্যুয়েশন। এত লোক রাজ্যে! অলকা লিখল।

এবার মিম এক্সপার্ট জয়িতা লিখল, ধুস! কেউ কথা শুনছে না। এই লকডাউনের কোনও অর্থ নেই। হটস্পট একটা গিমিক। রেড জোন কনসেপ্ট ঢপের চপ। কেউ বুঝছেই না কিস্যু। বিকেল হলেই পুলিশের গাড়ির মধ্যে থেকে অনুরোধ শুনছ?

হ্যাঁ, ঘরের মধ্যেই লুডো খেলুন, তাস খেলুন, টিভি দেখুন, বই পড়ুন… রুটিন মোনোলগ।

গ্রুপ মেসেজ এল হঠাৎ করে। টেলিভিশনে নাকি দেখাচ্ছে আবাসনের সেই হোমরাচোমরার স্ত্রীয়ের মৃত্যু কোভিডেই হয়েছে।

জয়িতা, আত্রেয়ী, স্বপ্না, অলকা নিজেদের মধ্যে ফোনাফুনি শুরু করে দেয়। কী হবে এবার? তেনাদের মৃত্যুতে বডি দেওয়া হয়? আর সাধারণ মানুষের? এত লোক যে চলে যাচ্ছে! তাঁদের কেউ পেলেন না ফুল-মালা-চন্দন, কাছের মানুষের ছোঁয়া এমনকি একফোঁটা আগুন!

 

কিন্তু ততক্ষণে সেই ডেডবডি মহাসমারোহে ইলেকট্রিক চুল্লিতে লাল আগুনের তাতে।

 

শাস্তি

মহাষ্টমীর দুর্গামণ্ডপ। সাজো সাজো রব সেখানে। ধূপধুনোর গন্ধে, ফুলের সুবাসে চরিদিকে পুজো পুজো গন্ধ যেন উথলে উঠছে। নতুন জামাকাপাড়ের গন্ধে, পাটভাঙা শাড়ির শব্দে সবার আনন্দ দেখে কে! ওদিকে এই বারোয়ারি প্যান্ডেলের প্রথা মেনে চলছে কুমারী পুজোর এলাহি আয়োজন। দূরে বসে আছে মঞ্চের ওপর ছোট্ট কুমারী। প্রতিমার মত ঢলঢল রূপ তার। মাথায় ফুলের মুকুট, গলায় ফুলের মালা। হাতে চুড়ি। টুকটুকে লাল ফ্রকের ওপরেই নতুন শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে কেউ। মাথায় তার জড়ির কাজ করা ওড়না। হাঁটু মুড়ে কী সুন্দর বসে আছে সে। নিজের মনে দু হাতের চুড়ি নিয়ে খেলছে। ওর নাম কুসুম। সত্যিই নরম, নিষ্পাপ ফুলের মত মেয়ে। মায়াবী মুখ। চোখ দুটো তার যেন হাসে। ঠোঁটের কোনায় আলগা হাসি মাখানো। হাসলে ডান গালে ঈষৎ টোল পড়ে। মহাষ্টমীতে প্রতিমা দেখতে এসে সবার নজর সেই কুমারীর দিকে, দেবীজ্ঞানে যার পুজো হবে সেদিন। কুসুমই কুমারীপুজোর মধ্যমণি। পুজোর সব আয়োজন শেষ। পুরোহিতমশাই বললেন এবার শুরু হবে কুমারী পুজো। সবাই প্রস্তুত হোন। পুজো আয়োজকরা মাইকে অ্যানাউন্স করলেন, সবাই যাতে প্যান্ডেলে এসে কুমারী পুজো দেখেন, অঞ্জলি দেন। খুব ভিড় হতে থাকল। মঞ্চে পুরোহিত মাইকে রীতিমত শব্দ করে মন্ত্রোচ্চারণের দ্বারা পুজো শুরু করেছেন সবেমাত্র। গুরুগম্ভীর পবিত্র পরিবেশ। পবিত্র নিষ্পাপ কুসুমের চোখেমুখে জোরালো আলো পড়ে যেন আরও উজ্জ্বল দীপ্তি ঠিকরে বেরুচ্ছে। কিছু পরেই পুরোহিত যজ্ঞে আহুতি দেবেন। তার আগে পুষ্পাঞ্জলি সেরে নিতে চান তিনি। আজ সবাই কুমারী কুসুমকেই দেবীরূপে বরণ করেছে। অতএব তার জন্য‌ই অঞ্জলি দেবে সবাই। কুসুমের কিছু দূরে বসে তার মায়ের চোখে জল। ঘন ঘন চোখ মুছছেন তিনি। হয়ত মেয়েকে দেবীর মত লাগছে তাই এ হল মায়ের আনন্দাশ্রু। কত পুণ্যি করলে মেয়ে কুমারীপুজোয় বসে। সবার ভাগ্যে হয় না এমন। সবাই কুসুমের মায়ের কান্না দেখে তাই বুঝি বলাকওয়া করছে। পুরুতমশাই বললেন, সবাই হাত ধুয়ে ফুলবেলপাতা নিন। এবার শুরু হবে মহাষ্টমীর অঞ্জলি। একদিকে ছেলেদের লাইন, পাশে মেয়েদের। তার মাঝখান দিয়ে হঠাৎ দু-চারজন লোক কাকে যেন ধরে বেঁধে রীতিমত টানতে টানতে নিয়ে এল। ওমা! এ তো পাড়ার রিকশাওয়ালা ভোম্বল। সবার মনে আছে সেই ঘটনাটা এখনও দগদগে ঘায়ের মত। ভোম্বল ইস্কুল নিয়ে যায় পাড়ার ছোট ছোট মেয়েদের। কুসুমকেও নিয়ে যেত সেইসঙ্গে। তবে এখন আর যায় না। শ্রীঘর থেকে পুলিশ পাহারা দিয়ে, বিশেষ অনুমতি নিয়ে ভোম্বলকে সেদিন মহাষ্টমীর মণ্ডপে হাজির করা হয়েছে শুধুমাত্র কুসুমের পায়ে ফুল ছুঁড়ে অঞ্জলি দেবার জন্য। অঞ্জলি দিয়েই আবার তাকে পৌঁছে দেওয়া হবে পুলিশ ভ্যানে। তার ঠিকানায়, আলিপুর জেলে। মাস ছয়েক আগে রিকশায় শুধু কুসুম যাচ্ছিল তার ইশকুলে। কুসুমের স্পেশাল ইশকুল। অন্যদের মত নয়। তার সেদিন ছুটি ছিল না। দুপুরে ফেরার সময় ভোম্বল তাকে নিয়ে গেছিল নিরিবিলি এক নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাট বাড়ির মধ্যে। কুসুমের সরল মন বোঝেনি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তার ভোম্বলকাকা। ভোম্বল স্তোক দিয়েছিল তাকে। আর তারপর ফুটফুটে কুসুমের নরম যোনির মধ্যে বারেবারে প্রবেশের চেষ্টা করেও ক্ষান্ত দেয়নি ভোম্বল। একরত্তি মেয়েটার ওইটুকুনি শরীর তছনছ করে দিয়েছিল নিমেষে। ভাগ্যিস সেদিন কুসুমের প্রচণ্ড গোঙানিতে আশেপাশের লোকজন ছুটে এসেছিল নয়ত মেয়েটা বুঝি মরেই যেত। সবাই মিলে কুসুমকে হাসপাতালে নিয়ে গেছিল  আর ভোম্বলকে সোজা থানায়। সেখান থেকে শ্রীঘর হয়েছিল তার ঠিকানা।

সেদিন মহাষ্টমীর পুণ্য তিথিতে কুসুমের হল পুনর্জন্ম।

সর্বসমক্ষে তার পায়ে ফুল ছুঁড়ে অঞ্জলি দিয়েছে তার ধর্ষক, ভোম্বল যার নাম। পঞ্চপ্রদীপের আলোয় কুসুমকে উদ্ভাসিত করতে বাধ্য করেছে পাড়ার লোকজন। কুসুম বোঝে না। বেচারা। ভোম্বলকে দেখে শুধু গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠেছে… অ্যাঁ অ্যাঁ করে। বেচারা কুসুম। জন্ম থেকেই বোবা এবং কালা যে। এর বেশি সে আর বলবেই বা কী করে?

 

সোনামার পোকামন

ভাদ্র মাস পড়েছে। বাগানের সব ঘাসফুল, রেইন লিলির পাতা খেয়ে সাফ করছে শুঁয়োপোকা। বড় অশান্তি।

সোনাগলা রোদ্দুরে সোনামা সেঁকছেন দুষ্প্রাপ্য ব‌ই। ব‌ইয়ের পাহাড়ের কোলে সোনামা। অজস্র পোকা পাতায় পাতায়। পাতাগুলো খুলতেই বেরিয়ে এল রুপোর মত চকচকে সিলভারফিশ। একদিকে হিট স্প্রে কর অন্যদিকে আবারো পোকা। সর্বাঙ্গে ব্যথা। ওষুধ দেব কোথা? ওষুধ দেন ব‌ইয়ের মলাটে, পাতায় পাতায়। আলমারির কোনায় কোনায় রাখেন ন্যাপথলিন, ওডোনিল। চলে পোকার বারমাস্যা। ঢাকাই, বালুচরির ভাঁজে একটা কাপড় কাটার দুমুখো পোকা পেয়েছেন। সকালে উচ্ছে কাটতে গিয়ে ঘুমন্ত সাদা পোকা দেখেছেন। জলখাবারের ময়দা মাখতে গিয়েও দেখলেন কৌটোবন্দি ধবধবে সাদা ময়দার মধ্যে কালো পোকা গুটিগুটি হেঁটে যাচ্ছিল। রাঁধতে গিয়ে হলুদ গুঁড়োর বয়ামে পোকা দেখেছেন। সোনামা জানেন, পোকা মারতে হলুদ গুঁড়ো ছড়ানোর কথা। তবে সর্ষের মধ্যেই ভূত? হলুদ খেতে বলছে। ক্যান্সার হবে না। সেই হলুদেও পোকা? বার্মাটিকের ব‌ইয়ের আলমারির একপাশেও উইপোকা চেষ্টা চালিয়ে বিফলমনোরথ হয়ে রণে ভঙ্গ দিয়েছে। আরেকটি কাঠের আলমারির তাকে ঘুণ। স্প্রে করতেই ঘুণপোকাটা ফড়ফড় করে বেরিয়ে এসেই ফুড়ুত। ব‌ইয়ের সমুদ্রে বসে হঠাৎ নিজের মাথাটা চুলকে উঠল। উকুন নয়ত?

ফোনের চার্জ দেওয়ার প্লাগপয়েন্টের গর্তে বোলতার বাসা। মাটি দিয়ে সিল করে ফেলেছে প্লাগের গর্ত। তাকে পেন্সিল দিয়ে খুঁচিয়ে পরিষ্কার করেন। বাপ্‌রে বাপ্‌! সংসার যেন আদাজল খেয়ে সোনামার পেছনে লেগেছে। এবার রান্নাঘরে এগুতেই তাকের পাশ থেকে বিনবিন করে কুট্টি কুট্টি আরশোলা। ডিম ফুটেছে। এত চেষ্টা করেন রান্নাঘর পরিষ্কার রাখতে। তবুও!

কাজ করতে করতে খিদে পেয়েছিল। একটা পাকা পেয়ারায় কামড় বসিয়েই কী মনে হল, চেয়ে দেখেন পেয়ারার মধ্যে থেকে গদগদ করে বেরিয়ে আসছে সাদা কুচো কৃমির মত লকলকে পোকা। ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ভাবেন কোনও পোকা কি তবে তাকে ছাড়বে না আজ?

সংসারের সব পোকা আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে সোনামাকে। এর হাত থেকে আমৃত্যু নিস্তার নেই। বন্ধুত্বে, রাজনীতিতে, সম্পর্কে, সংসারে, জীবনযাপনে সর্বস্তরে এমন সব পোকার বাস। পোকা দেখতে ছোট কিন্তু সব্বনাশ অতি বড়।

ভাগাড় কাণ্ডের পর মাছ, মাংস, ফল, সবজি কিছুতেই আর বিশ্বাস নেই। সদা ভয় হয়, হারাই, হারাই। মাছভাজার সেই ভিডিওটা। হোয়াটস্যাপে ভাইরাল। দেখতে তাজা মাছ। গরম তেলে ছাড়তেই ভেতর থেকে কিলবিল করে বেরিয়ে আসছিল সাদা সাদা জ্যান্ত পোকা।

সংসারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গর্ত এমন। কত জায়গায় আর ওষুধ দেবেন? সবকিছুতেই ওপরে কোঁচার পত্তন আর ভেতরে ছুঁচোর কেত্তন। ভাবতে ভাবতেই পায়ের কাছে যেন একটা বাদামী রংয়ের ছারপোকা। ঠিক দেখছেন তো? হাতে টিপে মেরেই গন্ধ নিলেন নাকে। হ্যাঁ, যা ভেবেছেন তাই। সেই গন্ধ যুগ যুগ ধরে লেগে আছে ছারপোকাদের গায়ে।

পোকাদের সঙ্গে দিনযাপনের পরেই সোনামা হঠাত একদিন চুল আঁচড়াতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন তাঁর কপালের দুপাশে দুটি শুঁড়ের মত কি যেন গজিয়েছে। আয়নার সামনে দেখতে গেলেন তিনি। সেগুলি কি মাথার চুলের ই অংশ নাকি পোকাদের মত আবার অ্যান্টেনা উৎপন্ন হল? সোনামা কি নিজেও তবে পোকা হয়ে গেলেন?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2689 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...