রাজপথে-ফুটপাথে-অলিগলিতে অন্য রূপে নারী

দিগন্ত শর্মা

 

মূল অসমিয়া থেকে ভাষান্তর: শহিদুল হক

 


লেখক পেশায় সাংবাদিক। গুয়াহাটির বাসিন্দা। রাষ্ট্রসঙ্ঘের ‘জনসংখ্যানিধি ও পপুলেশন ফার্স্ট’, মুম্বাইর ‘লাডলি মিডিয়া ফেলোশিপ’ লাভ করেছেন। বর্তমান প্রতিবেদনটি সেই ফেলোশিপের অংশ। প্রতিবেদনে প্রকাশিত মন্তব্য সাংবাদিকের নিজস্ব। মন্তব্যের সঙ্গে উক্ত প্রতিষ্ঠান জড়িত নয়।

 

 

রাজপথের পাশে রাখা একটি রিকশার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মহিলা। যাত্রীর অপেক্ষায় নয়, বরং গ্রাহকের অপেক্ষায়। রিকশাটিতে সাজিয়ে রাখা ছিল বিভিন্ন ধরনের ফলমূল। কয়েক রকমের কলা, আনারস, আপেল, ডালিম ইত্যাদি ফল বিক্রির জন্য রিকশাটিকে রূপান্তরিত করা হয়েছিল একটি ভ্রাম্যমান দোকানে— যেখানে বিক্রেতা একজন মহিলা। গুয়াহাটি মহানগরীর হাতিগাঁও অঞ্চলের রাজপথের পাশে ভ্রাম্যমান ফলের দোকানের বিক্রেতা এই মহিলার নাম ভানুমতী রায়। কোচ রাজবংশী জনগোষ্ঠীর বছর সাতচল্লিশের এই মহিলা যে রিকশাটিতে ফলমূল বিক্রি করছেন, সেটি চালাতেন তার স্বামী প্রফুল্ল রায়। ৫৫ বছর বয়সী প্রফুল্ল রায়ের জন্য রিকশাটি ছিল জীবনের চালিকাশক্তি। প্রফুল্ল-ভানুমতীর মূল বাড়ি পশ্চিম অসমের ধুবড়ি জেলার গোলকগঞ্জ অঞ্চলে। দুই সন্তান নিয়ে কোনও এক দিন তারা চলে এসেছিলেন গুয়াহাটিতে। মহানগরীর হাতিগাঁও এলাকায় ভাড়া করা ঘরে থেকে প্রফুল্ল রায় চালাতেন রিকশা আর ভানুমতী কয়েকটি পরিবারে গৃহশ্রমিকের কাজ করে দিনগুজরান করতেন। নিজের রান্নাঘর থেকে শুরু করে অন্যের রান্নাঘর সামলানো, কাপড় কাচা, ঘর পরিষ্কার করা— সব কাজই করেন ভানুমতী। নবম ও সপ্তম ক্লাসে পড়া দুই সন্তানের জীবন গড়ে তোলার জন্য প্রফুল্ল রায় হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে রিকশায় দিনভর যাত্রী টেনেছেন, ভানুমতী অন্যের ঘরে গৃহপরিচারিকার কাজ করেছেন। এভাবেই অব্যাহত ছিল তাদের জীবনযুদ্ধ। কিন্তু গত মার্চ মাসে কোভিড-১৯ সংক্রমণ রোধ করার নামে সরকার ঘোষিত দেশব্যাপী লকডাউন স্তব্ধ করে দিল প্রফুল্ল-ভানুমতীর জীবন। রিকশা বন্ধ করতে হল, ভানুমতীকেও কাজ থেকে অব্যাহতি দিল পরিবারগুলি। হাতে জমা থাকা টাকাকড়িও শেষ হল। ঘরভাড়াও জমতে থাকল। লকডাউনও দীর্ঘায়িত হতে থাকে। রিকশা নিয়ে আর বেরোতে পারেন না প্রফুল্ল। বেরোলেও মানুষ ওঠেন না রিকশায়। একদিন রিকশা বার করতেই লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে পুলিশ। সেদিন থেকেই রিকশার চাকা আর ঘুরল না। এমতাবস্থায় ভানুমতী সিদ্ধান্ত নিলেন, লকডাউনের সময়ে রিকশায় ফলমূল নিয়ে বিক্রি করবেন পথের ধারে। যে সময় পুরুষ মানুষ কেউ ব্যবসা করলে পুলিশ লাঠিপেটা করে, সে সময়ে ভানুমতী পথের ধারে রিকশা রেখে ফলের দোকান আরম্ভ করলেন। ভানুমতী আমাদের বললেন, ‘আমার কর্তা দোকানে থাকলে পুলিশ এসে বাধা দেয়, কিন্তু আমি থাকলে ওরা কিছু বলে না। একদিন আমাকেও বাধা দিয়েছিল। কিন্তু আমি প্রতিবাদ করে বলি যে, যদি আমরা কিছু না করি তো আমাদের জীবন চলবে কী করে? স্বাস্থ্যবিভাগের নিয়ম মেনে আমি দোকান করেছি, মহিলা হিসেবে নিজের পরিবার চালানোর জন্য কিছু একটা করতে হবে তো, আমাকে বাধা দেবেন না। বর্তমানে আমি ব্যবসা করে যা উপার্জন করি তাতেই আমাদের সংসার চলছে। আমার স্বামী কাজহারা হবার পর থেকে আমিই সংসারের ভার সামলাচ্ছি।’

উল্লেখ্য, লকডাউনের সময়ে রাস্তাঘাটে বহু পুরুষ পুলিশি নির্যাতনের শিকার হওয়ায় এমন সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করতে গিয়েও পিছু হটতে হয়েছিল। তাই এগিয়ে আসতে বাধ্য হতে হয়েছিল বাড়ির মহিলাদের। মহিলা হওয়ার সুবাদেই কর্মরত পুলিশকর্মীদের নির্যাতন থেকে নিজেকে রক্ষা করে গুয়াহাটি মহানগরীর রাস্তাঘাটে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন তারা। ভানুমতী রায়ও তেমন একজন মহিলা। লকডাউনে আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে যাবার পরও পুলিশি নির্যাতনকে উপেক্ষা করে স্বামীর রিকশাটিকে অবলম্বন করে চালিয়ে নিয়ে গেলেন জীবন-জীবিকার চাকা। লকডাউনের প্রেক্ষিতে ভানুমতী রায় এমনই একজন মহিলা যিনি বিশেষভাবে মহিলাদের জন্য চিহ্নিত গৃহশ্রমিকের কাজ হারিয়েও সাহসের সঙ্গে এই রাজপথের ধারে বিপদকে উপেক্ষা করে জটিল পরিস্থিতিতে অব্যাহত রেখেছেন আর্থিক সংগ্রামের যাত্রা। অর্থাৎ লকডাউনের পরিপ্রেক্ষিতেই ভানুমতীকে পরিবর্তন করতে হয়েছিল বৃত্তি।

একই রকমের গল্প গোলাপী দাসের, যিনি মূলত বড়পেটা জেলার পাঠশালা অঞ্চলের লোক। লকডাউনের সময়ে যাকে দেখা গিয়েছিল গুয়াহাটি মহানগরীর বিভিন্ন প্রান্তে একখানা তিন চাকার ঠেলাগাড়িতে শাক-সবজি বিক্রি করে ঘুরতে। ৫৭ বছরের গোলাপী দাসও ছিলেন একজন গৃহশ্রমিক। লকডাউন ঘোষণা করার পর গোলাপী দাসকে তার নিয়োগকর্তা পরিবারগুলো কাজ থেকে অব্যাহতি দেয়। অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করা এই মহিলা শ্রমিক তার স্বামীর সঙ্গে বাস করেন গুয়াহাটিতে একটি ভাড়া ঘর নিয়ে। দিনমজুর স্বামী কাজহারা হলেন এবং লকডাউনের সময়েও কোনও কাজ পাননি। কদিন জমা পুঁজি দিয়ে ঘর চলল, কিন্তু ধীরে ধীরে খাওয়া ও ঘরভাড়া দেওয়ার জন্য অর্থের অভাব দেখা দিল। গোলাপীর স্বামী একদিন দৈনিক একশো টাকায় একটি ঠেলা ভাড়া করে পথের ধারে শাক-সবজির পসরা সাজিয়ে বসেন। পুলিশ তাকে বাধা দেয় ও পিঠে লাঠি দিয়ে আঘাতও করে। দুদিন পর সেই ঠেলাটি নিয়ে গোলাপী দাস নেমে এলেন পথে। একজন সবজি বিক্রেতার কাছ থেকে অল্প কম দামে কিছু শাকসবজি কিনে নিয়ে ঠেলা সাজিয়ে বিক্রি করতে বেরোলেন তিনি। পুলিশের লোকজন বাধা দিতে এলে গোলাপী তাদের সঙ্গে তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হন। এভাবে লড়াই করে পথে পথে ঠেলা নিয়ে শাকসবজি বিক্রির কাজ চালিয়ে গেলেন। গোলাপী দাসকে লকডাউনের জন্য শুধু বৃত্তি পরিবর্তন করতে বাধ্য হতেই হয়নি, তাকে লিপ্ত হতে হয়েছে এক আর্থিক সংগ্রামেও। ঠেলা টেনে টেনে ব্যবসা করাটা কেবল পুরুষেরই কাজ বলে যে চিরায়ত ধারণা, তাকে নস্যাৎ করে মহিলা হিসেবে গোলাপী দাস অন্য এক পথের দ্বার উন্মুক্ত করেছেন। পথে ব্যবসা করাটা লকডাউনের বিধি মোতাবেক নিষিদ্ধ ছিল যদিও, গোলাপী দাস এই প্রশাসনিক বাধা অতিক্রম করে সক্ষম হয়েছিলেন পথের দখল নিতে। যে কাজটি তার স্বামী করতে পারছেন না, সেই কাজটি অব্যাহত রেখেছিলেন গোলাপী। তিনি বলেন, “লকডাউনের ফলে আমার জীবিকা পরিবর্তন করতে হল। আগে লোকের বাড়ি বাড়ি ঘরোয়া কাম-কাজ করার চেয়ে এখন নিজেকে বেশি স্বাধীন বলে মনে হচ্ছে। নিজের মতো করে ব্যবসা করছি, উপার্জন কম হচ্ছে কিন্তু মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছে, পথচারীর সঙ্গে আলাপ হচ্ছে। মনের কথা খুলে বলতে পারছি। লকডাউনের জন্য রোজগার অনেকটাই কমে গেছে। কিন্তু নিজের ঘর ও অন্যের ঘরের চার দেয়ালে আবদ্ধ থাকা মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া ঘর মোছা, বাসন-কাপড় ধোয়া ইত্যাদি কাজ থেকে বেরিয়ে অন্য এক খোলা জায়গা পেয়েছি। পুলিশ ব্যতিব্যস্ত করার চেষ্টা করে যদিও, মহিলা হবার জন্য বিশেষ কিছু বলে না। স্বামী সকালের দিকে এসে কাজে সাহায্য করে চলে যান, আমি দিনভর ঠেলা টেনে টেনে অলি-গলিতে শাক-সবজি বিক্রি করি।”

৫২ বছর বয়সী সবিতা গড়। মহানগরীর নারেঙ্গি-চন্দ্রপুর সংযোগী পথের খাঙ্কর এলাকায় এই মহিলাকে দেখা গেছে কচু, বাঁশ-কড়ুল, কলার মোচা, কলমি ইত্যাদি নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসে আছেন। লকডাউনের সময়ে এই রাস্তায় যদিও লোকজনের চলাচল খুব কমই ছিল, তবুও তিনি অপেক্ষায় বসে থাকতেন কেউ না কেউ এসে তার সামগ্রীগুলো কিনে নেবে। এই শাকসবজিগুলো বিক্রি করে যে যৎসামান্য উপার্জন হবে তা এই পরিবারের একদিন বা দু দিন বেঁচে থাকার সম্বল। কামরূপ (মেট্রো) জেলার অন্তর্গত পুব-খাঙ্কর গ্রামের বাসিন্দা সবিতা গড়কে রাজপথের ধারে লকডাউনের সময়ে সামান্য কয়েক পদ বস্তু নিয়ে বসতে হয়েছিল কেন? এর আগে নির্দিষ্ট এই স্থানে কোনও মহিলাকে দেখা যায়নি শাকসবজি নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসতে। লকডাউনে পথের ধারে ছোটখাটো ব্যবসাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও সবিতা গড় এলেন কোত্থেকে? এই প্রসঙ্গে সবিতার বয়ান— “আমরা ছোট একটি ফ্যাক্টরিতে কাজ করছিলাম। লকডাউন ঘোষণার পর সেই কাজ আর থাকল না। কাজ নেই তাই স্বামীও মজুরি পান না। একদিন আমার স্বামী রাজু গড় জঙ্গল থেকে কিছু বাঁশ-কড়ুল, কচু, কলার মোচা ইত্যাদি সংগ্রহ করে এনে রাজপথের ধারে বিক্রি করার জন্য নিয়ে বসেছিলেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে তাড়িয়ে দিল, সবজিগুলো পথের ধারে পড়ে রইল। তারপর আমি এসে এগুলো নিয়ে বসলাম। আমার সঙ্গে আরও তিনজন মহিলাও এলেন। আমরা খুবই গরিব লোক, দিন আনি দিন খাই। দু দিন উপার্জন না করলে উপোস থাকতে হয়। তাই করোনায় মরার চেয়ে পুলিশের লাঠির আঘাতে মরাটাই ভালো মনে করে আমরা তিন মহিলা বনজ শাকসবজি নিয়ে বিক্রি করতে বসলাম। পুলিশ বাধা দিল, বুঝিয়ে বললাম, আমরা মেয়েমানুষ এখানে না বসলে বাচ্চাকাচ্চাদের কী খাওয়াব? কী করে বাঁচব যদি দু পয়সা উপার্জন না করি? দেখলাম সঠিক পথেই এগোচ্ছি, মহিলা হওয়ার কারণে পুলিশ বিশেষ কিছু বলল না। সেদিন থেকে আমরা তিন মহিলা এই পথের ধারে দোকান নিয়ে বসি। পুরুষরা জঙ্গল থেকে বস্তুগুলো সংগ্রহ করে এনে দেয়। পুলিশের লাঠির ভয়ে ওরা ঘরে থাকে, আমরা মহিলারা বেরিয়ে এসেছি।”

এই খাঙ্কর এলাকায় সবিতা গড়ের সঙ্গে বছর ৫০-এর অন্য একজন মহিলা গীতা দর্জি একটি শিশুকে নিয়ে বসেছিলেন পথের ধারে। একইভাবে কৌশল্যা গোয়ালা নামের এক ৭০ বছরের বিধবা বৃদ্ধাকেও বনজ শাকসবজি নিয়ে বসতে দেখা গেছে এই স্থানে। পুত্র-পুত্রবধূ থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনভাবে একাকী জীবন-যাপন করা কৌশল্যা অন্যের ঘরের কাম-কাজ করে দিনগুজরান করতেন। লকডাউনে তিনিও কাজ হারিয়ে বৃত্তি পরিবর্তন করে পথের ধারে কচু ইত্যাদি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। পাশের পাহাড়ে বনজ শাকসবজি সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণের ভয়ে বেশিক্ষণ পাহাড়ে থাকতে পারেন না। তবুও বাঁচার তাগিদে রাজপথে সরলভাবে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছেন এই বৃদ্ধা। পুত্র ও পুত্রবধূর উপর নির্ভর না করে সত্তর বছর বয়সী এই বৃদ্ধা কঠোর লকডাউনের সময় প্রশাসনের কঠোরতাকে প্রত্যাহ্বান জানিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বহু পুরুষই লকডাউনের সময়ে পথের ধারে দোকান নিয়ে বসতে না পারলেও কৌশল্যা, গীতা, সবিতাদের মতো নারীরা পথ দখল করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

একইভাবে গুয়াহাটির বোন্দা এলাকায় বেশ কজন মহিলা পথের ধারে অব্যাহত রেখেছেন বিকিকিনি। চন্দ্রপুর-নারেঙ্গি বাইপাস হাইওয়ের হাজংবোরি এলাকায় দেখা হয় ৫৫ বছর বয়সী মইনা উপাধ্যায়ের সঙ্গে— যিনি লকডাউনের সময় পথের ধারে শাকসবজির ছোট পসরা নিয়ে বসেছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, “এই সবজির দোকানটা চালাতেন আমার স্বামী কালীনাথ উপাধ্যায়। কিন্তু লকডাউন হয়ে যাওয়ায় দোকানটি কিছুদিন বন্ধ রাখতে হল। আমাদের উপার্জনের বিকল্প না থাকায় একদিন স্বামী এসে দোকান খোলেন। প্রশাসন বাধা দেয়। তারপর থেকে দোকানটিতে আমি বসতে শুরু করলাম। পুলিশ আমাকে বিশেষ কিছু বলেনি। তখন থেকেই দোকানটা আমি চালিয়ে যাচ্ছি। স্বামীকে ঘরেই থাকতে হচ্ছে। কখনও বা পাহাড়ে গরু চরাতে যান, এছাড়া আর কিছু কাজ নেই তার। তিন কন্যা সহ আমাদের পাঁচ জনের সংসার এখন আমার উপরই নির্ভরশীল।”

উল্লেখ্য, জীবিকার ক্ষেত্রে এই লকডাউন লিঙ্গভিত্তিকভাবে যে প্রভাব ফেলেছে তার উদাহরণ শুধু মইনা, ভানুমতী, গীতা, সবিতা, গোলাপীরাই নন, কামরূপ জেলার বিভিন্ন প্রান্তে এমন বহু নারীদের দেখা যায় রাজপথে বা অলিগলিতে ঠেলা-রিকশা করে ফলমূল, শাকসবজি, মাছ ইত্যাদি বিক্রি করতে বেরিয়ে পড়েছেন। একদল তিনচাকার ঠেলায় পসরা সাজিয়ে ব্যবসা করছেন আরেকদল ফুটপাথে নিয়ে বসেছেন ঘরে তৈরি বিভিন্ন রকমের সামগ্রী। ইতিপূর্বে এই মহিলাদের গুয়াহাটির রাজপথে কোনওদিনই রিকশা বা ঠেলা টেনে নিয়ে যেতে দেখা যায়নি। কিন্তু লকডাউনের প্রভাবে যখন বাড়ির পুরুষদের ঘরে বসে পড়তে হয়েছে বা শ্রমজীবী মহিলারা নিজেরাই ‘নির্দিষ্ট কাজ’ হারিয়ে বসেছেন, তখন এমন মহিলারাই বাধ্য হয়েছেন ঠেলা-রিকশা নিয়ে বা ফুটপাথে বসে ব্যবসা শুরু করতে। লকডাউনের দিনগুলোতে চানমারি-বামুনিমৈদাম রোডে এক মহিলা ডাব-নারকেল কেটে কোনও অভিজাত মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছেন, এই ছবিও দেখা গেছে। এই দৃশ্যগুলো প্রমাণ করে যে পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট বা সমাজে স্বীকৃত কিছু কিছু কাজ লকডাউনের প্রভাবে মহিলারা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা এক অনন্য নিদর্শন। দেখা গেছে এই কাজে স্বনিয়োজিত হওয়া মহিলাদের পাশে পুরুষরা সততই অনুপস্থিত। যেভাবে কামরূপ (মেট্রো) জেলার পথে ও অলিগলিতে মহিলা ব্যবসায়ীদের আধিপত্য দেখা যাচ্ছে তার বিপরীতে পুরুষদের পশ্চাৎপসরণ লক্ষ করা গেছে। একই সময়ে এইভাবে পথেঘাটে খোলামেলা ব্যবসাতে স্বনিয়োজিত হওয়া মহিলাদের অধিকাংশই লকডাউনের ঠিক আগে পর্যন্ত ঘরের চারদেয়ালের গণ্ডিবদ্ধ জীবনে আবদ্ধ ছিলেন। যাদের বেশি অংশই নিজের ও অন্যের ঘরে ব্যস্ত ছিলেন মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট কাজগুলো নিয়ে। এমনকি গুয়াহাটির চানমারি এলাকায় একাংশ মহিলারা পথের ধারে শাকসবজির দোকান চালানোর পাশাপাশি মাঝেমধ্যে নিজেদের মধ্যে মন খুলে গল্পগুজব করার দৃশ্যও দেখা গেছে। অর্থাৎ এই মহিলারা পথের ব্যবসাতে সামিল হয়ে পরিবারকে আর্থিক সুরাহা দেওয়া ছাড়াও নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনার জন্যও একটি পরিসর তৈরি করতে পারছেন। পুরুষরা বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হয়ে থাকার মধ্য দিয়ে যেভাবে একটি আড্ডার পরিবেশ তৈরি করে নেন, তার বিপরীতে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মহিলাদের ক্ষেত্রে এই ভাবের আদান-প্রদানের পরিসর প্রায় দেখাই যায় না। কিন্তু কামরূপ (মেট্রো) জেলায় বিশেষভাবে এই ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা গেছে। অর্থাৎ মহিলাদের জন্য তৈরি হচ্ছে অন্তরঙ্গ ভাব বিনিময়ের বিশেষ পরিসর। এটি লকডাউনের এক অনন্য প্রভাব।

অন্যদিকে, দিন কয়েক আগে বেলতলা অঞ্চলে কিছু মহিলা পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে নেমে পড়েছিলেন। ঘটনার মূলে ছিল মহিলা বিক্রেতাদের শাকসবজি ফেলে দিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার পুলিশি হুমকি। কিন্তু সেই মহিলারা যুক্তিপূর্ণভাবে পুলিশ প্রশাসনের কাছে মানুষের জীবনজীবিকার সুরক্ষার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। অর্থাৎ, এই লকডাউন একাংশ নিম্ন আয়ের নারীদের জীবিকার অধিকার, মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয়েও সচেতন করে তুলেছে। আমাদের চালানো এক সমীক্ষা থেকে জানা গেছে কামরূপ (মেট্রো) জেলায় লকডাউনের সময় যদিও বহু নারী জীবিকা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন, তার বিপরীতে তারা ঘরের আর্থিক সঙ্কট মোকাবেলা করার জন্য পথের ধারে, ফুটপাথে বা শহরের অলিগলিতে ভ্রাম্যমান বা অস্থায়ী দোকান করে বসেছেন। সঙ্গে সঙ্গে পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবসাগুলোতে মহিলারা হাত দিয়েছেন। পুরুষদের উপর প্রশাসনের অত্যাচারের জন্য মহিলারা সংসারের বোঝা মাথা পেতে নিচ্ছেন, যেখানে পুরুষরা পশ্চাৎপদ অবস্থান নিয়েছেন।

আমাদের ক্ষেত্রভিত্তিক অধ্যয়নে দেখা গেছে আগের তুলনায় এই মহিলাদের উপার্জন কমেছে ঠিক, কিন্তু ব্যবসার জগতে এসে তারা স্বাধীনচেতা হচ্ছেন, অন্য মহিলাদের সঙ্গে মত বিনিময়ের সুযোগ পাচ্ছেন, ঘরের চার দেওয়াল থেকে বেরিয়ে আসছেন। ঘরোয়া সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন ও নির্ণায়ক ভূমিকা নিচ্ছেন এবং বাস্তবতার কঠোর পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবেলা করার জন্য মানসিক শক্তি পাচ্ছেন। লকডাউনের প্রভাবে কামরূপ মহানগরীর বহু মহিলার কাজকর্মে নারী ক্ষমতায়নের এক অন্য রূপ দেখা গেছে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে অনেক মহিলাই যারা ইতিপূর্বে গৃহশ্রমিকের কাজ করতেন, তারা ব্যবসার কাজে স্বনিয়োজিত হওয়ার পর পুনরায় ওই বৃত্তিতে ফিরে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সমীক্ষায় এটা সামনে এসেছে যে গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করার সময়ে বহু মহিলা তাদের নিয়োগকর্তা মালিকপক্ষের দ্বারা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিছু মহিলা মালিকপক্ষের দ্বারা যৌন নির্যাতন তথা অশ্লীল আচরণের সম্মুখীন হওয়ার কথাও জানিয়েছেন। অনেক সময় কাজের বিনিময়ে সময়মতো উপযুক্ত মজুরিও পেতেন না তারা। লকডাউনের সময় বহু মালিকেরা হঠাৎ কাজ থেকে বের করে দেন গৃহশ্রমিক মহিলাদের এবং তারা যে কটা দিন কাজ করেছেন সেই হিসেবে মজুরি দেন। যার ফলে এমন গৃহশ্রমিক মহিলারা আর্থিক সঙ্কটের মুখোমুখি হন। এই লকডাউন বহু শ্রমজীবী মহিলাদের জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত করে দেয়। এর প্রভাব পড়েছিল তাদের সন্তানসন্ততি ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের উপর। সঙ্গে ছিল জীবিকা হারানোর জন্য মানসিক অশান্তিও। কিন্তু এর মধ্য দিয়েও বহু সংখ্যক মহিলারা এই নতুন পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছেন। অতিক্রম করেছেন বহু বাধা।

এ প্রসঙ্গে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘যুবা’-র পরামর্শদাতা তথা সমাজকর্মী পুজা নিরালা বলেন, “এই লকডাউন জীবিকার উপর নানাভাবে সঙ্কট নামিয়ে এনেছে। এমনকি এক শ্রেণির মানুষ ভিক্ষাবৃত্তির পথও বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি সামনে আসার কারণ হচ্ছে রাজ্যে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য এযাবৎ বিশেষ কোনও আইন প্রণয়ন করা হয়নি যার দ্বারা তাদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। এমন জটিল পরিস্থিতির জন্যই মহিলারা আর্থিক সঙ্কটের সম্মুখীন হচ্ছেন ও বৃত্তি পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারের উচিত এই বিপন্ন মহিলাদের জন্য শীঘ্রই কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা। জীবন-জীবিকার প্রশ্নকে অবজ্ঞা করে যেহেতু সমাজ নির্মাণ সম্ভব নয়, তাই এই মহিলাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার বিশেষভাবে কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করুক।”

ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয় এবং অমিয় কুমার দাস সামাজিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন গবেষক ডঃ সোনালি শর্মা এ প্রসঙ্গে বলেন, “কামরূপ (মেট্রো) জেলার বিভিন্ন স্থানে রোজগারের জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এভাবে মহিলাদের বেরিয়ে আসা একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এটি লকডাউনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রভাব। বিশেষ করে পথগুলোতে মহিলারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসা আরম্ভ করে রাজ্যে এক সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করেছেন। স্বনির্ভরতার জন্য এক গতিশীলতা আমরা লক্ষ করছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি উপলব্ধি করছি, যদিও আর্থিক সঙ্কট থেকে উৎরাতে বা জীবিকা পরিবর্তন হওয়াতে এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে; প্রকৃতপক্ষে এমন ঘটনা প্রমাণ করছে যে নারী ক্ষমতায়ন থেমে থাকেনি। বরং মহিলা হওয়ার জন্য যারা কাজ হারিয়েছেন, তারাই আবার মহিলা হওয়ার জন্যই প্রশাসনের বাধা অতিক্রম করে পথে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে জীবিকার নতুন ভিত্তি তৈরি করেছেন।”

আরেকজন সমাজকর্মী রিহান আলির বক্তব্য: “লকডাউনের জন্য রাজ্যের মহিলারা কীভাবে প্রভাবিত হচ্ছেন তার এক নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে কামরূপ (মেট্রো) জেলার ফুটপাথে, রাজপথে, অলিগলিতে। প্রকৃতপক্ষে এসব মহিলারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসা আরম্ভ করে দেখিয়েছেন যে জেলায় যেসব কাজ পুরুষরা করতে পারেননি সেসব কাজ তারা সম্ভব করে তুলেছেন। লকডাউনে দুর্বল করে দেওয়া সমাজটিকে তারা পুনরায় আর্থিকভাবে সুস্থির করে তোলার জন্য অগ্রগামী সেনানীর ভূমিকা নিচ্ছেন। এই দৃশ্য কেবল কামরূপ (মেট্রো) জেলার অলিগলিতেই নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে লকডাউনের সময়ে মহিলারা বেরিয়ে এসেছেন এবং পুরুষের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে চলতে দেখা যাচ্ছে তাদের। যে পুরুষ একেকটি পরিবারের সকল দিক সামলে নিচ্ছিলেন, বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা নিচ্ছিলেন, সেই পুরুষদের আজকের পরিস্থিতিতে পেছনের সারিতে থাকতে হচ্ছে এবং মহিলাদের দেখা যাচ্ছে পরিবার পরিচালনায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ।”

তাৎপর্যপূর্ণভাবে অসমের রাজধানীতে অবস্থিত কামরূপ (মেট্রো) জেলার ফুটপাথে-রাজপথে-অলিগলিতে ছোট ছোট ব্যবসায় মহিলারা যেভাবে আধিপত্য বিস্তার করছেন, তা সমাজের তথাকথিত লিঙ্গভিত্তিক কর্মবিভাজনের বিধিকে নস্যাৎ করছে। রিকশায় করে ফল বিক্রি করা ভানুমতী রায়, তিন চাকার ঠেলায় ভ্রাম্যমান সবজি বিক্রি করা গোলাপী দাস, রাস্তার পাশে শাকসবজি নিয়ে বসা সবিতা গড়, কৌশল্যা গোয়ালা, গীতা দর্জি, মইনা উপাধ্যায়ের মতো মহিলাদের বাড়িতে পুরুষ থাকা সত্ত্বেও সামনের সারি থেকে নিজের পরিবারের আর্থিক নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। অথচ এইসব মহিলাদের নেই কোনও উচ্চশিক্ষা বা ব্যবসার মূলধন। তবুও লকডাউনের দিনগুলোতে নিজেদের অধিকার সাব্যস্ত করে পথের দখল নিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, এই মহিলারা একদিন কর্মহীন হয়ে পড়লেও আবার সেই মহিলা হওয়ার জন্যই স্বনিয়োজনের মাধ্যমে একেকটি পরিবারকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে পারেন ও সঙ্কটের সময়ে অর্থনৈতিক বিপ্লবের পথে এগিয়ে যেতে পারেন তারাই।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2689 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...