প্রণামে পার্থপ্রতিম— একটি কুণ্ঠিত স্মরণিকা

শোভন ভট্টাচার্য

 


লেখক কবি, গদ্যকার

 

 

 

 

সত্যি বলতে কী, ‘কবিতা লেখা লোক’ এই সাতচল্লিশ বছরের জীবনে কম দেখলাম না, কিন্তু কবি দেখেছি ক্বচিৎ। জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা কবিতায় এমন কবি সত্যিই দুর্লভ যাঁর অন্তত গোটা চারেক বিস্ফোরক কবিতা বোঝাই বই আছে। পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল তেমনই দুর্লভ একজন কবি, যে-কবিকে, অন্তত শারীরিকভাবে, বাংলা কবিতা চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলল আজ ১৩ আশ্বিন, ১৪২৭ বা ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০-র সাতসকালে। ‘দেবী’-র মতো ভূলোক-দ্যুলোক একাকার করা, একই সঙ্গে এমন আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক কবিতার বই দিয়ে যিনি এই অদীক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত বাংলা কবিতার আসরে আবির্ভূত হয়েছিলেন, একরাশ অভিমান, পারিবারিক ও সামাজিক উপেক্ষা-লাঞ্ছনা বুকে নিয়ে চলে যাওয়ার জন্যও যে তিনি এক ‘আশ্বিনের শারদ-প্রাতে’-র সময়টিকেই বেছে নিলেন, তাকে হয়তো নেহাত কাকতালীয় বলেই মনে হবে আধুনিক বাঙালি ভদ্রসমাজের, বা কেউ হয়তো বিষয়টা ভেবেই দেখবেন না।

যদিও তাঁর চলে যাওয়ার খবর নিমেষে চাউর হয়ে যাবে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এত যে মানুষ পার্থপ্রতিমের শুভাকাঙ্খী পাঠক ছিলেন এতকাল, ভেবে যুগপৎ আশ্চর্য হব আমরাই। কিলো দরে একদিনের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে ভরে দেব আমাদের নিউজফিড। কবিতা ভেসে আসতে থাকবে একের পর এক। চলে গেলেন, চলে গেলেন, চলে গেলেন… বলতে থাকবে সবাই। কেউ কেউ আবার ব্যক্তিগত ফোনে ‘চলে গেল, বলে গেল না’ বলেও অভিমান করবেন কবির প্রতি। কিন্তু কীভাবে যে গেলেন সবার এত প্রিয় একজন কবি, কেউ জানবে না। কেউ খবর নেবে না কবির শেষযাত্রার কী হল? কারা কারা গেলেন কবিকে দেখতে? কারা গেলেন আগুনের লেলিহান দরজা অব্দি তাঁর মরদেহটিকে এগিয়ে দিতে? তাঁর প্রাণে আগুনের পরশমণিটুকু ছুঁইয়ে দিল কে? না, অত কথা জানার সময় আমাদের নেই। মরে গেছে, চুকে গেছে, আমরাও এবার শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের শ্রাদ্ধটুকু করেই দায়মুক্ত হতে পারি।

যখন আমাদের মতো ভণ্ড ভক্তকুল এসব নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত, তখন কবির মৃতদেহের সৎকার নিয়ে ঘনিয়ে উঠেছে বিরাট সংশয়। কবির একমাত্র কানাডাবাসী মেয়ে, যিনি বাবার জীবদ্দশাতেই শুধু টাকা দিয়ে নিজের কর্তব্য সেরে ফেলতে চেয়েছেন, তিনি যে আসার কথা ভাববেনও না সে তো জানাই ছিল। কিন্তু পার্থদার বন্ধু বলে যাঁরা সোচ্চারে দাবী করেন নিজেদের, তাঁরাও কেউই গেলেন না? ফলে একসময় পুলিশ কবির বাড়িতে এসে প্রতিবেশীদের জানিয়ে যায় বাড়ির কাউকে না পাওয়া গেলে তারা লাশ ধাপায় ফেলে দেবে। সেই খবর পাওয়া মাত্র পার্থদার সাউথ সিঁথির বাড়িতে হাজির হন পার্থদার দীর্ঘদিনের তরুণ কবিবন্ধু, অন্ধের যষ্টির মতো তাঁর দীর্ঘদিনের প্রধান ভরসা অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সৎকারপর্ব শেষ হওয়া পর্যন্ত অনির্বাণের সঙ্গে সারাক্ষণ ছিল আরও এক তরুণতর কবি পৃথ্বী বসু। কিছুক্ষণ ছিলেন পার্থদার দিদি ও তাঁর মেয়ে এবং দুজন আন্তরিক শুভানুধ্যায়ী বিতস্তা ঘোষাল ও রম্যানি ঘোষাল। সর্বমোট এই ছজনের সাহচর্যেই বাংলা কবিতার একজন অন্যতম প্রধান কবির শেষযাত্রা। রতনবাবুর ঘাটে তাঁর মুখাগ্নি করেন প্রকৃত পুত্রসম অনির্বাণই।

আর আমরা? আমরা মানে যারা পার্থদার সাহায্যকল্পে ত্রাণতহবিল খুলে নিজেদের মহান ভাবার অবকাশ পেয়েছি কিছুদিন, আমরা যারা সাহায্যকল্পে টাকা দেব দেব করেও একটা টাকাও দিয়ে উঠতে পারিনি, আমরা যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে সেই টাকা দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছি, আমরা যারা কিছু টাকা দিতে পেরে নিজেদের ধন্য মনে করেছি, আমরা যারা তাঁর শেষ কাতর প্রার্থনা অনুযায়ী একটা অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করতে পারিনি, আমরা যারা বাড়িতে অক্সিজেন ঢোকাতে বারণ করে দিয়েছি, আমরা যারা তাঁর একমাত্র দেখভালের লোকটিকেও বিতারিত করতে চেয়েছি বাড়ি থেকে, এই আমরাই আসলে পার্থদার খুনি। হ্যাঁ, কবিকে আমরা খুন করেছি শেষ দশবছর ধরে। উপেক্ষা করে খুন করেছি, আঘাত করে খুন করেছি, ব্যবহার করে খুন করেছি। আমি নিজেও সেই না-করা না-দেওয়া না-যাওয়াদের দলে, ফলে অন্য কারও সমালোচনা আমার মুখেও মানায় না। তাই আমি এক্ষেত্রে নিজেকেও কাঠগোড়ায় রেখেই এই লেখায় হাত দিচ্ছি।

পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল সেই দুর্লভ কবি যিনি তাঁর প্রথম বইতেই মানব-প্রজ্ঞার উজ্জ্বলতম দ্যুতিকে প্রতিবিম্বিত করতে পেরেছেন। সমাজ-সংসার তাঁর ধারালো উপলব্ধির সামনে একেবারে নাঙ্গা হয়ে ধরা দেয় যেখানে।

দেবী, মুদ্রা ব্যবহারে আজ সমস্ত সম্পর্কগুলি হয়েছে কুটিল
অস্পষ্ট, একদেশদর্শী, বদ্ধ। যাকে পিতা বলে জানি
তিনি অবান্ধব, অবান্তর, যাকে জেনেছি প্রেমিকা, সেও নয়
হৃদয়জননী, যে বন্ধু, তার ব্যবহারে থেকে যায় অনভিভাবক
উদাসীন দৃষ্টিপাত। মানুষের মুদ্রা ব্যবহারে, যশ ব্যবহারে
এ সকল বিপত্তি হয়েছে। আজ কোন কবিতার স্তব শুদ্ধভাবে
শুক্লতার সঙ্গে তুলে আনবো, পুনর্বার হিরন্ময় হবে তোমার রূপের অমলতা।

কবি কি তাঁর নিয়তিকেই রচনা করেছেন নিজের প্রথম কাব্যগ্রন্থে? তা না হলে মৃত্যুকালেও তাঁর এইসব উচ্চারণ এত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল কীভাবে? চলুন, আরও একটু এগিয়ে গিয়ে মেপে নেওয়া যাক কবির দূরদৃষ্টির গভীরতা। ওই কবিতাতেই তিনি লিখছেন—

যৌবন ভুলেছে তার মধুর ভঙ্গিমা আজো প্রকৃতির কোনও ঐশ্বর্যই

আয়ত্ত করেনি,

প্রৌঢ়তা ভুলেছে তার প্রসন্নতা
শীতের রৌদ্রের থেকে আরো বেশি প্রার্থিত এই পৃথিবীতে।
আমরা কেবল
ক্ষমতা ও বোধের অভাবে শিশু,
সীমাজ্ঞানহীনতার জন্যই আমরা কিশোর
ভ্রান্ত মত্ততা ছাড়া আমাদের যৌবনের অন্য কোনও অভিজ্ঞান নেই
কুটিলতাপ্রিয় বলে আমরা প্রত্যেকে প্রৌঢ় স্বেচ্ছানির্বাসনে
কণ্ডুয়নসুখে। …

হ্যাঁ, এতদূর পর্যন্ত কবি সমাজ-সংসারকে আঁচ করতে পেরেছিলেন তাঁর প্রথম বইতেই। তিনি কি এও আঁচ করতে পেরেছিলেন যে মৃত্যুর ২৪ ঘন্টা যেতে না যেতেই তাঁর কোনও কোনও ‘অনভিভাবক’ ‘বন্ধু’ তাঁকে ‘একদাকবি’ বলে লঘু করে দেওয়ার চেষ্টা শুরু করে দেবেন নগ্নভাবে? হয়তো পেরেছিলেন। প্রকৃত কবির ত্রিকালদর্শী প্রজ্ঞায় তিনি নিশ্চয়ই আঁচ করতে পেরেছিলেন সংসারের এই কদর্য রূপ। পাশাপাশি কবিতার নন্দনতত্ত্বের দিক থেকেও ‘দেবী’ বইটির তুলনা খুঁজে পাওয়া ভার।

দুলে ওঠে তোমার ও কৃষ্ণাগ্নির মতো মুক্ত কেশ
ছিন্নমাল্য
চরম সুগন্ধে যেন অকস্মাৎ ভীষণ হরিণ
চিরশত্রু বধোদ্যত। …

এরকম নান্দনিক, ক্লাসিক চিত্রকল্প জীবনানন্দ পরবর্তী জীর্ণশীর্ণ বাংলা কবিতায় চোখে পড়ে খুব কদাচিৎ। পার্থপ্রতিম সেই দুর্লভ কবি যিনি একটি দু ফর্মার চটি বই দিয়েই ধ্বসিয়ে দিতে পারেন সাবেক বাংলাবাজারের গ্রন্থপ্রাচীর। তেমনই এক পুস্তিকার নাম ‘টেবিল, দূরের সন্ধ্যা’। সেখানে ‘কবি’, ‘বালককালের প্রথম বেশ্যা’, ‘বন্ধুদের’, ‘নৈশ’, ‘আরো রাতের কবিতা’ চিরকালীন বাংলা কবিতার প্রথম সারিতে প্রোজ্জ্বল থাকবে ততদিন যতদিন বাংলা কবিতার গূঢ় ঐশ্বর্যের খোঁজখবর রাখবেন প্রকৃত পাঠক। বহুদূরের তরুণ পাঠক একদিন নিশ্চয়ই শিহরিত হবেন পড়লে—

‘…দুমুখো সাপের জীবন আজ আমারই, আজ আমিই জেনে গিয়েছি আমার বিষ না কামালেও বিধাতার চলে যায়। হয়তো নিজের বিষে নিজেই মরে যাবো একসময়, ভয় হয়, যদি আত্মা থাকে, পুনর্জন্ম থাকে, যদি পুনর্জন্ম নিতে এমনই কাড়াকাড়ি পড়ে যায় আত্মাদের মধ্যে— কী হবে আমার। তবু মৃত্যুময়ূরের রূপ মনে পড়ে কিছুটা আহ্লাদ হয়— নিশ্চয়ই সে একদিন ঊর্ধ্বে তুলে নেবে। সেসময় তাকে কি বলতে পারব ময়ূর, তোমারও যে মৃত্যু, সেই আশ্চর্য চিতাবাঘের পায়ে জড়িয়ে গিয়ে— কামড়াতে পারিনি— কিন্তু দৌড় করিয়েছিলাম তাকে দিগন্তের পর দিগন্ত, থামিয়ে রেখেছিলাম তাকে স্তব্ধতায়, নিজেরই চারপাশে ঘুরপাক খাইয়েছিলাম তাকে নির্জনে! এর বেশি কিছু করার ছিল না আমার— যাকে ব্যর্থ বললেও অন্যান্য ব্যর্থদের অবমাননা করা হয় আমি ছিলাম সেই দুমুখো সাপ!’

‘টেবিল, দূরের সন্ধ্যা’ বইটা পড়ে বহু যুগ ধরেই তরুণ কবিরা শিখবেন কবিতা জিনিসটা কীরকম ‘মদ-পেঁয়াজের অতিপার্থিব গন্ধের’ ভিতর থেকে আর্তনাদ করে ওঠে আবার ‘পুকুরে তারার ছায়া, কোথাও যাবে না’ সুলভ স্থিতধী ও শাশ্বত সত্যের আভাস দিয়ে যায়।

এই ‘ব্যর্থ’ জীবনেই পার্থ দা বাংলা কবিতার আঙ্গিক নিয়ে যে কাজ করে গেছেন তার তুলনা সাম্প্রতিক অতীতের বাংলা কবিতায় তো নেইই, আবহমান বাংলা কবিতাতেও সেই স্তরের কাজ দু-চারজন কবির বেশি কেউ করেননি বলেই মনে হয়। ‘পাঠকের সঙ্গে, ব্যক্তিগত’ তেমনই এক কাব্যগ্রন্থ যেখানে অত্যন্ত উচ্চস্তরের কবিতার ভেতর দিয়ে দীক্ষিত ও শ্রদ্ধাশীল পাঠক পেতে পারেন বিভিন্ন কবিতার আঙ্গিক সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা করে নেওয়ার আশ্চর্য অবকাশ। প্রসঙ্গত বলি, পার্থপ্রতিমের এই বই প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে। যার ঠিক একবছর আগেই ২০০০ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশ পায় আমার প্রথম কবিতার বই ‘ব্যক্তিগত আলেখ্যের প্রতি’, যেখানে আমিও নানারকম সনেট লেখার আস্পর্ধা করেছিলাম, অথচ পার্থদার বইটা পড়ার পর আপসোস হয়েছিল, কেন আমার বইটা এই বইয়ের পরে বেরোল না, তাহলে হয়তো আরও কিছুটা শক্তপোক্ত হয়ে নেওয়ার সুযোগ পেতাম। ‘পাঠকের সঙ্গে, ব্যক্তিগত’ না পড়লে কি জানতাম কামিংসের সনেটের মিলকাঠামোয় লুকিয়ে রয়েছে কী আশ্চর্য চ্যালেঞ্জ? জানতাম কি কেমন দেখতে-শুনতে হয় ‘তানকা সনেট’ বিষয়টা? ‘মালয়ী পান্তুম’ আর সাধারণ ‘পান্তুম’-এর তফাৎ ঠিক কীরকম, জানতাম? হয়তো জানতাম, হয়তো জানতাম না, কিন্তু এটা ঠিক যে, জানলেও, সেই জানাটা এইরকম অপূর্ব সব কবিতার ভেতর দিয়ে জানা হত না কিছুতেই। কোথায় পেতাম ‘এক ভিখারি ঠিক তখনই / ঘাঁটছে পথে চিন্তামণি / বিদ্যুতকুলজননী জঞ্জাল’। এ এমন এক বই, ধ্রুপদী কাব্যগুণের দিক থেকে যার তুল্য কবিতা তাঁর সমসাময়িক আর কারও লেখারই সাধ্য ছিল না। তাঁর কবিতা পড়লে সত্যিই মনে হয় আমরা এই রুগ্ন সমসময়েও এক বিশাল ভাব ও ভাষার উত্তরাধিকার বহন করে চলেছি। তাঁর কবিতা আত্মার যে রহস্যময় দরজা খুলে দেয় সে একটা আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। শাস্ত্রীয় ভাষা এবং শিক্ষার গুণে তিনি তাঁর কবিতায় বিভিন্ন আত্মিক উপলব্ধির পাশাপাশি সমসাময়িক সমাজ ও রাজনীতিকে যেভাবে মহাসময়ের প্রেক্ষাপটে গেঁথেছেন, তা এককথায় ক্লাসিক।

কিন্তু আমি আজ পার্থপ্রতিম গত হওয়ার দিনেই তাঁর এতসব প্রশস্তি গাইছি কী উদ্দেশ্যে? পার্থদার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিছু আদৌ ছিল কি? পঁচিশ বছরের চেনাজানার ভেতরে দু-তিনদিন কারও বাড়িতে গেলে, সাকুল্যে চার-পাঁচবার টেলিফোনে কথা বললে বা কফিহাউসের টেবিলে পাঁচ-ছদিন একসঙ্গে বসলে কি আদৌ তাকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বলা যায়? তবু আজ মনে পড়ছে গত শতাব্দীর একেবারে শেষভাগের কোনও একদিন, তাঁর সল্টলেকের বাড়িতে গিয়েছিলাম অনির্বাণের সঙ্গে। মনে পড়ছে কফিহাউসের টেবিলে শোনা পার্থদার মুখে আজব সব ভুতুড়ে গল্প, যে গল্পের ভূত বিড়ি চেয়ে খেয়েছিল পার্থদার কাছে। মনে পড়ছে ২০০১ সালের জানুয়ারি মাসের এক শীতসকাল। প্রায় ফাঁকা কফিহাউসের দক্ষিণ দিকের জানলা দিয়ে রোদের ফালি এসে পড়েছে একটা টেবিলের ওপর, টেবিলে রাখা কফির কাপ থেকে পাতলা ধোঁয়া সেই রোদ-আসা-জানলপথ বরাবর মিলিয়ে যাচ্ছে আর পার্থদা বিড়ি টানতে টানতে প্রুফ দেখে চলেছেন ‘পাঠকের সঙ্গে, ব্যক্তিগত’ বইটির। মনে পড়ছে, আমি আমার একটা বইয়ের নাম ‘শনির জাতক’ দেব শুনে কফিহাউসের টেবিলে আমায় বলেছিলেন ‘খবরদার একাজ করবেন না, শনি যে বন্ধ্যাগ্রহ’। আমি যদিও তাঁর সেকথা মানতে পারিনি। মনে পড়ছে অনির্বাণের এবং পার্থদার অন্যান্য কিছু বন্ধুদের মুখে শোনা তাঁকে নিয়ে কত কথা, কত গল্প… মনে পড়েছে অনির্বাণ আর আমাকে উল্লেখ করে লেখা তাঁর ‘একটি অনুরোধ’ নামক অগ্রন্থিত কবিতাটি। মনে পড়ছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরে দাঁড়িয়ে একটা লোককে, যিনি একদা শক্তি-সুনীলের দেওয়া ‘কৃত্তিবাস পুরস্কার’ প্রত্যাখান করেছিলেন হাসতে হাসতে, অবলীলায়, এবং পরে ঠাট্টা করে বলতেন ‘ফেম একবারই এসেছিল নীরবে’। পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল এক রহস্যের খনি, যার খুব সামান্য অংশই আমাদের জানা। শুনেছি তাঁর একটা বিরাট পরিমাণ লেখাই এখনও অগ্রন্থিত অবস্থায় রয়েছে, কী হবে তার জানি না। শুধু প্রার্থনা করি পার্থদার অগ্রন্থিত কবিতাবলির পরিণতি যেন জীবনানন্দের অগ্রন্থিত রচনা আবিষ্কারের মতো না হয়। কবির ইচ্ছাকে সম্মান জানানো যে তাঁর সৃষ্টিকে সম্মান জানানোরই নামান্তর, এ কথা যেন আমরা ভুলে না যাই।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2689 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...