করোনার কাল আকাল

আনসারউদ্দিন

 

 

এখন অস্থির সময়। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে স্থির। এই সময়ের জন্য, আমাদের কোনও মানসিক প্রস্তুতি ছিল না। যখন চিনে প্রথম প্রাদুর্ভাবের কথা শুনেছি তখনও তার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারিনি। নিশ্চয়ই সামান্য এই উপস্থাপনার মধ্যে পাঠক জেনে নিতে পারছেন আমি করোনা ভাইরাসের কথা বলছি।

মানুষ দৈনন্দিন জীবনযাপনে প্রচুর কথা বলেন। কথা বলেন দেশীয় ভাষায় বা আঞ্চলিক ভাষায়। কিন্তু ‘করোনা’ বিশ্বজনীন ভাষা হয়ে উঠেছে। এই একটি ভাষার ক্ষেত্রে স্থান কাল কোনও বাধা হয়ে উঠতে পারেনি। দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রনেতা থেকে পথের ফকির পর্যন্ত এক সরলরেখায় মিলে যায়। কেন সবার মুখে মুখে ‘করোনা’ একটি অনিবার্য ভাষা হয়ে দেখা দিয়েছে?

এর একটাই উত্তর হতে পারে, করোনার সঙ্গে জীবনমরণের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। এ রোগ এক শ্রেণির ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে যার মধ্যে ধনী-গরিব শিক্ষিত অশিক্ষিত এবং ধর্ম সম্প্রদায়ের কোনও ভেদরেখা নেই। করোনা হচ্ছে সেই রোগ যা বিশ্বের সমস্তরকম মানুষকে একাসনে বসিয়ে দিয়েছে। এবং তা অতি দ্রুততার সঙ্গে।

ইতিপূর্বে অনেক মারণব্যাধির মুখোমুখি হয়েছে বিশ্বজন। কিন্তু এতটা আতঙ্কগ্রস্ত হতে হয়নি। এতটা মৃত্যুভয়ের মুখোমুখি হতে হয়নি। করোনা নিয়ে এই যে এত প্রচার, এত ত্রাহি ত্রাহি রব উঠছে এর মূল কারণ গোটা মানবসভ্যতা সঙ্কটের মুখোমুখি। আক্রান্তের গাণিতিক পরিসংখ্যান গ্রামজীবনের থেকে নগরজীবনে কয়েকগুণ বেশি। এটা শুধু আমাদের দেশ নয়, তামাম পৃথিবী জুড়ে একই ছবি। বিশ্বের প্রথম শ্রেণির নাগরিকদের করোনা ভীতি নীচের দিকে সংক্রমিত হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের সঠিক চরিত্র কতটা চিহ্নিত করা গিয়েছে এ নিয়ে সঠিক ব্যাখ্যা এখনও করা যায়নি। এই ভাইরাস বাতাসে ভাসে, না জলে ডোবে আমরা জানি না। হাঁচি কাশির মাধ্যমে এক গজ, না দু গজ দূরত্বের মানুষকে সংক্রমিত করবে তা সঠিকভাবে নির্ধারিত করা যায়নি। ভেবেছিলাম ‘ভারত আবার জগতসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’। কেননা আমাদের দেশের রাষ্ট্রনেতাগণ মোমবাতি জ্বালিয়ে হাততালি দিয়ে করোনা তাড়ানোর নিদান দিয়েছিলেন।

আমাদের দেশের মানুষ হাততালি দিতে অভ্যস্ত। বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশে উপস্থিত থেকে নেতাদের উৎসাহ জোগাতে আমরা তা দিয়ে থাকি। আরও দিই হাততালি কিনতে হয় না বলে। দেশের অধিকাংশ মানুষ গরিব। টাকা পাবে কোথায়! হাততালি দিয়ে চল্লিশ টাকা কেজি দরের আলু কুড়ি টাকায় আর সত্তর টাকা কেজির পিঁয়াজ ত্রিশ টাকাতে আনা যায় না। এ নিয়ে প্রশ্ন করলে দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়তো বলবেন— হাততালি দিয়েছ তো কী হয়েছে, কব্জি থেকে হাতের তালুদুটো তো খুলে পড়েনি।

হাততালি দিয়ে হাতের তালু খুলে পড়েনি এটা আমাদের কপাল বলতে হবে। খুলে পড়লেই বা কী হত! কিন্তু পাশাপাশি এটাও বলতে হবে করোনা তাড়াতে বিদ্যুৎবাতি নেভানোর সেই অকাল দেওয়ালিতে আমাদের পাড়ার মেয়ে তারাসুন্দরীর যে শ্লীলতাহানি হয়ে গেল তার কী! আমরা এমন দুর্ঘটনায় কেবল মৌখিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করতে পারি। পৃথিবীর আর কোনও সভ্য দেশ এমন নিদান দিয়েছে বলে জানা নেই। তবে হাততালি আর মোমবাতি কারও জন্মদিন পালনে ভীষণ প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আমরা আমাদের দেশের রাষ্ট্রনায়কদের কথা শুনে করোনা তাড়াতে গিয়ে তার জন্মদিন পালন করে বসলাম না তো!

করোনা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। গরুময় দেশ আমাদের। গরুই দেবতা। তাঁর দুধে সোনা থাকে। গোবর মাখলে গো-চোনা খেলে করোনা সেরে যায়। এই খবর শুনে আমরা খুব আশাবাদী হয়েছিলাম এইবার নিশ্চয়ই ভারতবর্ষ থেকে দারিদ্র উঠে যাবে। বিলিয়ন বিলিয়ন বৈদেশিক মুদ্রা আসবে। ভারতীয় অর্থনীথিতে সত্যিকার জোয়ার আসবে। গোবর গো-চোনার এমন আন্তর্জাতিক ব্যবসার বাণিজ্যের কথা কে কবে শুনেছে। অন্য দেশের গরু নয়, খাঁটি ভারতীয় গরুই এক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ কথা তো অন্য কোনও হ্যাবলা ক্যাবলার কথা নয়, দেশের মূল শাসকদলের দায়িত্বশীল নেতামন্ত্রীরা বলেছেন। তাদের কথা অমান্যি করলে তো পাপ হবে। তাদের কথা শিরোধার্য করে দেশের অনেক আগ্রহী মানুষ গোবর মেখেছেন গো-চোনা খেয়েছেন। অবশ্য এমন নিদান যারা দেশের একশ পঁয়ত্রিশ কোটি মানুষকে দিয়েছেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে তারা অবশ্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ভর্তি হওয়ার আগে নিজস্ব বিশ্বাস মতে কত কুইন্টাল গোবর আর কত কুইন্টাল গো-চোনা খেয়েছেন বলতে পারব না।

বাদ যান না রাজ্যের নেতারা, মন্ত্রীরা। এরা অবশ্য গরুর লেজ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। কারণ গোবর গো-চোনা সংগ্রহ করতে হলে পিছনে দাঁড়াতে হয়। তাতে চাঁটি খাওয়ার ভয় ষোল আনা। যে কারণে রাজ্যে করোনাদেবীর পুজো চলছে। একজন ডাকাবুকো মন্ত্রী তো প্রকাশ্যে গলায় স্মার্টকার্ড ঝুলিয়ে বলতে লাগলেন, এতেই ভালো আছি। করোনা ধারেকাছে পৌঁছবে না। যেদিন টিভি-তে তাঁকে সগর্বে একথা বলতে শুনলাম তার তিনদিনের মধ্যে শুনলাম তিনি করোনা আক্রান্ত এবং অবশেষে হাসপাতালে।

করোনাতে আক্রান্ত যে কেউ হতে পারে। এই অদৃশ্য মারণরোগ কাকে ছোঁয় কখন ছোঁয় কেউ তা হলফ করে বলতে পারে না। অবশ্য এসবের মধ্যে সরকার যখন বলে গুজবে কান দেবেন না, গুজব ছড়াবেন না, গুজব ছড়ালে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তখন তো উল্টো কথা বলতেই হয়। যারা বলেন করোনার নিদান বিদ্যুৎবাতি নিভিয়ে হাততালি দেওয়া, গোবর আর গো-চোনার দাওয়াই, স্মার্টকার্ড গলায় ঝোলানোর কথা, তাঁরা কি গুজব ছড়াচ্ছেন না? প্রধনমন্ত্রীর দো গজ কি দূরির কথা মিথ্যে হয়ে যায় যখন দেখি তাঁর দলের অনুগামীরা রাজনৈতিক জমায়েতে সামিল হচ্ছে সমস্ত বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে। সাধারণ মানুষের মুখে মাস্ক না থাকলে কান ধরে উঠবোস, নয়তো লাঠির বাড়ি। পুলিশের এই ভূমিকা যদি সবক্ষেত্রে বহাল থাকত তাহলে রাজনৈতিক নেতাদের হাড়গোড় আর আস্ত থাকত না। আসলে রাজ্যের পুলিশ বাবাজিরা জানে যে কখন টেবিলের তলায় ফাইল মাথায় দিয়ে লুকিয়ে থাকতে হয় আর কখন ডান্ডা হাতে বেরুতে হয়।

থাক এইসব রাজনৈতিক কেচ্ছা কথা, ভেবেছিলাম দেশের মানুষ এই অতিমারির সময়ে বিজ্ঞানমনস্ক হবে। তন্ত্রমন্ত্র ঝাড়ফুঁক দেওয়া তাবিজ হোম যজ্ঞের বাইরে এসে দাঁড়াবে। সে জায়গায় ফল হল উল্টো আসল কথা হল যুক্তিবাদকে যাঁরা ভয় পান, বিজ্ঞানকে ভয় পান, তাঁরাই আজ দেশ চালাচ্ছেন।

আমরা গৈ-গেরামের মানুষেরা এক অজানিত রোগব্যাধির খবরে যেমন ভয় পাই তেমনি ভয় পেতে পেতে সাহস সঞ্চার করে ফেলি। করোনা একটি মারণব্যাধি ঠিকই, দেশদুনিয়ার জ্ঞানীগুণী মানুষ থেকে রাষ্ট্রনেতাদের ঘুম নেই এই মারণ ব্যাধি থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য। এই জায়গায় একটু ভেবে দেখার দরকার আছে। মানুষকে বাঁচানোর নানান পথ আছে, পদ্ধতি আছে। বিশ্বব্যাপী মানুষ নানানভাবে মারা যাচ্ছে। যুদ্ধে মারা যাচ্ছে, অনাহারে যাচ্ছে, অন্যান্য রোগব্যাধিতে মারা যাচ্ছে, এবং নানারকম দূষণের ফলেও মারা যাচ্ছে মানুষ। এই মৃত্যু পরিসংখ্যান করোনা থেকে কম নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেভাবে এই অতিমারির বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে, রাষ্ট্রসঙ্ঘ কেন ক্ষুধা দারিদ্র অনাচার অশিক্ষা শোষণের বিরুদ্ধে সেভাবে লড়াই চালাচ্ছে না? আমাদের দেশসহ অন্যান্য দেশে যে নানান কুসংস্কার রয়েছে, সেগুলো দূর করার জন্য উপযুক্ত কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছে না। শুধুই করোনা নিয়ে কেন এত ঢাকঢোল হরিবোল?

এর মূল কারণ হল করোনা হল অতি সংক্রামিত রোগ। এ রাতারাতি দেশের সীমারেখা অতিক্রম করে অন্যদেশে হানা দিতে পাতে। এখানে ভয় পৃথিবীর প্রথম শ্রেণির অধিবাসীদের। তারাই সর্বাপেক্ষা বেশি বেশি নাগরিক সুবিধা ভোগ করে থাকেন। এদের জন্য যাবতীয় ভোগপণ্য প্রস্তুত হয়ে আছে। তা লুটেপুটে ভোগ করার জন্য এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকার খুব প্রয়োজন। এই প্রয়োজনের জন্যেই করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। সমস্ত শ্রেণির মানুষকে চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা। তা না হলে যে কোনও মানুষের মধ্যে থেকে এই মারণব্যাধি মাথা তুলে দাঁড়াবে। কেচে যাবে এ পৃথিবীকে স্বর্গ বানিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন, সাধ-আহ্লাদ। তাই অন্য কোনও রোগব্যাধি, অনাহার নয়, দারিদ্র্য নয়, শুধুই করোনা। আর যা কিছু অভাব অভিযোগ একইভাবে চলতে থাকুক।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2689 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...