কোটি টাকার আলোকমঞ্জীর

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী

 

মোবাইল স্ক্রিনে আঙুল নাচাতে নাচাতে এই পাঁচটা লাইন চোখে পড়ল এইমাত্র। ‘সপ্তমী শোভাবাজার রাজবাড়ি/ অষ্টমী ম্যাডক্স স্কোয়ার/ নবমী সুরুচি সংঘ/ দশমী বাগবাজার সার্বজনীন/ একাদশী বেলেঘাটা আইডি।’ বেরঙিন সময়ে যাঁর মাথা থেকে এই রসবোধের জন্ম হয়েছে, তাঁকে কুর্নিশ। বাঁশের পর বাঁশ জুড়ে প্যান্ডেল তৈরি হচ্ছে যত, স্বাস্থ্যপরিষেবার সঙ্গে যু্ক্ত কিছু মানুষের ভ্রুকুটিও তত প্রকট হচ্ছে। তাঁদের সন্দেহ, পুজোর আবহে জনতার ঢলে রাশ টানতে না পারলে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আটকানো যাবে না।

বিজ্ঞাপনদাতার অভাবে পুজো কমিটির হর্তাকর্তাদের কপালে ত্রিকোণমিতি খেলছিল যখন, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী তখন ছয় মারলেন। আশাভরা স্টেডিয়ামের আকাশ ছুঁয়ে একেবারে বাইরে গিয়ে পড়ল সেই সোনার বল। ৩৭ হাজার পুজোকমিটির প্রতিটার জন্য ৫০ হাজার টাকা অনুদান ঘোষণা করলেন তিনি। গুণ করলে এই সংখ্যাটা দাঁড়ায় ১৮৫ কোটিতে। শুধু তাই নয়, বিদ্যুৎ বিলেও ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হল। পুরসভা, পঞ্চায়েত, দমকলের ফিও মকুব করা হল। ২৪শে সেপ্টেম্বর নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে রাজ্যের শীর্ষমন্ত্রীর এই ঘোষণা শোনামাত্র তুমুল হর্ষধ্বনি শোনা যায় পুজো কমিটির প্রতিনিধিদের গলায়। যেন শুখা মরুভুমিতে বৃষ্টি ঝরল অবশেষে। যে তৃষ্ণার্ত উটেরা এক ঘটি জলের জন্য হাঁসফাঁস করছিলেন, তাঁরা হঠাৎই সামনে দেখতে পেলেন সিনটেক্সের ট্যাঙ্ক। হল থেকেই হয়তো অনেকে ফোন করেছিলেন নিজের ক্লাবে। সহর্ষে আদেশ দিয়েছিলেন, ‘গালা খুঁটিপুজো হয়ে গেল এক্ষুণি। প্যান্ডেলের কাজ শুরু করে দে ইমিডিয়েটলি।’ হয়তো বলেছিলেন, ‘কি আমার কথা মিলল তো? বলেছিলাম না, একটা ব্যবস্থা হবেই।’ ভেবেছিলেন, একটু দেরিতে হলেও মা দুর্গা মুখ তুলে চাইলেন। এই খবর ভাইরাল হওয়ার সময় স্প্রিং দেওয়া কাশফুলে যখন প্রবল দোলা লাগছিল, তখন ধর্মতলা বাসস্ট্যান্ডে লটবহর নিয়ে হাওড়ার বাসে উঠতে উঠতে কয়েকজনকে বলতে শুনেছিলাম, ‘এবারও পুজোয় বাড়ি থাকা হল না। এই নিয়ে তেরো বছর।’ মুখের আই-কার্ড জানান দিচ্ছিল, তাঁরা পরিযায়ী শ্রমিক। ‘এ বার নিজের মাটিতেই করে খাব’ ভেবে, লকডাউনে বহু কষ্টে যাঁরা বাড়ি ফিরেছিলেন, তাঁদের ‘ভিন রাজ্যে আর যাব না’ ভাবার প্রচ্ছন্ন শান্তি চুরমার হয়ে যেতে বেশি সময় লাগেনি। হাড়ে হাড়ে বুঝে গিয়েছিলেন, কাজের সুযোগ অন্য কোথাও, অন্য কোনওখানে। এ বাংলা উৎসব দেবে, কাজ দেবে না।

১৮৫ কোটিতে শারদপ্রাতে আলোকমঞ্জীর বাজার আগেই আমার তিন জন বন্ধু কাজ হারিয়েছে। ওই তিন জন আরও পনেরো জনকে চেনে, মাসের শেষে মোবাইলে সুখ-মেসেজটা যাঁরা পায় না গত কয়েক মাস। এই পনেরো জনের থেকে হয়তো সন্ধান পাওয়া যাবে এরকমই আরও পঞ্চাশ জনের। ‘উঠল বাই তো সামপ্লেস এলস’ যাই বলা এক বন্ধু, চাকরি করা ইস্তক যার কলার গুটিয়ে যায়নি কোনওদিন, সে কুঁকড়ে গিয়ে আমার কাছে টাকা ধার চেয়েছে সম্প্রতি। পদ্মপাতায় জলের মতো চাকরি আঁকড়ে বসে থাকা আমি ওকে টাকা দিইনি। বলা ভাল দিতে পারিনি। আমার স্কুলজীবনের সুহৃদ, এক বহুজাতিকের এক্স-এরিয়া সেলস ম্যানেজার আজ বড়বাজার থেকে পাইকারি দরে স্যানিটাইজার কিনে ডালহৌসির সারি সারি অফিসবাড়ির সিকিউরিটির কাছে গলাধাক্কা খায়। উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও পাঁচ লিটার বিক্রি করতে পারে না সারাদিনে। হাবড়া থেকে প্রতিদিন আমাদের দমদমের বাড়িতে কাজ করতে আসত যে মালতী, সে ফোন করে মড়াকান্না কাঁদে। মার্চের পর থেক ওর হাতে কোনও কাজ নেই। ওর বরের রিক্সার চাকাতেও হাওয়া দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি গত সাত মাস। এক বিরাট কর্পোরেটের দেড় লাখি চিফ ম্যানেজারকে পাড়ার মোড়ে গোঙাতে শুনলাম, পঁচিশ হাজারের বেশি দিতে রাজি হচ্ছে না কেউ। এই টাকা ওঁর মেয়ের এক মাসের পড়াশোনার জন্য বরাদ্দ ছিল এত দিন। জব পোর্টালে অনেক দিন সাঁতরানোর পর একটা সংস্থা থেকে ডাক পেয়েছিলেন। মাসের শেষে পঁচিশ হাজারের কথা জানতে পেরে, চাকরি চলে যাওয়া সেই চিফ ম্যানেজার ইন্টারভিউতে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘মনে হয় না আমার উপরে অবিচার করছেন আপনারা?’ টেবিলের উল্টো দিক থেকে উত্তর এসেছিল, ‘উই হ্যাভ এভরি রাইট টু ডু দ্যাট। ডোন্ট উই?’ গলায় এক দলা হতাশা নিয়ে সেই চিফ ম্যানেজার ফোনে বলছিলেন আমায়, এমন ক্রূঢ় হাসি তিনি দেখেননি কখনও।

যাঁদের সর্বনাশ হয়নি এখনও, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ব পড়ব করেও পড়েনি এত দিন, তাঁরা দুর্গে দুর্গে দুর্গতিনাশিনী বলতে বলতে পুজোয় ‘চিল’ করবেন, প্যান্ডেল হপিং করবেন। ষষ্ঠী থেকে দশমী— এই পাঁচ দিনের পাঁচ রকমের নয়া লুক নিয়ে নিশ্চয়ই মাথা ঘামাবেন বিস্তর। কোন পোশাকের সঙ্গে কোন ডিজাইনার মাস্কটা যায়, তা নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজেকে ডেমো দেবেন বার বার। ওয়ার্ক ফ্রম হোম-এর বদ্ধ জীবনে বন্দি ও ‘রেস্টলেস’ হয়ে পড়েছেন যাঁরা, পুজো শুরু হলেই বাঁধ ভাঙা জলের মতো হুড়মুড় করে তাঁরা ছড়িয়ে পড়বেন মন্ডপে মন্ডপে। হ্যাশট্যাগ ঠাকুরদেখা, হ্যাশট্যাগ সোশ্যালডিসট্যান্সিং@পুজো কিংবা হ্যাশট্যাগ আইওয়ান্টফ্রিডম বলে হাতে ভি দেখিয়ে সেলফি গ্রুপফি তুলবেন। চারদিকে পুতিগন্ধময় খালের জলের উপরে সোনালি বুদবুদের মতো সে ছবি ছড়িয়ে পড়বে ওয়ালে ওয়ালে, ইনস্টাগ্রামে। আর এঁদের থেকে অনেক বেশি মানুষ হয়তো এ বার পুজোয় ঢাকের আওয়াজে বমি করবেন বাড়ির বাথরুমে।

সামাজিক দায়িত্ববোধের পরিচয় দেওয়ার জন্য যে পুজোকমিটিগুলো কর্মহীন, অন্নহীন, মরা মাছের মতো চোখওয়ালা কিছু লোককে ত্রাণ দেবে বলে ঠিক করেছিল বাজেট কাটছাঁট করে, পঞ্চাশ হাজার প্রাপ্তি তাদের সেই ‘লস’ পুষিয়ে দেবে এতে কোনও সন্দেহ নেই। কিছু খালি গা, নিদেনপক্ষে স্যান্ডো গেঞ্জির ভিখিরি, কিংবা কপাল ভাল থাকলে কয়েকটা পরিযায়ী শ্রমিককে আলোমাখা মঞ্চে উঠিয়ে দিতে পারলে ত্রাণের মার্কেট ভ্যালু বেড়ে যায় অনেক। করোনার কল্যাণে এ বারে এমন লোকের সাপ্লাই প্রচুর। দুকেজি চাল, এক কেজি আলু, পাঁচশ পেঁয়াজ, সঙ্গে মাস্ক ও স্যানিটাইজার— এমন কম্বো ত্রাণ প্যাকেজ আর কিছুদিনের মধ্যেই রেডি হতে শুরু করবে মন্ডপের গ্রিনরুমে। শ খানেক গরীবগুর্বো, পুজো কমিটির চেয়ারম্যান, স্থানীয় কাউন্সিলর, ত্রাণের কম্বি প্যাক আর আবহে কর্কশশব্দে ‘মাতল রে ভুবন’— এমন সুযোগ বার বার আসে না।

সরকার বলে, উৎসব হলেই নাকি টাকা ঘোরে। এক হাত থেকে অন্য হাতে টাকা গেলে নাকি সে টাকা রোটেট হয়। বহু মানুষ কাজ পায়। কাজ পেলে টাকা আসে। আর টাকা এলে সে টাকা আবার ঘুরতে শুরু করে বাজারে। এই জরুরি পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদরা এমন তত্ত্বকে দুয়ো দেন। যে সময়ে মানুষের হাতে কাজ নেই, কাজ থাকলেও যে শ্রমের মূল্য তলানিতে, তখন এই ১৮৫ কোটি টাকা যদি সরাসরি হতভাগ্য, জর্জরিত মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে হয়তো অনেক পরিবার আক্ষরিক অর্থে বেঁচে যেত, অন্তত কয়েকটা মাসের জন্য। অর্থনীতির কারবারি যাঁরা, তাঁদের একটা বড় অংশ এমনটাই মনে করেন।

প্রাণের উৎসব ঘিরে অতিরিক্ত আবেগ চলতি বিপর্যয়ের কথা ভেবে যদি মুলতুবি রাখা যেত এ বছর, তা হলে হয়তো করোনার সংক্রমণেও রাশ টানা যেত আরও একটু ভালোভাবে। মাত্র কয়েক মাস আগেই আমরা প্রধানমন্ত্রীর গলায় অনুরোধ কিংবা হুঁশিয়ারি শুনেছি— যে যেখানে আছেন, তিনি সেখানেই থাকুন। আজও দেশের সাতচল্লিশ কোটি মোবাইলে রিং শোনানোর বদলে বাজানো হয়, একান্ত জরুরি না হলে ঘর থেকে বেরোবেন না। সরকারি হিসেবে বাসে আজও কেউ দাঁড়িয়ে সফর করেন না। যতগুলো সিট আছে, ঠিক তত জন লোকই বসেন। বাস্তবের বাদুড়ঝোলা ভিড় এমন ধারণার গালে সপাটে থাপ্পড় কষায়। সামাজিক দূরত্ববিধি লঙ্ঘনের যে রঞ্জি ম্যাচ দেখে আসছি গত কয়েক মাস, হলফ করে বলতে পারা যায়— দুর্গাপুজোতে তার বিশ্বকাপ। পরিস্থিতি লাগামহীন হওয়ার আগে আরও একবার ভাল করে ভেবে নিলে খুব ভুল হত কি? অনেকে বলছেন, মৃতদেহের কানে হেডফোন গুঁজে দিয়ে আনন্দধারা বহিছে ভুবনে শুনিয়ে, এই জোট-বন্দনার নেপথ্যে আসলে কাজ করছে ভোট-বন্দনার অঙ্ক। পরিস্থিতির আশীর্বাদে কাজের হাত গিয়েছে। ভাতও। প্রাণটা যেন থাকে তা দেখা দরকার।

মা দুর্গাও জানেন, আমাদের মন ভাল নেই।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2689 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. অসাধারণ একটা লেখা ।চাবুক ।কিন্তু আমোদগেঁড়ে বাঙালি বুঝবে কি!

  2. কি আর বলি? নিজেকেই নিজের লাথি মারতে ইচ্ছে করছে। সব কিছুরই শেষ আছে, এই অরাজকতা কবে শেষ হবে?

আপনার মতামত...