তারান্তিনো, সিজন দুই — চার

প্রিয়ক মিত্র  

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

কর্নেল স্লিম্যান। স্যার উইলিয়াম। উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যান। বা উইলিয়াম ঠগী স্লিম্যান।

১৮১৪ সালে লেগে গেল অ্যাংলো-নেপাল যুদ্ধ। দার্জিলিংয়ের দখল নিয়েছে গোর্খারা। গোর্খাদের হাত থেকে দার্জিলিং পুনর্দখল করল ব্রিটিশরা। সেই রেজিমেন্টেই ছিলেন উইলিয়াম স্লিম্যান। সেই অভিযান সেরে ফেরার পথে স্লিম্যানের হাতে এল একটি চাঞ্চল্যকর অপরাধের নথি।

ঘটনাটা ঘটেছে এলাহাবাদে। ‘ঘটনাটা’ বললে ভুল বলা হবে। পরপর বেশ কয়েকটা ঘটনা।

ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের যে রাজন্যবর্গ ছিল, তাদের মধ্যে সদ্ভাব মোটেই ছিল না। ফলে দুই প্রদেশের সংযোগকারী এলাকার রাস্তাঘাটের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিত না কেউই। কিছু কিছু এলাকায় রাজার শাসন ছিল কড়া। সেখানে মানুষ নিশ্চিন্তে রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে পারত। কিন্তু বেশিরভাগ স্থানেই সেই সুবিধে ছিল না। বিশেষ করে প্রবাসী কিছু দূরপাল্লার যাত্রী, জলপথে যাতায়াতে অপারগ বণিক-ব্যবসায়ী বা শরণার্থী-তীর্থযাত্রী গোছের লোকজন। তখন কোম্পানির আমল। শুধু সৈন্যদের যাতায়াতের জন্য কিছু মজবুত রাস্তা তৈরি হয়েছিল। বাকি সবই ছিল মূলত ‘মাঠান’ রাস্তা। কাঁচা, এবড়োখেবড়ো। আর সর্বোপরি যানবাহন বলে কিছু নেই। ধরা যাক, দূরদেশের উদ্দেশ্যে কোনও পথিক রওনা দিয়েছেন। তার নিজস্ব ঘোড়া থাকলে ওই অসম্ভব রাস্তায় কিছুটা সুরাহা হয়তো হবে, তাও সে ঘোড়া যতক্ষণ না হাল ছেড়ে দেয়। নইলে উপায় পদব্রজে। ফলে হত কী, রাস্তায় যাওয়ার সময় আরেকদল পথিকের দেখা পেলে, বিনা সন্দেহে সেই দলের সঙ্গে মিলমিশ করতেন যাত্রীরা। শ্বাপদসঙ্কুল জঙ্গল তো আছেই, যেখানে হিংস্র জন্তুজানোয়ারের ভয়, তাছাড়াও অশৈলী কিছুর ভয়ও থাকতে পারে।

কিন্তু যে ভয়ের কথা পথিকরা মাথাতেও আনতেন না সচরাচর, তা হল দস্যুর ভয়।

কিন্তু সেসময়ের ভারতবর্ষে এই দূরদেশের পথিকরা সবচেয়ে বেশি শিকার হতেন দস্যুদলের।

হত কী, পথিকরা নগর থেকে যাবতীয় প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করে নিতেন। তারপর রওনা দিতেন ওই পার্বত্য, অরণ্যসঙ্কুল রাস্তা ধরে। ভারতের নানা জাতির বণিকরা এই রাস্তা দিয়ে যেতেন। ফলে, ছদ্মবেশ ধরতে চাইলে যে কোনও রকম ছদ্মবেশ ধরা যায়। আর এই ছদ্মবেশের সুযোগ নিয়ে দস্যুরা পথিকদের লুঠ, খুন— সবই করত।

এর মধ্যে সবচেয়ে খতরনাক ছিল ঠগীদের দল!

এলাহাবাদে যে এই ঠগীদের দল পথিকদের লুঠ করছে, এবং নির্বিচারে খুন করছে— এ বিষয়ক নথি এল কর্নেল স্লিম্যানের হাতে। কখনও এরা ফকির সাজে, কখনও সাজে সন্ন্যাসী। কখনও বা ভিনদেশি বণিকের রূপ ধরে।

কর্নেল স্লিম্যানের অনুমান ছিল— মোগল ও তাতাররা ভারতবর্ষ আক্রমণ করার পরে ভারতে বহু লুটেরা মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্ম হয়েছিল। ঠগীদের উৎপত্তি তাদের থেকে হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু, ঠগীরা পুজো করে ভবানীর। এবং এরা মূলত হিন্দু ধর্মাচারেই অভ্যস্ত। তাহলে এরা কারা?

হিন্দু-মুসলমান— যে সম্প্রদায়ই হোক না কেন— ভারতবর্ষে এদের অস্তিত্ব বহুদিন যাবৎ। আকবর বাদশার আমলে এদের কয়েকজনকে ধরে শাস্তিটাস্তি দেওয়া হয় বটে, কিন্তু তাতে এদের পরাক্রম বিন্দুমাত্র কমেনি।

এরপর হল কী, ১৮১২ সালে ব্রিটিশ লেফটেন্যান্ট মনশেল খুন হলেন ঠগীদের হাতে। তখন থেকেই ব্রিটিশ সরকার নড়েচড়ে বসেছিল। তারপর স্লিম্যান উঠেপড়ে লাগলেন। একের পর এক দস্যু ধরা পড়তে লাগল। দেখা গেল কেবল মধ্যপ্রদেশ নয়, ভারতজুড়েই এদের অবস্থান। এদের বাসস্থান চিহ্নিত করা গিয়েছিল সিন্দৌসী পরগণার একটি পল্লীতে। সিন্ধিয়া রাজবংশকে এরা মোটা কর দিত। এছাড়াও নর্মদা উপত্যকায় নরসিংহপুর জেলার এক ম্যাজিস্ট্রেট বলছেন, সেই এলাকার জমিদার এবং রাজন্যবর্গের সঙ্গে ঠগীদের ভালই দহরম মহরম ছিল।

স্লিম্যানের আমলে অনেকে পাকড়াও হয়েছিল। সেসব ঠগীদস্যুর জবানবন্দিতে যেসব অপরাধের বর্ণনা ছিল, তা জানলে অনেকেই শিউরে উঠবেন।

যেমন কর্নেল ফিলিপ মেডোস টেলরের কাছে নিজের যাবতীয় কৃতকর্মের বিবরণ দিয়েছিলেন ঠগীদস্যু আমির আলি। সে বলেছিল, সাতশো উনিশটা খুন সে করেছে। ধরা না পড়লে তার খুনের খতিয়ান হত হাজারটা! সে ফলাও করে একথাও বলেছিল, “এই সমস্ত বীরত্বকাহিনির উপর আমার নাম লিখিত থাকিবে, সুদূর ভবিষ্যতে মানবমণ্ডলী বিস্ময় চকিতনেত্রে পাঠ করিবে, ‘ঠগীবীর আমির আলি’।”

বাংলাদেশেও ঠগীদের উৎপাত ছিল ভালোমতোই।

যাক সে কথা, মোদ্দাকথা পুলিশ বিভাগের প্রথম দিকে এই স্লিম্যানের কীর্তিকলাপ হয়ে গিয়েছিল রূপকথার মতো। কীভাবে এই দুর্ধর্ষ ঠগীদের তিনি কবজা করেছিলেন, তা নিয়ে কিংবদন্তি এখনও চালু আছে পুলিশ বিভাগে। সেই স্লিম্যানের আমলেই ঠগীদমনকারী বরকতউল্লাহ যে ‘বাঁকাউল্লার দফতর’ লিখলেন, তা পুলিশি কাহিনির সূচনা করল বাংলায়। যেখান থেকে গোয়েন্দা গল্পের ইতিহাস শুরু। যদিও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-কে সুকুমার সেন ক্রাইম কাহিনি বলেছিলেন। আবার ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘হরিদাসের গুপ্তকথা’, এবং ও সময় গুপ্তকথার যে চল…

থাক এসব কথা। গোয়েন্দা গল্পের ইতিহাস নিয়ে কচকচি করে লাভ নেই বিশেষ। আমরা বলছিলাম লতার গল্প। লতাকে নিয়ে মহেশ সেন যাচ্ছিলেন লালবাজারের পথে। সেসময় হঠাৎ আগন্তুক এই সনাতন হাজরা।

বয়স সাতের কোঠায়। জাত নীচু। কাজ ছিল পুলিশ বিভাগের খোচড়বৃত্তি। এই কাজে বাঙালিরা খুবই চোস্ত ছিল। সনাতনের ঠাকুরদা এবং বাবাও ছিলেন পুলিশ বিভাগের কর্মচারী। পুলিশের গোয়েন্দা তখন উঠে আসত বাঙালিদের ভেতর থেকেই। ১৮৫৫ সালের পুলিশ রিপোর্টে বলা হয়েছে বাঙালিরা কনস্টেবল হওয়ার অনুপযুক্ত, কিন্তু গোয়েন্দা হিসেবে তারাই উপযুক্ত। কে ভুলবে প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়কে? তবে খুব যে পোড়খাওয়া গোয়েন্দা সনাতন হাজরা ছিলেন, তাও নয়। কিন্তু এই বৃদ্ধ নীচু জাতের খোচড়টিকে পুলিশ বিভাগে সকলেই সমঝে চলত।

কারণ ওই কর্নেল স্লিম্যানের চিঠি।

ঠগীদের আমলে ছদ্মবেশে এই বাংলাদেশের একদল ঠগীকে জব্দ করেছিলেন সনাতনের ঠাকুরদা। সেই বিবরণ জানতে পেরে বিমুগ্ধ স্লিম্যান চিঠি লিখে বসেছিলেন হরিধন হাজরাকে। ইংরেজি ভাষায় লিখেছিলেন, সে চিঠির তর্জমা করেছিলেন তারই সেরেস্তার কোনও বাঙালি কর্মচারী।

যদিও হরিধনের একটি হালকা বদনাম বাজারে রয়েছে।

ঠগীদের সঙ্গে বিপুল ধনরত্ন থাকত। লুঠ করা ধনরত্ন।  সেই ধনরত্ন সঙ্গে থাকলে চট করে কেউ তাদের দস্যু বলে সন্দেহও করবে না।

সনাতনের ঠাকুরদা হরিধন যে দস্যুদলকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে যাবতীয় যা ধনরত্ন ছিল, তা সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল সেসময়। কিন্তু একটি বিশেষ রত্ন থেকে গিয়েছিল হরিধনের কাছে।

মধ্যপ্রদেশের এক মহারাজা শিকারে গিয়ে সেই রত্ন পেয়েছিলেন। জঙ্গলে এগোচ্ছেন তিনি, হঠাৎ দেখলেন একটি বিঘৎ ময়াল সাপ রাস্তাজুড়ে পড়ে।

রাজা মহা খুশি। সংস্কার হল, যদি রাস্তায় এত বড় সাপ চোখে পড়ে, তাহলে রাজার কপালে একটি দশাসই বাঘ শিকার লেখা আছেই‌।

কিন্তু সে সাপ নড়ে না! রাজা পাইকদের বললেন, যাও গিয়ে বল্লমে গেঁথে সাপের ইন্তেকাল করে রাস্তা পরিষ্কার করো।

কিন্তু তৎক্ষণাৎ মনে হল, এ সাপ যদি সৌভাগ্যের প্রতীক হয়, তাকে মেরে ফেলা কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে?

এইসব সাতপাঁচ ভেবে পাইকদের এগোতে বারণ করলেন মহারাজা।

পাইকরাও খানিক নিশ্চিন্ত হল। বল্লম দিয়ে জ্যান্ত ময়াল মারার খেয়াল ভালো লাগছিল না কারও।

রাজা একটি মস্ত গাদাবন্দুক থেকে দুটি গুলি ছুড়লেন পরপর।

ময়াল তাতেও নড়ে না!

তারপর পাইকরা সামান্য কাছে গেল বল্লম বাগিয়ে। যদি তাড়ানো যায়।

গিয়ে তারা আবিষ্কার করল, সেই ময়াল পড়ে পেটকাটা অবস্থায়।

রাজা নামলেন। কাছে গেলেন ময়ালের।

আর হঠাৎই তাঁর চোখ গেল ধাঁধিয়ে।

কী ঝিলিক মারছে ময়ালের পেট থেকে?

পাইকদের আদেশ দিলেন সেই ময়ালের পেট ভাল করে ফুঁড়ে দেখতে।

কী রত্ন বেরোল, তা জানলে কেবল চারজন পাইক এবং রাজা স্বয়ং। মোদ্দাকথা হল, সেই রত্ন রাজা কাউকে দেখাতেন না। লুকিয়ে রাখতেন। তেমনই আদেশ দিয়েছিলেন তাদের কুলগুরু।

কিন্তু রাজার শরীর ভয়ানক খারাপ হতে শুরু করল। অসহ্য অর্শের ব্যথা উঠল।

সেসময় এক বাঙালি কোবরেজ তাকে সারিয়ে তুলল। শোনা যায়, রাজপরিবারে ধারণা হয়েছিল, যে রত্ন রাজা কুড়িয়ে পেয়েছেন ময়ালের পেট থেকে, সে রত্ন আদতে অপয়া!

কোবরেজকে সেসব কিছুই বলা হল না‌। তার হাতে তুলে দেওয়া হল সেই রত্ন।

সেই কোবরেজ বাংলায় তার গ্রামের বাড়িতে ফিরছিল।

পথে ঠগীরা তার সর্বস্ব লুঠ করল। তারপর পাথর বাঁধা গামছা গলায় পেঁচিয়ে তাকে খুন করল।

লুঠ হল মহারাজার দেওয়া সেই রত্নও।

কী ছিল সেই রত্ন, সে খবর জানতেন হরিধন। পুলিশ বিভাগে কাউকে সে কথা বলেও বসেন হরিধন।

কিন্তু সব ধনরত্ন যখন বাজেয়াপ্ত হল ওই ঠগীদস্যুর দলের কাছ থেকে, তখন পাওয়া গেল না সেই আশ্চর্য রত্ন!

সাহেব পুলিশের কানে কেউ তুলল সেই কথা। নীচু জাতের নেটিভকে সাহেব পুলিশ এই মারে তো সেই মারে দশা!

এমন সময় এসে হাজির সেই চিঠি। পরিত্রাতার মতো।

কর্নেল স্লিম্যান হরিধনের এই দুঃসাহসিকতার কথা শুনে এই চিঠিখানি পাঠিয়েছেন। আর কে তাকে চোর ঠাওরায়?

শ্যামাপদ এবং সনাতন— হরিধনের এই দুই বংশধরকেও প্রায়শই শুনতে হয়েছে চোরের ব্যাটা বা চোরের নাতি। ঠগীদের সম্পত্তি যে চুরি করে সে তো আরও বড় দস্যু— এমন কথাও কেউ কেউ বলেছে।

কিন্তু প্রায় একশো বছর ধরে এই বদনামের মোকাবিলা করে এসেছে কর্নেল স্লিম্যানের চিঠিখানা।

তবে কী ছিল সেই লুঠ হওয়া রত্ন?

কানাঘুষোয় শোনা যায়, তা ছিল এক আশ্চর্য আংটি। সেই আংটির ওপর যে পাথর বসানো, এমন পাথর নাকি কেউ কোনওদিন দেখেনি।

মহেশ সেন অবিশ্যি কোনও দিন অবিশ্বাস করার সাহসও দেখাননি সনাতনকে।

‘আপনি এভাবে এই পোশাকে এই রাস্তায় কী করছিলেন?’

মহেশ সেনের বিস্ময়ভরা প্রশ্ন।

ঘোড়ার গাড়ি ততক্ষণে নিজস্ব ছন্দে ছুটতে শুরু করেছে। গাড়োয়ান মাঝে মাঝে হাঁটুতে হাত বোলাচ্ছে, আর গজরাচ্ছে।

‘আর বলেন কেন! ঠাকুর্দার আমল কবে পেরিয়েছে। তবু ডাকাতদের দলের উপদ্রব আর থামে না। এই এলাকার রায়বাহাদুর জমিদারদের বাড়িতে সম্প্রতি একদল ডাকাত হামলা করেছিল। সন্দেহ করা হচ্ছে, তারা নাকি রায়বাহাদুরেরই বরকন্দাজ। ভাবুন দেখি! ঠগীদের রাজারাজড়ারা সমঝে চলত! আর এখন সরিষার মধ্যে ভূত ঢুকে বসে! লুকিয়েচুরিয়ে ডাকাতি করে! যাক, রায়বাহাদুরের বরকন্দাজ, তাদের তো এমনি এমনি পাকড়ানো যাবে না। তাই একটু খোঁজখবর করা! তা কাজ একটু এগোতেই বরকন্দাজরা দে চম্পট! তা হঠাৎ কলকেতা থেকে তলব এল! এই বরকন্দাজদের দল আছে একখান। তার পান্ডা নাকি কলকেতায় গা ঢাকা দিয়েছে!’

মহেশ সেন আর থাকতে পারলেন না।

বলে উঠলেন, ‘আচ্ছা, চিঠিখানা কি এখন আপনার কাছে?’

প্রাজ্ঞ হাসি হাসলেন সনাতন হাজরা। যেন অপেক্ষাই করছিলেন এই প্রশ্নের।

‘উপায় আছে না থেকে!’ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তাঁর ভেতর থেকে। ‘ঠাকুরদার কীর্তিতে তো আমাদের এখনও বুক ফুলিয়ে ঘোরার কথা। কিন্তু আপনি তো জানেনই, কী অপবাদ আমাদের সহ্য করতে হয়েছে। এই চিঠি সম্বল করে আমাদের কোথায় পৌঁছে যাওয়ার কথা! তা তো হলনে, এখনও খোচড়গিরি করেই চলছে।’

‘আসলে যুগ পালটে গেছে হাজরামশায়! ঠগীদস্যু ধরার বীরত্ব এ আমলে কজন বুঝবে?’ লতাকে আড়চোখে দেখে মহেশ সেন বলতে শুরু করলেন, ‘এ আমলে ডাকাতদের চেহারাও অন্যরকম! তারা দেশের নাম করে ডাকাতি করে। ডাকাতির জন্য নাকি সে ডাকাতি নয়, তা নাকি ব্রিটিশ তাড়ানোর জন্য। ভাবতে পারেন? আপনি-আমি কোথায় থাকতাম ব্রিটিশ না থাকলে? আর এরা কিনা…’

লতা ততক্ষণে অন্যমনস্ক।

পড়াশোনার নেশা তাকে মা ধরিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু মৃন্ময়দাদা না থাকলে সে নেশা তার বাড়ত না।

সেই মৃন্ময়দাদার টানেই তো দেশের কাজ করতে আসা।

পুরুষের ঠোঁটের স্বাদ কেমন, তা জানত না লতা। রমার ঠোঁটই শুধু চিনত সে। নিজের ঠোঁটের ফাঁকে যা যখনতখন আঁকড়ে ধরা যায়।

কিন্তু মৃন্ময়দাদা যেদিন পড়ানোর ফাঁকে তার কানের পাশে চুল সরিয়ে দিয়ে আচমকা ঠোঁটের ওপর ঠোঁট ছোঁয়াল, তখন সে রোমাঞ্চ শুধু যেন শরীরের ছিল না।

মা কী বুঝত কে জানে! হয়তো কিছুই বুঝত না।

তাই মৃন্ময়দাদার এ বাড়িতে প্রবেশ ছিল অবাধ।

রমার আনাগোনা অনেক কমে গিয়েছিল।

আস্তে আস্তে মৃন্ময়দাদা তাকে নিয়ে গেল সূর্যবাবুর কাছে। দিনরাত কালীপুজো হয় সূর্যবাবুর আস্তানায়। মা মা বলে কালীকে জড়িয়ে ধরে যেমনটা করেন সূর্যবাবু, তা দেখলে লতার শরীর যেন কেমন করে!

আর সূর্যবাবুর বাড়িতে রয়েছে বই। নানা ধরনের নানা ভাষার বই। সূর্যবাবু ম্যৎসিনি, গ্যারিবল্ডি, জেফারসনের সনদ, সুরেন্দ্রনাথ‌– এসব নিয়ে অনেক কথাই বলতেন মৃন্ময়দাদার সঙ্গে। লতা তার কিছু বুঝত না।

একদিন মৃন্ময়দাদাকে নিয়ে আলাদা করে ঘরে কীসব কথা বলতে গেলেন সূর্যবাবু। লতাকে বলে গেলেন, ‘তুমি বইপত্তর নেড়েঘেঁটে দেখো মা কেমন! আমরা একটু কথা বলে আসছি।’

লতা টুকটাক বইপত্তর ঘাঁটছে। হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটি বিঘৎ বই।

কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত।

মা তাকে কতবার বলেছে এই বইয়ের কথা।

ওইটুকু বয়সে কত কাজ করে গেছে লোকটা!

টেবিলে যত্ন করে বইটা রেখে পাতা উলটোতেই তার হৃদস্পন্দন থেমে গেল মুহূর্তে।

বইয়ের পাতার মাঝখানে অনেকটা অংশ কেটে ফাঁক করা, একটা বাক্সের ভেতরের মতো জায়গা করা।

সেখানে শোভা পাচ্ছে একটি পিস্তল!

লতা থমকে আছে। এমন সময় সে তার ঘাড়ের কাছে একটি গরম প্রশ্বাস অনুভব করল।

সে তাকানোর আগেই মৃন্ময়দাদা তার কোমর জড়িয়ে তার ঘাড়ে একখানা চুমু খেল।

তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, ‘তুই হবি আমার মৃন্ময়ী, আমাদের মৃন্ময়ী। আজ থেকে তুই আমাদের দলে।’

 

আবার আগামী সংখ্যায়

*ঠগী সংক্রান্ত তথ্য এবং উদ্ধৃতি ফিলিপ মেডোস টেলর প্রণীত ‘Confessions of a Thug’-এর বঙ্গানুবাদ ‘ঠগীকাহিনী’ থেকে সঙ্কলিত।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2689 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...