মৃত পরিস্থিতির সুরৎহাল

রোমেল রহমান

 

মধ্যরাত্রে আঙ্গুরির ঘুম ভেঙে যায় এবং সে দেখে তার স্বামী আচকান মাঝি ঘরের মধ্যে সাঁতরাচ্ছে! প্রথমে আঙ্গুরির মনে হয় সে স্বপ্ন দেখছে। তারপর তার মনে হয় স্বপ্ন না ঘন তন্দ্রায় সে ডুবে আছে। কিন্তু তার কয়েক মুহূর্ত পর আঙ্গুরি টের পায় সে যা দেখছে তা সত্য! ফলে আঙ্গুরি ধড়মড় করে উঠে বসে এবং তার শরীরের ব্যস্ত নাড়াচাড়ায় পুকুর হয়ে ওঠা ঘরটার জলের মধ্যে নাড়াচাড়া পড়ে যায়, জল খলবল করে ঢেউ তোলে। আচকান মাঝি তার চিরায়ত স্বরে বলে ওঠে, উঠছস বউ? এই দ্যাখ ঘরের মইধ্যে কী কারবার? আঙ্গুরি পাথরের মতো স্বরে বলে ওঠে, আমার ভর করতেছে! আচকান মাঝি বলে, পরথম পরথম এট্টু ভয় ভয় লাগে, কিন্তুক তারপর ভাইসা গেলেই আরাম! পেরেশানের কারবার শ্যাস! আয় বউ ওঠ! সাঁতার দে! সাঁতার দিলেই ভাইসা যাবি! দুইজনে ঘরের মইধ্যে এট্টু শান্তিতে সাঁতরাই, আয়! আঙ্গুরি বলে ওঠে, এইসব কী হইতেছে আমাগের সাথে? আচকান মাঝি বলে, যা হবার হইতেছে, আমাগের আটকাবার উপায় নাই! তয় আইজকা জেবনের এট্টা খোয়াব বাস্তব হইতেছে; আয় দুইজনে সাঁতরাই! এই দ্যাখ, আমি কত্ত উপ্রে, চাঙ্গের কাছাকাছি! আঙ্গুরি বলে, এইটা কেমন জল ভেজা ভেজা লাগতেছে না যে? আচকান মাঝি বলে, বলদা মেয়েছেলের মতন কথা কইস না বউ! এইটা কি তোর ভৈরব নদী পাইছস যেইখানে আমি নৌকা বাই! আমার বাপ-দাদা যেই নদীর ঘোলাজলে মাঝিগিরি করত সেই নদী পাইছস? এইটা হইল জলের ছায়াজল! বুঝছস? আঙ্গুরি বলে, আপনের মাথা খারাপ হইসে! ভুলভাল বলতেছেন! আচকান মাঝি বলে, চিন্তা নিস না বউ! সামনের মাসে নৌকায় এঞ্জিন লাগায় ফেলব ইন্সাল্লা! তারপর ভট্‌ ভট্‌ ভট্‌ ভট্‌! পেসেঞ্জার আর পেসেঞ্জার! পারানির টেকায় টেকায় টেঁকের খইতা ভইরা উপচায় পড়বো! বাজার করতে গিয়া খালি হাতে ফিরা আসা লাগব না! আমার মা ফাতেমারে মামাবাড়ি থিকা ফিরায় নিয়াসবো! দেখিস! আঙ্গুরি সাঁতার দিয়ে পুকুর হয়ে ওঠা ঘরের মধ্যে ভেসে ওঠে। আচকান মাঝির গা ঘেঁসে এসে তার হাত ধরে বলে, সংসার চালাইতে না পারার জন্যে আপনের অন্তরে বিষম দুঃখ তাই না? আচকান মাঝি বলে, নাহ! আমার কোনও দুঃখ নাই! তোর ভাই আছিল বইলা অন্তত মাইয়াটারে তাগের কাছে রাইখা আসতে পারছি! যদি হেরা না থাকত তাইলে কী করতাম? মাইয়া বিক্কির কইরা দিতাম হোসেনের মতন। সেই পাপ তো করা লাগে নাই! দুঃখ কিসের তাইলে? আঙ্গুরি বলে, ফাতেমা যদি আরেট্টু বড় হইত তাইলে বিয়া দিয়া দিতাম! কিন্তুক কী করব কন? যা করছি আমাগোর ভালর জন্য করছি! আচকান বলে, বাদ দে হাবিজাবি! আয় সারা ঘর সাঁতার দিই! ছোটকালে বাপের সাথে যহন নৌকা চালাইতাম, রাইতে ঘরে ফিরা আসলে মনে হইত আমার ঘরটা একটা নদী! আমি নদীর তলায় শুইয়া আছি! ভাবছিলাম ডুবুরি হব! কিন্তুক হইলাম যাইয়া সেই মাঝির পোলা মাঝি! বাপের এট্টা ঠ্যাং হাঙ্গরে টাইনা নিয়া গেছিল! পেসেঞ্জারেরা কইত ল্যাংড়া মাঝি! আর অন্য মাঝিরা ফিসফাস কইরা কইত বাপের ঠ্যাং গেছে গুলি খাইয়া! আমি অবশ্যি এইসব বিশ্বাস করতাম না। আমি বিশ্বাস করতাম, বাপের ঠ্যাং হাঙ্গরে কামড়ায় নিছে। আমার সাহসী বাপ নদীতে ঝাঁপ দিয়া সেই হাঙ্গর মাছরে জাপটায় ধইরা খুন কইরা ডাঙ্গায় তুলছে তারপর পেট ফাইরা পা বাইর করছে! তারা দুইজনে এইসব আলাপ করে আর সারা ঘর সাঁতরায়! একবার তারা সাঁতার দিতে দিতে খাটের নিচে যায়, বন্ধ জানালার ফাঁক ফোকর দিয়ে বাইরে দেখে। বন্ধ ট্রাঙ্কটা খুলে দেখতে গিয়ে ফাতেমার রেখে যাওয়া পুতুলটা জড়িয়ে ধরে আঙ্গুরি হুহু সুরে কেঁদে ফেলে। আচকান মাঝি আঙ্গুরিকে জড়িয়ে ধরে ভেসে ওঠে শুশুকের মতো জলের উপরে। যেন দম ফুরিয়ে গিয়েছিল দুইজনের একটু দম নিয়ে আবার তারা জলে ডোবে। আচকান বলে, চিন্তা নিস না বউ। এঞ্জিন লাগায়ে টেকা আসলেই মাইয়ারে নিয়াসবো! এই কয়দিন জানে বাঁচুক! তারপর কী হইসিল জানস বউ? আমার বাপে হাঙরের পেটের থিকা পা বাইর কইরা আমাগোর ভিটার এক পাশে কবর দিসিল! আঙ্গুরি বলে, আপনার ভাগের সেই জমিটাও গত বচ্ছর বিক্কির কইরা এই নাও কিনলেন! এহন ইঞ্জিনের টেকা পাইবেন কই? আচকান বলে, লোকে কী কইত জানস? আমার বাপরে নাকি জলপুলিস গুলি করছিল, সেই গুলিতে তার পা গেছে! সেইবার নাকি দেশের সব লবণ আচানক হাওয়া হইয়া গেছিল! বাজারে কোথাও লবণ নাই! কারবারিরা সব লবণ জমা রাইখা দাম বাড়াইতেছিল! ঘাটের একটা গোডাউন ভাইঙ্গা লুট হইল লবণ। আমার বাপ এক বস্তা নিয়া নাকি নৌকা ছাড়ল! কিন্তুক পৌছাইতে পারল না! গুল্লি খায়া চিত আমার বাপ! লবণ ফেলায় দিল ভৈরবের পানিতে! আঙ্গুরি বলে, কন কী এইসব? আচকান বলে, হ! আমার অত সাহস নাই আমার বাপের মতন! ছোটকালে হাঙ্গরের গল্পটাই বিশ্বাস করতাম তয় আইজকাল আমার বিশ্বাস হয়, লবনের গল্পটাই সত্য! আঙ্গুরি বলে, আসেন! ঘুমাই! ভোর হইয়া আসতেছে! আচ্ছা মাছেরা কেম্নে ঘুমায় পানির নিচে? আচকান মাঝি বলে, তা জানি না তয় এইটা জানি যে মরলে মাছ ভেটকায় ভাইসা উঠে পানির উপ্রে! আঙ্গুরি বলে, আসেন আরেকটুস সাতরাই! তারপর ঘুমাইতে যাই।  সকালে যদি এই পানি না থাকে ঘরের মইদ্দে! বাকি জীবনে যদি না পাই ঘরের মইদ্দে নদী! তারপর তারা দুজন তুলকালাম সাঁৎরাতে থাকে জলাশয় হয়ে ওঠা ঘরের মধ্যে।  তাদের খেয়াল থাকে না বা তারা খেয়াল করতে চায় না যে রাত্রি ফুরিয়ে আসে।

পরের দিনের পরের দিন খবরের কাগজে আসে,

‘হতদরিদ্র মাঝি দম্পত্তির অস্বাভাবিক মৃত্যু!’

এই সংবাদ কয়েকদিন চলে এবং আমরা স্থানীয় সংবাদপত্র থেকে জানতে পারি যে, ক্রমবর্ধমান বাজারদরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে অভাবের তীব্র তারনায় কদিন আগে আঙ্গুরি এবং আচকান মাঝি তাদের একমাত্র কন্যাকে নিঃসন্তান শ্যালকের কাছে দিয়ে আসে।  কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সুরৎহাল রিপোর্টে আত্মহত্যা বা হত্যার কোন আলামত পায় না পুলিশ! ইঞ্জিন কেনার জন্য ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট ছেলেটা বিরক্ত চোখে ফিরে যায়, এ মাসে তার টার্গেট পুরনের শঙ্কা নিয়ে। আচকানের নৌকাটা নদীতে ভেটকায় ভেসে থাকা মরা মাছেরে মতো ভাসতে থাকে। আচকানের শ্যালক বিক্রি করে দিয়ে যায় নৌকাটা। দ্বিতীয় দফা সুরৎহাল করার পরও হত্যা বা আত্মহত্যার কোন আলামত না পেয়ে পুলিশ হতাশ হয়। সন্দেহ ভরা চোখে গঞ্জের লোকেরা আলাপ করতে থাকে চারদিকের পরিস্থিতি এবং এই স্বাভাবিক মৃত্যুর অস্বাভাবিক কারণটা আসলে কী?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2689 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...