তাৎক্ষণিক তালাক সম্পর্কে দুএকটি কথা

সাদিক হোসেন

আমাদের পরিবারে কেউ তালাকপ্রাপ্ত হয়নি।

প্রাথমিকভাবে উপরের বাক্যটিকে অত্যন্ত সরল মনে হতে পারে। কিন্তু খেয়াল করলে বোঝা যাবে বাক্যটি আসলে একটি কূটাভাস তৈরি করছে। এই বাক্যটির মধ্যে ‘প্রতিষ্ঠা’ ও ‘সম্ভাবনা’ প্রায় পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। ‘আমাদের পরিবারে কেউ তালাকপ্রাপ্ত হয়নি।’-– এই ঘোষণাটির মাধ্যমে আমি আপনাদের সামনে আমাদের পরিবারের একটি ছবি তুলে ধরেছি। আমি যেন বোঝাতে চাইছি, আমাদের পরিবারের পুরুষেরা অতটাও মৌলবাদী নয়। তারা মেয়েদের সম্মান করে। মেয়েদের অধিকার সম্পর্কে তারা বেশ সজাগ।

অন্যদিকে এই বাক্যটির ভেতর, ঠাণ্ডা সাপের মতো, এক প্রবল সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে। যেখানে ‘আমাদের পরিবারে কেউ তালাকপ্রাপ্ত হয়নি’ বাক্যটি অতি সহজেই ‘এখনও অবধি আমাদের পরিবারে কেউ তালাকপ্রাপ্ত হয়নি’ বাক্যে পরিণত হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে ‘এখনও অবধি’ শব্দটি শুধু আর সময় বোঝাচ্ছে না; এটি একটি সামাজিক ব্যাধিকেও প্রকাশ করছে। ‘এখনও অবধি’ বলতে আসলে তো আমি ‘যেকোনও সময়’কেই বোঝাতে চেয়েছি। অর্থাৎ, যেকোনও সময়ে যেকোনও মুসলিম পরিবারে যে কেউ তালাকপ্রাপ্ত হয়ে যেতে পারে।

এমন একটি সম্ভাবনাকে জিইয়ে রেখে একটি পরিবারের মূল্যবোধ কীভাবে তৈরি হয়? প্রশ্নটি রেখেছিলাম আমি আমার মায়ের কাছে। মা আমাকে পাল্টা আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। বলল, এটা তো তুই ভাল বলতে পারবি।

প্রথমে মনে হয়েছিল, মা হয়ত উত্তরটা দিতে চাইছে না। তাই যা হোক করে প্রশ্নটাকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছে। কিন্তু মায়ের উত্তরের মধ্যেই আসলে প্রশ্নটাকে প্রশ্ন করা ছিল। একটা তীব্র হেঁয়ালি ছিল যা আমি ধরতে পারিনি। কিংবা এটাও হতে পারে, স্বামীর মৃত্যুর পর যেহেতু সে এই ‘সম্ভাবনা’ থেকে এখন মুক্ত, তাই হয়ত প্রশ্নটি তার কাছে অবান্তর ঠেকেছে। তাই হয়ত সে বলতে চাইছে, আমি প্রশ্নটি কেন আমার বাবা বেঁচে থাকাকালীন তাঁকে করতে পারিনি? তবে কি আমার মা আমাকে সন্দেহ করছে? সন্দেহ করছে আমি অলরেডি কোনও সেফ সাইড নিয়ে ফেলেছি কি না? তবে কি যেহেতু আমি পুরুষ, এবং আমার বাবার মতোই যেকোনও সময় আমার স্ত্রীকেও তালাক দেবার অধিকার নিয়েই আমি বড় হয়েছি-– তাই কি সে, আমার মা, ক্রমাগত আমাকে ধন্দে ফেলে দিতে চাইছে?

আমি প্রশ্নটিকে আরও তীক্ষ্ণ করে দিই। তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, আচ্ছা তোমরা যখন ঝগড়া করতে কখনও কি তোমার মনে হয়েছে বাবা তোমাকে তালাক দিয়ে দিতে পারে?

মা হাসে। কোন উত্তর দেয় না।

আমি আবার বলি, তার মানে ঝগড়া করবার সময় তুমি সবসময় সজাগ থাকতে। নিজের জন্য একটা গণ্ডি কল্পনা করে নিয়েছিলে। তুমি জানতে এই গণ্ডি তুমি কোনওদিনও অতিক্রম করবে না। এই যে তালাক নিয়ে এতসব তথ্য আমাদের সামনে উঠে আসছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, খুব কম শতাংশ মুসলিম মহিলাই তালাকপ্রাপ্ত হয়েছে। তার মানে কি এই যে, সেই কল্পিত গণ্ডিটা এতটাই ডিফাইনড্ হয়ে গিয়েছে, এতটাই সুনির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছে এর অস্তিত্ব যে প্রত্যেক মহিলাই এই গণ্ডিটার ভেতর নিজেকে আবদ্ধ করে রেখেছে? আর যদি তাই হয়, তবে এটা তো বলাই যায় যে তোমরা টেনশন পেতে পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছ, আর কিছু নয়। তালাক না পাওয়াটা একটা অভ্যেস, আর উল্টোটা বদভ্যাস।

মায়ের উত্তরটা বেশ আকর্ষণীয়। মা এবারও হাসল। এবং আমি আরও গভীর ধন্দে পড়ে গেলাম।

রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটি বেশ জটিল। কখন যে রাষ্ট্র একটি মানুষকে ‘ব্যক্তি’ হিসাবে দেখে, আর কখন যে তার গোষ্ঠীর আইডেন্টিটিটাই প্রধান হয়ে যায়-– তা বোঝা বেশ মুশকিল। তালাক নিয়ে বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের অবস্থানে বোঝা যাচ্ছে, তারা বিষয়টিকে গোষ্ঠীর আইডেন্টিটির নিরিখেই দেখছে। তাই পক্ষে বিপক্ষে জনমত গঠনের এই হিড়িক।

এই জনমত গঠনের একটি প্রণালী হল, ‘নির্দিষ্ট’ গোষ্ঠীটিকে ‘অপর’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়া। তালাক সম্পর্কিত জ্ঞানতত্ত্বে এই প্রকল্পটিকে আমরা সুস্পষ্টরূপে চিহ্নিত করতে পারি। তালাক সম্পর্কিত প্রধান যে অভিযোগটি ওঠে, তা হল-– ‘ওদের’ ভেতর থেকে প্রতিরোধ গড়ে না উঠলে কিছুই করা যাবে না। অর্থাৎ, এখানে ধরেই নেওয়া হচ্ছে, যেসব মুসলিম মহিলারা তালাকপ্রাপ্ত হয়েছে, এবং যারা প্রতিনিয়ত এই সম্ভাবনার মধ্যে জীবনযাপন করছে, তারা শুধুই ‘মুসলিম’ সমাজের অংশ, ‘আমাদের’ সমাজের অংশ নয়। ‘আমরা’ শুধুমাত্র তাদের ‘ইনিশিয়েটিভ’গুলোর পাশে দাঁড়াতে পারি। ‘আমাদের’ দায়িত্ব এইটুকুই, আমাদের কর্তব্য এটাই।

দ্বিতীয় অভিযোগটি হল-– শিক্ষিত মুসলমানরা এটা নিয়ে অতটা ‘ভোকাল’ নয় কেন? ‘শিক্ষিত মুসলমানরা’ আমাদের রাষ্ট্রের কাছে ট্রান্সপারেন্ট গ্লাসের মতো। তাদের অস্তিত্ব আছে, কিন্তু উপস্থিতি নেই। তাদের কথা কেউ শোনে না। মাঝে মাঝে নিজেদের প্রয়োজনে রাষ্ট্র তাদের ব্যবহার করে। এই যেমন, এইসব তর্ক-বিতর্কে ‘শিক্ষিত মুসলমান’ শ্রেণিটিকে একটি একরৈখিক এন্টিটিতে পরিণত করা হয়ে গেল। আমরা প্রশ্ন করতে ভুলে গেলাম, এই শিক্ষিত মুসলমানদের আমরা কবে কোথায় মুসলমানদের প্রতিনিধি হিসাবে স্বীকার করেছি! কিংবা কোনও গোষ্ঠীর প্রতিনিধি কীভাবে নির্মিত হয়-– এই জটিল প্রশ্নগুলিকে কেন আমরা ক্রমাগত পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছি?

আমাদের বাড়ির সামনে একটা মাঠ ছিল। সে মাঠের মাঝখানে একটা কাঁঠাল গাছ ছিল। তখন আমরা ছোট, একদিন দেখলাম, গাছটিকে কেটে ফেলা হয়েছে। কেন? না ওখানে একটা ঘর তৈরি হবে। তা সেই অনুযায়ী, মাটি খোঁড়া শুরু হল। আর একফুট মাটি কাটা হয়েছে কি হয়নি, মাটির ভেতর থেকে কত বছরের পুরনো ইট বেরিয়ে এল। আমরা অবাক। আমরা তখন রূপকথা পড়ি, আশ্চর্য দুনিয়ার বাসিন্দা আমরা, আমরা ভাবলাম-– হরপ্পার মতো, সিন্ধু সভ্যতার মতো, কোনও এক লুকনো সভ্যতা এইখানে টিঁকে ছিল কোনও এক সময়। মরা কাঁঠাল গাছটার শিকড়-বাকর যেন সেই সভ্যতার প্রবেশদ্বার।

বাবা আমাদের ভুল ভাঙিয়ে দিল। বাবা বলল, আরে ধুর, সভ্যতা ওইভাবে হয় নাকি! এখানে তো আংরেজ বিবির ঘর ছিল।

–কে উনি?

–আমাদের সম্পর্কে কেউ না। প্রতিবেশী বলতে পারিস। ওনাকে ওনার বর তালাক দিয়েছিল। গরীব মানুষ, আর যায় কোথা, তোর দাদাজী এই ঘরটা তখন বানিয়ে দিয়েছিল। সে-ই কবেকার কথা। আমার নিজেরই ভাসা ভাসা মনে আছে!

বাবা ঠিকই বলেছিল। সভ্যতা এইভাবে গড়ে ওঠে না। আমি এখনও এটা বিশ্বাস করি। মাটি খুঁড়লে এখনও ইট বেরিয়ে আসবে, ভাঙা কাচ, ভাঙা জানলা, ভেঙ্গেচুরে যাওয়া জীবন বেরিয়ে আসবে-– এগুলি যাপনের চিহ্ন হতে পারে-– সভ্যতার চিহ্ন এগুলো নয়।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায় আসলে তো সেইসব ভেঙে যাওয়া, নুইয়ে যাওয়া মহিলাদেরই জয়। সেইসব আংরেজ বিবি যখন তার ফেলে আসা জীবনের দিকে তাকাচ্ছে-– মেঘের মতো, বৃষ্টির মতো, ঝড়ের মতো যাবতীয় বন্ধন নয়ছয় হয়ে যাচ্ছে যেন।
এই রায় পিছিয়ে থাকা মহিলাদের জীবনে কতটুকু আলো আনতে পারে তা নিশ্চয় সময় বলবে। তবে এগোতে গেলে সামনের দিকে তাকিয়ে এগোনোই শ্রেয়। তাতে হোঁচট খাবার সম্ভাবনা কমে। এতদিনে আমরা অন্তত সামনের দিকে তাকাতে পারলাম।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1912 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...