গদ্যগুচ্ছ

দময়ন্তী দাশগুপ্ত

 

গল্প দেখা, গল্প শোনা

সবার একটা করে গল্প থাকে, সব্বার। ওই যে বুড়ো ট্রাম ড্রাইভারটা ক্রসিংয়ে ট্রামটা দাঁড়ালেই মাঝের দরজা দিয়ে এসে সামনের সিটটায় বসে পড়ছে, ওর ক্লান্ত মুখের ভাঁজে ভাঁজে কোথাও একটা আলগা সুখ-দুঃখের কাহিনী লেগে রয়েছে যেন। ভাগ্যিস সামনের সিটটায় বসিনি। ইস, রোজ সারা রাস্তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ট্রাম চালাতে হয়। মোটাসোটা কনডাক্টরটারও বয়স হয়েছে। শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের ক্রসিংয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কী কথা বলে যায় ড্রাইভারের সঙ্গে। ওর কথা বলার ধরণটার মধ্যেও যেন একটা গল্প আড়মোড়া ভাঙে।

ট্রাম চলে টুং টাং সুর তুলে। জানলার ধারে বসে দেখতে দেখতে যাই। পুরোনো ইমারতের ইট-কাঠে, বড় বড় গাছেদের পাতায় পাতায় কত না গল্প লেগে আছে। রাস্তায়, বাসের চাকার দাগে বয়ে চলে কাহিনীরা।

ওই যে লোকটা ছাতা মাথায় দিয়ে আপনমনে হাসতে হাসতে আসছে গল্পটা ওর হাসিতে আছে না পুরোনো ছাতার গায়ে তা আমার জানা হবে না কোনওদিনও। পথের ধারের দোকান থেকে খাবার খেয়ে আলগোছে জল খায় বউটি, চেহারা-পোশাক দেখে খুব সাধারণ ঘরেরই মনে হয়। ওই তো আরেকজন হাঁটতে হাঁটতে হাসপাতালের গেট দিয়ে বেরিয়ে আসছে, সুখ-দুঃখ কিছুরই আভাস নেই মুখে। অথচ এদেরও আঁচলের খুঁট খুললে ঠিক কিছু না কিছু গল্প মিলবে, মিলবেই। আর ওই যে ঠেলাওলা তার বোঝাখানি ঠেলার ওপর চড়িয়ে আস্তে আস্তে ব্রিজ পেরোচ্ছে, ঘাম গড়িয়ে নামছে কপাল বেয়ে, ওর ওই ঠেলায় শুধুই কী আর দরকারি জিনিস আছে, একটা নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় গল্পও কি লুকিয়ে নেই কোথাও?

শেষ স্টপেজ এসে গেছে প্রায়। জানলা দিয়ে ফিরে দেখি, রাস্তার ধারে পিছনে পড়ে রইল ফলওলারা, তাদের ঝুড়ি বোঝাই টক-মিষ্টি গল্প নিয়ে। কনডাক্টর তাড়া দেয়। আমি কাঁধে ব্যাগ, হাতে মেয়ের বইয়ের প্যাকেট আর মাথায় একরাশ গল্প নিয়ে আবার পথে নেমে পড়ি।

 

উপন্যাসের চরিত্রেরা

কেউ কেউ উপন্যাসের চরিত্রের মতো হয়।

সেইসব কাহিনীর যা বারবার পড়লেও আবারও পড়তে ইচ্ছে করে। এবং তারপরেও পুরোনো হয় না। আবার কেউবা প্রায় অপঠিত বইয়ের পাতা থেকে নেমে আসে।

কিন্তু এমন সব জটিল চরিত্ররা যখন বাস্তবে হাজির হয় সত্যি সত্যি তাকে মেনে নিতে পারাটা শক্ত হয়ে যায়। গতানুগতিকতায় অভ্যস্ত মানুষ। সাধারণকে নিয়েই তার ঘর-সংসার। চেনা কাঠামো ভেঙে গেলে তাকে মানতে পারে না মন থেকে।

তবু উপন্যাসের চরিত্রেরা জন্ম নেয় রোজকার জীবন থেকেই। চিরকাল।

 

একলা থাকার খুব দুপুরে

দুপুরের এই গনগনে রোদ্দুরটার মধ্যে একটা হু হু মনখারাপ লুকিয়ে থাকে। এই মনখারাপটা খুব চট করে টের পাওয়া যায় না শীতের বিকেলের মতো। খানিকটা লু বা গরম ধুলো বয়ে যাওয়ার মতো লাগে ভেতরে ভেতরে। ছেলেবেলার এমনি গরমের দুপুরে ঘুঘুর একটানা ডাক কিংবা হঠাৎ করে কাকের আর্ত চিৎকার সেই অনুভূতিটাকে আরও বিষণ্ণতার দিকে নিয়ে যেত।

এইরকম গরমের দুপুরে একা একা থাকলে কত মুহূর্ত, কত মুখ, বইয়ের পাতার কত চরিত্র মনে ভিড় করে আসে। নিশ্চিন্দিপুরের গ্রামের বালক অপুর বাঁশের কঞ্চি হাতে ঘুরে বেড়ানো কি দুর্গার ছেঁড়া আঁচলে কাঁচা আম কুড়িয়ে বাঁধার দৃশ্য সত্যি বলে মনে হয়। বৃষ্টি পড়লে পুরোনো যে স্মৃতি যে মনকেমন ভেসে আসে সে আবার ভিজে ভিজে। গরমের দুপুরের স্মৃতি কিছুটা রুক্ষ, উদ্‌ভ্রান্ত।

সেই যে বুড়ো লোকটা আমাদের কাছ থেকে পুরোনো খবরের কাগজ কিনত, অনেকদিন আসেনি এর মধ্যে, শুনলাম অসুখ করে দেশে গিয়ে মরে গেছে। এমনি কত রোদের দুপুরে বারান্দার নীচ থেকে ওর চেনা গলার ডাক ভেসে আসত, ‘কাগজওলা… কাগজ… লোহা বেচবে…।’ একদিন কী কারণে যেন এমন দুপুরে লেকটাউনের একেবারে শেষের দিকে একটা চওড়া গলি দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখলাম নির্জন রাস্তায় ও হাঁকতে হাঁকতে যাচ্ছে মাঝে মাঝে ওপরের দিকে তাকাতে তাকাতে, কেউ যদি ডাকে।

মাঝে একবার অনেকদিন আসেনি, ভাবছিলাম শরীর-টরির খারাপ হয়নি তো? হঠাৎ করেই আবার হাজির। ভারী খুশি খুশি ভাব। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, রাজস্থান বেড়ানোর শখ ছিল অনেকদিনের। এদ্দিনে খানিক টাকা জমিয়ে আর ছেলের কাছ থেকে আরও কিছু নিয়ে বেড়িয়ে এসেছে রাজস্থান। বললাম, বেশ করেছেন, কিন্তু এরপরে আর কোথাও গেলে খবর দিয়ে যাবেন।

নাহ্‌, এবারেও খবর না দিয়েই চলে গেল কোথাও।

এই দুপুর রোদ্দুরে দূর থেকে ‘কাগজ, কাগজওলা…’ ডাক ভেসে এলেই হয়তো কখনও মনে পড়বে ওকে।

খুব গরমের দুপুরের মনখারাপের কোনও এক স্মৃতি হয়ে…।

 

পথে চলে যেতে যেতে

এক কাঁধের ওপরে গামছার ভার। লাল, নীল, সবুজ নানা রঙ, নানান রকমের ডোরাকাটা। শান্তিপুরী, বাঁকুড়া কত জায়গার নাম তার। গামছার রঙ পেরিয়ে দৃষ্টি আটকায় মানুষটির মুখে। অন্ধ!

রাত বেড়েছে। রেলগাড়ির কামরায় যাত্রীর সংখ্যা শেষ গন্তব্য ক্রমশ এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে কমছে। বিক্রেতার ভিড়ও তেমন নেই। এক যাত্রী গামছা দেখে। নানা রঙের ছোট ছোট চৌখুপী গামছা সরিয়ে একটা নীল গামছায় নজর আটকেছে তার। রঙটি ভালো লেগেছে, নেড়েচেড়ে দেখে। বিক্রেতাও যেন আপন দৃষ্টিতে দেখতে পান বিক্রেয় পণ্যটিকে ভালো লেগে যাওয়া সেই মুখটি। তাঁর মুখেও ছড়িয়ে পড়ে পরিতৃপ্তির ঈষৎ রেশ। ওপাশ থেকে আরেকজন দাম জানতে চান। কাঁধের ওপর রাখা নির্দিষ্ট গামছায় হাত রাখলেই বিক্রেতা গামছার নাম আর দাম বলতে থাকেন। আশি টাকা, একশো টাকা, দুশো টাকা, আরও দামীও রয়েছে। কোনওটা মেলে দেখান। জোড়া লাগানো রয়েছে লম্বা করে ছড়িয়ে ধরেন দুহাতে। আমি দেখতে থাকি চলমান জীবনের গল্পের এক চরিত্রকে।

প্রথম ও একমাত্র ক্রেতাটি ইতিমধ্যে মনস্থির করে ফেলেছেন। একশো দশ টাকার গামছা রফা হয়েছে একশো টাকায়। নিপুণ দক্ষতায় জোড়া গামছা হাতের টানে দুভাগ করে একটা গামছা ক্রেতার হাতে তুলে দেন বিক্রেতা। যাত্রীটিও দাম মিটিয়ে ভারী খুশি হয়ে ভাঁজ করতে থাকেন ব্যাগে ঢুকিয়ে নেবেন বলে। গামছাওলা এগিয়ে গেলে পিছনের যাত্রীটিকে নিজের পুরোনো আর নতুন গামছা পাশাপাশি রেখে কেমন সস্তায় ভালো গামছা পাওয়া গেছে, কেমন সুন্দর রঙ বোঝাতে উদ্যোগী হয়েও তাঁর উৎসাহের অভাবে দুটিকেই ব্যাগে ভরে প্রসন্নমুখে সিটে বসে পড়েন।

আমার সম্বিত ভাঙে। গামছাওলা এগিয়ে গিয়েছেন অনেকটা। আমার গামছার কোনও প্রয়োজন ছিল না সত্যি। কিন্তু একটা কিনলে কী এমন ক্ষতি হত?

 

আমি খুঁজছি তোমার ঠিকানা

লেকটাউন জয়া সিনেমার ঠিক পাশের গলিতে ঢুকেই ডানহাতে একটা ঝুপড়ি দোকান আছে চায়ের। খিদে পেয়েছিল, ডিম-পাঁউরুটি বলে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। দেখছি দোকানদারের ধীরেসুস্থে বানিয়ে তোলার ভঙ্গী। আমার পাশে শ্যামলা রঙের রোগা পাতলা একটা লোক দাঁড়িয়ে দোকানদারের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল। হঠাৎ আরেকজন এসে কিছুটা চিন্তিত মুখে জিজ্ঞাসা করল, ‘এখানে প্রিয়া বিস্কুটের দোকান কোথায় আছে জানেন?’ দোকানদার ধীরেসুস্থে ঠিকানা জানতে চায়। কিন্তু জয়ার কাছে ছাড়া কোনও ঠিকানা সে জানে না। দোকানদার বলে, ‘কোন রাস্তা তাও জানো না? জয়ার পাশে তো কত কিছুই আছে।’ একদম সত্যি কথা। বিভ্রান্ত দেখায় লোকটিকে। পাশের থেকে শ্যামলা ভদ্রলোক মন্তব্য করেন, ‘এখন তো সবারই সিঁড়ির নীচে বিড়ির দোকান– সব বাড়িতেই একটা-দুটো অফিস রয়েছে, ঠিকানা না জানলে হয়?’ সবে পাঁউরুটি কাটা হয়ে ডিম গোলা হচ্ছে। আমি বলি, ফোন নম্বর তো আপনার কাছে নিশ্চয় আছে, ফোন করে ঠিকানাটা জেনে নিন। লোকটি কিঞ্চিৎ স্বস্তির মুখ করে জানায়, ‘আছে, আছে।’ দোকানদার বলে, ‘ঠিকানাটা জেনে নিয়ে বলুন, আমি সব চিনি, বলে দেব।’ লোকটি বোধহয় ফোন করতে সরে যায় এবং আর ফিরে আসে না। পাশের শ্যামলা লোকটির কথা কানে আসছে। ইতিমধ্যেই বুঝলাম লোকটি ফ্রিজ সারায়, পাকা চাকরি কিছু নেই, সামনে ছোট মেয়ের বিয়ে। সবই একই রকম হাসিমুখে বলে যাচ্ছে, দোকানদার এবং অপরিচিত আমাকে ভারী চেনা মুখ করে। ওরই মাঝে ডিম-পাঁউরুটির ঠোঙা বার করে দোকানদারের নির্দেশে। ঠোঙা হাতে নিয়ে দাম মিটিয়ে পাঁউরুটি চিবোতে চিবোতে হাঁটা দিই। ভাবতে ভাবতে যাচ্ছিলাম যে, লোকটা খুঁজে পেল কিনা দোকানটা আদৌ।

‘সারি সারি সব বাড়ি, যেন সার বাঁধা সৈন্য, সব একধাঁচ সব এক রঙ তুমি কোথায় থাকো অনন্য’ … ওই যাহ্‌, প্রিয়া বিস্কুট…!

 

তোমার নাম জানিনে, সুর জানি

গ্র্যাজুয়েশন শেষে হস্টেলের পাট চুকিয়ে একবছর বাড়িতেই ছিলাম। নানা কারণে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করে ওঠা হয়নি সেইসময়ে। বাড়ি থেকে একঘণ্টার দূরত্বে সফট্ওয়ারের একটা ডিপ্লোমা কোর্স করতে যেতাম। রোজ একই সময়ে বাড়ি থেকে বেরোতাম। একই বাসে উঠতাম। কিছুদিন পর লক্ষ করলাম এক তরুণ রোজ আমার জন্য জানলার ধারে তার পাশে সিট রেখে দেয়। সে আমার আগে ওঠে আর পরে নামে। ধীরে ধীরে আলাপ হল। রোজ নানা বিষয়ে গল্প করতে করতে একঘণ্টার রাস্তা কোথা দিয়ে দিব্যি কেটে যায়। আন্দাজ করেছিলাম ভদ্রলোক বোধহয় চাকরি করেন। একদিন নাম ধাম জিজ্ঞাসা করতে বললেন, তোমার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে। বললাম, বলুন। উনি বললেন, আমরা কেউ কারও নাম, পরিচয়, কোথায় থাকি এসব কিচ্ছু জিজ্ঞাসা করব না। আমি এমনিতেই বেশ রোমান্টিক। বেশ লাগল প্রস্তাবটা। আর কোনওদিন জানতে চাইনি। উনিও কোনওদিন আমাকে কোনও ব্যক্তিগত প্রশ্ন করেননি।

কিন্তু রোজই এই পথযাত্রাটুকুর জন্য সকাল থেকে মনটা উৎসুক হয়ে থাকত। যেদিন নিজে কোনও কারণে যেতে পারতাম না বা উনি আসতেন না, সেদিন একটু মনখারাপই লাগত। এছাড়া কিন্তু অন্য কোনও সময় ওনার সঙ্গে দেখা হত না। কেবল একদিন বাদে। সেদিন উনি আমাকে বেশ একটা বিপদ থেকেই বাঁচিয়েছিলেন। মাঝদুপুরে যখন কম্পিউটার সেন্টার থেকে বেরোতাম, জায়গাটা বেশ নির্জনই থাকত। একদিন লক্ষ করলাম একজন আমার পিছু নিয়েছে। লোকটির চোখমুখ যেরকম, আমার ওই বয়সে যথেষ্ট আতঙ্কিত হওয়ার মতোই। হয়েওছিলাম। একা প্রায় দৌড়াচ্ছি। বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছেও দেখি কেউ নেই। কী করব ভাবছি। আমার পিছনে যে লোকটা আসছিল সে কিছুটা বয়স্ক তাই গতিতে আমি এগিয়েছি। হঠাৎ দেখি রাস্তার ওপারে প্রায় বিপদতারণ মধুসূদনের মতো আমার সেই বন্ধুটি হাজির। চট করে রাস্তা পার হয়ে গল্প জুড়ে দিলাম। আড্ডায় আড্ডায় বাস এসে গেল। তিনিও আমাকে রাস্তা পার করে বাসে তুলে দিলেন। নাহ্‌, ওনাকে আমি বলিনি যে বিপদে পড়েছিলাম।

পরের বছর বিয়ে করে কলকাতায় চলে আসি। আর কখনওই সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। মুখটাও এখন একেবারে ভুলে গেছি। অর্থাৎ দেখা হলেও চিনতে পারব না আর কোনওদিনও। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে পড়ে তাঁর কথা নানা সময়ে, যখন দেখি মানুষ মানুষের কত সহজে শত্রু হয়, কত সহজে ভুল বোঝে। ভাবে লাভ-ক্ষতির বিনিময় না থাকলে বুঝি বন্ধুত্ব হয় না।

আসলে কোনও মানুষই হারায় না এ জীবনে, রাখতে চাইলে রয়ে যায় কোথাও না কোথাও।

আচ্ছা, আমাকেও কি মনে আছে তাঁর? মাঝে মাঝে একথাও মনে হয় বৈকি।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

3 Comments

আপনার মতামত...