চাও-এর চিনি দেওয়া চা চেনা চাই

সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়

 

প্রাত্যহিক বাংলাভাষা পড়াতে গিয়ে মাথার মধ্যে কিলবিল করে ভাষা সংক্রান্ত নানান চিন্তাভাবনা। ভাষাকে নতুন করে চিনতে চাই। আর সেই চেনার পথে সত্যি সত্যি নতুন কিছু ভাবনা এসে উঁকি দিয়ে যায় প্রতিনিয়ত। এই লেখায় তেমনই একটি দিক নিয়ে আলোচনা করব।

যেহেতু বিদেশিদের বাংলা পড়াই তাই তাদের ইংরিজির সঙ্গে সমান্তরালে বাংলাকে রেখেই পড়াতে হয়। আর সেইটে করতে গিয়েই খুলে যায় কত নতুন নতুন জানলা আর কত তুলনার নতুন দরজা।

সেদিন পড়াচ্ছিলাম Compulsion. অর্থাৎ বাংলায় কতভাবে এই ঔচিত্যের প্রকাশ ঘটানো যায়? সেই দিকে চোখ ফেরালে আমরা দেখতে পাব, এই ঔচিত্য বোঝানোর জন্য অনেকরকম বাক্যই ব্যবহার করতে পারি আমরা। ধরা যাক,

১) আমাকে এই কাজটা করতে হবে।

২) আমার এই কাজটা করা উচিত।

৩) আমার এই কাজটা করা দরকার।

৪) আমার এই কাজটা করা চাই।

ভাবতে গিয়ে এই কয়প্রকারের কথাই মাথায় আসছে। এর যদি ইংরিজি করার চেষ্টা করি তাহলে দাঁড়ায়,

  • I will have to do this work.
  • I should do this work./I must do this work.
  • I need to do this work.

আর চতুর্থটির ক্ষেত্রে আসলে dynamic translation করতে হচ্ছে।

একটা মজার জিনিস খেয়াল করার মতো। উপরে লেখা বাংলার প্রত্যেকটি বাক্য Passive আর ইংরিজির প্রত্যেকটি Active.

তাহলে কি চাইলেও ইংরিজিতে passive-এ বলা যায় না compulsion-এর বাক্য?

দেখা যাক,

  • This work will have to be done.
  • This work should/must be done.
  • This work is needed.
  • This work is wanted.

অতএব? দিব্য বলা যায়!

তাহলে নিশ্চই বাংলাতেও এই বাক্যগুলোর Active করা যায় অনায়াসেই? আবার দেখা যাক…

“আমাকে এই কাজটা করতে হবে” –-

খুব বেশিদূর গেলে হয়ত আমি বলতে পারি “আমি এই কাজটা করব” কিন্তু এই ‘করতে হবে’ কে কোনওভাবে কি ‘আমি’ কর্তা দ্বারা নির্ধারিত করা সম্ভব? উঁহু। “আমি কাজটা করতে হবে” একেবারেই ভুল বাক্য।

আবার “আমি কাজটা করব” আর “আমাকে কাজটা করতে হবে”-– এই দুটো বাক্যে ফারাক রয়ে যায় বিস্তর। “আমি এই কাজটা করব” আসলে আমার একটা সিদ্ধান্ত, আমার ইচ্ছে, আর তা ‘উচিত’ নাও হতে পারে, ‘দরকার’ও নাও হতে পারে। সে কেবলই আমার ইচ্ছের প্রকাশমাত্র। কিন্তু আমি যখন বলছি “আমাকে এই কাজটা করতে হবে” তার মানে একটি কাজ যা আমার অবশ্য কর্তব্য। যা ‘উচিত’।

তারমানে বাংলাভাষায় ঔচিত্যের প্রকাশ ACTIVE VOICE-এ করা সম্ভবই নয়? একটু ভেবে দেখলেই দেখা যাবে, একেবারেই তাই! বাংলা ভাষায় এই compulsion-এর প্রকাশ একেবারেই Passive.

ইংরিজির কথা যদি ভাবি, তাহলে এই compulsion আসলে Modals-এর অন্তর্গত।

সহজ করে বলতে গেলে Modals অর্থাৎ CAN, MAY, SHOULD, MUST ইত্যাদি।

এর মধ্যে SHOULD আর MUST নিয়ে আমরা একটু আগেই নেড়েঘেঁটে দেখলাম। একবার চট করে দেখে নেওয়া যাক বাকি দুটো। বাংলায় CAN আর MAY এই দুটোই আসলে একই শব্দ “পারা”।

I can do this work.

আমি এই কাজটা করতে পারি।

I may do this work.

আমি এই কাজটা করতেও পারি।

(এই করতেও-এর ‘ও’ নিয়ে আপাতত এই লেখায় আলোচনা করছি না)

সুতরাং এই capability বা সক্ষমতা অর্থে যে প্রকাশ তা আমরা Active-এ করতে পারি। পারি না কেবল এই Compulsion বা ঔচিত্যের প্রকাশ।

ব্যাকরণ, সিন্ট্যাক্স এসব থেকে জেনে নেওয়া গেল আমরা কী পারি আর কী পারি না। কিন্তু আসলে খেলা তো শুরু এর পরেই। কেন পারি না? বাংলায় কেন কিছুতেই এই ঔচিত্যকে “আমি” দিয়ে বেঁধে দিতে পারি না। কেন কর্তার সরাসরি কোনও হাত নেই সেই উচিত কর্মের উপর? এই প্রশ্ন যখন তাড়া করে বেড়াচ্ছে আমায় তখন আমি বেছে নিলাম কয়েকটা ঘটনা।

মার্কিন ছাত্র ছাত্রীদের অনেক সময়ই দেখেছি একজন অসুস্থ হলে অন্যজনের তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই। আবার মাঝে মাঝে এক দুবার দেখেওছি এর অন্যথা। কিন্তু আমাদের বড় হওয়ার সংস্কৃতির মধ্যেই রয়েছে যে যদি পরিচিত কেউ হাসপাতালে ভর্তি হয় কিংবা পাশের লোকটি যদি অসুস্থ হয় তাহলে আমার ইচ্ছে করুক বা নাই করুক ‘আমাদের দেখা করতে যেতে হয়’। অর্থাৎ এই ঔচিত্যের বোধ আমাদের পূর্ব নির্ধারিত। চয়েস নেই, অপশন নেই। এই ‘দায়িত্ব’ বা ‘কর্তব্য’র বোধ আসলে আমাদের ভিতর থেকে জাগ্রত নয়, বা আরও ঠিক ঠিক করে বলতে গেলে এই বোধ আমাদের ‘ব্যক্তিগত’ নয় এমনকী কোনও এক ‘ব্যক্তি’র ইচ্ছে বা অনিচ্ছের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং দাঁড়িয়ে আছে সমষ্টির ইচ্ছের ওপর। সমষ্টির দিক নির্দেশের ওপর। তাই ইংরেজিতে যখন বলা যায় “I should do this” এই “I”-এর প্রাধান্য চোখে পড়ে, কিন্তু বাংলায় “আমি”কে সরিয়ে রাখাই দস্তুর…

“আমাকে এটা করতে হবে”

অর্থাৎ–

“আমাকে এটা করতে হবে”

“আমার এটা করা উচিত”

“আমার এটা করা দরকার”

যখন এই বাক্যগুলো আমি বলছি তখন কি প্রশ্ন আসছে না মনে? কে ঠিক করে দিল এই ‘উচিত’ ‘দরকার’ এইগুলো?

বাঙালি সংস্কৃতির দিকে একটু মুখ ফেরালেই আন্দাজ পাওয়া যাবে এর। বাঙালি সমাজে, ব্যক্তি কোনওদিনই প্রাধান্য পায়নি, পেয়েছে পরিবার, সমাজ ও সংসার। আর তাই এই ‘উচিত’ ‘দরকার’ ‘করতে হবে’ এই সবকিছুতে মিশে থেকেছে কোনও এক তৃতীয় পুরুষের ইচ্ছে, নির্ধারিত আদেশ। হ্যাঁ, কেবল বাংলা ভাষার জন্যই নয় বরং এই সংস্কৃতির জন্যও ‘পুরুষ’ বললাম। ‘পুরুষ’কে যদি এক তন্ত্রের প্রতীক ধরে নিই তাহলে সমাজ সেই ‘পুরুষ’, সংসার সেই ‘পুরুষ’… যে পুরুষ ‘ব্যক্তি’র ইচ্ছের কথা শোনে না বরং বৃহত্তর ঔচিত্যের বাণী দিয়ে নির্ধারিত করে দেয় ‘দায়িত্ব’, ‘কর্তব্য’ কিংবা “নীতি”।

খুব কি সরলীকৃত করে ফেলছি সব? জানি না। আসলে এ তো কেবলই আমার ভাষাকে চিনতে চেয়ে সেই ভাষার হাত ধরে সমাজকে বুঝতে চেয়ে ভাষা আর সমাজের হাত ধরাধরির একটা ক্লোজ শট নেওয়ার চেষ্টা।

অন্য একটা কথা মনে পড়ল। মায়ের সঙ্গে এই নিয়ে আমার মতান্তর হয় প্রায়ই, মা বলেন “বিয়ে হয়” আমি বলি “বিয়ে করে”। অর্থাৎ কেবল একটামাত্র ক্রিয়ার তফাত, কিন্তু কী সাঙ্ঘাতিকভাবে পুরো খেলাটা ঘুরিয়ে দিয়ে চলে যায় ভাবুন তো। সত্যিই তো একটা সময় অবধি আমাদের সমাজে ছেলে-মেয়ের বিয়ে “হত”। কারণ এই বিয়েতে তাদের ভূমিকা থাকত কতটুকু? বরং অনেক বেশি থাকত সমাজ, সংসার আর বড়দের ভূমিকা। তারা শুধু পালন করে যেত নির্ধারিত “দরকার” “উচিত” “চাই” “হবে” এইসব! কিন্তু দিন বদলেছে, এখন মানুষ ‘বিয়ে করে’ অর্থাৎ সেই ‘উচিত’ ‘দরকার’ ‘চাই’ ‘হবে’-র বাধা কাটিয়ে তারা তাদের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দেয় আর তাই এই বিয়েতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে তারা ‘বিয়ে করে’। এই বিয়ের ভালোমন্দ তাদের, একেবারে তাদের ‘ব্যক্তিগত’।

আরও সহজ করে ভাবতে গেলে ছোটবেলার দিনগুলোয় ফিরে গেলেই বুঝতে পারব এর মর্ম। মা বাবার শিক্ষা সর্বদাই ছিল ‘ত্যাগ’-এর প্রতি এবং ‘সমষ্টি’র প্রতি নিষ্ঠাবান হওয়ায়! এখনও মনে পড়ে মা ভাতের গাল করে খাইয়ে দিচ্ছে আর আমি মুখের মধ্যে নিয়ে বসে আছি, সুযোগ পেলেই মুখ থেকে ফেলে দিচ্ছি। মা খুব গম্ভীর হয়ে বললেন… “তুমি কি জানো যে ভাত ফেলতে নেই? দেশের কত মানুষ খেতে পায় না, কত বাচ্চাদের খিদে পায়, তাদের কেউ ভাত দেয় না, আর তুমি ভাত পেয়েও ফেলে দিচ্ছ? জানো যারা ভাত পায় না তাদের কত কষ্ট হয়?” চোখ ফেটে জল এসছিল সেদিন, যেন আমারই জন্য দেশের এত মানুষ খেতে পাচ্ছে না, যেন আমারই জন্য আমার মতো বাচ্চাদের এত কষ্ট। তারপর থেকে ভাত ফেলতে পারি না আর কোনওদিন। কিন্তু কেন পারি না? নাহ, মা কখনও বলেননি ‘তোমার শরীর ভালো হবে ভাত খেলে’। কেন বলেননি এমন? অত ছোট বয়সে নিজের ভালো মন্দ বুঝব না তাই? ভাত যে আসলে কার্বোহাইড্রেট আর তা খুব ভালোও নয় এমন নিশ্চই বাঙালি মায়েদের আউটলুক ছিল না, তবে? আসলে মা ওভাবে ভাবতেই পারেননি আর হয়ত চানওনি যে আমিও ওভাবে ভাবি। কারণ মা চেয়েছিলেন আমাকে এই সমষ্টির সঙ্গে মিলিয়ে দিতে। আমার ঔচিত্যের বোধ এই সমষ্টিকে মাথায় রেখে জাগ্রত হোক। কারণ মায়ের চোখে সেটাই আমাদের সংস্কৃতি…! হ্যাঁ, “আমাদের”।

মার্কিন ছাত্রছাত্রীদের অনেক সহজে খাবার ফেলে দিতে দেখি, তা কি কেবলই তারা ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রি বলেই? প্রথম বিশ্বের অহংকারে না প্রাচুর্যে? কিন্তু কেবলই কি অর্থনীতি? এর মধ্যেই কি জড়িয়ে নেই তাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি? তাদের সমাজে ‘individual’ বা ব্যক্তির মূল্য অনেক বেশি। তারা নিজেদের “আমি” ভাবতেই বেশি স্বচ্ছন্দ, তারা সমষ্টির নিরিখে নিজেদের দেখতে অতটাও অভ্যস্ত নয়। আর এখান থেকেই যদি ভাষার দিকে ফিরে তাকাই, এবার কি একটু সহজ হয়ে আসে না সেই দুটো বাক্য?

I have to do this.

আমাকে এটা করতে হবে।

ইংরিজি বাক্যটির মধ্যে সেই ঔচিত্যের বোধ এক ব্যক্তির। আর বাংলা বাক্যটির মধ্যে সেই ঔচিত্যের বোধ সমষ্টি থেকে পাওয়া, বা বাইরের কোথাও থেকে। যেন নেপথ্যে কেউ ঠিক করে রেখেছে কর্তব্য।

“আমার এই কাজটা করা চাই”

“তোমার এই কাজটা করা চাই”

“তার এই কাজটা করা চাই”

এইসব বাক্যতে বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা মাঝে মাঝেই subject-এর সঙ্গে মিলিয়ে লিখে দেয়—

“তোমার এই কাজটা করা চাও

“তার এই কাজটা করা চায়

তাদের দোষ নেই, হয়ত তার কিছুদিন আগেই তাদের শিখিয়েছি ক্রিয়ার প্রথম পুরুষ, দ্বিতীয় পুরুষ ও তৃতীয় পুরুষ! কিন্তু এইরকম লিখলে লাল পেন দিয়ে কেটে দিতে হয় আর তখনই তাদের প্রশ্ন “এমন কেন করা হল?”

ঠিকই, কেন ক্রিয়ার পুরুষ বদলে গেল না? কেন প্রতিটি বাক্যে “চাই” রয়ে গেল? মাথা সত্যিই খারাপ হওয়া অবস্থা! কিন্তু তারপরই মজা হল ভেবে-– “আরে! আসলে এই বাক্যগুলোর কর্তা তো বাক্যগুলোতে নেইই”।

অর্থাৎ এই—

“আমার এই কাজটা করা চাই”

কিংবা,

“তোমার এই কাজটা করা চাই”/“তার এই কাজটা করা চাই”

এই “চাই” আসলে কী? বাক্যের বাইরে থাকা কোনও প্রকৃত কর্তা চাইছেন যে আমি, তুমি, সে এই কাজগুলো করি/করুক। সেই কর্তা সমাজ হতে পারে কিংবা হতে পারে অন্য কেউ, আর তাকেই আমরা ধরে নিচ্ছি প্রথম পুরুষ কর্তা হিসেবে, অর্থাৎ সমাজ তখন হয়ে উঠছে “আমি” আর তাই আসলে বাক্যটা হল–

তোমার এই কাজটা করা (আমি) চাই

এই “আমি”টা উহ্য! অর্থাৎ এই চাহিদাটা ‘আমার’। আর তাই জন্যই প্রতিটি বাক্যে “চাও” আর “চায়”–এর কোনও পাত্তাই নেই বরং “চাই”-এরই রমরমা ঔচিত্যের সর্বত্র।

এইসব ভাবনার কতটা যুক্তি পাঠক গ্রহণ করবেন কতটা বর্জন করবেন তা পাঠকের উপর। তবে এই মনে হওয়াটুকু ভাগ করতে পারাই আমার প্রাপ্তি।

একটি মজার গল্প বা বাক্য দিয়ে লেখাটা শেষ করি। একবার এক চাইনিজ ছাত্র পড়তে এসেছিল বাংলা। তার নাম ছিল “চাও”। তাকে নিয়ে মজার মজার বাক্য বানাতাম আমরা।

তার মধ্যে একটি বাক্য এইখানে উল্লেখ করে লেখাটায় ইতি টানি।

একই ট্রেতে যখন চিনি দেওয়া আর চিনি ছাড়া চা রাখা আছে তখন বলা হত…

“চাওয়ের চিনি দেওয়া চা চেনা চাই”

এই দেখুন, কেমন ‘চাও’ দিয়ে শুরু হয়ে ‘চাই’ দিয়ে শেষ হল! তবে মনে রাখা ভালো এ ক্ষেত্রে কিন্তু চাইনিজ আর বাংলা মিলেমিশে গেল। সত্যি সত্যিই যেমন আমরা মিলেমিশে গিয়েছিলাম ‘চাও’-এর সঙ্গে!

আর এইবার

“আমাকে শেষ করতে হবে” / “আমার শেষ করা দরকার” / “আমার শেষ করা উচিত” / “আমার শেষ করা চাই”!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...