বিজয়া ও বিবর্জিতা

স্বাতী ভট্টাচার্য

 

সীতা, দ্রৌপদী, চিরদুখিনী স্ত্রী। নাথবতী অনাথবৎ হয়ে তাঁদের কেটেছে জীবনের অনেকটা সময়। কিন্তু দেবী চণ্ডী? তিনি তো অপরের শক্তিনির্ভর নন। তিনিও কেন যুদ্ধে জয় ছাড়া নারীকে পাওয়ার অপর কোনও শর্ত ভাবতে পারেন না? তিনি মহামায়া বলেই? স্ত্রী যে পুরুষের বশ, এ ধারণাই এক মায়া। শক্তির হাতে ধরাশায়ী হয়ে তা থেকে একদিন মুক্তি পাবে পুরুষ। লিখেছেন সাংবাদিক ও লেখক স্বাতী ভট্টাচার্য ।

 

দুর্গাপুজোয় আমরা কেবল মহিষাসুরমর্দিনীর পুজো করি বটে, কিন্তু যেখানে তাঁর সেই অসুরবধের আখ্যান পাওয়া যায়, সেই ‘শ্রীশ্রীচণ্ডী’ বইটিতে অসুরবধের আরও দুটো এপিসোড রয়েছে। প্রথমটা মধুকৈটভ বধ, তারপর মহিষাসুর, আর তৃতীয় পর্ব হল শুম্ভ-নিশুম্ভ বধ। শুম্ভ-নিশুম্ভকে বধ করার আগে অবশ্য দেবীর আদেশে তাঁর দেহনিসৃত শক্তি চামুণ্ডা বধ করে রক্তবীজ, আর দুই সেনাপতি, চণ্ড আর মুণ্ডকে। এই তিনটি কাহিনীতেই দেবী বিজয়িনী, দুটি কাহিনীতে অপরিসীম শক্তিতে তিনি ঘোরতর যুদ্ধের পর সসৈন্য অসুরদের বিনাশ করেন। সেই যুদ্ধের বিবৃতি পড়লে কোথাও মনে হয় না যে মহিলা বলে তাঁকে কোনও রেয়াত করা হয়েছিল। আর একটা ব্যাপার হল, অসুরেরা প্রচুর মায়াযুদ্ধ করে, মহিষাসুর তো তাতে অতি-পারদর্শী। নানা রূপ নিয়ে সে ভয় দেখায়। দেবী নিজের মধ্যে থেকে নানা শক্তি, যাঁরা তাঁরই অংশ, তাঁদের বার করেন, আবার নিজের মধ্যে সংবরণ করেন, কিন্তু নিজের রূপ পরিবর্তন করেন না। হুঙ্কারে ভস্ম করে দেওয়ার মতো একটা-দুটো বিভূতি দেখিয়েছেন বটে, কিন্তু যুদ্ধে যখন নেমেছেন তখন অস্ত্রচালনা ছাড়াও রীতিমতো ঘুষি চালিয়ে, চড় কষিয়ে যুদ্ধ করেছেন। তিনি যে পুরুষশক্তির বলদর্পের কাছে হার মানেননি, তাঁকে শক্তিরূপিণী বলে মনে করার তা একটা কারণ তো বটেই।

কিন্তু একটা খটকা থেকেই যায়।  শক্তি থাকলেই কি সক্ষমতা থাকে? ধরুন যারা বাউন্সার-টাইপ লোকজন, কিংবা ভাড়াটে গুণ্ডা, নায়ক বা নেতারা যাদের পয়সা দিয়ে রাখে, তাদেরও তো গায়ে অনেক জোর। তাদের পাঠালে যে কাউকে পিটিয়ে কাঁঠাল পাকিয়ে দিয়ে আসবে। কিন্তু সে অন্যের আদেশ পালন করছে মাত্র, না করে তার উপায় নেই। এই তিনটি কাহিনীতেই দেখা যায়, অসুরেরা কেউ দেবীর সঙ্গে সরাসরি শত্রুতা করেনি। মধু-কৈটভ ব্রহ্মাকে গিলতে এসেছিল, মহিষাসুর দেবতাদের দেশছাড়া করেছিল, শুম্ভ-নিশুম্ভের সঙ্গে দেবতারা এঁটে উঠতে পারেননি। কখনও স্তুত হয়ে, কখনও দেবতাদের তেজোরাশি থেকে আবির্ভূত হয়ে, দেবী যুদ্ধঘোষণা করেছেন। দেবী তাঁর নিজের কথায় কীভাবে চ্যালেঞ্জ করছেন তাঁর শত্রুকে, কী শর্ত তৈরি করছেন যুদ্ধ জয়ের, তা একটু না দেখলে তাঁর ‘এজেন্সি’-টা বোঝা মুশকিল।

মধু-কৈটভবধ পালায় মহামায়ার মুখে কোনও সংলাপ নেই, তিনি নীরবে দুই অসুরের বুদ্ধি গুলিয়ে দেওয়ার কাজটা করেছেন। মহিষাসুরের আস্ফালনের সামনে তাঁকে একবারই কথা বলতে শোনা যায়, ওরে মূঢ়, গর্জন করে নে, একটু পরেই যখন আমার হাতে মরবি তখন এখানেই দাঁড়িয়ে দেবতারা গর্জন করবে। এমনই এক উদ্ধত সংলাপ বলেন শুম্ভের বধের সময়ে – “একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা” (এ জগতে আমি অদ্বিতীয়া, আমি ছাড়া আর কে আছে? এই দেখ, আমার বিভূতিসকল আমার মধ্যেই প্রবেশ করছে)

কিন্তু এই শুম্ভ-নিশুম্ভ পর্বেই দেখা যায়, দেবী সরাসরি যুদ্ধে নামছেন না। তিনি একাকী সুন্দরী নারী হয়ে দাঁড়িয়ে কৌশলে বিপক্ষকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করছেন। শুম্ভ-নিশুম্ভের দূতকে বলছেন, “সত্য বটে শুম্ভ আর নিশুম্ভের প্রবল পরাক্রম, কিন্তু আমি স্বল্পবুদ্ধি নারী, আগেই ঠিক করে ফেলেছি যে, যে আমাকে যুদ্ধে পরাজিত করবে, যে আমার দর্পহরণ করবে, তাকেই আমি ভজনা করব

দেবী বলছেন না, “তোমার দুই প্রভু অতি দুষ্কৃতিকারী, তাদের বলো এসে যুদ্ধ করতে” এ-ও বলছেন না যে, “ওদের আসতে বলো, দেখি আমার তাদেরকে পছন্দ হয় কিনা” কিন্তু যুদ্ধে নিজেকে পণ রাখছেন। তিনি যে জিতলেন, সেটা বড় কথা নয়, তিনি এক নারীকে পাওয়ার যে শর্ত রাখলেন, সেটা লক্ষ করার মতো।

এই কথাই আমরা পেয়েছি আরও প্রাচীন দুই মহাগ্রন্থ, রামায়ণ-মহাভারতে। রাজসভায় সম্রাজ্ঞী দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ তো অবিস্মরণীয়। সেখানে সেই বুদ্ধিমতী নারী বারবার সভার প্রবীণদের কাছে প্রশ্ন করেছিলেন,  ‘আমি বিজিতা না অজিতা?’ স্বামী যদি পূর্বেই দাসত্ব গ্রহণ করে থাকেন, তবে স্ত্রীয়ের উপরে তাঁর আর অধিকার নেই। অতএব তাঁকে পণ রাখার অধিকার যুধিষ্ঠিরের ছিল না, এটাই তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাশায় যে তাঁর স্বামীকে হারিয়েছে, সেই দুর্যোধন এখন তাঁরও প্রভু, মোটের উপর সভার মত ছিল তাই। নেহাত ধৃতরাষ্ট্র বর না দিলে সে যাত্রা দ্রৌপদীর রেহাই ছিল না।

এ যে ব্যতিক্রম নয়, তা ফের বোঝা গেল, যখন বনবাসের সময়ে জয়দ্রথ দ্রৌপদীকে অপহরণ করল। পাণ্ডবরা গিয়েছেন মৃগয়ায়, আশ্রমে কেবল ধৌম্য আর দ্রৌপদী। জয়দ্রথ তাঁকে রথে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন, পিছন পিছন ধৌম্য ছুটছেন। কী বলছেন তিনি? “জয়দ্রথ, পাণ্ডবদের যুদ্ধে না হারিয়ে তুমি দ্রৌপদীকে নিয়ে যেতে পারো না” একই শর্ত এখানেও। নারীর উপর অধিকার জন্মায় যুদ্ধে তার বৈধ স্বামীকে হারাতে পারলে। ‘স্বামী’ কথাটার অর্থও প্রভু বা মালিক, যেমন গৃহস্বামী। ‘স্ত্রী’ মানে কিন্তু শুধুই এক লিঙ্গ-নির্দেশ, পুরুষসঙ্গীর উপর তার কোনও প্রভুত্ব, দাবি-দাওয়া কিছুই বোঝায় না।

রামায়ণের যুদ্ধ তো বাহ্যার্থে সীতার স্বামীত্ব দখল করারই যুদ্ধ। সে যুদ্ধ জয়ের পর রাম সীতাকে যে মর্মভেদী কথাগুলো বলেছিলেন, তা আর মনে করে কাজ নেই। স্বামীত্ব প্রমাণ করাই যে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, পত্নীকে ফিরে পাওয়া নয়, সমস্ত সৈন্যসামন্তের সামনে রামের এই কঠিন কথা শুনতে হয়েছিল সীতাকে।

সীতা, দ্রৌপদী, চিরদুখিনী স্ত্রী। নাথবতী অনাথবৎ হয়ে তাঁদের কাটাতে হয়েছে জীবনের অনেকটা সময়। কিন্তু দেবী চণ্ডী? তিনি তো অপরের শক্তিনির্ভর নন। তিনি নিজেই শক্তিরূপিণী, অপরের মুক্তিদায়িনী। তিনিও কেন যুদ্ধে জয় ছাড়া নারীকে পাওয়ার অপর কোনও শর্ত ভাবতে পারেন না? হয়তো তিনি মহামায়া বলেই। স্ত্রী যে পুরুষের বশ, এ ধারণাই এক মায়া। শক্তির হাতে ধরাশায়ী হয়ে তা থেকে একদিন মুক্তি পাবে পুরুষ।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. শক্তিশালী চণ্ডীই হোক কি জনমদুখিনী সীতা, নারী পুরুষের সম্পত্তি ছাড়া কিছু নয় – এটাই হিন্দু ঐতিহ্য৷ আধুনিক যুগে ব্যাপারটার একটা অন্য মাত্রা আছে৷ যে গৃহস্থালীর কাজ করে তার গার্হস্থ শ্রমের মালিক স্বামী বা শ্বশুরবাড়ি৷ আবার যে নারী বাইরের কাজ করে অর্থোপার্জন করে তার রোজগারের ওপর অধিকারও স্বামী তথা শ্বশুরবাড়ির৷

আপনার মতামত...