ভয়ের অভিধান

ফতিমা ভুট্টো

 

অনুবাদ — সুচেতনা দত্ত

ফতিমা ভুট্টো পাকিস্তানী কবি ও লেখক। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকারের নাতনী এবং বেনজির ভুট্টোর ভাইঝি। প্রথম বই পনেরো বছর বয়সে - 'হুইসপার্স অফ দ্য ডেজার্ট'। সবথেকে উল্লেখযোগ্য কাজ - 'সংস অফ ব্লাড এন্ড সোর্ডস' (২০১০)। বর্তমান রচনাটি লেখিকার ওয়েবসাইট থেকে আহৃত, এবং লেখিকার সম্মতিক্রমে অনুবাদিত এবং প্রকাশিত। 

 

 

গত মে মাসে ভোটের দিন আমি আর আমার মা ঘিনওয়া ভুট্টো নওদেরো নামে একটা ছোট্ট, শান্ত, নিরিবিলি সিন্ধি গ্রামের এক বুথ থেকে আরেক বুথে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। ততক্ষণে দুপুর হয়ে গেছে, মাথার উপর ঝাঁ-ঝাঁ রোদ্দুরেই আমরা একটা পুরুষদের ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি সশস্ত্র সেনাবাহিনী আগে থেকেই মজুত। আমার মা, নিজেই যিনি একজন প্রার্থী হিসাবে এই ভোট লড়ছিলেন, তাঁকে বুথে ঢুকতে দিতে অস্বীকার করা হল। এবং আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই গর্জে উঠল বন্দুক।

বুথটির ছাদের উপরে উপস্থিত সৈন্যেরা খোলা আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি চালিয়েছে। আর নীচে আমাদের সামনে দাঁড়ানো সৈন্যেরা ফাঁকা গুলি চালিয়েছে মাটির দিকে তাক করে। আমাদের সামনেই একটি লোককে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে হুমকি দেওয়া হল। আমার মা প্রতিবাদ করলে, আমাদের সামনে দাঁড়ানো সৈন্যটি তার অস্ত্র তুলে ধরে আমাদেরই বুথ ছেড়ে চলে যেতে বলে।

কিন্তু মজার ব্যাপার হল, এই পুরো ঘটনাটির কোনো সময়েই আমি এক মুহূর্তের জন্যও ভয় পাই নি।

না ভয় পেয়েছি গুলি চলার সময়, না ভয় পেয়েছি হুমকি দেওয়ার সময়। যখন লোকটিকে মাটিতে ফেলে দেওয়া হল, আমি বরং ছুটে দেখতে গেলাম তার আঘাত গুরুতর কি না।

হিংসার উদ্দেশ্য কখনোই শুধুমাত্র হিংস্রতার মুহূর্তগুলোয় ভয় দেখানো নয়, বরং আরো সুদূরপ্রসারী – যা জীবনের বাকী সময়টাতেও প্রতিনিয়ত ভয়ে-ভয়ে থাকতে বাধ্য করে। তাই, সেদিন এই ঘটনার পরে, অ্যাড্রেনালিন রাশ থেমে গেলে আমি প্রচণ্ড আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ি।

আমি খুবই ভাগ্যবতী যে আমার জীবনে আমি বেশ কিছু অসামান্য সাহসিনীর সঙ্গ পেয়েছি। আমার মা বড় হয়েছিলেন লেবাননের গৃহযুদ্ধ চলাকালীন।  আমার দিদিমা নুসরত তাঁর সারা জীবন ধরে এত এত আপনজনের কবরে মাটি দিয়েছেন, যা কারুর পক্ষে এক জীবনে দেওয়া সম্ভবই নয়। আমার বন্ধুরাও সবাই ছিল বেজায় ডাকাবুকো আর শক্তপোক্ত। আমি জানি না – আমাদের জীবন থেকে ভয় নামের ব্যাপারটা সম্পূর্ণভাবে মুছে বা উপড়ে ফেলা সম্ভব কি না, বা উচিৎ কি না। তবে এটুকু জানি – মেয়েদের, বিশেষত এই উপমহাদেশের মেয়েদের, সহ্যশক্তি অসম্ভব। রোজ রোজ আমাদের সমাজের, আমাদের পরিবারের, আমাদের রাজনীতির প্রবল আসুরিক চাপে আমরা ভেঙ্গে তুবড়ে যেতে যেতেও বেঁচে থাকি। বেঁচে থাকি আমাদের, আর আমাদের সমাজকে উন্নত করে তোলার লড়াই লড়তে, স্বাধীনভাবে বাঁচতে আর কথা বলতে, নিজেদের কথা প্রকাশ করতে সকলকে আমাদের কণ্ঠ শোনাতে। আমরা লড়াই করি আমাদের সুরক্ষা আর নিরাপত্তার জন্য, আমাদের দুনিয়াগুলোর মধ্যে মিলমিশ বজায় রাখতে। এই লড়াই লড়বার থেকে বেশী সাহসের কাজ কিই বা হতে পারে?

ভয় নামের অনুভূতিটা ঠিক কেমন, বা কেন আমার এমন অনুভূতি হচ্ছে, সেটা বোঝার আগেই অনুভব করলাম – আমার পেটের মধ্যে মোচড় দিচ্ছে, ঈষৎ মাথা ঘুরছে, দমবন্ধ হয়ে গলা শুকিয়ে আসছে আর বুকের ভিতরে হৃৎস্পন্দন হঠাত বহুগুণ বেড়ে গেছে।

ভয় আমাকে আমার ছোট্টবেলা থেকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। কখনো কখনো আবার আমিও মজা পেয়ে ভয়কে তাড়া করে বেড়িয়েছি। ভয় কখনো আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে, দমবন্ধ হয়ে এসেছে আমার। কখনো আবার আমি ভয়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছি। কিন্তু প্রায় সবসময়ই আমার পিছু নিয়েছে ভয়, আমার খুব কাছে-কাছেই যেন সে তার আস্তানা বানিয়ে রেখেছে আজীবন। আপনারা যদি আমাকে আর কয়েকটা মুহূর্ত কোনো ভিক্টোরিয়ান উপন্যাসের নায়িকার রূপে সহ্য করে নেন, তাহলে আমি আপনাদের কাছে স্বীকার করব, যে বহু বছর যাবৎ আমি ভেবেছি ভয় বুঝি শুধু আমার সঙ্গেই এরকম বেয়াড়াপনা করে। আর কারুর পায়ে-পায়ে এই ভয় নামের জন্তুটা ঘোরে না, আর কাউকে ভয়ের বোঝা আমার মত করে বইতে হয় না।

কলেজে পড়ার দিনগুলোয় যখন চূড়ান্ত প্যানিক অ্যাটাকের মধ্যে দিয়ে যেতাম, তখন আবিষ্কার করলাম আমি একাই নই – আমার আশেপাশের সব মেয়েরাই গলার কাছে খামচে-ধরা ভয় নিয়েই বেঁচে থাকেন। শুধু সেটা নিয়ে আমরা একে অপরকে কিছু বলি না – এই যা।

মেয়েদেরকে যদি অবিরত বলা হয় তাদের যা কিছু সহজাত প্রবৃত্তি আছে তা অনুসরণ করে চলতে, তাদের বলার কথা বলতে, ভয়ের ব্যাপারে এমন কথা ভুলেও কেউ কেন কখনও বলে না? ভয় কি এমনই একটা ইন্সটিঙ্কট বা সহজাত প্রবৃত্তি যা নিয়ে আমাদের আরো বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত? না কি সেটা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া উচিত?

আর ঠিক এখানেই ভয়ের বিশেষত্ব। বেশি মনোযোগ পাওয়ার বা সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেওয়ার – দুটোরই সমান দাবীদার এই ভয়। হ্যাঁ-ও আবার না-ও। ভয় তোমাকে সাবধানও করে আবার ডুবিয়েও দেয়। ভয় কখনো শক্তি জোগায়, যা তোমাকে বাঁচিয়ে রাখে। আবার কখনো ভয় তোমাকে দুর্বল করে দেয়, যদি তাকে চিনতে না পারা যায়।

ভয়ের একটা অভিধান থাকা বড় উচিত ছিল (সে অভিধান পড়ার থেকে ভয়ানকতর অভিজ্ঞতা আর কিছু থাকতে পারে কি?)। কিন্তু, যেহেতু তেমন কোনো অভিধান বা হ্যান্ডবুক আমাদের কাছে নেই, আপাতত জরুরী কয়েকটা বিষয় নিয়েই আলোচনা করব ।

 

১) ভয় পাওয়া অর্থহীন

ওরতেঞ্জিয়া ভিসকন্তি একজন ইতালীয় ঔপন্যাসিক এবং চলচ্চিত্রকার, আর আমার জানা সবথেকে সাহসী মহিলাদের একজন। আমাদের এই আলোচনার বিষয়বস্তুর সঙ্গে সহজেই খাপ খেয়ে যায় ভিসকন্তির লেখালেখির জগতে পদার্পণের প্রথম দিকের অভিজ্ঞতা। ভিসকন্তি তাঁর কেরিয়ার শুরু করেন একজন ওয়ার রিপোর্টার বা যুদ্ধ-সাংবাদিক হিসেবে। লা রিপাবলিকা আর দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের হয়ে সেইসময় ওঁকে ইরাক,আলজিরিয়া এবং প্যালেস্টাইনের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে ঘোরাঘুরি করতে হত খবর সংগ্রহ এবং ছবি তোলার কাজে। ‘ভয়’ নিয়ে কি ওঁর মতামত, বা অভিজ্ঞতা, তা জানতে আমি যখন ওঁকে ফোন করি, উনি এক মজার গল্প শোনান।

“আমার প্রথম অ্যাসাইনমেন্টে যাবার কথা ছিল রামাল্লায়। যেদিন যাব, তার আগের রাতে আমার রোমের ফ্ল্যাটে একটা মৌমাছি ঢুকে পড়ে। মৌমাছিটাকে দেখে আমি ভয়ে কাঁপছি আর ভাবছি – একটা মৌমাছিকে দেখেই আমার যদি ভয়ে এই অবস্থা হয়, তাহলে রামাল্লা যাওয়ার পরে আমার কী অবস্থা হবে! কিন্তু পরের দিন আমি যখন প্লেনে উঠলাম, এবং সরাসরি রামাল্লার যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে নামলাম তখন আমি একদম শান্ত। মাথা আমার ততটাই ঠাণ্ডা ছিল, যতটা তার আগে আর কখনো ছিল না। ভয়ের বাসা শুধু আমাদের মনেই।”

ভয় আসলে একটা বিভ্রম,  যা তোমাকে ততক্ষণই দাবিয়ে রাখে,  যতক্ষণ তুমি তাকে সেটা করতে দাও। ভিসকন্তি কখনোই ভয়কে তাঁকে দাবিয়ে রাখার জায়গাটা দেন নি। পরে তিনি ইরাকে থাকার সময়ে পেশোয়ার এবং অন্যত্র বিভিন্ন পাকিস্তানি উপজাতি-জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রচুর কাজ করেন। কিউবায় গিয়ে ফিদেল কাস্ত্রোকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্রও বানান।

(ভিসকন্তির সঙ্গে ফোনে কথা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর ফোন াবার পেলাম। ভয়ের বিষয়ে ওঁর কিছু মনে পড়ে গেছে – “কাবুলে থাকার সময়ে সেই যে একবার একটা মাকড়সা………….”)

 

২) ভয় এমন প্রবৃত্তি নয়, যা আমরা কাটিয়ে উঠতে চাই

ব্যথাবেদনার মত ভয়ও নিজেকে বাঁচিয়ে চলার একটা স্বাভাবিক পন্থা। ভয়ে হৃৎস্পন্দন বেড়ে না গেলে আমরা কী করে বুঝতে পারব, যে সামনেই কোনো ভয়ের কারণ থাকতে পারে? যে কিছুতেই ভয় পায় না, সে-মানুষ তো মৃত। রাতের বেলা কোনো অচেনা রাস্তা ধরে একলা হেঁটে যাওয়ার সময়ে যখন আমরা টের  পেতে থাকি যে এই অঞ্চলটা খুব একটা নিরাপদ নয়, কোথাও যেন কোনো বিপদ ঘাপটি মেরে বসে আছে, আমাদের উদ্বেগ আমাদের বলে দিতে থাকে এবার আর আমরা খুব একটা সুরক্ষিত এলাকায় নেই। এ-ক্ষেত্রে এই ভয়টাই আমাদের সুরক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করে।

তাই ভয়ের বিরুদ্ধে লড়াই কোরো না। ভয়কে থাকতে দাও, আর কেমন করে ভয়ের ইশারাগুলোকে চিনবে তা শেখার চেষ্টা করো। বরং যে ভয় অকারণ, লড়াইটা হোক তার বিরুদ্ধে। তুমি বিফল হবে, পারবে না, যথেষ্ট ক্ষমতা তোমার নেই – অকারণ ভয় সেই ক্ষীণ স্বর যে তোমাকে ভেতর থেকে এই কথাগুলো বলতে থাকে।

তুমি সফল হবে, পারবে, তোমার ক্ষমতা অসীম।

 

৩) ভয় এবং সাহস – দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার

লণ্ডন-নিবাসী ঔপন্যাসিক বেলা পোলেন এবং ভোগ ও নেট-আ-পোর্টার ডট কমের মতন অনেক পত্রিকার লেখিকা ক্রিস্টা ডিসুজা শুধুই দুই প্রতিভাময়ী, হাস্যরসে টইটম্বুর, বুদ্ধিমতী, সুন্দরী লেখিকা নন; তাঁরা কাবুলের মারেফত স্কুলের হৃদয় এবং মস্তিষ্কও বটেন। ১৯৯৪ সালে পেশোয়ারের একটি রিফিউজি ক্যাম্পে স্কুলটির প্রতিষ্ঠা হলেও পরবর্তীকালে স্কুলটি স্থায়ী আস্তানা পায় কাবুলে – ২০০২সালে। স্কুলটিতে এই মুহূর্তে ৩০০০ ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া করছে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাক্ষরতা কেন্দ্র চালু করে স্কুল কর্তৃপক্ষ এই বছরেই স্কুলটির আরো সম্প্রসারণ ঘটাতে চলেছেন।

পোলেন এবং ডিসুজা প্রায়ই আফগানিস্তানে গিয়ে থাকেন। এই বছরের গোড়ার দিকে জানুয়ারি মাসে কাবুলের একটি রেস্তোরাঁয় এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।  ঘটনাচক্রে সেই রেস্তোরাঁটি যে রাস্তায়, সেই রাস্তারই একটি বাড়িতে পোলেন এবং ক্রিস্টা ছিলেন। সৌভাগ্যের কথা যে সেই রাতে তাঁরা ওই রেস্তোরাঁটিতে উপস্থিত ছিলেন না, যদিও তাঁরা প্রায়ই ওই রেস্তোরাঁটিতে খেতে যেতেন। আমি ডিসুজাকে যখন জিজ্ঞেস করি,  সেই রাত্রে বিস্ফোরণের পরে তাঁরা ভয় পেয়েছিলেন কি না, ডিসুজা উত্তর দেন, “না, অদ্ভুতভাবে সেই মুহূর্তে একটুও ভয় পাই নি। যদিও ভয় এমনই একটা অনুভূতি বা আবেগ যা সবকিছুর সঙ্গে পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে। আমার জীবনের সব কিছু চালায় ভয়, সিঁড়ি দিয়ে নামার ভয়, টেলিফোনের ভয়, আমাকে কেউ কোনো কিছু করতে বলবে সেটা শোনার ভয়……..।”

কিন্তু ভয়ের ব্যাপারে পোলেনের মত ভিন্ন। পোলেনের ভাষায়, “যদিও আমি দেখাতে চাই যে আমি খুবই সাহসী, যে কোনো বিপদকে অগ্রাহ্য করে মানুষকে সাহায্য করতে ঝাঁপিয়ে পড়ি, কিন্তু এত সব কিছুর পরেও কিন্তু আমি একজন খুবই ভীতু মানুষ।” এই পোলেনই কিন্তু কিলিমাঞ্জারো চড়েছেন, উপন্যাস লিখেছেন মেক্সিকো সীমান্তের জীবন নিয়ে (যেখানে তিনি জীবনের বেশ কিছুটা সময় কাটিয়েছেন), করাচির বিভিন্ন দরগায়-বন্দরে-বাজারে দিব্যি ঘুরে বেড়িয়েছেন ঈর্ষা করার মত ভয়হীন দ্বিধাহীন মনে। পোলেনের কথায় – “ক্রিস্টার মত একজন মানুষ – যে কিনা গাড়ি থেকেও যতবার নামে, ততবার নিশ্চিত করে নেয় যে গাড়ি থেকে নামাটা নিরাপদ কি না, আর যে কি না নিজেকে একজন ভীতু মানুষ বলে মনে করে যেহেতু সে সব কিছুতেই ভয় পায় – আসলে ঠিক ভীতু নন। বরং একদম উলটো। সে ভয় যেমন পায়, তেমন সেই ভয়কে কাটিয়ে উঠে যা কিছু করার সব কিছু করেও ফেলে, ভয় থাকা সত্ত্বেও। তাই আমার খাতায় সাহসের সবচেয়ে বড় উদাহরণের নাম – ক্রিস্টা ডিসুজা।

এবছরের জানুয়ারি মাসে এই দুই সাহসিনী যখন কাবুল ছাড়েন তখন কিন্তু মারেফত স্কুলের নতুন আঠাশটি ক্লাসরুম তৈরীর কাজ শুরু হয়ে গেছে।

 

৪) ভয় সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে না

জীবনে যখন আমরা কোনো কাজে আটকে যাই, বা দ্বিধায় ভুগতে থাকি, তখন আমাদের ভয় আমাদের সামনে যে-যে রাস্তা খোলা রাখে, তার একটাও নেওয়া ঠিক নয়। তোমার ভয় সবসময় তোমাকে সবথেকে হতাশাজনক রাস্তাগুলো নিতে বলে।  তুমি যখন ভয় পাও, তখন তুমি জলের গ্লাসটা অর্ধেক খালি দেখতে পাও, অর্ধেক ভর্তি নয়। ভয়ের কথায়, সুতরাং, কান দিও না। নিজের স্বাভাবিক উপস্থিত বুদ্ধির উপর বরং ভরসা রাখো, কারণ তা তোমাকে জীবনকে ভালোবাসার রাস্তা দেখায়। সেই পথ ধরলে রাস্তা ভুল করার সম্ভাবনা খুবই কম।

 

৫) ভয় আসলে একটা জটিল অংক

তুমি ভয়কে যত কম বোঝার চেষ্টা করবে, ভয় তত তোমাকে চেপে ধরবে। ভয়কে সামলানোর একমাত্র উপায় হল ভয়কে খুব ভালো করে লক্ষ্য করে বুঝে নেওয়া।

ভয় আসলে বাস্তব আর আশা-আকাঙ্ক্ষার মধ্যকার ফাঁকের থেকে জন্ম নেয়। অনিশ্চিত ভবিষ্যত-সম্বন্ধে, আর সেই অনিশ্চয়তায় আমাদের স্থান সম্বন্ধে আমাদের ধারণার অস্পষ্টতা থেকে জন্ম নেয় ভয়। প্রেজেন্টেশন দেওয়ার সময় সবাই যদি আমার দিকে তাকিয়ে হাসে? যদি আমার কখনো বিয়ে বা পদোন্নতি না হয়? কেমন হত, যদি ভবিষ্যতের এই সব আশা ছেড়ে বর্তমানের প্রতিটা মুহূর্তকে আনন্দের সঙ্গে বেঁচে নেওয়া যেত (আমি কিন্তু সত্যিই জানি না কি ভাবে এটা করা সম্ভব। শুধু জানি, চাইলে করা যায়।)

ট্রেসি কার্টিস-টেলর একজন পাইলট এবং প্রাক্তন ফ্লাইং ইন্সট্রাকটর। গত নভেম্বরে তিনি একক উড়ানে কেপ টাউন থেকে ইংল্যান্ডের সাসেক্সে পৌঁছান ১৯৩০য়ে ডিজাইন করা খোলা ককপিটের প্লেনে চড়ে। দীর্ঘ উড়ান-দূরত্বের কথা তো ছেড়েই দিলাম। যে বিমান নিয়ে ট্রেসি বেরোলেন, তার বয়স নব্বই বছর। তাতে কোনো আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। কো-পাইলটের সাহায্য নেই, এমনকি একটা জানলাও নেই। এমন একটি বিমানে ট্রেসির এই একক উড়ান আসলে প্রতি-মুহূর্তে বেঁচে থাকার যুদ্ধ, যা খুব শীঘ্রই একটি তথ্যচিত্রের মূল বিষয়বস্তু হতে চলেছে।

ট্রেসি কি ভয় পেয়েছিলেন? ট্রেসির কথায়, “বহু মানুষই আছেন যারা বিমান উড়ানে ভয় পান, কিন্তু আমার ভয় তখনই করে, যখন আমি রাত্রে শুয়ে উড়ানের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য সমস্যাগুলোর কথা চিন্তা করি – হাওয়ার গতিবেগ, আবহাওয়া, ভূগোল, দূরত্ব এবং বিমানযন্ত্রটির যান্ত্রিক ত্রুটি। এই সম্ভাবনাগুলিকে আমি ভয় পাই।”

আসলে কোথাও কোনো ফাঁক থাকলেই ভয় এসে সেই ফাঁকটাকে ভরাট করে দেয়। আর ভয়ের এই সংক্রমণ থেকে আমরা কেউ রেহাই পাই না।

কিন্তু ট্রেসি কার্টিস ট্রেলর, কিন্তু যিনি আরো একটা বুক-কাঁপানো উড়ানে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন,  এবং এবারে সেটা ভারতে, জানালেন, “আমি যখন আমার বিমানে চড়ি, আমার একটুও ভয় করে না। বরং বিমানটাকে দেখলে আমি খুশি হই, উত্তেজনার অ্যাড্রেনালিন রাশটা টের পাই আবার আকাশে উড়তে পারব – এই ভেবে। কতবার এমন হয়েছে যে আমি আফ্রিকার আকাশে আমার বিমান নিয়ে একা উড়াল দিয়েছি পরম আনন্দে আর মনের শান্তিতে।”

ভগবদগীতা বলছেন, “যা অবাস্তব, কখনও ছিল না বা ভবিষ্যতেও থাকবে না, তাকে ভয় কোরো না। যা বাস্তব, আদিকাল থেকে আছে, তা অবিনশ্বর”।

(মূল রচনাটি এই লিঙ্কে লভ্য ।)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1755 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...