হার্ভে বনাম হিউস্টন, প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতায় হার্ভের রোজনামচা

Lisa Rehr holds her four-year old son Maximus, after they lost their home to Hurricane Harvey, as they await to be evacuated with their belongings from Rockport, Texas, U.S. August 26, 2017. REUTERS/Adrees Latif

সুমন মাইতি

প্রথম পর্ব

শরীরটা একটু খারাপ ছিল বৃহস্পতিবার, সেজন্য ইউনিভার্সিটি থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে শুয়ে পড়েছিলাম। সন্ধ্যার খবরে শুনলাম এখানে হারিকেন আসার পূর্বাভাষ আছে আগামীকাল। টিভিতে উপস্থাপক বলছেন: হার্ভে আসছে, টেক্সাসের উপকূলে, হিউস্টনের দক্ষিণ পূর্বে কর্পাস ক্রিস্টিতে শুক্রবার রাতে আছড়ে পড়বে। কর্পাস ক্রিস্টি হিউস্টন থেকে সাড়ে তিনঘণ্টার ড্রাইভ। ক্যাটেগরি ফোর হারিকেন, ঘণ্টাপ্রতি দু’শো কিলোমিটার গতিতে বাতাস বইবে, সাথে প্রবল বৃষ্টিপাত। বিগত কয়েক বছরে এখানে বন্যা দেখার অভিজ্ঞতা থাকার সুবাদে এধরণের পূর্বাভাষকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাইনি— মনে হয়েছিল এটাও সেরকমই কিছু হবে, হয়ত জল একটু বেশি উঠবে। ভুলটা ভাঙ্গল আরেকটু রাতের দিকে। ডিনারের সময় দেখলাম সবক’টা লোকাল চ্যানেলে হার্ভের কভারেজ শুরু করে দিয়েছে— অন্যসব খবর বন্ধ, এমনকি সিএনএনের হেডলাইনেও দেখাচ্ছে।

দোনোমোনো করে বেরিয়েই পড়লাম—বাড়ির কাছাকাছি সুপারমার্কেট থেকে কিছু জল আর বেড়ালের শুকনো খাবার নিয়ে আসব। বেশিক্ষণ লাগবে না। তখন বাজে রাত সাড়ে আটটা। কাছাকাছি যে ক’টা দোকানে  গেলাম প্রত্যেকটায় শেলফের পর শেলফ খালি, কাউন্টারের সামনে অধৈর্য ক্রেতাদের লম্বা লাইন, পার্কিং লটের থেকে একের পর এক গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে। বুঝলাম অবস্থাটা সত্যিই জটিল, একটু দুঃশ্চিন্তাও করছি সমস্ত জিনিসপত্র জোগাড় করে উঠতে পারব কিনা। কয়েকটা ক্লোরিন ট্যাব্লেট কিনলেও ভালো হয়। কিন্তু প্রত্যেকটা সুপারমার্কেট খালি হয়ে গেছে। ছয় নম্বর সুপারমার্কেটে এসে ভাগ্য প্রসন্ন হল। একজন সহৃদয় কর্মী আমাদের মতো ক্রেতাদের জন্য একেকটা পানীয় জলের ক্রেট তুলে দিচ্ছেন, আমাকেও দু’টো দিলেন। সেটা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। বাড়িতে কিছু শুকনো খাবার রয়েছে। তাতে অন্তত কয়েকদিন চলে যাবে। গাড়িটা পার্কিং লটে যতটা পারা যায় উঁচুতে পার্ক করে এলাম।

পরের দিন শুক্রবার—সকাল থেকেই ঝোড়ো হাওয়া বইছে, মেঘলা আকাশ। পাশের পড়শি ছেলেটির সাথে কথা হল। সদ্য বাবা হয়েছে। একতলায় জল উঠে এলে বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাবে সেটা নিয়ে বেশ চিন্তায়। সামনের রাস্তা দিয়ে পিক-আপ ট্রাক, সেডান, জীপ ইত্যাদি  বেরিয়ে যাচ্ছে, লোকজন শেষমুহুর্তে যতটা পারছে সাপ্লাই জোগাড়ে ব্যস্ত। বাড়িতে আবার টিভি খুললাম। ঝড়ের গতিপ্রকৃতি ঘণ্টায় পাল্টাচ্ছে, এখনও ল্যান্ডফল করেনি—আবহবিদরাও যেন হার্ভের মতিগতি বুঝতে পারছেন না, আমাদের মতো রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায়। রাত থেকে বৃষ্টি শুরু হল। বারোটার সময় সামনে দুই ফুট দূরত্বের প্রায় সবকিছু ধূসর লাগছে। নিচের ড্রাইভওয়েতে ফেলা আলোতে দেখলাম ইতিমধ্যে  জল জমতে শুরু করে দিয়েছে, রাস্তা থেকে হু হু করে জল উঠে আসছে। এর মধ্যেই স্টর্ম ড্রেনেজ সিস্টেম উপচে পড়েছে, বাড়ির (ব্রেইজউড) কাছের নিকাশিনালা ব্রেইজ বায়্যুর  পাড়ের ওপর দিয়ে জল বইছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুরো পার্কিং লট  জলের তলায় চলে যাবে। সেদিন সারারাত্রি জেগে কাটল। মূহুর্মূহু মোবাইলে ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস থেকে টর্নেডো ওয়ার্নিং আসছে। সাথে প্রবল বৃষ্টি আর উত্তাল ঝোড়ো হাওয়া। ডপলারে দেখাচ্ছে হার্ভে কর্পাস ক্রিস্টিতে আঘাত হেনে ইনল্যান্ডের প্রায় ত্রিশ মাইল ভেতরে ঢুকে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে, নিজের ঘূর্ণিতে গালফ অফ মেক্সিকো থেকে আর্দ্র বায়ু টেনে আনছে— হিউস্টন  এবং পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো হার্ভের সেন্টারের (“আই অফ স্টর্ম”) ডানদিকে থাকায়, রেনফিডার ব্যান্ড এই অঞ্চলগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে অঝোরধারায় বৃষ্টি। সামনের দিনগুলো অনিশ্চতায় ভরা।

দ্বিতীয় পর্ব

শনিবার সকালে চিরপরিচিত পাড়াকে আর চেনার উপায় নেই— মনে হচ্ছে ওয়াটার ওয়ার্ল্ড। রাতে বোঝা যায়নি কিন্তু আশপাশের প্রতিটি বাড়ি  তিন-চার ফুট জলের তলায়। রাস্তার পাশেই রাখা  গাড়িগুলোর জানালার মাঝামাঝি অবধি জল। ভেতরের বাসিন্দাদের কথা ভেবে অস্থির লাগছে। বয়স্ক মানুষ, অল্প বয়েসি শিশু, অসুস্থ আবাসিক আছেন বাড়িগুলোতে—এঁদের দরকার অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা, কিন্তু এদিকে সাহায্য এসে পৌঁছতে অনেক বাকি। হিউস্টনের  মেয়র সিলভেস্টার টার্নার কিছুক্ষণ আগেই সাংবাদিক সম্মেলনে জানালেন ৯-১-১ জরুরি পরিষেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ব্যতিব্যস্ত, যাঁরা ফোন করছেন তাঁরা যেন লাইনে অপেক্ষা করেন, কল ড্রপ করলেই একেবারে লাইনের শেষে চলে যাবেন। অনেকেই ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষায়। জলবন্দী মানুষ নিজেদের পরিবারকে দেখবেন, না টেলিফোন ধরে থাকবেন কতক্ষণে সাহায্য আসে! দুপুরে বৃষ্টি শুরু হল, এদিকে রাত্রের জমা জলের স্তর তখনও কমেনি। সন্ধ্যা নামার সময়েও পুরোদমে বৃষ্টি হচ্ছে। সারাদিন ধরেই হ্যারিস কাউন্টি থেকে বারবার ফ্ল্যশফ্লাডের সতর্কবার্তা আসছে। টর্নেডো ওয়ার্নিং-এ ছেদ পড়েনি। আমাদের মতো যাঁরা আটকা পড়েছেন, তাঁদের সামনে দু’টো রাস্তা—যেখানে আছেন সেখানেই থাকবেন নাকি শেল্টারে চলে যাবেন। রাত বাড়ছে, জলও বাড়ছে।  গাড়ি নিয়ে  পালানোর উপায় নেই—সমস্ত রাস্তা তখন নদীর চেহারা নিয়েছে। ইন্টারস্টেট লুপ থেকে বেরোবার সময় এতদিন যে একজিট নিয়েছি সেটা তখন খরস্রোতা নদীর মতো ফুঁসছে। একমাত্র বোট ছাড়া বেরোবার কোনও উপায় নেই। কিন্তু রাতে বোট নিয়ে আসবে কারা? মানুষজন আতঙ্কিত, বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন। মাঝে খবর এল বেশ কিছু এলাকা কার্যত বিদ্যুৎবিহীন—আমাদের দুশ্চিন্তা বাড়ল—চারিদিকে নোংরা দূষিত জল, ক্রস-কন্ট্যামিনেশন হতে পারে, ফুটিয়ে খাওয়া দরকার। এদিকে অধিকাংশ আভেন বিদ্যুৎচালিত, ফলে সেগুলিও অকেজো—জল ফোটানো বা রান্না করা যাবে না—আরো দূর্গতি বাড়বে অসহায় মানুষগুলোর। কাছাকাছির মধ্যে একটা লাইব্রেরি এবং চার্চে শেল্টার খোলার খবর পেলাম। কিন্তু যাবার উপায় নেই—রাস্তায় তখন চার ফুটের ওপর জল—কোনও কোনও জায়গায় আরও বেশি। এদিকে সমস্ত শেল্টাতে পোষ্যদের রাখতে দেবে কিনা সেটাও জানা যাচ্ছে না। হিউস্টন হ্যারিস কাউন্টির অন্তর্ভুক্ত। হ্যারিসের পাশের কাউন্টিগুলোয়—ফোর্ডবেন্ড, ব্রাজোরিয়া, লিভিংস্টোন এগুলোতেও চূড়ান্ত তান্ডব চালাচ্ছে হার্ভে। বহু জায়গায় লোকজন বাড়ির ছাদে উঠে রেস্কিউড হবার অপেক্ষা করছে।

চারিদিকে ধ্বংসের মধ্যেও ধীরে ধীরে হিউস্টনের মানবিক মুখগুলো ভেসে আসছে—দূরদূরান্ত থেকে শুধু সাহায্য করবার জন্য দলে দলে স্বেচ্ছাসেবকরা আসছেন—টেক্সাসের মধ্যে অস্টিন, ব্যোমন্ট, পোর্ট আর্থার তো বটেই, অন্যান্য প্রতিবেশী রাজ্য লুইজিয়ানা (ক্যেজান নেভি), অ্যারিজোনা, ন্যুইয়র্ক, অ্যারক্যানস, এমনকি মেক্সিকো থেকেও তাঁরা এসে পৌঁছেছেন। বস্তত বহু জায়গায় ন্যাশনাল গার্ড বা কোস্ট গার্ড আসার আগেই  এই স্বেচ্ছাসেবকরা  নিজেদের উদ্যোগে বোট, হাই-ওয়াটার ভেহিকল, হামার, এমনকি ডাম্প ট্রাক নিয়েও উদ্ধারকাজে নেমে পড়েছেন।  বাড়ির কাছেই ৬১০ ইনার লুপের কাছে একাধিক র‍্যাম্প থেকে বোট লঞ্চ করে আটকা পড়া মানুষদের তুলে আনছেন, পৌঁছে দিচ্ছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। ডিকিকিন্সের কাছে একটি নার্সিংহোমে আটকে পড়েছিলেন বয়স্ক আবাসিকরা—সারাদিন কোমরসমান জলে হুইল চেয়ারে বসে ফার্স্ট রেসপন্ডারদের অপেক্ষায় ছিলেন অশক্ত মানুষশগুলো—তাঁদের উদ্ধার করা গেছে। শুধু মানুষ নয়, পশুপাখিদের জন্যেও অসম্ভব মমতার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন ভলান্টিয়াররা—ক্রেটে করে, কোলে, কাঁধে, তোয়ালে জড়িয়ে তুলে নিয়ে আসছে এই প্রাণীগুলোকে। এরমধ্যেই মিডিয়াতে ভাইরাল হয়ে গেছে একটি কুকুরের ছবি। হার্ভে বিধ্বস্ত রকপোর্ট শহরের রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছে একটা কুকুর, মুখে ধরে আছে খাবারের ব্যাগ— “ওটিসকে” উদ্ধার করে মালিকের  কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। মানুষের সাথে পশুপাখিদেরও আশ্রয় দিচ্ছে বহু শেল্টার।

যে ডাউনটাউন, মেডিক্যাল সেন্টারে প্রত্যেকদিন যেতে হয় সেই জায়গাগুলোকে চেনা যাচ্ছে না। মেডিক্যাল সেন্টারে যাওয়ার মেইন স্ট্রিটের ওপর চলে এসেছে ব্রেইজ বায়্যু…সমস্ত আন্ডারপাসগুলো জলের তলায়। এর মধ্যেই খবর এল বেন টউব হাসপাতাল থেকে রোগীদের নাকি ইভ্যাক্যুয়েট করা শুরু হয়েছে। অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনা করে ডাউন টাউনে জর্জ ব্রাউন কনভেনশন সেন্টার খুলে দিয়েছেন মেয়র টার্নার, সেখানে কাতারে কাতারে লোক এসে পৌঁছচ্ছে।  তিন হাজার লোকের জন্য তৈরি হওয়া সেন্টারে প্রায় প্রায় দশ হাজার লোক আশ্রয় নিয়েছেন। আরও মানুষ এসে পৌঁছোচ্ছে। বাড়তি শরণার্থীদের জন্য  টয়েটো সেন্টার এবং এনআরজি স্টেডিয়ামে অস্থায়ী শেল্টার খুলে দেওয়া হল। সন্ধ্যার মুখে বাড়ির সামনেই হেলিকাপ্টারের আওয়াজ শুনলাম—দেখলাম এয়ারলিফট করে রেসক্যু করেছে কোস্ট গার্ড।  রাত বাড়ার সাথে সাথেই দৃষ্টিসীমা কমে আসায় বাধ্য হয়েই সেদিনকার মতো উদ্ধারকাজ স্থগিত করে দেওয়া হল।

পরেরদিন রবিবার সারা্ দিনভর দফায় দফায় বৃষ্টি পড়েই চলেছে। ইতিমধ্যে টিভিতে অবিচ্ছিন্ন কভারেজ—হিউস্টনের উত্তর পূর্বে অ্যাডিক এবং বার্কার রিজার্ভয়ের থেকে জল ছাড়ছে, নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সন্নিহিত অঞ্চলে, বহু মানুষ জলবন্দী হয়ে পড়বেন সেই আশঙ্কা। বাড়তি জল বাফেলো বায়্যু দিয়ে নিচে নেমে এসে ডাউন টাউনকে আরো কয়েক ইঞ্চি জলের তলায় নিয়ে যাবে। হিউস্টনের দক্ষিণপূর্বে ফোর্ট বেন্ড কাউন্টিতে ব্রাজোস নদীঅববাহিকা বরাবর ম্যান্ডেটরি ইভ্যাকুয়েশন নির্দেশিকা জারী হয়েছে। আবার নৈশকালীন কার্ফিউ বলবৎ রয়েছে—কেউ যাতে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি থেকে না বেরোন—রাতের অন্ধকারে রেস্কিউ করা অসম্ভব। প্রায় ৭৫,০০০ মানুষ জরুরি পরিষেবার জন্য কল করেছেন কিন্তু সাহায্য করার পরিকাঠামো নেই। সব মিলিয়ে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। মানুষ বুঝতেই পারছে না কোনদিকে যাবে। হিউস্টনের প্রায় সবক’টি বরোতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় টর্নেডো সতর্কবার্তা আসছে, তবে গত দুই দিনের তুলনায় অনেকটাই কম—হাওয়ার গতিপ্রকৃতি  অনুসারে পাল্টে যাচ্ছে এলাকা।  ঘণ্টায় তিন মাইল গতিতে হার্ভে  যেন হামাগুড়ি দিয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থা কতক্ষণ চলবে কেউ জানেন না । এতগুলো মানুষকে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে হচ্ছে! একজন উপস্থাপক কথাগুলো বলতে গিয়ে  মেজাজ হারালেন,  আমরা প্রহর গুনছি। ঝড়ের দাপট বাড়লেও বেরোবার রাস্তা বন্ধ, বাইরে বুকসমান জল, প্রবল  বৃষ্টি—প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার সামনে “সিটিং ডাক” আপামর হিউস্টনিয়ান।

তৃতীয় পর্ব

সোমবার সকাল থেকেই শরীর আর দিচ্ছে না। চারদিন হয়ে গেল  টানা দুই ঘণ্টাও ঘুম হয়নি।

বাড়ির  সামনে দিয়ে  বৃষ্টি, ঝড়জল উপেক্ষা করেই বেরিয়ে পড়েছেন বহু মানুষ—খাবার, পানীয় জল ফুরিয়ে এসেছে, শেল্টারের খোঁজে হাঁটছেন তাঁরা। এরমধ্যেই আবার পূর্বাভাষ আসছে হার্ভে গালফের দিকে ফিরছে, সেখান থেকে শক্তি বাড়িয়ে  ঘুরে আবার হিউস্টনের দিকে আসবে আগামীকাল। সঙ্গে আরও বৃষ্টি। হিউস্টন এবং আশেপাশের কাউন্টিগুলোয় এর মধ্যেই প্রায় ৪০ ইঞ্চির ওপর বৃষ্টি হয়ে গেছে, বাড়তি বর্ষণ সামলানোর ক্ষমতা বর্তমান পরিকাঠামোর নেই। ফোর্ট বেন্ডের জাজ হেবার্ট বললেন : হার্ভের মতো দুর্যোগ প্রতি আটশো বছরে একবার আসে, এর মোকাবিলা করা আমাদের সাধ্যের বাইরে। রাতের দিকে কাছাকাছি গুলির আওয়াজ শুনলাম মনে হল—এখানে মধ্যরাত থেকে সকাল পাঁচটা  অবধি কার্ফু জারি হয়েছে। অন্যান্য শহরগুলো—লিগ সিটি, বে টাউন,  প্যাসাডিনা, রকপোর্ট, মিজৌরি সিটি—এগুলোতে রাত দশটা থেকে ভোর ছয়টা অবধি কার্ফু গত দু’দিন ধরেই চলছে। হিউস্টনে আজ থেকে শুরু। বিভিন্ন জায়গায় লুঠপাঠ শুরু হয়েছে খবর পাচ্ছি—জল, খাবার, বাচ্চাদের ডায়পার সবই বাড়ন্ত—কী করবে লোকে…বাঁচার তাগিদে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তাঁরা. যেকোনও বিপর্যয়ের প্রতিঘাত দরিদ্রদের ওপর সবথেকে প্রবল হয়। অসাম্যের অভিশাপ।

মঙ্গলবার সকাল থেকে আকাশটা একটু পরিষ্কার হল. খবরে বলছে বুধবার রাতের মধ্যে হার্ভে আরো পূর্বদিকে সরে যাবে। একবার স্টর্মওয়ালের বামদিকে চলে গেলে বৃষ্টি থেকে রেহাই মিলবে। কিন্ত সাধারণ পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে। অবস্থা যাতে আয়ত্তের বাইরে  চলে না যায়, সে কারণে গভর্ণর অ্যাবট ১২,০০০ ন্যাশনাল গার্ড উপদ্রুত অঞ্চলগুলোতে মোতায়েন করেছেন। ক্যাট্রিনার পুনরাবৃত্তি  না ঘটে!  সিভিক ভলান্টিয়ারদের  সাথে হাত মিলিয়ে উদ্ধারকাজের তদারকির সাথে সাথে কড়া হাতে আইন-শৃঙ্খলা সামলাচ্ছেন সেনারা। হার্ভে আছড়ে পড়বার চারদিন পর হিউস্টনের সবথেকে বড় চার্চ লেকউড বন্যাদূর্গতদের সাহায্যে এগিয়ে এল। বহু স্থানীয় মসজিদ, চার্চ, বুদ্ধিস্ট জেন সেন্টার নিজেদের দরজা খুলে দিয়েছে—সাহায্য করেছে ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সবাইকে। ইমিগ্রেশন কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট ঘোষণা করেছে—কোনও আশ্রয়প্রার্থীর কাছ থেকে অভিবাসন সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখতে চাইবে না তারা, শেল্টারে সবাই স্বাগত। হিউস্টনে প্রচুর অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা থাকেন, তাঁদের আশ্বস্ত করতেই এই পদক্ষেপ।

বুধবার রাত্রি থেকে ঝড়ের দাপট কমতে শুরু করেছিল। বৃহস্পতিবার বৃষ্টি একদম ধরে গেল। গত এক সপ্তাহের মধ্যে প্রথম রোদ উঠল। জল নামতে শুরু করেছে। হিউস্টন ছন্দে ফিরছে—প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প টেক্সাস এবং লুইজিয়ানার উপদ্রূত অঞ্চলগুলির জন্য বিপর্যয় মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করেছেন। কিন্তু পুনর্বাসনে সময় নেবে। ফিমার(FEMA) বক্তব্য  অবস্থা স্বাভাবিক হতে বছর ঘুরে যেতে পারে।

হার্ভে পরবর্তী সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া চূড়ান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ক্যাট্রিনা, আইক, স্যান্ডি ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের তুলনায় হার্ভের সময় ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটস অ্যাপ এই সামাজিক মাধ্যমগুলো ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য দিশা দেখিয়েছে—বহু মানুষ সরাসরি নিউজ মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, নিজেদের জন্য, প্রতিবেশীদের জন্য উদ্ধারের  আর্জি জানিয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, ফার্স্ট রেসপন্ডার্সরা দ্রুতগতিতে জনসাধারণের কাছে খবর পৌঁছে দিতে সামাজিক মাধ্যমগুলোর সাহায্য নিয়েছেন। জিনিভা থেকে ব্রাউন্সভিল, স্যান আন্টনিও থেকে মেরিল্যান্ড, কলকাতা থেকে গোয়া, প্রচুর মানুষের শুভেচ্ছা, প্রার্থনা সাহস জুগিয়েছে এসময়। এই বিপর্যয়ের পরিবেশগত প্রভাব সুদূরপ্রসারী। গত কয়েক বছরে হিউস্টন প্রত্যেকবার বন্যার কবলে পড়েছে কিন্তু এবারের মতো সর্বগ্রাসী বন্যা শহরের ইতিহাসেই কখনও হয়নি। প্রায় ৫০ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র চারদিনে। অ্যামেরিকার ইতিহাসের বৃহত্তম প্রাকৃতিক বিপর্যয় হার্ভে। As if in a morbid way, it proved : everything is big in Texas. এর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, উষ্ণায়নের প্রভাব কতটা সেটা নিয়ে আবহবিজ্ঞানীরা কাজ শুরু করে দিয়েছেন; তবে অ্যামেরিকার পরিবেশ, নগরায়ণ সংক্রান্ত নীতি, পরিকল্পনা রূপায়ণে হার্ভে পরবর্তী মুল্যায়ণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। প্যারিস চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর পর, এই প্রথম সর্বাত্মক, অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন অ্যামেরিকা। প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে হার্ভে আমাদের সভ্যতার গর্ব মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। মাত্র ছিয়ানব্বই ঘণ্টার বৃষ্টিতেই আধুনিকতার সমস্ত স্তম্ভগুলো হড়পা বানের ঘোলা জলে ভেসে গেছে। এ গ্রহে মানব অস্ত্বিত্বের প্রশ্ন  এখনও প্রকৃতির কৃপাদাক্ষিণ্য-আশ্রিত ফুটনোটের বেশি কিছু নয় বুঝিয়ে দিয়ে গেল হার্ভে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

আপনার মতামত...