আলো ও অন্ধকারের নক্ষত্র সঙ্গীত

সিদ্ধার্থ মজুমদার

 

সেই কোন ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব ভালো যন্ত্রসঙ্গীত বাজাতে পারে ছেলেটি। এত কম বয়স থেকে এরকম সুর জ্ঞান আর বাদ্যযন্ত্র বাজানোয় প্রতিভা খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়। দশ-বারো বছর বয়সেই সে তুখোড় হয়ে উঠেছে সুর সঙ্গীত আর তাল লয় জ্ঞানে। এমন কোনও বাদ্যযন্ত্র নেই, যা সে বাজাতে পারে না! বেহালা, পিয়ানো, শানাই-জাতীয় বাজনা সহ চার-পাঁচ রকমের বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী সে। তাছাড়া মিউজিক থিয়োরি নিয়েও রয়েছে ওর জ্ঞান। কিশোর বয়স থেকেই নিজে নিজেই সঙ্গীত সুর সৃষ্টি করতে পারে সে! এত গুণ হবে না-ই বা কেন? আসলে ছেলেটির বাবাও যে একজন দক্ষ বাজনদার ও সুরের কারিগর। বলা চলে এ যেন ওর জন্মগত প্রতিভা!

যে ছেলেটির কথা বলছি, ওর নাম উইলিয়াম হার্শেল (১৭৩৮-১৮২২)। প্রায় দুশো পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেকার কথা। উত্তর পশ্চিম জার্মানির ‘হ্যানোভার’ নামের একটি জায়গায় ওরা থাকত। দশ ভাই বোনের মধ্যে ছোটবেলাতেই চার জন মারা যায়। বাবা আইজ্যাক ছিলেন একজন সুপ্রতিষ্ঠিত মিউজিসিয়ান এবং সেনা বিভাগের কুশলী একজন ব্যান্ড মাস্টার। বেশ কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র বাজানোয় পারদর্শী।

ছেলের কথায় আসি আবার। চমৎকার চেহারার, হাসিখুশি আর খুব মিশুকে ছেলে উইলিয়াম। ছেলের সঙ্গীত প্রতিভার কথা বুঝে তাকে সেনা বিভাগে বাজনদার হিসেব নিযুক্ত করে দিল বাবা। উইলামের বয়স তখন সবে চোদ্দ পনের বছর। অভাবের সংসার। উপার্জন করতে পারলে সংসারের কিছুটা সুরাহা হয়। সেই জন্যে আইজ্যাকের দ্বিতীয় সন্তান উইলিয়ামকে দাদার মতন গান-বাজনাকেই পেশা করে নিতে হল কিশোর বয়স থেকেই। উইলিয়ামের পড়াশোনার কথা আলাদা করে সেরকম বলার মতন কিছু নয়। অল্প বিস্তর জার্মান ভাষা জানে। আর পড়েছে পাটিগণিত, ইতিহাস, ইংরেজি আর ধর্মের কিছু বই। পড়া বলতে স্কুলের এই পাঠটুকুই। বস্তুত উইলামের আসল বিদ্যা বলতে ‘মিউজিক’-ই! পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর চাকরিতে ঢুকে নিজের মাইনের টাকায় ফ্রেঞ্চ ভাষাটিও শিখে নেয় উইলিয়াম।

আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী…

উইলিয়ামের কথায় যাওয়ার আগে ওদের বাবার সম্বন্ধে আরও দুএকটি কথা বলে নিতে চাই। তিনি ছিলেন একজন সংস্কৃতিমনস্ক আর বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ। আইজ্যাকের ভালোলাগার পরিধিটিও ছিল বিস্তৃত। মিউজিক ছাড়াও তাঁর আগ্রহ ছিল প্রকৃতিবিদ্যা এবং গণিতেও। আকাশের গ্রহ, তারা নক্ষত্র এসব কিছু তাঁকে খুব টানত। মাঝে মাঝে ছাদে গিয়ে সন্ধের আকাশে খালি চোখে চেয়ে চেয়ে তারা দেখেন তিনি। বিভিন্ন তারাদের অবস্থান, উজ্জ্বলতা কিংবা স্থান পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়গুলি বুঝবার চেষ্টা করেন। সুবিশাল আকাশের ‘স্তব্ধ তারার মৌনমন্ত্রভাষণে’-র মধ্যে তিনি হয়তো খুঁজে পান সঙ্গীতময়তা। ভুবন ছেয়ে-যাওয়া ‘সুরের আলো’ আর ‘সুরের সুরধ্বনি’ তাঁকে হয়ত আবিষ্ট করে তোলে। আকাশের অপরূপ ঐকতানের মুগ্ধতা থেকেই জ্যোতির্বিদ্যা সম্বন্ধে জানার আগ্রহ হয় আইজ্যাকের। নিজে নিজেই নানান বইপত্তর জোগাড় করে পড়তে থাকেন। আইজ্যাক হয়ত বুঝতে পেরেছিলেন যে আকাশের সুর আর সমন্বয়ের সঙ্গে কোথাও যেন গণিতের ভাষাটিও জড়িয়ে আছে। তাই শিখতে শুরু করলেন গণিতের ভাষাও। এইভাবে একদিকে সামরিক বিভাগের ব্যান্ড মাস্টারের কাজ, অন্য দিকে শখের তারা চেনা।

রাত্রির অসীম আকাশে ঝিকিমিকি তারাদের অপার সৌন্দর্য চেনানোর জন্য ছেলেমেয়েদেরও সঙ্গে নিয়ে যেতেন তিনি। তারাদের অবস্থান, ধূমকেতু, অরবিট-– এসব নিয়ে তাঁর নিজের জ্ঞান ভাগ করে নিতেন ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের কথায় সেখানে প্রায়শই কেপলার, গ্যালিলিও, নিউটন, লেয়নার, ওয়লার প্রমুখ দিকপালদের কথা উঠত। মুগ্ধ হয়ে ছেলেমেয়েরা বাবার বলা সেই সব কথা শুনে যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সব চেয়ে বেশি উৎসাহী ছিল উইলিয়াম। তারাদের নিয়ে বাবার বলা নানান কথা আর কাহিনি তন্ময় হয়ে শোনে সে। তখন কারওরই কোনও দিকে কোনও কিছুর খেয়াল থাকত না।

কিন্তু খেয়াল না রাখলে কী আর চলে? সব কিছু ভুলে শুধু খামখেয়ালিপনায় মেতে থাকলে কি চলবে? ছেলেমেয়ে আর তাদের বাবা-কে কোথাও দেখতে না পেয়ে মা ঠিক আঁচ পেয়ে উঠে আসত ছাদে। “সংসারের ভালোমন্দ কোনও দিকে খেয়াল নেই। অভাবের সংসার। ছেলেমেয়েদের মাথাগুলোও এই ভাবে চিবিয়ে খাচ্ছ? তোমার কি কোনও কালে আক্কেল হবে না?”– খেঁকিয়ে উঠত স্ত্রী।

ওদের এইসব আকাশের তারা দেখে রাতজাগা নেশায় মায়ের ছিল ঘোর আপত্তি। হবে নাই বা কেন? ছেলেমেয়েদের এইভাবে নিত্যদিন ঘুম নষ্ট করে রাত জাগলে শরীর খারাপও তো হবে। তাছাড়া সকাল সকাল উঠে সংসারের কাজকম্মও তো আছে প্রত্যেকেরই।

যতই মিউজিক ব্যান্ড হোক, যেহেতু তা সেনাবাহিনীর কাজ, তাই সেখানে আছে কঠিন অনুশাসন এবং পাশাপাশি অনুশীলন আর পরিশ্রম। বড্ড একঘেয়ে সে কাজ। নিজের মতন কোনও কিছু স্বাধীন ভাবনা চিন্তা করার কোনও সুযোগই নেই সেখানে। সৃজনশীলতার কোনও জায়গায় নেই।  স্বভাবতই মাস ছয়েক যেতেই উইলিয়ামের মতন অমন মেধাবী ছেলের উৎসাহে ভাঁটা পড়তে শুরু করল। কিন্তু চাকরি ছাড়লেও তো চলবে না? তার উপার্জনের টাকাতে কিছুটা হলেও তো বাড়ির সুরাহা হয়। সঙ্গে নিজেরও হাত খরচা হয়ে যায়, যা দিয়ে বই পত্তর কিনতে পারে। তাই কাজ ছেড়ে আসার কোনও উপায়ই খুঁজে পায় না উইলিয়াম।

এইভাবে কয়েক বছর কাটানোর পর একবার বাবার সঙ্গে সেনাবাহিনীর কাজে কিছুদিনের জন্যে ইংল্যান্ড যাওয়ার সুযোগ এল উইলিয়ামের। ওই কদিনের ইংল্যান্ডে থাকার অভিজ্ঞতায় উইলিয়াম মনে মনে ঠিক করে নেয়, এমন একটা জায়গায় যদি গান বাজনা নিয়ে কাজ করার কখনও কোনও সুযোগ ভবিষ্যতে আসে, তাহলে তৎক্ষণাৎ দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসবে সে।

সুরে সুরে রঙে রসে জাল বুনি

তবে সময় সুযোগ কী আর অত সহজে আসে! বছর চার-পাঁচ কাটানোর পরে মিলিটারি কেরিয়ার ছেড়েছুড়ে, বাবার পরামর্শে আর সাহায্যে উইলিয়াম পালিয়ে এল তার বহু কাঙ্ক্ষিত জায়গা ইংল্যান্ডে। ১৭৫৭ সাল তখন। উইলিয়ামের বয়স তখন উনিশের কাছাকাছি। অচেনা জায়গা তারপর আবার বিদেশ বিভূঁই। ইংল্যান্ডে যখন পা দিচ্ছে উইলিয়াম, পকেটে তখন একটিও টাকা নেই। এমন অবস্থায় শুরু হল উইলিয়ামের নতুন জীবন। জীবন সংগ্রাম।

তবে খুব বেশি সময় কষ্ট করতে হল না উইলিয়ামকে। মিউজিকে পারদর্শিতা ছাড়াও, চমৎকার বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্ব ছিল উইলিয়ামের। যেকোনও মানুষ তার ব্যক্তিত্বে সহজেই আকৃষ্ট হয়ে যেত। বাস্তবিকই, কয়েক মাসের মধ্যেই উইলিয়াম সেখানে বেশ কিছু সমমনস্ক গুণী বন্ধুবান্ধব পেয়ে গেল। কিছুদিনের মধ্যেই গান-বাজনা সংক্রান্ত একটি কাজও পেল ইংল্যেন্ডের ব্যাথে-তে। যেহেতু সে এসব কাজে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট সুদক্ষ হয়ে উঠেছে, তাই কয়েক বছরের মধ্যেই নামডাক এবং খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে উইলিয়ামের। নানান জায়গা থেকে ডাক পেতে থাকে স্টেজ পারফর্মেন্সের জন্যে। এসবের পাশাপাশি নামজাদা এবং গণ্যমান্য অনেক মানুষের সঙ্গেও যোগাযোগ গড়ে উঠল তার। ওরা সকলেই প্রতিভাবান উইলিয়ামকে খুব সমাদর করে।

যদিও উইলিয়ামের পক্ষে এই উচ্চতায় ওঠা অত সহজ ছিল না। বিশেষত ইংল্যান্ড তার মাতৃভূমি নয়। তা ছাড়া অষ্টাদশ শতকের ইংল্যান্ডে ইউরোপের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিভাসম্পন্ন মিউজিসিয়ান-রা আগে থেকেই এসে আস্তানা গেঁড়ে রেখেছে। সবাই সেখানে এসেছে, যাতে করে কম সময়ের মধ্যে সুযোগ, অর্থ আর নামডাক হতে পারে, এমন আশা নিয়েই। তাই সেখানে তখন সুযোগ যেমন ছিল, প্রতিযোগিতাও ছিল বিস্তর। তবু মেধাবী উইলিয়াম নিজের প্রতিভার জোরে ইংল্যান্ডের সঙ্গীত জগতে জায়গা করে নিল। গান বাজনায় তার মেধা আর স্বকীয়তা এবং বিভিন্ন ধরণের বাদ্যযন্ত্র বাজানোয় চমৎকার দক্ষতা থাকায়, উইলিয়ামের সঙ্গীত ক্ষেত্রের রাস্তা মসৃণ হয়ে উঠতে অসুবিধা হল না।

ইংল্যান্ডে এসে উইলিয়ামের প্রথম যে কাজের ক্ষেত্র তা ছিল– ‘হ্যান্ড-কপিয়িং মিউজিক’। পরে হলেন ‘ব্যান্ড-ইন্সট্রাক্টার’। তারপর নিযুক্ত হন মিলিটারি ব্যান্ডের প্রধান হিসেবে। মিউজিক কম্পোজও করতেন উইলিয়াম। এইরকম ভাবে পাঁচ বছর লিডস-এ এবং বছর খানেক হ্যালিফেক্স-এ কাজ করার পর ১৭৬৭-তে ব্যাথ-এ চলে আসলেন উইলিয়াম। এখানে অক্টাগন চ্যাপেল নামের একটি নামকরা কনসার্টে ‘পিয়ানো বাদক পরিচালক’ হিসেবে নিযুক্ত হলেন। এইভাবে প্রাইভেট মিউজিক টিচার, পারফর্মার, কম্পোজার এবং চার্চের পিয়ানোবাদক হিসেবে কাজ করে শেষে থিতু হলেন ব্যাথ-এ। আর এই সংস্থাতেই প্রায় পনেরো বছর সুনামের সঙ্গে কাজ করেন উইলিয়াম।

মম অন্তর কম্পিত আজি নিখিলের হৃদয়স্পন্দে …

ইংল্যান্ডে দশ-বারো বছর সফল মিউজিক জীবন পেরিয়ে গেছে তখন উইলিয়ামের। গানের জগতে তখন তিনি প্রতিষ্ঠিত। তখন তাঁর তুমুল ব্যস্ততা। এই সময় থেকেই উইলিয়ামের আগ্রহের বৃত্তে একটু একটু করে জ্যোতির্বিদ্যা এবং গণিত জায়গা করে নিচ্ছিল। ১৭৫৭ থেকে ১৭৭২– মিউজিকে তখন তাঁর খ্যাতি আর নামডাক তুঙ্গে। উইলিয়ামের জীবনে এবং কাজের ক্ষেত্রে এই সময় এল এক বিরাট পরিবর্তন। ছোট বোন ক্যারোলিনকে বাড়ি থেকে ইংল্যান্ডে তার কাছে নিয়ে এলেন দাদা উইলিয়াম। ১৭৭২ সাল তখন। ক্যারোলিনের বয়স তখন বাইশ। বিয়ে থা হয়নি। তাছাড়া মা জানে, রোগে ভোগা কুৎসিত চেহারার খর্বকায় অশিক্ষিত ওই মেয়েকে, কেই বা বিয়ে করবে! মায়ের আপত্তিতে পড়াশোনার কোনও সুযোগ পায়নি সে। তাকে কাজের মেয়ের মতন বাড়ির সমস্ত কাজ করাত মা। বাড়িতে ওই অসহ্য পরিস্থিতি থেকে দাদার কাছে চলে আসতে পারায় ক্যারোলিন মুক্তি পেল। পড়াশোনা তো জানেই না, জার্মান ছাড়া আর কোনও ভাষাও জানে না সে। তবে ক্যারোলিনের গানের গলা ছিল বেশ মিষ্টি। বাজনাতেও অল্পবিস্তর পারদর্শী ছিল।

এদিকে গান বাজনার কাজে সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি অসম্ভব চাপ, তাই বোনকে সঙ্গী হিসেবে পেয়ে উইলিয়াম যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। শুধু তো আর গান বাজনা নয়, বাড়ির সমস্ত কাজকর্ম, সবই তো একা হাতে উইলিয়ামকেই সামলাতে হয়। গান বাজনা ছাড়া উইলিয়ামের অন্য আরও নানান বিষয়ে আগ্রহ। তাই বোনকে সর্বক্ষণের সঙ্গী হিসেবে পাওয়ায়, অন্য দিকেও সে এখন কিছুটা বেশি সময় দিতে পারবে। ক্যারোলিন যাতে দাদার কাজে সাহায্য করতে পারে সে জন্য প্রত্যেক দিন বাড়ি ফিরে নিয়ম করে বোনকে ইংরেজি শেখানো, সংখ্যা চেনানো, মাপজোখ এবং নামতা শেখানো চলতে থাকে। এসবের পাশাপাশি আছে গান আর মিউজিকের তালিমও।

খুব কম সময়েই ক্যারোলিন হয়ে উঠল কনসার্টের অন্যতম একজন সঙ্গীত শিল্পী এবং উইলিয়ামের সহকারী। ধীরে ধীরে সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে ক্যারোলিনেরও ভালো নামডাক হয়ে গেল। এবার বোনকে সঙ্গী করে উইলিয়ামের গানের জলসাঘর জমজমাট হয়ে উঠল। উইলিয়াম সৃষ্টি করতে থাকে সুর আর সঙ্গীতের নানান মণিমঞ্জুষা। রয়েছে স্টেজ পার্ফরমেন্স করা, সঙ্গীত শিক্ষকতা করা। এভাবেই কেটে যায় সকাল থেকে সন্ধে।

একদিকে গান বাজনা আর অন্যদিকে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা। গণিত আর নিউটনের ক্যালকুলাস পড়া। সেসময় ব্রিটিশ অ্যাস্ট্রোনোমার জেমস ফার্গুসনের লেখা ১৭৫৬-তে প্রকাশিত নতুন সংস্করণের একটি বই পেলেন উইলিয়াম। বইটি অ্যাস্ট্রোনমির টেক্সট বই যা আইজ্যাক নিউটনের সূত্রের ব্যাখ্যা সম্বলিত। বস্তুত উইলিয়াম বইটি গোগ্রাসে গিলে ফেললেন বলা চলে। উইলিয়াম যখন একজন পূর্ণ সময়ের মিউজিসিয়ান, সে সময় ফার্গুসনের এই বই তাঁকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে তুলল। ইতিমধ্যেই উইলিয়াম পড়ে ফেলেছেন রবার্ট স্মিথের লেখা “হারমোনিক্স অর দা ফিলোজফি অফ মিউজিক্যাল সাউন্ডস (১৭৪৯)” এবং “এ কমপ্লিট সিস্টেম অফ অপটিক্স (১৭৩৮)” নামের বই দুটিও। লেখক রবার্ট স্মিথ ছিলেন একজন প্রথিতযশা গণিতবিদ। কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের আস্ট্রোনমির অধ্যাপক। রবার্ট স্মিথের এই বই দুটি উইলিয়ামের জ্ঞান ও উপলব্ধিকে একদিকে যেমন পোক্ত করে তুলল, তেমনি তাঁর ভাবনাচিন্তার আমূল পরিবর্তন ঘটাল।

…আমার আকাশ-চাওয়া মুগ্ধ চোখের রঙিন-স্বপন-মাখা…

উইলিয়াম হার্শেলের চল্লিশ ফুট দীর্ঘ টেলিস্কোপ

স্মিথ-এর বই টেলিস্কোপ নির্মাণের ব্যাপারে দারুণ ভাবে সাহায্য করল উইলিয়ামকে। একই সঙ্গে ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে আকাশ দেখার অনুরাগকে বাড়িয়ে তুলল। শুধু বাড়িয়ে তুলল বললে, কতটুকুই বা বলা হল! উইলিয়ামের আকাশ দেখার ইচ্ছা তখন তীব্র নেশার মতন হয়ে উঠেছে। শুরু হল খালি চোখে আকাশের গ্রহ নক্ষত্র দেখা। আর ভাবতে থাকে কখন টেলিস্কোপ দিয়ে আরও ভালোভাবে আরও দূরের তারাগুলি দৃশ্যমান হয়ে ধরা দেবে তার চোখে।

তখন ১৭৭৩। বসন্ত কাল। উইলিয়াম পুরোদমে গানের জগতে রয়েছেন তখন। তবু চোখ বন্ধ করলেই তিনি যেন দেখতে পাচ্ছেন রাত্রির আকাশে নক্ষত্রপুঞ্জের মানচিত্র। ‘গানের ভিতর দিয়ে’ তিনি যেন ‘ভুবনখানি’ দেখতে পাচ্ছেন! শুনতে পাচ্ছেন উৎসারিত আলো ও অন্ধকারের মহাসঙ্গীত। তিনি যেন ‘মুক্তি’-র সুরের মূর্ছনায় ‘আলোয় আলোয় এই আকাশে’ স্পন্দিত হয়ে উঠছেন!

অ্যাস্ট্রোনমি সংক্রান্ত নানান বই এবং প্রয়োজনীয় কয়েকটি যন্ত্রপাতী কিনে নিয়ে এলেন উইলিয়াম তার ঘরে। ভাড়া করা একটি রেফ্লেক্টিভ টেলিস্কোপও নিয়ে এলেন। কিছুদিন যেতেই বুঝতে পারলেন যে এত কমজোরি টেলিস্কোপ দিয়ে তার কাজ হবে না। প্রয়োজন বড় আর শক্তিশালী টেলিস্কোপের। ঠিক করলেন তিনি নিজেই এই টেলিস্কোপ বানাবেন। তাছাড়া এসব কাজে সময়ও দিতে হবে অনেক। তাই মিউজিকের কাজ যতটা সম্ভব কমাচ্ছেন।

তাঁর পূর্বতন জ্যোতির্বিদরা যেমন তুলনামূলকভাবে কাছের সুর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন, উইলিয়াম সেসব ছাড়িয়ে মহাকাশের দূরতর সাম্রাজ্যের দিকে দৃষ্টি দিতে চান। আর এ কাজের জন্য তার চাই উন্নততর টেলিস্কোপ, যার মধ্যে থাকবে প্রয়োজনীয় অপেক্ষাকৃত অনেক বড় লেন্স। শুধু ইচ্ছে হলেই তো আর হবে না। এসব কেনার জন্য যে প্রয়োজন অনেক টাকার। অত টাকা তখন তার কোথায়?

টেলিস্কোপ নির্মাণ করা অত সহজ কাজ নয়। বড় সাইজের লেন্স লাগবে তা অপ্টিসিয়ানদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে না। তাই ঠিক করলেন নিকটবর্তী ঢালাই কারখানায় তামা, টিন, অ্যান্টিমনি মিশিয়ে তৈরি করবেন। চেষ্টা শুরু হল। এসব কাজে কারওরই অভিজ্ঞতা নেই সেভাবে। তাই নানান অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। তবু সফলতা না পাওয়া অবধি হাল ছাড়লেন না উইলিয়াম। অবশেষে উন্নত গুণমান সমৃদ্ধ বৃহত্তম লেন্স তৈরি করা সম্ভব হল। তারপর একটু একটু করে নির্মিত হল সম্পূর্ণ টেলিস্কোপটি। নিজের কাজের জন্য বিশাল বড় সেই টেলিস্কোপটি তৈরি করা শেষ হল ১৭৭৪-এর শেষ নাগাদ। শুরু হল সেটি দিয়ে নতুন উদ্যমে কাজ। রাতের পর রাত টেলিস্কোপে চোখ রেখে গ্রহ নক্ষত্রদের অবস্থান, চালচলন ইত্যাদির খোঁজ চলতে থাকে। টেলিস্কোপ নির্মাণ থেকে শুরু করে আকাশ পর্যবেক্ষণ সব কাজেই তার সহকারী বোন ক্যারোলিন। অ্যাস্ট্রোনমির নির্ণয়ের কাজে উইলিয়াম ক্যালকুলাস টেকনিক প্রয়োগ করলেন।

আকাশ জুড়ে শুনিনু ওই বাজে…

যুগ যুগ ধরে তারাভরা রাত্রির রহস্যময় আকাশের দিকে চেয়ে মুগ্ধ হয়েছে মানুষ। বিস্মিত হয়েছে সীমাহীন আকাশের নক্ষত্রখচিত ওই অনিঃশেষ সৌন্দর্য বৈভব দেখে। অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছে নক্ষত্রের জ্যোতির্ময় দ্যুতির দিকে। মনের মধ্যে জেগে উঠেছে হাজার জিজ্ঞাসা। উদগ্রীব আর ব্যাকুল করেছে মানুষের কৌতূহলী মনকে। কত দূরে আছে ওই নক্ষত্রের সাম্রাজ্য? ‘তন্দ্রাহারা অন্ধকারের বিপুল গানে’ মন্দ্রিত হয়ে ওঠা ‘সারা আকাশের আহ্বান’ শোনার জন্য এখন উইলিয়াম নির্নিমেষ চেয়ে থাকেন আলোর নির্জন উৎসবের দিকে!

চলতে থাকে নিবিড় অনুসন্ধান। প্রকৃতির নিয়মকানুন বুঝতে চেষ্টা করা, জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে গ্রহ নক্ষত্রদের রহস্য বোঝার চেষ্টা। সে সময়ের পৃথিবী ছাড়া আরও পাঁচটি গ্রহের অস্তিত্বের কথা জানা ছিল। বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি এবং শনি– সৌরজগতের এই গ্রহগুলির কথা।

…গ্রহে তারকায় কিরণে কিরণে বাজিয়া উঠিছে রাগিণী…

ইউরেনাস

শনির পরেও যে একটি গ্রহ রয়েছে, ১৭৮১-তে উইলিয়াম হার্শেল প্রথম তা বললেন। তাঁর তৈরি করা শক্তিশালী টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে ছোট্টো চাকতির মতন হালকা সবুজাভ রঙের যা দেখতে পাচ্ছিলেন, তা যে কোনও সাধারণ তারা নয়, সে কথা হার্শেল সম্যক বুঝেছিলেন। নিশ্চিত হতে রাতের পর রাত উইলিয়াম টেলিস্কোপের লেন্সে চোখ রেখে দেখে গেছেন। বস্তুত হার্শেলের পর্যবেক্ষণ যে সঠিক তা বোঝা গেল। ওটি আসলে সুর্য থেকে সপ্তম গ্রহ। হার্শেল চিহ্নিত করলেন ‘ইউরেনাস’ গ্রহ। সে সময়ের নামজাদা অ্যাস্ট্রোনোমার নেভিল মাস্কেলিনও উইলিয়ামের কাজকে সমর্থন জানালেন।

গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার মোড় ঘুরিয়ে দিল উইলিয়াম হার্শেলের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে। বিশ্ববিখ্যাত হয়ে উঠলেন তিনি। ইংল্যান্ডের রাজা জর্জ III তাঁর বদান্যতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। উইলিয়ামকে রাজা ২০০০ পাউন্ড দিলেন, যাতে করে সে নিজের প্রয়োজনের জন্যে একটি ৪০ ফুট উচ্চতার রিফ্লেক্টার টেলিস্কোপ তৈরি করতে পারে। চার বছর সময় এবং ৪০০০ পাউন্ড লাগল এই টেলিস্কোপটি বানাতে। এটিই ছিল সে সময়ের সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী টেলিস্কোপ। এই টেলিস্কোপ দিয়ে তিনি শনি-র ষষ্ঠ এবং সপ্তম চাঁদ দুটি আবিষ্কার করলেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের কাজ করার জন্য পেলেন প্রয়োজনীয় রাজার কাছ থেকে অনুদান। এরই সঙ্গে রাজ–জ্যোতির্বিদ হিসেবে নিযুক্ত হলেন উইলিয়াম।

টেলিস্কোপ নির্মাণ, আকাশের তারা পর্যবেক্ষণ– এ সবের মধ্যে সঙ্গীত জারি আছে। তবে দুটো জিনিস আর একসাথে চালাতে পারছিলেন না উইলিয়াম। তাই এবার সঙ্গীতকে পুরোপুরি ছেড়ে দিলেন। ১৭৮২ সালে তিনি এবং বোন তাঁদের শেষ পাবলিক মিউজিক পারফর্মেন্স করে বিদায় নিলেন সঙ্গীতের ভুবন থেকে।

এবার কেবলই জ্যোতির্বিদ্যা চর্চা। বোনকে সঙ্গে নিয়ে বেশ কিছু টেলিস্কোপ তৈরি করলেন উইলিয়াম। রেফ্লেক্টার-টেলিস্কোপ নির্মাণ করার সময় বোন এবং তাঁকে দিনে ষোলো ঘণ্টার বেশি নিমগ্ন হয়ে টানা কাজ করতে হয়েছে। সে কাজ অসম্ভব কঠিন। লেন্সের কাচ ঘষে ও পালিশ করে তা উপযোগী করে তোলার কাজ। টেলিস্কোপ নির্মাণে লেন্সের কাচ ঘষা আর পালিশ করার কাজে লাগে সূক্ষ্ম পরিমাপ জ্ঞান আর শিল্পীর মতো নিপুণ কুশলতা। নিপুণ হাতে ক্যারোলিন লেন্সের কাচ ঘষা ও পালিশ করতেন। লেন্স ঘষার কাজ ছাড়াও রাতের আকাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেলিস্কোপে চোখ-লাগানো ভাইয়ের পর্যবেক্ষণগুলি লিপিবদ্ধ করে রাখতেন বোন।

গবেষণারত ভাইবোন

একদিকে টেলিস্কোপে চোখ রেখে আকাশ পর্যবেক্ষণ অন্য দিকে টেলিস্কোপ নির্মাণ করা। ভাবতে অবাক লাগে বোনকে সঙ্গী করে উইলিয়াম প্রায় চারশটি মতন বিভিন্ন ধরনের টেলিস্কোপ তৈরি করেছেন। খুব বেশি কাজে না লাগা টেলিস্কোপগুলি ইউরোপের বিভিন্ন বিত্তশালী মানুষ এবং রাজাদের বিক্রি করে অর্থের সংস্থান করেছেন। এইভাবে উইলিয়াম গবেষণা চালানোর জন্যে নিজের খরচ নিজে উপার্জন করেছেন। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলতে হয়, তা হল বর্তমান সময়ের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষকরা গবেষণার খরচের জন্যে এই ভাবে উপার্জনের কথা ভাবতেই পারবে না আজ!

উইলিয়ামের জীবনে এল আবার একটি বিরাট পরিবর্তন। ১৭৮৮ সাল, উইলিয়ামের বয়স তখন প্রায় পঞ্চাশ বছর। প্রতিবেশী এক বিধবা ধনী মহিলা, মেরি পিটকে বিয়ে করলেন উইলিয়াম। একটি সন্তানও হল তাঁদের, নাম জন।

নাইটহুড খেতাব

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকেই পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার, সম্মান, স্বীকৃতি ও খেতাব। ১৮১৬-তে নাইট উপাধি পেয়েছেন উইলিয়াম হার্শেল। অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ১৮২১–এ।

তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে…

মিউজিক বা সঙ্গীতচর্চা কি কোনওভাবে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীর বিজ্ঞানসাধনাকে প্রভাবিত করে? একথা ঠিক যে বিভিন্ন শতাব্দীর বেশ কয়েকজন বিখ্যাত চিন্তাবিদ বা দার্শনিকদের জীবনকাহিনি থেকেই এর উত্তর মেলে। দৃষ্টান্তস্বরূপ কয়েজনের কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই। গ্রীক দার্শনিক ও বন্দিত গণিতবিদ পিথাগোরাসের (৫৮২-৪৯৭ বিসি) কথা বলি। তিনি মিউজিক, গণিত আর গ্রহনক্ষত্রদের সম্পর্কের কথা বলেছেন। প্রবর্তন করেছেন মিউজিক থিয়োরির। যে কোনও মিউজিক যে শব্দ, ধ্বনি, তাল, লয় ইত্যাদির সংখ্যাভিত্তিক নিয়ম রীতি মেনে চলে এবং মিউজিকের সঙ্গে যে গাণিতিক অনুপাতের একটা বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে, তা পিথাগোরাসই বলেছেন। মিউজিক্যাল হারমোনির মতন সৌরজগতের মধ্যেও যে রয়েছে সমন্বয় ও গাণিতিক নিয়মানুগতা, বলেছেন সে কথাও। পিথাগোরাস ছাড়া গণিত ও অ্যাস্ট্রোনমির সঙ্গে মিউজিকের সম্পর্কের কথা বলেছেন টলেমি এবং প্লেটোও।

বিশ্ববন্দিত কয়েকজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে সঙ্গীত অনুরাগের কথা আমরা জানি। যেমন নোবেলজয়ী পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ভায়োলিন বাজানোয় ছিলেন দারুণ পারদর্শী। পিয়ানো বাজানোয় পারদর্শিতা ছিল বিজ্ঞানী থমাস এডিসনেরও। নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফেইনম্যান খুব ভালো বঙ্গো বাজাতে পারতেন। বিজ্ঞানীদের সঙ্গীত বা মিউজিকের সঙ্গে সংযোগ সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীর ব্রেনে এক ধরণের উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। সম্ভবত যা তাঁদের সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়ে ওঠে। আধুনিক কগনেটিভ সায়েন্সের পরীক্ষালব্ধ ফলাফলও এমন ইঙ্গিতই দেয়।

তবে ওপরে বলা সঙ্গীত অনুরাগী বিজ্ঞানীদের সঙ্গে উইলিয়াম হার্শেলের বিষয়টি আলাদা। আইনস্টাইন, এডিসন বা ফেইনম্যানের মূল ভুবন ছিল বিজ্ঞান। তাঁদের কাছে সঙ্গীত ছিল কেবল শখের বা ভালো লাগার জায়গা। কিন্তু উইলিয়ামের ক্ষেত্রে তা নয়। তিনি জীবনের একটি বিরাট সময় সম্পূর্ণভাবে মিউজিক বিভাগে নিয়োজিত ছিলেন, যেখানে তিনি পেয়েছেন বিপুল সফলতা। প্রায় তিরিশ বছর নিরবিচ্ছিন্নভাবে সঙ্গীত ও মিউজিকের চর্চা করেছেন তিনি এবং পরবর্তী প্রায় তিরিশ বছর তিনি জ্যোতির্বিদ্যা চর্চায় নিবিষ্ট ছিলেন। উইলিয়ামের ক্ষেত্রে আগ্রহের অভিমুখটিই সম্পূর্ণভাবে বদল হয়েছে মিউজিক থেকে জ্যোতির্বিদ্যায়! তাছাড়া, দুটি ক্ষেত্রেই তিনি পেয়েছেন বিপুল সফলতা।

উন্নত টেলিস্কোপ নির্মাণ করা এবং ইউরেনাস গ্রহ আবিষ্কার করা ছাড়াও উইলিয়াম আবিষ্কার করেছেন ইনফ্রা-রশ্মি–রেডিয়েশন। নির্ভুলভাবে ইনফ্রা-রশ্মি–রেডিয়েশনের বেশ কিছু ধর্ম সম্পর্কে আগাম ধারণা দিয়েছিলেন তিনি। এছাড়াও শতাধিক নক্ষত্রপুঞ্জ (নেব্যুলা) এবং গ্যালাক্সি চিহ্নিত করেন। ধারণা দিয়েছেন ছায়াপথের গঠন সম্পর্কে। উইলিয়াম হার্শেলই প্রথম জ্যোতির্বিদ যিনি সুনির্দিষ্টভাবে সোলার সিস্টেমের বাইরে ইন্টার-গ্যালাক্টিক স্পেসে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর আকাশ অনুসন্ধান থেকেই তৈরি হয়েছে আজকের আকাশের গভীরতর বস্তুর সন্ধান NGS (নিউ জেনারেল ক্যাটালগ)। তিনিই নির্ণয় করেছেন চাঁদের অন্তর্গত পাহাড়ের উচ্চতা এবং তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন শনির ষষ্ঠ ও সপ্তম চাঁদের। এছাড়াও ইউরেনাসের সবচেয়ে বড় দুটি চাঁদ, টাইটেনিয়া এবং ওবেরন তাঁরই আবিষ্কার। ‘অ্যাস্ট্রয়েড’ এই নাম নামটিও উইলিয়ামের প্রবর্তন করা। বস্তুত তাঁর হাত ধরেই জন্ম হয়েছে আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার।

আকাশ আমায় ভরল আলোয়, আকাশ আমি ভরব গানে…

তবে অনেকেই মনে করেন, অ্যাস্ট্রোনমির ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের পেছনে সম্ভবত ঢাকা পড়ে গেছে তাঁর সঙ্গীত জীবনের অনেক সুর সৃষ্টি ও পারদর্শিতা। ভায়োলিন, সেলো, ওবেয়, হার্পসিকর্ড এবং পিয়ানো বাজানোয় দারুণ দক্ষ উইলিয়াম অনেক উল্লেখযোগ্য সুর সৃষ্টি করে গেছেন। বিশেষত চার্চ-মিউজিকের ক্ষেত্রে এবং কনসার্ট ও সিম্ফনিতেও রেখে গেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। অ্যাস্ট্রোনমিতে বিশাল অবদানের পাশাপাশি তিনি চব্বিশটিরও বেশি সিম্ফনি এবং অজস্র সুর সৃষ্টি করেছিলেন। অসাধারণ মেধা, সফলতা, যশ, প্রতিপত্তি সত্ত্বেও উইলিয়াম ছিলেন খুব সাধারণ এবং বিনয়ী। তাঁর উদারতা, সততা আর আন্তরিক স্বভাবের জন্য খুব সহজেই প্রত্যেকটি মানুষ তাঁকে পছন্দ করত।

জ্যোতির্বিদ্যায় ক্যারোলিনের অবদান সম্পর্কে এই লেখায় উল্লেখ করা হয়নি। তাই পাঠকদের বলে রাখা দরকার যে, এই লেখা পড়ে যেন কেউ মনে না করেন যে ক্যারোলিন শুধু উইলিয়ামের সহায়ক হিসেবেই কাজ করে গেছেন। ক্যারোলিনের অসাধারণ আত্মত্যাগ এবং ভাইয়ের সহকারী হিসেবে কাজ করা যেমন সত্য,  তিনি নিজেও যে স্বাধীনভাবে জ্যোতির্বিদ্যার কাজ করেছেন, এ কথাও সমানভাবে সত্যি। ভাই নিজে তাঁকে উৎসাহ দিয়েছে মৌলিক গবেষণা করতে। তার কাজের জন্য দিয়েছেন প্রয়োজনীয় টেলিস্কোপ। ক্যারোলিনের জীবনসংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর জ্যোতির্বিদ্যায় অবদানের কথা, সেও এক দারুণ চিত্তাকর্ষক কাহিনি। ভাই-বোনের এমন পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও ত্যাগ স্বীকারের কথা আমাদের মুগ্ধ করে। বলা বাহুল্য, এসব কাহিনি একটি আলাদা পরিসরের দাবি করে। তাই এখানে নয়। ক্যারোলিনের কাহিনি আলাদা করে বলতে হবে।

একজন ব্যান্ডের যন্ত্রবাদক, মিউজিক-শিক্ষক, কম্পোজার ও সফল সঙ্গীত শিল্পী, প্রথম দিকে জ্যোতির্বিদ্যা চর্চা যার কাছে ছিল শখের। সেই স্বশিক্ষিত মানুষটি একা হাতে জ্যোতির্বিদ্যা চর্চায় আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছেন।  প্রবর্তন করেছেন জ্যোতির্বিদ্যার এক নতুন যুগ। আগ্রহ, শখ আর মেধার সঙ্গে অনুসন্ধিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ যে একজন মানুষকে সফলতার কোন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উইলিয়াম হার্শেল।

একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ মিউজিসিয়ান থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর একজন গুরুত্বপূর্ণ অ্যাস্ট্রোনোমার হয়ে ওঠার এই অসাধারণ জীবনকাহিনি রহস্য উপন্যাসের থেকেও রোমাঞ্চকর! যতদিন পর্যন্ত পৃথিবী নামের আমাদের এই গ্রহ থাকবে, থাকবে মানুষ, ততদিন পর্যন্ত উইলিয়াম হার্শেলের অবদান উজ্জ্বল আলোকস্তম্ভের মতন সকলকে পথ দেখাবে। মিউজিসিয়ান থেকে একজন বিশ্ববন্দিত জ্যোতির্বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার এই অভাবনীয় ইতিহাস, বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে অমর হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন থেকে নতুন করে উজ্জীবনের মন্ত্র খুঁজে পাবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 956 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

3 Comments

  1. Apu has written exactly the same words what I intended to. Resorting to English (even poorer) to evade my insufficiency in expressing in the same way.
    Virtually, hardly any word can extend justice to write an encomium on this writing.
    With absolute regards, I would express my little concern about the colloquilism in usage of the word ‘Bajondar’, which in my opinion might have compromised (though not to a significant extent) the gravity the writing has maintained throughout; though the diction of my own falls short in finding any better substitutive word.

    Such a writing from our family adds to the pride to all of us.

    • উৎপল …. So nice of you Utpal ! I must appreciate as you have gone through the article so meticulously ! You are rightly pointing out use of the term — ‘ বাজনদার ‘ in which I could not also fully satisfied using the term as writer. However other options are also not better substitute eg. বাদ্যকর , বাজিয়ে, বাজনাদার ! Ya , it could be replaced as যন্ত্রশিল্পী!
      অর্কও লেখাটা পড়েছে এবং ভালো লাগা জানিয়েছে। তোর মননশীল মন্তব্য পেয়ে খুব ভালো লাগল!

  2. খুব ভালো লাগলো পড়ে। ভালো লাগে তোমার এই বিজ্ঞানের সঙ্গে সাহিত্যকে নিয়ে পথ চলাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*