গ্লামিস হ্যাথ মার্ডার্ড স্লিপ… ম্যাকবেথ শ্যাল স্লিপ নো মোর

অভী আচার্য

 

মৃত্যুর মাসকয়েক আগে ধারওয়াড়ের বিজেপি সাংসদ প্রহ্লাদ জোশির করা মানহানির মামলায় কর্নাটকের এক স্থানীয় আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন গৌরী লঙ্কেশ। পরে অবশ্য সে মামলা উচ্চতর আদালতে যায়, সেখানে নিম্ন আদালতের রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ জারি হয়, এবং জামিনে মুক্তি পান গৌরী। খবর সেটা নয়। খবর এটাও নয় যে, নিম্ন আদালতের রায় বেরনোর পর বিজেপি-র সোশ্যাল মিডিয়া উইং-এর প্রধান শ্রী অমিত মালব্য মহাশয় একটি টুইট-এ সেই রায়কে স্বাগত জানিয়েছিলেন। সেই টুইট-বার্তার শুরুতে বলা হয়েছিল, “প্রহ্লাদ জোশি বিজেপি এমপি ফ্রম ধারওয়াড় গেটস গৌরী লঙ্কেশ কনভিক্টেড ইন দ্য ডিফেমেশন কেস।” খবর হল, ওই বার্তার শেষে একটি সংক্ষিপ্ত অথচ সুস্পষ্ট চেতাবনি ছিল। সে চেতাবনির ভাষাটি এইরকম – “হোপ আদার জার্নোজ টেক নোট।” গৌরীর হত্যার ঠিক পরপরই জনৈক বিক্রমাদিত্য রানার টুইটেও প্রায় একই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিল – “হোপ দিস ইজ নট দ্য লাস্ট, ইট শুড বি অ্যান এপিসোড অফ সিরিয়াল অ্যাসাসিনেশনস অফ অল অ্যান্টিন্যাশনালস লাইক শোভা দে, অরুন্ধতী রায়, সাগরিকা ঘোষ, শেহ্‌লা রশিদ…”

এ দু’টি নিছক উদাহরণমাত্র। গৌরী লঙ্কেশের হত্যা ও হিন্দুত্ববাদী শিবিরের তৎপরবর্তী লাঙ্গুলাস্ফালনের খবর যাঁরা সংবাদমাধ্যমে অনুসরণ করেছেন তাঁরা জানেন এমন অসংখ্য টুইটের খবর। শুধু টুইটারে নয়, ফেসবুক-সহ সোশ্যাল মিডিয়ার একাধিক প্ল্যাটফর্মে, এমনকী টেলিফোনেও রবীশ কুমার, রাজদীপ সরদেশাই, সিদ্ধার্থ বরদারাজন অভিসার শর্মা, প্রতীক সিন্‌হা প্রমুখ প্রতিবাদী সাংবাদিককে সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়েছে। শুধু কুলপুরোহিত শ্রী মালব্য নন, তদনুসারী শাসক দলের সোশ্যাল মিডিয়া-বাহিনির মেজো-সেজো পাণ্ডা ও তন্ত্রধারীরা – যাঁদের মধ্যে নিখিল দধিচের মতো মহামানবেরাও আছেন যাঁদের কাউকে-কাউকে আবার স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী টুইটারে অনুসরণও করার সময়ও পেয়ে থাকেন – অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এই প্রচার চালিয়ে গিয়েছেন, যার মর্মার্থ, এইসব সাংবাদিকদের হাতেই দেশের হিন্দুত্ববাদী সত্তা সমূহ বিপন্ন – এদের দ্রুত নিকেশ করে ফেলতে পারলেই, অতএব, দেশে শান্তিকল্যাণ বিরাজ করবে। হিন্দুত্ববাদী সোশ্যাল মিডিয়া-বাহিনির এই প্রচারে হাওয়া দিয়েছে শাসকদলের সমর্থনপুষ্ট একশ্রেণির মিডিয়াও – লঙ্কেশের হত্যার পরে নয়াদিল্লির প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের প্রতিবাদসভাকে কটাক্ষ করে বৈদ্যুতিন মিডিয়ার পোস্টারবয় তথা দেশের স্বঘোষিত ‘একমাত্র স্বাধীন সংবাদমাধ্যম’-এর কালো কোট-পরা প্রধান সঞ্চালক রাত ন’টার প্রাইমটাইমে বলেছেন, “হায়, এবার সাংবাদিকরাও রাজনীতিবিদদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফেললেন।”

গত মাসপাঁচেক ধরে ‘দেশের একমাত্র স্বাধীন সংবাদমাধ্যম’টি যে হিন্দুত্ববাদীদের একটিও আচরণের বিরোধিতা করার অবকাশ পায়নি, আখলাক-জুনেইদ-পহলু খানেদের গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনাকেও নির্বিকল্প সমর্থন করেছে, সংঘ-পরিবার ও তার রাজনৈতিক ভাষ্যকে মান্যতা দেওয়ার লক্ষ্যে বিজেপি-র মুখপাত্রদের প্যানেলে ডেকে এনে তাঁদের দিয়ে ক্রমাগত অসত্যভাষণ করিয়ে মিথ্যাকে প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা দিতে ব্যস্ত থেকেছে, সেই চ্যানেল যখন সাংবাদিকতায় রাজনীতির অনুপ্রবেশ নিয়ে আক্ষেপ করে, তখন তার নিহিতার্থ অনুধাবন করা সহজ হয়ে যায় বইকী। কিন্তু এ-লেখার মূল অভিপ্রায় শুধু সেইটুকুই নয়। বেঙ্গালুরুর রাজরাজেশ্বরীনগরের বাড়ির সামনে গৌরীর রক্তের দাগ আপাতত প্রায় মুছে যাওয়ার মুখে। যারা প্রত্যক্ষত ও পরোক্ষত এই ঘটনার নেপথ্যে, তারাও ইতিমধ্যেই প্রায় নিশ্চিত যে সিদ্দারামাইয়ার গড়ে দেওয়া ১৯ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল তাদের টিকিটিও খুঁজে পাবে না – ঠিক যেভাবে কালবুর্গির হত্যাকারীদের এখনও চিহ্নিত করা যায়নি। গৌরী-হত্যার তদন্তের আপডেট ইতিমধ্যেই প্রথম পাতা থেকে সরে গিয়েছে, এবং আমরা নিশ্চিত যে, তা অচিরেই জনসাধারণের স্মৃতি, যাকে ‘পাবলিক মেমরি’ বলা হয়, তা থেকেও মুছে যাবে। আমরা হয়তো মনেও রাখব না যে, গৌরীর মৃত্যুর একমাস অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই ত্রিপুরার মান্দাইয়ে হিন্দুত্ববাদী একটি সংগঠনের সদস্যদের চপারে মর্মান্তিকভাবে খুন হতে হয়েছে তরুণ সাংবাদিক শান্তনু ভৌমিককে। গত একমাসে খাস দিল্লিতেই প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে ‘দ্য হিন্দু’-র রিপোর্টার মহম্মদ আলি, ‘দ্য কুইন্ট’-এর দীক্ষা শর্মা-সহ অন্তত একডজন সাংবাদিককে। একাধিক ক্ষেত্রে সেই হুমকি এসেছে হোয়াট্‌সঅ্যাপ মেসেজে, একেবারে ‘আরএসএস’-এর নাম করেই।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, গৌরী লঙ্কেশের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদীরাই জড়িত, নির্বিকল্প সে দাবি করার সময় নিশ্চিতভাবেই এখনও আসেনি, কারণ তা তদন্তসাপেক্ষ বিষয়। ঠিক যেমন বলার সময় আসেনি কালবুর্গি বা পানসারে বা ডাভোলকরের আততায়ীদের বিষয়েও। সময় আসেনি, কারণ তদন্ত এখনও চলছে, এবং কাউকেই এখনও পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত করার মতো প্রমাণ তদন্তকারীদের হাতে আসেনি। ঈষৎ কৌতূকজনক এই তথ্যও উল্লেখ করে রাখা যাক যে, কোনও-কোনও মহল থেকে এ-কথা ভাসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়েছে যে, মাওবাদীদের একটি অংশ গৌরীর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, কারণ কর্নাটকের কংগ্রেস-সরকারের সঙ্গে মিলে তাদের সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন গৌরী, এবং তাঁর এই প্রয়াসকে কট্টরপন্থী মাওবাদীরা নাকি ভাল চোখে দেখেনি। যদিও বিশেষ তদন্তকারী দল এ-পর্যন্ত এ-ঘটনার সঙ্গে কোনও মাওযোগ খুঁজে না-পাওয়ায় সে দাবি ধোপে টেকেনি। কিন্তু গৌরী তাঁর কাগজে কী ধরনের বিষয় নিয়ে লিখতেন, কাদের বিরুদ্ধে লাগাতার আক্রমণ শানাতেন তা যদি একটু খেয়াল করা যায় তা হলে কারা তাঁর মুখ বন্ধ করতে চাইতে পারেন, বা তাঁর মুখ বন্ধ হলে কারা খুশি হতে পারেন সে বিষয়ে মোটামুটি একটা ধারণা করা খুব কঠিন হয় না। ধারণা করা বস্তুত আরও সহজ হয়ে আসে এ-লেখার শুরুতে উল্লেখিত মালব্য-মহাশয়ের টুইট-বার্তাটি খেয়াল করলে।

এই প্রসঙ্গে ঈষৎ পুরনো আরও একটি টুইট-বার্তার প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইব। ২০১৫-র অক্টোবরের সেই টুইট-বার্তার নেপথ্যপুরুষ কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রকের তদানীন্তন মন্ত্রী শ্রী মহেশ শর্মা। এমএম কালবুর্গি, গোবিন্দ পানেসর ও নরেন্দ্র ডাভোলকরের হত্যার প্রেক্ষিতে তখন একের পর এক লেখক-বুদ্ধিজীবী কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া সম্মান প্রত্যর্পণ করছেন, প্রকাশ্যে নিন্দা করছেন দক্ষিণপন্থী গৈরিক শিবিরের হাতে রচিত ভয় ও অসহিষ্ণুতার আবহের। সেই ‘অ্যাওয়ার্ড-ওয়াপ্‌সি’ প্রসঙ্গে সংস্কৃতি-মন্ত্রীর বীরদর্প ঘোষণা ছিল, “ইফ দে সে দে আর আনেব্‌ল টু রাইট, লেট দেম ফার্স্ট স্টপ রাইটিং। উই উইল দেন সি…।” নৈমিষারণ্যে জলাহরণে উদ্যত পাণ্ডবভ্রাতৃবর্গের উদ্দেশে যেমন ছিল ধর্মবকের সেই বহুশ্রুত সাবধানবাণী – মাং সাহসং কার্ষীমঃ – প্রশ্নের উত্তর না-দিয়ে জলপানের সাহস কোরো না – অনেকটা যেন তেমনই। বলা বাহুল্য, সে-সময় অনেকেই কান দেননি মন্ত্রী মহোদয়ের সেই সাবধানবাণীতে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তার শেষাংশে কি প্রচ্ছন্ন ছিল অন্তরালবর্তী একটি ‘বুঝে নেওয়ার’ ইঙ্গিত? “উই উইল দেন সি”-র মধ্যে দিয়ে কি আসলে বলতে চাওয়া হয়েছিল, “লেখা বন্ধ করো, (নইলে) বুঝে নেব”? ঘটনাক্রমের পূর্বাপর বিশ্লেষণ করলে যেন খানিক তেমনই বোধ হয় – কীভাবে বুঝে নেওয়া হবে, তার চিত্রনাট্য যখন মঞ্চায়িত হতে দেখা যায় গৌরী লঙ্কেশের বাড়ির সামনের রাস্তায় – কালবুর্গির ক্ষেত্রে ঠিক যেমন হয়েছিল। এবং এখানেই, এই একই চিত্রনাট্যের হুবহু পুনঃমঞ্চায়নের মধ্যেই যেন ধরা থাকে এক নির্দ্বিধ, নিঃসংশয় বার্তা – হ্যাঁ, আমরাই। এভাবেই কালবুর্গিকে মেরেছিলাম আমরা, এভাবেই গৌরীকেও মারলাম। আরও যারা-যারা মুখ খুলবে, তাদেরও পরিণতি হবে এমনই – হোপ জার্নোজ মে টেক নোট।       

সত্যি বলতে কী, সাংবাদিকদের (আরও ব্যাপক অর্থে ধরলে, প্রতিবাদী সমস্ত কণ্ঠস্বরকে) খুন করে সত্যের মুখ চাপা দেওয়ার চেষ্টা মোটেই নতুন কোনও খবর নয়। না এ-দেশে, না বিদেশেও। যদি একটু তথ্যের দিকে খেয়াল করে দেখি, ১৯৯২ থেকে এ-পর্যন্ত অন্তত ২২জন সাংবাদিককে ‘অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ী’র হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে আমাদের দেশে। সারা পৃথিবীর হিসেবে সে সংখ্যা আরও অনেকটাই বেশি। সম্প্রতি আর একটি বিচিত্র তথ্য হাতে এসেছে, যেখানে ‘রিপোর্টার্‌স উইদাউট বর্ডার্‌স’ নামে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, সিরিয়া এবং ইরাকের পর, সাংবাদিকদের পক্ষে তৃতীয় সর্বোচ্চ বিপজ্জনক দেশ ভারত। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের পক্ষে এ যে বাস্তবিক এক অতি গৌরবজনক অভিধা, তাতে আর সন্দেহ কী!

লেখার একেবারে শেষে এসে মনে পড়ে গেল ম্যাকবেথ নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কের সেই বিখ্যাত স্বগতোক্তি। “… ঘুম কেড়েছে ম্যাকবেথ, কডর কখনও ঘুমোবে না – ম্যাকবেথ কখনও ঘুমোবে না।” যে-কোনও বিরুদ্ধ কণ্ঠস্বরকে হত্যা করে, অস্বস্তিকর যে-কোনও প্রশ্নকে হুমকির চাদরে চাপা দিয়ে যেভাবে দেশজোড়া ভয়ের পরিবেশ ঘনিয়ে তুলতে চাওয়া হচ্ছে, তার পরিণতিতে ভয়ের রচয়িতারাও অনতিদূর ভবিষ্যতে ঘুমোতে পারবেন তো?

 

লেখক পেশায় মুক্তভল্ল স্বাধীন সাংবাদিক ও সমাজকর্মী  

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...