অরণ্যের অধিকার, জনজাতির ভবিষ্যৎ— আমাদের নিষ্ফল আলোচনা কেবল

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

 


অরণ্যের অধিকার বহুকাল যাবৎ অপসৃত। আমরা সময়ে সময়ে সেই হারানো অধিকারের কথা চিন্তা করি কেবল। মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহের ঘটনা। ১৮ মার্চ তারিখে ওড়িশার কোরাপুট জেলার আদিবাসী-অধ্যুষিত নন্দপুর ব্লক অঞ্চলের ছয়টি গ্রামপঞ্চায়েতের বাসিন্দারা মিছিল করে স্থানীয় তহশিলদারের দপ্তর অভিযান করেন। সেখানে তাঁরা ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপাল ও দেশের রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে লেখা একটি চিঠির মাধ্যমে তাঁদের বক্তব্য জানান। সংবাদে প্রকাশ সংশ্লিষ্ট এলাকার বলাদা বক্সাইট প্রকল্পের ভার আদানি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্তের কথা জানাজানি হওয়ার পর, সেই পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁদের এই মিলিত প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত।

 

অরণ্যের অধিকার বহুকাল যাবৎ অপসৃত। আমরা সময়ে সময়ে সেই হারানো অধিকারের কথা চিন্তা করি কেবল। মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহের ঘটনা। ১৮ মার্চ তারিখে ওড়িশার কোরাপুট জেলার আদিবাসী-অধ্যুষিত নন্দপুর ব্লক অঞ্চলের ছয়টি গ্রামপঞ্চায়েতের বাসিন্দারা মিছিল করে স্থানীয় তহশিলদারের দপ্তর অভিযান করেন। সেখানে তাঁরা ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপাল ও দেশের রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে লেখা একটি চিঠির মাধ্যমে তাঁদের বক্তব্য জানান। সংবাদে প্রকাশ সংশ্লিষ্ট এলাকার বলাদা বক্সাইট প্রকল্পের ভার আদানি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্তের কথা জানাজানি হওয়ার পর, সেই পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁদের এই মিলিত প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত। তাহলে প্রথমে বলাদা বক্সাইট ব্লকের বিষয়ে কিছু তথ্য দেওয়া জরুরি।

আদানি গোষ্ঠীর অন্তর্গত মুন্দ্রা অ্যালুমিনিয়ম লিমিটেড কোম্পানিকে বর্তমানে বলাদা বক্সাইট প্রকল্পে খননকার্য চালানোর ভার দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক সমীক্ষায় দেখা গেছে এই বলাদা ব্লকে মাটির তলায় প্রায় ২.২৩ কোটি টন বক্সাইটের সঞ্চয় রয়েছে। এছাড়াও আদানি গোষ্ঠীরই অন্তর্গত অন্য আরেকটি সংস্থা, কলিঙ্গ অ্যালুমিনিয়ম কোম্পানি লিমিটেডকে নিকটবর্তী ভেজা মৌজার ২৭ এবং ২২৫ নং প্লটের ২ একর ৪৮ শতক পরিমাণ জমিতে, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই সেটির দখল নেওয়া ও সেখানে খননকার্য চালানোর বিষয়ে সরাসরি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট গ্রামবাসীদের অভিযোগ, তাঁদের সঙ্গে কোনওরকম আলোচনা ছাড়াই সরকারি তরফে একমুখী এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে পরিবেশ ও জীবিকা ধ্বংসের পাশাপাশি, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে পবিত্র প্রার্থনাস্থল হিসেবে চিহ্নিত নাগেশ্বরী পাহাড় অবধি নষ্ট হতে বসেছে। সরকারের কাছে তাই আদিবাসীদের দাবী—

  1. বলাদা ব্লকের নাগেশ্বরী পাহাড় ও নিকটবর্তী এলাকাতে সমস্ত ধরনের খননকার্যের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে।
  2. ৬ মার্চ ২০২৫ তারিখে যে জনশুনানি হয়েছিল বলে সরকারের তরফে দাবি করা হচ্ছে, সেটিকে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক বলে মেনে নিয়ে নতুন শুনানির ব্যবস্থা করতে হবে ও সেই শুনানিতে গ্রামসভার সদস্যদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
  3. এলাকার জনগোষ্ঠীকে এই বিপর্যয় ও এভাবে জমি হারানোর সমস্ত সম্ভাবনার হাত থেকে রক্ষা করতে অরণ্যের অধিকার আইন প্রয়োগ করতে হবে। এবং,
  4. তাঁদের জীবিকার অধিকার ও নাগেশ্বরী পাহাড়ে তাঁদের ধর্মাচরণের যে বহু প্রজন্মের অধিকার, সেই বিষয়ে কোনওরকম হস্তক্ষেপ করা চলবে না।

এদিকে ওড়িশা প্রশাসনের তরফে দাবি করা হয়েছে কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রকের সমস্ত নির্দেশিকা মেনেই গত ৬ মার্চ, ২০২৫ তারিখে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের মতামত জানার জন্য জনশুনানির ব্যবস্থা করা হয়। যদিও গ্রামবাসীদের বক্তব্য, সেই শুনানিতে বলাদা, ভেজা, কুলবীর, অটন্ডা ও বাদেল গ্রামপঞ্চায়েতের সদস্যেরা এই প্রকল্পগুলির তীব্র বিরোধিতা করেন। তা সত্ত্বেও সরকারি আধিকারিকেরা তাঁদের বক্তব্য না শুনেই কার্যত শুনানি ছেড়ে পালিয়ে যান। ওড়িশা রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের এক আধিকারিক এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ-ও মন্তব্য করেছেন, এমন বিষয়ে গ্রামসভার অনুমোদন আইনত বাধ্যতামূলক নয়। যদিও আদিবাসী-অধ্যুষিত এলাকায় যে কোনও ধরনের খননকার্য চালানোর প্রয়োজনে সেখানকার গ্রামসভার অনুমোদন, অরণ্যের অধিকার আইন মোতাবেক ১০০ শতাংশ বাধ্যতামূলক। সেই কারণেই বলাদা ও সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা সেই আইনকে হাতিয়ার করে নিজেদের মৌলিক অধিকার দাবি করেছেন। এই ঘটনা প্রসঙ্গে আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও স্বভাবতই তাদের কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।

পরিবেশগত সমস্ত বিষয়কে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সরকারি তরফে নির্বিচারে পরিবেশ ধ্বংসের প্রবণতা গত এক দশক যাবৎ অস্বাভাবিক পরিমাণে বেড়েছে। হিমালয়ের সংবেদনশীল অঞ্চলগুলিতে একাধিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনাও ‘বিকাশে’র এই উন্মাদনৃত্যকে প্রতিহত করতে পারেনি। এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে প্রান্তিক  জনজাতি গোষ্ঠীগুলিকেও ক্রমশ কোণঠাসা করার প্রক্রিয়া। অরণ্যের অধিকার আইনের কারণে আদিবাসী, জনজাতি-অধ্যুষিত অঞ্চলে বৃহৎ পুঁজিপতিদের সাহায্যে খনি-বিস্তারের প্রক্রিয়া বহুকাল ধরেই বাধাপ্রাপ্ত হয়ে এসেছে। প্রত্যেক সরকারই, সংবিধানের প্রতি তাঁদের আনুগত্যের কথা মুখে উচ্চারণ করলেও, ব্যবহারিক ক্ষেত্রে নানা কূটকৌশলের মাধ্যমে এই আইনকে পাশ কাটিয়ে বৃহৎ এলাকার খনিজ সম্পদ পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিতে সচেষ্ট থেকেছে। আদিবাসী অঞ্চলগুলিতে লাগাতার অনুন্নয়ন ও সেই বঞ্চনার কারণে একাধিক জায়গায় গড়ে ওঠা উগ্র-রাজনৈতিক আন্দোলনকে সরাসরি অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সেই অঞ্চলগুলিতে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামিয়ে আনার প্রচেষ্টা বহু বছর ধরে জারি থেকেছে। সরাসরি সেই অঞ্চলগুলিকে ‘উপদ্রুত’ তকমা দিয়ে, কঠিন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে রীতিমতো হত্যাযজ্ঞ চালানো, ও আদিবাসী-জনজাতি গোষ্ঠীগুলিকে সেই সন্ত্রাসের মাধ্যমে শায়েস্তা করা প্রত্যেক সরকারের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে উপদ্রুত অঞ্চল বা নকশালবাদের হাত থেকে আদিবাসী অঞ্চলগুলিকে উদ্ধারের নামে সরকারি কৌশল বা ‘দমনমূলক’ প্রকল্পগুলি আদৌ কতখানি বাস্তব-ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে, সেই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সাংবাদিক আলি আহমেদের সাম্প্রতিক নিবন্ধটি[1] প্রণিধানযোগ্য।

২০১৪ সালে ‘নয়া ভারতের সরকার’ প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এই পুরনো কৌশলের পাশাপাশি অরণ্যচারীদের অরণ্য থেকে উচ্ছেদ করার বিষয়টি যাতে সহজতর হয়, সেজন্য অর‍ণ্য সংরক্ষণ আইনটিকেও বিস্তারিতভাবে সংশোধন করা হয়েছে। এর ফলে অরণ্য অঞ্চল হিসেবে কোনও একটি এলাকাকে চিহ্নিত করার বিষয়টিই নানান যুক্তির প্যাঁচে ঘোরালো হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলস্বরূপ ‘অরণ্য’ হিসেবেই যদি স্বীকৃতি না মেলে তবে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের ‘অরণ্যচারী’ হিসেবে স্বীকৃতি মেলাটাই অকল্পনীয় হয়ে দাঁড়ায়। তাই তথ্য বলছে, ২০১৪ সালে সংশোধিত অরণ্য সংরক্ষণ আইন বলবৎ হওয়ার পরবর্তীতে জনজাতি অধ্যুষিত অরণ্য-অঞ্চলকে অপরিকল্পিত খননকার্যের হাত থেকে রক্ষার প্রয়োজনে মোট ১২৫টি আবেদন সরকারের কাছে জমা পড়লেও, কোনওটির ক্ষেত্রেই জনজাতি গোষ্ঠীগুলির অরণ্যের অধিকার স্বীকৃতি পায়নি।[2] পাশাপাশি ২০২২ সালে এই আইনটিকে পুনরায় সংশোধনের মাধ্যমে আরওই দুর্বল করে দিয়ে, আদিবাসী-উচ্ছেদ ও বৃহৎ পুঁজিপতিদের হাতে বিপুল পরিমাণে খনিজসম্পদ অনায়াসে তুলে দেওয়ার বিষয়টি সহজ করা হয়েছে। আমাদের রাজ্যেও দেউচা-পাঁচামি খনিপ্রস্তাবকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেই বিষয়েও বর্তমান রাজ্য সরকারের তরফে কোনওরকম স্বচ্ছতা বা বিতর্ক সমাধানের প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে না। পরিবর্তে স্বাধীন যে কোনও নাগরিক সংগঠনকেই সেই অঞ্চলে ঢুকতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, এই দেউচা-পাঁচামি খনির ক্ষেত্রেও আদানি গোষ্ঠীরই হাতে খননকার্যের ভার তুলে দেওয়া হয়েছে। যে পদ্ধতিতে খোলামুখ খনি প্রযুক্তির মাধ্যমে দেউচা-পাঁচামিতে খননকার্য চালানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সারা পৃথিবীতে সেই পদ্ধতির বিরুদ্ধে বিশেষজ্ঞ মানুষেরা মত প্রকাশ করেছেন।[3] একইসঙ্গে নাগরিক অধিকার ও লাগাতার পরিবেশ ধ্বংসের মাধ্যমে এ-দেশে অরণ্যসম্পদ ধ্বংস ও জনজাতি-অধিকার লুণ্ঠনের মাধ্যমে যে বিকাশের জয়রথ চলেছে, ভবিষ্যতে এর ফলাফল ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াবে। আমরা, অপেশাদার নিবন্ধকার হিসেবে এই বিষয়ে মানুষকে সাবধান করে দিতে পারি কেবল।


[1] Ahmed, Ali. A curious statistic: Maoists only die; they don’t seem to get injured, captured or surrender. The Wire. Mar 24, 2025.
[2] Nitnaware, Himanshu. FRA implementation: 16 years after its inception, just 3 states recognise community forest resource rights. Down to Earth. Feb 12, 2025.
[3] Berglund, Oscar and Brotto, Tie Franco. Repression of climate and environmental protest is intensifying across the world. Climate Home News. Jun 6, 2025.

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5003 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...