
বর্ণিল ভট্টাচার্য
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-ব্যবস্থা আজ ট্রাম্প-এর দ্বারা আক্রান্ত। আমেরিকার উৎপাদনব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে যে নীতি তিনি নিয়েছেন, তা ক্রমশ বদলে গিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্য-বিষয়ক ঐকমত্যকেই চ্যালেঞ্জ করছে। এর ফল হবে সুদূরপ্রসারী, বহু প্রজন্মব্যাপী। বহু দশক ধরে গড়ে তোলা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাতারাতি ধসে পড়তে পারে, কেবল প্রেসিডেন্টের একটি ঘোষণার জেরে। এই অনিশ্চিত সময়ে বিশ্ব-অর্থনীতি নতুন পথ খুঁজছে
যে মুক্ত বাণিজ্যের কাঠামোর উপরে বিশ্ব-অর্থনীতি গড়ে উঠেছে গত কয়েক দশক ধরে, তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন পণ্যকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়ার নীতি নিয়েছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেন ট্রাম্প। তারপর থেকে আমেরিকার প্রশাসন যেভাবে শুল্ক আরোপ করে চলেছে, তাকে গত একশো বছরে সবচাইতে আক্রমণাত্মক বাণিজ্য নীতি বললে ভুল হবে না। এর ফলে গোটা অর্থনীতির ছবিটাই বদলে যাচ্ছে— আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য, দু-দিক দিয়েই।
এমন দ্রুত আর এত ব্যাপকভাবে শুল্ক আরোপ শুরু করা শুরু করেছেন ট্রাম্প, যে অন্যান্য দেশগুলি গোড়ায় হতচকিত হয়ে গিয়েছিল। ক্ষমতায় ফেরার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ট্রাম্প কানাডা ও মেক্সিকোর পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ, চিনা পণ্যের উপর সর্বমোট ২০ শতাংশ, এবং বিশ্বের যে-কোনও দেশ থেকে আসা ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। সম্প্রতি তিনি ঘোষণা করেছেন যে বিদেশি গাড়ির উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক বসাবেন। সব মিলিয়ে মোট শুল্কের পরিমাণ এখন এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে, যা প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর প্রথম মেয়াদে আরোপিত শুল্কের প্রায় চারগুণ। ২ এপ্রিল দিনটিকে ট্রাম্প ‘মুক্তি দিবস’ আখ্যা দিয়েছেন, কারণ সেদিন তিনি ‘পারস্পরিক শুল্ক ব্যবস্থা’ ঘোষণা করবেন। অন্য দেশগুলো যে হারে আমেরিকান পণ্যে শুল্ক বসায়, সে হারেই তাদের পণ্যে শুল্ক আরোপ করবে আমেরিকা।
ট্রাম্প এই পদক্ষেপগুলিকে জরুরি সংস্কার হিসেবে তুলে ধরছেন। “বছরের পর বছর ধরে আমরা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের দ্বারা লুণ্ঠিত হয়েছি, কিন্তু আর নয়,” তিনি ঘোষণা করেছেন ট্রুথ সোশালে। আমদানি করা পণ্যের উপর শুল্ক বসিয়ে আমেরিকার পণ্যকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়ার যে নীতি (‘প্রোটেকশনিসম’) ট্রাম্প নিয়েছেন, কারণ তাঁর ধারণা তাতে আমেরিকার বাণিজ্যঘাটতি কমাবে, দেশের উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করবে। এই বাণিজ্যিক সুরক্ষাবাদ বেআইনি অভিবাসন বা ফেন্টানিল-জাতীয় নেশাদ্রব্য পাচারের মতো সীমান্ত-সমস্যাগুলিরও মোকাবিলা করবে, মনে করেন ট্রাম্প।
কিন্তু যা শুরু হয়েছিল আমেরিকার উদ্যোগ হিসেবে, তা দ্রুত একটি বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যযুদ্ধের রূপ নিচ্ছে। আমেরিকার বিভিন্ন রপ্তানির উপরে শুল্ক বসিয়ে প্রত্যাঘাত করা শুরু করেছে নানা দেশ। ট্রাম্পের ইস্পাত শুল্কের জবাবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন আমেরিকান হুইস্কি, মোটরসাইকেল এবং মোটরবোটে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। চিউয়িং গাম এবং সয়াবিনের উপরও শুল্ক বসানো হবে বলে জানিয়েছে। কম্পিউটার এবং খেলাধুলার সরঞ্জাম-সহ ২১ বিলিয়ন ডলারের সামগ্রীর উপর শুল্ক আরোপ করেছে কানাডা। আমেরিকার মুরগি, গম, ভুট্টা এবং তুলোর উপর ১৫ শতাংশ, সয়াবিন, শূকরমাংস এবং অন্যান্য কৃষিপণ্যের উপর ১০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছে চিন। এই সব প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রাম্প ইউরোপের ওয়াইন, শ্যাম্পেন এবং অন্যান্য মদিরা-জাতীয় পানীয়ের উপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। অর্থাৎ মার্কিন নীতি বিশ্বজোড়া এক শুল্ক-যুদ্ধের জন্ম দিয়েছে।
কিন্তু একটু তলিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই শুল্কনীতির মধ্যে প্রবল অসঙ্গতি রয়ে গিয়েছে। কেবল শুল্কের অর্থমূল্যই নয়, এমন এলোমেলো, যুক্তিহীনভাবে শুল্কের আরোপ হচ্ছে, যে ওয়াকিবহাল মহল আশ্চর্য হয়ে পড়ছেন। কানাডা এবং মেক্সিকোর নানা পণ্যের উপর পরপর দুবার শুল্ক ঘোষণা করা হয়েছে, আবার দুবারই তার অধিকাংশ স্থগিত করা হয়েছে। যেমন, ওই দুই দেশ থেকে আসা গাড়ির যন্ত্রাংশে আপাতত শুল্ক বসছে না। শুল্ক আরোপ বিষয়ক ঘোষণার সময়ে ট্রাম্প এই বিষয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। কখনও তিনি নিরাপত্তার যুক্তি দেন আবার কখনও বা আমদানি-রপ্তানিতে ভারসাম্যের অভাব নিয়ে অভিযোগ করেন।
ফলত, আমেরিকার ব্যবসাজগতে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। ফেডএক্স, ডেল্টা এয়ারলাইন্স থেকে শুরু করে ‘স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুয়োর ৫০০’ সূচকের অন্তর্গত বাণিজ্যিক সংস্থাগুলির অধিকাংশ এই শুল্ক-দোলাচলের জন্য সঙ্কটে পড়েছে। ট্রাম্প ফিরে আসার পরে শেয়ারবাজার চার শতাংশ ওঠায় যে বিনিয়োগকারীরা উৎফুল্ল হয়ে ট্রাম্পকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, তাঁদের সেই ফুর্তি এখন উধাও। এ ক-দিনে বাজার যে হারে পড়েছে, তাতে সে সময়ের লাভের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ট্রাম্প কিন্তু শেয়ারবাজারের পতনকে পাত্তাই দিচ্ছেন না। ব্যবসা-বাণিজ্যের জগৎ হতবাক— প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টারা কি জেনেবুঝে এটা হতে দিচ্ছেন, নাকি প্রকৃত চিত্রটাকে তাঁরা অস্বীকার করছেন? অনেকে আবার মনে করছেন, বাজারের এমন সংশোধন অর্থনীতির পক্ষে ‘স্বাস্থ্যকর’। বাণিজ্যসচিব হাওয়ার্ড লুটনিক বলেছেন যে শুল্ক আরোপের জন্য যদি বাজারে মন্দা (রিসেশন) দেখা দেয়, তাতেও আখেরে লাভই হবে।
এই বাণিজ্য সুরক্ষাবাদের অভিঘাত ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে সারা বিশ্বে। বহু বছর বিশ্ব-বাণিজ্যে যে-সব বাধা দেখা যায়নি, সেগুলি আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে। বিশ্ব-বাণিজ্যে প্রাধান্য রয়েছে যে দেশ বা অঞ্চলগুলির, সেই ‘জি২০’ দেশগুলির মধ্যে ৪৬৫০টি আমদানি-নিয়ন্ত্রণ কার্যকর ছিল ১ মার্চ, ২০২৫ তারিখে, যা ২০০৮ সালের তুলনায় প্রায় দশগুণ বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৩০ দশকের পর এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ঝোঁক আর দেখা যায়নি।
শুল্ক-যুদ্ধের ফলে সব চাইতে সঙ্কটে পড়েছে সেই উৎপাদকরা, যাদের পণ্য তৈরিতে নানা দেশের উপাদান লাগে। যেমন ফোর্ড কোম্পানির এফ-১৫০, যে গাড়িটি আমেরিকায় সবচাইতে বেশি বিক্রি হয়, তার বডি তৈরি হয় অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে। অ্যালুমিনিয়ামের পাত তৈরি করে আমেরিকার ‘রোলিং মিল’, কিন্তু ধাতুটির জোগানের জন্য নির্ভর করতে হয় কানাডার কারখানার উপর। আমেরিকাকে অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হতে বহু বছর লাগবে, বলেছেন ফোর্ড-এর এক মুখপাত্র। একের পর এক উপকরণে শুল্ক আরোপ করায় গাড়িনির্মাতারা যেন জেগে দুঃস্বপ্ন দেখছেন। বহু উপকরণ তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়ায় একাধিকবার নানা সীমান্ত অতিক্রম করে শেষ কারখানাটিতে পৌঁছয়। কিন্তু সেই পথে প্রতিবার শুল্ক আরোপ হওয়ায় শেষ অবধি গাড়ির দাম কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, ভাবতেও শিউরে উঠছেন তাঁরা।
বাইরে থেকে আসা ইস্পাত আর অ্যালুমিনিয়ামের উপর শুল্ক বসায় খুশি হওয়ার কথা ছিল আমেরিকার ইস্পাত এবং অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদকদের। কিন্তু তাঁরাও নানা কারণে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। যেমন, একটি অ্যালুমিনিয়াম শিল্পসংস্থা বলেছে যে আমেরিকায় যা বিদ্যুতের চড়া দাম, তাতে মৌলিক অ্যালুমিনিয়াম কানাডা থেকে না এনে আমেরিকায় উৎপাদন করতে গেলে খরচ বেশি হবে।
ট্রাম্প মনে করছেন, আমদানি কমালে আমেরিকার শিল্পে ফের জোয়ার আসবে। সমস্যা হল, আমেরিকা যা আমদানি করে, তার ৪৫ শতাংশ হল আমেরিকার নানা শিল্পে উৎপাদনের নানা উপকরণ। এগুলোতে শুল্ক বসালে প্রশাসনের যা মূল লক্ষ্য— উৎপাদন বাড়ানো— সেটাই মার খেয়ে যাবে।
শুল্কনীতিতে এই অস্থিরতার মুখে পড়ে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যরত দেশগুলি নানা ধরনের কৌশল নিচ্ছে। যেমন, চিন ঠিক করেছে, আমেরিকায় রপ্তানি ইচ্ছে করে নিয়ন্ত্রণ করবে। রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানোর লক্ষ্য থেকে সরে এসে, অল্প কয়েকটি জরুরি পণ্যের জন্য বেশি দাম দাবি করবে চিন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজ়েশন) তৈরি হয়েছিল, যাতে শুল্ক যুদ্ধ প্রতিরোধ করা যায়। আমেরিকার অভিযোগ, ডব্লিউটিও নিজের এক্তিয়ার ডিঙিয়ে কাজ করে। সংস্থাটিকে আর বিশেষ পাত্তা দেয় না আমেরিকা। কিন্তু কোনও একটা নিরপেক্ষ ‘রেফারি’ কাজ না করলে বিশ্ববাণিজ্যে সঙ্ঘাত দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। এমন অস্থির পরিস্থিতিতে কোনও বাণিজ্যিক সংস্থার পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-ব্যবস্থা আজ ট্রাম্প-এর দ্বারা আক্রান্ত। আমেরিকার উৎপাদনব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে যে নীতি তিনি নিয়েছেন, তা ক্রমশ বদলে গিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্য-বিষয়ক ঐকমত্যকেই চ্যালেঞ্জ করছে। এর ফল হবে সুদূরপ্রসারী, বহু প্রজন্মব্যাপী। বহু দশক ধরে গড়ে তোলা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাতারাতি ধসে পড়তে পারে, কেবল প্রেসিডেন্টের একটি ঘোষণার জেরে। এই অনিশ্চিত সময়ে বিশ্ব-অর্থনীতি নতুন পথ খুঁজছে।
বিশ্ববাণিজ্যে সঙ্ঘাত বাড়লে আমেরিকার ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে, সে আশা কম। আক্ষেপ এই যে, মার্কিনদের আগ্রাসী শুল্কনীতির ফলে আরও অনেক দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্যের ছবি হয়তো অনুজ্জ্বল, মলিন হতে চলেছে। এই বিষয়ে সে-সব দেশের কোনওরকম দোষ না থাকা সত্ত্বেও।
*মতামত ব্যক্তিগত