বস্তারের দেবদেবীরা, পর্ব — এক

অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী

 

তৃতীয় উপকথা এখানে

 

‘পেন ও বুঢ়া পেন’

বস্তারের লোকবিশ্বাস–চর্চায় ‘পেন’ শব্দ বারবার আসে। তাই আদি ধর্মগুরু অর্থাৎ জিনি গোণ্ডদের ৭৫০টি টোটেমে প্রচলিত ও পালিত এণ্ডোগ্যামি-প্রথার বিধান দিয়েছিলেন, তাঁর নাম হয়ে যায় ‘লিঙ্গো’-‘পেন’, আবার গোণ্ডদের প্রথম ঐশ্বরিক কনসেপশানের নাম ‘বুঢ়া’-‘পেন’, অর্থাৎ বুড়ো দেবতা। মুণ্ডারীরা যখন ‘বোঙ্গা’ এবং অস্ট্রেলিয়া-পলিনেশিয়াময় প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপদেশের অ্যাবরিজিন আদিবাসীরা যখন ‘মানা’ ঐশ্বরিকতার হদিশ পাচ্ছিলেন প্রাকৃত উপাসনা মারফৎ, সেই একই সময়কালে গোণ্ডরা কনসেপচুয়ালাইজ করছিল ‘বুঢ়া’-‘পেন’-কে। পঞ্চভূতেরা একে অপরের সাথে বিভিন্ন জাগতিক রি-অ্যাকশান-প্রক্রিয়ার ফলে সৃষ্টি ও লয়, গঠন ও বিগঠন, করে চলেছে জড় ও জীবময় বস্তুজগৎকে। এই গঠন-বিগঠনের প্রক্রিয়াকে প্রাকৃত ভক্তিপথে চিহ্নিত করছেন ৭৫০ টোটেমময় বিধৃত গোণ্ড-কৈতর (গোণ্ডি-ভাষায় কৈতর অর্থে মানুষ) সম্প্রদায়সমূহ সেই বুড়োঠাকুরের নামে।

আবার অরণ্যযাপনে নিত্যনৈমিত্তিক-প্রয়োজনীয় ঔজার ছোট কুড়ুল। গোণ্ডি ভাষায় কুড়ুলকে বলা হয় ‘ফরসা’, আর বিশ্বাসে তা অর্চনা পায় ফরসা-‘পেন’ হিসেবে।

উপরের উদাহারণগুলো থেকে স্পষ্ট, গোণ্ডি ভাষায় ‘পেন’ শব্দার্থ -– দৈব অথবা ঐশী-শক্তির আধার। এর আগের একটুকরো রূপকথায় আমরা জানলাম ‘লিঙ্গো’-‘পেন’-এর কথা। এইখানে আমরা জানবো ‘ভিররু’ আর ‘কোতি’-‘পেন’-এর পুত্রকন্যাদের মাধ্যমে গোণ্ড আদিবাসীদের প্যান্থিয়নের প্রচার-প্রসার পাওয়া এবং অপরাপর ঐশীশক্তির ধারক-বাহক দেবদেবীদের কথা।

‘ভুররা, কোতি ও তাদের ছেলেমেয়েরা’

এই প্যান্থিয়ন প্রচলনের কাহিনীর আরম্ভ ভুররা আর কোতি-র থেকে। ‘ভীমাল’, কিন্তু এই গল্পে টোটেম-চিহ্নদের মাধ্যমে গোণ্ড দেবদেবীদের ‘গুড়ি’ বা থানেদের, অস্তিত্বদের, এবং সেই সব থানে হওয়া রিচুয়াল পুজোপাঠেদের কিছু আলগোছ হিসেব মেলে।

‘ভুররা’ ভূমি থেকে উৎপন্ন হল, অথবা, ওয়াটার-বাফেলো -– যা চামড়া-ব্যবসায়বৃত্তির বহুলবিস্তারের ফলে মধ্যভারত থেকে অধুনালুপ্ত -– তার টোটেম থেকে। টোটেম প্রসঙ্গে পাঠককে স্মর্তব্য, সমস্ত আদিবাসী গোষ্ঠীর টোটেমেই প্রকৃতির কোনও এক বা অধিক পশু, পাখি, গাছ, পাতা, ফুল, পতঙ্গ ইত্যাদি পূজ্য ও অবশ্যসংরক্ষণীয়।

ইন্টার-জেনারেশানাল ইকুইটি

এই উপাসনা ও সংরক্ষণের যুথষ্ক্রিয়ার মূলে কাজ করছে দুনিয়ার তামাম আদিবাসীদের একটা দর্শন -– ইন্টার-জেনারেশানাল-ইকুয়ালিটি। এই দর্শনে বলীয়ান হয়েই উপমহাদেশের অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, মোঙ্গোল ভাষাগোষ্ঠীর মানুষেরা অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ অবধি কতবার যে শ্বেতাঙ্গ বণিক-শাসক, সবর্ণ ভূস্বামী-শাসকদের বিরুদ্ধে ঢাল তরোয়াল তুলেছে, তার ইয়ত্তা রাখার অপচেষ্টামাত্র করেনি ব্রাহ্মণ্যাভিমানী মূলধারা, উলটে, টিটিকিরি কেটে ব্যঙ্গ-বচন বানিয়েছে ‘নিধিরাম সর্দার’। এক ছোটনাগপুরেই দেখা যাচ্ছে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে, কোম্পানির শাসন ও তদপ্রসূত মন্বন্তরের ছায়া পড়তে না পড়তেই, ১৭৭৮-এর মালপাহাড়িয়ার পর পরেই, ১৭৮৫ সালে, তিলকা মাঝি নামক কোনও কিছু-বাস্তব কিছু-মিথিকৃত নেতা আবার ডাক দিচ্ছে বিদ্রোহের, ১৭৯৮-৯৯ জুড়ে দ্রোহদামামা বাজাচ্ছে ভূমিজ আদিবাসীরা; আবার একই সময়কাল জুড়ে নাগপুরের রেসিডেন্টাদির প্রভাব, মারাঠী ঘোরহিন্দু ভূস্বামীবর্গ-কৃত জুলুমবাজির বিরুদ্ধে গর্জে উঠছে লোরমি, বীজাপুর, ভোপালপাটনার মতো অঞ্চলের গোণ্ড আদিবাসীরা, আবার সমগ্র উনিবিংশ শতাব্দী ধরেই ফরসা-পেন হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে স্বীয় ও কৌমের টোটেম-খচিত গাছদের অবাধ নিজাম-কৃত খনন রুখতে, আর তাদের শাহাদতের উপর নিজামের বিত্ত বাড়ছে, বাড়ছে বস্তার, কাঙ্কের, সরগুজার প্রিন্সলি এস্টেট-এর হিন্দু গোত্রবাহী ‘রাজা’দের। এতই প্রবল ছিল সেকালের ইন্টার-জেনারেশানাল ইকুয়ালিটি-চিহ্নিত যাপনপ্রজ্ঞার ধক, যে তবু আদিবাসী বিদ্রোহ করে গিয়েছে শ্বেতাঙ্গের বিরুদ্ধে, সবর্ণ জমিদারের বিরুদ্ধে, ধনাঢ্য বনব্যবসায়ীদের দালালদের বিরুদ্ধে, অগণনবার! ফিরে আসি গল্পে।

পুনঃ ভুররা-কোতি-র গল্প

ভুররার সাথে বিয়ে হল ভুজদেশের কোতি-র। তাদের হল সাতটা ছেলে আর পাঁচটা মেয়ে। বড়ছেলে ভীমাল। বড়মেয়ে খের। এরা সকলেই গোণ্ড ভক্তিগাথায় গাথায় শ্রুতিবিধৃত ‘পেন’ হিসেবে। গোণ্ড গ্রামে গ্রামে দেখা যায় এদের ‘গুড়ি’-‘ঠানা’, থান -– সেক্রেড কমনস হিসেবে গোণ্ডি মিথোষ্ক্রিয়ায় কালচারাল সম্পদ হয়ে ওঠে গ্রাম ছাড়িয়ে পরগণা ছাড়িয়ে বিভিন্ন ট্রাইবাল কনফেডারেট-এর ব্যাপ্তিতে। একটা বয়েসের পর ভীমাল হয়ে উঠল ভাবালু প্রকৃতির। ঘরে মন বসে না। বেরিয়ে পড়ল। গ্রামে গ্রামে গিয়ে আস্তানা গেড়ে পড়ে থাকতে লাগল দিনের পর দিন।

এদিকে তাকে মা কোতি বাবা ভুররা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে উঠল। ভীমালানুজ ছয় ভাইকে পাঠিয়ে দিল তাদের হারানো দাদাকে ফিরিয়ে আনতে। নানান জায়গায় তন্নতন্ন করে খুঁজেও ভীমালের দেখা পেল না তারা। তারপর তারাও আর ঘরে ফিরল না, আশেপাশের গাঁ-গঞ্জেই আস্তানা গাড়ল। তখন ভুররা-কোতি তাদের পঞ্চকন্যাদের পাঠালেন ভীমাল সমেত সাত ভাইকে খুঁজে আনতে। বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরল পাঁচ বোন। তারাও খুঁজে পেল না কাউকে। সাত ভাইয়ের মতোই পাঁচ বোনেও সিদ্ধান্ত নিল, গোণ্ড আদিবাসীদের বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে আস্তানা বানিয়ে পল্লীসমাজকে রক্ষা করবে। এইভাবে, গোণ্ড কৈতরদের গ্রামে গ্রামে বসে গেল এই সাত ভাই আর পাঁচ বোনের থান।

গোঠান-গোচারণভূম্যাদিতে বসে গেল খীলা-মুঠভা-র থান; আবার অপরাপর থানে ঠাঁই পেল ‘ঠাকুর-দেও’, যার নামের সাথে ‘বিদৌরী-সঞ্জৌরী’-বীজমন্ত্রের গুহ্যসমাজ-সাধনাচারের ইঙ্গিত যেমন রয়েছে এক-ধারায়, অপরাপর এক ধারা এসে সেই আইডেন্টিটিতেই সম্পৃক্ত করছে ‘জটবা’-র নাম। উক্ত ‘খণ্ডাৎ’ তথা খণ্ড বা খাড়া (ছোট তরোয়াল) ধারী কোনও এক মধ্যযুগীয় আদিবাসী দলপতি-র নাম ও নানান মিথিকাল বীরগাথা।

জটবা

চতুর্দশ শতাব্দীতেই জটবা বর্তমান মহারাষ্ট্রস্থ ছিন্দ-ওয়াড়া, গড়-বাঔলি অঞ্চলের পূর্বাপর কোনও আদিবাসী দলপতি-দ্বয় রণসাসুর, ধনসাসুরদের প্রতিহত করে প্রতিষ্ঠা করল স্বীয় টোটেমবংশ, আর সেই সব ঘটনার কিছু দশকের মধ্যেই বহমানি সালতনতে উপস্থিত হয়ে এই জটবা প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের কথা লিখে ফেলল পারসিক ইতিহাসকার ফারিশতা। গোণ্ড ইতিহাসের বিভিন্ন টোটেম-স্মরিত যোদ্ধারা এইভাবে বিভিন্ন জায়গায় ও বিভিন্ন সময়ে রাজছত্র উড়িয়েছে, পুজো পেয়েছে। এই উপায়ে বিভিন্ন গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করছে যে তাদের টোটেমের দাদা-পরদাদা-রা ‘খণ্ডা-মুখিয়া’ বা খাঁড়াধারী বীরদের প্রাকৃত দৈবশক্তি হয়ে দিবারাত্র অতন্দ্র প্রহরা রাখছে তাদের গাঁয়ে-গাঁয়ে।

ভীমাল-খেরা-র ভাইবোন ও অন্যান্য দেবদেবীরা   

এছাড়াও, গ্রামের দেবতা হয়ে সুখ-সমৃদ্ধির নিশ্চিন্তি দিতে থাকল হারদূল। হির্ভা, ডঙ্গুর, সররি-রাও বিভিন্ন দেব-দেবী হয়ে গ্রামে গ্রামে থান নিল।

এইবার, সমাজগঠনের পালা। গ্রাম থেকে গ্রাম সংযোগ-পথ বানাতে, পুল-সাঁকো বানাতে, সহায় হল ‘সর্প’ টোটেমচিহ্নধারী ভজভা-‘পেন’। ঘাটের সুরক্ষা নিশ্চিত করলেন ঘটভৈঁয়া ‘পেন’। এই প্যান্থিয়নেই ঠাঁই পেল হাওয়া, আগুন আর জল কন্ট্রোল করবার অমিত দৈবক্ষমতাসম্পন্ন ভীমাল ‘পেন’। এতই তার তেজ যে কোথাও কোথাও তার নামই হয়ে গেল ‘গুরু ঘামসান’!

সেই অলৌকিক বোনেদের মধ্যে পুঙ্গুর আর পণ্ড্রী অন্ন-খাদ্য-অরণ্যের নিরাপত্তা-দাত্রী হলেন। গ্রামের সীমারেখা জুড়ে ঠাঁই নিয়ে সীমান্ত-প্রহরার অধিষ্ঠান নিল মেঢ় দেবী। নদী-জলসত্রময় পানি-র রক্ষণভার নিল পানঘাটের রাখওয়ালি পনিহওয়াড়িন। সন্ধ্যন, চুডূর সেলার, খৈরো নামধারী দেবীসত্তারাও এইভাবে গ্রামে গ্রামে ‘গুড়ি’-তে বসে গেলেন, লোকভক্তির গলতা ধরে, হয়ে গেলেন বিভিন্ন জাগতিক বস্তুবিষয়ের বা স্থানের ‘ওয়াড়িন’ — রক্ষণকর্ত্রী। এইভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সময়ের সাথে সাথে ভুররা-কোতি-র ছেলেমেয়েরা ছাড়াও বিভিন্ন দেবদেবী গোণ্ড প্যান্থিয়নে ঠাঁই করে নিচ্ছে। তাদের সাথে জুড়ে যাচ্ছে ‘জটবা’-র মতো মধ্যযুগীয় মিথনায়ক তথা ঐতিহাসিক দলপতিরা, কোথাও মাতৃ-উপাসনার ইঙ্গিত করে চলেছে কেকাসনী-খেরা-দান্তেওয়াড়িন ঐশীবোধেরা, আবার কোথায় স্থানমাহাত্মে ঠাঁই নিচ্ছে দান্তেওয়াড়িন, ডোঙ্গর-গড় (অর্থে -– পর্বতমালার মধ্যে যে পাহাড়)-এর বিম্লাই, ভিলাই ও বিলাই-গড়ের বিলাই-দেবীরা।

বিভিন্ন দেবদেবীদের হিন্দু-নাম ও চিহ্নে মিশে যেতে থাকা

কেউ কেউ আবার তাদের ইন্ডিজিনাস নামচিহ্নে ধূসর হয়েছে। আজকের মধ্য ছত্তিসগড় বা সেকালের দক্ষিণ কোশলের মধ্যভাগ বিলাসপুর জেলায়, খরং নদীর কোলে রতনপুর অঞ্চলের জমিদারেরা এক সহস্রাব্দকাল ধরে, অর্থাৎ গত সহস্রাব্দের প্রায় সমস্তটা জুড়েই, মধ্যভারতের মূলবাসী ভূ-ব্যবহার-পন্থা তথা বিভিন্ন পরিবার, ক্ল্যান, টোটেম, সমাজ ও গোত্রের মধ্যে জমির রোটেশানাল ব্যবস্থা বজায় রেখেছিল, তাদের ‘মহামায়া’। আরণ্যক যাপন থেকে বৃহত্তর কৃষি তথা কৃষি-বাণিজ্যের পথে চলতে থাকা কৌমলোকের ভক্তিধারা থেকে হিন্দুধর্ম কালক্রমে ছেঁটে দিয়েছে অরণ্যদেবীর নামস্মৃতি। একইভাবে, বস্তার অঞ্চলের দক্ষিণতম বিন্দুতে, যেইখানে ইন্দ্রাবতী নদী মিশেছে গোদাবরী নদীতে, সেইখানে শাল্মলী তরুচ্ছায়াতেই অস্থি যে প্রাচীন ইন্ডিজিনাস মাদার-আর্থ সাধনপীঠ, তা-ও সমগ্র মধ্যযুগ ধরে নাগপুর-বিদর্ভ-মণ্ডলা অঞ্চলের ‘নাগ-বংশী’ (তথা -– সর্প টোটেমচিহ্নধারী) ও অন্যান্য আদিবাসী শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতাচ্ছায়ায় লালিত হতে হতে আজকের আঞ্চলিক মূলবাসী ব্যক্তি, কৌম ও সমাজসমষ্টির মনে রেখে দিয়েছে শুধু তার হিন্দুনাম -– ‘ভদ্রকালী’।

এরপর চতুর্থ উপকথা, পর্ব — দুই

 

2 Trackbacks / Pingbacks

  1. বস্তারের উপকথা – পাঁচ – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম
  2. বস্তারের উপকথা — তিন – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*