শূন্য

শুভ্রদীপ চৌধুরী

 

কাটা পড়েছে, কাটা পড়েছে, একটা লোক। এইমাত্র… সামনেই… স্টেশনেই শুনলাম। ট্রেনটা চলে যেতেই ভিড়টা দেখলাম। হয়তো ওখানেই থেবড়ে পড়ে আছে লোকটা। ছেলে না মেয়ে?

কোনওদিন এগিয়ে যাইনি। ভাল্লাগেনা এসব দেখতে। আজ যাই।

মনোতোষের কথা মনে পড়ে।

ওর বৌ গতকাল ফোন করে বলেছিল, দাদা  আপনার বন্ধু তিনদিন হল বাসায় ফেরেনি। থানায় ডায়েরি করেছি। আপনি আসবেন একটু।

যাওয়া হয়নি কাল। অফিসে চাপ ছিল। আজ যাব। সেইমত অফিস থেকে ফিরছিলাম তাড়াহুড়ো করে।

দুমড়ে মুচড়ে পড়ে আছে লোকটা। অফিস ব্যাগ থেকে ছিটকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে টিফিনকৌটো। সযত্নে পাট করে গুছিয়ে রাখা খবরের কাগজ। একটা নীল কলম। ক্ষয়াটে পকেট ডায়েরি। একটা লোক সেটা তুলে নিয়ে পড়ে, ‘স্বপ্ন সত্যি হতে হতে জীবন লেগে যায়/কিন্তু চুলের ধূসর হওয়া পর্যন্ত কেই বা বেঁচে থাকে’।

আমি ‘গালিব, গালিব’ বলে চেঁচিয়ে উঠি!

–চেনেন? ওনার নাম গালিব!

–আপনার চেনা?

–এদিকে এদিকে আসুন।

যে যার মতো বলে যায়। আমায় হাত ধরে টেনে আনে একজন, ওনার নাম কি বললেন? গালিব?

আমি বলি, না, না। লেখাটা গালিবের মনে হল। আর মনোতোষ গালিব আওড়াত সারাদিন।

–মনোতোষ কে?

–আমার বন্ধু। কয়েকদিন হল বাড়ি ফেরেনি।

লোকটা ক্ষয়াটে ডায়েরিটার পাতা খসখস করে উলটে পালটে বলল, আর সব পাতায় লিখেছে শুন্য। দেখুন…. দেখুন….। লেখাটা নিশ্চয় চিনতে পারছেন।

নীল একটা পলেথিনে মুড়িয়ে নিয়ে গেল তাকে। মুখ বলে কিছু নেই। একটা কান ছোঁ মেরে নিয়ে গেছে নাকি কাক।

এসব শুনতে শুনতে বেরিয়ে আসি স্টেশন থেকে। ঢুকে পড়ি একটা বাসের পেটে।

নেমে পড়ি, দুম করে। মাথার উপরে ঝুলছে দমবন্ধ ছাই রঙের আকাশ। খরায় পোড়া ঘাসের মতো বিশ্রী লাগে শহরটা।

গতমাসে হাজারখানেক টাকা ধার চেয়েছিল মনোতোষ। মাসের শেষ বলে কাটিয়েছিলাম। আজ আর পারলাম না। ওর বাড়ির সামনে দাঁড়াই। অন্ধকার আর শ্রীহীন পুরনো বাড়ি। কলিংবেল নেই। দরজা ধাক্কাই।

কেউ আসে না। ধাক্কাতেই থাকি।

বেশ কিছু মানুষ আমার পেছনে এসে দাঁড়ায়।  শেকলের উপরে ছোট্ট তালাটা আপনার চোখে পড়েনি! ওদের মধ্যে কেউ বলে।

আরও জানতে পারি,

এক, মনোতোষরা ঘুরতে গেছে সমুদ্রে। 
দুই, ঘুরতে গেছে তবে সমুদ্রে নয় পাহাড়ে।
তিন, কাল কিংবা পরশু ফিরতে পারে।
চার, সুন্দরবন যাবে বলেছিল।
পাঁচ, তাজমহল দেখতে গেছে। নিশ্চিত।

আমি মনোতোষ আর ওর বৌয়ের নম্বর পরপর ডায়াল করতে থাকি। নেই। পরিষেবা সীমার বাইরে।

দেখি মাঝরাতে জানলায় এসে বসেছে একটা কাক। তার চকচকে ঠোঁটে ঝুলছে একটা কান। আলো জ্বালি। সে যায় না। কাকটা গম্ভীর গলায় বলে, আমি অন্ধ। আমায় বলে দাও এই কানটা আসলে কার?

আমি চুপ করে থাকি। কাকটাও।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...